নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৬
নাজনীন নেছা নাবিলা
মিহালরা যখন হাসপাতালের করিডোর মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাল, ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১১টা বেজে গেছে। তার দাদার কেবিনটি ছিল ঠিক তিন তলার ৩০০ নম্বর রুমে। বাংলাদেশে নেমেই তারা প্রথমে সেখানে গেল। দাদার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মিহাল দেখল, ওনার শারীরিক অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো। কেবিনের ভেতরে মিহালের বাবার বাড়ির বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। দাদাকে মূলত একদিন আগেই এখানে ভর্তি করা হয়েছিল, প্যারিস থেকে রওনা দিয়ে মিহালদের পৌঁছাতে পৌঁছাতেই যা একটু দেরি হয়ে গেল। অবশ্য ডাক্তার জানিয়েছেন, দাদা যেহেতু এখন পুরোপুরি সুস্থ, তাই আর কিছুক্ষণ পরেই ওনাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও মিহালের মনটা কোনো কিছুতেই বসছিল না। তার ভেতরে এক তীব্র ছটফটানি আর সুগভীর হাহাকার।
তার মামার বাড়ির এত কাছাকাছি এসেও সে কি কারোর দেখা পাবে না? আজীবন কি তবে ওনার মামাদের শুধু মায়ের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা ওই পুরনো ছবিগুলোতেই দেখে যেতে হবে? মামাদের সাথে কি তার মায়ের সম্পর্কটা কোনোদিনও আর জোড়া লাগবে না? মায়ের চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই চেনা কষ্টটা মিহাল যে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। মিহাল যখন নিজের মনের এই গভীর ভাবনার জালে পুরোপুরি বন্দি, ঠিক তখনই তিন তলার একদম কোণার দিকের একটা কেবিন থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করল। হাসপাতালজুড়ে কত বাচ্চার কান্নাই তো শোনা যায়, কিন্তু কেন জানি না এই বিশেষ বাচ্চাটার কান্নার তীব্র আওয়াজ মিহালের বুকের ভেতরটা একদম ওলটপালট করে দিল। এক অদ্ভুত একাত্মতায় তার মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। সে আড়চোখে তার মা-বাবার দিকে তাকিয়ে দেখল, ওনারা তখনো বাড়ির অন্য আত্মীয়দের সাথে দাদার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর কথাবার্তায় ব্যস্ত। মা-বাবার এই অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে মিহাল ধীর পায়ে সেই কোণার রুমটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। করিডোরের সাদা দেয়ালগুলো পেরিয়ে সে যতই সেই নির্দিষ্ট কেবিনটার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, এক অজানা এক অনুভূতিতে তার বুকের ভেতরের ধুকধুকানিটা তত বেশি তীব্রতর হয়ে উঠছিল। যেন ওই বন্ধ দরজার ওপারেই লুকিয়ে আছে তার জীবনের কোনো এক মস্ত বড় বিস্ময়।
মিহাল ধীর পায়ে এগোতে এগোতে অবশেষে সেই নির্দিষ্ট কেবিনটার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে পৌঁছাতেই সে দেখল, বেশ কিছু মানুষ দরজার সামনে উৎসুক হয়ে ভিড় করে আছেন। ভিড়ের মাঝে তার নজরে পড়ল দুটি ছোট ছেলে, বয়সে নিশ্চিত ভাবেই তারা মিহালের চেয়ে ছোট হবে। তাদের সাথে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মহিলা, তিনজন পুরুষ আর একজন বয়স্কা বৃদ্ধা। কিন্তু তারা সবাই কেবিনের দরজার দিকে মুখ করে থাকায় মিহাল এখনো কারোরই চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না। সে কৌতূহল নিয়ে আরও একটু সামনে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে একজন নার্স ফুটফুটে এক সদ্যোজাত শিশুকে কোলে নিয়ে বাইরে বের হয়ে এলেন। শিশুটি তখনো তারস্বরে কেঁদে চলেছে। বাচ্চাটিকে দেখা মাত্রই সেখানে উপস্থিত সবাই সমস্বরে এক পরম তৃপ্তিতে বলে উঠলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ!”
সাথে সাথে সেই পুঁচকে অতিথিকে নিজের কোলে নেওয়ার জন্য সবার মাঝে এক আনন্দময় কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। মিহাল করিডোরের এক কোণে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যটি উপভোগ করতে লাগল। একটা ছোট্ট শিশুকে কেন্দ্র করে এতগুলো মানুষের এমন নিঃশর্ত আনন্দ আর মাতামাতি দেখে তার ভেতরের নিষ্পাপ মনটা এক অজানা সুখে ভরে উঠল। আর কেন জানি না, তার নিজের ভেতরের অবুজ মনটাও প্রবলভাবে চাইল, যদি সে-ও একবারের জন্য হলেও এই বাচ্চাটিকে নিজের কোলে তুলে নিতে পারত! ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন পুরুষ মানুষ সবার আগে বাড়িয়ে দিয়ে নার্সের কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। পরম আদরে শিশুটির দিকে তাকিয়ে তিনি বেশ অধিকার খাটিয়ে আনন্দিত স্বরে বললেন,
“আমি ওর বাবা! তাই সবার আগে কোলে নেওয়ার অধিকারটা কিন্তু আমারই।”
কথাটি বলতে বলতেই সেই ভদ্রলোক যখন ঘুরে পেছন ফিরলেন, তখনই মিহাল লোকটির মুখাবয়ব একদম স্পষ্ট দেখতে পেল। আর সেই মুখটি দেখা মাত্রই মিহালের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা বিদ্যুতের তীব্র তরঙ্গ বয়ে গেল। লোকটিকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র সময় বা অসুবিধে হলো না। কারণ প্যারিসের ঘরের ড্রয়ারে যত্নে রাখা মায়ের সেই পুরোনো পারিবারিক অ্যালবামের প্রতিটি ছবি মিহালের মনের মণিকোঠায় খোদাই করা ছিল। এই অবিকল চেহারাটিকেই সে ছবিতে বারবার দেখেছে। তার মা পরম মায়ায় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেছিলেন, এই মানুষটি হলেন মিহালের মেজ মামা নিলয় মির্জা। নিজের আপন মেজ মামাকে এভাবে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিহাল চরম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। তার চোখের কোণটা জলোচ্ছ্বাসের মতো ভিজে উঠল। এতক্ষণ ধরে সে মনে মনে আল্লাহর দরবারে যে বিনীত আকুতি জানাচ্ছিল, অবশেষে সেই দোয়া এত অলৌকিকভাবে পূরণ হলো। তার তীব্র ইচ্ছে করছিল এখনই দৌড়ে গিয়ে মামা কে জড়িয়ে ধরতে, ওনাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে, ‘আমি আপনার বোনের ছেলে মিহাল।’ কিন্তু নিজের বয়সের চেয়েও এক অদ্ভুত পরিপক্বতা দেখিয়ে সে অনেক কষ্টে, নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সেই উপচে পড়া আবেগ আর কান্নার বেগ নিয়ন্ত্রণ করল। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মেজ মামা আর ওনার কোলে থাকা সেই কান্নারত পুঁচকে মেয়েটির দিকে।
মেজো মামা নিলয় মির্জা কোল বদল করে যখন শিশুটিকে পরম আদরে আগলে রেখেছিলেন, ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় মামা ইমরান মির্জার চোখ গেল হঠাৎ তাদের কিছুটা অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত মায়াবী ছেলের দিকে। ছেলেটির শান্ত, গভীর চোখ দুটোর দিকে তাকানো মাত্রই ইমরান মির্জার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এই চোখ যে একদম ওনার সুদূরে হারিয়ে যাওয়া ছোট বোনের মতোন। এই পরিচিত হরিণ-চোখ চিনতে ইমরান মির্জার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। এক লহমায় ছোট বোনের সেই পুরোনো স্মৃতি, রাগ আর অভিমানের দেয়াল ভেঙে ওনার চোখের কোণে নোনা অশ্রু জমে গেল। এদিকে মিহাল অপলক দৃষ্টিতে দেখল, তার মেজো মামার কোল থেকে একে একে বাড়ির সবাই সেই সদ্যোজাত শিশুটিকে কোলে নিয়ে আদর করছে। সবার হাত ঘুরে শিশুটি যখন আবার ইমরান মির্জার কোলে ফিরে এলো, তখন মিহালের ভেতরে এক তীব্র অবাধ্য ইচ্ছে জেগে উঠল বাচ্চাটিকে নিজের বুকে জড়ানোর। কিন্তু সে তো এই পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ এক অচেনা আগন্তুক! তীব্র দ্বিধা আর বুকের ভেতর একরাশ ধুকধুকানি নিয়ে সে পা বাড়াল তাদের দিকে। ধীর পায়ে এগিয়ে সে যখন বড় মামা ইমরান মির্জার একদম সামনাসামনি এসে দাঁড়াল, তখন সে শিশুটির মুখটা প্রথমবার খুব কাছ থেকে দেখতে পেল। ওহ, কী অপূর্ব সুন্দর আর নিষ্পাপ এক মায়াবতী! বাচ্চাটির নরম শরীরটা একটা গাঢ় নীল রঙের টাওয়ালে জড়ানো ছিল। মির্জা বাড়ির উপস্থিত সবাই তখন আনন্দের জোয়ারের মাঝেই হঠাৎ এই অপরিচিত, সুন্দর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই আনন্দের মুহূর্তে কে এই বালক, যে তাদের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে? মিহাল নিজের কণ্ঠস্বরে পৃথিবীর সমস্ত কোমলতা উজার করে দিয়ে, বড় মামার চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম অনুরোধের স্বরে বলল,
“আমাকে একটু দিবেন? আমি এই শিশুটিকে একবার কোলে নিতে চাই।”
উপস্থিত সবাই এক অপরিচিত, অচেনা ছেলের মুখে এমন আকুল আবদার শুনে বেশ অবাক হলেন। কিন্তু কেন জানি না, ছেলেটির চোখের সেই গভীর চাউনি আর মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে উপস্থিত কারোর মনেই কোনো সন্দেহ জাগল না, উল্টো এক অদ্ভুত ভালোবাসার মায়া লেগে গেল সবার মনে। ইমরান মির্জা মুচকি হেসে সেই অচেনা ছেলেটির বাড়িয়ে দেওয়া ছোট্ট দুটি হাতের ওপর নিজের সদ্যোজাত ভাতিজিকে আলতো করে তুলে দিলেন। মিহাল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও ভঙ্গুর কোনো ধন হাতে পেয়েছে! সে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করে, নিজের বুক দিয়ে আগলে সেই নীল টাওয়ালে জড়ানো শিশু মেয়েটিকে নিজের ছোট্ট কোলে তুলে নিল। ঠিক সেই জাদুকরী মুহূর্তেই, ভিড় ঠেলে বছর আটেকের এক দুর্দান্ত ছেলে তার একদম সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটি আর কেউ নয়, স্বয়ং ইরফান। সে মিহালের দিকে তীব্র এক রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুক ফুলিয়ে বলে উঠল,
“এই ছেলে! তুই এই বাচ্চাটিকে আমার আগে কেন স্পর্শ করেছিস? ও আমার। আমি আগে নিব ওকে, দে বলছি।”
মিহাল নিজের কোল থেকে নীল তোয়ালে জড়ানো পুঁচকে শিশুটিকে হাতছাড়া না করে সোজা তাকাল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির দিকে। অবয়ব দেখে আন্দাজ করা যায়, ছেলেটি বয়স আর উচ্চতায় তার চেয়ে অন্তত দুই-তিন বছরের ছোট হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রথম দেখাতেই ছেলেটির চোখের চাউনি আর অবাধ্য জেদ মিহালের কাছে কেমন যেন সুবিধার ঠেকলো না। অবচেতন মনেই তার ভেতর এক অদ্ভুত প্রতিরোধী মনোভাব জেগে উঠল। সে-ও নিজের ভেতরের সমস্ত অধিকার আর দৃঢ়তা এক করে দিয়ে, শিশু বাচ্চাটির প্রতি এক অদৃশ্য মালিকানা খাটিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
“এই বাচ্চাটিকে তোর আগে আমি নিজের কোলে তুলে নিয়েছি, তার মানে এই বাচ্চাটি এখন থেকে শুধুই আমার।”
করিডোরে উপস্থিত মির্জা পরিবারের সবাই এক অচেনা, অপরিচিত বালকের মুখে এমন সগর্ব আর অধিকারসূচক কথা শুনে চরম অবাক হলেন। একজন সম্পূর্ণ অচেনা ছেলে কীভাবে একটি সদ্যোজাত শিশুর ওপর এমন দাবি খাটাত পারে, তা ভেবে যখন সবাই স্তম্ভিত, ঠিক তখনই বড় মামা ইমরান মির্জার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটির এই অদম্য জেদ আর কথা বলার ভঙ্গি যে ওনার সেই হারিয়ে যাওয়া বোনের অবিকল প্রতিচ্ছবি। ইরফান এই জবাব শুনে অপমানে আর রাগে একদম অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। সে মিহালকে লক্ষ্য করে পাল্টা আরও কিছু কড়া কথা বলতে যাবে, ঠিক তখনই পাশ থেকে তার বাবা অর্থাৎ মিহালের বড় মামা গম্ভীর স্বরে তাকে থামিয়ে দিলেন,
“ইরফান, চুপ করো! ও ছোট মানুষ, ওর সাথে এভাবে অভদ্রতা করতে নেই।”
বাবার এমন শাসনে ইরফানের ভেতরের রাগটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে মিহালের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের আপন চাচাতো বোনকে সে সবার আগে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বীরত্ব দেখাতে চেয়েছিল, অথচ তার চোখের সামনে সম্পূর্ণ বাইরের একটা ছেলে এসে শিশুটিকে নিজের বুকে জড়িয়ে ফেলল। এই চরম পরাজয় আট বছরের ইরফানের অহংকারে মারাত্মকভাবে আঘাত করল। সে কোনোভাবেই এই দৃশ্য সহ্য করতে পারছিল না। আর ওদিকে মিহাল নিজের কোল ঘেঁষে থাকা সেই ছোট্ট শিশুটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ অনুভব করছিল, যেন এই মেয়েটি আসলেই চিরকালের জন্য তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
নিলয় মির্জা কেবিনের ভেতরে চলে গেলেন নিজের অসুস্থ স্ত্রীকে দেখার জন্য। ওনার দেখাদেখি ওনার পেছনে পেছনে বাড়ির বাকি সদস্যরাও এক এক করে কেবিনের ভেতরে ঢুকতে লাগলেন। করিডোরে তখন শুধু দাঁড়িয়ে রইল ইমরান মির্জা আর কোলজুড়ে শিশুটিকে আগলে রাখা মিহাল। ইমরান মির্জা অত্যন্ত পরম মায়ায় এই অপরিচিত ছেলেটির দিকে তাকালেন, তারপর চিবুক ছুঁয়ে নরম গলায় নাম জিজ্ঞেস করতেই মিহাল স্পষ্ট স্বরে বলল,
“আমার নাম মিহাল খান।”
ইমরান মির্জা ভেবে মুচকি হেসে বললেন,
“চলো বাবা, তুমিও ওকে কোলে নিয়ে আমাদের সাথেই কেবিনের ভেতরে এসো।”
বড় মামার এমন আন্তরিক আমন্ত্রণে মিহালের মনের ভেতরের সব দ্বিধা কেটে গেল। সে পরম সাবধানে বাচ্চাটিকে বুকে চেপে ওনার সাথে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল। আর ওদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফান নিজের মনে মিহালকে অনবরত বকতে বকতে, রাগে ফুসতে ফুসতে সবার শেষে কেবিনের ভেতরে পা রাখল। ভেতরে গিয়ে মিহাল এক অদ্ভুত সুন্দর পারিবারিক আবহের মুখোমুখি হলো। বাড়ির সবাই তখন সদ্য মা হওয়া মহিলা কে নিয়ে ব্যস্ত, আর ওপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে তুমুল উৎসাহে আলোচনা করছে, এই পুঁচকে সোনাটাকে কে কীভাবে আদর দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে বড় করবে। এই নিখাদ পারিবারিক দৃশ্যটা দেখে মিহাল ভেতরে ভেতরে মারাত্মক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা এক সুগভীর হাহাকারে মোচড় দিয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, আজ যদি তার মা-বাবার সাথে পরিবারের এই দূরত্বটা না থাকত, তবে সে-ও তো আজ এই মির্জা বাড়ির একজন হয়ে মামা-মামীদের এমন অফুরন্ত ভালোবাসা বুকে নিয়ে বড় হতে পারত! মিহাল যখন নিজের এই ইমোশনাল ভাবনায় ডুব দিয়েছে, ঠিক তখনই তার কোলে থাকা নীল তোয়ালে জড়ানো বাচ্চাটা চারপাশের এত মানুষের শোরগোলে আচমকাই আবার তারস্বরে কাঁদতে শুরু করল। মিহাল আলতো করে শিশুটিকে একটু দুলিয়ে নিয়ে বড় মামার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওকে কি একটু বাইরে নিয়ে যাব? এখানে সবাই মিলে একসাথে কথা বলছে বলে হয়তো ও ভয় পাচ্ছে।”
ইমরান মির্জা ছেলেটির এমন বিচক্ষণতা দেখে বেশ প্রীত হলেন। তিনি নিজের ভাইয়ের ছেলে আবির আর নিজের ছেলে ইরফানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কিন্তু স্নেহশীল স্বরে বললেন,
“ইরফান আর আবির, তোমরা দুজনে মিহালের সাথে বাইরে যাও। আমরা একটু পরেই আসছি। আর মিহাল, তুমি কিন্তু ওকে খুব সুন্দর করে সাবধানে কোলে রেখো।”
মিহাল মাথা নেড়ে সায় দিয়ে অত্যন্ত আলতো পায়ে বাচ্চাটিকে নিয়ে কেবিনের বাইরে চলে এলো। আর তার পেছনে পেছনে একরাশ অসন্তোষ নিয়ে ইরফান এবং কিছুটা কৌতূহল নিয়ে ছোট আবিরও করিডোরে বেরিয়ে এলো। হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ করিডোরে, তিন জন বালকের প্রহরায় তখন নিশ্চিন্তে কেঁদে চলেছে মির্জা বাড়ির ছোট্ট রাজকুমারী।
মিহাল বাচ্চাটিকে নিয়ে কেবিনের বাইরে পা রাখতেই ইমরান মির্জার স্ত্রী বেশ চিন্তিত মুখে নিজের স্বামীর দিকে ঘুরলেন। ক্ষোভ আর শঙ্কা মেশানো গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“আচ্ছা, তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, অচেনা ছেলের কোলে আমাদের বাড়ির এতটুকু একটা মেয়েকে ছেড়ে দিলে? যদি কোনো ক্ষতি করে বসে? তার ওপর সাথে পাঠিয়েছো বাড়ির আরও দুটো ছোট সদস্যকে। তুমি নিজে ওদের সাথে বাইরে গেলেও তো পারতে।”
কেবিনের ভেতরের আনন্দঘন আবহটা এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাড়ির সবাই এখন কৌতূহল আর সংশয় নিয়ে ইমরান মির্জার দিকে তাকিয়ে রইল, সবাই ওনার উত্তরের অপেক্ষায় অধীর। ইমরান মির্জা সবার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে বুক চিরে এক সুগভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তিনি অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর স্বরে বলতে লাগলেন,
“আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে… এই ছেলেটি আমাদের মিনুর ছেলে। যখন আমি একটু আগে হাসপাতালের বারান্দায় গিয়েছিলাম, তখন দূর থেকে এই ছেলেটিকে তার পরিবারের সাথে ভেতরে আসতে দেখেছিলাম। ছেলেটির সাথে যে মহিলাটি ছিলেন, ওনাকে দূর থেকে হুবহু আমাদের মিনুর মতোই লাগছিল। কিন্তু তখন আমি ভালো করে মুখটা দেখতে পারিনি বলে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে এখন যখন ছেলেটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল, ওর চোখ দুটো লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওর চোখের মণির সাথে আমাদের মিনুর চোখের হুবহু মিল। আর কেন জানি না, ছেলেটার দিকে তাকালেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত নাড়ির টান অনুভব করছি।”
ইমরান মির্জার এই চটজলদি ও আবেগঘন বিশ্লেষণ শুনে কেবিনের প্রতিটি মানুষ এক পরম বিস্ময়ে থমকে গেলেন। মেজো ভাই নিলয় মির্জা এবং ছোট ভাই আকাশ মির্জা দুজনেই এতক্ষণ মনে মনে ভাবছিলেন, কেন ওই অচেনা বালকটির প্রতি তাদের নিজেদের ভেতরেও এক আলাদা, তীব্র টান তৈরি হচ্ছিল। এখন বড় ভাইয়ের মুখের এই কথাটি শুনে তারা রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লেন। তবে কি আসলেই ওই মায়াবী বাচ্চাটি তাদের কলিজার টুকরো বোন মিনুরই ছেলে? তাদের সেই আদরের মিনু কি তবে এত বছর পর এই বাংলায়, তাদের এত কাছাকাছি ফিরে এসেছে?
ঠিক তখনই ঘরের কোণে এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা ইমরান মির্জার বৃদ্ধা মা তীব্র এক ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। ওনার জরাজীর্ণ কণ্ঠে যেন এক বজ্রপাত হলো। তিনি কঠোর ও কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন,
“ওই অলক্ষীর কথা আজ থেকে কেউ তোরা আর এই মুখে নিবি না। ও যদি এই দেশে ফিরেও আসে, আর তোরা যদি নিজেরা গিয়ে ওর সাথে কোনো রকমের কথা বলিস বা যোগাযোগ রাখিস, তবে আজই তোরা আমার মরা মুখ দেখবি। আমি মরে যাওয়ার পর তোরা যা খুশি তাই করিস, কিন্তু আমি যতদিন জীবিত আছি, এই মির্জা বাড়িতে ওই মেয়ের নাম আর কেউ উচ্চারণ করবি না। যেই মেয়ে একদিন নিজেদের জাত-কূল আর পরিবারের সম্মানের কথা বিন্দুমাত্র ভাবেনি, সেই পাপিষ্ঠ মেয়ের কথা আজ আমাদেরও ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই।”
মায়ের এমন ভীষণ আর অনমনীয় কণ্ঠস্বর শুনে কেবিনের ভেতরের সমস্ত গুঞ্জন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রতিটি মানুষ যেন নিজের জায়গায় জমে বরফ হয়ে গেলেন। মায়ের এই চূড়ান্ত আর কড়া মুখের ওপর প্রতিবাদ করে কথা বলার সাধ্য মির্জা বাড়ির কারোরই ছিল না। ওদিকে তিন ভাইয়ের মন তখন সুদূর প্রবাস থেকে ফিরে আসা বোনকে এক নজর দেখার জন্য, আর করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা বোনের ফুটফুটে ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করার জন্য একেবারে উতলা হয়ে উঠেছে। কিন্তু তারা নিজেরা চাইলেও মা-কে কোনো প্রকার সান্ত্বনা দিতে বা বোঝাতে পারছিলেন না। মায়ের বয়স হয়েছে, ওনার এই বয়সের জেদকে ভাঙার ক্ষমতা তাদের নেই। তার ওপর রয়েছে এক সুগভীর অতীত দায়।
ওনাদের বাবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে নিজের স্ত্রীর অর্থাৎ তাদের মায়ের হাত চেপে ধরে শেষ ইচ্ছা হিসেবে বলে গিয়েছিলেন, মিনু যদি কোনোদিন ফিরেও আসে, ও যেন কখনোই ওনার সেই সন্তানকে ক্ষমা না করে। মৃত বাবার সেই অন্তিম আদেশ আর জীবিত মায়ের এই তীব্র প্রতিজ্ঞার মাঝখানে পড়ে তিন ভাই আজ এক চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। মা-বাবাদের এই চিন্তাভাবনা একদম সেই পুরোনো আমলের গোঁড়ামিতে ঠাসা যেখানে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে, নিজের সন্তানের, চেয়ে সমাজের লোকলজ্জা আর মেকি সম্মানটাই সবসময় সবার আগে স্থান পায়।
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৫
মনের ভেতরে এক তীব্র দহন আর চোখের কোণে লুকানো জল চেপে রেখে তিন ভাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের পাথরখণ্ডে পরিণত করলেন। তারা মনকে শক্ত করে নিলেন, যেন কোনো এক আকস্মিক মুহূর্তে যদি করিডোরে বা হাসপাতালের কোথাও বোনের সাথে চোখের দেখাও হয়ে যায়, তবে মায়ের এই কড়া আদেশের সামনে তারা যেন কোনোভাবেই ভেঙে না পড়েন। নিজেদের কঠোর করার এক নির্মম অভিনয় তারা শুরু করলেন।
