Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৭

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৭

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৭
নাজনীন নেছা নাবিলা

অতীতের সমাপ্তি।
মিহালকে নিজের আশে পাশে না দেখতে পেয়ে মিনা মির্জা ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ আগেও তো ছেলেটা তাদের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। উনি এবং ওনার স্বামী বাকি আত্মীয়দের সাথে গভীর কথাবার্তায় এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, এর মাঝেই ছেলেটি চোখের আড়াল হয়ে কোথায় চলে গেল, তা তারা বিন্দুমাত্র টের পাননি। ছেলেটা এই দেশে একদম নতুন, এর আগে কোনোদিন এখানে আসেনি। যদি অচেনা পরিবেশের বাইরে গিয়ে কোথাও হারিয়ে যায়, অথবা কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যায়। এই অজানা আশঙ্কায় মিনা মির্জার বুকটা কেঁপে উঠল। মিহালকে খুঁজে বের করার জন্য ওনারা তন্ন তন্ন করে পুরো হাসপাতাল চত্বর চষে ফেলতে লাগলেন। পরিবারের কেউ কেউ খোঁজার জন্য নিচে নেমে গেলেন, আবার কেউ কেউ ওপরে অন্য তলায় ছুটে গেলেন। মিনা মির্জা নিজের স্বামীকে সাথে নিয়ে তিন তলার করিডোর ধরে বাকি রুমগুলোর দিকে এগোতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে একদম কোণার রুমটার সামনে এসে ওনারা থমকে দাঁড়ালেন।

সেখানে ওনারা দেখতে পেলেন তাদের ছেলেটি পরম মায়ায় একটি সদ্যোজাত শিশুকে নিজের কোলে নিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের সামনে ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় দেখে মিনা মির্জার ব্যাকুল মনটা অবশেষে শান্ত হলো। তিনি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে প্রায় দৌড়ে ছেলের কাছে গেলেন এবং পরম মমতায় তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। মিহাল মাকে আচমকা জড়িয়ে ধরতে দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। তার ভেতরের শিশু মনটা ভাবল, মায়ের সাথে তো এখন ওনার নিজের ভাইদের, অর্থাৎ ওনার নিজের পরিবারের দেখা হওয়ার একটা মস্ত বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মিনা মির্জা তখন স্বস্তির পরক্ষণেই ছেলেকে অমনোযোগী হওয়ার জন্য বেশ কড়া গলায় বকতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আচমকা এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে মায়ের মনের ভেতর যে ঝড় বয়ে গেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছিল ওনার কথায়। কিন্তু মিহাল মায়ের সেই বকুনিতে বিন্দুমাত্র মন খারাপ করল না। সে কোনো পাল্টা যুক্তি না দিয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে মায়ের সব বকা শুনে গেল। মিহালের বাবাও স্ত্রীর পাশাপাশি ছেলেকে পরম স্নেহে বোঝাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, যাতে ভবিষ্যতে সে আর কখনো বাবা-মাকে না জানিয়ে এভাবে কোথাও চলে না যায়। মা-বাবার সেই বকাবকি আর বোঝানোর পর্বটি শেষ হতেই মিহাল তার কোলজুড়ে থাকা শিশুটির দিকে তাকাল। তারপর নিজের মা-বাবার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কোমল ও উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল,

“মা, বাবা দেখো, এই বাচ্চাটা কত সুন্দর না? ওকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি ওর সাথে একটা ছবি তুলব।”
মিহালের মুখে এমন অদ্ভুত আর আকস্মিক আবদার শুনে ওনার মা এবং বাবা দুজনেই চরম অবাক হলেন। উনারা কোনো হিসাব মেলাতে পারছিলেন না। এই সম্পূর্ণ অপরিচিত শিশুটি কার, আর হঠাৎ করে এই অচেনা শিশুটির প্রতি ওনাদের শান্ত ও গম্ভীর ছেলেটি এতটা ব্যাকুল ও মায়ায় অন্ধ হয়ে পড়ল কেন? তা ভেবে ওনারা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফান রেগে একদম তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে চিৎকার করে বলল,
“এই বাচ্চাটি শুধুমাত্র আমার! তুই ওর সাথে কোনো ছবি তুলবি না। ওর সাথে প্রথম ছবিটা শুধুমাত্র আমিই তুলব।”
ইরফানের এমন অন্যায্য ও অবাধ্য জেদ দেখে মিহালের রাগও একদম মাথায় চড়ে গেল। সে-ও নিজের ভেতরের সমস্ত অধিকার এক করে দিয়ে বেশ কড়া গলায় পাল্টা জবাব দিল,

“তোর অনুমতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। আমার ইচ্ছে হয়েছে, আমি একবার কেন—হাজার বার ওর সাথে ছবি তুলব।ৎওকে তোর আগে যেমন আমি নিজের কোলে তুলে নিয়েছি, ঠিক তেমনি তোর আগে ওর সাথে আমি ছবিও তুলব। শুধু তাই নয়, এই শিশুটিকে তোর আগে আমি চুমুও খাব।”
কথাটি শেষ করতে না করতেই মিহাল কোলজুড়ে থাকা ছোট্ট শিশুটির তুলতুলে গালে পর পর কয়েকটি গভীর ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। মিহালের এমন আকস্মিক ও অভাবনীয় কাণ্ডকারখানা দেখে তার মা-বাবা যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়লেন। ওনারা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আর ওদিকে ইরফানের তো রাগে শরীর কাঁপতে শুরু করল। নিজের পরাজয়টা আরও স্পষ্ট করতে মিহাল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে ছোট্ট শিশুটিকে আরও কয়েকটি আদুরে চুমু খেল।
ইরফানের তীব্র ইচ্ছে করছিল মিহালের কোল থেকে বাচ্চাটিকে এক ঝটকায় কেড়ে নিতে। তার ভেতরে তখন মারাত্মক এক হিংসা আর জেলাস ফিল হচ্ছিল। মিহাল কোলজুড়ে বাচ্চা থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করে নিজের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করল। তারপর সেটি সোজা তার মায়ের হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“মা, আমাদের দুজনের একটা সুন্দর ছবি তুলে দাও তো।”

মিনা মির্জা তো তখন বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছে স্তব্ধ হয়ে আছেন। একটা অচেনা বাচ্চার জন্য নিজের গম্ভীর ছেলের এমন পাগলামি দেখে তিনি পুরোপুরি বাক্যহারা। তবুও ছেলে যখন একই আবদার পর পর কয়েকবার রিপিট করল, তখন তিনি যেন কিছুটা হুশে ফিরলেন। অগত্যা তিনি ফোনটি হাতে নিয়ে ছেলের কোলজুড়ে থাকা সেই মায়াবী বাচ্চাটির সাথে মিহালের কয়েকটি দারুণ ছবি তুলে দিলেন। ছবি তোলা শেষ হতেই মিহাল নিজের মোবাইল ফোনটি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট আবিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
,“আমাদের পুরো পরিবারের একটা ছবি তুলে দাও তো এই বাচ্চাটির সাথে।”
আবিরকে এই কথাটি বলেই মিহাল অত্যন্ত জোর দিয়ে নিজের মা-বাবাকে বলল, ওনারা যেন এখনই এসে তার দুই পাশে দাঁড়ান। মিনা মির্জা এবং মুবিন খান শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলের এমন অবুঝ জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন। ওনারা দুজনে এসে মিহালের দুই পাশে দাঁড়ালেন এবং আবির বেশ মায়ার সাথে তাদের একটি নিখুঁত ফ্যামিলি ছবি তুলে দিল। এভাবেই সম্পূর্ণ অজান্তে, মির্জা বাড়ির সেই ছোট্ট রাজকুমারীর জীবনের প্রথম পারিবারিক ছবিটিতে ফ্রেমবন্দি হয়ে রইল তার ফুফু, ফুফা আর তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা মিহাল খান।

ঠিক তখনই কেবিন রুমের ভারী দরজাটা খুলে গেল, এবং বাইরে বের হয়ে এলেন মির্জা পরিবারের বাকি সদস্যরা। কেবিন থেকে বের হতেই মির্জা পরিবারের তিন ভাই ইমরান মির্জা, নিলয় মির্জা এবং আকাশ মির্জার নজর গিয়ে থমকে গেল মিহালের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিনা মির্জা এবং মুবিন খানের ওপর। এক মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের সেই কোলাহলপূর্ণ করিডোরের পুরো পরিস্থিতি একদম থমকে গেল, যেন চারপাশের সময়টাও থমকে দাঁড়িয়েছে। আজ দীর্ঘ বহু বছর পর তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন, একে অপরের চেনা চেহারাটা দেখছেন। ইমরান মির্জা আজ কত অনেক বছর পর নিজের কলিজার টুকরো ছোট বোন এবং একই সাথে নিজের একসময়ের জান-জিগার বেস্ট ফ্রেন্ড মুবিন খানের মুখটা স্বকণ্ঠে, স্বচক্ষে দেখলেন। এক সুগভীর আবেগ আর নস্টালজিয়ায় ওনাদের সবার চোখের কোণেই নোনা জল জমে উঠল। মিনা মির্জা নিজের ভেতরের এত বছরের জমে থাকা কষ্ট আর ভাইদের দেখার আকুলতা কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি চোখের জল মুছতে মুছতে প্রায় দৌড়ে ওনার ভাইদের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু পরম মায়ায় যেই না তিনি নিজের ভাইদের বুকে জড়িয়ে ধরতে যাবেন, অমনি ওনাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা উনাদের বৃদ্ধা মা প্রচণ্ড জোরে এক ধমক দিয়ে কড়া স্বরে বলে উঠলেন,
“তুই আমাদের জন্য বহু বছর আগেই মরে গিয়েছিস। তাই আজ নতুন করে আমাদের সাথে আর কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করবি না।”

মায়ের মুখ থেকে এমন নির্মম আর বিষাক্ত কথাটি শোনা মাত্রই মিনা মির্জার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওনার চোখের জল এবার অনবরত গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। এই প্রচণ্ড আঘাত আর প্রত্যাখ্যান তিনি ঠিক সহ্য করতে পারলেন না, ওনার পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছিল। মুবিন খান আর এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের স্ত্রীর কাছে ছুটে গেলেন। তিনি মিনা মির্জাকে নিজের দুই বাহুর বন্ধনে অত্যন্ত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন এবং ওনার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। মিহাল কোলজুড়ে থাকা শিশু বাচ্চাটিকে পরম সাবধানে আরেকটু উঁচুতে তুলে নিয়ে বীরদর্পে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। নিজের মায়ের এই অপমান সে সহ্য করতে পারল না। সে অত্যন্ত দৃঢ় অথচ বিনম্র কণ্ঠে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার মাকে কেউ কোনো কড়া কথা বলবে না। আর মামারা, আমার মা প্যারিসে থেকেও প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা দিন তোমাদের ভীষণ মিস করত। সবসময় আমাদের কাছে শুধু তোমাদের ভালোবাসার কথাই বলতো। এখন তো অনেক সময় পার হয়েছে, তোমাদের উচিত এই মিথ্যে মান-অভিমান আর পুরোনো দেয়াল ভেঙে ফেলে মাকে বুকে টেনে নেওয়া।”

ভাগ্নের মুখের এমন পরিপক্ব আর যৌক্তিক কথা শুনে ইমরান মির্জা, নিলয় মির্জা এবং আকাশ মির্জা অনেক কষ্টে নিজেদের চোখের বাঁধভাঙা পানি আটকে রাখলেন। মায়ের কড়া আদেশের সামনে তারা অসহায়, কিন্তু ভেতরের মামাত্ব আর ভাইয়ের টান তো আর অস্বীকার করা যায় না। তিন ভাই মিলে মায়ের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা উপেক্ষা করেই ধীর পায়ে মিহালের একদম কাছে এগিয়ে এলেন। পরম মায়ায় তিন ভাই একসাথে মিহালকে আর ওনার কোলজুড়ে থাকা শিশুটিকে নিজেদের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন। মিহালের মাথায় পরম আদরে চুমু খেলেন তিন ভাই। তারপর ইমরান মির্জা মিহালের কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত নিচু ও ভারী স্বরে ধীরে ধীরে বললেন,
“আমরা এই পরিস্থিতির কাছে বড্ড নিরুপায় রে বাবা! আজ মির্জা পরিবারের এই গুরুভার আর দায়িত্বটা আমরা তোর এই ছোট্ট কাঁধেই দিয়ে গেলাম। আশা করি, তুই যখন বড় হয়ে যাবি, তখন নিজের যোগ্যতা দিয়ে আমাদের ভেতরের এই সব ভুল বোঝাবুঝি আর সমস্যার সমাধান করবি। তোর বড় মামাকে কথা দে যে তুই পারবি।”
মিহাল নিজের বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ম্যাচিউর আর বুদ্ধিমান। বড় মামার চোখের সেই সুগভীর জল আর অসহায়ত্ব দেখে সে মুহূর্তেই বুঝতে পারল, এই কঠোরতার পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনো না কোনো বড় সামাজিক কারণ বা পারিবারিক প্রতিজ্ঞা লুকিয়ে আছে। বড়দের এই জটিল রহস্যকে সম্মান জানিয়ে সে আর কোনো পাল্টা প্রশ্ন করল না, আর কোনো কথাও বলল না। সে কেবল চোখ দিয়ে ওনার বড় মামাকে আশ্বস্ত করল যে, সে এই গোপন দায়িত্ব আজীবন মনে রাখবে।

ঠিক সেই আবেগঘন মুহূর্তেই মিহালের কোলে থাকা পুঁচকে শিশুটি এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। সে মিহালের কোলের ওপরই পরম শান্তিতে প্রস্রাব করে দিল। করিডোরে উপস্থিত সবাই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল মিহালের প্রতিক্রিয়া। যে ছেলেটি সবসময় চরম মাত্রায় হাইজিন মেইনটেইন করে চলে, কাপড়ে সামান্য ধুলোবালি লাগলেও যে তৎক্ষণাৎ জামাকাপড় বদলে ফেলার জন্য ছটফট করে। সেই ছেলেটির পুরো শরীরে এখন একটি সদ্যোজাত শিশুর প্রস্রাব লেগে আছে, অথচ তার মুখে বিরক্তি বা অস্বস্তির বিন্দুমাত্র কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। উল্টো সে নিজের ভেজা কাপড়ের কথা পাত্তাই না দিয়ে, শিশুটির জন্য চরম উদগ্রীব হয়ে বলতে লাগল,
“ও তো প্রস্রাব করে দিয়েছে। ওর গায়ের এই ভেজা টাওয়ালটা এখনই চেঞ্জ করা উচিত, নয়তো ওর ভীষণ ঠান্ডা লেগে যাবে।”

১০ বছরের একটা ছেলের এই অবিশ্বাস্য দায়িত্ববোধ আর মায়া দেখে মিহালের মা-বাবা সহ মির্জা বাড়ির প্রত্যেকে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন। ইমরান মির্জার মন তো এই ভাগ্নের জন্য এক গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভরে উঠল। তিনি আর দেরি না করে মিহালের কোল থেকে অতি সাবধানে শিশুটিকে নিজের হাতে তুলে নিলেন এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের স্ত্রীর কোলে দিলেন। এরপর তিন ভাইয়ের কেউই আর তাদের সেই আদরের বোনের দিকে সরাসরি তাকাতে পারলেন না। আসল কথা হলো, ওনাদের সেই আদরের মিনার চোখের পানি সরাসরি দেখার মতো বুকভরা সাহস বা শক্তি ওনাদের কারোরই ছিল না। ওনারা খুব ভালো করেই জানতেন, বোনের এই অবিরত কান্নার ধারা ওনাদের ভেতরের কঠোরতার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দেবে‌‌ অথচ ওনারা এই মুহূর্তে নির্মম পরিস্থিতির শিকার। মিহাল পরিস্থিতিটা কিছুটা আঁচ করতে পারলেও সে এটাও বুঝতে পারল যে, এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো কিছুই আর ঠিক করা সম্ভব নয়।পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে উঠেছে। তার নানু তখনো কঠোর মুখে তার মাকে একের পর এক নির্মম কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে মায়ের বুকফাটা কান্না, আর অন্যদিকে বড়দের এই চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে ভয় পেয়ে সেই নীল তোয়ালে জড়ানো ছোট্ট শিশুটি তীব্র চিৎকারে কেঁদে চলেছে। নিজের জীবনে অত্যন্ত আপন এই দুই নারীর যুগপৎ কান্না মিহালের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে কোনো কিছু ঠিক করা সম্ভব নয়, তাই আপাতত মাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সে একছুটে তার কান্নারত মায়ের কাছে চলে এলো। ওনার হাত দুটো শক্ত করে ধরে সান্ত্বনার সুরে বলতে লাগল,

“মা, চলো। আমাদের আর এখানে এক মুহূর্তও থাকার প্রয়োজন নেই। এতগুলো বছর যেহেতু তুমি ধৈর্য ধরেছ, আর মাত্র কয়েকটা বছর একটু ধৈর্য ধরো। আমি বড় হয়ে সব কিছু ঠিক করে দেব, তোমাকে কথা দিচ্ছি। প্লিজ মা, তুমি আর কান্না কোরো না। তোমার কান্না আমি একদম সহ্য করতে পারি নাঋ আর ওই ওপাশে থাকা ছোট্ট শিশুটার কান্নাও আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলছে। প্লিজ, চলো এখান থেকে।”
মিহাল কথাগুলো অত্যন্ত আবেগের সাথে তার মাকে বলে আবার তার মামাদের দিকে তাকাল। নিজের চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু মুছে সে অত্যন্ত আকুল স্বরে ওনাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“প্লিজ মামা, এবার অন্তত তোমরা থামো। তোমাদের এই জেদের কারণে তোমাদের নিজের বোন এবং ওই নিষ্পাপ শিশুটি ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। আগে আমি শুধু আমার মায়ের কষ্ট দেখতে পারতাম না, কিন্তু আজ এই হাসপাতালে এসে আমার মা সহ ওই নিষ্পাপ শিশুটির কষ্টও আমি আর সহ্য করতে পারছি না। প্লিজ, তোমরা এবার থামো।”
মিহালের কণ্ঠের এমন সুগভীর আকুতি আর হাহাকার শুনে করিডোরে উপস্থিত মির্জা পরিবারের প্রত্যেকের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু মিনা মির্জা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি চরম বিস্ময়ে নিজের চোখের পানি মুছে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,

“আমার যে ছেলে নিজের আত্মসম্মানের কারণে কখনো কারো সামনে আজ পর্যন্ত এই ‘প্লিজ’ শব্দটি ব্যবহার করেনি, সে আজ আমার জন্য এবং এই শিশুটির কষ্টের জন্য এই শব্দটি উচ্চারণ করল!”
মিহালের এই অভাবনীয় আচরণ আর অধিকারের টান যেন মিনা মির্জার মনের সব গ্লানি এক মুহূর্তে ধুয়েমুছে সাফ করে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন, তার ছেলে আসলেই এক অনন্য হৃদয়ের অধিকারী হয়ে বড় হচ্ছে। মিনা মির্জার এই বিস্ময়ভরা কথা শুনে সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন নতুন করে মিহালের দিকে তাকালেন। মিনা মির্জা নিজের অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো ছেলের মায়াবী মুখের ওপর স্থির রেখে আরও বলতে লাগলেন,
“ছোটবেলা থেকেই ওর ব্যক্তিত্ব আর মনোভাব একদম ভিন্ন ছিল। কারো সামনে মাথা নত করতে ও কখনো রাজি হতো না; কাউকে ‘প্লিজ’ বলা কিংবা ‘সরি’ বলা ওর ডিকশনারিতেই ছিল না। অথচ আজ ও এভাবে সবার কাছে অনুরোধ করছে। আমি আমার ছেলের এই অনুরোধ কোনোভাবেই ফেলতে পারব না। চলো মিহালের বাবা।”
কথাটি বলেই তিনি এগিয়ে গেলেন এবং নিজের বড় ভাইয়ের স্ত্রীর কোল থেকে অত্যন্ত পরম মায়ায় সেই নীল তোয়ালে জড়ানো ছোট্ট শিশুটিকে একবার নিজের বুকে তুলে নিলেন। শিশুটির কপালে এক দীর্ঘ ভালোবাসার চুমু এঁকে দিয়ে ওনার ভাবীকে বললেন,

“ওকে সাবধানে রেখো ভাবি।”
এরপর শিশুটিকে আবার ওনার কোলে ফিরিয়ে দিয়ে, নিজের স্বামীর হাত শক্ত করে ধরে এক মুহূর্তও আর পেছন না তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। মিহাল কিন্তু তখনো সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মা-বাবা কিছুটা এগিয়ে যেতেই সে অত্যন্ত ধীর কিন্তু দৃঢ় পায়ে নিজের বড় মামা ইমরান মির্জার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
এরপর মিহাল শিশুটির তুলতুলে ছোট্ট হাতটি নিজের হাতের মাঝে নিল, সেখানে আলতো করে একটি বিদায়ী চুমু খেল। তার ঠোঁট দুটো তখন শিশুটির কানের খুব কাছে। সে একদম নিচু স্বরে, অত্যন্ত গভীর এক প্রত্যয় নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৬

“খুব শীঘ্রই আমাদের আবার দেখা হচ্ছে, নীলাঞ্জনা। এভাবেই দেখা হলে কোনো ছুতায় আমার প্যান্ট ভিজিয়ে দিও। তাহলে চিনে যাব তোমাকে।”
কথাটি শেষ করেই মিহাল আর এক সেকেন্ডও সেখানে কালক্ষেপণ করল না। নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ আর ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য বন্ধন বুকে নিয়ে, সে-ও দ্রুত পায়ে তার মা-বাবার পেছন পেছন হাসপাতালের সেই করিডোর মাড়িয়ে চলে এলো।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here