আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩১
সুরভী আক্তার
আজ অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিটের ডেট ছিলো ।
সময়ের আগে ক্লাসে উপস্থিত আদ্রিয়ান কাবির আদ্র । ক্লাসে ঢুকেই সব স্টুডেন্ট দেরকে একে একে পরখ করে নিলো সে । চিরচেনা দুই মুখাবয়বের পাশে অপ্রত্যাশিত ভাবে কাঙ্ক্ষিত মুখখানা দেখে বিব্রত বোধ করলো কিছুটা । এই মেয়ে আজ এতো তাড়াতাড়ি এসে গেছে ?
ওকে ঠেকতে পারা গেলো না আজ ।
কেনো যেনো ওকেই খুঁজছিলো আদ্র । সটান ক্লাসে ঢুকে চেয়ার টেনে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়লো । কপালের ধারে দুই আঙ্গুলে স্লাইড করে ভাবলো কিছু একটা ।
সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো গুরুভার গলায়…..
” স্টুডেন্ট’স ,, সেমিস্টার তো শেষ । নেক্সট পিএল , দেন এক্সাম ! প্রিপারেশন কেমন ?
সমস্বরে আশ্বাস সূচক উত্তর ভেসে আসলো সকলের দিক থেকে । চিলতে পরিমাণ হাসলো আদ্র ।
” অ্যাসাইনমেন্ট রেডি ?
দ্বিতীয় বার সমস্বরে হ্যাঁ বোধক উত্তর ভেসে আসলো । আদ্র খানিক বিরতি রেখে তড়াৎ দৃষ্টিপাত করলো মেঘার পাশে বসে থাকা শিশিরের দিকে । বিলম্ব না করে রাশভারী গলায় ইশারা ছুড়ে বললো….
” হেয়য় ইউ ,,,, স্ট্যান্ড আপ !
আকস্মিক নিজের প্রতি ইশারা বুঝে কিছুটা আশ্চর্য হলো শিশির । মুখে প্রকাশ না করে অগত্যা উঠে দাঁড়ালো ।
আদ্রের দৃষ্টি বরাবর সবাই তাকিয়েছে ওর দিকে ।
ক্লাসে কেবল একজনের দৃষ্টি ক্ষুব্ধ,সূচালো । রাগ নিয়ে চাইলো শিশিরের দিকে । আদ্র এই মেয়েকে দাঁড়াতে বললো কেনো ?
শিশির দাঁড়াতেই আদ্র ওষ্ঠ বাঁকিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন ছোড়ে….
” ইউর নেম ?
কপাল গুটিয়ে নেয় শ্যামলিনী মেয়েটা । এই লোককে নিজের নামটা আর কতবার বলবে ও ?
” শিশির !
” ওকে । বেরিয়ে এসো ।
” সরি ?
না বুঝে বললো মেয়েটা । আদ্র বিরক্ত হয় । এই মেয়ে কথায় কথায় সরি বলে কেনো ? এতো কিসের বিনয় ? বিরক্ত টুকু গিলে বললো চোখ ফিরিয়ে…
” সকলের পেপার কালেক্ট করে আমার ডেস্কে জমা করো । ফাস্ট ।
শিশির তাৎক্ষণিক আদেশ তামিল করতে লেগে পড়লো । শাফাহ্’র কাছ থেকে শুরু করে একে একে সবার অ্যাসাইনমেন্ট পেপার তুলে নিলো তাদের থেকে । ফারিনের কাছে যাওয়া মাত্রই তিরষ্কার করে চোখ উল্টায় সে । বিড়বিড় করে মেয়েটাকে শুনিয়ে….
” ক্লাসলেস লেডি..
এটাই করার যোগ্যতা রাখো তুমি । স্যার জাস্ট তোমার যোগ্যতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো ।
শিশির তাৎক্ষণিক তীক্ষ্ণ স্বরে কথা ফিরিয়ে দিতে বিলম্ব করে না…..
” তাহলে তোমার যোগ্যতা টা কোথায় , ভেবে দেখো তো ফারিন ? না মানে , স্যারের পিছু পিছু এতো ঘোরার পর ও তো , স্যার তোমাকে থোরিই না কেয়ার করে । ইগনোর হও বারবার । আর মানুষ কাকে ইগনোর করে ,, জানো তো ?
ফারিনের মুখখানা ফাটা বেলুনের ন্যায় চুপসে আসে সহসা । দাঁত পিষে কিড়মিড় করে ডেস্ক চেপে ধরে সে । ক্লাস টাইম না হলে অপমানের প্রতিশোধে হয়তো তেড়ে যেতো এতক্ষণে । এসময় আর পারলো না ।
শিশির সবার থেকে পেপার কালেক্ট করে আদ্রের সামনে উঠলো । ডেস্কের উপর সবগুলো রেখে চলে আসতে নিলে আবার পুরু কন্ঠের ডাক পড়লো….
” এক্সকিউজ মি..
চলে যেতে বলেছি আমি ?
শিশির পিছু ফিরে আধো চোখে তাকায় ।
” আর কি করার আছে ?
আদ্র হাতের মার্কার টা ঘোরাতে ঘোরাতে চোখ সূক্ষ্ম করে থেমে বলে….
” নাথিং । ইউ ক্যান গো….
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অমনি মার্কার টা ছিটকে পড়লো হাত থেকে । শিশির সেটার দিকে তাকালো ঝট করে । অবাক হওয়ার ভান ধরে পায়ের উপর থেকে দ্বিতীয় পা নামিয়ে বললো আদ্র…..
” উপসস্,, পড়ে গেলো ।
তুলে দাও ওটা !
কপাল গুটায় শিশির । সোজাসুজি তাকায় আদ্রের দিকে । ওকে অবাক করে দিয়ে ভ্রু নাচায় আদ্র । চোখে চোখ রেখে বলে পূনরায় ….
” কি হলো ,, তুলে দাও ।
শিশির বিলম্ব করলো না । মার্কার টা তুলে ডেস্কের উপর রাখতে গেলে আবার লোকটার কন্ঠ ভেসে আসলো…..
” ওখানে রাখতে বলিনি ,,, আমার হাতে দাও ।
শিশির বাড়িয়ে দিলো সহসা । লোকটা প্যাঁচ ঘুরিয়ে আবার বললো…..
” না থাক , ওটার কাজ নেই । ওখানেই রাখো !
নমনীয় মেয়েটা বিব্রত হয় কিছুটা । মুখ কুঁচকে ঠক করে ডেস্কের উপর মার্কার টা রাখে । ফের চলে যেতে গেলেই আবার ডাক পড়ে…..
” ওয়েট !
ক্লাসের সবাই ভ্যাট ভ্যাট তাকিয়ে আছে আদ্রের কান্ডে । আশ্চর্য ওরা । আদ্রিয়ান কাবির আদ্র এতোটা মারপ্যাঁচ করে না । আজ তাকে ভিন্ন লাগলো ।
শিশির বিরক্তি দেখিয়ে নিচু স্বরে বলল….
” আর কি ?
” উমমম , কিছু না । সিট….
আর থামলো না শিশির । মুখ গোল করে শ্বাস ফেলে আগের জায়গায় গিয়ে বসলো ।
মেঘা আর শাফাহ্ কে এক পলক করে দেখে নিলো । মেঘা আনমনা বসে । খেয়াল করে নি এতো কিছু । মনমরা হয়ে খাতায় কলম চালাচ্ছে সে । লিখছে না । পৃষ্ঠার ভাঁজে আঁকি বুকি করছে । আজ শেষ ক্লাস ।
এর পর তিন দিনের পিএল দেওয়া হবে পরীক্ষার আগে । এই সেমিস্টার খতম এখান থেকেই ।
শিশির পাশে বসেই মেঘা কে ডেকে বললো মৃদু স্বরে….
” মেঘা কি হয়েছে ? মনমরা হয়ে বসে আছিস কেনো এভাবে ? সেই এসেছি থেকে দেখছি !
” তেমন কিছু না । ভালো লাগছে না ।
ক্লাস হয় নি আজ । আদ্র অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে খানিকের মধ্যে বেরিয়ে এসেছে । আজ কোনো ক্লাসই আর হবে না । কেবল এটেনশন দিতে হবে সব ক্লাসেই ।
ফাঁকে একবার বাইরে বেরিয়েছে তিন শালিক । শাফাহ্, মেঘা আর শিশির ক্যাম্পাসের একধারে বসেছে । টুকটাক গল্পের মাঝে শিশির এক পর্যায়ে বলে উঠলো..
” এরপর তো সেমিস্টার ব্রেক । বেশ অনেকদিন দেখা হবেনা তোদের সাথে । মিস করবো ভীষণ ।
” আমিও,, খুব মিস করবো তোকে । আচ্ছা কতদিন বন্ধ থাকবে আমাদের ?
শাফাহ্’র প্রশ্নের উত্তর করলো শিশির….
” কুড়ি-পঁচিশ দিন ।
” খুব বেশিদিন নয় । এর মধ্যেই বাইরে দেখা করবো আমরা ।
শিশির আর শাফাহ্ একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে । মেঘার উদাসীনতা দেখে চিন্তায় পড়ে ওরা । মেঘা কান দিচ্ছে না কোনোদিকে । এক খেয়ালে মশগুল হয়ে ঝিমিয়ে বসে আছে । কিন্তু সেই খেয়াল টা কি ?
শাফাহ্ ওকে ঝাঁকালো….
” এই মেঘা , কি হয়েছে তোর ?
নড়েচড়ে বসে মেঘা । আচমকা বলে….
” হাত পুড়ে গেলে খুব ব্যাথা লাগে তাই না ?
ওরা দুটো কেউই বুঝলো না ।
” কেনো ? হাত পুড়ে গেছে তোর ? কোথায় পুড়েছে ? বলিস নি তো । কি হয়েছে বল না !
” কিছু না । এমনি বললাম ।
আদ্র বাড়িতে নেই । দুপুরে ভার্সিটি থেকে ফিরেই অফিসে বেরিয়েছিল । সে যেকোনো এক পথে যেতে পারবে না । না ভার্সিটি ছাড়তে পারবে , আর না বাপের কথায় এই মুহূর্তে অবাধ্য হতে পারবে । দু’টোকেই মেনে নিলো । ভার্সিটি থেকে ফিরে আসার পর বাকিটা সময় বিজনেসের কাজে লেগে পড়বে । অফিসে জয়েন করবে সে ।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চললো । আদ্র আর শুভ্র দু ভাই অফিস থেকে ফিরেছে একসাথে । ড্রইং রুমে ঢোকা মাত্রই গুমোট ভাবটা দুজনকেই নাড়িয়ে দিলো । চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছেন রুবিনা কাবির ।
সোফায় বসে তোফায়েল কাবির । সিরাত একপাশে দাঁড়িয়ে কানে ফোন গুঁজে রেখেছে ।
আদ্র শুভ্র একে অপরের দিকে তাকালো । এগিয়ে শুধালো শুভ্র……
” কি হয়েছে মামনি ? টেন্সড্ দেখাচ্ছে কেনো তোমায় ?
রুবিনা কাবির যেন হাঁফ ছাড়লেন । কিছুটা প্রশান্তি নিয়ে ধড়ফড়িয়ে শুভ্রর দিকে এগোলেন । ওর অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি । বললেন বিচলিত হয়ে…..
” শুভ্র , এসেছিস বাবা ? তোর ফোন থেকে একবার রৌদ্র কে ফোন কর না । ছেলেটা সারাদিন বাড়িতে নেই । সেই কাল সকালে শেষ বার দেখেছি । এখনো বাড়ি ফেরে নি । রাতেও ফেরে নি কাল । কোথায় আছে , খোঁজ করে দেখ না একটু ।
” রুডি কাল রাতে ফেরেনি ?
আদ্রের প্রশ্ন । রুবিনা কাবিরের তাৎক্ষণিক উত্তর….
” ফিরলে কি সকালে দেখতাম না ? দেখেছিস ওকে সকালে ? ও তো বাড়িতেই নেই । সেই কাল সকালে ব্রেকফাস্টের পর বেরিয়ে গেছে । পুরো একটা দিন কেটে আজ সন্ধ্যা হতে চললো , ছেলেটার আর খোঁজ নেই কোনো ।
” সে কি মামনি , ফোন দাও নি ? এজন্যই সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে দেখি নি ওকে ।
সিরাত উঠতে উঠতে জবাব দিলো……
” এই নিয়ে অর্ধশত বার ফোন করলাম । বারংবার বন্ধ দেখাচ্ছে ফোন ।
শুভ্র সন্দেহ দূর করতে সহসা ফোন বের করে কল লাগালো । ফোন সুইচ অফ । কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেললো সে । কান থেকে ফোন নামিয়ে বললো…..
” ফোন অফ মামনি !
রুবিনা কাবির পা গুঁড়িয়ে পিছিয়ে আসেন কয়েক কদম । হুঁ হুঁ করে কেঁপে ওঠে মাতৃ হৃদয় । তার ছেলে বেপরোয়া , দুই একদিন বাড়িতে না ফিরলেও নিজে থেকে খোঁজ পাঠাবে কভুও । কাল থেকে ছেলেকে দেখেন নি । রাতে ফিরেছিলো কি না জানেন না ।
কোথাও গেলো রৌদ্র ?
মেঘা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে শাফাহ্ সহ ।রুবিনা কাবির ঠোঁট ভেঙে ফুঁপিয়ে উঠলেন এবার…..
” কোথায় আমার ছেলেটা ? ফোন বন্ধ কেনো ওর ? আমাকে নিয়ে একটুও চিন্তা করে না ও ? আমি যে ওর চিন্তায় চিন্তায় মরে যাই,তা ও জানে না ? এবাড়ির কেউ ভাববে না ওকে নিয়ে । কিন্তু আমি তো ভাবি । ও ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেনো ?
মেঘা শুনেই সিঁড়ির একধারে দাঁড়িয়ে পড়লো । মুখখানা মলিন, চুপসে যাওয়া । শুকনো অধর জিভ দিয়ে ভিজিয়ে ঢোক গিললো সে । রেলিংয়ের রোলার চেপে ধরলো বাম হাতে । মনে পড়লো কাল রাতের ঘটনা । লোকটার হাত পুড়িয়ে দিয়েছিলো সে । তবুও লোকটা বিন্দুমাত্র অভিযোগ করে নি । ব্যাথা প্রকাশ করে নি মুখে । মেঘা অনুতাপে দগ্ধ । ও তো রাগের মাথায় খুন্তি টা হাতে চেপে ধরে ছিলো । ভাবেনি অতটা গরম হবে । রৌদ্রের প্রতিক্রিয়া না দেখে অধীক সময় চেপে রেখেছিলো হাতের কাছটায় । পুড়ে গেছে তার হাত ।
লোকটা রাগলো না তবুও । অন্যসময়ের মতো রেগে মেগে সপাটে থাপ্পর বসালো না গালে । কেবলই সহ্য করলো মুখ বুজে । মেঘা কে থামালো না অবধি ।
মেঘা তখন ঐ রাতেই লোকটার পিছু পিছু গেছিলো । তবে দরজার সামনে গিয়ে থেমে গেছে । ভেতরে পা বাড়ানোর মতো দম ছিলো না ।
সেই রাতের পর রৌদ্রের আর খোঁজ নেই । সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলেও দেখা মেলে নি । এখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামছে । খোঁজ নেই তবুও । হাতের কি অবস্থা কে জানে ।
রুবিনা কাবির ফুঁপিয়ে কাঁদছেন । তোফায়েল কাবির কে নির্বিকার বসে থাকতে দেখে অভিযোগ করলেন স্বামীর উপর….
” আপনি বসেই থাকুন । রৌদ্র কে আপনার ? ও তো কেবলই আমার ছেলে ! সন্তান বাধ্য হলে বাপের দায় , আর অবাধ্য হলে মায়ের দায় । এটাই তো আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি । ও অবাধ্য বলে ও কেবলই আমার ছেলে । আপনাকে ভাবতে হবে না আমার ছেলে কে নিয়ে ।
দীর্ঘ শ্বাসে উত্তর আসে ভদ্রলোকের থেকে……
” তোমার ছেলের জন্য দু একদিন বেনামি ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ানো কোনো ম্যাটার করে না । ও দিনের পর দিন বাড়িতে ফেরে না । এটা ভুলে যেও না । কেবল একদিন হয়েছে , দুদিনের মাথায় বাধ্যতার টানে ঠিক ফিরে আসবে ।
আদ্র ক্লান্তি নিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকায় । মেঘা কে দেখেই আচানক প্রশ্ন করে…….
” মেঘ , তুই জানিস রৌদ্র কোথায় ?
” ও কি করে জানবে ?
রুবিনা কাবিরের কটাক্ষ স্বরে কান না দিয়ে আদ্র আবার একই প্রশ্ন করলো……
” কি হলো,বল ? জানিস তুই ?
মেঘা চিবুক নামায় । উত্তর করে শুকনো কন্ঠে…..
” না ভাইয়া ।
আদ্র মায়ের দিকে ফিরে শান্তনা দিয়ে বলে….
” ডোন্ট ওয়ারি আম্মু । ফোন বন্ধ করে রাখা রুডির অভ্যাস । আজ রাতে ফেরে কি না দেখো ! ও বেশিক্ষণ বাইরে টিকতে পারবে না । দম বন্ধ হয়ে আসলে মুক্ত বাতাসের তাগিদে ঠিক ছুটে আসবে । চিন্তা করো না আর ।
আদ্র উপরে উঠে গেলো ক্লান্ত পায়ে ।
বেপরোয়া ছেলেটার আর খোঁজ মিললো না ।
সেদিন রাত টুকু কেটেছে । পরের রাত টুকুও কেটেছে । তবুও রৌদ্রের খোঁজ নেই । বাহাত্তর ঘন্টা পেরোতে চললো তার অনুপস্থিতির । নিখোঁজ হওয়ার ।
এবার চিন্তা বেড়েছে সবার । বাড়ির সবাই হয়রান । রৌদ্রের ফোন এখনো সুইচ অফ । আদ্র ওর বন্ধুদের থেকে খবর নিয়েছে । তাঁরাও কিছু জানে না । কন্টাক্ট হয় নি রৌদ্রের সাথে । লাস্ট দেখেছিলো তিন দিন আগের সেই রাতে । যে রাতে মেঘা রৌদ্রের হাত পোড়ালো । সে রাতের পর থেকেই উবে গেলো সেই বেপরোয়া লোক । কোথায় গেলো ? জানা নেই , খোঁজ নেই কারোর কাছে ।
এমনিতেও রৌদ্র দিনের পর দিন বাড়িতে ফিরতো না । তখন ও নিজের খোঁজ দিতো না কাউকে । তবে এখনকার সময় আলাদা । দেশে ফেরার পর এই প্রথম এতো সময়ের জন্য বাড়িতে নেই রৌদ্র । আদ্র ভেবেছিলো মেঘার টানে হলেও ফিরবে দিনের মাথায় । কিন্তু না , তিন দিন পার হলো । তবুও ফিরলো না সে । যদিও চিন্তা নেই , রৌদ্র বেপরোয়া হলেও নিজের প্রতি পরোয়া আছে তার । নিজের খেয়াল রাখতে জানে সে । কিচ্ছু হবে না ওর । ও ঠিক আছে । কিন্তু ঠিক থেকে কোথায় আছে জানা গেলে এ বাড়ির সবাই স্বস্তি পেতো একটু ।
রুবিনা কাবির খাওয়া দাওয়া ছেড়েছেন এক চিন্তায় । ফেরার পর এই প্রথম তার ছেলে এতো সময়ের জন্য কাছে নেই ।
আজ দুপুরের পর থেকে চিন্তায় চিন্তায় শরীর কাঁপিয়ে জ্বরের কবলে পড়েছেন । বেহুঁশ তিনি । ডক্টর এসে প্রেসার মেপে মেডিসিন দিয়ে গেছেন । প্রেসার ফল্ট করেছে ছেলের চিন্তায় । এই থেকে চরম জ্বর ।
সিরাত তার রুমেই বসে আছে মায়ের শিয়রে । শাহিনা কাবির জোর করে এক বাটি স্যুপ খাইয়ে মেডিসিন দিলেন । এখন ঘুমিয়েছে ঔষধের চোটে । এই একটু স্বস্তি পেয়েছে চিন্তা থেকে ।
বিকেল নামছে । দুপুরের পর থেকেই বিছানায় বেঢাল হয়ে পড়ে আছে মেঘা । বিষন্ন মন তার । রোজ এই সময় ছাদে যায় । আজ আর ইচ্ছে করছে না । পুরো বাড়ি এক বেপরোয়া ছেলের চিন্তায় দিশেহারা । রমনী ও কম নয় । বরং একটু বেশি , কেবলই অব্যক্ত তার দুশ্চিন্তা ।
লোকটার খোঁজ নেই তিন দিন । কোথায় আছে কেমন আছে কে জানে । চঞ্চলা রমনী ছটফট করছে ভেতর ভেতর । অনুতপ্ত হয়ে পুড়ছে দহনে । সেদিন লোকটার হাত পোড়ালো । কালসিটে দগদগে পোড়া দাগটা সরছে না চোখের সামনে থেকে । বারবার ধড়ধড় লাগছে ।
মেঘা উবু হয়ে শুয়ে মাথা কাত করে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনের দেয়ালের পানে । বিছানার পাশেই বই । পরশু থেকে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা । পড়তে ইচ্ছে করছে না কিছুতেই । পড়া জমে আছে কতশত । অথচ বুকে জমে আছে এক রাশ বিষন্ন তিক্ততা ।
এতে পড়ায় মন বসে নাকি ? তবুও দুপুরের পর পড়েছে । শাফাহ্ পড়ছিলো এতোক্ষণ ধরে । কানের কাছে বড় গলা তুলে বাচ্চাদের মতো করে পড়ছিলো । চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে না পড়লে মাথায় কিছুই ঢোকে না ।
এখন একটু বিরতি নিয়ে বেরিয়েছে পানি আনতে । রুমে পানি নেই । ক্ষণিকের মধ্যে মুখ গোমড়া করে ফিরে আসলো । বাড়ির সবাই বিষন্ন । কেমন গুমোট ভাব । ভালো লাগছে না মোটেও । অনেকক্ষণ পড়েছে । এখন একটু ফ্রেশনেস প্রয়োজন । ছাদে যাওয়ার সময় গেছে । গাছ গুলোতে পানি দিতে হবে ।
মেঘা কে ডাকলো সে….
” মেঘা , রোদ পড়েছে । চল ছাদে যাই ।
মেঘা চোখ নিভিয়ে প্রত্যুত্তর করলো ধীরে….
” তুই যা । যেতে ইচ্ছে করছে না । পড়া বাকি আছে অনেক । সময় নেই হাতে । একটু ঘুমিয়ে পড়বো আবার ।
” ধুর , ভাল্লাগে না । সবাই কেমন একঘেয়ে হয়ে পড়ে আছে । রৌদ্র ভাইয়াও নেই । কোথায় গেছে একটু বলে গেলে কি এমন হতো ? চিন্তা কমতো সবার । এই ভাইটাও না , পুরো বেপরোয়া ।
” তোর বেপরোয়া ভাইয়া আগেও এমন করতো ? না বলে কয়ে দিনের পর দিন বাইরে কাটাতো ?
” হুম ,, কাটাতো । জানিস , কাউকে খোঁজ খবর না দিয়ে হায়েস্ট একবার বাইশ দিন বাইরে ছিলো ভাইয়া । আমার মনে আছে । তখন বাড়ির সবাই কতো টেনশনে ছিলো জানিস ! ভেবেছিলো হয়তো ভাইয়া মরেই গেছে..
শাফাহ্ খেয়ালের বশে পাতলা জিভে কথা বলতে গিয়ে বেফাঁস উচ্চারণ করা মাত্রই চড়া কন্ঠের উত্তপ্ত ধমক ভেসে আসলো একবিংশীর থেকে….
” টুকটুকি ,,,
জবান সামলে কথা বল ।
সহসা থতমত খেলো বুদ্ধি হীন মেয়েটা । মেঘা থেমে বললো একই কন্ঠে…..
” কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ কি বলে ফেলিস না ফেলিস খেয়াল আছে তোর ?
” না মানে , এমনি বললাম কথার পরিপ্রেক্ষিতে ।
রেগে যাচ্ছিস কেনো ?
মেয়েটার কাঁচুমাচু স্বর । একটু পর মোড় ঘোরাতে ছটফট করে বললো…..
” আচ্ছা বাদ দে । ভাইয়া কে এবার মিস করছি খুব । এবার ভাইয়ার তিন দিনের বিরহে আমার আর এক্সট্রা চকলেট খাওয়াও হচ্ছে না ।
” কেনো ?
” ভাইয়া এনে দিতো , আমি খেতাম । সেটা আর খাওয়া হচ্ছে কই ?
মেঘা চট করে চোখ তাক করলো । শাফাহ্’র দিকে তাকিয়ে থেমে থেমে শুধালো বিচলিত হয়ে…..
” এনে দিতো ? তোকে ? রোজ ?
” হুম !
” কখন দিতো ? আগে তো বলিস নি ?
শাফাহ্ মুখ ফসকে বলে ফেলে…..
” ভাইয়া বলতে বারণ করেছে । তাই বলিনি….
” বারন করেছে মানে ?
থতমত খায় শাফাহ্ । এই রে , আবারো মুখ ফসকে বলে দিচ্ছিলো এক্ষুনি । নিজেকে শুধরে নিয়ে কথা পাল্টালো…..
” না মানে ,, বেশি চকলেট খেলে তো সবাই বকে । ভাইয়া এক্সট্রা করে এনে দিতো । কেউ জানতো না । জেনে গেলে বকবে সবাই । তাই বলতে বারন করেছিলো , আরকি । আর তেমন কিছু না । ভাইয়া এমনি এমনি চকলেট এনে দিতো আমায় । রৌদ্র ভাইয়া খুব ভালো ।
ফের মুখ ফিরিয়ে নিলো মেঘা ।
” ওওও । ছাদে যাবি বলছিলি । যা , আমি একটু ঘুমাবো ।
বেরিয়ে গেলো শাফাহ্ । অতৃপ্ততায় চোখ বুজে রাখাও দায় একবিংশীর নিকট । ভালো লাগছে না , শান্তি মিলছে না । একটা খচখচানি থেকেই যাচ্ছে মনে । সৃষ্টি হয়েছে নানান উচাটন । জোর পূর্বক চোখ খিচে বন্ধ করে রাখলো সে ।
সেভাবেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই । সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঘুম ভাঙলো ফোনের শব্দে । অসময়ে ঘুমানোর দরুন ভার মাথাটা গিজগিজ করে উঠলো মেয়েটার । অগত্যা চোখ মেলতে পারলো না । মস্তিষ্ক হালকা করার জন্য চোখ বুজেই বালিশের নিচে হাত ঢুকিয়ে ফোনটা তুলে নিলো হাতে । বেখেয়ালে রিসিভ করে ঠেকালো কানে । ঘুমের আচ্ছন্নতায় নিজে কিছু বলার শক্তি পেলো না । কেবলই জোরালো শ্বাস ফেললো ঘন ঘন । ওপাশেও নীরব । ক্ষণিক চললো এই নীরবতা । অতঃপর নীরবতা ভেঙে ভেসে আসলো মৃদু স্বর…..
” হেয়য়য় সানি ?
কর্নপাত হওয়া বর্তমান , মেয়েটা ধক্ করে ওঠে তাৎক্ষণিক । কেমন ছলকে ওঠে অন্তরাত্মা । ঘুম ছুটিয়ে এক লাফে উঠে বসে একবিংশী । ফোন ছিটকে পড়েছে বিছানায় । মেঘার ঘুম কাতর আধো অক্ষি যুগল তড়াক করে বৃহৎ আকার ধারণ করে । প্রথমেই ঢোক গিলে ঠোঁট ভেজায় । ভ্রম কাটাতে তড়িঘড়ি ফোনটা টেনে নেয় কম্পিত হাতে । স্ক্রিনে নজর দেওয়া মাত্রই সম্বিত ফেরে তার ।
ভ্রম নয় । সত্য সত্যই ফোন এসেছে । স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটা আননোন অদ্ভুত নাম্বার । বিডি নাম্বার নয় । কোড ভিন্ন । মেঘা আহম্মকের মতো বাকহারা হয়ে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত । কেমন ঘোর লাগলো । কে ফোন করেছে ? প্রশ্ন জাগতেই কানে ফোন ঠেকালো আবার । সেই বেপরোয়া লোকটার শান্ত কন্ঠ আবারো…
” হোয়াটসঅ্যাপ সানি ? আমায় ছাড়া কেমন চলছে দিনকাল ? ভুলে গেছো ?
মেঘা কাঁপে । হাঁসফাঁস অবস্থায় উচাটন ধরে উচ্চারণ করে কোনো রকমে…
” আ..আপনি ?
” ইয়েস , ইউর LP ?
মেঘা সব ভুললো । উদগ্রীবতা ধরে রাখতে না পেরে ছটফট করে বুকে চেপে ধরলো ফোনটা । চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানলো বুক ভরে । বুক চিরে বেরোলো দীর্ঘ শ্বাস । পূনরায় ফোন কানে ঠেকালো…..
ব্যাকুল হয়ে বললো….
” রৌদ্র ? আপনি ,,, আপনি কোথায় ? বাড়িতে নেই কেনো ? তিন দিন হয়ে গেছে । কোথায় আছেন আপনি ?
মৃদু হাসে রৌদ্র । ইজি চেয়ারে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নেয়…..
” বাইরে ।
” বাইরে মানে , বাইরে কোথায় ? আপনি জানেন বাড়িতে সবাই কত টেনশন করছে ? ফোন অফ কেনো আপনার ?
” সবাই টেনশন করছে , আর তুই ? তুই করছিস না ?
” বাজে কথা রাখুন , কোথায় আছেন বলুন আগে ?
” অ্যাবরডে ফিরেছি !
মেঘা ভড়কে যায় । অবিশ্বাসে উচ্চারণ করে….
” হোয়াট ?
” ইয়েস সুইটহার্ট ,,, ফিরে এসেছি আমি । আর জ্বালাবো না তোকে ।
কপালে হাত রাখে মেঘা । ঘাম জমেছে সেখানটায় । ঘাম মুছে চোখ ডলে হাঁফ ছেড়ে বলে…..
” ইরিটেটিং ম্যান, মজা পেয়েছেন সব ? খোঁজ ছিলো না কেনো আপনার ? দেখুন মজা করবেন না , কোথায় আছেন আপনি ?
” বলছি তো ফিরে এসেছি । নাম্বার চেক করে দেখ ।
মেঘা বিশ্বাস করেও করলো না । জোরপূর্বক জেদ ধরে বললো….
” ইউ রাইনো মুখো , মিথ্যে বলবেন না একদম । মামনি টেনশন করছে । প্রেসার ফল্ট করেছে আপনার চিন্তায় । জ্বর এসেছে ভীষণ । আপনাকে প্রয়োজন এখানে !
” মমের খেয়াল রাখার জন্য অনেকেই আছে । আমার প্রয়োজন পড়বে না তার । তবে,,,
” তবে কি ?
রৌদ্র মৃদু হাসে ।
” তোর যখন আমায় প্রয়োজন পড়বে , একটা বার খবর দিস শুধু । সব ফেলে তখনই ফিরবো আমি ।
এই বলেই মুখের উপর টুং টুং করে ফোনটা কেটে দিলো সে । মেঘা কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়েও আর পারলো না ।
হ্যালো হ্যালো করে ফোন সামনে নিয়ে ফোনের দিকে তাকালো । ততক্ষণে স্ক্রিন থেকে নাম্বার টা মুছে গেছে । ঘুমের টালে সবটা এলোমেলো লাগলো মেঘার কাছে । নিজেকে সামলাতে সময় লাগলো । মস্তিষ্ক সম্পুর্ন চেতনায় ফেরা মাত্রই ছটফট করে বিছানা ছাড়লো মেঘা । খোলা কুন্তল হাতে পেচাতে পেচাতে দম আটকে ছুটলো ঘরের বাইরে ।
রাতের ডিনারের সময় হয়ে গেছে । শাফাহ্ মেঘা কে ডাকার জন্য উপরে উঠতে যাচ্ছিলো ।
এমতসময় ধড়ফড় করে হুড়মুড়িয়ে নামলো মেঘা ।
সিরাত রুবিনা কাবিরের খাবার নিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে ওকে দেখেই থামলো । সাবধান করে বললো….
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩০
” মেঘা , ওভাবে ছুটছিস কেনো ? পড়ে যাবি তো !
মেঘা কেবলই পরখ করলো সকলকে । শ্বাস জোরালো হয়ে এসেছে । হাঁসফাঁস করে শ্বাস টেনে উচ্চারণ করলো ক্ষিণ স্বরে……
” আপু , তোমার ভাই…..
