Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৫

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৫

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৫
রূপন্তী সরকার

ইয়াশফা ধিরো পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে মিহি হাতে একটা ট্রে নিয়ে বের হলো। ট্রের ওপর ধোঁয়া ওঠা দুটো কফির মগ সাজানো। মিহি ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “ইয়াশফা, এই কফিগুলো একটু ইউভান আর রুহিকে দিয়ে আসো তো মা। ওরা ওপরের ছাদে আছে।”

করিডোরে একটু আগে ঘটে যাওয়া সেই অস্বস্তিকর ঘটনার পর ইয়াশফার আবার ওপরে যাওয়ার একদমই ইচ্ছে ছিল না। ওই বেয়াদব লোকের মুখোমুখি হওয়াটা ওর জন্য বেশ অস্বস্তির। কিন্তু মিহির কথা ও অমান্য করতে পারল না। নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ও আলতো করে মাথা নাড়িয়ে ট্রের হাতলটা ধরল।
সোফায় ওহিদুল সাহেবের সাথে বসে থাকা রিদের তীক্ষ্ণ চোখে ইয়াশফার এই মলিন মুখটা এড়াল না। ওর ছটফটে এটাম বোম এমন চুপচাপ আর শান্ত কেনো? রিদ একটু চিন্তিত হয়ে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চোখ-মুখ এমন শুকিয়ে আছে কেন মা? কী হয়েছে তোমার?”
ইয়াশফা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা আড়াল করার চেষ্টা করল। ও মুচকি হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কিছুই হয়নি বাবা। আসলে মাথাটা কেমন যেন একটু ব্যথা করছে।”
ইয়াশফার মাথা ব্যথার কথা শুনে রিদ সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালল। ও ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“মাথা ব্যথা করছে যখন, তখন তুমি আর ওপরে যেও না। ট্রে-টা ওখানেই রাখো, আমি গিয়ে দিয়ে আসছি। তুমি বরং চুপচাপ নিজের ঘরে যাও, একটু রেস্ট নাও”
ইয়াশফা রিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো ও আর রিদকে কষ্ট দিতে চাইল না। ইয়াশফা নিজের মাথা নেড়ে ট্রে-টা শক্ত করে ধরে বলল, “না বাবা, ঠিক আছে। আমি যেতে পারবো, দিতে এমন কিছু কষ্ট হবে না। আপনি আঙ্কেলের সাথে গল্প করুন।”
কথাটা বলেই ইয়াশফা কফির ট্রে-টা হাতে নিয়ে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ছাদের দিকে রওনা দিল।
ও যখন ছাদের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, তখন বিকেলের হালকা ঠান্ডা হাওয়া ওর মুখে এসে লাগল। ও দেখল ইউভান আর রুহি ছাদের একদম শেষ প্রান্তের রেলিংটার কাছে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গভীর কোনো গল্পে মেতে আছে। ইয়াশফা ওদের আড্ডায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে চাইল না। ও ছাদের মাঝখানে থাকা কাচের টেবিলটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ট্রের থেকে কফির মগ দুটো তুলে, নিঃশব্দে টেবিলের ওপর রাখল।
ইয়াশফাকে কফি রাখতে দেখে ইউভান নিজের কথা থামিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। সিঁড়ির ওই ঘটনার পর ওর নিজেরও কেন জানি একটু খারাপ লাগছিল। একটা বাচ্চা মেয়ের ওপর ওভাবে মেজাজ দেখানোটা একদম ঠিক হয় নি” ও নিজের ব্লেজারের বোতামটা একটু ঠিক করে ইয়াশফার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “কিছু মনে করবেন না, তখনকার ওই ব্যবহারের জন্য। আমার ওভাবে কথা বলা সত্যিই উচিত হয়নি।”
লোকটার কথা শুনে ইয়াশফা শান্ত সুরে জবাব দিল, “আচ্ছা, সমস্যা নেই ভাইয়া। আমি কিছু মনে করিনি।”
রুহিও ওদের কাছে এগিয়ে এল। ও ইয়াশফার এই থমথমে আর গম্ভীর মুখটা দেখে একটু অবাক হলো। ও ইয়াশফার কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ইয়াশফা? মুখটা এমন ভার হয়ে আছে কেন তোমার?”

ইয়াশফা রুহির দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণে একটা চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও মাথা নেড়ে বলল, “আরে না আপু, কিছুই হয়নি। এমনিই মাথাটা একটু ধরেছে, আর কিছু না।”
কথাটা শেষ করেই ইয়াশফা ট্রে-টা হাতে নিয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াল। ঠিক তখনই ইউভান ওকে থামানোর বলে উঠল, “আপনিও আমাদের সাথে কিছুক্ষণ থাকুন না? নিচে গিয়ে একা একা কী করবেন? আসুন, আমাদের সাথে বসুন, একটু গল্প করা যাক।”
ইউভানের কথা শুনে ইয়াশফা থেমে গেলো ও ধীর গলায় বলল, “না ভাইয়া, নিচে আমার কাজ আছে। আপনারা গল্প করুন।”

কথাটা বলেই ও আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। একদম জোড়ে জোড়ে হেটে ছাদের দরজা পেরিয়ে নিচে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ইয়াশফা চোখের আড়াল হতেই ইউভান কফির মগটা হাতে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও রুহির দিকে তাকিয়ে একটু আফসোসের সুরে বলল, “মেয়েটা হয়তো আমার ওপর সত্যিই রাগ করেছে রুহি। তখন মাঝখান থেকে ওভাবে ওকে কথা শোনানোটা আমার একদমই উচিত হয়নি। ও তো না বুঝেই সিঁড়িতে একটা ধাক্কা দিয়েছিল, তাই বলে ওরে আমি অত বড় কথা শুনিয়ে দিলাম?”
রুহি রোহানের দিকে তাকিয়ে নিজের কফি মগে একটা চুমুক দিল। তারপর মুচকি হেসে ইউভানকে বলল, “আরে না ভাইয়া! ও তোমার ওপর রাগ করবে কেন? ওর মাথা ব্যথার জন্যই হয়তো এমন করছে।”
ইউভান ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে নিচে ড্রয়িংরুমের চেনা করিডোরটার দিকে তাকাল। ওর মনের ভেতর কেন জানি মেয়েটার প্রতি একটা কৌতূহল কাজ করছিল। ও রুহির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললো, ” চল, আমরা বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি। এক কাজ কর, ওই মেয়েটাকে আই মিন ভাবীকেও আমাদের সাথে নিয়ে চল। কিন্তু”

রোহান একটু ইতস্তত করে ওর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “ওকে আমাদের সাথে বাইরে নিয়ে গেলে ঋষভ আবার কিছু বলবে না তো? ও যদি রাগ করে?”
রুহি ওনার এই প্রশ্নে একগাল হাসলো। এরপর ইউভানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জবাব দিল,
“নাহ! ঋশ ভাইয়া তো ওকে নিজের বউ বলেই মানে না! ও আমাদের সাথে ঘুরতে গেলে ভাইয়া কিচ্ছু বলবে না, ওসব নিয়ে তুমি একদম চিন্তা করো না।”
রুহির মুখে এই কথা শুনে ইউভান মনে মনে বেশ একটু অবাক হলো। ঋষভ এত মিষ্টি বউকে মানে না? ও হলে তো মানতো, কিউট একটা বাচ্চা বউ, না মেনে কিভাবে থাকে? যাইহোক, ও নিজের মনের ভাব প্রকাশ না করে হাসিমুখে বলল, “ওকে ফাইন, তাহলে। যা, তুইও ঝটপট রেডি হয়ে নে, আর ওকেও রেডি হতে বল।”

রুহি আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। ও সোজা গিয়ে ঢুকল ইয়াশফার ঘরে। ইয়াশফা তখন বিছানায় শুয়ে এক দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের মাথা ব্যথার কষ্টটা কমানোর চেষ্টা করছিল। রুহি ঘরে ঢুকেই কোনো ভূমিকা না করে এদদম ধপাস করে ইয়াশফার পায়ের কাছে এসে বসল। তারপর বেশ আদুরে গলায় বলল, “এই ইয়াশফা! ঝটপট রেডি হয়ে নাও তো। আমরা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসব।”
ইয়াশফা বিছানা থেকে উঠে গেলো, নিজের ক্লান্ত চোখ দুটো বুজে একদম শান্ত গলায় বলল, “নাহ আপু, আমার শরীরটা আসলেই ভালো লাগছে না। মাথাটা বড্ড ধরেছে। তোমরা যাও, ঘুরে এসো।”
রুহি ইয়াশফার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আবদার করে বলল, “প্লিজ ইয়াশফা? একটু চলো না আমাদের সাথে! বাইরে গিয়ে তোমাকে তোমার প্রিয় ফুচকা খাওয়াব, আর আসার সময় চকলেটে ও কিনে দেব, প্রমিজ!”
ইয়াশফা মলিন হাসলো এরপর মাথা নেড়ে বলল, “নাহ, আজকে কিচ্ছু খাব না আমি। তুমি যাও আপু, আমি যাব না।”

রুহি এবার ওর শেষ অস্ত্রটা প্রয়োগ করল। ও নিজের মুখটা একবারে মলিন করে একটু অভিমানী গলায় বলল, “তুমি যদি আজকে আমার সাথে না যাও, তবে আমি ধরে নেব যে তুমি আমার ওপর রেগে আছো! আর আমি মন খারাপ করে বসে থাকব।”
এই বাড়িতে রুহি মেয়েটাকেও ইয়াশফা বড্ড ভালোবাসে। ওর এই মন খারাপের কথা শুনে ইয়াশফা আর নিজের জেদ ধরে রাখতে পারল না। ও একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাধ্য হয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর বাইরে যাওয়ার একদমই ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু রুহির এত জোরজাজুরিতে ও আর না করতে পারল না। ও আলমারি খুলে একদম ছিমছাম একটা বাদামী রঙের শর্ট কুর্তি পরে নিল, যা ওর গায়ের রঙের সাথে একদম নিখুঁতভাবে মানিয়ে গেল। ও নিজের লম্বা, কালো চুলগুলো কোনো ক্লিপ দিয়ে না আটকে পিঠের ওপর ছেড়ে দিল। আর সবশেষে, নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে ছোট্ট একটা টকটকে লাল রঙের টিপ পরে নিল। কোনো বাড়তি মেকআপ ছাড়াই এই বাদামী কুর্তি আর লাল টিপের ছিমছাম সাজে ইয়াশফাকে দেখতে এক মায়াবী রাজকন্যের মতো লাগছিল।
রেডি হয়ে ইয়াশফা ধীরপায়ে রুহির রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ও গিয়ে দেখল রুহিও ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রুহি ইয়াশফার এই রূপ দেখে একদম হাঁ হয়ে গেল! রুহি বললো “তিউট লাগছে,”

রুহি রিদকে বলে, ইয়াশফাকে সাথে নিয়ে সদর দরজা পেরিয়ে বাইরের গেটের দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির সামনে ওদের গাড়িটা স্টার্ট করা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। ড্রাইভিং সিটে ব্লেজার ছাড়া একদম ক্যাজুয়াল শার্ট পরে বসে আছেন ড. রোহান ইউভান। রুহি পেছনের দরজা খুলে ইয়াশফাকে নিয়ে সিটে গিয়ে বসল। গাড়ির লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাতেই ইউভানের নজর আটকে গেল ঠিক পেছনে বসা ইয়াশফার মুখের ওপর। ওর মনে হলো, এই মেয়েটার রূপের মাঝে এক অদ্ভুত মাদকতা লুকিয়ে আছে। ও আড়চোখে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে নিজের মনের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। গাড়ি স্টার্ট নিয়ে ধীরগতিতে রায়ান কুঞ্জের মস্ত বড় গেট পেরিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে চলল। ইয়াশফা জানালার কাচ গলে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইউভান রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামল। ওরা তিনজন গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে ঢুকল। রেস্টুরেন্টের ভেতরের পরিবেশটা বেশ চমৎকার, চারপাশটা একদম শান্ত। ওখানের একটা কোণার টেবিলে গিয়ে ওরা তিনজন বসল। কিন্তু বসার পর থেকেই ইয়াশফা একদম চুপচাপ হয়ে রইল, ওর মুখে কোনো কথা নেই। ইয়াশফাকে ওভাবে পাথরের মতো শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে ইউভান একটু হেসে টেবিলের ওপর হাত রেখে বলল, “কী হলো ইয়াশফা? আপনি একদম চুপ করে আছেন যে? একটুও বকবক করবেন না? প্লিজ, কিছু তো কথা বলুন!”
ইয়াশফা গম্ভীর গলায় চোখের চাউনি তীক্ষ্ণ করে বলল, “কেন? আপনার কী মনে হয় আমি সবসময় শুধু বকবকই করি?”

ইউভান ওর এই ধারালো আর সোজাসাপ্টা জবাব শুনে একটু অপ্রস্তুত হয়েই মৃদু হাসল। ঠিক তখনই ইয়াশফার কেমন যেন একটু অস্বস্তি হতে লাগল। আসলে ও এর আগে কখনো রেস্টুরেন্টে আসেনি, তাই ভেতরের এসি আর চড়া সুবাসে ওর মাথাটা ঘুরে কেমন যেন গা গুলাচ্ছিল। ও টেবিল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে বলল, “রুহি আপু, এক মিনিট। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।”
রোহান ইউভান ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “একা কেন যাবেন? কী দরকার বলুন, আমি সাথে যাচ্ছি চলুন।”
ইয়াশফা হাত তুলে ওনাকে থামিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বলল, “কোনো সমস্যা নেই, আমি একলাই যেতে পারব। এই তো সামনের গেটেই যাব আর আসব, আপনি বসুন।”
রুহি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কই যাচ্ছো রে?”
“আসছি।”

ইয়াশফা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ধীরপায়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে বাইরের খোলা বাতাসে এসে দাঁড়াল। বাইরে আসতেই ওর গা গুলানো ভাবটা একটু কমল। ও শান্ত পায়ে হেঁটে সামনের একটা বড় সুপারশপের সামনে এসে দাঁড়াল।বিকেলের এই সময়ে সুপারশপের সামনে বেশ কিছু মানুষের আনাগোনা ছিল। ইয়াশফা যখন একা দাঁড়িয়ে চারদিকের আলো দেখছিল, ঠিক তখনই ও হঠাৎ অনুভব করল পিছন থেকে কোনো এক অজ্ঞাত ব্যক্তি অত্যন্ত নোংরা উদ্দেশ্যে ওকে ব্যাড টাচ করার চেষ্টা করল!
ইয়াশফা প্রথমবার একদম চুপ করে রইল, কোনো চিল্লাচিল্লি করল না। ও শুধু নিজের চোয়ালটা শক্ত করে দাঁড়িয়ে ওৎ পেতে রইল। ঠিক তার পরের মুহূর্তেই লোকটা যখন সাহস পেয়ে আবারও একই নোংরা কাজ করতে গেল, ইয়াশফা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। ও বিদ্যুতের গতিতে নিজের শরীরটা এক পাক ঘুরিয়ে হাত দিয়েই সজোরে একটা কোপ বসিয়ে দিল লোকটার ওই হাতের কবজি বরাবর!
হাড় মড়মড় করার মতো বিকট শব্দে লোকটা নিজের হাত চেপে ধরে তীব্র যন্ত্রণায় ওখানেই চিৎকার করে রাস্তায় বসে পড়ল। আশেপাশের যত মানুষ, পথচারী ছিল সবাই চমকে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু ইয়াশফা এখানেই থামল না। ও এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় লোকটার শার্টের কলারটা খামচে ধরল। তারপর নিজের গায়ের পুরো শক্তি দিয়ে লোকটাকে মাটির থেকে এক হাত ওপরে তুলে আবার পরক্ষণেই এক আছাড়ে আবার নিচে নামিয়ে দিল!

ঠিক তখনই,রাস্তার মোড় ঘুরে এক বিকট ব্রেক চাপার শব্দে একটা কুচকুচে কালো রঙের ব্ল্যাক মার্সিডিস গাড়ি এসে একদম ওদের গা ঘেঁষে থামল! গাড়ির দরজা খুলে ধীরপায়ে বাইরে বেরিয়ে ঋষভ! ও নিজের অফিস থেকে ফিরছিল, আর মাঝরাস্তায় নিজের বউয়ের এই রণচণ্ডী রূপ ও নিজের চোখে দেখেছে।
ইয়াশফা কলার ছেড়ে দিয়ে সোজা তাকাল ঋষভের সেই জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখের দিকে। ঋষভ গাড়ি থেকে নেমে ইয়াশফাকে একটা কথাও বলল না, ওর দিকে তাকালও না। ও এগিয়ে এসে ইয়াশফার হাত থেকে ওই লোকটার কলারটা নিজের শক্ত মুঠোয় ছিনিয়ে নিল।
ইয়াশফা পুরো চুপ মেরে দাঁড়িয়ে রইল। ঋষভ পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে একটা কল দিল। কোনো কথা না বলে ও শুধু লোকেশনটা জানাল। মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় দুটো কালো গাড়ি এসে থামল আর সেখান থেকে কয়েকজন গার্ড নেমে ওই লোকটাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল।

ঋষভ এবার ইয়াশফার দিকে ঘুরল। ওর চোখের চাউনি তখন রাগে লাল হয়ে এসেছে। ও ইয়াশফার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, “এইখানে কী করছিস? কার সাথে এসেছিস?”
ইয়াশফা জামার হাতাটা একটু টেনে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “রুহি আপু আর একটা লোক।”
‘একটা লোক’
শব্দটা শুনতেই ঋষভের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ও চোখ দুটো সরু করে জিজ্ঞেস করল, “কোন লোক? কোথায় ওরা?”
ইয়াশফা পেছনের রেস্টুরেন্টের দিকে ইশারা করে বলল, “ভেতরে আছে।”
ঋষভ পকেটে থাকা হাতের মুঠিটা শক্ত করল, ওর হাত রাগে কাঁপছিল। ও ইয়াশফার দিকে এক পা এগিয়ে এসে হুট করেই একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, “তুই ক্যারাটে কীভাবে জানিস?”
ইয়াশফা একটু থমকে গেল। ও চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
ঋষভ নিজের ভেতরের অস্থিরতা আর প্রকাশ করল না। ও চোখ থেকে সানগ্লাসটা নামিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কিছু না।”

কথাটা বলেই ও ইয়াশফার হাতটা একপ্রকার খামচে ধরে নিজের গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে গেল। ও ইয়াশফাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ও তীব্র গতিতে রায়ান কুঞ্জের দিকে রওনা দিল।পুরো গাড়ির ভেতর তখন এক দমবন্ধ করা নীরবতা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। ঋষভ স্টিয়ারিং হুইলটা এত শক্ত করে ধরে ছিল যে ওর হাতের আঙুলগুলো সাদা হয়ে আসছিল। ও কিছু একটা চিন্তা করছে, চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, ইয়াশফা বুঝতে পারছে না কি হয়েছে,
রায়ান কুঞ্জের মস্ত বড় গেট দিয়ে গাড়িটা ভেতরে ঢুকতেই ঋষভ কড়া ব্রেক চাপল। গাড়ি থামতেই ও এক ঝটকায় দরজা খুলে নেমে ইয়াশফার পাশের গেটটা খুলে ওর হাতটা ধরল। ও কোনো কথা না বলে, ইয়াশফার হাত ধরে একপ্রকার হিঁচড়ে টানতে টানতে ওপরে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে গেল। রুমে ঢুকেই ও ইয়াশফার হাতটা ছেড়ে দিল, কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার বা বোঝার সুযোগ না দিয়েই সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল ইয়াশফার গালে!

ইয়াশফার মাথাটা ঘুরে গেল, ও টাল সামলাতে না পেরে খাটের ওপর গিয়ে পড়ল। ও তীব্র বিস্ময় আর ব্যথায় চোখ মেলে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তার পরের সেকেন্ডেই ঋষভ ওর ওপর চড়াও হয়ে মুখের ওপর আরেকটা কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দিল! ইয়াশফা নিজের দুই হাত দিয়ে গাল চেপে ধরল। ও নিজের মনেই বুঝতে পারল না হঠাৎ এই লোকের কী হলো?
ঋষভ ইয়াশফাকে ওঠার সুযোগ দিল না। ও খাটের ওপর ঝুঁকে এসে এক হাত দিয়ে ইয়াশফার গলাটা চেপে ধরল। ওর চোখ লাল হয়ে আছে, পুরো শরীর তখন রাগে রি রি করে কাঁপছে। ও হিসহিসানি কণ্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমার পারমিশন ছাড়া তুই এই বাড়ি থেকে বের হয়েছিস কোন সাহসে,?
ইয়াশফা গলা চেপে ধরা অবস্থায় কোনোমতে নিশ্বাস নিয়ে শান্ত কিন্তু কাঁপানো গলায় বলল, ” রুহি আপু যেতে বলেছিল।”
ঋষভ ওর মুখটা নিজের আরও কাছে টেনে এনে বললো “ইউভান তোর কোমর জড়িয়ে ধরল কেন?!”
ইয়াশফা একদম আকাশ থেকে পড়ল। এটা এই লোক কিভাবে দেখলো?. ও নিজের কপাল কুঁচকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল, “কখন?”
“মিথ্যা বলিস না একদম!”

ঋষভ রাগের মাথায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একদম উন্মাদ হয়ে গেল। ও এক ঝটকায় টেবিলের ওপর থাকা ফুলদানিটা তুলে নিয়ে সজোরে ছুঁড়ে মারলো মেঝের ওপর! বিকট শব্দে ফুলদানিটা ভেঙে শত টুকরো হয়ে চারদিকে ছিটকে গেল। ও ওখানেই থামল না, ঘরের দেয়ালের ড্রয়ার আর কয়েকটা কাচের জিনিস লাথি মেরে ভেঙে চুরমার করে দিল। পুরো ঘরটা এক সেকেন্ডে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।জিনিসপত্র ভাঙার পর ও এগিয়ে এসে বিছানায় বসে থাকা ইয়াশফার একদম গায়ের কাছে দাঁড়াল। চিৎকার করে ঘর কাঁপিয়ে বলে উঠল
“ও তোর কোমর জড়িয়ে ধরলো কেন?! আনসার মি, ইডিয়ট! তুই জড়িয়ে ধরতে দিলি কেনো হারামির বাচ্চা? তাড়াতাড়ি বল, আমাকে রাগাস না মেরে ফেলবো কিন্তু”
ইয়াশফা একদম চুপ মেরে রইল। ওর মনের ভেতরের রাগটা তখন একবারে চড়চড় করে ওপরে উঠছিল। ও খুব ভালো করেই জানে, ও যদি এখন পালটা চিৎকার করে বা রাগ দেখাতে যায়, তবে পরিস্থিতি আরও জঘন্য রূপ নেবে। এই মুহূর্তে ঋষভ একটা হিংস্র পশুর মতো হয়ে আছে, ওর ওপর এখন চোটপাট দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। এখানে চালাকি খাটিয়ে সাময়িকভাবে পার পেয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ইয়াশফা নিজের ভেতরের কাঁপনটা কোনোমতে চেপে রেখে শান্ত গলায় বলল, “আমি গোসল করে আসছি।”

কথাটা বলেই ও ঋষভের চোখের সামনে থেকে সরে সোজা ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে দরজাটা টেনে দিল। ও চলে যেতেই ঋষভ বিছানার এক কোণায় ধপাস করে বসল। ওর বুকটা রাগে তখনো কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ও নিজের দুই হাত মুঠো করে দাঁত কিড়মিড় করে মনে মনে বলল, ” ওই বেগুনের বাচ্চার হাত আমি ভেঙে গুঁড়ো করে দেবো!”
ও বিছানায় এক সেকেন্ডও স্থির হয়ে বসতে পারল না। ও ধড়ফড় করে উঠে সোজা ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে সজোরে কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে ইয়াশফা দরজাটা হালকা খুলে দিতেই ঋষভ একপ্রকার ঝড়ের গতিতে ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ও ইয়াশফার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাগি কন্ঠে বললো “জামা তোল!”

ইয়াশফা কোনো মুখে মুখে তর্ক না করে বাধ্য মেয়ের মতো নিজের জামা সামান্য ওপরের দিকে তুলল। ঋষভ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের শক্ত, হাত দুটো দিয়ে ইয়াশফার কোমরের দুপাশ সজোরে, ঘষতে শুরু করল! ও যেন ইয়াশফার চামড়া থেকে ওই ইউভানের স্পর্শের শেষ চিহ্নটুকুও চামড়া ছিঁড়ে তুলে ফেলতে চায়। ঋষভের ওই অমানুষিক টানে ইয়াশফার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে পানিতে ছলছল করে উঠল। ওর মনের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভ আর কষ্ট দানা বাঁধতে লাগলো। ওর কোমরের নরম চামড়াটা ব্যথায় লাল হয়ে যাচ্ছে দেখে ও আর সহ্য করতে না পেরে করুণ সুরে বলল, “ছেড়ে দিন লাগছে আমার!”
ঋষভ ওর এই আকুল মিনতিতেও থামল না, ওর হাত একইভাবে চলতে লাগল। ও দাঁত কিড়মিড় করে হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে বলল, “তোর কলিজার উপর পা তুলে দেবো জানোয়ারের বাচ্চা! পরপুরুষের কাছে যাস তুই? কেনো তুই অন্য একটা পুরুষকে তোকে ছোঁয়ার সুযোগ দিলি?”
ইয়াশফা চুপ করে রইলো,
অনেকটা সময় পর ঋষভ অবশেষে ওকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। তারপর ও ইয়াশফার দিকে আর না তাকিয়ে, ওকে ওই অবস্থায় ওয়াশরুমে রেখেই হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে চলে গেল। ইয়াশফা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ওভাবেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ওর কোমরের দুপাশ অনবরত জ্বলছে, আর ওর কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইয়াশফা ওয়াশরুম থেকে গা মুছে বের হয়ে এলো। ও ধীরপায়ে এসে বিছানার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে বসল। ঋষভ ততক্ষণে ঘরে ফিরে এসেছে, ও জানালার ধারের চেয়ারটায় এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছে। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে, জানালার কাচে বৃষ্টির ফোটাগুলো আছাড় খেয়ে পড়ছে। দেখতে দেখতে চারপাশ একদম কালো করে রাত হয়ে গেছে। ঋষভ চেয়ার থেকে উঠে ধীরপায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এলো। ও ইয়াশফার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আর কখনো ওই বেগুনের বাচ্চার সাথে কথা বলবি?”
ইয়াশফা মাথা নিচু করে শান্ত গলায় জবাব দিল,
“না, আর কখনো কথা বলবো না।”
“আর কখনো আমার পারমিশন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হবি?”
“না, আর বের হবো না। ওয়াশরুমেও যাবো না আপনার পারমিশন ছাড়া!”
ঋষভ একটু থামল। ওর ভেতরের সেই রাগটা থেমে গেলো। ও এক হ্যাঁচকা টানে ইয়াশফাকে বিছানা থেকে তুলে সোজা নিজের কোলের ওপর বসাল। তারপর ওর মুখের একদম কাছে নিজের মুখ নিয়ে, ওর কানের লতিতে ঠোঁট ঠেকিয়ে বেশ জোরালো আর আকুল কণ্ঠে বলল,
“আমাকে ভালোবাসবি ইয়াশ?”
ইয়াশফা ওর চোখের সেই তীব্র চাউনি দেখে নিজের গাল দুটো ফুলিয়ে একটু আমতা আমতা করে বলল,
“হু বাসবো নি একটু”

ঋষভের চোখের কোণায় এক চিলতে নেশাতুর হাসি ফুটে উঠল। ও ইয়াশফার একদম কাছাকাছি নিজের ঠোঁট এনে ফিসফিসিয়ে বলল, ” একটু কেনো? বেশি নয় কেনো?”
কথাটা শেষ করেই ও নিজের মাথা নিচু করে ইয়াশফার বুকে একটা গভীর, চুমু দিল। ইয়াশফা কোনো বাধা দিল না, ও নিজের দুই হাত দিয়ে ঋষভের চওড়া পিঠটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল। ঋষভ ইয়াশফার বুকের মাঝখানে মাথা রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“পেটেও একটা চুমু খাই?”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৪

ইয়াশফা মুখ ফুটে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ঋষভ নিজের মুখটা নিচে নামিয়ে কোমরের ঠিক মাঝখানে, ওর ফরসা পেটের ওপর পরম আবেশে একটা গভীর চুমু বসিয়ে দিল। ইয়াশফার সারা শরীর একবার শিউরে উঠল।পেটে চুমু দেওয়া শেষ করে ঋষভ আলতো করে মাথা তুলল। ও ইয়াশফার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম গম্ভীর গলায় বলল, “আমি কিন্তু তোকে আমার বউ বলে মানি না!”
“তাহলে ছাড়ুন”
ঋষভ আবারো ওর বুকে একটা চুমু দিয়ে বললো “উমম পরে”,

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here