নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬ (২)
রূপন্তী সরকার
রিদ ইয়াশফাকে একটু বুঝিয়ে বলল,
“এটাম বোম, ট্যাওকে ইউভানের কাছে দাও। ও একটু ভালো করে চেকআপ করুক।”
ইয়াশফা আর কোনো জেদ না করে ইয়ানকে ইউভানের কোলে দিয়ে চেম্বারের বাহিরে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াল। ইউভান অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ইয়ানকে কিছুক্ষণ দেখল। স্টেথোস্কোপ দিয়ে ওর বুকটা পরীক্ষা করার সময় ইউভানের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। পরীক্ষা শেষ করে ও রিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আঙ্কেল, বাচ্চাটার আসলে মাঝে মাঝেই বুকে খুব ব্যথা করে, ওই জন্যই ও ওমন করে হঠাৎ কেঁদে উঠে। ওর হার্ট ফুটো। ওকে বড্ড সাবধানে রাখবেন। আর ও কোনো রকম সমস্যা হলে আমাকে যখন ইচ্ছে কল করবেন, আমি যে কাজেই থাকি না কেন, সব ফেলে চলে আসবো।”
ইউভানের মুখে এই আশঙ্কার কথা শুনে রিদের চোখ দুটো এক পলকে ছলছল করে উঠল। ও পাশে মিহির দিকে তাকালো, মিহির মুখে কোনো কথা নেই, আগে তাও একটু কান্না আসতো এখন তাও আসে না।
রিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাঙা গলায় বলল,” আল্লাহ আর কতো পরীক্ষা নিবে আমার, আমি জানি না। উনি আমাকে সব দিক থেকে একদম নিঃস্ব করে দিচ্ছেন। এই ছোট্ট প্রাণটাকে যেভাবেই হোক আমায় বাঁচাতে হবে।”
ইউভান রিদের মনের অবস্থাটা বুঝতে পারল। ও নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে রিদের কাঁধে একটা হাত রাখলো। সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল, “ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে আঙ্কেল। আমি আছি তো, আপনি একদম ভেঙে পড়বেন না।”
রিদ নিজের চোখের কোণার জলটুকু মুছে একটা মুচকি হাসি দিল। ও মিহির দিকে তাকিয়ে বলল, ” সব ঠিক হয়ে যাবে, টেনশন করো না পাখি”
রিদ ইয়ানকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। ওরা চলে যাওয়ার পর ইউভান এক দৃষ্টিতে ওদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা পুরোনো কষ্টের কথা ভাবছিল।
ইয়াশফার এই বাবুটা জন্মের সময় ওদের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল, সেই কথা ভাবলে আজো ইউভানের নিজের কলিজাটা কেঁপে ওঠে। তার উপর বাচ্চাটা আবার হয়েছিল মাত্র ৭ মাসে, অর্থাৎ একদম অপুষ্ট। আর সেই সময় ইয়াশফা সহ পুরো রায়ান পরিবারের ওপর দিয়ে কী ভয়ঙ্কর মানসিক আর শারীরিক ধকল গিয়েছে, তা শুধু ওপরওয়ালাই ভালো জানেন। সন্তান জন্মের সময় ইয়াশফার শরীরের ভেতরের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, ও জীবনে আর কোনোদিন মা হতে পারবে না।
কারণ এবার যদি ইয়াশফা কোনোদিন মা হতে যায়, তবে ওকে আর কোনোভাবেই বাঁচানো যাবে না। ইয়ানের জন্মের সময়ই ডাক্তাররা এই কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে দিয়েছিলেন।
ইয়ানের জন্মের পর থেকেই ওর হার্টটা বুকের বাঁ দিকে না থেকে ডান দিকে রয়েছে, তার ওপর আবার সেখানে একটা ছোট্ট ফুটো। ও সাত মাসের অপুষ্ট বাচ্চা হওয়ায় এই সমস্যাটা আরও জঘন্য রূপ নিয়েছে। ইয়ানের জন্মের পর থেকে ওর সমস্ত জরুরি মেডিকেল ফাইল আর সব ট্রিটমেন্ট এই ইউভানই হ্যান্ডেল করছে। ইউভান নিজের খুব ভালো করেই জানে, এই হার্ট নিয়ে ইয়ান বড়জোর আর তিন থেকে চার বছর বাঁচবে, এর বেশি কোনোভাবেই না। কিন্তু এই সত্যটা ইউভান আজ পর্যন্ত কাউকে বলেনি। রায়ান কুঞ্জের একটা মানুষও এই খবরটা জানে না। রিদ, মিহি কিংবা ইয়াশফা কেউই টের পায়নি যে ইয়ান আর মাত্র কয়েকটা দিনের অতিথি। ইউভান খুব ভালো করেই জানে, এই কথাটা যদি ও কোনোদিন ওদের বলে, তবে পুরো পরিবারটা এক নিমেষে জ্যান্ত লাশ হয়ে যাবে। ইয়াশফা তো নিজের সন্তানকে হারানোর শোকে ওখানেই শেষ হয়ে যাবে। তাই এই মস্ত বড় সত্যিটা নিজের বুকের গভীরে পাথর বানিয়ে চেপে রেখেছে ইউভান। প্রতি রাতে যখন পুরো শহর ঘুমে নিঝুম হয়ে যায়, ইউভান তখন জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়ায়। ও দু হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ডুকরে ডুকরে কেঁদে নিষ্পাপ বাচ্চাটার জন্য প্রাণ ভিক্ষা চায়।
ও সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারে না চোখ বন্ধ করলেই ইয়ানের ওই মায়াবী, চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে আর ওর বুকটা এক অজানা হাহাকারে ফেটে যেতে চায়। বাচ্চাটার চেহারার মধ্যে কেনো জানি কেমন এক অদ্ভুত মায়া লুকিয়ে আছে, যা ওকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয় না। ইউভানের নিজের যদি এতটুকু ক্ষমতা থাকত, তবে ও এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিনিময়ে হলেও এই ছোট্ট প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখত। কিন্তু ও একজন সাধারণ মানুষ, আল্লাহর হুকুমের ওপর তো কারো কোনো হাত নেই। তাই সব কিছু এখন একমাত্র আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ ভরসা। ইউভান জানে না যে ঋষভ আদৌও কোনোদিন এই বাড়িতে ফিরে আসবে কি না। ওর মনে শুধু একটাই তীব্র আকুতি কাজ করে আল্লাহ না করুক, বাচ্চাটার কিছু হওয়ার আগে ও যেন অন্তত একবারের জন্য হলেও নিজের বাবাকে চোখের সামনে দেখতে পারে। আর যদি ঋষভ না-ই ফেরে, তবে এই বাচ্চাটার মস্তিস্কে যেন অন্তত এটুকু স্মৃতি থাকে যে দুনিয়ায় তারও একটা বাবা ছিল, যে তাকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। কিন্তু ঋষভের কোনো খোঁজ না থাকায়, ইয়ান যাতে কখনো বাবার অভাব বোধ না করে ঠিক এই কারণেই ইউভান সবার সামনে ইয়ানকে নিজের ছেলে বলে দাবি করে। ও সত্যি সত্যিই এই ছোট্ট ইয়ানকে নিজের অস্তিত্ব মনে করে। আইনগতভাবে না হলেও, মনের দিক থেকে আজ ইউভানই ইয়ানের একমাত্র বাবা। ইউভান নিজের নামের সাথে মিলিয়ে ইয়ানের পুরো নাম রেখেছিল ইয়ান ইউভান। ও চেয়েছিল এই নামেই ও বাচ্চাটাকে বড় করবে। কিন্তু ইয়াশফা বড্ড জেদি মেয়ে ও ইউভানকে কোনোদিনও ইয়ানকে এই নামে ডাকতে দেয় না।
ইউভানের চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণের চেপে রাখা কষ্টটা আর সামলাতে পারল না ও। নিজের দুই হাত দিয়ে চোখটা ভালো করে মুছে ও ওপরের দিকে তাকাল। দুই হাত তুলে বড্ড আকুল হয়ে বলল,
“আমার সন্তানকে আপনি রক্ষা করুন আল্লাহ। তার মাকেও রক্ষা করুন। আমার জীবনের সবটুকু আয়ু আপনি আমার সন্তান আর তার মাকে দিয়ে দিন। ইয়া রব, দয়া করুন এই অধমের ওপর।”
ইউভান আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। ফাঁকা চেম্বারের ভেতরে ও একলা বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ইয়ানের ওই নিষ্পাপ মুখটা মনে পড়তেই ওর বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় ভেঙে আসছিল। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ওর ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনে ওহিদুল রহমানের নামটা ভেসে উঠতেই ইউভান কোনোমতে নিজের চোখ দুটো মুছল। গলার স্বর স্বাভাবিক করে ও কলটা রিসিভ করে বলল, “হ্যালো পাপা, বলো।”
ওপাশ থেকে ওহিদুল রহমান বললেন, “তুমি কি এখনো চেম্বারেই আছো? বাড়িতে কখন আসবে?”
ইউভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, “তাড়াতাড়ি চলে যাবো আজকে। কাজ প্রায় শেষ।”
“আচ্ছা এসো। তোমার জন্য একটা ভালো মেয়ে ঠিক করেছি।”
ওহিদুল সাহেব বেশ খুশি মনে কথাটা বললেন। বাবার মুখে আবারও এই বিয়ের কথা শুনতেই ইউভানের মনটা এক নিমেষে তিতকুটে হয়ে গেল। ও একটু বিরক্ত গলায় বলল,
“আবার এসব শুরু করেছো পাপা? তোমাকে কতবার বারণ করেছি যে এসব ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই? আমাকে কেন এত মানুষ মানসিক চাপে ফেলো বলো তো? আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যিই সব কিছু ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবো!”
কথাটা বলেই ও ওপাশ থেকে বাবার কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে খট করে কলটা কেটে দিল। ও ফোনটা টেবিলের ওপর উপুড় করে রেখে চেয়ারে হেলান দিল। ও বিয়ে করবে না, কোনোদিনও না। ও কেন অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে যাবে? ওর তো বাচ্চা আছে আর ওর মনে ভালোবাসার একজন মানুষও আছে। হ্যাঁ, পরিস্থিতি আর ভাগ্যের কারণে হয়তো ও তাকে কোনোদিন নিজের করে পাবে না, ওকে নিজের স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করতে পারবে না কিন্তু দূর থেকে নিজের সবটুকু মন দিয়ে ভালোবাসতে তো পারবে! আর ভালোবাসলে যে তাকে নিজের করে পেতেই হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। ও ট্যাও এবং তার দুজনকেই ভালোবেসে, ওদের আড়ালে থেকে আগলে রেখেই ও নিজের বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। বিয়ে টিয়ের প্রয়োজন নেই।
ইয়াশফা ইয়ানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর প্রথমে ওকে অল্প কিছু খাবার খাইয়ে দিল। তারপর কয়েকটা মেডিসিন খাইয়ে ও বুকে জড়িয়ে ধরে ওকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। ওষুধ পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়ানের ছটফটানি কমে এলো, ওর ছোট চোখ দুটো ক্লান্তিতে বুজে এল।
ইয়াশফা ইয়ানের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু দিল। বাচ্চাটাকে বিছানায় সাবধানে শুইয়ে দিয়ে ও নিজেও ওর পাশে এলিয়ে পড়ল। এই একাকীত্বের ধকল আর মানসিক টেনশনে ওর নিজের শরীরটাও যেন আর চলছিল না। বিছানায় পিঠ ঠেকোতেই ও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
দুপুরের দিকে মিহি একবার ইয়াশফাকে খাওয়ার জন্য ডাকতে ওপরে এসেছিল। কিন্তু দরজার ফাঁক দিয়ে ইয়াশফাকে ইয়ানকে জড়িয়ে ওভাবে অঘোরে ঘুমাতে দেখে ও আর ডাকেনি। মিহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ নিচে চলে গেছে, মেয়েটাকে আর বিরক্ত করেনি। মিহি সবই বোঝে, ইয়াশফার মনের ভেতর দিয়ে যে কী ঝড় বয়ে গেছে এতগুলো দিন তা ওর চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। ঋষভ যখন হুট করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, ইয়াশফা তখন প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। সেই কঠিন দিনগুলোতে মিহি নিজেই কত রাত মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছে, ওর চোখের পানি নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিয়েছে।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, বিকেল থেকে সন্ধ্যা। রুমে ইয়াশফা আর ইয়ান তখনো ঘুমাচ্ছে। চারপাশের পুরো বাড়িটা এখন এক্কেবারে নিস্তব্ধ, নিঝুম হয়ে আছে। ঘরটা হালকা ঠান্ডা হয়ে আছে।
গভীর ঘুমের মাঝে ইয়াশফা হঠাৎ কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি পেল। ও স্পষ্ট অনুভব করতে পারলো ওর পেটের ওপর কে যেন খুব আলতো করে নিজের একটা শক্ত হাত রাখল। এই হাতের স্পর্শটা, এই চেনা উষ্ণতা ওর বড্ড বেশি চেনা, বড্ড চেনা এক অনুভূতি!
স্পর্শটা টের পাওয়া মাত্রই ইয়াশফা ঘুমের ঘোরেই এক ঝটকা খেয়ে বিছানায় লাফিয়ে উঠল! ওর বুকটা তখন ধকধক করে কাঁপছে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে।
ও তাড়াহুড়ো করে ঘরের ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় চারদিকে চোখ বোলাল। কিন্তু ঘরের কোথাও কেউ নেই। দরজা ভেড়ানো, জানালার কাচগুলোও বন্ধ। বিছানায় কেবল ইয়ান এক পাশে ঘুমিয়ে আছে।
ইয়াশফা নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের পেটটা চেপে ধরল। তাহলে ওকে কে স্পর্শ করল? ও কি কোনো স্বপ্ন দেখছিল, নাকি সত্যিই এই নিঝুম ঘরের অন্ধকারের আড়ালে কেউ লুকিয়ে আছে? এক অজানা ভয়ে আর আশঙ্কায় ইয়াশফার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। ও আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে বিছানায় ইয়ানের একদম কাছাকাছি সরে গেল, ওকে নিজের দুই বাহু দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চারদিকের অন্ধকারের দিকে পাহারাদারের মতো তাকিয়ে রইল।
বিছানায় ইয়ানকে জড়িয়ে ধরে ও যখন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠিক তখনই আচমকা একটা বিকট শব্দ হলো। ঘরের সাথে লেগে থাকা বারান্দা ভেদ করে একটা পাথর এসে সজোরে আছাড় খেলো মেঝেতে। পাথরের ওই আচমকা শব্দে ইয়াশফা একদম ধড়ফড়িয়ে উঠল।
ও ভয় পেলো কিছুটা। তারপর ও বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ততক্ষণে চারপাশ কালো করে একদম সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ঠান্ডা বাতাস বইছে। ইয়াশফা মেঝের দিকে তাকাতেই দেখল, একটা পাথরের গায়ে একটা কাগজ ভালো করে মোড়ানো রয়েছে। মূলত ওই কাগজটা দিয়েই পাথরটা পেঁচিয়ে ওপরের দিকে ছুঁড়ে মারা হয়েছে।
ইয়াশফা নিচু হয়ে মেঝে থেকে পাথরটা তুলল, তারপর সাবধানে কাগজের মোড়কটা খুলে ফেলল। কাগজের ভাজটা খুলতেই ওর চোখ আটকে গেল ভেতরের কুৎসিত হাতের লেখার ওপর। সেখানে খুব স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে
“আর কত পালাবি মা? এবার তো আমাট কাছে ধরা দে? নাহলে কিন্তু তোর ছেলেকে….”
লাইনের শেষের ওই ডট ডট চিহ্ন আর নিজের ছেলের ওপর হুমকির ইঙ্গিত দেখা মাত্রই ইয়াশফার মাথার সব কটা রগ যেন একসাথে চিড়বিড় করে উঠল, পুরো মাথায় রক্ত চড়ে গেল ওর।
ও ঝড়ের গতিতে ঘরের ভেতর এসে টেবিল থেকে একটা খাতা আর কলম তুলে নিল। কাগজের একটা টুকরো ছিঁড়ে পালটা জবাব লিখে দিলো,
” আমার পরিবার এবং আমার ছেলের দিকে ভুলেও নজর দিলে কলিজা কানা করে ফেলবো, ইয়াশফা শেখ আমি উপরে আল্লাহ ছাড়া কারো বাপকে ভয় পাই না,”
লেখাটা শেষ করেই ও কাগজের টুকরোটা আবার ওই ভারী পাথরটার গায়ে শক্ত করে মুড়িয়ে নিল। তারপর বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে নিচে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সজোরে পাথরটা আবার নিচের দিকে ছুঁড়ে মারল। ও দেখতে চাইল না নিচে কে দাঁড়িয়ে আছে, ও
পাথরটা নিচে পড়তেই ও এক ঝটকায় বারান্দার ভারী দরজাটা টেনে ভেতর থেকে লক করে দিল। ওর শরীর তখন রাগে কাঁপছে।
ইয়াশফা বারান্দা থেকে ঘরের ভেতরে এসে বিছানায় বসল। ওর নিজের বুকের ভেতরটা তখন দপাদপ করে কাঁপছে। ও লম্বা একটা নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর নিজের মনকে শক্ত করে একা একাই বিড়বিড় করে বলল,
“কুল ইয়াশ কিচ্ছু হয় নি। ভয় পাচ্ছিস কেন তুই? থাপ্পড় চিনিস?”
কথাটা মুখ দিয়ে বের হতেই ইয়াশফা নিজেই নিজের ওপর ভীষণ অবাক হলো। ও দুই সেকেন্ড থমকে রইল। এমন করে, এই ভাবে তো ঋষভ কথা বলে! ও হুট করেই ওই লোকটার মতো আচরণ করছে? নিজের অবচেতন মনের এই খ্যাপাটে স্বভাব দেখে ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই বিছানায় ইয়ান নড়েচড়ে উঠলো। ইয়াশফা আর ওসব নিয়ে না ভেবে ইয়ানকে কোলে তুলে নিয়ে নিচে নেমে গেল।নিচে ড্রয়িংরুমে তখন সবাই একসাথে বসে ছিল। ইয়াশফার মুখটা গম্ভীর, ও নিচে নামতেই রিদ নিজের হাত বাড়িয়ে ইয়ানকে নিজের কোলে নিয়ে নিল। তারপর ইয়াশফার এই থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তিত গলায় বলল,
“মা শোনো, একটা মস্ত বড় বিপদ হয়ে গেছে। সামনের সপ্তাহে আমাদের বিজনেসে একটা বড়সড় লস হয়েছে। আগামীকাল ওটার রিকভারির জন্য একটা বড় প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। আমি কয়েকটা ফাইল দিচ্ছি, ওগুলো একটু চেক করে রেডি করতে পারবে?”
ইয়াশফা শান্ত গলায় জবাব দিল, “ওকে”
রিদ ইয়াশফার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বেশ ভরসা পেল। ও অনেকদিন ধরেই খেয়াল করে দেখেছে, ইয়াশফা এত কম বয়স থেকেই বিজনেসের খুঁটিনাটি আর জটিল হিসাব-নিকাশ বড্ড ভালো বোঝে। এই মেয়েটা বিজনেসের নলেজ আর চতুর বুদ্ধি অনেক বেশি ধারালো। সেই কারণেই রিদ নিজের ব্যবসার অনেক বড় বড় সিদ্ধান্তের মাঝেই ইয়াশফার হেল্প নেয়। রিদ মনে মনে একটা বড় পরিকল্পনাও করে রেখেছে ও আর দু-তিন বছর পর ইয়াশফাকে ওদের পুরো কোম্পানির সিইও (CEO) বানিয়ে দেবে। কারণ ও জানে, চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি ইয়াশফার চেয়ে ভালো আর কেউ সামলাতে পারবে না।
পরেরদিন…
বিকেল গড়াতেই ড. রোহান ইউভান রায়ান কুঞ্জে এসে হাজির হলো। ইয়ানের হার্টের সমস্যার কারণে ওকে প্রায় প্রতিদিন নিয়ম করে চেকআপ করাতে হয়, সেই দায়িত্বটা ইউভানই সামলাচ্ছে।
ইউভান ইয়ানকে খুব ভালো করে চেকআপ করাল। চেকআপ শেষ করে ও টেবিলের ওপর নিজের স্টেথোস্কোপটা রাখল। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সোফায় বসা ইয়াশফার একদম কাছাকাছি গিয়ে বসল। ইউভানকে অত কাছে বসতে দেখেই ইয়াশফা শরীরটা একটু শক্ত করে ওখান থেকে কিছুটা সরে গেল।
ইউভান ইয়াশফার এই গুটিয়ে যাওয়াটা লক্ষ্য করল। ও ইয়াশফার মুখের দিকে তাকাতেই হুট করে ওর নজর গেল ইয়াশফার গলার এক কোণায়। ও নিজের কপালটা সামান্য কুঁচকে কৌতুহল মাখা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? তোমার গলায় ওটা কিসের দাগ?”
ইয়াশফা নিজের ওড়নাটা এক টানে গলার কাছে শক্ত করে চেপে ধরে বড্ড রুক্ষ আর ঠান্ডা গলায় বলল, “কেন? আপনার তাতে কী?”
ইউভান ওর এই ধারালো চাউনি আর মুখের ওপর দেওয়া কড়া জবাব শুনে নিজের চশমাটা একটু ঠিক করল। ও বেশ গম্ভীর সুরে বলল, “তুমি মেয়ে মানুষ, আর মেয়ে মানুষের এত মুখে মুখে তর্ক করতে নেই।”
ও নিজের চোখ দুটো সরু করে ইউভানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “কেন? মুখে মুখে তর্ক করার জন্য কি এখন আমার জেন্ডার চেঞ্জ করতে হবে নাকি?”
ইউভান নিজের ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে ইয়াশফাকে আরও একটু খ্যাপানোর জন্য সোফায় ওর আরেকটু কাছে সরে আসল। ইয়াশফাও আর এক সেকেন্ড সময় না দিয়ে সোফার একদম শেষ মাথায়, অনেকটা দূরে সরে গেল। ইউভান বলল, “তুমি এত অবাধ্য কেন ইয়াশ?”
‘ইয়াশ’ নামটা ইউভানের মুখে শোনা মাত্রই ইয়াশফার মাথার সব কটা রগ যেন একসাথে চিড়বিড় করে জ্বলে উঠল, পুরো মাথায় আগুন চড়ে গেল ওর। ও আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না। টেবিলের ওপর একটা প্লেটে ফল রাখা ছিল, আর তার পাশেই ছিল একটা ধারালো ফল কাটার ছুরি। ইয়াশফা চোখের পলকে সেই ছুরিটা হাতে তুলে নিল এবং ওটার ফলাটা সজোরে গেঁথে দিল ইউভানের হাতের ওপর!
ইয়াশফা নিজের রক্তচক্ষু নিয়ে ইউভানের একদম চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল “আপনার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হচ্ছি, আমাকে এই নামে ডাকার মতো দুঃসাহস আর কোনোদিন করবেন না। আমি কিন্তু মানুষ ভালো না, নিজের সীমাই থাকুন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে জ্যান্ত পুতে ফেলবো!”
ইউভান পাথরের মতো জমে গেল। ছুড়িটা বেশি জোড়ে লাগে নি, ইউভান আলতো করে ছুড়ি টেনে বের করলো, এরপর ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল এই মেয়ে হুবহু ঋষভের মতো আচরণ করছে কেন? ঠিক ওই চাউনি, ওই একই রকম রক্তচক্ষু আর রাগ!
ইউভান নিজের মনের ভেতরের ধাক্কাটা সামলে নিয়ে হালকা একটু হাসল। ও টেবিল থেকে নিজের চোখটা সরিয়ে মনে মনে বলল, “নিজে চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু বউটাকে নিজের ফিমেল ভার্সন বানিয়ে রেখে গেছে! খোদা, কী চিজ বানাইলা”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬
ইউভান নিজের বসার ভঙ্গিটা একটু সোজা করে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল, “ওকে সুইটহার্ট, আর কোনোদিন বলবো না ওই নামে।”
ইয়াশফা নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে ঠান্ডা গলায় বলল, “আউট!”
ইউভান নিজের ব্যাগ আর স্টেথোস্কোপটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ও ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে একগাল দাঁত কেলিয়ে হেসে বলে গেল,
“ওকে সুইটহার্ট, আমি আবার আসবো। টাটা, আলাবু!”
