Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩০

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩০

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩০
সুরভী আক্তার

ব্রেকফাস্টের পর পর শুভ্রর সাথে বেরিয়েছে আদ্র । বাপের বিজনেসে সে মাথা ঘামায় না । নিজের চাওয়া আর স্বপ্ন টাকেই প্রায়োরিটি দিয়েছিলো সে । ইচ্ছে ছিলো প্রফেসর হওয়ার । আর সেটাই হয়েছে প্রচেষ্টা থেকে । বিজেনেস পুরোপুরি শুভ্রর হাতে । ভবিষ্যতে আদ্র যোগ হবে কিনা সন্দিহান । আর ছোট ছেলের তো কোনো কথাই নেই । তার উপর আশা নেই বিন্দুমাত্র । হিসেবের খাতার বাইরে সে । ছন্নছাড়া তার জীবন । কিভাবে চলবে না চলবে , তা নিয়ে চিন্তা নেই ।
তোফায়েল কাবির বরাবর আদ্র কে নিজেদের বিজনেসে যুক্ত হতে বলেন । তার আর তৌসিফ কাবিরের বয়স বাড়ছে । আর কতদিন সামলাবেন এসব । যদিও শুভ্রই সব সামলায় । তারা কেবলই ডান হাত আর বাম হাত । দুই কর্তা অফিস যাওয়া ছেড়ে দিলে সব ধকল এসে পড়বে শুভ্রর উপর । একা একা কত কি করবে সেই ছেলে ?

আদ্র কে কাজে লাগাতে চান তোফায়েল কাবির । শুরুতে ছেলের লেকচারার হওয়া নিয়ে তিনি ও খুশি ছিলেন । তখন মেনে নিয়েছিলেন । তবে ইদানিং বেঁকে বসেছেন তিনি । আদ্র কে অফিসে জয়েন করার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন কথায় কথায় ।
আদ্র এতে বিরক্ত । ওকে ভার্সিটিতে থাকতে হয়‌ সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত । বাদ বাকি সময় মোটামুটি ফ্রি সে । আজ ভার্সিটি ছিলো না । তোফায়েল কাবিরের চাপ সহ্য করতে না পেরে আজ অফিসে বেরিয়েছে বাধ্য হয়ে । এতে বাবা খুশি হলেও সে একদমই খুশি নয় । জোর পূর্বক বাপের চাওয়া টাকে প্রাধান্য দিচ্ছে কেবল । কাবির গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমান চেয়ারম্যান তৌসিফ কাবির । তবে তিনি নামমাত্র । শুভ্র কে সঁপে দেওয়া হবে সবটা । শুভ্রর আলাদা কেবিন । সেখানেই থমথমে মুখে বসে আছে আদ্রিয়ান কাবির আদ্র । চেয়ারের হাতলে কনুই ঠেসে চিবুক স্লাইড করছে এক আঙ্গুলে । চোখে মুখে বিরক্তির ভাঁজ ।
এখানে এসেই বা কি করবে ও ? বিজনেস নিয়ে ও ভাবে না । ভাবতে চায় না । মাথা ঘামাতে চায় না এসবে । ওর আলাদা পার্সোনালিটি আছে ।‌ কেবল সেটাতেই ফোকাস করতে চায় ।

কিন্তু তোফায়েল কাবির তা চাননা । কোনো ছেলেকেই নিজের প্রতি বাধ্য করতে পারেন নি তিনি । বাবা হিসেবে এটা তার বিরাট আফসোস ।
রৌদ্রের বাধ্যতা অকল্পনীয় । কিন্তু আদ্রের ক্ষেত্রে তো তা নয় । তার একটা ছেলে অন্তত পারিবারিক বিজনেসে জয়েন হোক , এটাই তার চাহনা ।
আদ্র বিব্রত । আসার পর ঘটা করে ছেলেকে অফিসের সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তোফায়েল কাবির । ওর জন্য নেমপ্লেট ও তৈরি করিয়েছেন । ইতোমধ্যে ছেলের আলাদা কেবিন ও সাজানো হয়েছে ।
আদ্রের দ্বিমত, বিমুখতা বুঝে শুভ্র মুখ খুললো….
” এতো ভাবছিস কেনো ? বাবাই যখন চাইছে তুই বিজনেসে জয়েন কর , তখন তার অবাধ্য হওয়াটা উচিত হবে কি ?

” সবসময় বাধ্য হয়ে আসতে আসতেই অবাধ্যতা ভুলে গেছি ভাইয়া । যদি রুডির মতো বেপরোয়া অবাধ্য হতাম, তাহলেই হয়তো ভালো হতো । অন্তত নিজের চাওয়া টাকে প্রায়োরিটি দিতে পারতাম সবার বিরুদ্ধে গিয়ে । আমি বিজনেস চাই না । আমি যা করছি , তাই করতে চাই । বিজনেস নিয়ে কোনো আইডিয়া নেই আমার ।
” আইডিয়া কি শুরুতে আমার ছিলো নাকি ? আমি কি খুব বুঝতাম এসব ? ধীরে ধীরে বুঝেছি , তুই ও ঠিক বুঝবি ।
” বুঝতে চাই না আমি । তুমি তো আছোই । আমাকে কি খুব প্রয়োজন এখানে ? আমি যেমন আছি , তেমনটা থাকতে দাও না আমায় ।
আদ্রের কন্ঠে তিতিবিরক্তি । শুভ্র নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো । ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা শান্ত স্বরে বলল…..

” তোরা দুভাই কিন্তু অভিন্ন । একজন কেবল প্রকাশ করিস, অন্যজন চেপে রাখিস । বাবাইয়ের কথার গুরুত্ব দিয়েও দিস না তোরা । এজন্যই কিন্তু বাবাই এতোটা কঠোর তোদের উপর । সন্তানদের বাধ্য করতে পারলে, পিতারা আর কিচ্ছু চায় না । কিন্তু তোরা দুটোই অবাধ্য হয়েছিস । বাধ্য হতে পারিস না বলেই বাবাই কে এতোটা রুড মনে হয় তোদের কাছে ।
এখন সবটা তোর হাতে । ভেবে দেখ কি করবি ।
আদ্র সবটা শুনে অফিস থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে এসেছে । মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে সবকিছু । একদিকে স্বপ্ন , অন্যদিকে বাপের ইচ্ছে । কি করবে এখন ? দুটোর মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নিলে অপরদিকটা ঝাপসা হয়ে যাবে । চরম রাগ উঠছে মাঝে মাঝে ।
গাড়িতে উঠে বসে কঠোর ভঙ্গিতে গাড়ি স্টার্ট করলো সে । চোয়াল শক্ত । রেগে মেগে গাড়ির স্পিড বাড়ালো । ব্যাস্ত রাস্তা পেরিয়ে নামলো ফাঁকা রাস্তায় । বিকেলের মিঠে রোদ ঝিমিয়ে এসেছে । রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা । নির্জন রাস্তা । মানুষজন যারা আছে , তারা পায়ে হেঁটে চলাচল করছে । গাড়ি কম এ রাস্তায় । আদ্র স্পিড কিছুটা বাড়িয়ে স্টিয়ারিং চেপে ধরেছে । মস্তিষ্ক দগদগে হয়ে উঠেছে রাগে । ভীষণ রাগ লাগছে । সে সর্বদা শান্ত । রাগ প্রকাশ করে না বলে কি রাগ নেই নাকি ?

কেবলই রাগটা গুমড়ে রাখতে পারে ভেতর ভেতর । উজাড় করতে পারে না অবাধ্য হয়ে ।
গাড়ির এসিতেও ঘামছে সে । চোখ লাল ‌। চিবুকের ধারে চিকচিকে বিন্দু বিন্দু ঘাম । গাড়ি চলছে পুরো দমে । ফাঁকা রাস্তা হাওয়ায় সেভাবে বেগ পোহাতে হচ্ছে না ।
তবে আকস্মিক আর চলমান গতি ধরে রাখা গেলো না । হুট করে গাড়ির সামনে কেউ একজন আসতেই ভড়কালো আদ্র । কপালের ভাঁজ মিলিয়ে চট করে ব্রেক কষলো অগত্যা । সামনের জন বোধহয় রাস্তা পার হচ্ছিলো । আদ্রের গাড়িটার ব্রেক পড়ার পর গিয়ে থামলো সেই জনার কাছ ঘেঁষে । ভয়ে তটস্থ হয়ে সেই জনাও থেমেছে সহসা । তাৎক্ষণিক শরীর খিচে নিয়ে গলায় চিবুক নামিয়েছে । ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বুজে নিয়েছে দুচোখ ।
অঘটন ঘটার আগেই গতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে আদ্র । গ্লাস ভেদে সামনে তাকালো সে । একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ঠিক সামনে । চিবুক নোয়ানো , মুখশ্রী বোঝা গেলো না । ও তো ফাঁকা রাস্তাতেই ড্রাইভ করছিলো । এই মেয়ে হুটহাট রাস্তা না দেখেই এসে পড়েছে গাড়ির সামনে । আদ্র একেই ক্ষিপ্ত । তার উপর এই ঘটনায় ক্ষিপ্ততা বাড়লো তড়তড়িয়ে । চোয়াল খিচে গাড়ি থেকে নেমে ঠাস করে দরজা লাগালো । ঘুরে সামনে গিয়ে তপ্ত ধমক দিলো না দেখেই…..

” আর ইউ ব্লাইন্ড ? স্টুপিড গার্ল । দেখে চলতে পারেন না ?
মেয়েটা চমকালো । দু কদম পিছিয়ে সহসা মাথা তুললো । অমনি কপালের ভাঁজ কপালে ফিরে আসলো পূণরায় । সেই স্বল্প পরিচিত শ্যামলা মুখাবয়ব । যার মুখশ্রীতে কিছুটা আতঙ্কের রেশ । আদ্র কে দেখে সেও বোধহয় অবাক হলো । পলক ফেলে তাকালো আশ্চর্য হয়ে ।
নিজেকে সামলে পরক্ষনে আবার ধমকালো আদ্র…..
” ইউউউ ? দেখে চলতে পারো না ? রাস্তায় চলার সময় চোখ কি পকেটে নিয়ে ঘোরো ?
শিশির মৃদু কথা ফোঁটায়…..
” সরি , বাট আপনার গাড়ির স্পিড বেশি ছিলো । এটা পায়ে হাঁটার রাস্তা । ফুল স্পিডে চার চাকা গাড়ি চালানোর নয় ।
মেয়েটার তপ্ত স্বর । মুখখানা ও শক্ত । সেও কিছুটা বিব্রত এসময় । টিউশন পড়াতো দুটো । আজ থেকে একটা টিউশনি হাত ছাড়া হলো । কিছুটা হলেও টাকা আসতো এখান থেকে । এখন আর আসবে না । নিজের টুকটাক খরচটুকু অন্তত চলতো এতে করে । এখন সে পথ বন্ধ । নতুন টিউশনি খুঁজতে হবে আবার । দুটো টিউশন হাতে থাকলে অনায়াসে কিছু খরচা চালানো যায় । ইকরার উপর কতোই বা প্রেসার দেওয়া যায় ?
লাস্ট টিউশন টা পড়িয়েই ফিরছিলো । সেসময় এই ঘটনা । ওর খিটখিটে কথায় আদ্রের কপালের ভাঁজ প্রখর হয় । রেগে বলে…..

” সেটা তোমার থেকে শিখবো আমি ? বেয়াদব , তর্ক করছো মুখে মুখে ?
” এগেইন সরি , বাট ধমকাচ্ছেন কাকে ? গলা নামিয়ে কথা বলুন । এখানে আমি আপনার স্টুডেন্ট নই । আর না আপনি আমার টিচার । ভুলটা আপনার ছিলো । আমি কেবলই একজন রোড ক্রসার । আর আপনি , ট্রাফিক রুলস ব্রেকার । রুলস ব্রেক করে সবসময় এভাবেই গাড়ি চালান ?
আদ্র ক্ষুব্ধ হলো । একের পর রাগ বেড়েই চলেছে । এই মেয়েটা কে এসময় পুরো কাঁচা চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করলো ওর । দাঁত পিষে হাত মুঠিয়ে সংযত করলো নিজেকে । রগরগে দৃষ্টিপাত করে আঙ্গুল তুলে কিছু বলতে নিলো । এর আগেই দুই একজন পথচারী বাড়াবাড়ি দেখে এগিয়ে আসলেন….
” কি হচ্ছে টা কি এখানে ? একেই বাড়াবাড়ি গতিতে গাড়ি চালিয়ে এক্ষুনি একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলছিলেন । তার উপর নিজের দোষ স্বীকার না করে এই মেয়েটার উপর হম্বিতম্বি করছেন কেনো ভাই ? বড়লোক হয়েছেন , গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন বলে কি বাদবাকি পথচারীদের দাম নেই নাকি ?
এক হাত কপাল চেপে ধরলো আদ্র । মগজে গিয়ে আঘাত হানছে আশপাশের সবকিছু । উপর থেকেই ডিস্টার্ব লাগছে ভীষণ । শিশির আধো চোখে চায় । লোকটার মুখো ভঙ্গিমায় কিছু একটা আন্দাজ করে বলে বাকিদের উদ্দেশ্যে….

” ওনাকে কিছু বলতে হবে না । আপনারা আসতে পারেন । উনি আমার পরিচিত । আমরা মিটিয়ে নেবো নিজেদের মাঝে ।
আদ্র চট করে চায় । লোকগুলো চলে যেতেই শিশির তাকায় আবার । বিষন্নতায় চটে গেছিলো নিজেও । এখন স্বাভাবিক হয়ে ধীরে বললো….
” সরি স্যার । বেশি বলে ফেলেছি হয়তো । একচুয়েলি….
” সরি মাই ফুট । কথায় কথায় সরি বলবে না বেয়াদব । ইম্পিউডেন্ট গার্ল । সরো সামনে থেকে ।
শিশির তব্দা মেরে গেলো । এই লোকটা আসলেই রগচটা গুরুগম্ভীর । শাফাহ্ আর মেঘাকে বিশ্বাস করে যতই এই ধারনা থেকে বেরোতে চায় , ততই লোকটার রাগ আর গম্ভীরতা দেখে জড়িয়ে যায় আবার । গাড়ির সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো মেয়েটা । আদ্র গাড়িতে উঠতে গিয়ে একটু থেমে বললো নিরেট কন্ঠে…..
” তোমার নামটা যেনো কি ?
শিশির কুঁচকানো মুখে জবাব দেয়….
” শিশির ‌।
” শিশির ,,, বেয়াদব । দেখে নেবো তোমায় ।
বিড়বিড় করে গাড়িতে বসে । গাড়ি স্টার্ট করে চলে যায় নিমিষেই । শিশির হতবাক হয়ে তাকিয়েই দেখলো ।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা । অতঃপর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত একটার কোঠায় ঘড়ির কাঁটা । রৌদ্রের রোজকার ন্যায় লেইট নাইটে বাড়ি ফেরার ফুরসৎ মিললো কেবল । রোজই চাবি ঘুরিয়ে সদর খোলে । আজও তাই ।
ভেতরে ঢুকে সোজা সিঁড়ির দিকে এগোলো । ড্রইং রুমের লাইট অফ । উপরে করিডোরে একটা আলো জ্বলছে । নিচেও এসেছে সেটার ঝলকানি । সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে ঠুকঠাক শব্দ কানে পড়তেই থমকালো রৌদ্র । নিভু চোখ জোড়া জোর পূর্বক পূর্ণ করলো । পিছু ফিরে এদিক ওদিক তাকালো । কোথা থেকে আসছে এই শব্দ ।
চোখে পড়লো কিচেনে আলো জ্বলছে । সেখান থেকেই আসছে আওয়াজ । কিন্তু এতো রাতে কিচেনে কে হতে পারে ? সন্দিহান হয়ে টালমাটাল পদ যুগল পিছনে হটালো সে । যেতে যেতেই হাতের জ্যাকেট টা ছুঁড়ে মারলো সোফার দিকে ।

এই রাত বিরেতে ঘুম ধরা দিচ্ছে না চোখে । মাঝে মাঝেই এমনটা হয় । অভ্যাস হয়ে গেছে মেঘার । হুট করে কি হয় কে জানে । একদিন হঠাৎ করেই ঘুম উবে যায় চোখ হতে । রাত্রি পার হলেও চোখ জোড়া এক হয় না । সেই এগারোটা থেকে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেও ঘুমোতে পারেনি একবিংশী । টানা এক ঘন্টা বিরক্তি নিয়ে শুয়ে ছিলো । এতেও ঘুম আসলো না । আব্বু আম্মুর ছবিটা নিয়ে বারান্দায় বসে একা একা বকবক করেছে আরো আধা ঘন্টা । হাঁপিয়ে গেছে রমনী । খিদে পেয়েছিলো । যখন রাত করে ঘুম আসে না , তখন সবার অগোচরে খিদে পেলে নিজে নিজে মন মতো কিছু একটা বানিয়ে খায় মেঘা । এর মধ্যে নুডুলস অন্যতম । আজও নিচে নেমেছে সেই কখন ।
ভাবলো কেবল কফি খাবে । কিন্তু খিদের প্রখরতা বুঝে আলসেমি সত্তেও নুডুলস বানাতে কোমর বেঁধে লেগে পড়লো ।
কিচেনের দরজার কাছে যাওয়া মাত্রই এই অসময়ে মেঘা কে কিচেনে দেখে বিস্মিত হলো রৌদ্র । এই ঘুমপরী আজ ঘুমোয় নি এখনো ? এগারোটা হতে হতেই সোনার কাঠি আর রুপোর কাঠি নিজেদের জায়গায় বসে ঘুম পাড়ায় এই মেয়েকে । আজ একটু বিপরীত হলো যে ? কি করছে এতো রাতে ? রাঁধছে টা কি ?
সেদ্ধ নুডুলস নামিয়ে কড়াইয়ে তেল গরম করতে দিলো মেঘা । এমতসময় পেছন থেকে অপ্রত্যাশিত সেই বেপরোয়া লোকটার মিটমিটে স্বর কানে বাজলো….

” এতো রাতে এখানে কি করছো MP ? খাওয়ার বানাচ্ছো LP এর জন্য ?
মেঘা স্তব্ধ কিচেনে একলা ছিলো । আকস্মিক পুরুষালি ভরাট কন্ঠে নীরবতা কাটতেই তড়াৎ ভয়ে ধক্ করে উঠলো ভীত মেয়েটা । চোখ বড় বড় করে চমকে পিছু ফিরলো । রৌদ্র এগিয়ে এসেছে । মেঘা চোখ সম্মুখে ওকে দেখে বুকে হাত রেখে হাঁফ ছাড়ল । ভীতি দূর করলো শ্বাস ফেলে । এই লোক কেবলমাত্র আসলো ? ও তো ভেবেছিলো এসেছে হয়তো ।
রৌদ্রের উপস্থিতি বুঝেও গুরুত্ব দিলো না মেঘা । এড়িয়ে গেলো এভাবে , যেনো কাউকে দেখে নি সে ।
পিছু ফিরে গরম তেলে পেঁয়াজ কুচি ঢেলে দিলো । খুন্তি দিয়ে নাড়লো পরক্ষনে । রৌদ্র উপেক্ষিত হলো । যেটা তার বড্ড অপছন্দনীয় ।
ঘাড়ে হাত ডলে এগোলো সে । ফ্রিজ হতে ঠান্ডা পানি বের করে দুঢোক গিললো ।

” হোয়াট হ্যাপেন্ড সানি ? কথা বলছো না কেনো ? আর তুমি কি করে জানলে আমার খিদে পেয়েছে ? হোয়াট অ্যা কানেকশন ! আমার আসার আগেই খাবার বানাচ্ছো আমার জন্য ? কি বানাচ্ছো দেখি । নুডুলস ? উমমম , নট ব্যাড । পছন্দ আমার ।
মেঘা কথা গুলো সহ্য করলো কোনো রকমে । ঠক ঠক করে কড়াইয়ে খুন্তি নাড়াতে লাগলো । লোকটা বকবক করেই যাচ্ছে । এক পর্যায়ে ঠিক পেছনে এসে দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো । অদ্ভুত অভ্যাসের বশে মেয়েটার খোঁপা হতে টেনে বের করলো কাঁটা টা । ঝড়ঝড়িয়ে চুল গুলো খুলে পড়লো পিঠে । এলোমেলো হয়ে ঢেকে দিলো পুরো শরীর ।
এতেই খুন্তি ছেড়ে তিরিক্ষি হয়ে পিছু ফিরলো মেঘা । ততক্ষণে রৌদ্র পাশে সরে গেছে । কেবিনেটে একটু হেলান দিয়ে রয়ে সয়ে দাঁড়িয়েছে । মেঘার খ্যাট খ্যাটে দৃষ্টি আড়চোখে দেখে চুলের কাঁটা টা হাতে নাচালো ।
ওর দিকে ফিরে পেঁয়াজের তুলনায় দ্বিগুণ ঝাঁজ দেখিয়ে বললো মেঘা…..
” ডিস্টার্ব করবেন না রাইনো মুখো । দূরে যান আমার থেকে ।
” ওওও সুইটহার্ট । এতো তেজ কেনো দেখাও আমায় ? কাছেই আসি নি এখনো । দূরে থেকেই আরো কত দূরে যাবো ? দূরে যাওয়া ভালো লাগে না জান পাখি । ছিলাম তো এতো গুলো দিন দূরে । দূরত্ব বড্ড পীড়া দেয় । এবার একটু কাছে আসলে খুব ক্ষতি হবে কি ?
মেঘা কিড়মিড়িয়ে উঠলো । সকাল থেকে মেজাজ চড়ে আছে । লোক লজ্জায় বাড়ির কারোর সামনে স্বস্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারে নি ও । শাফাহ্ বারবার খোঁচাচ্ছে ওকে । সবাই কেমন সূচালো চোখে তাকাচ্ছে ওর দিকে । সব এই লোকের মিথ্যাচারের জন্য । মেঘা কটমট করে বললো…..

” ইউ বিস্ট , ইরিটেটিং ম্যান ….
আমার প্রশ্নের উত্তর দিন আগে । সকালে মিথ্যে বলেছেন কেনো সকলকে ? লাভ বাইট ? কিসের লাভ বাইট বয়ে বেড়াচ্ছেন আপনি ?
” বউয়ের দেওয়া লাভ বাইট ।
” বউ , কিসের বউ ?
” আমার বউ ।
” মিথ্যে বলবেন না ? আমি কখন বাইট করলাম আপনার গলায় ?
” আমি কখন বললাম তুমিই বাইট করেছো ? বলেছি একবারও ?
মেঘা ছ্যাত করে ওঠে । তাকায় দীর্ঘ নয়নে । ক্ষিপ্ত মুখাবয়বে বদল আসে চট করে । এক মুহুর্তে মস্তিষ্ক এলোমেলো হলো । ও জানে ও এই কাজ করে নি ? আর এই লোক একটা বারের জন্যও মেঘার নামও নেয় নি সে সময় । কেবলই বউ বলেছিলো । কে বউ , কোন বউ, তা তো বলে নি ।
মেঘার চট করে পরিবর্তন হওয়া ভড়কানো ভাবমূর্তি দেখে ঠোঁট বাঁকায় রৌদ্র । চুলের কাঁটা টা পকেটে ঢুকিয়ে মেয়েটার নির্ভেজাল মুখপানে তাকিয়ে বলে বুকে হাত ঠেসে….

” বাই দ্যা ওয়ে , তুমি কি কোনো ভাবে নিজেকে আমার বউ বলে স্বীকার করছো ? আমি তো কেবলই আমার বউয়ের কথা বলেছি । নাম নিয়ে তোমার কথা বলিনি তো । বাইট তো করেছে আমার বউ ।
মেঘা চোখ রাঙিয়ে তুললো । নাকের পাটা ফুলে উঠলো তিক্ত ক্ষোভে । কি বলছে এই লোক ? বউ মানে , কোন বউ ? এক মুহুর্তেই আচানক হিংস্র বেগে রৌদ্রের কলার টেনে ধরলো সে । লম্বাটে লোকটাকে টেনে ঝুঁকিয়ে আনলো । গজগজ করে উঠলো দাঁত চেপে । ক্রোধে হিসহিসিয়ে বললো…..
” এইইই , জানে মেরে ফেলবো একদম । কে বাইট করেছে গলায় ? কোন বউ বাইট করেছে ? আর কে আছে আপনার জীবনে ? বিদেশে গিয়ে আমাকে রেখে আর কাকে জড়িয়েছেন নিজের সাথে ? বলুন ?
শেষের টুকু কন্ঠ চিপে চেঁচিয়ে বললো ।
চোখে এক রাশ আবেশ নিয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো রৌদ্র । বাম ভ্রু উঁচিয়ে বাঁকা হাসলো । এলোমেলো কেশে অগ্নি কন্যার হিংসাত্মক সত্তাটা বেশ সোজাসুজি স্পষ্ট ধরা দিলো তার চোখে । ফুঁসছে মেঘা । রৌদ্র বেশ এনজয় করলো । শিথিল ভঙ্গিতে পরখ করে বললো হীম শীতল কন্ঠে….

” তোমাকে রেখে আর কাউকে জড়ানোর প্রয়োজন বোধ করি নি ?
মেঘার একই তেজি স্বর…..
” কামড়ের দাগ কোথা থেকে আসলো তাহলে ? কে কামড়েছে গলায় ?
” আমার বউ !
” চুপপ , কোন বউ কামড়েছে বলুন ?
রৌদ্র মিটমিটে হাসে । রমনীর এক গোছা কুন্তল টেনে নাকের ডগায় ঠেকায় । চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাসে ঘ্রাণ টেনে বলে…
” তুমি ?
” মাথা খারাপ ? কখন বাইট করলাম আমি ?
” মনে করো ।

মেঘা কপাল কুঁচকায় । রৌদ্রের কলার চেপে ধরে আছে এখনো । ওর টানে সমান হতে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছে রৌদ্র । ওদিকে ভাজা পেঁয়াজ পুড়ে ছাই । ফুটছে গরম তেল ।
বেপরোয়া লোকটা বারংবার চিলতে পরিমাণ হাসে বেখেয়ালে । মেঘা এখন ধ্যান খুইয়েছে । ঘোর ভাঙলে এই সত্তা টাকে হারাবে আবার । ওর নির্বোধ মুখো ভঙ্গিমা দেখে মুখ খুললো রৌদ্র । মেঘার বাম ভ্রু’র নিকট আলতো টোকা মেরে বললো…..
” মনে করতে সাহায্য করি ?
আমার দেওয়া প্রথম আঘাত যেমন এটা ছিলো । তেমনি তোমার দেওয়া প্রথম আঘাত ও ছিলো এটা । তবে আমি এটাকে আঘাত ভাবিনি কখনো । আঘাত ভাবলে ভালোবাসার চিহ্ন বলতাম না । মনে করে দেখো তো , সেদিন আমার গলায় দাঁত বসিয়েছিলে কি না ?
খুব ভেবেও মেঘার কিছুই মনে পড়লো না । মস্তিষ্ক সাঁড়া দিলো না শত চেষ্টাতেও । কখন দাঁত বসালো ? ভাবতে গিয়ে মুখ ছোট করলো সে । কলার ছেড়ে আবারো সন্দিহান হলো ।

” মিথ্যে বলবেন না রাইনো মুখো । আমি কোনো দিন এই অকাজ করি নি ।
” করেছো সুইটহার্ট । পিচ্চি ছিলে , তাই মনে নেই ।
রৌদ্রের পকেটে ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে । মেঘা চকিতে তাকালো পকেটের দিকে ।
পরক্ষনে রৌদ্রের পানে তাকিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে খিটখিটে স্বরে জানতে চাইলো….
” কে ফোন করছে ?
না‌ দেখেই উত্তর করলো রৌদ্র….
” কেউ না ।
কটমট করে মেঘা । এই লোক কিছু তো একটা লুকোচ্ছে ওর থেকে । সেদিন রাগ না দেখিয়ে ফোনটা ঘেঁটে দেখলেই পারতো । খোলসা হতো সব । কে ফোন করে জানা যেত ! আর ঐ দিন ঐ বাচ্চা , কে ছিলো ওটা ? কল স্ক্রিনে কোন বাচ্চার ছবি ছিলো ? কার নাম্বার বাচ্চার ছবি সমেত সেভ করেছে রৌদ্র ?
এ কথা মনে উঠতেই দাঁত খিচে আসলো । অজ্ঞাত কারনে রাগ উঠলো অত্যাধিক । দলা পাকিয়ে শ্বাস আটকালো গলায় । রৌদ্র পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোন সাইলেন্ট করা মাত্রই আচানক গরম তেলের কড়াই হতে খুন্তি টা তুলে নিলো মেঘা ‌। বিলম্ব হীন উত্তপ্ত পাশটা চেপে ধরলো রৌদ্রের ডান হাতের কব্জির ঠিক উপরে । সহসা চোখ বুজে নিলো রৌদ্র । বাম হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো ক্যাবিনেটের একধার । মেঘা কিড়মিড়িয়ে ধরা জবানে বললো….

” আই হেইট ইউ রাইনো মুখো । আই জাস্ট হেইট ইউ…
রৌদ্রের উদ্বেগ নেই ‌। কিয়ৎ কাল বাদ চোখ মেলে চোখ রেখেছে একবিংশীর ছলছলে আঁখিতে । মেঘার চোখজোড়া টলমল । যেনো পানি গড়াবে এক্ষুনি ।
মুহুর্ত কয়েকেও রৌদ্রের প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললো মেঘা । হাতের দিকে তাকালো । খুন্তি টা কি গরম নয়‌ ? তাপের আঘাতেও এই লোকের ভ্রুক্ষেপ নেই কেনো ? রৌদ্রের হাত থেকে খুন্তি টা সরিয়ে উত্তাপ অনুমানের জন্য এক আঙ্গুলের ডগায় ওটাকে ছুঁয়ে দেখলো মেঘা । অমনি প্রখর সেঁকে ছিটকে সরে আসলো পিছনে । ঝনঝনিয়ে হাত থেকে স্টিলের চামচটা খসে পড়লো মার্বেলের মেঝেতে । বিটক শব্দ হলো এতে । বহুক্ষণ চুলোর আঁচে গরম তেলে চোবানো ছিলো সেটা । উত্তপ্ত হয়েছে সাংঘাতিক । ন্যানো সেকেন্ডেই চিনচিন করে উঠলো তর্জনীর ডগা ।

মেঘা ছিটকে পিছিয়ে যেতেই রৌদ্র ওকে টেনে ধরলো । ওর ব্যাথাতুর হাত টা সাথে সাথে পানি ভর্তি জগের ভেতর চুবিয়ে নিলো নিজেকে সামলে নিয়ে ।
কিংকর্তব্য বিমূঢ় বনে গেলো একবিংশী । ছলাৎ করে গোল গোল চোখে তাকালো রৌদ্রের দিকে । পরক্ষনে রৌদ্রের ডান হাতের দিকে । কব্জির উপরে দগদগে লালচে দাগ । মেয়েটা আকস্মিক ধাক্কায় কেঁপে ওঠে । টুপ করে নোনা পানি ঝড়ে পড়ে চোখের কিনার ঘেঁষে । ভয়ে ভয়ে তাকায় রৌদ্রের দিকে । লোকটা চেয়ে আছে আগে থেকেই । একটুও পরিবর্তন নেই । মেঘা সেই এক চিমটে সামান্য উত্তাপ সহ্য করতে পারলো না । আর এই লোক ?
ভাবতে পারলো না মেঘা , নিজের হাতটা জগ থেকে তুলে রৌদ্রের হাতটা টেনে ধরলো ‌। পোড়া স্থানটা কালসিটে বর্ন ধারন করেছে ইতোমধ্যে । মেঘা ভড়কায় । ধকধকে অনুভুতিতে শিউরে ওঠে । চোখে চোখ রাখে ।
ঠোঁট ভিজিয়ে শঙ্কিত হয়ে কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করে মেয়েটা….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৯ (২)

” রৌদ্র !
প্রত্যুত্তরে ক্ষিণ হাসে রৌদ্র । চোখ জুড়িয়ে মেঘা কে ছেড়ে দেয় । নিজের হাতটা ওর থেকে ছাড়িয়ে নের ‌। হাত ঝেড়ে বলে….
” আমি যা সহ্য করি , তা তোর সহ্য সীমানার বাইরে সানি । পোড়াচ্ছিস পোড়া , নিজে পুড়তে আসিস না । ছাই হয়ে যাবি নয়তো । খিদে পেয়েছে তো ? খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড় । রাত হয়েছে অনেক । গুড নাইট…..
আর‌ এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না বেপরোয়া লোকটা । মূর্ত রমনীকে পাশ কাটিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে কিচেন ছাড়লো । কেবলই বাকহারা হয়ে শূন্য খেয়ালে তাকিয়ে রইলো একবিংশী । আশপাশ কেমন ঝাঁপসা হয়ে আসলো ক্ষণিকের ব্যাবধানে ‌।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here