Born to be villains part 31
মিথুবুড়ি
❝ফুলকুলিরে, ফুলকুলিরে,
ফুল বানাইয়া কই গেলি…
গন্ধ পাইয়া টাকার নেশায়,,!
আমায় থুইয়া দৌড় দিলি…..
চোখেতে ধুলা দিয়া…..
বড়লোক করলি বিয়া,,,!
এই জ্বালা তো আমি মিটাবো
DJ গানের bass দিয়া….❞
শীততাপনিয়ন্ত্রিত কাঁচ-ঘেরা কেবিন। বিছানার পাশে রাখা কার্ডিয়াক মনিটরে হৃদস্পন্দনের রেখাগুলো তখন স্বাভাবিক ছন্দে ওঠানামা করছিল। সাদা দেয়াল, ধবধবে সাদা চাদরে মোড়ানো বিছানা আর জীবাণুনাশকের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে থমথমে এক আবহ! চারদিকের এই গুমোট আর থমথমে আবহের মাঝেও ছেলেটার কোনো হেলদোল নেই। সে আপনমনে হিপহপ স্টাইলে নেচেই চলেছে। তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি আর হাত-পা নাড়ানোর ক্ষিপ্রতা দেখলে যে কেউ ভিরমি খাবে। কেউই বিশ্বাস করবে না যে, মাত্র ঘণ্টাখানেক আগেই এই ছেলেটার জ্ঞান ফিরেছে! দীর্ঘ দেড়টা মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে, কোমায় কাটিয়ে আজই সে চোখ মেলে তাকিয়েছে।
ফিনফিনে সাদা শয্যাশায়ী বিছানার ওপর একটি ল্যাপটপ রাখা। ল্যাপটপের নীল পর্দায় বেশ সাড়ম্বরে চলছে এলিজাবেথ আর রিচার্ডের রাজকীয় বিয়ের ভিডিও। আর সেই ভিডিওর তালে তালেই হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা ঝোলানো যুবকটি বেপরোয়াভাবে হিপহপ স্টাইলে নাচছে। মাঝেমধ্যে ব্যান্ডেজে মোড়ানো মাথার দিকে সাবধানতার ভঙ্গিতে বুড়ো আঙুল তুলে দেখিয়ে, কানে ঝুলানো অ্যাপল এয়ারপডস ম্যাক্সে বাজতে থাকা গানের সঙ্গে ঠোঁট বাঁকিয়ে সুর মেলায়,
❝আজ আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়া!❞
“ওটা গালফেন্ড নয়, বউ হবে, ব্রো!”
স্টেইনলেস স্টিলের ভারি দরজাটি ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে লাইনটি শুদ্ধিকরণ করল নিক। সুরাকার; ওরফে ম্যাডবিস্ট তার উন্মাতাল নাম থামিয়ে থমকে দাঁড়াল। তার মাথা এখনও মোটা ব্যান্ডেজে জড়ানো, পরণে হসপিটালের শীর্ণ পোশাক, অথচ ঠোঁটের কোণে চকচকে বিদ্রুপের ঘন ছায়া।
নিক সুরাকারের শান্ত, ক্ষিপ্ত এবং দূরদর্শী চোখ দু’টোর দিকে প্রলুব্ধ স্বরে হাসল, আওড়াল,
“অথবা শালি!” চোখ টিপল সে, একইসাথে টিপুনি কেটে ঠোঁট কামড়ে হাসল।
নিক সুউচ্চ গড়নের আধুনিক এক তরুণ। ছিপছিপে, মেদহীন শরীর আর উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রং। তার নামটার মধ্যেই যেমন একটা মিষ্টি ও আদুরে ভাব আছে, ঠিক তেমনি নিখুঁত তার বাহ্যিক সৌন্দর্য। তবে নিকের এই রূপের আসল জাদু লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। তার সমস্ত শারীরিক সৌন্দর্য ফিকে হয়ে আসে যখন সে হাসে। ছয় ফুট এক ইঞ্চির এই অসম্ভব সুদর্শন পুরুষটির সবচেয়ে মোহনীয় এবং আকর্ষণীয় দিকই হলো তার হাসি। তার হাসির মুগ্ধতা যে কতটা তীব্র, তা প্রমাণিত হয়েছিল প্যারিস ভ্রমণের একটি স্মৃতিতে। একবার লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত মোনালিসা’র পেইন্টিং দেখতে সে গিয়েছিল ল্যুভর মিউজিয়ামে। সেখানে নিকের হাসির দেখা পেয়ে মোনালিসার সেই রহস্যময় হাসির চেয়েও এক স্থানীয় আর্টিস্ট বেশি বিমোহিত হয়েছিলেন নিকের হাসিতে। প্রশংসাস্বরূপ সেই শিল্পী নিকের হাসিকে সরাসরি তুলনা করেছিলেন স্নিগ্ধ চাঁদের সাথে।
তবে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো যেমন অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধারে হারিয়ে যায়, ঠিক তেমনি নিকের মোহনীয় হাসিও সবসময় ঢাকা পড়ে থাকে রহস্যময় অন্ধকারের চাদরে। সে তার জগদ্বিখ্যাত হাসিটিকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে ব্যাটম্যানের ধাঁচে তৈরি, বাদুড়ের কানওয়ালা কালো কাউল মাস্কের অন্তরালে। সাধারণ কোনো মানুষ হিসেবে নয়, নিক নিজেকে সবসময় জাহির করতে ভালোবাসে রাতের আঁধারের অতন্দ্র প্রহরী—ব্যাটম্যান হিসেবে! আর এই সে-ই ব্যক্তি, যে সেদিন মলে ব্যাটম্যানের মতো তাকে রিচার্ডের গার্ডস, অফিসার প্রেমের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল এবং রানওয়ে থেকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করেছিল।
নিকের সূক্ষ্ণ খোঁচায় সুরাকার ঠোঁটের কোণ আলতো নেড়ে প্রতিক্রিয়াহীন রইল, কেবল সর্বনাশা হ্যাজেল রঙা চোখে মোহনীয় জাদুর অরুণিমা ছড়িয়ে মোহাবিষ্টের ন্যায় তাকাল নিকের সৌম্যকান্ত অবয়বে৷ নিক তখনও ঠোঁট কামড়ে হাসছিল। কিন্তু সরকারের চোখে চোখ পড়ামাত্র ভেতর থেকে কেঁপে উঠল সে। তৎক্ষনাৎ তড়িৎ বেগে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঘাড় কাত করে তড়িঘড়ি করে বলল,
“ডোন্ট…..ডোন্ট লুক অ্যাট মি উইথ থোজ আইজ।”
বাঁকা হেসে সুরাকার দৃষ্টি স্বাভাবিক করল। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত ক্রোধ এবার নাগাসাকি বোমার মতো সশব্দে বিস্ফোরিত হলো। মুহূর্তের মধ্যে শিকারির ক্ষিপ্রতায় তীরবেগে ছুটে গিয়ে সে নিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শক্ত মুঠোয় তার কলার চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল ল্যাপটপটার সামনে।
হাঁপাতে হাঁপাতে চাপা গর্জনে বলল, “শি ইজ লিলি, মাই লিলি!”
কথাটা বলতে বলতে সুরাকার মেক্সিকোর একটি হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজের রেকর্ড অন করল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে রাতের আঁধারে ইমান ওয়াসিম এবং মিসেস নীহারিকা এলিজাবেথকে নিয়ে হাসপাতালের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এলিজাবেথের শরীর তখনো মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত, ঠিকমতো পা ফেলে হাঁটতেও পারছিল না ও।
ভিডিওটা এক জায়গায় পজ করে সুরাকার এলিজাবেথের ঘাড়ের ওপর জুম করল। এলোমেলো চুলের নিচে চামড়ায় ফুটে উঠেছে ছোট একটি চিহ্ন, যা সম্ভবত জন্মচিহ্ন হবে! তবে ভিডিওর মান খারাপ হওয়ায় সেটা আঘাতের দাগ নাকি জন্মচিহ্ন, তা পুরোপুরি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।
সুরাকার স্ক্রিনে সেই চিহ্নটার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলল, “লুক, জাস্ট লুক—বার্থমার্ক! আমার লিলির ঠিক এই জায়গাতেই বার্থমার্কটা ছিল।”
সে স্ক্রিনে আরেকটি ফাইল ওপেন করল। সেটি ছিল ওই মেক্সিকোর হাসপাতালেরই একটি ডেথ সার্টিফিকেট। সেখানে মৃত ব্যক্তির নামের জায়গায় লেখা—ইমামা ওয়াসিম। আর বাবার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে—ইমান ওয়াসিম।
নিক বিস্ফোরিত চোখে সুরাকারের দিকে তাকাতেই সুরাকার আবার বলতে শুরু করল, “আই নো, তুইও ঠিক আমার মতোই ভাবছিস যে এখানে আসলে কী ঘটছে! লিলির একটা যমজ বোন ছিল, সে কথা আমি আগে থেকেই জানতাম। লিলি অতীত হাতড়াতে চায়নি, তাই আমরাও বিষয়টায় আর মাথা ঘামাইনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একদিন দুই বোন এক হয়েছিল। কিন্তু একে অপরের সাথে মুখোমুখি কথা বলার সুযোগটুকুও পায়নি। সেদিনের সেই ভয়াবহ মেট্রো দুর্ঘটনায় লিলির যমজ বোনটি মারা যায়। পুলিশ ফাইল আর মেডিকেল রিপোর্ট অন্তত সেটাই প্রমাণ করে। আর দুজনের অবিকল চেহারার কারণেই এই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। মিস্টার ইমান ওয়াসিম এবং তার স্ত্রীর রাত ওভাবে হসপিটালকে পালিয়ে যাওয়া, বাকিটা ক্লিয়ার করে দেয়!”
নিকের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে সংশয়ী গলায় প্রশ্ন করল, “কিন্তু লিলি তোকে ভুলে গেল কীভাবে, সুরাকার? সেদিনের ওই এক্সিডেন্টেই কি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে?”
সুরাকার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, “শুরুতে আমিও ঠিক সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে অনেক ঘেঁটে জানতে পারলাম, ওর আলঝেইমার্স রয়েছে!”
“হঠাৎ আলঝেইমার্স?” নিকের মুখটা হাঁ হয়ে গেল, পুরো বিষয়টা ঠিক তার মাথায় ঢুকল না, “আর দুনিয়ার সবাইকে রেখে ও শুধু তোকেই ভুলে গেল? তোর স্মৃতি এমনকি অস্তিত্ব মাথা থেকে মুছে গেল, অথচ একই চেহার……
“দীর্ঘ দুটো বছর পর ওকে খুঁজে পেয়েছি আমি, নিক। এই দুই বছরে ওর ওপর দিয়ে ঠিক কী ঝড় বয়ে গেছে, তার বিন্দুমাত্র আমি জানি না। তবে এটুকু নিশ্চিত বলতে পারি, এই পরিচয়টা ওর নিজের নয়।”
তার চোখে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে,”ইমামা ওয়াসিম— এই পরিচয় ওর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে ওই স্বার্থপর ওয়াসিম পরিবার। এলিজাবেথ— শুধুমাত্র…. শুধুমাত্র ওর রূপের ওপর মুগ্ধ হয়ে ওকে এই পরিচয়ে যেতে বাধ্য করেছে ওই ব্ল্যাডি মনস্টারটা!”
ধীরে ধীরে একরাশ হতাশা গ্রাস করে তার কণ্ঠ,”সকলে জোর করে ওর ওপর পরিচয় চাপিয়ে দিয়েছে। আর রোগ তো মানুষ জন্ম থেকে নিয়ে আসে না, রোগ হঠাৎ করেই জীবনে হানা দেয়!”
“তাহলে তুই এখন কি করতে চাইছিস, ব্রো?”
কালচে অধরের কোণে ধীরে ধীরে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সেই প্রশস্ত হাসিতে গালজোড়া ঢেউয়ের মতো টলে উঠতেই বাঁ-গালের সৌন্দর্যের অপূর্ব নিদর্শন—ছোট্ট একটি ডিম্পল স্পষ্ট হয়ে উঠল। একই সঙ্গে ডান গালের ওপরের কাটা লালচে দাগটিও রহস্যময় হ্যাজেল চোখের মতোই তীক্ষ্ণ ও ভয়ংকর হয়ে ফুটে উঠল। হিসহিসে স্বরে সে উচ্চারণ করল,
“ধ্বংস!”
ল্যাপটপের পাশে একটি death note বুক রাখা ছিল। যার প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ছিল একটি নাম।
ক্রিস হান্টার—তার দাদু! নামের পাশে টিক চিহ্ন দেওয়া। এই নামের পরবর্তী সিরিয়ালে
সে প্রথমে লিখল—এলিজাবেথ,
তারপর লিখল—রিচার্ড কায়নাত।
নিক আঁতকে উঠল, তার কণ্ঠগহ্বর ছিটকে বেরুলো,”ক্রীশ!”
সুরাকার নোটবুক মিশিয়ে রেখে পৈশাচিক হাসল,”অনেক বছর পর ভেতরের পশুটা জেগে উঠেছে।”
একটু থামল সে। নিকের আতঙ্কিত মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষল,”সে ভালোবাসে, কে কখনো ভুলে না। রোগ? ইট জাস্ট আ ফাকিং এক্সকিউজ। সে পরিচয়কে সে সব ভুলে সাদরে গ্রহণ করেছে, সে-ই পরিচয়ই হবে তার কাল।”
সুরকারের চোখে ভয়ংকর কিছু দেখতে পায় নিক। তা দেখে সে আতঙ্কে মাথা নাড়ে। ম্যাডবিস্ট অকস্মাৎ অনর্থক
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। অস্বাভাবিক হাসিতে মেতে উঠে চিৎকার করতে করতে বলল,
“Everything is fair in love and war,
love is over, now war begin” (সংগৃহিত)
নিক তার এরূপ রুদ্র, উন্মাদনাপূর্ণ আচরণে বিরক্ত হয়ে অত্যন্ত বিতৃষ্ণা সাথে বলল,
“তুই সত্যিই একটা সাইকো!”
তার কথাটা স্রেফ হাওয়ার মতো উড়িয়ে দিয়ে সে নিচ থেকে শপিং ব্যাগগুলো তুলে নিল। তারপর নিকের উপস্থিতিকে তোয়াক্কা না করেই গা থেকে হাসপাতালের পোশাক খুলে ফেলল। শরীরে আর একটা সুতোর অস্তিত্বও রইল না। অপ্রস্তুত ভাবে নিক মুখ বিকৃত করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। অথচ সে নিজে সম্পূর্ণ নির্বিকার।
বহুদিন পর নিজের চিরচেনা অল-ব্ল্যাক স্ট্রিটওয়্যার লুকে ফিরে গেল সে। নগ্ন শরীরে গলিয়ে নিল কালো কার্গো প্যান্ট, কোমরে এঁটে নিল রুপালি বাকলযুক্ত কালো লেদারের বেল্ট। সুগঠিত পেশিবহুল শরীরে কালো ফিটেড ট্যাঙ্ক টপটা একদম আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে রইল। তার ওপর চড়িয়ে নিল স্বভাবসুলভ কালো লাইটওয়েট হুডেড জিপ-আপ জ্যাকেট। জ্যাকেটের হুডটা মাথায় টেনে দিয়ে তার ওপর চাপাল কালো ক্যাপ। সবশেষে, পিয়ার্সিং করা ঠোঁট দুটো আড়াল করতে মুখে পরে নিল কালো মাস্ক। মুহূর্তের মধ্যে সে নিজেকে কুচকুচে কালো রঙের রহস্যে মুড়ে ফেলল। এখন তার অবয়বে দৃশ্যমান বলতে কেবল হ্যাজেল রঙের দুটো চোখ। হুডের নিচ থেকে কয়েক গোছা ঘন, সিল্কি কালো চুল এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেছে চোখের পাতা।
পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে সে যখুনি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, নিক একটা কালো স্পোর্টস সানগ্লাস তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চাপা গলা বলল,
“ওয়্যার ইট অ্যান্ড হাইড ইয়োর ফাকিং কিলিং আইজ!”
সে ঠোঁটে দাঁত কামড়ে ধরল। বাঁকা হেসে ফটাফট সানগ্লাসটি নিয়ে পরে ফেলল। তারপর কেবিন থেকে বেরুতে বেরুতে গমগমে গলায় প্রশ্নেরবান ছুঁড়ে,
“তারা এখন, এই মুহুর্তে কোথায় আছে?”
“ইন্দোনেশিয়া, ডায়মন্ড বিচ।”
“কতদিন স্ট্রে করবে?”
“নো আইডিয়া। আই ডোন্ট নো, হোয়াইস রং উইথ হিম! চোখের পলকে দেশ পরিবর্তন করছে। একের পর এক লোকেশন চেঞ্জ করেই যাচ্ছে!”
ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটল তার অধর নীড়ে,”দেয়ার নেক্সট ডেসটিনেশন?”
“নো ক্লু।”
“আর দে স্লেপ্ট টুগেদার?”
নিক থতমত খেয়ে তাকাল তার দিকে। কোনো জড়তা নেই তার কণ্ঠে। কতটা অবলীলায় এমন দুঃসাহসিক একটা প্রশ্ন করে বসল! নিক শুষ্ক ঢোক গিলল। সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“ইয়েস।”
এমতাবস্থায়ও তার কণ্ঠ ভীষণ বাজখাঁই শোনাল,”ওকে লেটস, গো।”
“কোথায়?”
সে ঘুরে তাকাল নিকের দিকে। মাস্কের অন্তরালে আচ্ছাদিত ঠোঁটের কোণে রহস্যের আভা ছড়িয়ে হিসহিস করে উঠল,
“আমার প্রিয় খেলনা কিনতে। যুদ্ধে নামছি। হাতিয়ার লাগবে না?”
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বাইক শোরুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল কুচকুচে কালো রঙের একটি আলিশান অডি গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো ব্যাটম্যান এবং ম্যাডবিস্ট। নিককে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে সে আসল ব্যাটম্যান নয়। আপাদমস্তক কালোর সাথে চিরায়ত ব্যাটম্যান মাস্কে তাকে দেখে মনেই হয় সে সরাসরি গথাম সিটি থেকেই বুক চিরে উঠে এসেছে। এমন অদ্ভুত জুটিকে একসঙ্গে দেখে চারপাশের উৎসুক জনতার অনেকেই আড়চোখে তাকাতে লাগল, ফিসফিসানি আর কুঁচকানো ভ্রুর ভিড় জমে উঠল নিমেষেই। তবে চারপাশের শত-সহস্র কৌতুহলী দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তারা সরাসরি শোরুমের ভেতরে পা রাখল।
শোরুমে থরে থরে সাজানো প্রায় একশত আধুনিক স্পোর্টস বাইক। কিন্তু কোনোদিকে চোখ না ঘুরিয়ে ম্যাডবিস্টের লক্ষ্য ছিল একেবারে স্থির। সে সোজা গিয়ে থামল একটি দানবীয় Kawasaki Ninja H2R-এর সামনে। বাইকটির আগ্রাসী রূপ আর হিংস্র ডিজাইন পূর্বের ন্যায় আবারও ম্যাডবিস্টকে সম্মোহিত করে ফেলল। শোরুমের ম্যানেজার ততক্ষণে ম্যাডবিস্টের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ম্যাডবিস্ট মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ না করে সরাসরি নিজের কার্ডটি সোজা ম্যানেজারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চড়ে বসল বাইকটির ওপর। তারপর আসক্তিকর মাদকের মতো করে সে ফুসফুস ভরে টেনে নিল নতুন বাইকের মাদকতাময় ঘ্রাণ। চোখ দুটো বুজে পরম তৃপ্তিতে ফিসফিস করে আওড়ালো,
“মাই টয়, মাই বেবি বয়।”
ইন্দোনেশিয়া, ডায়মন্ড বিচ!
মেঘহীন আকাশে তাঁরার মেলা। অথচ রমণীর মনের কোণের কালো মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বিচের এককোণে বিষন্ন মনে বসে ছিল এলিজাবেথ। সময়ের স্রোতে মধ্যবর্তী দিনগুলো হারিয়ে গেলেও, এলিজাবেথের হৃদয়ে মুকুট পরা অভিমানী রাজকন্যাটি এখনও সিংহাসন ছাড়েনি। ভালোবাসার উষ্ণতম পরশও আজ অবধি তার মানভাঙা চোখে বসন্তের আভাস এনে দিতে পারেনি।
রিচার্ডের আচরণে আংশিক পরিবর্তনও এলিজাবেথকে ভেতর থেকে নড়বড়ে করে তুলে। লোকটার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কণ্ঠের অদম্য দাপট, ছোঁয়ায় অনমনীয়তা.. এই সবকিছুই তার মনোজগৎকে ভাঙা কাঁচের মতো ভেঙেচুরে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। তবে আড়ষ্ট মেয়েটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় রিচার্ডের আকষ্মিক বদলে যাওয়া। কখনো-কখনো তার মনে হতো, এ যেন সেই রিচার্ড নয়, যাকে সে এতদিন চিনে এসেছে। এই মানুষটির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি সত্তা, যার অস্তিত্বের কথা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। আর সেই অজানা সত্তার জন্য সে কখনো নিজের হৃদয়ের উর্বর জমিনে একচিলতে জায়গাও বরাদ্দ রাখেনি।
হঠাৎ পেছন থেকে দীর্ঘ এক ছায়া পড়ল তার ওপর। সুদীর্ঘ ছায়ামূর্তিটি চিনতে সময় লাগল না তার। অভিমানের ঢেউ তখনও রমণীর বুকে দামামা বাজিয়ে চলেছে৷ প্রেমের বানভাসি জোয়ারকে জোর করে আটকে রেখে এলিজাবেথ তড়িঘড়ি উঠে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হলে, পেছন থেকে তীব্র অধিকার নিয়ে তার হাত টেনে ধরা হলো।
“এভাবে হুটহাট পেছন থেকে হাত টেনে ধরবেন না। আমি আতঙ্কিত হই।”
এলিজাবেথের ঝাঁঝাল স্বরের পরিবর্তে লোকটার কণ্ঠ ছিল ভীষণ শান্ত, ঠিক যেন পাহাড়ি নদীর বহমান শীতল স্রোত বইছে তার কণ্ঠে, “এই টান আপনাকে বার-বার মনে করিয়ে দেয় না, আপনি আমার? পুরোটাই আমার।”
এলিজাবেথ থমকে কাতর চোখে লোকটার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই তড়িঘড়ি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ওই গভীর চোখের ফাঁদে সে পা দেবে না। অথচ সমুদ্র-নীল চোখ দু’টি তখনও অনিমেষ দৃষ্টিতে তার দিকেই নিবদ্ধ।
“কি চান আপনি?”
“আপনাকে। শুধু আপনাকেই চাই৷”
বিলম্বহীন জবাবে রিচার্ড শার্টের একটি বোতাম খুলে বুকের একাংশ উন্মুক্ত করে ধরল রমণীর সামনে। এলিজাবেথের বিস্ময়ে প্রসারিত দৃষ্টি গিয়ে থামল রিচার্ডের বুকের বাঁ-পাশে। পেশিবহুল বুকে সদ্য খোদাই করা ট্যাটুতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা— ‘Elizabeth’। বুকের গভীরে, হৃদয়ের ঠিক ওপরে চিরস্থায়ী সিলমোহর এঁকে বসানো হয়েছে তার নাম। দৃশ্যটি দেখে এলিজাবেথের চোখ বাষ্পাকুল হয়ে উঠল।
সেই ভেজা চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রিচার্ড মোহাবিষ্ট কণ্ঠে বলল,
“এর বাইরে আর কোনো চাওয়া নেই আমার।”
এলিজাবেথের ঠোঁট দু’টো শিহরণে কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই তার শিশুসুলভ সমস্ত অভিমান গলে গেল। ছুটে গিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল পুরুষালী বক্ষপটে। নিমেষেই রিচার্ড তাকে শূন্যে তুলে নিল। বাহুবন্ধনে বুকের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। তারকাখচিত আকাশের নিচে আবারও এক হয়ে গেল দুটি হৃদয়।
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
“সমুদ্র দর্শনে।”
“এভাবেই হাঁটিয়েই নিয়ে যাবেন?”
“উঁহু, কাঁধে করে।”
বলেই কোনো পূর্ববাস ছাড়াই অর্তকিতে রিচার্ড এলিজাবেথকে কাঁধে তুলে নিল। ভয় কিংবা ভড়কানোর পরিবর্তে এলিজাবেথ শব্দ করে হেসে উঠল। শিশুসুলভ উল্লাসে কাঁধে ঝুলে থাকা অবস্থাতেই প্রসন্নচিত্তে পা নাচাতে লাগল।
ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ঝুলিয়ে দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল ইবরাত। ডায়মন্ড বিচে এসে ডায়মন্ডের দেখা না মিললেও বানরের দৌড়ানি খেতে হয়েছে তাকে। দৌড়ে পালাতে গিয়ে পায়ে বেশ গুরুতর আঘাতও লেগেছে। তাই আজ সে অস্বাভাবিক শান্ত, ছোটাছুটি বা দুষ্টুমির লেশমাত্রও নেই।
একসময় দৃষ্টি নামাল হাতে ধরা ডায়েরিটার দিকে। কিছুক্ষণ আগেও ওটা ছিল রিচার্ডের কাছে। এলিজাবেথ যখন সমুদ্রতীর ধরে উচ্ছ্বাসে ছুটে বেড়াচ্ছিল, রিচার্ড তখন খানিকটা দূরে বসে তাকে একদৃষ্টে দেখছিল আর ডায়েরির পাতায় কিছু লিখে যাচ্ছিল। পরে হঠাৎ ডাক পড়ায় তাড়াহুড়ো করে ডায়েরিটা সেখানেই রেখে এলিজাবেথের দিকে ছুটে গিয়েছিল সে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ইবরাত ডায়েরিটা তুলে নেয়। পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল কয়েকটি পঙ্ক্তি, এলিজাবেথকে উদ্দেশ্য করে রিচার্ডের লেখা একটি গান,
❝Tu Jo Kahe Apna Jahan
War Doon Ga…
Maine Maula Se Teri,
Meri Duniya Hi Maangi…
Woh Jo Likh De To Usko Hi
Haq Maan Loonga.❞
ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ইবরাত পেছন ফিরে তাকাল। খানিকটা দূরে বসা ছিল ফোনে মগ্ন ন্যাসো। আজ ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল ম্যাচ। চিরাচরিত গম্ভীর মুখে একমনে খেলা দেখছে সে। সে মেসির অন্ধভক্ত। তার পিঠ আর পেটের একাংশজুড়ে খোদাই করা রয়েছে মেসির বিশাল ট্যাটু। ইবরাত দৃষ্টি সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে মলিন এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। ভাবল, এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কি কোনোদিন তার ভাগ্যেও ধরা দেবে? এই মানুষটা কি কখনো তাকে এতটা উন্মত্ত, এতটা নিঃশর্ত ভালোবাসতে পারবে?
ক্রুজ শিপে পা রাখতেই এলিজাবেথ ভ্রু কুঁচকায়,”ক্যাপ্টেন তো নেই, মি.কায়নাত।”
রমণীর কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ। পুরো শিপে কোথাও ক্যাপ্টেনের অস্তিত্ব না পেয়ে মেয়েটা বোধহয় ভেবেই বসেছে, তাদের মাঝরাতের সমুদ্র দর্শন আর হবে না! এলিজাবেথের উদ্বেগের বিপরীতে রিচার্ডকে খুব নির্লিপ্ত দেখাল। সে উত্তর না দিয়ে কন্ট্রোল রুমের দিকে পা বাড়ায়। কপালে ভাঁজ ফেলে তার পিছু পিছু এলিজাবেথও গেল।
কিন্তু যখুনি এলিজাবেথ দেখল রিচার্ড ক্রুজশিপের স্টিয়ারিং হুইলে হাত রাখামাত্রই বিশালাকার জাহাজটি চলতে শুরু করেছে, বিস্ময়ে তার চোয়াল ঝুলে পড়ে। রিচার্ড এলিজাবেথের হতবিহ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল।
ডায়মন্ড বিচের ঠিক পেছনে থাকা ছোট্ট একটি দ্বীপের দিকে এগিয়ে চলেছে তাদের ক্রুজশিপ। দূর থেকে সৈকতের রেখা
আবছা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে এলিজাবেথ ডেকে উঠল,
“হেই, হাসবেন্ড!”
“হ্যালো, ওয়াইফি!” নিদারুণ সম্মোহনী জবাবে রিচার্ড পেছন ফিরে তাকাল। এলিজাবেথ রিচার্ডের চোখের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
“লেটস হ্যাভ অ্যান অ্যাডভেঞ্চার!”
বলেই উত্তাল সমুদ্রের বুকে ঝাঁপ দিল এলিজাবেথ। রিচার্ড চমকে উঠে ডেকের কিনারায় ছুটে গেল। দেখতে পেল এলিজাবেথ পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, বাঁচার জন্য হাত-পা ছুড়ে ছটফট করছে। সঙ্গে সঙ্গে রিচার্ড পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এলিজাবেথকে শক্ত করে বুকে আঁকড়ে ধরে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত গলায় ধমকে উঠল,
“আপনি সাঁতার জানেন না?!”
এলিজাবেথ হেসে মাথা নাড়ল, “না।”
এবার রিচার্ড বেশ কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল, “হোয়াট! এমন ছেলেমানুষির মানে কী, রেড? সাঁতার না জেনে কেউ এভাবে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়?”
চারিদিকে তখন অথৈ নীল জলরাশি, যার মাঝে ভাসছে তারা দুজন। রিচার্ড একহাতে এলিজাবেথের কোমর শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরেছে, আর অন্যহাতে পানি কেটে নিজেদের ভাসিয়ে রেখেছে। এলিজাবেথ পরম আস্থায় দুহাতে রিচার্ডের গলা জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটের কোণে নির্ভয়ে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আপনি আছেন তো। আমি জানতাম, আপনি আমাকে ডুবতে দেবেন না।”
হ্যাঁ, রিচার্ড তাকে ডুবতে দেয়নি। এলিজাবেথকে বুকে আগলে রেখেই সে সমুদ্রের ঢেউ পেরিয়ে ডাঙার দিকে এগিয়ে যায়।
সাতাশ কিলোমিটার সাঁতরে রিচার্ডের শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে। সমুদ্র সৈকতের তপ্ত বালির ওপর সে গা এলিয়ে দেয়। এলিজাবেথ মাথা রেখে শুয়ে ছিল রিচার্ডের চওড়া বুকের ওপর।
আকাশের কোণে ধীরে ধীরে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। হঠাৎ বিকট শব্দে বজ্রপাত হতেই এলিজাবেথ ভয়ে কেঁপে উঠে রিচার্ডের বুকে মুখ লুকাল। মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন কিছুটা মিলিয়ে যেতেই এলিজাবেথ আকাশের দিকে মুখ তুলে ভেংচি কেটে বলে উঠল,
“ওই আকাশ, ওভাবে মিছেমিছি গর্জন করে কোনো লাভ নেই। তোমার জানা থাকা দরকার, ভয়ে মুখ লুকানোর জন্য খুব নিরাপদ একটা বুক এখন আমার আছে!”
এলিজাবেথের কথায় রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির ঝলক ফুটে উঠল। অস্পষ্ট সুরে বলে উঠল,
“মাফিয়াদের বুকে এতো নিশ্চিন্তে মাথা রাখতে নেই। এঁরা বুকে জড়িয়ে, পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়।”
এলিজাবেথ ঘাড় তুলে রিচার্ডের দিকে তাকাল,”কিছু বললেন?”
রিচার্ড মাথা নাড়ে, অথচ তার চোখে ছিল অন্য কিছু। এলিজাবেথ আবারও রিচার্ডের বুকে মাথা রেখে উত্তাল সমুদ্রের দিকে তাকায়। আপনমনে বলতে লাগল,
“এমন, ঠিক এমন একটা নির্জন দ্বীপে সাদা রঙের একটা বাড়ি চাই আমি। নীল সমুদ্রের বুকে সাদা রঙের একটা বাড়ি থাকবে, সবুজ ঘাস থাকবে ছোটো একটা বাগান থাকবে। সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে রাজহাঁস হেঁটে বেড়াবে। আর আমি বাগানে বসে পেইন্টিং করব। সমুদ্র নীলের মতো ওই নীল চোখ দু’টো আঁকবো।।”
কথাগুলো বলার সময় এলিজাবেথের চোখ দুটো ঝলমল করে উঠেছিল। রিচার্ড গভীরভাবে তা লক্ষ্য করল। কিন্তু আকষ্মিকভাবে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে রিচার্ডের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে কুঁচকে এলো। ঠিক যেন এক বিপদ সংকেত তীব্র তড়িৎ প্রবাহের মতো তার মস্তিষ্কে সতর্কবার্তা বয়ে গেল। তার তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় জানান দিয়ে উঠল খুব কাছেই কোথাও কারও মৃদু পদচারণার শব্দ হচ্ছে। কেউ তাদের ওপর নজর রাখছে।
“ওয়েট ফর মি। আসছি।”
এলিজাবেথকে কিছু বলার বা প্রশ্ন করার ন্যূনতম সুযোগ না দিয়েই রিচার্ড যেন চোখের পলকে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
রিচার্ডকে ওভাবে হঠাৎ উঠে চলে যেতে দেখে ঝোপের আড়ালে ওত পেতে থাকা লোকটার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে ভ্রু কুঁচকে বালির দিকে তাকাল। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করছিল। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল রিচার্ডের সেই অতিমানবীয় তীক্ষ্ণতার কথা—রিচার্ড না দেখেও তার চারপাশের যেকোনো মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়! তবে কি রিচার্ড তার অস্তিত্বও ধরে ফেলেছে?
ভাবনাটা মাথায় পুরোপুরি চাড়া দিয়ে ওঠার আগেই পা ছুটতে চাইল,কিন্তু ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিছন থেকে চিতার মতো ক্ষিপ্র গতিতে কেউ একজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সজোর ধাক্কায় লোকটাকে বালির ওপর আছড়ে ফেলা হলো। পরমুহূর্তেই একটা শক্তিশালী হাঁটু সজোরে এসে গেঁড়ে বসল তার বুকের ওপর। চাপের তীব্রতায় লোকটার নিঃশ্বাস পাঁজরের হাড়ের খাঁচায়ই আটকে গেল। ছদ্মবেশী সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিটি আতঙ্কে চোখ মেলে তাকাল। তার চোখের সামনে তখন একজোড়া সমুদ্র-নীল চোখ, যা থেকে আগুন ঝরছে।
রিচার্ড দাঁতে দাঁত পিষে, “কে পাঠিয়েছে?”
প্রশ্নের সাথে লোকটার বুকে হাঁটুর চাপ আরও বাড়িয়ে দিল । আর চাপে নীরবতা ফালি ফালি করে পাঁজরের হাড় ভাঙার মটমট শব্দ শোনা গেল। অজ্ঞাত লোকটা যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠার আগেই রিচার্ড তার কণ্ঠনালিতে কনুই চেপে ধরল, যাতে চিৎকার করতে না পারে। ঠান্ডা গলায় আবার আওড়াল, “বল, কে পাঠিয়েছে?”
বাতাসের অভাবে অজ্ঞাত লোকটার দম ফুরিয়ে আসছিল, চোখ দুটোও উল্টে যাওয়ার উপক্রম। সে গোঙাতে গোঙাতে কোনোমতে অস্ফুটে কেবল দুটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারল,
“ইয়ং… মাস্টার!”
রিচার্ডের ঠোঁটের কোণ থেকে এক টুকরো অস্পষ্ট শব্দ ঝরে পড়ল, “ফাদার!”
লোকটা যন্ত্রণায় আর বাতাসের অভাবে ছটফট করছে। হঠাৎ রিচার্ডের হিংস্র দৃষ্টি ছিটকে গেল তার হাতের দিকে। লোকটার অবশ হয়ে আসা হাতের মুঠোয় একটা ডিভাইস! রিচার্ড কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা শেষ শক্তি দিয়ে ডিভাইসের একটা বাটনে চাপ দিল। রিচার্ড বিদুৎবেগে ডিভাইসটি তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সমুদ্রের অতল জলের দিকে ছুড়ে ফেলল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। লাল বাতি জ্বলে ওঠার সাথে সাথেই সংকেত পৌঁছে গেছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে!
পরিচিত পায়ের শব্দে রিচার্ড চমকে পিছন ফিরে তাকাল। ঝোপের ফাঁক গলে দেখা গেল এলিজাবেথ তাকে খুঁজতে খুঁজতে এই দিকটাতেই এগিয়ে আসছে। সময় খুব অল্প! যা করার দ্রুত করতে হবে। রিচার্ড প্যান্টের পিছনের পকেট থেকে রিভলবার বের করতে গিয়েও থেমে গেল। গুলির শব্দ এলিজাবেথের কানে পৌঁছালে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে।
রিচার্ড দ্রুত ভিন্ন কিছু ভাবতে লাগল। এমন সময় তার নজর গেল পাশের একটা গাছের ওপর। ঝোপের লতা বেয়ে একটা বিষধর গোখরো সাপ নিচে নেমে আসছে। রিচার্ড ভালো করে তাকিয়ে দেখল, ওটা একটা ধারালো কাঁটাযুক্ত হানি লোকাস্ট গাছ।
আকাশে মেঘের বুক চিরে বিজলী চমকে উঠার আলোয় রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে উদ্ভাসিত পৈশাচিক হাসি। গলা টিপে লোকটাকে মেরে ফেলার খুব সহজ একটা পথ খোলা ছিল, কিন্তু সে একটু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার দিকে গেল। কণ্ঠনালীতে ক্রমাগত চাপের কারণে অজ্ঞাত লোকটা তখন প্রায় অচেতন, প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তার নেই।
রিচার্ড অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে খপ করে সাপটির মাথা চেপে ধরল। সাপটি ক্রোধে ফণা তুলে হিসহিস শব্দে তাকে ছোবল মারতে এলে, রিচার্ড আত্মরক্ষার্থে শরীরের উপরের অংশটুকু কিঞ্চিৎ পিছিয়ে নিল। তবে সাপটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে তার কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগল না। এরপর সে হানি লোকাস্ট গাছের একটা সুচালো কাঁটা ছিঁড়ে, কাঁটাটি সাপের বিষগ্রন্থিতে সজোরে গেঁথে দিয়ে বি ষ মাখিয়ে নিল। তারপর সেই বি ষা ক্ত কাঁটাটি অজ্ঞাত লোকটার ঘাড়ে ঢুটিয়ে দিল! মুহূর্তের মধ্যে বি ষ লোকটার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে তার চামড়ার রং নীলচে হয়ে উঠল ,মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে লোকটার শরীরটা দুবার তীব্রভাবে কেঁপে উঠল, তারপর একটা খিঁচুনি দিয়ে চিরতরে নি থ র হয়ে গেল।
লোকটার প্রা ণহী ন দেহের দিকে তাকিয়ে রিচার্ডের ঠোঁটের কোণের পৈশাচিক হাসিটা আরও চওড়া হলো। বড্ড ভয়ংকর আর বীভৎস ছিল সেই হাসি, যা দেখলে যেকোনো সাধারণ মানুষের কলিজা কেঁপে উঠবে।
শরীর থেকে বালি ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। এরপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে আচমকা এলিজাবেথকে কোলে নিয়ে শূন্যে তুলে আনন্দের আতিশয্যে ঘোরাতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে রিচার্ডের চোখ-মুখের অবয়ব সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একটু আগের সেই খুনে, পৈশাচিক রূপটা যেন এক নিমেষেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এখনকার এই হাসিখুশি, প্রেমিক রিচার্ড আর একটু আগের সেই হিংস্র রিচার্ড, দুজন সম্পূর্ণ আলাদা, অবিশ্বাস্য রকমের আলাদা!
“ইয়েস! ইয়েস! লোকেশন ট্র্যাক করতে পেরেছি!”
বিজয়ের উল্লাসে চিৎকার করে উঠল লোকটা। ফাদার তখন গ্লাসে ওয়াইন ঢালছিলেন, ওগ্রুর আকস্মিক চিৎকারে চমকে উঠলেন তিনি। ওগ্রু উন্মাদের মতো লাফাতে লাফাতে ফাদারের দিকে ছুটে গেল। উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে ইংরেজিতে বলল, “ইয়ং মাস্টার, উই ট্র্যাকড হিম!”
ফাদারের চোখ দুটো মুহূর্তেই আশায় জ্বলজ্বল করে উঠল। তিনি ওগ্রুর কাঁধ শক্ত করে ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন, “কী? আমার রিদকে পাওয়া গেছে?”
ওগ্রু মাথা নাড়ল। সে ব্রাজিলিয়ান মনস্টার—নামের মতোই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ‘ওগ্রু একটি পর্তুগিজ শব্দ, যার অর্থ রাক্ষস। প্রকৃতপক্ষে সে জীবন্ত রাক্ষসই বটে। দেখতেও দানবতুল্য। উচ্চতা খুব বেশি না হলেও শরীরটা পাথরের মতো নিরেট । চোখের পাপড়ি আর ঠোঁট ছাড়া পায়ের নখ থেকে শুরু করে আপাদমস্তক ঢাকা ভয়ংকর সব ট্যাটুতে। ভ্রু, কান ও ঠোঁটের পাশাপাশি তার জিভেও করা আছে পিয়ার্সিং। এই দানবাকৃতির মানুষটি ফাদারের ব্যক্তিগত বডিগার্ড!
ফাদার এবার তাকালেন তার রক্ষিতা তাসার দিকে। মেদহীন, আকর্ষণীয় গড়নের তাসা—যার পোশাকের সিংহভাগ জুড়েই উন্মুক্ত থাকে শরীর। সুডৌল বক্ষযুগলের খাঁজ যেন পুরুষকে মাতাল করার জন্যই তৈরি৷ আর তার ঠোঁট? লাভ সেইভের সেই লাস্যময়ী ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিকের আস্তরণ যেন চিরস্থায়ী।
ফাদার তাকাতেই তাসা এগিয়ে এসে সবার সামনেই ফাদারের ঠোঁটে শব্দ করে একটা চুমু খেল। তারপর বুকের ভাঁজের ভেতর থেকে একটি রিভলবার বের করতে করতে আদুরে গলায় বলল, “আহ বেইবি! এত উত্তেজিত হয়ো না, অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমি আছি তো। আমরা যাচ্ছি রিদকে ফিরিয়ে আনতে।”
ফাদারের বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে৷ রগগুলোতে বইছে রক্তের তালমাতাল স্পন্দন। তিনি এক জায়গায় স্থির হতে পারছেন না। অস্থির চিত্তে পায়চারি করতে করতে ওগ্রুর উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছো কেন? এক্ষুণি বেরিয়ে পড়ো! আমি আমার রিদকে চোখের সামনে দেখতে চাই।”
তাসা আর ওগ্রু আর দেরি করল না। তারা একদল সশস্ত্র গার্ড নিয়ে যেই না বের হতে যাবে, এমন সময় ভেতর থেকে হিংস্র হুংকার দিয়ে বেরিয়ে এলো ব্ল্যাকহক। তাদের পায়ের গতি থমকে গেল।
ফাদার বললেন, “ব্ল্যাকহককেও সাথে নিয়ে যাও। ও ওর মালিকের গায়ের গন্ধ চেনে।”
ওগ্রু কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলতে চাইল, “কিন্তু ফাদার, ও সাথে থাকলে তো কখনোই ওর মালিককে আমাদের স্পর্শ পর্যন্ত করতে দেবে ন..”
Born to be villains part 30
ফাদার গর্জে উঠলেন, “খবরদার! মুখে লাগাম টানো। আমার রিদকে স্পর্শ করার যোগ্যতা তোমাদের আজও হয়নি। একটা ফুলের আঁচড়ও যেন না লাগে আমার রিদের গায়ে! আমি শুধু আমার ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় চোখের সামনে দেখতে চাই।”
ফাদারের সিংহগর্জনে কেঁপে উঠল নরখাদক ওগ্রু। সে মাথা নিচু করে নতজানু হয়ে বেরিয়ে গেল। তার সাথে পা মেলাল তাসা, আর তাদের মাথার ওপর দিয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে চলল ব্ল্যাকহক।
