প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫১
বন্যা সিকদার
“বউকে ছাড়া উজান চৌধুরী এক সেকেন্ডও শান্তিতে থাকতে পারবে না। আর তার বউকে সে কখন আদরে রাখবে আর কখন শাসন করবে সেটা সম্পূর্ণ তার নিজের ব্যাপার। এর জন্য অন্য কারো কাছ থেকে কোনো অ্যাডভাইস উজান চৌধুরী কোনোদিন নেবেও না‚ শুনবেও না!
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত থমকে না দাঁড়িয়ে গটগট করে কক্ষ ত্যাগ করল উজান। ধুপধাপ পা ফেলে মৌ’কে নিজের রুমে নিয়ে এসে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর কোনো কথা না বলে সোজা মৌ’য়ের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিল। মৌ’য়ের ঘুমন্ত শরীরটা খানিকটা নড়েচড়ে উঠল। উজান মাথা তুলে এক পলক তার মুখটা দেখল। তারপর আবারও তীব্র অনুশোচনায় গলার কাছে মুখ গুঁজে দিয়ে অসহায় স্বরে আওড়াল‚
“আই’ম রিয়েলি সরি‚ মাই লিটল পিচ্চি। আই’ম রিয়েলি রিয়েলি সরি…আমি সত্যিই তোমাকে এভাবে হার্ট করতে চাইনি জান। আমি জানতাম না আমার এই পিচ্চি বউটা ভেতরে ভেতরে এতটা কষ্ট পাবে।
উজান নিজের সকালের বেপরোয়া আর কটু কাণ্ডের জন্য প্রচণ্ড অনুতপ্ত। সে নিচু হয়ে মুখ তুলে মৌ’য়ের ফর্সা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পরম ভালোবাসায় নিজের গালটা মৌ’য়ের গালে ঘষে নিল। কিন্তু তার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শ পেয়ে মৌ’য়ের গালে এক অদ্ভুত সুরসুরি লাগল। এতে মৌ মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। সে আসলে ঘুমাচ্ছে না‚ জেগে আছে কিন্তু উজানে’র সাথে কথা না বলার জেদে চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকার ভান করে আছে। কারণ উজানে’র সাথে কোনো ভাবেই সে এখন কথা বলতে নারাজ। উজান হঠাৎ মৌ’য়ের থুতনিতে আলতো করে ধরে ডাক দিল।
“পিচ্চি…এই পিচ্চি। প্লিজ‚ একবার চোখ খোলো না? আমি সত্যি বলছি‚ লাইফে আর কোনোদিন তোমার সাথে এমন বিহেভ করব না। আমি তো জাস্ট রাগের মাথায় ওসব বাজে কথা বলে ফেলেছিলাম।
কিন্তু তবুও মৌ চোখ খুলল না। বার কয়েক ডাকার পরেও যখন ওপাশ থেকে বিন্দুমাত্র রেসপন্স এলো না। তখন উজান আরও আদুরে গলায় বলল‚ “পিচ্চি আমি খুব ভালো করে জানি তুমি জেগে আছো। আমার ওপর অভিমান করে আছো‚ তাই না? সরি জান আর কখনো এমনটা হবে না। এত ভালোবাসি তোমায়‚ একটুও কি রাগ সামলাতে পারবে না আমার? আমি তো মারিনি তোমাকে‚ প্লিজ চোখ খোলো। তোমার এই নিরবতা আমি আর সহ্য করতে পারছি না‚ একটু কথা বলো আমার সাথে।
তবুও মৌ চুপ করেই রইল‚ টু শব্দ পর্যন্ত করল না। এবার উজান নিজের সব ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে আচমকা ঝুঁকে এসে মৌ’য়ের থুতনিতে সজোরে নিজের দাঁত দিয়ে একটা কামড় বসাল। যন্ত্রণায় মৌ সাথে সাথে চোখ-মুখ খিঁচে তড়পিয়ে উঠল। তা দেখে উজানে’র ঠোঁটে এক ফালি দুষ্টু মুচকি হাসি ফুটে উঠল। মৌ ততক্ষণে বিদ্যুৎ গতিতে বিছানায় উঠে বসল। বাজখাঁই মেজাজে ঝেঁঝে উঠে।
”প্রবলেম কী আপনার? শান্তিতে একটু ঘুমাতেও দেবেন না? আমি কি আপনাকে কোনো ডিস্টার্ব করছি? না তো? তবে কেন বারবার এমন করছেন?
“কথা বলো আমার সাথে।
—উজান একগুয়ে গলায় বলল।
”কেন কথা বলব আপনার সাথে? আমি কথা বললেই তো আপনার মেজাজ খারাপ হয়। আমি তো সব কিছু নিয়ে শুধু ফালতু মজা করি‚ পাঁচ বছরের অবুঝ বাচ্চাদের মতো বিহেভ করি। অকারণে আপনার হাত কামড়ে দিই। আর সামান্য পরীক্ষার পাস নম্বরটুকুও তুলতে পারি না‚ তিন-তিনটে সাবজেক্টে ফেল মেরে বসে আছি। এমন একটা ঢংগী মেয়ের সাথে কথা বলে আপনার কী লাভ‚ শুনি? দরকার নেই আমার মতো ন্যাকামি করা‚ নির্লজ্জ আর বেহায়া মেয়ের সাথে কথা বলার।
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে মৌ আবারও রুষ্ট হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। মৌ’য়ের এই বরফশীতল ও আত্মসম্মানী ব্যবহারে উজান প্রচণ্ড অবাক হয়ে গেল। সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে‚ মেহেরে’র সাথে তুলনা করে সকালে যে কটু কথাগুলো বলেছিল। তাতেই মেয়েটার মনের একদম গহীনে তীব্র আঘাত লেগেছে। সে একদম নিচু ও কাতর স্বরে আওড়াল‚
“পিচ্চি সরি!
মৌ উজানে’র দিকে এক পলক শীতল চোখে তাকাল। তারপর নিজেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল‚ “আপনি কেন সরি বলবেন প্রফেসর সাহেব? সরি তো আমার বলা উচিত। দেশে-বিদেশে এত নামকরা এক সাকসেসফুল প্রফেসর আপনি আর আপনার নিজের বউ তিন-তিনটে সাবজেক্টে ফেল করে। সত্যিই তো এটা আপনার জন্য চরম লজ্জার বিষয়। যেখানে মেহের এত ভালো নম্বর নিয়ে পাস করল‚ সেখানে আমি ফেল করেছি…এটা আপনার ইমেজের জন্য সত্যি জঘন্য। আর কখনো আমার জন্য আপনাকে সমাজে বা ভার্সিটিতে লজ্জা পেতে হবে না। আমি নিজে পড়াশোনা করব‚ অনেক অনেক পড়ব। মেহেরে’র চেয়েও বেশি মন দিয়ে পড়ব। কাল থেকে ফোন ছোঁব না‚ একটুও আড্ডা দেব না আর টইটই করে ঘুরেও বেড়াব না। কাল থেকে আমি মেহেরে’র কাছেও আর যাব না। এই রুমে একলা বসে বসে সারা দিন শুধু পড়াশোনাই করব। আপনাকে বা অন্য কাউকে আর কখনো ডিস্টার্ব করব না।
কথাগুলো বলার সময় মৌ’য়ের দুই চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। উজান ফ্যাকাশে ও অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যি মেয়েটাকে সে সকালে একটু বেশিই কড়া কথা বলে ফেলেছে। উজান রুমের চারপাশে নজর বুলাল‚ বিছানা থেকে শুরু করে পুরো রুম আজ একদম নিখুঁতভাবে গুছানো। কোথাও একটুও এলোমেলো ছিটিয়ে নেই। নিশ্চয়ই আজ সারাদিন মৌ একাই এসব গুছিয়েছে। পড়ার টেবিলটাও সুন্দর করে সাজানো‚ এমনকি এর আগে উজান তাকে প্র্যাকটিস করতে যেসব ম্যাথ দিয়েছিল‚ তার সবকটাই মৌ একা একা সলভ করে রেখেছে। যা বাসায় ফিরে উজান অলরেডি দেখেছে। কিন্তু উজানে’র জন্য নিজেকে এতটা পাল্টে ফেলা মৌ’কে উজানে’র একদম পছন্দ হচ্ছে না। আগের সেই চঞ্চল‚ দুষ্টু আর পাগলী মৌ-ই উজানে’র কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।
“পিচ্চি…আই’ম রিয়েলি সরি। আমি সত্যি ইচ্ছে করে তোমাকে ওসব বলিনি।
”আপনার কি কিছু লাগবে? যদি না লাগে‚ তবে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ুন।
উজান এবার সম্পূর্ণ ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে এক ঝটকায় মৌ’কে টেন সোজা করে বসাল। মৌ’য়ের জলভেজা মুখটা দুই হাতের তালুতে ধরে নিজের একদম মুখোমুখি এনে চরম কাতর কণ্ঠে বলল‚ “সরি বললাম তো জান‚ তবুও এত অভিমান করে থাকবে আমার ওপর? সত্যি তোমায় আঘাত দিতে চাইনি। কিন্তু সকালে রেজাল্টের সাথে শিরিন বাজে ভাবে ব্যঙ্গ করে ম্যাসেজ করেছিল‚ তাই রাগের ওপর আমি নিজের মেজাজটাই কন্ট্রোল করতে পারিনি।
”আমি আপনার কাছে কোনো কৈফিয়ত চাইনি যে কেন আপনি আমাকে বকেছিলেন। আমি ভুল করলে আপনি নিশ্চয়ই শাসন করবেন‚ এর জন্য ক্ষমা চাওয়ার কোনো দরকার নেই। অনেক রাত হয়েছে‚ এবার ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালে উঠে আবার আপনাকে কলেজে যেতে হবে। আমি আর চাই না আমার ফালতু ভুলের জন্য আপনাকে কেউ কোনোদিন ছোট করুক। আমি নিজেকে তৈরি করে নেব‚ যাতে কারো সামনে আপনাকে আমার জন্য ছোট হতে না হয়।
মুহূর্তের মধ্যে উজান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় মৌ’কে টেনে এনে নিজের চওড়া বুকের একদম গভীরে লেপটে জড়িয়ে ধরল। মৌ’য়ের চোখের জল নিজের বৃদ্ধা আগুল দিয়ে মুছে দিয়ে পরম আকুলতায় বলে উঠল‚
“লাগবে না। আমার জন্য তোমাকে বিন্দুমাত্র পাল্টাতে হবে না পিচ্চি। এই যেমন আছো তুমি‚ ঠিক এই পাগলীটাই যে আমার ভীষণ‚ ভীষণ প্রিয়। প্রমিজ করছি আর কোনোদিন তোমার সাথে এমন বিহেভ করব না। তবুও প্লিজ’ এভাবে কথা বলো না আমার সাথে‚ আমি সহ্য করতে পারছি না।
তোমার ইচ্ছে না হলে কাল থেকে আর কোনো পড়াশোনাই করার দরকার নেই‚ আমি কিচ্ছু বলব না‚ জোরও করব না। পড়াশোনা করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নিয়ম তো দুনিয়ায় কেউ দেয়নি। তবুও প্লিজ‚ আমার লক্ষ্মী বউটা একটু স্বাভাবিক ভাবে কথা বলো আমার সাথে। তোমার এই দূরত্ব সহ্য করতে আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। আমি যদি আগে থেকে জানতাম তুমি এতটা হার্ট হবে‚ তবে জীবনেও কখনো ওভাবে বকা দিতাম না সত্যি।
”আমি কষ্ট পাইনি‚ আপনি বিচলিত হবেন না…ঘুম পাচ্ছে আমার।
মৌ খুব স্বাভাবিক শোনানোর চেষ্টা করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু উজান তার এমন কৃত্রিম দূরত্ব মেনে নিতে পারল না। সে আলতো করে মৌ’য়ের নরম গাল দুটো আবার নিজের দুই হাতের তালুতে আঁকড়ে ধরল।
“পিচ্চি তুমি কেন বুঝতে পারছো না যে তোমার এই অস্বাভাবিক নীরবতা আমি সহ্য করতে পারছি না? সত্যি বলছি‚ এতে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে ভিষণ। আচ্ছা কান ধরে উঠবস করবো? ওকে সেটাই করছি।
কথাটা বলেই উজান সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে পড়তে চাইল কিন্তু মৌ তাকে আর সরতে দিল না। সে এক ঝটকায় উজানে’র শক্ত বুকটা দুই বাহু দিয়ে জাপটে ধরে অঝোর ধারায় হু হু করে কেঁদে উঠল। উজান এক লহমায় স্থির হয়ে গেল। অত্যন্ত মমতায় মৌ’য়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মৌ কাঁপা কাঁপা রুদ্ধ কণ্ঠে কান্না ভেজা স্বরে বলে উঠল‚
“আমি সত্যি আপনার কথায় কষ্ট পাইনি কিন্তু আমাকে মেহুর সাথে তুলনা করায় আমার ভীষণ খারাপ লেগেছে। আচ্ছা‚ আপনিই বলুন একজন মানুষ কি কখনো অন্য আরেকজনের মতো হুবহু হতে পারে? মেহু মেহুর মতো পারফেক্ট আর আমি আমার মতো। আমি কীভাবে ওর মতো হব বলুন? আমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না তাই আমি পড়ি না‚ তার মানে এই নয় যে আমি পড়া পারি না! ছোটবেলায় বাড়ির সবাই আমাকে না পড়ার জন্য বকা দিত কিন্তু আব্বু সবসময় বলতেন খেলায় যেমন হার-জিত থাকে‚ পড়াশোনায়ও তেমন সাফল্য-ব্যর্থতা থাকে।
তাছাড়া ওই শিরিন ম্যাম আজ ফোন করে আমাকে অনেক বাজে বাজে কথা বলেছেন। উনি বলেছেন আমার দ্বারা নাকি জীবনে কিচ্ছু হওয়া সম্ভব নয়…আমি নাকি উজান চৌধুরীর মতো প্রফেসরের পাশে একদম অযোগ্য। উনার মতো নাকি এক পারফেক্ট মেয়ে আপনার সাথে মানায় আর আপনি নাকি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। আচ্ছা‚ উনি আমাকে এত বাজে কথা কেন বললেন? আমি তো উনাকে সবসময় যথেষ্ট সম্মান করি। আমি কি কখনো উনাকে খোঁচা দিয়ে বলেছি যে‚ তিনি নিজের ভালোবাসার মানুষকে ফেলে রেখে তারই বেস্টফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন? আবার তাকে ডিভোর্স দিয়ে আগের জনের কাছেই ফিরে আসতে চায়। রাতে অন্যান্য ছেলেদের সাথে ক্লাবে গিয়ে পার্টি করেন। আমি তো এসব নোংরা কথা উনাকে বলিনি…তবে সামান্য ফেল করার জন্য আমাকে এসব শুনতে হবে কেন? কে হয় উনি আমার? আমার কি শাসন করার মানুষ নেই? উনি কেন এসব বাজে কথা বলবেন?
কথাগুলো শোনা মাত্রই উজান একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার ফর্সা মুখের রক্তবর্ণ রূপ হলো। অতিরিক্ত ক্ষোভে তার হাতের শিরা-উপশিরাগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠল। শিরিন পরীক্ষা নম্বর দেওয়ার সময় মৌ’কে ব্যঙ্গ করেছিল। আর এখন ডিরেক্ট মৌ’কে ফোন করে এভাবে মেন্টালি হ্যারাস করেছে। উজানে’র ধৈর্যশক্তির বাঁধ এবার সত্যি চুরমার হয়ে গেল। সে মৌ’কে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে তড়িৎ গতিতে উঠে রুমের বাইরে যেতে চাইল। মৌ সাথে সাথে ভয় পেয়ে উজান’কে শক্ত করে ধরে ফেলল।
“কোথায় যাচ্ছেন আপনি এই মাঝরাতে?
“ওই বেয়াদব মহিলাকে আজ হাড়ে হাড়ে বোঝাতে‚ উজান চৌধুরীর ওয়াইফির সাথে বেয়াদবি করার পরিণতি কী হতে পারে।
উজান হুংকার দিয়ে উঠল। কিন্তু মৌ তাকে বিন্দুমাত্র সামনে এগোতে দিল না। দু-হাতে উজানে’র চওড়া হাত আঁকড়ে ধরে থেকে শান্ত গলায় বলল‚ “লাগবে না আপনার অহেতুক ঝামেলা করতে। আজ উনার বলার দিন ছিল তাই বলেছেন। আমাদেরও একদিন সময় আসবে! আমি কথা দিচ্ছি‚ এরপর থেকে খুব ভালো করে মন দিয়ে পড়ব। আপনার কোনো কথার অবাধ্য হব না। শাশুড়ি আম্মাও আমাকে খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছেন যে…কারো জন্য নয় বরং নিজের আত্মসম্মানের জন্য পড়াশোনা করা উচিত। পড়াশোনা নিয়ে আমি আর একটুও বাদারমি করব না‚ প্রমিজ!
মৌ’য়ের এমন আকস্মিক পরিবর্তন দেখে উজান না হেসে পারল না। তবে একই সাথে নিজের ওপর প্রচণ্ড অনুশোচনা হলো তার‚ সে যদি সকালে এত চিল্লাচিল্লি না করে মৌ’কে এভাবে ভালোবেসে প্রথম থেকেই বুঝিয়ে বলতো তবে তো এত কিছু সৃষ্টিই হতো না। উজান নিচু হয়ে মৌ’য়ের কপালে এক দীর্ঘ‚ গাঢ় ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে শুধাল…
“খেয়েছিলে কিছু রাতে?
মৌ কোনো উত্তর দিল না‚ একদম চুপ করে রইল। তার এই অর্থপূর্ণ নীরবতা দেখে উজানে’র আর বুঝতে বাকি রইল না যে মেয়েটা অভিমান করে না খেয়েই বসে আছে। সে তড়িঘড়ি আবার জিজ্ঞেস করল‚ “দুপুরেও খাওনি তাই না?
এবারও মৌ নিচু মাথায় নীরব রইল। উজান চরম হতাশ ও বিষণ্ন হয়ে পড়ল। মেয়েটা সারাটা দিন না খেয়ে পেটে খিদে নিয়ে রয়েছে আর সে কিনা একা খেয়েছে। উজান এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল‚
“জাস্ট ওয়েট জান‚ আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
মৌ বারণ করা সত্ত্বেও উজান সোজা নিচতলার কিচেন রুমে চলে গেল। কিচেন রুমে গিয়ে খুঁজে খুঁজেও মৌ’য়ের পছন্দের কোনো খাবার খুঁজে পেল না। আজ রাতে বাড়িতে রুই মাছের ঝোল রান্না করা হয়েছিল অথচ এই মাছ মৌ চোখেও দেখতে পারে না! উজান তাড়াহুড়ো করে ফ্রিজ খুলে দেখল ভেতরে ফ্রেশ চিকেন রয়েছে। সে সেখান থেকে দুইজনের জন্য বেশ কিছু পিস বের করে নিল। তারপর ওপরের ক্যাবিনেট খুঁজে চাল-ডাল থেকে পোলাওয়ের চাল বের করল। সমস্যা হলো জীবনে কোনোদিন সে কিচেন রুমের হাঁড়িতে হাত দেয়নি। আর এই গভীর রাতে সে রান্না করবে। উজান পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে ইউটিউবে সার্চ দিল তারপর ভিডিও দেখে দেখে সকল মশলা আন্দাজ করে দিল। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে কেঁদে কেটে তার চোখের জল-নাক এক হয়ে লালচে ও ফোলা রূপ ধারণ করল। আয়নায় নিজের সেই করুণ দশা দেখে উজান নিজেই এক ফালি হেসে ফেলল।
গ্যাসে আগুন জ্বালাতেও না পেরে আবার ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে ফায়ার অন করল। জীবনে কোনোদিন যে পুরুষ কিচেন রুমের ছায়াও মাড়ায়নি‚ আজ নিজের প্রিয় ওয়াইফির পেটের খিদের কথা ভেবে সেই উজান চৌধুরী টানা দুই ঘণ্টা ধরে পুরো কিচেন রুম রণক্ষেত্র বানিয়ে ফেলে শেষমেশ চিকেন আর গরম পোলাও রান্না শেষ করল।
পুরো কিচেন রুমের অবস্থা এখন এমন থমথমে যে সকালে যে কোনো লোক দেখলে হার্ট অ্যাটাক করবে। কিন্তু উজানে’র সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে অতি যত্নে একটা প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গরম পোলাও আর চিকেন নিয়ে সোজা দোতলায় নিজের রুমে ফিরে এলো।
রুমের ভেতর মৌ বিছানায় শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছিল। এতক্ষণ না খেয়ে থাকায় ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল তার। কিন্তু উজান’কে প্লেট হাতে রুমে ঢুকতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম চিকেন-পোলাও দেখে। উজান এসে নিশব্দে মৌ’য়ের পাশে বিছানায় বসে এক লোকমা গরম পোলাও আর মাংস মেখে মৌ’য়ের মুখের সামনে তুলে ধরল। এত অবাক হওয়ার পরেও প্রচন্ড ক্ষুধা থাকায় মৌ আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পেল না। চুপচাপ লোকমাটা মুখে পুরে নিল। কয়েক লোকমা পেটে যেতেই উজান বেশ উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“টেস্ট কেমন হয়েছে পিচ্চি?
মৌ একদম আনন্দিত হয়ে বলে উঠল‚ “অনেকককক মজা হয়েছে কিন্তু এটা কে রান্না করল? মেহু তো সন্ধ্যায় বলেছিল আজ রুই মাছ রান্না হয়েছে!
“সত্যি খুব ভালো হয়েছে? —উজান এক ভ্রু উঁচাল।
”হুম‚ সত্যি অনেক অনেক টেস্ট হয়েছে। কিন্তু কে রান্না করেছে বলবেন তো?
উজান ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে আনন্দে আওড়াল‚ “প্রফেসর উজান চৌধুরী আজ তার প্রিয় ওয়াইফির জন্য লাইফে ফার্স্ট টাইম নিজ হাতে রান্না করে নিয়ে এলো। স্পেশালি আপনার জন্য‚ ম্যাডাম!
মৌ তো কথাটা শুনে একবারে আকাশ থেকে পড়ল। বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই হাই-প্রোফাইল প্রফেসর তার জন্য রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করেছে। উজান কৌতুহলি হয়ে সে নিজেই প্লেট থেকে এক লোকমা মুখে দিল। মৌ যতটা বাড়িয়ে বলল‚ রান্না ততটাও সুস্বাদু হয়নি তবে একদম ফেলে দেওয়ার মতোও নয়। কোনো মতে চালিয়ে নেওয়ার মতো। সে খানিকটা অভিমানের সুরে বলল‚
“পিচ্চি মিথ্যে বললে কেন? অতটাও তো টেস্ট হয়নি।
ততক্ষণে মৌ’য়ের নজর গেল উজানে’র হাতের তালুর উপরের একপাশে। যেখানে আগুনের তাপে হালকা ছ্যাঁকা লেগে লাল হয়ে আছে। মৌ পরম ভালোবাসায় উজানে’র সেই লালচে স্থানে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা মিষ্টি চুমু খেল। পরম মমতায় মৃদু স্বরে বলল‚
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫০
“টেস্ট হয়েছে…সত্যি অনেক অনেক টেস্ট হয়েছে। কোথাও কি কখনো শুনেছেন‚ বউ অভিমান করে না খেয়ে থাকায় কোনো স্বামী মাঝরাতে নিজের হাত পুড়িয়ে বউয়ের জন্য রান্না করে নিয়ে আসে? কিন্তু আমার প্রফেসর সাহেব তো করেছে। তাই সে আমার কাছে অলওয়েজ বেস্ট! এবার আর কথা না বাড়িয়ে দয়া করে জলদি খাইয়ে দিন তো‚ প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে আপনার বউয়ের!
উজানের বুকটা এক পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল। সে পরম যত্নে এক এক লোকমা করে নিজের হাতে বউকে খাইয়ে দিতে লাগল। আর মৌ-ও কোনো আপত্তি না করে নিজে যেমন খেতে লাগল।
