Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৫

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৫

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৫
নাজনীন নেছা নাবিলা

মির্জা বাড়ির বিশাল হল রুমটায় আজ ভির জমেছে। ঠিক মাঝখানের বড় সোফাটায় গোল হয়ে বসেছে সবাই। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম তেলের ছ্যাঁকা আর ছাঁকনি নাড়ার আওয়াজ। বাড়ির মহিলারা ব্যস্ত হাতে ভাজছেন মচমচে গরম সিঙ্গারা, আর এক চুলায় ফুটছে সুগন্ধি এলাচি চা। এই সান্ধ্যকালীন ভোজের আয়োজন কোনো সাধারণ আড্ডা নয়, বরং একটা গূঢ় রহস্যের জট খোলার পটভূমি। আড্ডার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছে আবির আর ইবাদ। তাদের চোখে-মুখে টানটান উত্তেজনা আর একরোখা জেদ। পরিবারের দীর্ঘদিনের চেপে রাখা যত রহস্য, যত গোপন সত্য, সব আজ তারা জেনেই ছাড়বে। গুরুজনেরা অনেক চেষ্টা করেছিলেন পরিস্থিতি সামাল দিতে, বলেছিলেন,
“আস্তে আস্তে সব জানতে পারবি, তাড়াহুড়ো করিস না।”

কিন্তু তরুণ রক্ত কি আর এত সহজে মানে? আবির আর ইবাদের অনড় জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হলেন বাড়ির বড়রা। আর কোনো লুকোচুরি নয়, আজ সব সত্য প্রকাশ পাবে, এই শর্তেই বসেছে এই গম্ভীর আসর। এই থমথমে ভিড়ের মাঝে এক কোণে বসে আছে বেচারা ইরফান। তার ভেতরের ঝড়টা বাইরের কেউ টের পাচ্ছে না। সে যে এই পরিবারের সব সত্য আগে থেকেই জানে, সেই খবরটা বাকি সদস্যদের কাছে এখনো গোপন। এক অদ্ভুত দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে যেতে হচ্ছে তাকে। যতক্ষণ না তার আসল মুখোশটা সবার সামনে খসে পড়ছে, ততক্ষণ এই নির্বিকার থাকার নাটক তাকে চালিয়ে যেতেই হবে। ইরফান খুব ভালো করেই জানে, আজ যদি সব সত্য অনাবৃত হয়ে যায়, তবে তার বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না। সব সত্যি প্রকাশ পাওয়ার অর্থই তার নিজের চরম বিপর্যয়।

আরশি নিজের ঘরের অন্ধকার কোণটায় নিথর হয়ে বসে ছিল। জানলার বাইরে গোধূলির আলো তখন মিলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেমন একে একে মিলিয়ে গেছে তার জীবনের সবটুকু আলো। নিঃসঙ্গতার এই প্রহরে অতীতটা যেন এক জীবন্ত চলচ্চিত্রের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। শৈশবের সোনালী দিনগুলো শেষ হতে না হতেই এক কালবৈশাখী ঝড় এসে কেড়ে নিয়েছিল তার বাবা-মাকে। মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যাওয়ার পর, পরম আদরে আগলে রাখার মতো বলতে ছিল শুধু তার বড় ভাই। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, জীবিকার তাগিদে সেই ভাইকেও একদিন পাড়ি জমাতে হলো সুদূর প্রবাসে। আরশি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ল। আশ্রয় মিলল মামা-মামীর সংসারে। কিন্তু পরের বাড়িতে আশ্রিত থাকার গ্লানি যে কতটা নির্মম, তা আরশি প্রতি মুহূর্তে হাড়ে-মজ্জায় টের পাচ্ছিল। একটা সময় নিজেকে ওই সংসারের সবচেয়ে বড় ‘বোঝা’ মনে হতে লাগল তার। সে তো অন্য কিছু চায়নি, শুধু একটুখানি স্নেহ, একটুখানি ভালোবাসা আর এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয় চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য যেন শুরু থেকেই তার সাথে এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছিল, কোনোভাবেই তাকে সুখের মুখ দেখতে দিচ্ছিল না।

ঠিক তখনই, মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো আরশির জীবনে এসেছিল নীলা। শৈশবের প্রথম আর একমাত্র অকৃত্রিম বান্ধবী। নীলাই ছিল একমাত্র মানুষ, যার সামনে আরশি নিজের মনের সব জমানো কষ্ট, সব লুকানো কান্না অবলীলায় উজার করে দিতে পারত। বলতে গেলে, নীলা নিজের অজান্তেই আরশিকে এক অদৃশ্য মায়ার চাদরে আগলে নিয়েছিল। বন্ধনটা আরও গাঢ় হলো যখন আরশি নীলার হাত ধরে তাদের বাড়িতে পা রাখল। সেখানে গিয়ে আরশি এক পরম বিস্ময়ের মুখোমুখি হলো। নীলার পরিবারের প্রতিটি মানুষ তাকে পর ভাবেনি, বরং নিজেদের পরিবারের একজন অবিচ্ছেদ্য সদস্য হিসেবে বুকে টেনে নিয়েছিল। যে ভালোবাসা আর স্নেহের জন্য আরশি এতদিন চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিল, নীলার উসিলায় সে আবার তা ফিরে পেতে শুরু করল। দীর্ঘ অমাবস্যার পর তার জীবনে অবশেষে সুখের জোয়ার এসেছিল। নীলা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করেছিল, নিজের সবটুকু দিয়ে আরশিকে হাসাতে চেয়েছিল। কিন্তু আরশি? আত্মগ্লানি আর অনুশোচনার এক তীব্র শেল যেন তার বুকটাকে চিঁড়ে ফেলল। একটা দীর্ঘশ্বাস রুমের ভারী বাতাসকে আরও বিষাক্ত করে তুলল।

হিংসার এক অন্ধ মোহে পড়ে সে নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারল। যে হিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল তার এতদিনের চেনা সুখের নীড়, যে সুখের ছায়া সে এত কষ্টে খুঁজে পেয়েছিল, নিজের চিরন্তন ভুলের কারণে আজ তা আবার চিরতরে হারিয়ে ফেলল।
মির্জা বাড়ির যে কোণ থেকে একসময় আরশির জন্য শুধু আদর আর ভালোবাসার গুঞ্জন ভেসে আসত, আজ সেখানে কেবলই এক সুগভীর নীরবতা। আগে এই বাড়ির চৌকাঠে পা রাখলেই যে বুকভরা সম্মান আর অবারিত স্নেহ সে পেত, আজ তা যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে। নিজের আপন বড় ভাইটাও আজ দূর পরবাসে এক নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে, বিয়ে করে নিজের সংসার আর জীবনের গোলকধাঁধায় সে এতটাই ব্যস্ত যে, আরশির খোঁজ নেওয়ার ফুরসতটুকুও তার আর নেই। ভাই যেন ভুলেই গেছে এই পৃথিবীতে তার একটা বোনও ছিল। নীলাকে ধোঁকা দেওয়ার সেই অভিশপ্ত সত্যটা যখন থেকে প্রকাশ পেয়েছে, তখন থেকেই এই বাড়ির বাতাস আরশির জন্য ভারী হয়ে উঠেছে। মির্জা পরিবারের কেউই এখন আর তার সাথে নিজে থেকে দুটো কথা বলে না।

হয়তো তারা কোনোদিনও আর তাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারবে না, কোনোদিনও দেখতে পারবে না সেই আগের নজরে। এখন যা কিছু কথা হয়, তা কেবলই সামাজিকতার খাতিরে, লোকদেখানো মনুষ্যত্বের দায়ে যতটুকু না বললেই নয় ঠিক ততটুকুই। কেউ আর তাকে আপন মনে ডেকে কোনো ভুলত্রুটির জন্য শাসন করে না, আর ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে নেওয়া সে তো এখন এক অলীক কল্পনা। আর বাকি রইল তার স্বামী। যার জন্য সে এত কিছু করল, সেই মানুষটা এখন সারাক্ষণ নিজের এক অদ্ভুত বলয়ে বন্দি হয়ে থাকে। আরশির অস্তিত্ব যেন তার কাছে কেবলই এক নিষ্প্রাণ আসবাবের মতো। রাতের অন্ধকারে যখন কোনো শারীরিক চাহিদার তীব্র প্রয়োজন জাগে, ঠিক তখনই সে আরশির কাছে আসে, নিস্পৃহভাবে নিজের ক্ষুধা মেটায়। এছাড়া দিনের আলোয় আরশি বেঁচে আছে না মরে গেছে, সেই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম তাগিদও সে বোধ করে না।

অথচ একটা সময় ছিল, যখন এই পুরুষটাই আরশির কত শত খেয়াল রাখত! আরশিও বোকামির মতো সেই কৃত্রিম যত্ন আর খেয়াল রাখাকেই অন্ধের মতো ‘ভালোবাসা’ বলে ভুল করেছিল। আজ এতদিনে আরশির চোখের সামনের সেই মোহময় পর্দাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আজ সে নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছে, নীলার মতো একটা খাঁটি, নিষ্পাপ মেয়ে যে ছেলের পাশে ছায়ার মতো ছিল, সেই ছেলেই যদি নীলাকে এমন অবলীলায় ধোঁকা দিতে পারে, তবে সে আরশিকে কীভাবে ভালোবাসবে? যে মানুষটা নিজের আদিম অভ্যাসের কারণে একজনের বিশ্বাস ভাঙতে পারে, সে অন্য কারোর জীবনে কীভাবে বিশ্বস্ত হবে? আরশি নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কেন আজ নিজের অতীত কর্মের জন্য তার ভেতরটা এভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। এই অনুশোচনা কি সত্যিই পাপের প্রায়শ্চিত্ত, নাকি এক চরম একাকীত্বের হাহাকার,তা আরশির নিজের কাছেও এক মস্ত বড় রহস্য।

নীলা সোফায় নিস্পৃহভাবে বসে বসে সে নিজের বর্তমান আর ভবিষ্যতের খতিয়ান মেলাতে ব্যস্ত। তার নিজের বলতে যা কিছু ছিল,প্রাত্যহিক জীবনের সামগ্রিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জামাকাপড় সবই পড়ে আছে তার সেই পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে। এই বাড়িতে তার পরার মতো উপযুক্ত পোশাকও তেমন একটা নেই। শুধু তাই নয়, তার তিল তিল করে গড়ে তোলা পিঠার ব্যবসাটা এখন মাঝপথে পুরোপুরি ঝুলে আছে, পড়াশোনার চাকাটাও থমকে গেছে এক জায়গায়। এভাবে স্থবির হয়ে তো আর জীবন চলতে পারে না। তাছাড়া ইকরাকেও ওই বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে একা ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এই পুরো বিষয়টি নিয়ে তার নিজেরই উদ্যোগী হতে হবে। মিহাল, ফুফু আর ফুফার সাথে বসে একটা চূড়ান্ত কথা বলা এখন ভীষণ জরুরি। ঠিক তখনই ঘরের দরজায় একটা মৃদু আওয়াজ হলো। এতক্ষণ বাইরে নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে জরুরি কিছু অফিশিয়াল কাজ আর ফোন কল সেরে অবশেষে নিজের কক্ষে ফিরে এলো মিহাল। রুমে পা রাখতেই তার নজর গিয়ে থমকে গেল সোফায় বসে থাকা নীলার ওপর। মেয়েটা বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে। জানালার ওপার থেকে আসা আবছা আলোয় নীলার সেই চিন্তাক্লিষ্ট মুখশ্রী আজ মিহালের চোখে এক অন্যরকম মায়ায় ধরা দিল। ললাটের সামান্য ভাঁজ, বিষণ্ণ কিন্তু দৃঢ় চোখের দৃষ্টি,সব মিলিয়ে মেয়েটাকে দেখতে কতটা যে নিষ্পাপ আর মায়াবী লাগছে, তা যেন মিহাল কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে পারবে না। নিজের অজান্তেই মিহালের পায়ের গতি কিছুটা মন্থর হয়ে এলো, সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার এই নতুন রূপের নীলার দিকে।
মিহাল অত্যন্ত ধীর পায়ে সোফার দিকে এগিয়ে গেল। পরম মায়ায় সে নীলার ঠিক পাশে এসে বসল। তার পুরোটা দৃষ্টি তখন নীলার বিষণ্ণ মুখের ওপর স্থির। আলতো করে নীলার দিকে তাকিয়ে সে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী ভাবছো?”

মিহালের চেনা কণ্ঠস্বরের স্পর্শে নীলা যেন এক লহমায় নিজের ভাবনার অতল জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। সে কিছুটা চমকে উঠে মিহালের দিকে তাকাল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা আর দ্বিধাদ্বন্দ্বগুলোকে আড়াল করে, নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“ইকরার কথা ভাবছিলাম।”
নীলার মুখের এই একটিমাত্র বাক্যেই মিহালের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, মেয়েটা আসলে কোন গোলকধাঁধায় আটকে আছে এবং ঠিক কোন বিষয়টি তাকে ভেতরে ভেতরে দোটানায় ফেলছে। মিহাল আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে আলতো করে নীলার নরম হাত দুটি নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। নীলার চোখের দিকে গভীর বিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে সে বলতে লাগল,

“আমি তোমার স্বামী, নীলাঞ্জনা। তাই আমার থেকে কোনো কথাই কখনো লুকোবে না। তোমার মনের ভেতর যত রকমের দ্বিধা, যত সমস্যা আছে,সব আমার সাথে শেয়ার করবে। আমরা দুজনে মিলে চেষ্টা করব প্রতিটা সমস্যার সমাধান বের করার। কখনোই কোনো বিষয় নিয়ে নিজেকে একা ভেবে একা একা চিন্তা করবে না। জীবনের অনেক ঝড়-ঝাপটা তুমি একাই সহ্য করেছ। আর কোনো কষ্ট আমি তোমাকে সহ্য করতে দেব না। আমি আছি তো তোমার পাশে।” মিহালের হাতের সেই চেনা উষ্ণতা আর আশ্বাসের বাণী যেন মুহূর্তের মধ্যেই নীলার দীর্ঘদিনের ক্লান্ত মনে এক পশলা শান্তির বৃষ্টি এনে দিল। নীলা মিহালের দিকে তাকালো। লোকটি তাকে এত কেন বুঝে, বিষয়টি তার বোধগম্য হয়নি। আর কখনো হবে কিনা তার জানা নেই। সে শুধু এতটুকু জানে এখন কেউ একজন আছে যে তাকে খুব ভালো করে বুঝে। এবং তার পাশে আছে। নীলা মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই মিহাল বলল,

“হ্যাঁ হ্যাঁ জানি ইকরা কোথায় থাকবে এইটা নিয়ে চিন্তা করছো,আবার সেই আ্যপার্টমেন্টে তোমাদের সকল জিনিস আছে। তোমার পিঠার বিজনেস বন্ধ পরে আছে‌। ডোন্ট ওয়ারি বেবি গার্ল, প্রথম ইকরা আমাদের এখানেই থাকবে এবং আমি সময় করে নিয়ে যাব তোমাদের দুজনকে সেই আ্যপার্টমেন্টে। যা যা আছে তা তা নিয়ে আসবে। আর হ্যাঁ যা গেল আমাদের উপর দিয়ে তাই আর দুই একদিন জিরিয়ে তারপর না হয় পিঠার বিজনেস আবার শুরু কর।”
মিহালের মুখের এমন আকস্মিক ও গভীর আশ্বাসের বাণী শুনে নীলার মনের ভেতরে এক লহমায় খুশির এক পশলা হাওয়া বয়ে গেল। কিন্তু সে চট করে তার মনের সেই ভালো লাগা মুখে প্রকাশ হতে দিল না। বরং উল্টো নিজের চেহারায় এক কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে, চোখের দৃষ্টি কিছুটা তীক্ষ্ণ করে বলল,
“লিসা আপনাকে পছন্দ করে, তাই হয়তো সে আমাকে কিডন্যাপ করাতে চেয়েছে।”

নীলার মুখে এই সোজাসাপটা অভিযোগ শুনে মিহালের মুখের সমস্ত রং যেন এক মুহূর্তে উড়ে গেল। একজন পুরুষ হিসেবে সে নিজেও যে লিসার মনের অবদমিত ভালো লাগার টানটা কোনোদিন বোঝেনি, তা নয়। সে খুব ভালো করেই জানত লিসা তাকে পছন্দ করে, কিন্তু মিহাল কোনোদিনই লিসাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি বা প্রশ্রয় দেয়নি। নীলার চোখে সেই লুকানো অভিমান আর সংশয় দেখে মিহাল এবার আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো। নীলাকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করার জন্য তার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে গভীর স্বরে বলতে লাগল,
“আমাকে কে পছন্দ করে আর কে পছন্দ করে না, সেটা আমার জানার বা ভাবার বিষয় নয় নীলা। তুমি আমাকে পছন্দ করো কি না,আমার জন্য কেবল এইটুকুই যথেষ্ট। আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট আদারস্। দ্যা পারসোন আই কেয়ার অ্যাবাউট, ইটস্ ইউ। অনলি ইউ।”

মিহালের প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ যেন তীরের মতো গিয়ে বিঁধল নীলার হৃদয়ে। এতখানি অধিকার আর ভালোবাসার কথা শুনে নীলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস আচমকাই ভারী হয়ে এলো। এক অদ্ভুত, অবর্ণনীয় ভালো লাগা আর তীব্র এক অনুভূতির চাদর যেন তাকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল, যা সে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারল না।
”মিহালের প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ যেন তীরের মতো গিয়ে বিঁধল নীলার হৃদয়ে। এতখানি অধিকার আর ভালোবাসার কথা শুনে নীলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস আচমকাই ভারী হয়ে এলো। এক অদ্ভুত, অবর্ণনীয় ভালো লাগা আর তীব্র এক অনুভূতির চাদর যেন তাকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল, যা সে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারল না।
হঠাৎ মিহালের মনে হলো নীলাকে তার বলা উচিত যে সে জানে ইকরা এবং মুভি একে অপরকে পছন্দ করে।
“নীলাঞ্জনা জানো তোমার বান্ধবী এবং আমার বন্ধু একজন আরেকজনকে পছন্দ করে।”
মিহালের কথা শুনে নীলার হুঁশ ফিরল। মিহালের কথা তার বৌধোমো হতেই সে মুচকি হাসলো। এবং হেসে বলতে লাগলো,

” শুধু পছন্দ করা পর্যন্ত এই সীমাবদ্ধ নয়, আপনার বন্ধুর মা আজকে ইকরাকে নিজের হাতের স্বর্ণের চুড়ি পরিয়ে দিয়েছেন এবং দোয়া দিয়ে গিয়েছেন। আবার ইকরার কাছ থেকে তার মা বাবার নাম্বার নিয়েছেন হয়তো খুব শীঘ্রই তার মা-বাবার সাথে ইকরার সাথে আপনার বন্ধুর বিয়ের কথা বলবেন।”
নীলার মুখের এই অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তি শুনে মিহাল যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের পাতায় এক পরম বিস্ময়, আর মনের কোণে খেলে গেল এক অনাবিল খুশির হিল্লোল। যে বন্ধুকে সে নিজের ভাইয়ের মতো দেখে, সেই মুনভি অবশেষে তার ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পেতে চলেছে। এই আনন্দের চেয়ে বড় আর কী হতে পারে। মিহালের সেই স্তব্ধতা কাটাতে নীলা আবার আলতো করে যোগ করল,
“মুনভি ভাইয়া হয়তো নিজেই আপনাকে সবটা বলতো। কিন্তু ওই সিসিটিভি ফুটেজ দেখার চক্করে আর তারপর হঠাৎ করে উনাকে হসপিটালে ছুটে যেতে হলো বলে আর সময় পাননি। তাই হয়তো আপনাকে এখনো কিছু বলে উঠতে পারেননি। আপনি কিন্তু আবার এই নিয়ে উনাকে একদম ভুল বুঝবেন না।”

নীলা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে কথাগুলো গুছিয়ে বলল, যাতে মিহালের মনের ভেতরে মুনভিকে নিয়ে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা সন্দেহের তরী নোঙর করতে না পারে। নিজের বন্ধুর প্রতি, তাদের বন্ধুত্বের প্রতি নীলার এই অপরিসীম যত্ন আর দায়িত্বশীলতা দেখে মিহালের বুকটা এক অজানা গর্বে ভরে উঠল। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে পরম শান্তিতে বলল,
“একটা ভুল আমি দ্বিতীয়বার আর করব না, নীলাঞ্জনা।”
মিহালের আশ্বস্ত বাণী শুনে নীলার ঠোঁটেও এবার এক টুকরো ম্লান কিন্তু সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। সে মৃদু হেসে সায় দিয়ে বলল,
“করা উচিতও না। বন্ধুত্ব জিনিসটা আসলেই ভীষণ সুন্দর, পবিত্র। অবশ্য সবার কপালে এমন খাঁটি বন্ধুত্বের ভাগ্য জোটে না। আপনি আসলেই অনেক ভাগ্যবান।”

কথাগুলো শেষ করতেই নীলার বুক চিরে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সেই দীর্ঘশ্বাসে যেন মিশে রইল আরশির সাথে তার হারিয়ে যাওয়া পুরোনো দিনগুলোর স্মৃতি, আর এক সুগভীর একাকীত্ব।
নীলার চোখের কোণে জমে থাকা সেই সুগভীর বিষণ্ণতা আর তপ্ত দীর্ঘশ্বাসটুকু মিহালের নজর এড়াল না। সে নীলার ভেতরের সেই একাকীত্ব আর শূন্যতা মুহূর্তেই অনুভব করতে পারল। মিহাল আর এক মুহূর্তও দেরি না করে অত্যন্ত পরম মায়ায় নীলার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে নিজের দিকে তুলে ধরল। তার চোখে তখন এক মহাসমুদ্র সম্বলিত ভরসা। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আশ্বাসের মুচকি হাসি ফুটিয়ে সে গভীর স্বরে বলল,
“আমি আছি তো নীলাঞ্জনা, তোমার বন্ধু, তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তোমার সবটুকু ভালোবাসা হয়ে।”
মিহালের এই গভীর ভালোবাসার বাণী যেন আশ্বাসের বদলে নীলার মনের গহীনে এক অজানা, সুপ্ত আতঙ্কের জন্ম দিল। অতীতের সব হারানোর ক্ষতগুলো এক লহমায় জ্যান্ত হয়ে উঠল তার বুকের ভেতর। সে প্রচণ্ড ছটফট করে, এক বুক আতঙ্ক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,

“না, না, না, না! আমি… আমি চাই না আপনাকে বন্ধু বানাতে! আমি চাই না আপনাকে ভালোবাসতে! আমি কোনোভাবেই চাই না আপনাকে হারাতে… পারব না, আমি আপনাকে হারাতে পারব না মিহাল! আমি জীবনে যা কিছু ভালোবেসে চেয়েছি, তার সবকিছুই হারিয়েছি। দুনিয়ার মানুষ জানুক আমি খুব স্ট্রং, খুব শক্ত… কিন্তু এতটা শক্ত বা সাহসী আমি নই যে আপনাকে হারানোর ধকল সহ্য করার ক্ষমতা রাখব! আমার চাই না এই ক্ষমতা পেতে… চাই না আপনাকে হারাতে, চাই না, চাই না!”

কথাগুলো বলতে বলতে নীলার কণ্ঠস্বর বুজে আসছিল, চোখের কোণে এক পৃথিবী ভয় খেলা করছিল। নীলাকে এভাবে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উত্তেজিত হতে দেখে মিহাল রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মেয়েটাকে সে চিরকাল প্রচণ্ড ধৈর্যশীল, শান্ত আর গম্ভীর দেখে এসেছে, তাকে আজ এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে মিহালের বুকটা কেঁপে উঠল। নীলাকে শান্ত করার জন্য সে আর কোনো কথার অপেক্ষা করল না। এক ঝটকায় নীলাকে নিজের দুই বাহুর বন্ধনে জড়িয়ে একদম বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। যেন পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো নিয়তি আজ তার বুক থেকে নীলাকে কেড়ে নিতে পারবে না। মিহাল এক হাতে নীলার পিঠ জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে তার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে, নিজের চিবুক তার চুলে ঠেকিয়ে পরম শান্ত্বনার সুরে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল,
“ইটস্ ওকে সুইটহার্ট… রিল্যাক্স। কিচ্ছু হবে না। আমাকে বন্ধু মনে করতে হবে না, আমাকে ভালোবাসতেও হবে না। আমাদের এই সংসারে আমার একার ভালোবাসাই দুজনের জন্য যথেষ্ট। প্লিজ কাম ডাউন, শান্ত হও। আই অ্যাম হেয়ার উইথ ইউ। ভালোবাসি তোমাকে, আজীবন ভালোবাসব। কোনো ভয় পেও না নীলাঞ্জনা, আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

মিহালের বুকের সেই চেনা ধকধকানি আর পরম আশ্বাসের ছোঁয়ায় নীলার অস্থির শরীরটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসতে লাগল, যেন এক ক্লান্ত নাবিক দীর্ঘ ঝড় শেষে এক নিরাপদ বন্দরের খোঁজ পেল।
মিহালের বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে এসে নীলা ধীরে ধীরে তার চোখের ভারী পাতা দুটো বন্ধ করে ফেলল। আর অবাধ্য চোখের কোণ বেয়ে নোনা জলের তপ্ত ধারা গড়িয়ে পড়ল মিহালের গলার চামড়ায়। সেই এক ফোঁটা অশ্রুর উষ্ণতা মিহালের বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে তুলল। সে পরম মমতায় নীলার মাথায়, কপালে পর পর চুমু আঁকতে লাগল। নিজের সবটুকু ভালোবাসা উজার করে আদুরে আদুরে কথায় নীলাকে শান্ত করার, তার মনের ক্ষতগুলো মুছে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল সে। মিহালের এই অফুরন্ত প্রশ্রয় আর আশকারায় নীলা যেন নিজের অজান্তেই এক তীব্র আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ল। এতদিনের জমিয়ে রাখা সব অভিমান, সব অবদমিত কষ্ট বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো নেমে এলো‌। সে মিহালের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। নীলার এই বুকফাটা কান্না দেখে মিহালের মনে হতে লাগল, তার নিজের কলিজাটা যেন কেউ টেনে চিঁড়ে বের করে নিয়ে আসছে। পৃথিবীর সব ঝড় সে একাই সামলে নিতে পারে, কিন্তু এই একটা মেয়ের চোখের পানি সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারে না। নীলা তখনো মিহালের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ভাঙা গলায় আকুতি জানাল,
“ছেড়ে যাবেন না আমাকে কখনোই… কথা দিন।”

নীলার এই অসহায় আত্মসমর্পণ মিহালের ভেতরের পুরুষালি সত্তাটাকে এক লহমায় আরও দৃঢ় করে তুলল। সে নীলার দুর্বল শরীরটাকে নিজের বাহুডোরে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন এই আলিঙ্গন কোনোদিনও শিথিল হওয়ার নয়। সে নীলার কানের কাছে মুখ নিয়ে গভীর, ধীর অথচ এক চরম প্রত্যয়ী স্বরে বলল,
“এই দেহে প্রাণ যতদিন স্পন্দিত হবে, এই মিহাল খান তার নীলাঞ্জনার হয়ে ঠিক ততদিন বেঁচে থাকবে। ইহকালের জন্য, এই জীবনে বেঁচে থেকে আল্লাহর কাছে আমার এখন একটাই মাত্র মোনাজাত যেন আখিরাতের অনন্ত সফরেও তোমার আর আমার দেখা হয়। তিনি যেন আমাদের সমস্ত ভুলত্রুটি, আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়ে পরকালেও আমাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জান্নাতে চিরকাল একসাথে রাখেন।” মিহালের এই অলৌকিক আশ্বাসের বাণী শুনে নীলার কান্নার বেগ ধীরে ধীরে কমে এলো, এক পরম তৃপ্তিতে তার মনটা শান্ত হতে লাগল।

মিনু চৌধুরী বাড়ি ফিরে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না। বসার ঘরে ঢুকেই তিনি তড়িঘড়ি করে স্বামীর পাশে এসে বসলেন। মনের ভেতরের তীব্র উত্তেজনা আর চেপে রাখতে না পেরে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠলেন যে, মুনভি ইকরাকে ভীষণ পছন্দ করে। শুধু তাই নয়, স্বামীকে না জানিয়েই তিনি নিজের হাত থেকে সোনার চুড়ি খুলে ইকরাকে পরিয়ে দোয়া করে এসেছেন এবং ইকরার পরিবারের ফোন বের নাম্বারও জোগাড় করে এনেছেন। মিনু চৌধুরী ভেবেছিলেন না জানি উনার স্বামী এই হঠকারী সিদ্ধান্তে কতটা রাগ করেন। কিন্তু উনাকে অবাক করে দিয়ে শাহরিয়ার মামুন মোটেও রাগ করলেন না। উল্টো উনার মুখে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ছেলে তো শুধু তোমার একার নয়, আমারও। মা হিসেবে অবশ্যই তুমি তোমার ছেলের জন্য সবচেয়ে ভালো কিছুই চিন্তা করবে। তুমি যদি চাও, তবে আর দেরি না করে আমি এখনই ইকরার পরিবারের সাথে কথা বলতে পারি।”
স্বামীর মুখে এমন আশাতীত সবুজ সংকেত পেয়ে মিনু চৌধুরীর চোখে-মুখে স্বস্তির আলো ফুটে উঠল। তিনি উৎসাহিত হয়ে বললেন,
“তাহলে তাই করো, আর একদম দেরি কোরো না। মিহালের তো বিয়ে হয়ে গেছে, এবার মুনভিরটাও ব্যবস্থা করে ফেলো।”

স্ত্রীর কাছ থেকে কাগজের টুকরোয় লেখা নাম্বারটি হাতে নিয়ে শাহরিয়ার মামুন নিজের ফোন থেকে নাম্বারটি ডায়াল করলেন। ওপাশে রিং হতে শুরু করল। দুইবার রিং হতে না হতেই ওপাশ থেকে ইকরার বাবা ইমন শেখ ফোনটি রিসিভ করে অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে সালাম দিলেন। মুনভির বাবা সালামের জবাব দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মিনু চৌধুরী পাশ থেকে চোখের ইশারায় স্বামীকে নিজের পরিচয়টা স্পষ্ট করে বলতে বললেন। শাহরিয়ার মামুন নিজের পূর্ণ পরিচয় দিলেন। ওপাশ থেকে পরিচয় পাওয়ার পর অপর প্রান্তের মানুষটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আর তারপরই কথাবর্তার সুতো ধরে এগোতে এগোতে তারা আবিষ্কার করলেন এক অবিশ্বাস্য অতীত। দুজনে ছোটবেলায় একই ক্লাসে, একই বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করতেন। শুধু তাই নয়, মিনু চৌধুরীকে ভালোবেসে যখন শাহরিয়ার মামুন পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন এই ইমন শেখই নিজের দায়িত্বে গাড়ি ঠিক করে দিয়ে তাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন। ব্যাস, মুহূর্তের মধ্যেই যেন সময়ের চাকা বিশ-পঁচিশ বছর পেছনে ঘুরে গেল। সমস্ত পুরনো স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দুই পরম বন্ধু মেতে উঠলেন এক নস্টালজিক আড্ডায়। মিনু চৌধুরী তো খুশিতে পারলে ঘরের মাঝখানেই নাচতে শুরু করেন! এতক্ষণ তার মনের ভেতর যে তীব্র দোটানা আর ভয় কাজ করছিল, ইকরার বাবা আবার কী মনে করেন, সম্পর্কটা মেনে নেবেন কি না। তা এক লহমায় কর্পূরের মতো উবে গেল। ইকরার বাবা যখন স্বয়ং স্বামীরই সেই পুরনো পরম বন্ধু, তখন আর কোনো চিন্তার কারণই অবশিষ্ট থাকে না। মিনু চৌধুরী পরম শান্তিতে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন, এবার উনার ছেলের বিয়ে সেই রাজকন্যের সাথেই হবে, যাকে সে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
মিহাল চোখ বন্ধ রেখে তার বুকে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা নীলাঞ্জনাকে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করল,

“জানো নীলাঞ্জনা, সেদিন এ বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময়, ঠিক কী মনে করে যেন তোমার জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছিলাম। এক অদ্ভুত অবাধ্য টানে লিখেছিলাম। তুমি কি কখনো সেই চিঠিটা পড়েছ?”
ঘরের নীরব আবহাওয়ায় মিহালের সেই ফিসফিসানি মধুর মতো ছড়িয়ে পড়ল, যার উত্তর এখন কেবলই ওই ঘুমন্ত মেয়ের অবচেতন মনে লুকিয়ে আছে। মিহাল চোখ দুটো বন্ধ করে রাখা অবস্থায় ছিল। অতীতের সেই ধূসর হয়ে যাওয়া দৃশ্যপটগুলো এক এক করে তার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল। সে যেন আবার সেই দশ বছরের বালক হয়ে গেল,

হঠাৎ মিহালের দাদা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় মিহাল এবং তার পরিবারকে তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ আসতে হলো। ১০ বছরের মিহালের জন্য এটাই ছিল প্রথমবার বাংলাদেশে পা রাখা। এর আগে বাবা-মায়ের মুখে এই দেশ আর এই দেশের নিয়মকানুন সম্পর্কে অনেক কিছু শুনলেও, সবুজ-শ্যামল এই রূপকে কখনো স্বচক্ষে দেখার সুযোগ তার হয়নি। তার বাবার পক্ষে আত্মীয়-স্বজন বলতে তেমন কেউই ছিল না, কারণ তার বাবা ছিলেন ওনার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আর দূর সম্পর্কের যে দু-চারজন আত্মীয় ছিলেন, তারা সুযোগ পেলেই প্যারিসে গিয়ে তাদের সাথে দেখা করে আসতেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশে আসার কোনো বিশেষ তাগিদ বা কারণ এর আগে কখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু এবার দাদার এই আকস্মিক অসুস্থতা পুরো পরিস্থিতি বদলে দিল। বাংলাদেশে যে কেবল তার বাবার পরিবারই নয়, বরং তার মায়ের এক বিশাল পরিবারও রয়ে গেছে। এই সত্যটি মিহালের অজানা ছিল না। তার মা ছোটবেলা থেকেই তাকে খুব আদরে এবং চমৎকার সুশিক্ষায় বড় করেছেন। নিজের জীবনের অতীত অধ্যায়, ফেলে আসা দিনগুলোর কোনো গল্পই তিনি ছেলের কাছে গোপন করেননি। আর মায়ের মুখ থেকে শোনা সেই সব কাহিনীর সূত্র ধরেই মিহাল খুব ভালো করেই জানত, এই মুহূর্তে তার মা-বাবা কতটা তীব্র এক ভয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বহু বছর হলো নিজের পরিবারের সাথে মিহালের মায়ের কোনো যোগাযোগ নেই।

মায়ের পরিবারকে না জানিয়ে ওনারা দুজন যখন ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন, তখন নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মিহালের বাবা নিজের পরিবারকে ঢাকা শহর থেকে কিছুটা দূরে এক নিরিবিলি জায়গায় সরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। যেহেতু ওনারা স্থায়ীভাবে এই দেশে থাকতেন না, তাই নিজের অনুপস্থিতিতে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই ছিল ওনার কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে, বর্তমানে তার অসুস্থ দাদা ঢাকার একটি নামী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, যা কাকতালীয়ভাবে তার মায়ের বাপের বাড়ির খুব কাছাকাছি এলাকার মধ্যেই অবস্থিত। এত বছর পর নিজের চেনা গণ্ডির এত কাছে এসে তার মা-বায়ের মনে এক অজানা আতঙ্ক আর ভয় কাজ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। তবে মিহালের মনে কিন্তু ভয়ের বিন্দুমাত্র লেশ ছিল না। উল্টো তার ভেতরের নিষ্পাপ মনটা এক তীব্র ব্যাকুলতায় ছটফট করছিল।

সে মনে মনে অনবরত আল্লাহর কাছে দোয়া করে যাচ্ছিল, যেন কোনো এক উসিলায় তার মায়ের পরিবারের সাথে একবারের জন্য হলেও দেখা হয়ে যায়। নিজের মা আর বাবার মুখে তার মামাদের বীরত্ব আর স্নেহের এত গল্প সে শুনেছে যে, তাদের দেখার জন্য তার আর তর সইছিল না। ছোটবেলা থেকেই ধর্মের প্রতি, বিশেষ করে নিয়মিত সালাত আদায়ের প্রতি এক অদ্ভুত আত্মিক আকর্ষণ ছিল মিহালের। কিন্তু যেদিন সে প্রথম শুনল যে তাদের সপরিবারে বাংলাদেশে যেতে হবে, সেই দিন গভীর রাতে সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৪

পরম ভক্তিতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে দুহাত তুলে কেঁদেছিল, যেন এই সফরে আল্লাহ তার মায়ের পরিবারের সাথে দেখা করার একটা ব্যবস্থা করে দেন। মনের কোণে ঠিক এই গভীর আশা আর বিশ্বাস নিয়েই সে আজ হাসপাতালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মিহাল কি তখন জানত যে তার এই খাঁটি মনের আকুতি একদম বৃথা যাবে না? সে কি জানত যে আল্লাহ তায়ালা তার সেই রাতের তাহাজ্জুদের দোয়া এত অলৌকিকভাবে কবুল করে নিতে চলেছেন?

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here