Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩২

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩২

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩২
রূপন্তী সরকার

গাড়ির ভেতর এসি চলছে একদম কনকনে ঠাণ্ডায়,
কিন্তু ঋষভের বুকের ভেতরটা তখন অন্যরকম অনুভূতিতে
ভরা।
ও নিজের এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে আছে, আর অন্য হাত দিয়ে নিজের কোলের ওপর ইয়াশফাকে একদম শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। বুকের মাঝে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা মেয়েটা আচমকা ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠলো। ওর এই ছোট্ট বিড়ালের বাচ্চার মতো ওলটপালট হওয়া দেখে ঋষভ ড্রাইভ করতে করতেই একবার নিচের দিকে তাকালো।

ইয়াশফার নিষ্পাপ মুখটা দেখে ঋষভের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত সুন্দর হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
ও ইয়াশফার কপালে এসে পড়া কয়েকটা অবাধ্য চুল অত্যন্ত আলতো করে সরিয়ে দিল। তারপর নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো, ” অন্য মানুষের বউরা তো বড়ো হয় তাহলে আমারটা এমন বাচ্চা কেনো? শেষমেশ ঋষভ রায়ান চৌধুরীর বউ স্কুলে পড়ে? না মানিনা আমি এই বউকে”
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালানোয় পুরো মনোযোগ দিল।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গাড়িটা একসময় এসে থামলো মস্ত বড় রায়ান কুঞ্জের সদর দরজায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় দুইটার কাছাকাছি।
পুরো বাড়ি নিঝুম, নিস্তব্ধ। ঋষভ গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত সাবধানে, যেন এতটুকু ঝাঁকুনি না লাগে, ইয়াশফাকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। অত রাতে গেটের দারোয়ান ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। ও সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে ইয়াশফাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। গায়ের ওপর পাতলা কম্বলটা টেনে দিয়ে ওর কপালে আলতো করে নিজের হাত রাখলো, গায়ে জ্বর নেই, সব ঠিকঠাক দেখে ও চলে গেলো।
ক্লান্ত শরীরে এক কাপ কফি খাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে ঋষভ যখন ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো, তখন ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় একটা চেনা অবয়ব দেখে ও একটু থমকে দাঁড়ালো। মস্ত বড় সোফাটায় হেলান দিয়ে একাই বসে আছেন রিদ।

ওর হাতে কফির মগ, চোখে অনেক ক্লান্তি ।
ঋষভকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই রিদ কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে হালকা একটু হাসলো। ঋশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কী হয়েছে স্যার? খবর কী? সব ঠিকঠাক?”
ঋষভ রিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পকেটে হাত রেখে শান্ত গলায় জবাব দিল, “হুম, ভালো।”
রিদ কফির মগটা সামনের কাচের টেবিলে রাখলো।
তারপর নিজের কপালে হাত দিয়ে একটু ক্লান্ত সুরে বললো, “সন্ধ্যা থেকে মাথাটা কেমন যেন ভীষণ ব্যথা। আমার মাথাটা একটু টিপে দিবা ঋশ?”

বাবার মুখ থেকে এমন আবদার ভরা কথা ঋষভ সম্ভবত ওর পুরো জীবনে কখনো শোনেনি! রিদ রায়ান চৌধুরী কখনোই কারোর কাছে এভাবে নিজের দুর্বলতা বা আবদার প্রকাশ করেন না। তবে মিহির কাছে করে।
বাবার এই আচমকা কথায় ঋষভের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। ও আর এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে রিদের একদম কাছাকাছি গিয়ে বসলো। তারপর নিজের লম্বা, বলিষ্ঠ হাত দুটো বাড়িয়ে দিল রিদের মাথায়।
ঋষভের শক্ত আঙুলগুলো যখন রিদের চুলে আর কপালে আলতো করে ছুঁয়ে গেল, তখন রিদের চোখের কোণটা কেমন যেন ভিজে উঠলো। ওনার মনে হলো, বহু বছর পর
হয়তো এক যুগ পর ওর ছেলেটা ওনার শরীর স্পর্শ করলো! ওর সেই ছোট্ট ঋশ, যে একদিন ওর আঙুল ধরে ধরে হাঁটতে শিখেছিল, সে আজ কত বড় হয়ে গেছে!
এখন আবার বিয়ে করে একটা ফুটফুটে বউ নিয়ে সংসারও করছে! ভাবা যায়?
ও দুই হাত দিয়ে ঋষভের মুখটা আগলে ধরে নিজের কাছে টেনে নিলেন। তারপর ওর কপালে একটা গভীর চুমু খেলো। ঋষভ সাধারণত ভীষণ গম্ভীর আর রূঢ় স্বভাবের হলেও, বাবার ভালোবাসার সামনে ও এক্দম চুপচাপ শান্ত এক ছোট ছেলের মতো বসে রইলো।

এই মাঝরাতে আলো-আঁধারির মাঝে বাবা আর ছেলেকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখলে যে কেউ এক নজরে বিভ্রান্ত হয়ে যাবে! দুজনের চেহারার কাটিং, চোখের চাউনি আর ঠোঁটের গঠন হুবহু এক রকম। এমনকি বডি ফিটনেসও প্রায় একই রকম চওড়া আর পেশিবহুল। শুধু ঋষভ হাইটে বাবার চেয়ে ইঞ্চি দুয়েক বেশি লম্বা।
বাইরের কোনো মানুষ ওনাদের দেখলে কোনোদিনই বাবা-ছেলে বলবে না, মনে হবে দুই ভাই পাশাপাশি বসে আছে।
ঋষভ নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা কাটিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপর তলা থেকে একটা বুকফাটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো!
নিঝুম রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে সেই কান্নার শব্দটা আর কারোর নয়, ইয়াশফার! ও যেন কোনো এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কে, দুঃস্বপ্নে বা ব্যথায় চিৎকার করে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।
তীক্ষ্ণ কান্নার আওয়াজ কানে যাওয়া মাত্রই ড্রয়িংরুমে বসা রিদ আর ঋষভ—দুজনেরই বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কলিজাটা উড়ে গেলো ওদের।

কান্নার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই রিদ আর ঋষভ ড্রয়িংরুম থেকে একপ্রকার ঝড়ো গতিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ছুটে গেল। ঋষভ ধড়ফড় করে নিজের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, ইয়াশফা বিছানার ওপর গুটিসুটি মেরে বসে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কাঁদছে। ওর পুরো শরীরটা কান্নার তোড়ে কাঁপছে। ঋষভ বিছানার কাছে যাওয়ার সাথে সাথেই ইয়াশফা চোখের পলকে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। ওর শার্টের বুকটা চোখের পানিতে ভিজিয়ে দিয়ে ডুকরে উঠে বললো, “আমার, আমার ম্যাও কই? ও কি মারা গেছে? ওকে কি আর এনে দিবেন না? ওকে আমার কাছে এনে দিন! আমার ম্যাওকে আমার কাছে দিন!
ঋষভ ইয়াশফাকে শান্ত করার জন্য নিজের গলার স্বর নরম করে বললো,
“আরে না, ও মারা যাবে কেনো? ও হসপিটালে আছে, ওর ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। ডক্টর ওকে ইনজেকশন দিয়ে অবজারভেশনে রেখেছে, তাই এক রাত ওখানে থাকতে বলেছে।”
কিন্তু ইয়াশফা কোনো যুক্তি মানতে নারাজ। ও মাথা নেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “না! আমি কিচ্ছু জানি না! আমাকে এখনই ওকে এনে দিন। ওএকা একা ভয় পাচ্ছে। ও আমার কাছেই ভালো থাকবে। আমার ম্যাওকে এনে দিন!”

রিদ ইয়াশফার এই পাগলামি দেখে ওর ভীষণ মায়া হলো।
রিদ ইয়াশফার একদম কাছে এসে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে বললো
, “এটাম বোম শোনো, বিড়াল বেডি এখন এখন ভীষণ অসুস্থ। ও আগে সুস্থ হোক, তারপর ওকে বাসায় আনা হবে। ডক্টরের আন্ডারে না থাকলে ও আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তুমি বরং শান্ত হও, কাল সকালে গিয়ে ওকে দেখে এসো।”
রিদের কথা শুনেও ইয়াশফার জেদ একবিন্দু কমলো না। ও চোখ মুছে নাক টেনে আবার ডুকরে উঠলো,
“না! কাল সকালে কেন? আমাকে এখনই এনে দিন! আমি কিচ্ছু জানি না, আমার এখনই ওকে লাগবে!”
ইয়াশফার এই কান্না আর ছটফটানি দেখে ঋষভের মেজাজটা এবার চড়ে গেল, কিন্তু একই সাথে ওর ভেতরের অস্থিরতাও কাজ করছিল। ও হাল ছেড়ে দিয়ে একটু রুক্ষ স্বরে ধমকে উঠে বললো,
“এই বাল থাম! কান্দিস না, এনে দিচ্ছি ওকে, আর একটা কান্নার শব্দ মুখ থেকে বের হলে কানের নিচে মেরে কান ঝনঝনিয়ে দিবো। স্টুপিড!
কথাটা বলেই ঋষভ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। গভীর রাতে ওই অবস্থাতেই ইয়াশফার জেদ পূরণ করতে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়ির চাবি নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে চলে গেল।
ঋষভ চলে যেতেই ঘরের থমথমে ভাবটা একটু কাটলো। রিদ ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
“ভাগ্যিস সেদিন আমার ছেলের সাথে তোমার বিয়েটা হয়েছিলো! নাহলে তোমার মতো এটাম বোম আমি কোথায় পেতাম?

শ্বশুরের মুখে এমন কথা শুনে ইয়াশফা নিজের কান্না ভুলে গেল। ও চোখ ভরা পানি নিয়েই খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলো। ইয়াশফাকে হাসতে দেখে রিদ ওর পকেট থেকে একটা চকলেটের বক্স বের করে ওর হাতের ওপর রাখলো। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
, “নাও, এবার আর কাঁদো না। লক্ষ্মী মেয়ের মতো চকলেট খাও। আমি আসছি।”
রিদ ঘর থেকে চলে যাওয়ার পর ইয়াশফা চকলেট হাতে ঋষভের ফেরার পথ চেয়ে বসে রইলো। এদিকে ঋষভ এই মাঝরাতে হসপিটালে গিয়ে ডক্টরদের সাথে কথা বলে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে অবশেষে বিড়ালটাকে ডিসচার্জ করিয়ে নিয়ে আসলো। ডক্টর অবশ্য কিছু জরুরি মেডিসিন দিয়ে কড়া করে বলে দিয়েছেন, সকালে যেন অবশ্যই ওকে আবার চেকআপের জন্য আনা হয়।

ঋষভ ঘরে ফিরে ম্যাওকে ইয়াশফার কোলে দিতেই মেয়েটার মুখে যেন চাঁদের আলো ফুটে উঠলো। ও ম্যাওয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে, ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। এতক্ষণের ধকল আর কান্নার ক্লান্তিতে ইয়াশফার চোখ দুটো ঘুমে লেগে আসছিল। বিড়ালটাকে ও নিজের বুকের সাথে শক্ত করে ধরে রাখল। ঋষভ ইয়াশফাকে শান্ত দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে চলে গেল চেঞ্জ করে ঘুমানোর জন্য।
সারা বাড়ির বাতি নেভানো, চারদিক একদম নিঝুম। ইয়াশফার তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা, পুরোপুরি ঘুমায়নি কিন্তু চোখ দুটো বন্ধ। এমন সময় ওর হুট করে মনে হলো, ওর পেটের ওপর কে যেন আলতো করে মুখ ঘষছে। অনুভূতিটা একদম স্পষ্ট! ও ভাবল হয়তো ম্যাও ওর পেটের ওপর উঠে শুয়েছে। ও পাত্তা না দিয়ে চোখ বন্ধ করেই রইল।
কিন্তু একটু পরেই ও টের পেল, কেউ একজন ওর পেটে খুব আলতো করে, পরম আবেশে চুমু খাচ্ছে! ইয়াশফা অনেকক্ষণ ধরে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করল হ্যাঁ, অনুভূতিটা মোটেও ভুল নয়! কেউ একজন সত্যিই ওর পেটে একনাগাড়ে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। গভীর ঘুমের ঘোরে ম্যাও কি এমন করতে পারে?
ইয়াশফা যখন বিষয়টা নিয়ে মনে মনে ভাবছিল, ঠিক তার পরের মুহূর্তেই ও শিউরে উঠল! ও খুব স্পষ্টভাবে ফিল করল, পেটের চামড়ার ওপর কেউ একজন বেশ শক্ত করে কামড় বসিয়ে দিয়েছে! সেই কামড়ের হালকা ব্যথায় ইয়াশফার পুরো শরীর একসাথে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। ও আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ঝট করে চোখ মেলে তাকাল এবং উঠে বসল।

কিন্তু ঘরের আবছা অন্ধকারে চারদিকে তাকিয়ে ওর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। বিছানায় ওর পাশে ম্যাও শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে, আর পুরো ঘরে ও ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মানুষ বা প্রাণীর অস্তিত্বই নেই!তাহলে এই মাঝরাতে ওর পেটে ওভাবে চুমু আর কামড়টা দিল কে?
ইয়াশফা ঘরের আবছা অন্ধকারে চারদিকে আরও একবার ভালো করে চোখ বুলালো। না, কোথাও কেউ নেই! চারপাশটা একদম নিঝুম, সুনসান। ও নিজের পেটের ওপর হাত বুলিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ওর কেন জানি মনে হলো, যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, এই বাড়িতে কোনো একটা অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে আছে। ও বিছানা থেকে নেমে টেবিলের ড্রয়ার থেকে ওর সেই অতি প্রিয় ডায়েরিটা বের করলো। এটা ওকে ওর বাবা দিয়েছে, ও কলম দিয়ে ডায়েরির পাতায় আজকের তারিখ দিয়ে খুব সংক্ষেপে কিছু একটা লিখে রাখলো।

ডায়েরিটা বন্ধ করতেই ইয়াশফার মাথায় হুট করে একটা নতুন চিন্তা খেলে গেল। ও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা ঋষভের রুমের দিকে পা বাড়ালো। করিডোরটা তখন একদম অন্ধকার। ঋষভের ঘরের সামনে গিয়ে দেখলো দরজাটা পুরোপুরি আটকানো নয়, হালকা ভেড়ানো রয়েছে। ও আলতো ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। জিরো ওয়াটের নীলচে আলোর মাঝে দেখা যাচ্ছে সাদা ধবধবে মস্ত বড় বেডে ঋষভ একাই হাত-পা ছড়িয়ে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। ইয়াশফা খাটের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
ঠিক তখনই ঋষভ কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করে আচমকা চোখ মেলে তাকালো। ঘরের মৃদু আলোয় নিজের বিছানার পাশে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলো। পরক্ষণেই ইয়াশফাকে চিনতে পেরে ওর চোখ-মুখ বিরুক্তিতে কুঁচকে গেল। ও বিছানায় উঠে বসে একটু কর্কশ গলায় বললো,
“এই বাচ্চা এতো রাতে আমার রুমে এসেছিস কেনো? চোখে ঘুম নেই? থাপ্পড় চিনিস?”
ঋষভকে ওভাবে হুট করে উঠে বসতে দেখে ইয়াশফা একটুও ভড়কালো না। ও নিজের ভেতরের রাগ আর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিড়ালের মতো গরগর করে বললো, “আমার পেটে কেউ চুমু খেয়েছে, জানেন?
ইয়াশফার মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে ঋষভ একদম আকাশ থেকে পড়লো! ও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ও চোখ দুটো বড় বড় করে অবাক হয়ে বললো, “হোয়াট?! কে চুমু খেয়েছে তোকে?”
ইয়াশফা মুখটা ভীষণ কান্নাভেজা করে বললো, “আমি তো জানি না কে! শুধু চুমু না, দেখুন এইখানে একটা কামড়ও দিয়েছে শয়তানটা!”

কথাটা বলেই ইয়াশফা ওর পরনের ঢিলেঢালা গেঞ্জিটা সামান্য ওপরের দিকে তুলে দেখালো। ঋষভ মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বেলে ইয়াশফার পেটের দিকে তাকাতেই ওর পুরো শরীর রাগে রি রি করে উঠলো। ইয়াশফার ফরসা পেটের চামড়ার ওপর আসলেই একটা জায়গা বেশ লাল হয়ে ফুলে আছে, আর সেখানে স্পষ্ট দুটো দাঁতের নিখুঁত দাগ বসে গেছে!
এই দৃশ্য দেখা মাত্রই ঋষভের মাথার সব কটা রগ একসাথে চিড়বিড় করে উঠলো। মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো ওর।
ওর নিজের বাড়িতে, ওর নিজের বিবাহিত বউকে এত রাতে কার এত বড় সাহস যে ঘরে ঢুকে এমন নোংরামি করে যাবে? রাগে ঋষভের হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। ওর মনে হচ্ছে ইয়াশফার গলাটা টিপে এখনই মেরে ফেলতে! ও ইয়াশফার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বললো, “কোন ছেলে তোকে চুমু খেয়েছে সত্যি করে বল?! কার সাথে তোর এসব চলছে?”
ঋষভ ওভাবে সন্দেহ করতেই ইয়াশফা একদন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। ও রেগেমেগে চিৎকার করে বললো,
“আরে বাড়া! আমি কি জানি নাকি কে খেয়েছে? জানলে তো আমি নিজেই ওরে জুতো দিয়ে দিতাম। আমি কি সাধ করে ওরে কামড় দিতে ডেকেছি? যে আসো আমার পেটে কামড় দাও নাহলে আমার ঘুম আসবে না, সাও থাক আর বললাম না”

ইয়াশফার মুখের এই চড়া জবাব শুনে ঋষভ বুঝতে পারলো মেয়েটা আসলেই সত্যি বলছে। ও একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজের রাগটা কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। তারপর ইয়াশফার ঢিলেঢালা পোশাকটার দিকে তাকিয়ে একটু কড়া গলায় বললো, “কালকে থেকে বাসায় এসব গেঞ্জি টেন্জি পরে ঘুরবি না! ভদ্র জামাকাপড় পরবি, বুঝছিস? এসব গেন্জি পরে পুরো বাড়ি টইটই করে ঘুরতে দেখলে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো”
ঘরের থমথমে পরিবেশটা একটু শান্ত হলে ঋষভ বিছানার একপাশটা ফাঁকা করে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললো “আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এইখানে এসে ঘুমাও। নিজের ঘরে যাওয়ার কোনো দরকার নেই।”
ইয়াশফা প্রথমে একটু ইতস্তত করলো, কিন্তু পেটের ওই কামড়ের ভয় আর মাঝরাতের ওই অনুভূতির কারণে ও আর জেদ দেখালো না। গুটিসুটি মেরে ঋষভের দেখানো পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩১

বিছানার লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে ঋষভ শুয়ে পড়লো ঠিকই, কিন্তু ওর চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেছে। ও সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একনাগাড়ে গভীর চিন্তা করতে লাগলো কে ইয়াশফাকে ওভাবে স্পর্শ করলো? এই বাড়িতে এমন কে আছে যে এত বড় দুঃসাহস দেখালো? ও মনে মনে ইয়াশফাকে যতই নিজের বউ বলে মেনে না নিক, তাই বলে অন্য কেউ এসে ওর ওপর অধিকার ফলাবে আর এমন বেয়াদবি করে পার পেয়ে যাবে? সামনে পেলে কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলবে, সেটা মেয়ে হোক আর ছেলে হোক,”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here