আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৮
সুরভী আক্তার
শুক্রবারের নতুন দিন ।
আজ বাড়িতেই আছে সবাই । সব ব্যাস্ততা ভুলে পুরো পরিবার সারাটা দিন একসাথে কাটাবে । সকালে ওঠার পর মেঘা কিছুই টের পায় নি । কাল যে টেবিলের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো , তা বেমালুম ভুলে গেছে । সকালে উঠে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করেছে । মনে করার চেষ্টা করে নি রাতের ঘটনা ।
টইটই করে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতে গিয়ে নিজের অ্যাসাইনমেন্টের কথাও ভুলে গেছে বেমালুম । এগারোটা পেরিয়েছে । রৌদ্র নিজেও আজ বাড়িতে আছে । ঘুমোচ্ছে এখনো । সকালে রুবিনা কাবির ডাকতে গেছিলেন । রৌদ্র ঘুমের ঘোরে ডিস্টার্ব করতে বারন করে দিয়েছে । ঘুমোবে সে । সারাটা রাত ঘুমায় নি । তা রুবিনা কাবিরের অজানা । তিনি ছেলেকে আয়েশে ঘুমোতে দেখে ডাকেন নি আর ।
বেলা গড়াচ্ছে , তবুও ছেলের ওঠার নাম নেই । এতোটা ঘুমোয় না সে ।
বাড়ির বাকিরা নামাজ পড়তে যাবে । রুবিনা কাবির ভাবলেন , এবার ছেলেকে ডাকা উচিত । এ সময় উঠলে রৌদ্র কিছু খাবে না । একেবারে লাঞ্চ করবে । কড়া করে এক কাপ কফি বানিয়ে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উঠলেন তিনি । ছেলের ঘরের দিকে এগোতে গেলে কানে পড়লো স্বামীর ডাক । তোফায়েল কাবির ডাকলেন । হয়তো দরকার । রুবিনা কাবির মাঝপথে থামলেন । কোন দিকে যাবেন , এই ভাবতে ভাবতে মুখোমুখি শাফাহ্ কে পেলেন অগত্যা । তড়িঘড়ি করে ওর হাতে কফির মগটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন….
” এটা তোর রৌদ্র ভাইয়ার রুমে গিয়ে দিয়ে আয় তো মা । এখনো ঘুমোচ্ছে বোধহয় । ডাকবি আগে । বেলা গড়িয়েছে অনেক ।
বলেই চলে গেলেন তিনি । শাফাহ্ কিছুটা অলস প্রকৃতির । এই অলসতা থেকে বিরক্তি কাজ করলো । ও যাচ্ছিলো নিচে । এখন আবার পথ ফিরিয়ে রৌদ্রের রুমে যাবে ? বিরক্ত হলেও পরক্ষনে কিছু মনে পড়তেই চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো তার । দ্রুত ছুটলো রৌদ্রের রুমের দিকে । ঠাস করে দরজা খুলে চেঁচিয়ে ডাকলো…..
” রৌদ্র ভাইয়া….
একটু থেমে কাছাকাছি গিয়ে আবার…..
” রৌদ্র ভাইয়া ! ওঠো । দেখো বারোটা বাজতে চললো । আজান পড়বে এক্ষুনি । উঠবে না ? ওঠো প্লিজ । কথা আছে তোমার সাথে ।
রৌদ্রের ঘুম হালকা হয়ে আসে । ভার লাগছে মাথাটা । দূর্বলতায় চোখ জোড়া বন্ধ রেখেই জবাব করে….
” বল !
” ওঠো আগে । মামনি ডাকতে বলেছে তোমায় ।
রৌদ্র বিরক্ত হয়ে উঠে বসলো । চোখ ডলে গা মোড়ালো । না তাকিয়ে হাই তুলে বললো রাশভারী গলায়….
” কি হয়েছে ?
” আমার চকলেট কোথায় ? কাল দাও নি ! কি কথা হয়েছিলো তোমার সাথে ? তুমি যা যা জানতে চেয়েছিলে , সব বলেছি । যা যা করতে বলেছিলে সেসব ও করেছি । এখনো করছি , আর করবো ও । কদিন ধরে চাকরি করছি তোমার আন্ডারে । তুমি সবটা চেপে রাখতে বলেছিলে , আমি কত কষ্টে চেপে রেখেছি জানো ? সব কথা জমিয়ে রাখতে গিয়ে পেট ফুলে চুইচুই করছে আমার । মেঘা যদি জানতে পারে আমি ওকে লুকিয়ে ওর বিষয়ে সব তথ্য তোমাকে দিয়ে দিয়েছি , তাহলে ও আস্ত রাখবে না আমায় । কথা বলবে না আমার সাথে ।
” ও জানবে কি করে ?
” আমি যদি মুখ ফসকে বলে ফেলি ?
” মুখ বন্ধ রাখার জন্য ঘুষ দিচ্ছি তোকে ? গান্ডে পিন্ডে চকলেট গিলছিস , সেসব আসছে কোথা থেকে ?
” কাল থেকে তো দাও নি । তাই বলছি । মুখ চুলকাচ্ছে ।
রৌদ্র ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো । বললো….
” টেবিলের সেকেন্ড ড্রয়ারে তোর পারিশ্রমিক আছে , নিয়ে যা গাব্বু ।
শাফাহ্ গদগদ হয়ে ওঠে । বেড সাইড টেবিলের উপর কফির মগটা ঠক করে রেখে ঘুরে দাঁড়ায় । টেবিলের দিকে এগোনোর আগে একটু থেমে আবার শুধায়…..
” আচ্ছা ভাইয়া , তুমি তো আমায় বলো নি ! মেঘার সব পছন্দ অপছন্দ জানার পর এসব কেনো করছো তুমি ?
” এমনি !
” এহহ্,, এমনি ! আমি জানি , তুমি মেঘা কে কনভেন্স করার চেষ্টা করছো । কিন্তু এভাবে অপ্রকাশ্যে চেষ্টা করলে হবে ? ও তো জানবেই না , যে আমার নাম করে তুমি সব করছো । এমনিতেও এ বাড়ির কারোর খরচে চলে না ও ! মাস শেষে সব হিসেব বুঝিয়ে দেবে । হয়তো এসবের হিসেব ও যোগ…..
কথা শেষ করার আগেই রৌদ্রের ফোন বাজলো । বাকি কথা টুকু শেষ করতে পারলো না শাফাহ্ । রৌদ্র বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকায় । ইম্পর্ট্যান্ট নয় বিধায় রিসিভ করার আগেই কেটে দেয় । শাফাহ্’র দিকে চোখ তুলে অর্ধেক কথা না বুঝে বাকিটা শোনার জন্য শুধায়….
” কি যেনো বলছিলি ?
তালগোল পাকিয়েছে শাফাহ্ । কথা পেঁচিয়ে বললো…..
” বললাম , তুমি তোমার বউ কে কেয়ার করবে করো । আমি তো সবটা বলেছি তোমায় । এবার নিজের মতো করে যত্ন নাও ওর । তোমার বউ কিন্তু ঘাড় ত্যারা স্বভাবের । যদি জানতে পারে এসবে আমি আছি,তাহলে……
” শাট আপ গাব্বু । কে আমার বউ ?
শাফাহ্ কপাল কুঁচকায় …..
” কেনো ? মেঘা…..
” তোকে কে বলেছে ও আমার বউ ? আমি বলেছি ? আর তোকে এটা কে বললো, যে আমি ওকে কনভেন্স করার চেষ্টা করছি ?
” এহহ্ , এতো সব কিছু করছো কেনো তাহলে ?
” এ বাড়িতে ওসব করার মতো একমাত্র আমিই আছি ওর , তাই করছি । তোকে বেশি ভাবতে বলেছি ?
” ঐ ঘুরে ফিরে তো একই হলো । তুমিই ওর হাসবেন্ড । তাই এসব করছো….
” চুপকর…..আমিই কারোর হাসবেন্ড নই । না কোনো ঘাড় ত্যারা ইডিয়ট আমার বউ । কানের কাছে এসব ঘ্যান ঘ্যান করে ডিস্টার্ব করবি না । যা এখান থেকে ।
শাফাহ্ ভেংচি কেটে মুচকি হাসলো । ও বোকা । তাই বলে এতোটাও বোকা নয় । সব বোঝে সে । শুধু ওকে কেউ সিরিয়াসলি নেয় না ।
গত কদিনে সে রৌদ্রের হয়ে কাজ করছে । রৌদ্র যা বলে তাই করে । সময়ে অসময়ে রৌদ্রের কথা মোতাবেক মেঘা কে টেনে টুনে ছাদে নিয়ে যায় । ঠিক যে সময় রৌদ্র ছাদে থাকে সেসময় । রোজ বিকেল করে মেঘার পছন্দ মতো বাইরের খাবার আসে এ বাড়িতে ।
শাফাহ্ নিজে আনিয়েছে বলে চালিয়ে দেয় । কতশত মিথ্যে কথা বলছে আজকাল সে । মুখ পাতলা মেয়েটা সবটা চেপেও রেখেছে । হুটহাট বেফাঁসে বলতে গিয়েও কোনো রকমে থেমে যায় । সব রৌদ্রের কথায় । এসব রৌদ্র কেনো করছে ? শাফাহ্ কি বোঝেনা নাকি ? রৌদ্র ওকে গাব্বু পেয়েছে ?
টেবিলের ড্রয়ার খুলে সবগুলো চকলেট বের করলো শাফাহ্ । হুট করে টেবিলের উপর নজর পড়তেই একটা ল্যাপটপ চোখে পড়লো । চিনতে বেগ পোহাতে হলো না । ল্যাপটপের উপর মেঘার মার্ক করা নামটা জ্বলজ্বল করছে । শাফাহ্ কপাল গুটায় । না বুঝে পিছু ফিরতে ফিরতেই রৌদ্র ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়েছে । শাফাহ্ আর কিছু বলতে পারলো না । জিজ্ঞেস করতে পারলো না ।
ভাবতে ভাবতে বেরোলো রুম থেকে । নিজেদের ঘরে গিয়ে মেঘা কে পেলো না । শাওয়ার নিতে ঢুকেছে ঐ মেয়ে । শাফাহ্ বিছানার উপর পা তুলে বসে । চকলেট ছিড়ে খেতে খেতে ভাবুক হয়ে কিছু হিসেব মেলানোর চেষ্টা করে । খানিকক্ষণের মধ্যে মেঘা বেরোতেই ছটফট করে প্রশ্ন করে কপাল গুটিয়ে…..
” মেঘা , তোর ল্যাপটপ কোথায় ?
চুল মুছতে মুছতে বেরোচ্ছিলো মেঘা । ল্যাপটপের কথা কানে পড়তেই কপাল জড়ো করলো । মিররের সামনে দাঁড়িয়ে বললো….
” টেবিলের উপর ।
” নেই তো । দেখ….
ধক্ করে ওঠে মেঘা । চট করে পিছু ফিরে চায় । কাল রাতে তো টেবিলের উপরেই রেখেছিলো । অ্যাসাইনমেন্টের কাজ পুরোটা বাকি । ভাবলো একেবারে লাঞ্চ করে ল্যাপটপ নিয়ে বসবে ।
দ্রুত টেবিলের উপরে নজর বোলালো । নেই ল্যাপটপ । মাথায় টাওয়েল পেঁচিয়ে ছটফট করে ড্রয়ার খুলে দেখলো । সেখানেও নেই । শাফাহ্ ওর উদ্বিগ্নতা দেখে ভ্যাবলার মতো বললো….
” ঘরে নেই তোর ল্যাপটপ । আমি তো ভাইয়ার রুমে সেম ল্যাপটপ দেখে আসলাম ।
” ভাইয়া মানে ?
” রৌদ্র ভাইয়া । কফি দিতে গিয়ে দেখলাম টেবিলের উপর তোর ল্যাপটপ । তাই তো বলছি তোকে । তোর ল্যাপটপ ভাইয়ার রুমে কেনো ?
মেঘা চোখ ছোট করে তাকায় । কিছু বুঝে ওঠে না । ঐ লোকের ঘরে ওর ল্যাপটপ কেনো ? আর গেলোই বা কি করে ? এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না সে । সেভাবেই এক ছুটে ঘর হতে বেরোলো ।
দুটো ঘর পেরিয়ে সোজা রৌদ্রের ঘরে ঢুকলো দোটানা হীন । ঘর ফাঁকা । ঐ লোক ঘরে নেই । হয়তো ওয়াশ রুমে । শাওয়ার নিতে ঢুকেছে ।
মেঘা এদিকে ওদিকে তাকায় । টেবিলের উপর নজর দেয় প্রথমে । ওর নিজের জিনিসটা চিনতে ভুল হলো না । কাঙ্ক্ষিত ডিভাইস টা এই অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গায় দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো । চোখ সরু করে হাত বাড়ালো । ছুঁয়ে দেখলো নিজের জিনিসটা । এটা তো ওর নিজের । তড়িঘড়ি করে স্ক্রিন ওপেন করে মেঘা । এই ল্যাপটপ কেবলই পড়াশোনার জন্য । আর বাড়তি কিছু নেই এটাতে । মেঘা সবটা খুঁটিয়ে দেখলো ।
ডকস্ ব্রাউজারে ঢোকা মাত্রই ডাগর চোখ চোখ বড় বড় হয়ে আসলো রমনীর । ওর ফেলে রাখা অ্যাসাইনমেন্ট কমপ্লিট ।
কাল অবধি ব্লার ছিলো সবটা । আজ পুরোটা পূর্ণ । মেঘা হেডলাইন মিলিয়ে দেখে । নিজে কয়েক লাইন লিখেছিলো কাল । ওর লেখা গুলো নেই । ওরটা কাট করে নতুন করে লেখা হয়েছে সবটা ।
মেঘা পড়লো কয়েক লাইন । খেয়ালের বশে বসলো চেয়ারে । অবাক লোচনে তাকিয়ে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা লেখা গুলো এক এক করে পড়লো । কি সুন্দর বর্ননা করে গুছিয়ে লেখা । টাস্কের টপিকের সাথে খাপে খাপ ।
বেখেয়ালে বিষ্ময়ে মুখ ফাঁক হয়ে আসে একবিংশীর । চোখে ঘন পলক ফেলে ও । ঠোঁট ভিজিয়ে ভাবে , কে করলো এসব ? ও তো ডিপ্রেশড ছিলো এটা নিয়ে । পরশু পেপার সাবমিট করতে হবে ।
রৌদ্র করেছে এসব ? তা না হলে আর কে ?
মেঘার চিন্তার মাঝেই খট করে দরজা খোলার শব্দ হলো । ধ্যান কাটতেই চমকে চকিতে ঘাড় ঘোরালো মেঘা । রৌদ্র ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়েছে । পড়নে সাদা টাওয়েল পেঁচানো । ভেজা ভেজা পেটানো শরীর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত । ভেজা চুল কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ।
এক নিমিষেই চোখ গোল গোল হয়ে গেলো মেঘার । আহম্মক বনে রইলো ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে । লোকটার এমন দশা দেখে অক্ষি যুগল কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম । মুখ গোল রমনীর ।
রৌদ্র এখনো এদিকে খেয়াল দেয় নি । ওমাশ রুম থেকে বেরিয়েই মিররের সামনে দাঁড়ালো সে । এক ভ্রু উঁচিয়ে দুহাতে ভেজা চুল গুলো ব্যাক ব্লাশ করে পেছনে ঠেলে দিলো । মিররেই নিজের পেছনে মেঘার প্রতিবিম্ব দেখা মাত্রই কপাল কুঁচকে আসলো তার ও । অগত্যা এক ঝটকায় পিছনে শরীর ঘোরার সে । মেঘার সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্রই মূর্ত অবস্থায় থতমত খেলো মেঘা । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করলো । জিভে কামড় বসালো নিঃশব্দে । ঘাড় ঘুরিয়ে এক হাতে চোখ ঢেকে ফেললো । নীরবে মাথা ঝাঁকিয়ে মনে মনে নিজেই নিজেকে কটাক্ষ করে ঝাড়ি মারলো ।
মেঘা কে আচমকা নিজের রুমে দেখেও রৌদ্রের প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না সেভাবে । এই মেয়ে আসবে , তা ওর জানা ছিলো । তবে এ সময় আসবে , সেটা ভাবে নি । ওষ্ঠ বাঁকায় রৌদ্র । ফিচেল স্বরে বলে….
” হোয়াটসঅ্যাপ সানি ? আজ তুমি নিজে থেকে আমার রুমে এসেছো যে ?
মেঘা বিড়বিড় করে কিছু একটা বললো । অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে কর্কশ স্বরে বলল,,,
” নির্লজ্জ লোক , লজ্জা নেই ?
” লজ্জা পাওয়ার মতো কি এমন হলো ?
” কাপড় পড়ুন অসভ্য লোক !
রৌদ্রের হাসি শোনা যায় । কন্ঠস্বর বোধহয় কাছে কোথাও । তার মানে ঐ লোক মেঘার কাছাকাছি এগিয়ে আসছে । হাত পা কুঁকড়ে চোখ আরো খিচে নিলো মেঘা । সিটিয়ে ঢোক গিললো শিরশিরে অনুভূতি ঢাকতে ।
ওপাশ থেকে হাস্কি স্বরে বললো রৌদ্র…..
” সভ্য মেয়ে , হুটহাট আমার ঘরে এসেছো কেনো ? হুটহাট এসেছো বলেই এই অবস্থায় দেখতে পারছো । একটু জানিয়ে আসলেই পারতে । আরো মারাত্মক ভাবে ধরা দিতাম তোমার চোখের সামনে । মিস করে গেলে সুইটহার্ট….
মেঘার কান গরম হয়ে আসলো । বোঝার চেষ্টা না করে ঝাইঝাই করে উঠলো তপ্ত স্বরে…..
” খবরদার ঐ অবস্থায় আমার কাছে আসবেন না ? মেরে ফেলবো কিন্তু ! কাপড় পড়ুন রাইনো মুখো….
দীর্ঘক্ষণ রৌদ্রের তরফ থেকে কিছুই শোনা গেলো না । পিনপতন নীরবতা চললো পুরো রুমে । মেঘা নীরবতা অনুমান করে চোখ থেকে হাত সরায় । অনুভব করে নিজের শরীরের কম্পন । তিরতির করে কাঁপছে সে । পিটপিট করে চোখ মেলে মেঘা । সামনে দেয়াল । আর পেছনে ঐ অভদ্র লোক । মুখ বাঁকালো রমনী ।
মাথার চুল টাওয়েলে পেঁচানো এখনো । শাওয়ার নিয়েই এখানে এসেছে । টাওয়েল খুলতেই ভেজা চুল গুলো পিঠ ঝাঁপিয়ে পড়লো । ভেজা টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছলো মেঘা ।
এমত সময় রৌদ্রের স্বর শোনা গেলো….
” এদিকে তাকা ইডিয়ট ,
মেঘা ধীরে পিছু ফেরে । কাপড় পড়েছে লোকটা । বিছানার পাশে বসে কফির মগে চুমুক বসাচ্ছে । এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে কফি । মেঘা এবার আধো নিভু দৃষ্টি পূর্ণ করে । প্রথমেই চড়া গলায় শুধায়…
” আমার ল্যাপটপ আপনার রুমে কেনো ?
” এনেছি তাই ।
” কেনো এনেছেন ?
” কাজ ছিলো !
” আমার জিনিসে আপনার কি কাজ ?
” কি কাজ , তা এতক্ষণে দেখা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই !
মেঘা তৎক্ষণাৎ পরিপ্রেক্ষিতে বলার মতো কিছু পেলো না । গলা ভিজিয়ে ঘন পলক ঝাপটালো । চড়া কন্ঠ নরম হলো এবেলায়…..
” অ্যাসাইনমেন্ট , আপনি রেডি করেছেন ?
রৌদ্র কিছু বললো না । মেঘা উত্তর না পেয়ে আবার শুধায়….
” কি হলো ? বলছেন না কেনো ?
” হুম ।
” কেনো ?
” এমনি !
” কি করে জানলেন আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিলো ?
” দেখেছি !
” কখন ?
” রাতে !
” কি করে ?
” অতো কিছু জানতে হবে কেনো ? পেপার রেডি হয়েছে ! দেখে বুঝে নে সবটা । সব ঠিকঠাক থাকলে প্রিন্ট করে এনে দেবো । জমা দিবি গিয়ে ।
রৌদ্রের চড়া গলার বিপরীতে মেঘা এ পর্যায়ে কিছু বলতে গিয়েও থামলো । বেশ অবাক হলো । কেনো যেনো কথারা গলায় আটকে গেলো কোথাও একটা । মাঝে মাঝে কি হয় কে জানে !
মেঘা মাথা নামিয়ে কিছু একটা বিড়বিড় করে মনে মনে । যতটুকু পড়লো ততটুকু বেশ ভালোই লিখেছে এই লোক । অ্যাসাইনমেন্টের মূলকথা উঠে এসেছে পুরোটাই । মেঘা নিজেও এতো গভীর শব্দচয়নে লিখতে পারতো না হয়তো । এই লোক এতো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখলো কি করে ? তাও আবার ইংরেজি ! মেঘা এ বাড়িতে আসার পর আদ্রকে পড়াশোনা করতে দেখেছে । ইংরেজি নিয়ে পড়েছে আদ্র । অতঃপর ইংরেজিতেই লেকচারার হয়েছে ।
কিন্তু এই লোক ? এই লোক ও পড়াশোনা করেছে ? মেঘার সাথে সম্পর্ক জোড়ার আগ অবধি কেমন ছিলো জানা নেই । শুধু জেনে এসেছে , রৌদ্র বেপরোয়া , নেশাখোর । এই নেশাখোর লোকটা ইংরেজিতে এতোটা পারদর্শী ? কি করে ? আর কখনই বা এই অ্যাসাইনমেন্ট করলো ?
এটা তো এক নিমিষের ব্যপার নয় । যথেষ্ট সময় প্রয়োজন । রাতে যদি ল্যাপটপ এনে থাকে , তাহলে কি রাতেই করেছে ? আরো প্রশ্ন জাগে , মেঘার জন্য বরাদ্দ কাজ উনি করবেনই বা কেনো ? বিনিময়ে ওনার লাভটা কোথায় ?
ভাবুক ভঙ্গিতে ওষ্ঠ উল্টে ঘাড় উঁচায় মেঘা ।
লম্বা চুল হতে চুঁইয়ে চুঁইয়ে টুপটাপ পানি ঝড়ে পড়ছে মার্বেলের মেঝেতে । রৌদ্র এক পলক তাকলো , মেঘা কে ভাবুক অবস্থায় দেখে বললো….
” এইই ইডিয়ট , কি ভাবছিস ?
” আপনি পড়াশোনা করেছেন ? কতদূর ?
” মেট্রিক ফেল…
বিশ্বাস হলো না । সহসা মুখ বিকৃত করে ভেংচি কাটলো । তবুও ব্যাঙ্গ করে বললো….
” মেট্রিক ফেল । এতো দূর পড়েছেন ? আমি তো ভেবেছিলাম ওয়ান টু তে থাকাকালীন সময়েই বোধহয় হাল ছেড়েছেন পড়াশোনার !
রৌদ্র রেগে মেগে তাকালো । মেঘার হাসি পায় আকস্মিক । হাসি চেপে বলে….
” না । কিছু না । আমি বুঝেছি, আপনি একজন মেট্রিক ফেল রাইনো মুখো । তাই আপনার কমন সেন্স এতোটা কম ।
রৌদ্রের রাগ বাড়লো । ক্ষেপে বললো…..
” ইভারা , রাগাবি না আমায় ! থাপ্পর খাওয়ার জন্য গাল চুলকাচ্ছে ? ল্যাপটপ রেখে আমার রুম থেকে বের হ , ইডিয়ট । মাথা ধরেছে একেই ।
চট করে চায় মেঘা । তিক্ত স্বরে বলে…..
” বের হবো কেনো আমি ?
” তো ? থাকার ইচ্ছে আছে বুঝি ? নো প্রবলেম ? থেকে যা । আমি রেখে দেবো যত্ন করে ।
মুখ ঝামটালো মেঘা । আজান পড়েছে । বাড়ির বাকিরা নামাজে যাবে ।
বের হওয়ার আগে খানিক ঘুরে বললো….
” নামাজে যাবেন না ?
” না….
সোজা জবাব টা মোটেও পছন্দ হলো না । খানিক রেগে বললো….
” কেনো ?
রৌদ্রের পাশ থেকে জবাব নেই । মেঘা খিটখিটে স্বরে উচ্চারণ করলো হিসহিসিয়ে…..
” জালিম লোক । সবাই নামাজে যাচ্ছে বাড়ির । আর এনার নামাজ কালাম নেই । রাইনো মুখো কোথাকার ।
আর এক মুহূর্ত থামলো না । ওর বিড়বিড়ানো কিছুটা হলেও রৌদ্রের কানে পৌঁছেছে । রৌদ্র চোখ সরু করলো । মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো । সে জালিম নয় মোটেও ।
ঘর হতে বেরিয়েই চুল মুছতে মুছতে সোজা নিচে নেমেছে মেঘা । তোফায়েল কাবির, তৌসিফ কাবির ড্রইং রুমে বসে । পড়নে টানটান সাদা পাঞ্জাবি – পায়জামা । ছেলেরা নিচে নামলেই সবে মিলে নামাজে বেরোবেন এখন । খানিকের মধ্যে আদ্র আর শুভ্র একসাথে নামলো । দুই ভাইয়ের পড়নেই সাদা পাঞ্জাবি । দুই কর্তা আর তাদের ছেলেরা পুরোপুরি অভিন্ন । দেখলে চোখ ভরে যায় । দাম্ভিক চার বাপ ছেলে ।
মেঘা টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে বসেছে । একখানা আপেল নিয়ে কামড় বসালো । আদ্র নেমেই মোলায়েম কন্ঠে বলল দুই কর্তার উদ্দেশ্যে…….
” চলুন , দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
কর্তারা দাঁড়িয়ে পা বাড়ালেন একসাথে । শাহিনা কাবির তড়িঘড়ি করে কিচেন থেকে বেরোলেন । এই শুক্রবারের দিনটা তার কাছে বেশ ভালো লাগে । বাবা ছেলেরা একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজে বের হয় , এই মুহূর্ত টা দেখা থেকে মিস করেন না তিনি ।
সবাইকে একসাথে বেরোতে দেখে গাল ভরে প্রশান্ত হাসলেন তিনি ।
আচানক নজর সিঁড়ির দিকে যেতেই অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন…..
” রৌদ্র…..
মেঘার কানে পৌঁছেছে নামটা । মেঘা শাহিনা কাবিরের দৃষ্টি অনুসরণ করে সিঁড়ির দিকে তাকালো ।
ফিটফাট হয়ে নেমে আসছে রৌদ্র । পড়নে কালো পাঞ্জাবি । সাদা পাজামা । চুল গুলো সুন্দর মতো গুছিয়ে রাখা । শ্যামলা পুরুষের গড়নের সাথে কালো পাঞ্জাবি টা বেশ ভালোই মানিয়েছে । অবশ্য রৌদ্র কে শ্যামলা বলা চলে না । উজ্জ্বল শ্যামলা বা ফর্সা বললেও ভুল হবে না । সুদর্শন সে । মারাত্মক সুদর্শন । গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি । রৌদ্র চোয়ালে হাত বোলালো ।
অতঃপর পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে দাম্ভিক ভঙ্গিতে নামছে যুবক । আপেলে তৃতীয় কামড় বসাতে গিয়ে থামলো মেঘা । অবিশ্বাস্য বৃহৎ নয়নে তাকিয়ে রইল । রৌদ্র নেমে আসা মাত্রই শাহিনা কাবির প্রশ্ন করলেন ওর পোশাক দেখে….
” এভাবে কোথায় যাচ্ছিস রৌদ্র ?
” নামাজে…
কঠিন ভঙ্গিতে কঠিন জবাব বেপরোয়া ছেলের । শাহিনা কাবির বোধহয় ভুল শুনলেন । চোখ কচলে পুনরায় শুধালেন সন্দিহান হয়ে…..
” হ্যাঁ ?
” মসজিদে যাচ্ছি ।
তব্দা খান ভদ্রমহিলা । দুই কর্তা সহ বাড়ির দুই ছেলেও কন্ঠ শুনে সদরের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছে । তারাও বোধহয় নিজেদের কানকে অবিশ্বাস করলেন । বিষ্মিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন তারাও ।
শাহিনা কাবির গলা ভিজিয়ে তড়তড়িয়ে ডাকেন….
” রুবিনা , কোথায় ? দেখে যা তোর ছেলেকে …
রুবিনা কাবির কিচেন হতে বেরোতেই ছেলেকে দেখলেন সর্বপ্রথম । পাঞ্জাবি পড়ে না রৌদ্র । শেষ কবে পড়েছিলো ,
মনেই নেই । টিশার্টের উপরে ব্লেজার জ্যাকেট । এটাই তার ড্রেসাপ । সাধারনত , সব পোশাকেই রৌদ্র কে মানায় । তবে পাঞ্জাবিতে আরো বেশি । সব ছেলেদেরই বোধহয় মানায় । রৌদ্র কে একটু বেশিইইই ।
রুবিনা কাবির থম মেরে দাঁড়িয়ে দেখেন । এক মুহুর্ত পর পলক ফেলে এগিয়ে এসে বলেন……
” নামাজে যাচ্ছিস ?
” হুঁ…
সহসা হাসি ফুটলো মমতাময়ীর ঠোঁটে । ছলছল করলো দুচোখ ।
” সত্যিই ? আলহামদুলিল্লাহ ! যা বাবা…
শুক্রবারের নামাজ , দেরি হয়ে যাচ্ছে । দেখ , সবাই তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ।
রৌদ্র বেশি পরোয়া করলো না কারোরই । সবাই যে চরম অবাক হয়েছে ওকে দেখে , তা ঠিক বুঝতে পেরেছে বেপরোয়া ছেলে । একসাথে কতগুলো জোড়া দৃষ্টি অবাক লোচনে তাকিয়ে আছে ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৭
পথে কদম বাড়াতে গিয়ে একটু থামলো রৌদ্র । মেঘা এখনো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে । রৌদ্র থেমে বাম দিকে ঘাড় কাত করে । বাঁকা চোখ একবিংশীর সহজ মুখ পানে তাক করে ভরাট কন্ঠে উচ্চারণ করে…..
” আমি জালিম নই । ইডিয়ট……
