Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৩

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৩

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৩
সানজিদা আক্তার মুন্নী

শিকদার বাড়ির বর্তমান চিত্রটা এখন একেবারেই অন্যরকম, যে কথাটা আগে বলা হয়ে ওঠেনি। গোটা বাড়ি জুড়ে এখন নির্বাচনের তুমুল উত্তেজনার ঢেউ বইছে। সকাল থেকে রাত অবধি বাড়ির বৈঠকখানায় মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। কেউ আসছে পোস্টার নিয়ে, কেউ বা ভোটের হিসেবনিকেশ মেলাতে, আবার কেউ আসছে স্রেফ চা-নাশতা সেরে নিজের সমর্থনের কথা জানিয়ে যেতে। মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে তৌসির। বাড়ির পুরুষেরা এখন এই নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ততায় ডুবে আছে, দিনরাতের হিসেবটাই তাদের গুলিয়ে গেছে। কারো চোখে ঘুম নেই, কারো মুখে দুদণ্ড স্বস্তির হাসি নেই। সবার ভেতরে একটাই চিন্তা, তৌসির কে যেভাবেই হোক জেতাতে হবে।

এর মাঝে একটা বড় পরিবর্তনও এসেছে বাড়িটায়, একদম নিঃশব্দে। নাজেম চাচাও জেনে গিয়েছেন যে পুষ্প আর এই পৃথিবীতে নেই। প্রথম তিন-চার মাস উনার অবস্থা ছিল একেবারেই বিধ্বস্ত, ভেতরে ভেতরে গুঁড়িয়ে পড়েছিলেন মানুষটা। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন জানালার ধারে বসে। তার চোখের নিচে কালি জমেছিল, গাল ভেঙে গিয়েছিল, কণ্ঠস্বরে তার প্রাণটুকুই অবশিষ্ট ছিল না। তবে এখন তিনি অনেকটাই স্বাভাবিক, আবার আগের মতোই হাঁটাচলা করেন, কথা বলেন, খাওয়াদাওয়াও করেন নিয়ম মেনে। কারণটা সহজ নয়, বরং বেশ কৌশলে গড়ে তোলা এক মিথ্যের জাল। পুষ্প যে গাদ্দার ছিল, এই বিশ্বাসটা উনার মনের গভীরে ধীরে ধীরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। বিবিজান অত্যন্ত ছলে বলে কৌশলে উনার চোখে পুষ্পকে পুরোদস্তুর ভিলেন বানিয়ে দিয়েছেন। কখনো কথার মাঝে আকার ইঙ্গিতে, কখনো বা সরাসরি পুষ্পের নামে এমন সব অপবাদ এনেছেন যে নাজেম চাচার মনে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকেনি। তাই শোকের চেয়ে এখন ক্ষোভটাই উনার ভেতরে বেশি কাজ করে। সেই ক্ষোভই উনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, ভালোবাসার মানুষটার শোক ভুলিয়ে দিয়েছে অভিমানের আগুনে।

পুরো বাড়ি এখন তৌসিরের ছেলেমেয়ে আর নির্বাচন এই দুটো বিষয়েই একদম সরগরম। বাড়ির প্রতিটি মানুষ তৌসিরের তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভীষণ খুশি। ছোট ছোট তুলতুলে তিনটি প্রাণ গোটা বাড়িটাকে একটা বেহশতের বাগান বানিয়ে তুলেছে। কে রেখে কে কোলে নেবে, এই নিয়ে রীতিমতো হুড়োহুড়ি লেগে থাকে সারাদিন। সকাল হলেই তৌসির দের ঘরের সামনে লাইন পড়ে যায়। বিবিজান একটাকে কোলে তুলে আদর করতে না করতেই কেউ এসে কেড়ে নেয়। রুদ্র এসে যখন তিনজনকে একসাথে কোলে তুলে নিতে যায়, তখন সিমরানের সঙ্গে তার তুমুল ঝগড়া বেধে যায়।
আবার ইকরা একজনকে কোলে নিলেই ধ্রুব ছুটে এসে কেড়ে নেয়, আর তখন ইকরা চিল্লাতে থাকে ধ্রুবের ওপর, “এই দাও বলছি! আমি কোলে নিয়েছি না? নিজের বাচ্চা হলে তখন আদর করো।” ধ্রুব তখন বাচ্চাটার গালে চুমু খেতে খেতে দাঁত কেলিয়ে হাসে। এভাবেই এক আনন্দঘন উষ্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে শিকদার বাড়ির আনাচেকানাচে। হাসি, খুনসুটি, ঝগড়া আর ভালোবাসার এক নামহীণ মিশেলে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে তাদের স্রোতের মতো।

সময় এখন রাত আটটা। কারেন্ট নেই কয়েক ঘণ্টা ধরে, চারদিকে ভ্যাপসা গরমের গিজগিজানি। জানালা দিয়ে এক ফোঁটা বাতাসও আসছে না, হয়তো প্রকৃতিটা পর্যন্ত নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে। ধ্রুব এতক্ষণ পুকুর ঘাটে আড্ডায় বসে ফোনে গেম খেলছিল মন দিয়ে। ঠান্ডা হাওয়া আর গেমের নেশা মিলে সময়টা মন্দ কাটছিল না তার। কিন্তু কারেন্ট না থাকায় নেটওয়ার্কের অবস্থা নাজুক, ডেটাও শেষের পথে। গেমের বারোটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। বিরক্ত হয়ে ফোন পকেটে গুঁজে ধুপধাপ পা ফেলে ঘরে ফিরে আসে সে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই ইকরাকে হাঁক ছেড়ে ডাকে।
ইকরা বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে ছিল। সারাদিনের ক্লান্তি আর গরমে ওর শরীরটা ভেঙে পড়ছে চোখ বুজে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল, এমন সময় ধ্রুবের চিৎকার শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসে সে। ধ্রুবকে দেখে কপাল কুঁচকে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে, “কী হয়েছে? এই গরমে এমন ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছো কেন?”
ধ্রুব নিজের ফোনটা চোখের সামনে তুলে ধরে একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “হটস্পট দিবি?”
ইকরা বিরক্ত মুখে বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে আসে। বালিশের পাশ থেকে নিজের ফোনটা তুলে স্ক্যানারটা ধ্রুবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “নাও, স্ক্যান করে নাও।”

ধ্রুব ইকরার হাতে নিজের ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে আবদারের গলায় বলে, “তুই পাসওয়ার্ডটা মেরে দে, স্ক্যান হবে না।”
ইকরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আর কথা না বাড়িয়ে ধ্রুবের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করতে থাকে মনোযোগ দিয়ে। আর ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগায় ধ্রুব, যেন এতক্ষণ এই মুহূর্তটার অপেক্ষাতেই ছিল সে। ইকরার একদম কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আলতো করে ওর পরনের জার্সির কাঁধটা একটু নামিয়ে দেয়। তারপর ওর উন্মুক্ত গলায় ধীরে ধীরে গভীর একটা চুমু এঁকে দেয়। এসব এখন ওদের মাঝে বেশ স্বাভাবিক ঘটনা, প্রায় প্রতিদিনের রুটিনের মতোই। তাই ইকরাও খুব একটা বাধা দেয় না সাধারণত। তবে এমনিতেই গরমে দম বেরিয়ে যাচ্ছে, সারা শরীর ঘামে চিটচিটে হয়ে আছে, তার ওপর ধ্রুবর এমন আচমকা রোমান্স! ইকরা বিরক্ত হয়ে ধ্রুবের ফোন ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আলতো ধাক্কা মেরে বলে, “সরো তো! এমনিতেই গরম লাগছে, এর ওপর তোমার এই ঢং!”
ইকরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ায় ধ্রুব দু পা পিছিয়ে গিয়ে বুকে দুই হাত রেখে ফাজলামি করে গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে ,

“ললনা, ও ললনা,
ও ললনা, ও ললনা,
তুমি আমার মনটা বুঝো না।
ও ললনা, তোমার সাথে আমার বনে না।
ও ললনা, নাটক বুঝো, আবেগ বুঝো না।
আমার বুকের পিঞ্জিরাতে,
ছিল তোমার বসবাস,
তুমি মনে জায়গা দিলা না।
তোমার কাছে ছিলাম আমি,
ফ্লেক্সিলোড আর টাইমপাস।
পকেট খালি, পাই না তোর সুবাস।
ও ললনা, তোমার সাথে আমার বনে না।
ও ললনা, দেহ দিলা, মনটা দিলা না।
টেডি বিয়ার আর বার্বি ডল,
আইসক্রিম আর চিকেন বল…

ধ্রুবর মুখে এমন আজগুবি গান শুনে ইকরা দাঁত চেপে রাগী চোখে তাকায়। হাত কোমরে রেখে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “এই! তোমার টাকা কবে খাইছি আমি, যে এসব আজেবাজে গান গাচ্ছো? ফ্লেক্সিলোড দিছো জীবনে একবারও? আইসক্রিম খাওয়াইছো? তাহলে এই গান কোন আক্কেলে গাচ্ছো শুনি?”
ধ্রুব এবার ফোনটা বিছানায় ছুড়ে মারে অবহেলায়। তার মুখ থেকে ফাজলামির ছাপটা ধীরে ধীরে মুছে যায়। ইকরার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে গম্ভীর অথচ আবেদনময় স্বরে বলে, “চল না ইকরা, আমরাও একটা বেবি নিয়ে নিই। তৌসির ভাই বাপ হয়ে গেছে, আমিও হবো। ভাবতে পারিস, কত মিষ্টি হবে আমাদের বাচ্চাটা?”
ইকরা কথাটা শুনে চমকে ওঠে । অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। কিছুটা ইতস্তত করে, গলার স্বরটা একটু নামিয়ে বলে, “আমি পারব না। এখন মা হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমার এখনো কত কিছু করার বাকি, কত কিছু দেখার বাকি।”

ধ্রুব কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ পেছন থেকে ইকরার কোমর পেঁচিয়ে ধরে দুই হাতে। নিজের চিবুকটা আলতো করে রাখে ইকরার কাঁধের ওপর। ওর উষ্ণ স্পর্শে ইকরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নরম গলায় বলে, “আমি আর এক ছয় মাস পর পারব। তখন আর কোনো অজুহাত দেব না, কথা দিচ্ছি।”
কথাটা শুনে ধ্রুবর ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে আনন্দে তার। সে আর দেরি না করে ইকরাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। ইকরাও এবার আর মানা করে না, ধীরে ধীরে গা ছেড়ে দেয় ধ্রুবের আলিঙ্গনে। ধ্রুব তো এতে উন্মাদ হয়ে ওঠে ইকরার ঠোঁটে, গলায়, ঘাড়ে একের পর এক চুমু এঁকে যেতে থাকে পাগলের মতো। মনে হয় কতদিন পর সে তার প্রিয় কিছু একটা ফিরে পেয়েছে, আর হারাতে চায় না কিছুতেই। গরম, অস্বস্তি, বাইরের পৃথিবী সব কিছু ভুলে সে এক অন্য জগতে হারিয়ে যায়। একপর্যায়ে ধ্রুব নিজের সীমা ছাড়িয়ে যায়, আবেগের তোড়ে ইকরার পরনের জার্সিটা খুলে নিতে উদ্যত হয়।
কিন্তু ঠিক তখনই ইকরা ওকে শক্ত হাতে বাধা দেয়। ধ্রুবের বুকে আলতো করে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করে আস্তে গলায় বলে, “আমার পিরিয়ড চলছে, এখন না।”
মুহূর্তেই ধ্রুবর সমস্ত রোমান্টিক মুড হাওয়া হয়ে যায়, তার মনে হয় কেউ ঠান্ডা পানির বালতি ঢেলে দিয়েছে মাথায়। বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে সে বলে, “তোমার এই বাল কবে শেষ হবে? গত পরশুও না করলি, আজও না! এটা তো প্রতিবার চলতেই থাকে।”
ইকরা মুচকি হেসে নিজের পরনের জার্সিটা ঠিক করতে করতে শান্ত গলায় বলে, “আগামীকাল শেষ হবে। তখন যা ইচ্ছে করো, কোনো বাধা দেব না। এখন ছাড়ো তো, প্রচণ্ড গরম লাগছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে একদম।”

রাত এখন ঠিক তিনটে। পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে গভীর নিস্তব্ধতায়। জানালার বাইরে দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠেই থেমে যাচ্ছে। বাতাসে শীতল একটা ছোঁয়া, ঘরের পর্দাগুলো অল্প অল্প কাঁপছে। ঘরের ভেতর জ্বলছে শুধু একটা মৃদু নাইট ল্যাম্প, হলুদাভ আলো ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে, ঘরটাকে একটা অলৌকিক স্বপ্নের মতো করে তুলেছে।
কিন্তু এই স্বপ্নের ঠিক মাঝখানে, তৌসিরের চোখে ঘুম নেই। সে মাটিতে বসে আছে। হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে, পিঠ বাঁকিয়ে, মাথাটা বিছানার নরম চাদরে ঠেকিয়ে। বিছানার কিনারে কান চেপে রেখেছে সে, মনে হচ্ছে ঠিক তিন তিনটে ছোট্ট প্রাণের নিঃশ্বাসের শব্দটুকু শোনার লোভেই বেঁচে আছে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আজ সাত দিন পেরিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে দশ দিন।

দশটা দিন, অথচ তৌসিরের কাছে মনে হচ্ছে দশটা যুগ। প্রতিটি মুহূর্ত এক একটা বছরের ভার নিয়ে কেটেছে। চোখের নিচে কালি জমেছে, গাল ভেঙে গেছে, দাড়ি বেড়ে এলোমেলো হয়ে আছে। শরীরটা ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়েছে, অথচ তার ঘুম আসে না। ঘুম তো দূরের কথা, চোখ বুজলেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
বিছানার অন্য পাশে নাজহা ঘুমিয়ে আছে। ক্লান্তির গভীর ঘুমে তলিয়ে সে। তার এলোমেলো চুলগুলো বালিশের ওপর ছড়িয়ে আছে লালচে কালো রেশমের মতো। নিঃশ্বাসের সাথে সাথে তার বুক ওঠানামা করছে ধীর লয়ে। তার মুখটা শান্ত, ক্লান্ত, কিন্তু কী এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে তাতে, মাতৃত্ব তাকে নতুন করে গড়ে তুলেছে।
ছেলে-মেয়েগুলো একটু আগেই চোখ বুজেছে। তিনটে ছোট্ট ফুলের কুঁড়ি, তুরাব, নাওয়াব, তৌশি। কিন্তু এই তিনটে ছোট্ট প্রাণ নাজহাকে এক রত্তি শান্তি দেয় না। নাচিয়ে মারছে তাকে। একজনের ক্ষুধা মিটতে না মিটতেই আরেকজনের শুরু হয়ে যায়। একজন চোখ বুজল তো অন্যজন ঠোঁট নাড়ছে, কেউ চিৎকার করে কাঁদছে তো কেউ মৃদু গোঙাচ্ছে। বুকের দুধ ছাড়া আপাতত তাদের অন্য কিছু খাওয়ানোর উপায়ও নেই। এত ছোট, এত নরম তাদের শরীর, অন্য কিছু সহ্য করার ক্ষমতাই নেই।

সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয়টা হলো, তৌসির তার নিজের সন্তানদের কোলেও নিতে পারে না।
এই একটা বাক্য তার বুকের ভেতর একটা গভীর ক্ষতের মতো হয়ে গেছে। প্রতিদিন সেই ক্ষতটা নতুন করে রক্ত ঝরায়। নাজহা যখন ওয়াশরুমে যায়, ঠিক তখনই লুকিয়ে-চুপিয়ে একটু কোলে তুলে নেয় সে। চোরের মতো। দরজার দিকে কান পেতে রাখে, কখন ওয়াশরুমের কল বন্ধ হবে, কখন পায়ের শব্দ এগিয়ে আসবে। সেই কয়েক মিনিটের ছোট্ট সময়টুকুই তার কাছে ঠিক বেহেশতের সমান।নিজের সন্তানের কাছে এসে নিজেকে চোর মনে হওয়ার যন্ত্রণা যে কতটা ভারী, সেটা একমাত্র সে-ই জানে। একজন বাবা, যে রক্ত মাংস দিয়ে এই তিনটি প্রাণ গড়ে দিয়েছে, সে তার নিজের সন্তানকে আদর করতে গিয়েও কাঁপে। ভয় পায়,লুকায়। বিবিজান বিষয়টা একদিন ধরে ফেলেছিলেন। উনার চোখ কিছুতেই এড়ায় না। তৌসির এভাবে চোরের মতো নিজের সন্তানকে কোলে নিতে দেখে তিনি ফুঁসে উঠেছিলেন।
তৌসির তখন তার পায়ে পড়েছিল প্রায়। দু’হাত জোড় করে আটকেছিল।
“বিবিজান, আপনি কিছু কইয়েন না। নাজহা এমনিতেই আমারে সইহ্য করতে পারে না। এর মধ্যে এসব নিয়া কাহিনি হইলে, ও জিদের বশে হয়তো বাচ্চাগো বুকের দুধ খাওয়ানিও বন্ধ কইরা দিব। তখন আমার বাচ্চাগো কী হইব, বিবিজান? কী হইব?”
বিবিজান চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। দু’দিন আগের ঘটনাটাই ধরা যাক। তৌশি বারবার তৌসিরের দিকে তাকাচ্ছিল, তার ছোট্ট, নীলচে মায়াভরা চোখজোড়া দিয়ে। ঠিক বোঝাতে চাইছিল হয়তো, “বাবা, আমাকে একটু কোলে নাও না!”

তৌসির বুক বাঁধতে পারেনি। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েছিল। মেয়ের শরীরের দুধ-দুধ গন্ধটা বুক ভরে টেনে নিয়েছিল। মেয়ের নরম গালটা নিজের গালের সাথে চেপে ধরেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই নাজহা ঘরে ঢুকেছিল। শাস্তি হিসেবে নাজহা আধঘণ্টা পর্যন্ত মেয়েকে দুধ খেতে দেয়নি।
পুরো আধঘণ্টা। ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করছিল ছোট্ট প্রাণটা। গলা ফাটিয়ে কাঁদছিল। নাজহা পাথরের মতো মুখ করে বসেছিল। তৌসির পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল তখন। শেষমেশ নাজহার পায়ে পড়েছে। হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাত জোড় করে কথা দিয়েছে, “নাজহা, আর কখনো না। কথা দিতাছি আর কখনো ওগো কোলে নিমু না। তুই খালি আমার মাইয়ারে দুধ দে। দে নাজহা, দে।”
নিজের সন্তানগুলো ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অথচ সে তাদের কোলে নিতে পারে না। একটু আদর করতে পারে না। একটা চুমু পর্যন্ত দিতে পারে না। এই কষ্টে তৌসিরের কলিজাটা ফেটে যায়। ভেতরে অজানা কিছু একটা টুকরো টুকরো হয়ে যায় প্রতিদিন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সে ভেতর থেকে নিঃশব্দে শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে কেউ দেখলে বুঝবেও না, কিন্তু ভেতরে সে এক জীবন্ত লাশ।
এখন তৌসিরের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে তৌশি। নাজহা তৌসিরকে বিছানাতেও ঠিকমতো থাকতে দেয় না। বিছানার এক কোণে, সবার থেকে দূরে, ঠিক কোনো অস্পৃশ্যের মতো তৌসির কাঙালের মতো রাতের পর রাত জেগে বসে থাকে। শুধু এক পলক, এক ঝলক তৃপ্তি নিয়ে তার সন্তানদের দেখার জন্য। চোখ দিয়ে আদর করার জন্য। দূর থেকে ভালোবাসার জন্য।

নাজহার বাহুতে শুয়ে আছে তুরাব, মায়ের ওম পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সে। তার পাশেই নাওয়াব, ছোট্ট হাতে মায়ের ওড়নার আঁচল ধরে আছে। আর তৌসিরের দিকটায় শুয়ে আছে তৌশি।
হঠাৎ তৌশির ঘুম ভেঙে যায়। তার ছোট্ট চোখ দুটো পিটপিট করে খোলে সে। অন্ধকারে বাবাকে দেখতে পায়। তৌসিরের বুকটা ধক করে ওঠে।
কাঁপা হাতে, কোনো অমূল্য রত্ন ছোঁয়ার আগের কাঁপুনি নিয়ে তৌসির মেয়ের ছোট্ট চঞ্চল মুঠোর দিকে নিজের তর্জনীটা এগিয়ে দেয়। তার আঙুলটা থামে মেয়ের হাতের ঠিক উপরে। ছুঁবে কি ছুঁবে না, এই দ্বিধায় কাঁপছে।
মেয়েটা দু’হাতে বাবার একটা আঙুল আঁকড়ে ধরে। এত ছোট, এত নরম দুটো হাত। অথচ এত শক্ত করে ধরেছে, যা দেখে মনে হয় সে হয়তো বলতে চাইছে, “বাবা, ছেড়ো না।”
তারপর ছোট্ট তৌশি ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে তাকায় তৌসিরের দিকে। অন্ধকারেও সেই হাসিটা ঝলমল করে ওঠে। তৌসিরের চোখে পানি চলে আসে। ধীরে ধীরে তৌসিরের আঙুলটাকে নিজের ছোট্ট গোলাপি মুখের দিকে টেনে নেয় তৌশি। মুখে ঢোকাতে চাইছে। তৌসির বুঝতে পারে, তার মেয়ের ক্ষুধা পেয়েছে। আলতো করে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, “আমার মা।”

দুটো শব্দ। কিন্তু সেই দুটো শব্দে কী যে এক সাগর ভালোবাসা মিশে আছে, তা শুধু তৌসিরই জানে। তৌশি এবার কেঁদে ওঠে।
মেয়ের কান্নার আওয়াজে নাজহার ঘুম ভেঙে যায়। নাজহাকে উঠতে দেখে তৌসির বিদ্যুৎগতিতে নিজের আঙুল সরিয়ে নেয় তৌশির থেকে, ঠিক কোনো ভয়ংকর অপরাধ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে মনে হয়। নিজেকে মেয়ের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলে সে। সরে যায় কয়েক ইঞ্চি দূরে। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা দ্রুতগতিতে ধুকপুক করছে।
তুরাবকে একপাশে আলতো করে সরিয়ে নাজহা ধীরে ধীরে উঠে বসে। ঘুম জড়ানো চোখ, এলোমেলো চুল। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তার চোখ পড়ে তৌসিরের ওপর। তৌসির যে এভাবে নির্ঘুম বসে থাকে, এটা আজ নতুন কিছু নয়। প্রতি রাতেই এমন। নাজহা সব দেখে, সব বোঝে। কিন্তু কিছু বলে না। তবে আজ অবশ্য সে শান্ত গলায় বলে, “ওকে আমার দিকে দিন।”

কথাটা শুনে তৌসিরের বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। অন্তত একবারের জন্য হলেও তো মেয়েকে বুকের সাথে জড়াতে পারবে! মেয়েকে নাজহার দিকে দেওয়ার অজুহাতে এক মুহূর্তের জন্য বুকে চেপে ধরতে পারবে! ধীর হাতে তৌশিকে তুলে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় তৌসির। মেয়ের ছোট্ট মাথাটা তার বুকের কাছে আশ্রয় পায়। সেই উষ্ণতা, সেই গন্ধ, তৌসিরের শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে যায়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে নাজহার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। নাজহা হাত বাড়ায়। তৌসির অনিচ্ছায় মেয়েকে নাজহার হাতে তুলে দেয়।
বুকের চেইন খুলে নাজহা মেয়ের মুখে খাবার তুলে দেয়। তৌশি লোভাতুর ভঙ্গিতে মায়ের বুকের সাথে মিশে যায়। তার খাওয়ায় চুকচুক শব্দ ওঠে, আর সারা ঘরে এটাই এখন একমাত্র শব্দ।
তৌসির দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। এতে নাজহা ভ্রু কুঁচকে বলে, “লজ্জা করে না? মেয়েকে খাওয়াচ্ছি, এভাবে তাকিয়ে আছেন যে?”
তৌসির মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “লজ্জা করব ক্যান? ওদের আগে তো আমিই টেস্ট করছি। আমি না করলে কি আর ওরা এই দুনিয়ার আলো দেখে?”
কথাটা বলার সময় তার মুখে দুষ্টুমির হাসি লেগে থাকে কিন্তু চোখে কী এক চাপা ব্যথা তো আছে।
নাজহা রাগে দাঁত চেপে তার দিকে তাকায়, “কী বললেন?”
তৌসিরও বেপরোয়া গলায় বলে, “ক্যান, শুনস নাই কী বললাম? বললাম যে আমি ওদের আগে টেস্ট করেছি। ক্যান, তোর মনে নাই ওগুলো?”

নাজহার গাল গরম হয়ে ওঠে। তবে তা লজ্জায় নয় রাগে। রাগে পাশ থেকে একটা বালিশ টেনে তৌসিরের গায়ে ছুড়ে মারে সে আর হিসহিসিয়ে বলে, “আপনি সরুন আমার কাছ থেকে।”
কিন্তু তৌসির সরে না। বালিশটা তার গায়ে লেগে নিচে পড়ে। কিন্তু তার মুখের হাসি একই থাকে। চোখে সেই একই বেপরোয়া দৃষ্টি।
বেহায়ার মতোই নাজহার পাশে বসে থাকে তৌসির। কিন্তু এই বেহায়াপনা আসলে এক অসহায় বাবার নিরুপায় চেষ্টা। ছোট্ট একটা মুহূর্ত, সন্তানদের কাছাকাছি থাকার, স্ত্রীর কাছাকাছি থাকার। অপলক দৃষ্টিতে মন ভরে দেখতে থাকে তৌসির তার নাজহাকে। তার নাজহা এখন মা হয়ে গেছে। অথচ এতে তার সৌন্দর্য একটুও কমেনি। বরং মা হওয়ার সুবাদে তার গায়ের রঙ নূরের মতো চকচক করছে। ঘরের ম্লান আলোয় তার মুখটা আরও স্নিগ্ধ লাগছে। তার গালে এক ধরনের গোলাপি আভা। চোখের পাতা ভারী, কিন্তু দৃষ্টিতে পুরনো তেজ এখনো জ্বলজ্বল করছে। কপালে চিকন ঘামের ফোঁটা। ঠোঁটে চিরচেনা গোলাপ-পাপড়ির রঙ। এক হাতে সে বুকের দুধ ধরে মেয়ের মুখে দিচ্ছে, অন্য হাতে মেয়ের ছোট্ট মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছে আদর। ঠিক তখনই নাজহা চোখ তুলে তাকায় তৌসিরের দিকে। যে কিনা তার দিকেই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছে। তার চোখে অপার্থিব এক ভালোবাসা। মুখে অসহায়তার এক সূক্ষ্ম ছাপ। তৌসিরকে এভাবে দেখে নাজহারও বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তার ভেতরে কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। সে তো চায় না তৌসিরের সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করতে।
মন তো বলে, দৌড়ে গিয়ে তৌসির কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে, “আপনি কষ্ট পান কেন? আপনার কষ্টে যে আমারও বুক ফাটে! আপনার চোখের জল যে আমারও চোখে এসে জমে!”

কিন্তু কী করবে সে? তার ভেতরে যে লোকটার প্রতি ঘৃণার আস্ত একটা পাহাড় জমে আছে! সেই পাহাড়টা প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছে কিছুতেই গলছে না, ভাঙছে না। অতীতের প্রতিটি জ্বালা, প্রতিটি আঘাত, সব মিলে সেই পাহাড় তৈরি হয়েছে। তৌসিরের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না সে। বুকটা চিনচিন করে ওঠে তার। চোখ নামিয়ে নেয় সে।
মেয়ের খাওয়াও শেষ।তৌশি এখন আধো ঘুম-জাগরণের মাঝে। ছোট্ট ঠোঁট নাড়ছে অল্প অল্প করে, মনে হয় স্বপ্নেও খাচ্ছে। নাজহা কী মনে করে, হঠাৎ মেয়েকে তৌসিরের দিকে বাড়িয়ে দেয়। নরম গলায় বলে, “নিন, ওকে ধরুন।”
তৌসির থমকে যায়। তার কান বিশ্বাস করতে পারে না এ কথা। তার চোখে অবিশ্বাস। নাজহা তাকে অনুমতি দিচ্ছে? সত্যি! এতদিন পর! এই কথাটা সত্যি বের হলো এই মুখ থেকে!
মুহূর্ত নষ্ট না করে নিবিড় মমতায় মেয়েকে তুলে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় তৌসির, কেউ ছিনিয়ে নেওয়ার আগেই বুকে চেপে ধরে মেয়েকে। বাবার শরীরের উষ্ণতায় মেয়েটাও চোখ বুজে ফেলে। তার ছোট্ট শরীরটা শিথিল হয়ে আসে বাবার বুকে।ওর ঠোঁটের কোণে এখনও লেগে আছে এক ফোঁটা দুধ, শুভ্র, পবিত্র, ঠিক মুক্তোর কণার মতো।
তৌসিরের চোখে পানি চিকচিক করছে। সে চোখ বুজে মেয়ের গন্ধ নিজের ভেতরে নিয়ে নেয়। এই গন্ধটাই তার বাকি জীবনের সঞ্চয়। ড্রেসের চেইন লাগাতে লাগাতে নাজহা বলে, তবে গলাটা একটু কড়া করেই, “যান, ওকে নিয়ে ঐ পাশে শুয়ে পড়ুন। আজ দয়া করলাম। কারণ আমার দয়ায় আপনার এখন নিজের সন্তানদের কাছে আসতে হবে, মনে রাখবেন। দয়া করলাম।”

তার বলা প্রতিটি শব্দ এক একটা ছোট্ট ছুরির মতো। ওর কথা শুনে তৌসির মনে মনে বলে, ‘ছিনাল কোনখানের! আর কত কী বলবি? দয়া দয়া করস, একটু সুন্দর কইরা কইতে কী হয়? কইতে কী হয় তোর?’
তবে সে মুখে কিছুই বলে না। চুপচাপ মেয়েকে কোলে নিয়ে বিছানার ওপাশে গিয়ে বসে। গভীর আদরে মেয়ের গালে একটা চুমু খায়। দীর্ঘ একটা চুমু, এতদিনের সব ভালোবাসা এই এক চুমুতেই ঢেলে দিচ্ছে। এটা দেখেই নাজহা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। হাতে ছোট্ট একটা টর্চলাইট নিয়ে দ্রুত পায়ে তৌসিরের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, “এই থামুন! ওকে চুমু দেবেন না।”
তৌসির ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কী হলো আবার!
নাজহা কাছে এসে তৌসিরের গালে হাত রাখে। আঙুল দিয়ে গালটা একবার বুলিয়ে নেয়। কিন্তু হাত দিয়ে যা বুঝতে চাইছিল, তা স্পষ্ট হয় না। তখন আরো কাছে এগিয়ে আসে। তৌসিরের থুতনি ধরে নিজের গালটা তৌসিরের গালের সাথে আলতো করে ঘষে দেয়। মুহূর্তটা থমকে যায়।
দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে যায়। তৌসিরের শ্বাস ভারী হয়ে আসে। নাজহার এত কাছে এসে তৌসিরের শরীরে আগুন ধরে যায়। তারপর নাজহা সরে গিয়ে বলে, “আপনার গাল আপনি ক্লিন শেভ করেননি। আমার গালেই তো ব্যথা লাগছে, ওকে চুমু দিলে ওর ব্যথা লাগবে না?”

তৌসির আবার তৌশির গালে আলতো করে চুমু খেয়ে শান্ত গলায় বলে, “না, লাগে না। লাগলে তো কানত।”
কিন্তু নাজহা শুনে না। টর্চলাইট অন করে তৌসিরের দিকে ঝুঁকে এসে তৌশির গাল পরীক্ষা করে। আলোর নিচে মেয়ের নরম গোলাপি গালটা ভালো করে দেখে। আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখে। নাহ, দাড়ির কোনো আঘাত মেয়ের নরম ত্বকে লাগেনি। গালটা ঠিক আগের মতোই, মসৃণ আছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তৌসির হঠাৎ নাজহার গালে শক্ত করে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দেয়। নাজহা চমকে ওঠে। চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সারা শরীর কেঁপে ওঠে। কী হলো এটা! এত আকস্মিক! তারপর তৌসির বলে, “আমি এমনে এত জোরে দেই না।”
কথাটা বলেই, এবার আলতো করে, পালকের মতো হালকা, প্রজাপতির স্পর্শের মতো, নাজহার গালে আবার নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, “এমনে দিছি।”
নাজহার গালে আগুন ছোটে। লজ্জায়, রাগে, কিংবা অন্য কোনো নাম-না-জানা অনুভূতিতে। সে দ্রুত সরে যায়। কিছুক্ষণ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তৌসিরের দিকে, যে দৃষ্টিতে রাগ আছে, কিন্তু তার আড়ালে গুপ্ত আছে আরেকটা কিছু। ভালোবাসা? নাকি অসহায়তা? তৌসির বুঝতে পারে না। সে হাত বাড়িয়ে নাজহার হাত থেকে টর্চলাইটটা নিয়ে অফ করে দিয়ে , “সাউয়াটা অফ কর, আমার আজরাইলরা জাইগা যাইব।”

এ শুনে নাজহা আর কোনো জবাব দেয় না। চুপচাপ গিয়ে নিজের জায়গায় গা এলিয়ে দেয়। ঘুরে শোয়, তৌসিরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে। কিন্তু চোখ বুজেও তার বুকের ধুকপুকানি কমে না। তৌসির তার ছোট্ট প্রাণ তৌশিকে বুকে জড়িয়ে ধীরে ধীরে বালিশে মাথা রাখে। মেয়ের নিঃশ্বাসের তালে তার বুকটা ওঠানামা করে। আজ এতদিন পর, সে এক টুকরো শান্তির স্বাদ পেয়েছে।
নাজহা সবেমাত্র চোখটা লাগাবে ঠিক তখনই খাওয়ার জন্য জেগে ওঠে তুরাব। এতে নাজহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। যা তার ভেতর থাকা একটা ক্লান্ত শ্বাস। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসে। চোখ ডলে নেয়। মাথাটা ঘুরছে ক্লান্তিতে তার, কিন্তু উপায় নেই। তুরাবকে বুকে জড়িয়ে দুধ দেয়। ছেলেটা মায়ের বুকের সাথে মিশে যায়, এতক্ষণ এই অপেক্ষাতেই ছিল সে।
নাজহা নিজেকে নিজে বোঝায়, তার আর ঘুমের সময় নেই। সে এখন মা হয়ে গেছে। মায়েদের নিজের সুখ এভাবেই ত্যাগ করতে হয়। তার নিজের ঘুম, নিজের আরাম, নিজের সময়, সব কিছুই এখন তার এই তিনটে ছোট্ট প্রাণের জন্য। মায়ের ঘুম মানে সন্তানের কান্না। মায়ের আরাম মানে সন্তানের অস্বস্তি। সারারাত ধরে একেকজন পর্যায়ক্রমে খায়। নাজহার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে ক্লান্তিতে। হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। তার মাথা ভারী লাগছে। তবু সে হাসিমুখে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ এই মুখগুলো তো তার নিজের রক্ত। তার নিজের শরীরের অংশ।

ধীর পায়ে খাট থেকে নেমে আসে। হাঁটতে গিয়েও টালমাটাল হয়ে পড়ে। খাটের পাশে রাখা একটা কেকে কামড় দেয়। বিস্বাদ লাগে, কিন্তু খেতে হবে। গ্লাস থেকে কিছুটা পানি খায়, শক্তি পাওয়ার জন্য। গলা শুকিয়ে আছে তার। তাই পানিটা অমৃতের মতো লাগে। তুরাব মায়ের কোলে নড়েচড়ে কেঁদে ওঠে। নাজহা তাকে নিয়ে একটু সরে আসে, যাতে তৌসিরের ঘুমটা না ভাঙে।
তৌসির ঘুমিয়েছে। ক্লান্তিতে কাত হয়ে শুয়ে আছে। তৌশি তার বুকের ওপর। বাবা-মেয়ে একই ছন্দে নিঃশ্বাস ফেলছে।
বেচারা তৌসির সারারাত জেগে ছিল, সকালেও ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। নাজহা একদৃষ্টে দেখে তৌসিরের ক্লান্ত মুখটা। গাল ভেঙে গেছে, চোখের নিচে কালো দাগ, দাড়ি বড় হয়েছে অযত্নে।
মনে মনে বলে, ‘ওরা অন্তত একটু ঘুমাক।’ এ বলে ঘরের অন্যদিকে গিয়ে ধীরে ধীরে জিকির পড়ে তুরাবকে শান্ত করে সে। নাজহা মৃদু সুরে জিকির পড়তেই ছেলেটা মায়ের কণ্ঠে শান্ত হয়ে আসে। চোখ বুজে আসে। তুরাবকে বিছানায় শোয়াতেই
এবার উঠে পড়ে নাওয়াব। নাজহা শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর তাকে জাগতে দেখে নাজহা ক্লান্ত হয়ে বসে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। ভীষণ ক্লান্তি লাগছে তার। শরীরটা আর চলছে না তার। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু বাচ্চাদের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালে তার সব কষ্ট ধুলোয় মিশে যায়। কোথায় যায়, কে জানে! মা হওয়ার এই এক ম্যাজিক, যত ক্লান্তিই হোক, সন্তানের মুখ দেখলে নতুন করে শক্তি জাগে। তুরাবকে তৌসিরের পাশে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে নাওয়াবকে কোলে তুলে বসে নাজহা।

ছোট্ট নাওয়াব এক টান দুধ খায়, তো একবার মায়ের দিকে তাকায়। তার চাউনি দেখে মনে হয় সে জিজ্ঞেস করছে, “মা, তুমি ঠিক আছ?” বড় বড় চোখে মায়ের মুখটা দেখে। তার সেই কালচে সবুজ চোখে অপার মুগ্ধতা। নাজহা ছেলের কপালে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে মনে মনে বলে ‘তোরা কবে বড় হবি বাবা?কবে তোদের জবান ফুটবে?কবে আমায় “মা” বলে ডাকবি? তোদের মুখ থেকে “মা” ডাক শোনার ভাগ্য কি হবে এই হতভাগী মায়ের?’
নাজহার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ে। তা গড়িয়ে পড়ে নাওয়াবের কপালে। শিশুটা কেঁপে ওঠে অল্প। নাজহা দ্রুত ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নেয়। তার ভেতরটা মোচড়াতে শুরু করে। তার মনে হতে থাকে, হয়তো তার জীবনে কখনো সুখের দিন আসবে না। হয়তো এই সংসার, এই মা ডাক, কিছুই তার ভাগ্যে নেই। হয়তো সে এক চিরন্তন কষ্টের নাম। সে যে কী নিদারুণ কষ্টের মধ্যে আছে, তা একমাত্র সে-ই জানে।দু’টো বাক্য তার বুকের ভেতর প্রতিদিন আগুনের মতো জ্বলে যাকে ভালোবাসে, তাকেই ঘৃণা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যাকে ঘৃণা করে, তার মুখটাই প্রতিদিন দেখতে হচ্ছে। এই দু’টো বাক্যেই তার পুরো জীবনের গল্প। এই দু’টো বাক্যেই তার সব যন্ত্রণা। কাকে বলবে? কে বুঝবে? এই পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে তার বুকের ভেতরের ঝড়টা দেখতে পায়।
নাওয়াব মায়ের কোলেই ঘুমিয়ে পড়ে। তার
ছোট্ট মুখটা শান্ত হয়ে গেছে। তার ঠোঁটে এক ফোঁটা দুধ লেগে আছে। নাজহা তাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখে। এই দৃশ্যটাই তার সব দুঃখের ঔষধ।

তারপর তাকে বিছানায় আস্তে করে শুইয়ে দেয়। পাশে কোলবালিশ দিয়ে দেয়, যেনো গড়িয়ে না পড়ে। এবার নাজহা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। শরীরটা ধরে রাখতে কষ্ট হয়। তবু ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায় গিয়ে গোসল করে নেয়। কারণ দুধের গন্ধে সে নিজের কাছেই নিজে থাকতে পারছে না। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে সেই গাঢ় গন্ধ। কাপড়ে দাগ লেগেছে। চুলে লেগেছে বুকে, পেটে, হাতে, সর্বত্রে দুধ আর দুধ। তার দুধ মাশাল্লাহ অনেক বেশিই আল্লাহ দিয়েছেন। নিজেকে অপরিচ্ছন্ন লাগছে। আর এই অবস্থায় ঘুমালে আরো অস্বস্তি বাড়বে তাই গোসল করে নেয়। ঠান্ডা পানিতে গোসল করার সময় সারা শরীর শিউরে ওঠে। কিন্তু সেই শীতলতাই তাকে কিছুক্ষণের জন্য বাঁচায়। জল গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে, কে জানে, ওটা জল নাকি অশ্রু!
গোসল শেষে শুকনো কাপড় পরে বেরিয়ে আসে। চুল মুছে নেয় তোয়ালেতে মুছে নাওয়াবের পাশে কাত হয়ে শোয়। দুটো ছেলে এক পাশে, তৌসির অন্য পাশে তৌশিকে বুকে নিয়ে। নাজহা জানে, তার ঘুম হবে না। একটু চোখ লাগলেই হয়তো কেউ না কেউ আবার জেগে যাবে। মায়ের ঘুম তো এমনই, অর্ধেক ঘুম, অর্ধেক জাগরণ। এক কান সবসময় খোলাই রাখতে হয়।

সবার পরনে ডায়পার পরানো আছে, তাই সেদিক থেকে কিছুটা নিস্তার। বিদেশি ডায়পার নরম, শোষণক্ষম। বাচ্চাদের ত্বকে কোনো অস্বস্তি দেয় না। তালুকদার বাড়ি থেকে বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় সব জিনিস বিদেশ থেকে পাঠানো হয়েছে। প্রতিটা জিনিস বাছাই করা, সেরা ব্র্যান্ড, সেরা মান। নাজহার আট মাস বয়স থেকেই হ্যাঁ, তার গর্ভে যখন সন্তান এসেছিল, তার আট মাস বয়স থেকে, তার ফুফু অস্ট্রেলিয়া থেকে, চাচারা ইংল্যান্ড, আমেরিকা থেকে, লাগেজ ভরে জিনিসপত্র পাঠাতে শুরু করেছিলেন। বাচ্চাদের কাপড়, দুধের বোতল, ক্রিম, পাউডার, ডায়পার, কম্বল, ছোট ছোট জুতা, টুপি, মোজা, কী নেই সেই লাগেজে! হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর সবাই যখন নাজহা আর বাচ্চাদের দেখতে এসেছিলেন, তখন আট লাগেজ জিনিস নিয়ে এসেছিলেন তারা।আট লাগেজ!
ঘরভর্তি হয়ে গিয়েছিল, ঠিক বিদেশী একটা শোরুমের মতো লাগছিল। তৌসির প্রথমদিকে এসব কিছুতেই রাখতে চায়নি। যাদের জন্য আজ এত কিছু সেই তালুকদারদের কোনো জিনিস সে তার বাচ্চাদের গায়ে পরাবে না। পরাবে না!

“ ঐ খা***নকির পোলাগো কিছু আমার বাচ্চাদের গায়ে লাগামু না আমি!” সে ডিরেক্ট বলেছিল।
তখন নাজহাও কঠোর গলায় বলেছিল,
“এতই যদি বাচ্চা বাচ্চা করেন, তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। ওদের আপনি নিজেই সামলান। আমার পরিবারের কিছু পরাবেন না, তাহলে তো এই বাড়িতে আমার থাকা না-থাকা সমান। আপনি হাঙ্গা করে অন্য কোনো নতুন মা নিয়ে আসুন ওদের জন্য!”
নাজহার কথা শুনে তৌসিরের মুখটা পাংশু হয়ে গিয়েছিল। “নতুন মা”, শব্দটা তার বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল। অন্য কোনো নারী তার বাচ্চাদের মা! এ কথা ভাবতেও তার গা ঘিনঘিন করে। এই কঠিন কথার পর তৌসির আর কোনো রা কাড়েনি। চুপ হয়ে গিয়েছিল। মাথা নুইয়ে নিয়েছিল। তবে সে নিজেও তার ছেলে-মেয়েদের জন্য দশ হাজার টাকার কাপড় কিনে এনেছে।
জীবনে এই প্রথম সে নিজের জন্য বা নিজের পরিবারের জন্য এত টাকা একসাথে খরচ করেছে। তৌসিরের মতো হিসেবি মানুষের জন্য দশ হাজার টাকা মানে অনেক টাকা। অনেক রাত্রি জাগরণ, অনেক শ্রম, অনেক ঘাম।
দোকানে গিয়ে সে অনেকক্ষণ ধরে কাপড় বাছাই করেছিল। ছোট ছোট জামা, রঙিন প্যান্ট, নরম জুতা। দোকানদার অবাক হয়ে দেখেছিল, এত মনোযোগ দিয়ে একজন বাবা কাপড় বাছাই করছে। প্রতিটা কাপড়ের কোয়ালিটি ছুঁয়ে দেখেছিল। নরম কি না, খসখসে কি না, সব পরীক্ষা করেছিল।
আর নাজহা?

রাগ দেখালেও প্রায় সময়ই বাচ্চাদের গায়ে তৌসিরের আনা কাপড়গুলোই পরায়।
বিদেশি লাগেজ ভর্তি জিনিস থাকা সত্ত্বেও, সে বেছে বেছে তৌসিরের আনা কাপড়টাই বের করে।
কারণ শত ঘৃণার মাঝেও, একদিক দিয়ে সে তৌসিরকে খুশিও রাখতে চায়।
এ কথা সে নিজেই নিজের কাছে স্বীকার করে না। মুখে বলে, “আমি তো শুধু কাপড় পরাচ্ছি, এটা কিছু না।” কিন্তু তার মন জানে, মন কেন প্রতিদিন সেই কাপড়টাই বেছে নেয়। কেন বাচ্চাদের গায়ে সেই কাপড়টাই বেশি মানায় বলে তার মনে হয়।
ভালোবাসা আর ঘৃণা, এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাজহা প্রতিনিয়ত একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে। দু’দিকে দুই স্রোত তাকে টানছে। একদিকে রক্তে মিশে থাকা ঘৃণা, অন্যদিকে অজান্তে জন্মে যাওয়া মায়া। কোনদিকে যাবে সে? আর তৌসির?
সে তো ভেঙে যাচ্ছে নীরবে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে, প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা চাহনিতে। তার ভাঙনের কোনো শব্দ নেই, শুধু গভীর রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে যায়, তখন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ঘরের ছাদ ছুঁয়ে যায়।
রাত তিনটে থেকে চারটে হয়ে আসে।

ঘরের নাইট ল্যাম্পটা মৃদু আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিছানার এক পাশে তৌসির, তৌশিকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। অন্য পাশে নাজহা, দুই ছেলেকে দু’পাশে রেখে আধো ঘুমে। বাইরে আজান হবে কিছুক্ষণ পরেই। তারপর নতুন একটা দিন শুরু হবে।কিন্তু এই ঘরের ভেতরে, দুটো মানুষের ভেতরে, যুদ্ধটা থামবে না। প্রতিদিন নতুন করে শুরু হবে। ভালোবাসার যুদ্ধ। ঘৃণার যুদ্ধ। মান-অভিমানের যুদ্ধ। সন্তানদের জন্য আত্মত্যাগের যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে, কেউ জিতবে না। কেউ হারবেও না। দু’জনেই শুধু একটু একটু করে নিঃশেষ হবে। ভালোবাসার নামে।ঘৃণার নামে।
।।
বেশ কিছু মাস ধরে ওয়াসেম আর তৃষ্ণার সম্পর্কের জল অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে। যে দৃষ্টিতে একদিন শুধু উপেক্ষার বরফ জমে থাকত, ওয়াসেমের সেই একই চোখে আজকাল মায়ার এক অচেনা উষ্ণতা ঝিলিক দেয়। সে এখন তৃষ্ণার সঙ্গে কথা বলে কোমল স্বরে, খেয়াল রাখে তার ছোট ছোট অভ্যাসের, পছন্দ অপছন্দের।
ওয়াসেমের এই আকস্মিক বদল তৃষ্ণাকে শুরুতে দিশেহারা করে তুলেছিল। তার মনে হতো, হয়তো কোনো অচেনা মানুষ হঠাৎ পরিচিত মুখ নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সময়ের স্রোতে সে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে ধীরে ধীরে। নতুন এই ওয়াসেমকে এখন তৃষ্ণা চেনে, জানে, আর কোথাও বোধহয় একটু একটু করে ভালোও বাসতে শুরু করেছে তাকে।
আজ দুপুরের রোদ ঝিম মেরে আছে উঠোনে। চারদিকে একটা অলস নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে কোথাও একটা কাক ডেকে উঠছে থেকে থেকে। তৃষ্ণা নিজেদের রুমের বারান্দার রেলিং ঘেঁষে বসে রোদে শুকানো কাপড়গুলো একে একে ভাঁজ করে রাখছে। তার ওড়নার আঁচল হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছে, কপালে এসে পড়ছে এক গোছা এলোমেলো চুল।

হঠাৎ উঠোনে একটা গাড়ির চাকার আওয়াজ পায় সে, ব্রেক কষার তীক্ষ্ণ শব্দ। তার হাত থেমে যায় মাঝপথে। মাথা ঝুঁকিয়ে নিচে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। ওয়াসেমের চারজন লোক তাদের সাহেবকে দু’পাশ থেকে ধরে গাড়ি থেকে নামাচ্ছে অতি সাবধানে। ওয়াসেমের মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ, এক হাত কাঁধ থেকে ঝোলানো, পায়েও মোটা ব্যান্ডেজের আস্তরণ। তার মুখে রক্তশূন্য ফ্যাকাশে ভাব। “হায় আল্লাহ!” তৃষ্ণার গলা চিরে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। গুছিয়ে রাখা কাপড়গুলো তার হাত ফসকে মেঝেতে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। হাঁটু কাঁপতে শুরু করে, শরীরের রক্ত মনে হয় এক লহমায় জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ছুট লাগায় সিঁড়ির দিকে।
হাসপাতালে থাকার কথা ছিল ওয়াসেমের। কিন্তু তার একগুঁয়ে জেদের কাছে হার মেনেছে ডাক্তার, হার মেনেছে তার নিজের লোকজনও, তাই নিয়ে এসেছে তাকে বাড়িতে। তার এক কথা, সে বাড়ি আসবে। সকালেই এক্সিডেন্ট হয়েছে, এতক্ষণ হাসপাতালেই ছিল। বাড়িতে আজ সিতুজাও নেই, পাটোয়ারী সাহেবও বেরিয়েছেন কোনো কাজে। পুরো বাড়িটায় শুধু পড়ন্ত দুপুরের ছায়া আর একটা থমথমে নিস্তব্ধতা।

তৃষ্ণা গিয়ে কাঁপা হাতে সদর দরজার খিল খোলে। তার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা, কপালে চিকচিক করছে ঘামের বিন্দু। ওয়াসেমের লোকেরা তাদের সাহেবকে অতি সন্তর্পণে ভেতরে এনে শোয়ার ঘরের বিছানায় বসিয়ে দেয়। বের হওয়ার আগে তাদের একজন তৃষ্ণার দিকে ফিরে বিনীত স্বরে বলে, “ভাবি, ভাইয়েরে একটু খেয়াল রাখবেন। আমরা তাহলে আসি।”
“ভাবি।” শব্দটা তৃষ্ণার কানে এসে একটা মৃদু কম্পন তোলে। মাত্র ক’দিন আগেই ওয়াসেম তার লোকদের সামনে তাকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়েছে। সেই থেকেই এই সম্ভ্রম, এই সম্মান।
লোকগুলো চলে যেতেই তৃষ্ণা পা টিপে টিপে ওয়াসেমের কাছে এগিয়ে যায়। তার বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছে হৃদস্পন্দন। বিছানার পাশে নতজানু হয়ে বসে কাঁপা গলায় সে জিজ্ঞেস করে, “আপনার কি কিছু লাগবে? এমন ভয়ংকর অবস্থা হলো কী করে আপনার?”
ওয়াসেম কোনো জবাব দেয় না সঙ্গে সঙ্গে। শুধু এক জোড়া ক্লান্ত চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে তৃষ্ণার উদ্বিগ্ন মুখের দিকে। মনে হচ্ছে বহুদিন পর কোনো প্রিয় ছবি ফিরে দেখছে সে। তার এই দৃষ্টিতে আছে ব্যথা, আছে ক্লান্তি, আবার আছে অপার এক প্রশান্তিও। খানিক বাদে ওয়াসেমের শুকনো ঠোঁট নড়ে ওঠে, নিচু, নিস্তেজ স্বরে বলে সে, “না, কিছু লাগবে না।”

বলেই কারো সাহায্য ছাড়াই সে নিজে নিজে আধশোয়া হয়ে বালিশে হেলান দেয়। তার মুখে চেপে রাখা যন্ত্রণার আভাস স্পষ্ট, তবু একটাও শব্দ সে বের হতে দেয় না।
তৃষ্ণা আর কথা বাড়ায় না। নিঃশব্দে উঠে নিচে নেমে যায় সে। সদর দরজার খিল ভালো করে এঁটে দিয়ে ঢোকে রান্নাঘরে। লেবু চিপে, চিনি গুলে, এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত বানিয়ে আনে যত্ন করে। ফিরে এসে ওয়াসেমের সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু তার হাতের কাঁপুনি এখনো কমেনি, গ্লাসের ভেতর শরবতটাও কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই কাঁপা হাতেই তৃষ্ণা গ্লাসটা বাড়িয়ে ধরে কোমল স্বরে বলে, “শরবতটা খেয়ে নিন!”
ওয়াসেমের মুখের আবহাওয়া হঠাৎই বদলে যায়। তার কপালে ভাঁজ পড়ে, ভ্রু কুঁচকে যায়। বিরক্তি ঝরে পড়ে গলায়, “খাব না আমি শরবত!”
তৃষ্ণা দমে যায় না। মৃদু স্বরে সে আবার বলে, “তাহলে একটু স্যুপ এনে দেই? কিন্তু আপনার হলোটা কী?”
এবার ওয়াসেমের গলা চড়ে যায়, ধমকের সুরে বলে, “কিছু হয় নাই আমার! এক্সিডেন্ট হইছে। আর বারবার খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করিস না। আমি কিছু খাব না। যা, গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে আয়।”
তার ধমকের ঝাঁঝে তৃষ্ণা মনে মনে শক্ত খুঁটিতে বাঁধা পড়ে। আমতা আমতা করে বলে, “দ. দরজা কেন বন্ধ করব?”

ওয়াসেমের কণ্ঠ বরফের ছুরির মতো ধারালো। গলায় বলে, “বেশি প্রশ্ন করিস না। যা বলছি কর, বন্ধ করে আয় গিয়ে।”
আর সাহস হয় না তৃষ্ণার মুখে কিছু বলার। চুপচাপ সে শরবতের গ্লাসটা খাটপাশের টেবিলে রেখে ধীর পায়ে গিয়ে ঘরের দরজার ছিটকিনি টেনে দেয়।
দরজা বন্ধ করে তৃষ্ণা ফিরে আসে বিছানার দিকে। তার পা এগোতে চাইছে না, অথচ এগোতেই হচ্ছে তাকে। কাছাকাছি পৌঁছাতেই ওয়াসেমের কণ্ঠ ভেসে আসে। এবার আর ধমক নেই, আছে একরকম নিচু, গাঢ় আদেশ, “এদিকে ঝুঁকে আয় আমার দিকে।”
তৃষ্ণা ভাবে, হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে চায় সে, কানে কানে। বাধ্য মেয়ের মতো সে একটু সামনে ঝুঁকে আসে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, বিদ্যুৎ চমকের মতো, ওয়াসেমের আহত নয় যে হাত, সে হাতটা উঠে আসে। শক্ত করে চেপে ধরে তৃষ্ণার থুতনি। কিছু বোঝার সুযোগটুকুও সে দেয় না তৃষ্ণাকে। তৃষ্ণার নরম গালে গভীরভাবে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় ওয়াসেম, এক দীর্ঘ, উষ্ণ স্পর্শে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬২

তৃষ্ণার চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে যায়। তার শ্বাস আটকে আসে গলায়। গাল গরম হয়ে ওঠে নিমেষেই, লজ্জায়, না বিস্ময়ে, না অন্য কোনো অচেনা অনুভূতিতে, সে নিজেও বুঝতে পারে না।
ওর ঘোর কাটার আগেই ওয়াসেম তার সুস্থ হাত দিয়ে তৃষ্ণার ঘাড় পেঁচিয়ে ধরে, টেনে আনে তাকে একদম নিজের বুকের কাছে। তার মাথাটা ঠেকে যায় ওয়াসেমের পাঁজরের ঠিক ওপরে। তার কানের কাছে ওয়াসেমের গরম নিঃশ্বাস, ব্যান্ডেজের অ্যান্টিসেপটিকের গন্ধ, আর তার চেনা পারফিউমের মিশেল আছড়ে পড়ে।
তারপর ওয়াসেম তৃষ্ণার কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে এনে, ফিসফিস করে বলে ওঠে, “অনেক তো হলো। এবার বাপ হওয়ার পালা, বয়স তো আর কম হলো না আমার।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here