Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৩

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৩
সুহাসিনি ফাতেহা

“মরার খুব পাখা গজাইছে না ? আমার পারমিশন ছাড়া ঘুরাঘুরির নাম মুখে নেওয়ার সাহস কি করে হয় তোমার?”
হুংকার শুনে তিতলি ভয়ে বুকে কয়েকবার ফু দিলো। যুবকের এমন রাগের কারণ সপ্তদশীর অবুঝ মন তখনো বুঝে উঠতে পারে না। সে তো শুধু ঘুরতে যাবে বলছে, কিন্তু এখনো তো যায় নি। তাহলে ওনি এমন করছেন কেন? এত পাষাণ্ড লোক একটু ঘুরতে যাবে বলছে। তাও নিয়ে যাবে বলেনা তাকে। এখন সে বলায়ও রাগ দেখাচ্ছে তাকে। আর সে দিন-রাত এক করে কতকিছু ভাবে। কোনদিন হানিমুনে যাবে আল্লাহ! সুন্দর সুন্দর পিক তুলে ফেসবুকে আপলোড দিবে। তার স্বপ্ন বোধহয় আর পূরণ হবে না।
অস্পষ্ট সুরে দু তিনবার আহারে! আহারে বিড়বিড় করল তিতলি।

বিড়বিড় করে বোকা মানবী হতবুদ্ধির ন্যায় ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। আবার চোখ নামিয়ে নেয়। ফারাজ রাগে ফেটে পড়ছে যেন। সদ্য ঘুম থেকে উঠায় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। ঘুমঘুম চোখদুটো আগুন হয়ে আছে। বারবার অগ্নিদৃষ্টিতে তিতলির কাঁধে রাখা সিয়ামের হাতের দিকে তাকাচ্ছে। এত রাগ লাগছে তার। মন চাচ্ছে এক্ষনি ফোনের ভেতর দিয়ে অবাধ্য বউকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে।
তিতলি এবার মোবাইল স্টাডি টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে একটু দূরে বসল। সিয়ামকে এবার তারপাশে স্পষ্ট ভাবে দেখা গেল। তবে এবার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে ফেলছে সিয়াম।
তিতলি মুখাবয়বে হতভম্বতার রেশ ধরে আচানক
ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আমার কেন মরার পাখা গজাবে? পাখা গজাই পাখিদের, আমি তো জলজ্যান্ত মানুষ।”
ফারাজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। কারণ তিতলির কাঁধে ঠিকমতো ওড়না নেই। সেখানে কাঁধের কিছু অংশ স্পষ্ট সে দেখতে পাচ্ছে সে ভিডিও কলে। আর সিয়াম সেখানে এতক্ষণ হাত দিয়ে রেখেছিল। সবটুকু তেজ কণ্ঠে ঢেলে বলল,
“চুপ বেয়াদব! আজকে তোমার ঘুরতে যাওয়ার স্বাদ মিটাবো আমি, আমাকে আসতে দাও শুধু।”
তিতলির দিনদুনিয়ার খবর সেই। সে শুধু ঘুরতে নিয়ে যাবে নাকি যাবে না সেই কথা নিয়েই জেদ ধরে বসে আছে। এবারও আগের ন্যায় প্রশ্ন করল,
“ঘুরতে নিয়ে যাবেন নাকি যাবেন না সেটা বলেন!
“নাথিং!”
তিতলি মুখ ভেংচি কাটে। সোজা নিয়ে যাবে না সেটা বললেই পারে। সেও বলল,
“অয়ন ভাইয়াকে ফোন করে বলেন আমাদের ঘুরতে নিয়ে যেতে।”
“তুই বলো গিয়ে!”
ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলল। মাথায় আগুন জ্বলছে তার। চোয়াল ফুটেছে শক্তভাবে। এমনিতে তো রেগে আছে এখন অবাধ্য বউয়ের কথা শুনে গায়ে কাটা ফুটাচ্ছে তার। মুখ দিয়ে যাচ্ছে তাই বেরিয়ে আসছে। এইমুহূর্তে কল না কাটলে সে কিছু একটা বলে বসতেও দ্বিধা করবে না। রাগে হিতাহিত দিশেহারা হয়ে বলে বসল,

“কল কেটে যেখানে ইচ্ছে যাও তো!”
তিতলির পেল্লব মুখখানা অন্ধকার হয়ে গেলো এবার। কত আশা নিয়ে সে কল দিলো। আসলেই লোকটা ভাল্লুক কোথাকার! মুখে কোনো রসকষ নেই। তার মুখেও কোনো রসকষ থাকবে না এখন থেকে।
সে ত্যাড়া জবাব দিলো,
“আপনার ও তো হাত আছে আপনি কাটেন।”
“আমার হাত দিয়ে তোমাকে পানিশমেন্ট করবো জাস্ট ওয়েট!” আরো কয়েকটা ধমক দিয়ে কল কেটে দিলো ফারাজ।
তিতলি নিজের মুখ চেপে ধরে হাত দিয়ে। এই মুখ একহাত আগে চলে তার। তার কথা শুনে রেগে গিয়েছে নিশ্চয়ই! এটা না বললে কি চলত না? বিরক্ত হয়ে ওভাবে কেন বলতে গেলো? এখন তো রেগে ঘুরতে নিতেও আসবে না। মুখশ্রী অন্ধকার করে বসে রইলো সে।
কল কেটে দেওয়ায় অধৈর্য চোখে তাকিয়ে থাকা নিধি জিজ্ঞেস করল,
“কী রে কি বললো?”
তিতলির কানে ব্লুটুথ ছিলো তাই ফারাজের কথা ওরা শুনতে পায়নি। কিন্তু তিতলির গুলো ঠিকই শুনতে পেয়েছে। ওরা এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন ফারাজ রোমান্টিক কথা বলছে আর তিতলি ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছে। ওরা কি জানেনা ওটা যেকেউ নয়, ভাল্লুক কোথাকার! যার মুখে কোনো রসকষ নেই।
তিতলি কিছু বলছে না দেখে সিয়াম এবার বললো,

“দুলাভাই কি আসছে নাকি?”
তিতলি তেজ দেখিয়ে বলল,
“জানি না।”
সিয়াম মুখ ভেঙ্গিয়ে বলল,
“জানিস না কেন? তুই বলেছিস আমাদের দুলাভাইয়ের হাতে ট্রিট দিবি আজ।”
“দুলাভাই না ছাতা!”
নিধি এবার শান্ত কন্ঠে বলল,
“আচ্ছা কি বলছে সেটা বল? ঘুরতে নিয়ে যাবে তো?”
“বলছে ভালোবাসা দিবে!”
নিধি বুঝে গেলো তাদের ফারাজ স্যার রাগ ঝেড়েছে তার বেস্টুর উপর। তিতলি ত্যাড়া কথা বলছে মানে সে থোড়াই সব বুঝে গেছে। আফসোস করে বলল,
“পটানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে তো! কিছুক্ষণ পর আবার কল দে বেইবি দেখবি রাজি হবে। এমন গম্ভীর দুলাভাইকে পটাতে তোর কোমরে ওড়না বেঁধে নামতে হবে, বুঝলি?”
তিতলি নাক ফুলিয়ে বলল,

“না। ওনি কোমরে লুঙ্গি পেঁচিয়ে আমাকে পটাতে আসবে। তখন আমি পটবো না।”
“আরে বলদি তোর মাথা গেছে। স্যার কোনোদিন লুঙ্গি পরবে নাকি? শোন এখন তোকে কি বলছে সব আমাদের বল কিছু আইডিয়া দি।”
“এত সেজেগুজে বসে আছিস কেন তিতলি?”
আলেয়া শেখ ট্রেতে নাস্তা পানি নিয়ে তিতলির রুমে ঢুকতে ঢুকতে কথাটা বললেন। কিছুক্ষণ আগেও মেয়েকে গেঞ্জি পরা দেখেছেন। এখন গোল গ্রাউন পরে সাজুগোজু অবস্থায় দেখে তিনি কথাটি বললেন। স্টাডি টেবিলে নাস্তার ট্রে টা রাখলেন। নিধিরা নাস্তা না করেই তিতলির রুমে চলে এসেছে তিতলির পেছন পেছন তাই তিনি না পেরে নাস্তা নিয়ে উপরে এসেছেন। তিতলি সরাসরি মাকে বলল,
“ঘুরতে যেতে সাজুগোজু করছি কেন?”
আলেয়া শেখের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেলো। তিনি মেয়েকে বললেন,
“ফারাজকে না বলে কিসের ঘুরাঘুরি?”

“আমি বলছি আম্মু কিন্তু তোমাদের জামাই নিয়ে যাবে না বলছে তাই,নিজেই যাচ্ছি ওদের সাথে।”
“জামাই যেটা বলছে সেটা শোন তিতলি।”
“শুনবো না। তোমরা তোমাদের জামাইর কথা শুনো আমার কি?”
আলেয়া শেখ কপালে হাত দিলেন। মেয়েটা কোনদিন মানুষ হবে? জামাইর সাথেও কি এভাবে মুখেমুখে তর্ক করে? কে জানি জামাই কি মনে করেন? মেয়েকে বললেন,
“জেদ করিস না তিতলি। জামাই তোকে আজকে নিতে আসার কথা ছিলো। তোর দাদু কোনোমতে তোকে যেতে দিবে না বলছে। এটা নিয়ে জামাই রেগে আর এখন যদি শুনে তুই না বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিস তাহলে….”
তিতলি পথিমধ্যে কথা কেড়ে নিয়ে বলল,

“আমাকে তো এখন মেয়ে মনে হয় না। জামাই তোমাদের সব। তোমাদের জামাইকে ভয় পায় না আমি।” বলে মুখ বাঁকালো তিতলি।
আলেয়া শেখ আর কথা বাড়ালেন না। মেয়ের মন এইতো ভালো থাকে আবার কিছুক্ষণ পর বদলে যেতেও সময় লাগে না। তিনি নিধি সিয়ামকে বললেন,
“তোমরা তো নাস্তাও করলে না। নাস্তা করে নাও তো দেখি। অনেকদিন পর এসেছো।”
সিয়াম হেসে ভদ্রতায় বলল,
“কি যে বলেন না আন্টি। সেদিন ও তো তুষার ভাইয়ের সাথে আসলামে। ভুলে গেলেন?”
“আসছো তো মাঝেমধ্যে চলে আসবা।”
“জ্বি আন্টি।”

আলেয়া শেখ চলে গেলেন। সিয়ামের মায়ের সাথে আলেয়া শেখের ছোটবেলার বন্ধুসূলভ সম্পর্ক আছে। তাই মাঝেমধ্যে যাতায়াত হয়। সেই হিসাবে তিতলিরও বন্ধু। ছোট থেকেই তিতলি নিধি সিয়াম ওরা একই স্কুলে পড়ালেখা করে কলেজে উঠেছে।
নাস্তা পানি করে নিধি, সিয়াম তিতলিকে বলল,
ঘুরতে যাওয়া হবে না মনে হয় দোস্ত। থাক অন্যদিন যাবো। দুলাভাইয়াকে পটিয়ে নে আগে।
তিতলির মনটা খারাপ। তার মনের আশার ভেতরে ভাল্লুক একবালতি পানি ঢেলে দিয়েছে। উঁচু হিলও পরেছিল ঘুরতে যাবে বলে। ওরা তিনজন রুম থেকে বের হয়ে গেলো। সিঁড়িতে দু পা দিতেই পায়ে অসাবধানতায় স্রেফ পায়ে উঁচু হিল থাকায় তিতলির পা টা মুছকে গেলো। নাক মুখ কুঁচকে সিঁড়িতে বসে গেলো। অস্পষ্ট সুরে ব্যাথাতুর আর্তনাদ করলো,
উফফ পা টা ভেঙে গেলো আম্মু, আব্বু, টুনাটুনিদের বাপ..ব্যাথার মধ্যেও মুখ ফস্কে বের হয়ে গেলো কথাটা। তিতলির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে ব্যাথায়। নিধি সিয়াম ওরা তিতলিকে ধরলো। নিচ থেকে আলেয়া শেখও ফরিদা বানু এগিয়ে আসলেন। বাড়িতে আর কেউ নেই বিকেল টাইমে। তৌসিফ শেখ বাজারে গেছেন আর তুষার তো প্রেমে হাবুডুবু খেতে গেছে।
ফরিদা বানু এসেই নাতিনকে বললেন,

“দেইখছো নাতিনের কাম কান? এত লম্বা জুতা কেউ পরে? হুদা কি আর পইড়া গেছে? নাতাজামাই শুইনলে কি অইবো এহন?”
নিধি ফরিদা বানুকে বলল,
“হঠাৎ হাঁটার মধ্যে পড়ে গেছে দাদু।”
তিতলি তখনো পা ধরে সিঁড়িতে বসে আছে। চোখ বন্ধ করে রেখেছে চোখে ফারাজ ভাসছে। আলেয়া শেখ সহ নিধি তিতলি ধরে দাঁড় করালো।
তিতলি আবার পড়ে যেতে নিলো। আলেয়া শেখ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। মেয়ের বাবাকে কল দিতে হবে। তিতলির একহাত নিজের কাঁধে নিয়ে বললেন,
“কতবার বলি এসব হিল জুতো পরিস না। এর আগেও তিনবার হিল জুতো পরে পা ভেঙেছিস তাও শিক্ষা হয় না।”

তিতলিকে আবার ধরে রুমে নিয়ে আসলো সবাই। নিধি সিয়াম ওরা অনেকক্ষণ থেকে চলে গেলো। বেস্টুর জন্য খারাপ লাগছে তাদের। পায়ে সত্যি অনেক ব্যাথা পেয়েছে তিতলি। পায়ের গোড়ালি ফুলে লাল হয়ে উঠেছে। আলেয়া শেখ পায়ের কাছে বসে সেখানে আলতো হাতে দিয়ে মলম লাগিয়ে ডলে দিচ্ছেন। যাতে একটুখানি ব্যাথা বা চাপ না লাগে। আর মেয়েকে বুঝাচ্ছেন,
“জামাই শুনলে কি হবে এখন? ফোন করে জানায়?”
তিতলি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পায়ের গোড়ালি উঁচু করে রেখেছে। নরম বালিয়ে মুখ গুঁজে রেখেই আস্তে করে বলল,
“না আম্মু!”

আলেয়া শেখ স্বামীর ফোনে কলে দিলেন। দুবার রিং পড়েই রিসিভ হলো।
আলেয়া শেখ সাথে সাথেই বললেন,
“ডাক্তার নিয়ে আসেন আসার সময়।”
তৌসিফ শেখ বাড়ির দিকেই আসছিলেন। হঠাৎ স্ত্রীর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলেন। ডাক্তার কার জন্য নিয়ে আসবেন কারো কিছু হলো না তো? তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
“কি হয়ছে? সবাই ভালো আছে তো?”
আলেয়া শেখ: “আপনার মেয়ে পা মুছকে বসে আছে। উঁচু হিল পরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে। ডাক্তার এনে দেখালে ভালো হয়।”
তৌসিফ শেখ ভয় পেয়ে গেলেন। মেয়ের পা মুছকে গেছে শুনে। দ্রুত ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্য আবার বাজারের দিকে গেলেন।

ফারাজ শার্ট প্যান্ট পরে রেডি হয়ে নিচে নামলো। আজকে এক্ষুনি এইমুহূর্তে বউকে নিয়ে আসবে আর এটাই ফাইনাল। কারো কোনো কথা শুনবে না। ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে। আফজাল খান,ফারিন বেগম,সহ ফারাজের খালা।
আফজাল খান ছেলেকে বললেন,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
ফারাজ কিছু বলে না। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না তার। রাগ চেপে রেখেছে সব গিয়ে বউয়ের উপর ঝাড়বে বলে। সে চাচ্ছে না তার রাগের বহিঃপ্রকাশ বাবার উপর পড়ুক। তাই নিজ দায়িত্বে বেরিয়ে যাচ্ছে। আফজাল খান পেছন থেকে ভাবুক হয়ে বললেন,

“বৌমা কাল আসবে। আজকে রাত গিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে সকালে আসার সময় নিয়ে আসিস।”
বলে আফজাল উঠে রুমের দিকে গেলেন।
আফজাল চলে যেতেই নাছিমা বেগম ফারিন বেগমের কানে কানে বললেন,
“দেখছিস আপা ফারাজ কেমন যেন পর হয়ে যাচ্ছে দুলাভাইয়ের কথা না শুনে চলে গেলো। বিয়ের কয়দিন হয়ছে এখনই বউয়ের আঁচলে ঘুরতে শুরু করেছে মেয়েটা সুবিধার না। একটু টাইট দিয়ে রাখিস না হলে পরে মাথায় উঠে বসবে।”
ফারিন বেগম বোনের কথা শুনে বললেন,
“এসব কি বলিস নাছিমা? আমার বৌমা আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো। তুই নিশ্চয় কয়দিনে টের পেয়েছিস?”
নাছিমা বেগম মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
“সংসারের কাজ করতে পারে ওই মেয়ে? একটা সংসারিক মেয়ে দেখে ফারাজকে বিয়ে দিতি। কতবার বলছি নীলার সাথে বিয়ে দি…”

ফারিন বেগম কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,
“সংসারের কাজ করার জন্য এখনো আমি আছি। আমার বৌমাকে আমি শিখাবো। আর ফারাজ তো নীলাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলো না।”
“তুই বুঝিয়ে বললে ঠিকই রাজি হতো। তাহলে এখন এই মেয়েকে বিয়ে করলো কেন? আমাদের নীলার কি কম ছিলো?”
ফারিন বেগম সোফা থেকে উঠে চলে যেতে যেতে বললেন,
“বোন যা হওয়ার হয়ে গেছে। বাদ দে। আল্লাহ যার সাথে যার হাত রাখছে তার সাথেই বিয়ে হয়ছে আমার কিছু করার নেই।”
নাছিমা বেগম আর কিছু বললেন না। আজকে যদি মেয়েকে ফারাজের সাথে বিয়ে দিতে পারতেন মনের আশাটা পূরণ হতো। ছোট থেকেই মাঝেমাঝে বোনকে বলতো আমার মেয়ে হলে তোর ছেলের সাথে বিয়ে দিবো। কিন্তু কিছুই হলো না। এ নিয়ে তিতলির উপর ক্ষোভ জমেছে ওনার।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়।
ডাক্তার মোশারেফ করিম এসেছেন। তিতলির পায়ের চেক-আপ করে গিয়েছেন৷ সিরিয়াস কিছু নয়। রেস্ট নিলে সেড়ে যাবে ৷ ডাক্তার যেতে না যেতেই তিতলি খুঁড়ে খুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে রুম থেকে। ড্রয়িংরুমে ফরিদা বানু সহ তৌসিফ শেখ তুষার সবাই বসে আছে। তিতলি এসে বাবার পাশে বসলো। তৌসিফ শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“পায়ে এখনো ব্যাথা করছে আম্মু?”
তিতলি পায়ে এখনো ব্যাথা পাচ্ছে। অনেক কষ্টে নিচে নেমেছে। রুমের ভেতরে ভালো লাগছিল না তাই এসেছে। বাবাকে বললো,
“ব্যাথা করছে না আব্বু।”
“আব্বুকে মিথ্যা বলো না। তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। ডাক্তার বলছে শুয়ে রেস্ট নিতে নিচে নামলে কেন? কিছু লাগলে আব্বুকে ডাক দিতে।”
“রুমে ভালো লাগছিলো না আব্বু।”
ফরিদা বানু পাশেই বসে ছিলেন। নাতিনকে ধমক দিয়ে বললেন,
“ভালা লাইগবো কেম্নে? কয়দিন হরে বাচ্চা কাচ্চা অইবো এহনো আক্কল জ্ঞান অ নো?”

তিতলি লজ্জা পায় দাদুর কথা শুনে। কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসে থাকে। বাড়ির বাইরে থেকে বাইকের আওয়াজ আসছে। মনে হয় তুষার এসেছে। সদর দরজা খোলা। তৌসিফ শেখ উঠে দরজার দিকে গেলেন। তিতলি দরজার দিকে তাকানো ছিলো। বাবা আর চেনা কন্ঠসুর শুনে সে তক্ষুনি খুঁড়ে খুঁড়ে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। অনেক কষ্টে কয়েক সিঁড়ি উঠে। তাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে পারে নি এখন কেন এসেছে?
ততক্ষণে তৌসিফ শেখ জামাইকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসেছেন। ফরিদা বানু খুশি হলেন নাতাজামাই কে দেখে। নাতিনের পা মুছকে গেছে সেটা কি শুনতে পেয়েছে? তিনি ভাবলেন শুনেছে। তাই বললেন,
“নাতিনের পা ভাঙার কথা শুইন্না বুঝি কাম কাজ ফেলে চলে এসেছো নাতাজামাই।”
ফারাজের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেছে এমন কথা শুনে। পা ভাঙলো কখন? সে কিছু জানে না? বিচলিত দেখালে রাগের নিচে তা পিষে ফেলেছে সে। ফরিদা বানু আবার বললেন,

“কি অইলো নাতজামাই? মনে অইতেছে এহনো…”
তৌসিফ শেখ মাকে থামিয়ে দিয়ে জামাইকে বললেন,
“তিতলি সিঁড়ি দিয়ে নামতে পা মুছকে গেছে জামাই। ভাঙে নাই মুছকে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে, সেটাই বলতেছে।”
ফারাজের অভিব্যক্তি কঠিন। রক্ষণশীল গলায় ভদ্রতায় বললো,
“কখন হয়েছে এসব?”
“দু ঘন্টা হবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। ডাক্তার দেখে গেছে দ্রুত সেরে উঠবে। তুমি গিয়ে দেখে আসো।”
আলেয়া শেখ জামাই এসেছেন শুনে নাস্তা পানি বানাতে শুরু করেছেন। কিচেন থেকে আসতেই ফারাজ সালাম দিলো শাশুড়িকে। রাগ তার বউয়ের উপর শ্বশুর শাশুড়ি কাউকে অসম্মান করা তার সাথে যায় না। ফারাজ সবার সাথে কথা বলে উপরে গেলো। আজকে বউকে সে দেখে নিবে। পা মুছকে গেছে এবার সে হাত মুছকে দিবে না? বাঁচাবে কেন সেও দেখবে।
তিতলি বিছানায় শুয়ে আছে। ভাবখানা এমন যেন তার পা ভেঙে গুরগুরি হয়ে গেছে। চোখজোড়া বন্ধ করে রেখেছে সে ইচ্ছে করেই। সে শব্দ শুনতে পেয়েছে। কেউ তার রুমের দরজা খুলছে! তাও চুপচাপ শুয়ে আছে অন্যদিকে ফিরে। মনে মনে বলছে,

“আমি ঘুম থেকে উঠবো না।”
ফারাজ রুমে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিলো। তিতলি অন্যদিক মুখ করে শুয়ে। সে লম্বা কদমে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো। তিতলির পায়ের দিকে তাকালো। ফর্সা পায়ের গোড়ালি লাল হয়ে আছে। রাগী চেহারার পরিবর্তন দেখালো। তবে পুরোপুরি না। যেভাবে রেগে আছে এই রাগ সহজে যাওয়ার নয়। তিতলিকে গম্ভীর হয়ে ডাকলো,
“এই!”
কোনো সারশব্দ নেই। কিন্তু ফারাজ ঠিক বুঝতে পারছে তিতলি জেগে। এবার রেগে আবারও ডাকলো,
” এই বেয়াদব চোখ খোল!”
তিতলি তাও নড়ছে না। কিছু বলছে না। এবার তার রাগ বাড়লো। সোজা গিয়ে তিতলির পায়ের কাছে বসে পা ধরে হাতের মুঠোয় নিয়ে চিপায় দিলো। তিতলি ব্যাথায় নড়েচড়ে উঠল এবার। ফারাজ আরেকটু চাপ দিতেই তিতলি কেঁদে উঠল।
“মরে যাবো। ব্যাথা পাই।”

কথা বলছো না কেন? আমি ডাকছি সেটা শুনেও চোখ বন্ধ করে রেখেছো কোন সাহসে? বলে ফারাজ আরেকটু চাপ দিতেই তিতলি নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ধৈর্য ধরুন আমি মরে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ফারাজ রেগে যাচ্ছে হুটহাট। এইতো এখনো রেগে গেলো। রাগ কমাতে চাই তখনই এই অবাধ্য বউ তাকে রাগিয়ে দেয়। দাঁত চেপে বলল,
“আমার কথার অবাধ্য হওয়ার ফল। কাজটা আমিই করতাম কিন্তু…”
“তো এখনো কাজটা করছেন না কেন? এবার আপনি আমার পা ভেঙে দিন।”
“চুপ একদম!”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩২

“ওকে আমি চুপ! আপনি নিজেই কথা বলছেন।”
ত্যাড়া কথা শুনে ফারাজ শক্ত মেজাজে বলল,
“আমাকে রাগাচ্ছো কেন?”
ফারাজ তিতলির কাছে এগিয়ে গিয়ে কাঁধের দিকে তাকায়। এবার তার রাগ তরতর করে বাড়তে থাকে। ভিডিও কলের দৃশ্য চোখে ভেসে উঠতেই যুবক আকাশসম রাগ নিয়ে দিশেহারা হয়ে নিজের শক্তপোক্ত হাতের থাবায় তিতলির কাঁধ থেকে গেঞ্জিটা সামান্য নামিয়ে দেয়।

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here