অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৮ (২)
তেজরিন উম্মীদ
সকাল থেকে একটা অস্থিরতা গ্রাস করেছে রুশদীকে। একটা জিনিস সে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। সারা ঘর হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে, যেন কোনো ব্যাটারি চালিত যন্ত্র। ফারাজ সকালেই অফিসের যাওয়ার আগে দেখেছিল রুশদী কী যেন একটা খুঁজছে।রাতে অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত ফারাজ যখন রুমে ঢুকলো তখনও দেখল রুশদীর সেই একই কাজে ব্যস্ত।ঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল রুশদী ঝড়ের বেগে ছোটাছুটি করছে। ফারাজ যে ঘরে ঢুকেছে, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।
ফারাজ একটু এগিয়ে গিয়ে দেখল, বিছানার ওপর বই-খাতা দিয়ে শেরকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।মম এর নির্দেশ মেনে শের লক্ষ্মী ছেলের মতো পড়া তৈরিতে ব্যস্ত। তবে পাপাকে দরজায় দেখামাত্রই রোজকার মতো এক ছুটে এসে সে ফারাজের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর টুপটাপ করে কয়েকটা মিষ্টি চুমু এঁকে দিল পাপার গালে। মুখটা সামান্য ফুলিয়ে বলল, “পাপা, তোমার এই প্রতিদিন অফিসে যাওয়া আমার একদম পছন্দ না!”
“তাই? কেন বলো তো?”
“তুমি তো পাইলট, তাহলে রোজ কেন অফিসে যাও? তোমার ছুটির দিনগুলোতেও তুমি সারাদিন অফিসের কাজ নিয়ে থাকো। তোমার সাথে আমি একটুও সময় কাটাতে পারি না। তোমাকে কত মিস করি!”
রুশদীও প্রায়ই ঠিক এই কথাটাই বলে। ফারাজ অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে তাই ওদের নাকি সময় দিতে পারে না—এই অভিযোগ রুশদীর দীর্ঘদিনের।
“বাহ্! তোমাদের মা-ছেলের তো দেখছি দারুণ মিল! তোমার মম-ও আমাকে অফিসে যাওয়া নিয়ে বকাঝকা করে, আর এখন তুমিও নালিশ করছ!”
“করবই তো! তুমি আমাকে আর মমকে টাইম না দিলে আমাদের মন খারাপ হয় না, বলো?”
ফারাজ শেরের নাকে আলতো টোকা দিয়ে বলল, “আচ্ছা বাবা, এবার থেকে প্রতি উইকেন্ডে তোমাদের ঘুরতে নিয়ে যাব। উমম… আর নেক্সট মান্থে আমরা সবাই মিলে সুন্দর কোনো কান্ট্রিতে ট্যুরে যাব, ওকে?”
শেরের চোখ দুটো চকচক করে উঠল, “পিংকি প্রমিজ?”
“পিংকি প্রমিজ!” ফারাজ ছেলের সাথে আঙুল মেলালো।
কথা বলতে বলতেই ফারাজের দৃষ্টি গেল রুশদীর দিকে।সে এখন পড়ার টেবিলের বই-খাতা উল্টেপাল্টে ঘরের একেকটা কোণায় হন্যে হয়ে কিছু একটা খুঁজছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে না পাওয়ার চরম বিরক্তি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। ফারাজের কপালে এবার চিন্তার ভাঁজ পড়ল।কী এমন জিনিস খুঁজছে সে, যার জন্য সারাদিন পর ফারাজ বাসায় ফেরার পরও তা খেয়াল করার সময়টুকু তার হলো না?
ফারাজ শেরেকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার মম কী খুঁজছে, শের?”
“I don’t know, পাপা! সকাল থেকে মম কী যেন একটা খুঁজেই যাচ্ছে। কিন্তু পাচ্ছে না। আমি আস্ক করেছিলাম, মম কোনো আনসার দেয়নি।”
ফারাজ এবার রুশদীর দিকে এগিয়ে গেল,
“কী খুঁজছ তুমি?”
রুশদী আচমকা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। ফারাজকে আচমকা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখের মণি দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। সে খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “কি… কিছু না!”
বলেই রুশদী তড়িঘড়ি করে আবার নিজের কাজে মন দিল। মুখে সে ‘কিছু না’ বললেও ফারাজের অভিজ্ঞ চোখ এড়াল না যে, রুশদী এমন কিছু একটা খুঁজছে যা অত্যন্ত গুরুতর। ফারাজ মনে মনে বেশ অবাক হলো। রুশদী যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, ফারাজ অফিস থেকে ফিরলে সে সব কাজ ফেলে এগিয়ে আসে। ফারাজের কিছু লাগবে কি না, সে ক্লান্ত কি না—সবকিছুর খোঁজ নেয়। অথচ আজ ফারাজ ঘরে আসার পরও সেদিকে খেয়াল না করে সে কিছু একটা খুঁজে চলেছে।
ফারাজ আর কথা বাড়িয়ে তাকে বিরক্ত করল না। শেরকে খানিকটা সময় ট্যাব দেখার অনুমতি দিয়ে সে নিজে ফ্রেশ হতে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ঘরে ফিরে ফারাজ দেখল রুশদীর খোঁজাখুঁজি থামেনি। এখনো সে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পায়নি বোধহয়। এবার সে বিছানার দিকে এগিয়ে গেছে। বিছানার বালিশ, চাদর, ব্ল্যাঙ্কেট—সব টেনেটুনে একাকার করে ফেলেছে।
ঠিক এই সময় রাইমা খানের ডাক পড়ায় শের দাদুর ঘরের দিকে চলে গেল।ফারাজ নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে রুশদীর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল,
“কী খুঁজছ কিছু তো বলো, আমি খুঁজে দিচ্ছি!”
রুশদী মুখ না ফিরিয়ে বলল, “তেমন কিছু না!”
“ঠিক আছে, নিচে খেতে চলো!”
“আমি খাব না! আপনি খেয়ে আসুন!” রুশদীর চটজলদি উত্তর।
ফারাজ এবার শক্ত হাতে রুশদীর বাহু ধরে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হারিয়েছ সেটা তো বলবে? শের বলল সকাল থেকে নাকি কী যেন খুঁজছ, এখনো পাওনি! খুঁজছটা কী, বলবে?”
রুশদীর ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল। মাথাটা তার আপনাআপনি নুয়ে এল। তার অবয়ব জুড়ে এখন এক তীব্র ভীতি কাজ করছে। ফারাজকে সত্যিটা বলতে গিয়ে তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। সে নিজের কোলের ওপর দুহাত রেখে অপরাধীর মতো নখ খুঁটতে লাগল।
তার এই দশা দেখে ফারাজ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “ভয় পাচ্ছ কেন?”
রুশদী এবার এক জোড়া ভীতু চোখে ফারাজের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক রাশ অসহায়ত্ব। ফারাজ একটু হেসে বলল, “তোমাকে এভাবে ভীতু চোখে তাকাতে দেখে আমার সত্যি হাসি পাচ্ছে, রুশদী। তোমাকে কিন্তু এটা একদম মানায় না। তুমি তো মোটেও এমন ভীতু টাইপ মেয়ে নও। তবে আজ ভয় পাচ্ছ কিসের জন্য?”
রুশদী মুখটা সামান্য হাঁ করল। কিছু একটা বলতে চেয়েও তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, কোনো শব্দ বেরোল না।কথাটা যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল। রুশদীর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সে মস্ত বড় কোনো অপরাধ বা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটিয়ে ফেলেছে। নয়তো এমন কুঁকড়ে থাকা, আর চোখে এমন ভীতি—ফারাজের জানামতে রুশদীর ডিকশনারিতে অন্তত এই জিনিসটা নেই।
ফারাজ এবার রুশদীর পায়ের কাছে ফ্লোরের ওপর বসে পড়ল। নিজের বাম হাঁটুর ওপর বাম হাতের কনুই ঠেকিয়ে, আঙুলগুলো কপালে ছুঁইয়ে, ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে রুশদীর মুখের দিকে তাকাল। ফারাজকে এভাবে বসতে দেখে রুশদী তড়িঘড়ি করে আবারও মাথাটা নিচু করে ফেলল। ফারাজ মনে মনে ভাবল—কী হলো এই মেয়ের?
“বলবে তো কী হয়েছে?”
রুশদী নিচু স্বরে, অনেক কষ্টে বলল, “আসলে…!”
“তারপর?” ফারাজ তার চোখের দিকে চাইল।
“আসলে আ…মি…! আপনার, দেওয়া…” রুশদীর কণ্ঠস্বর কাঁপছে।
“এরপর কিছু তো বলো…”
“আমি না আপনার দেওয়া আংটি টা হারিয়ে ফেলেছি!”
রুশদীর কথাটি শুনে ফারাজের যেন হাসি পেল।
, “এতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?”
রুশদী অবাক হয়ে ফারাজের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভেবেছিল অত দামী, লাখ টাকার হিরের আংটি হারিয়ে ফেলার পর ফারাজ বুঝি তার ওপর ভীষণ রাগ করবে। কিন্তু ফারাজের এই মৃদু হাসি আর সহজ উত্তর সে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না। এত দামী একটা জিনিস হারানোর পর ফারাজ যদি রেগে গিয়ে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে বসে—এই ভয়েই তো সকাল থেকে সে কাঠ হয়ে ছিল।
সে অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, “আই অ্যাম সরি! কখন যে আমার হাত থেকে খুলে পড়ে গেছে আমি টের পাইনি। অনেক খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না। আমি সত্যি সরি!”
“এত সরি বলছ কেন? একটা আংটি তো, হারিয়ে গেছে তো গেছে!” ফারাজ যেন বিষয়টিকে পাত্তাই দিল না।
“ওটা বত্রিশ লাখ টাকার ছিল, ফারাজ!”
রুশদী তার চোখ দুটো বড় বড় করে টাকার অঙ্কটা মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।
“এটা কোনো ম্যাটারই না!”
“মজা করছেন? এটা মোটেও মজার বিষয় নয়! আমি বত্রিশ লাখ টাকার একটা আংটি হারিয়ে ফেলেছি!”
“তো কী হয়েছে? বত্রিশ লাখ টাকার আংটি হারিয়েছে, এক কোটির এনে দেব। ওটাও হারালে হান্ড্রেড মিলিয়ন ডলারের আংটি এনে দেবো!”
রুশদী কেমন যেন এক দৃষ্টিতে ফারাজের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারাজ হেসে বলল, “মুড ঠিক করো ইয়ার! তোমার এমন রূপ দেখে তোমাকে অচেনা লাগছে। একটা আংটির জন্য তুমি এভাবে মন খারাপ করে আছো?”
“ওটা আপনার দেওয়া প্রথম উপহার ছিল!” রুশদী নিচু স্বরে তার আসল দুঃখের জায়গাটা প্রকাশ করল।
“হুমহু, ভুল! তোমাকে দেওয়া আমার প্রথম উপহার ছিল আমার মন, আংটি নয়!”
“তবুও, এত দামী একটা আংটি…!”
রুশদী এখনো টাকার অঙ্কটা মাথা থেকে বের করতে পারছে না।
“বাদ দেবে এবার? তুমি কি চাচ্ছো আমি তোমাকে একটা আংটির জন্যনকথা শুনাই?”
“সেটাই তো স্বাভাবিক!”
“আচ্ছা যাও, কথা শুনালাম—তুমি অনেক বোকা, নির্বোধ একটা নারী! একটা আংটি হারিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছ! হয়েছে তো এবার?” ফারাজ কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল।
“আপনি কি মজা করছেন আমার সঙ্গে? আপনার কাছে এটা মজা মনে হচ্ছে?”
“নাহ্!” ফারাজ মুখটা গম্ভীর করার চেষ্টা করল।
“ফারাজ…! আমি বত্রিশ লাখ টাকার একটা আংটি হারিয়ে ফেলেছি! আর আপনি এখনো মজা করছেন?”
“দেখো, টাকা আমার, কিন্তু তা উড়ানোর দায়িত্ব তোমার!”
“ফারাজ, আপনি একটু সিরিয়াস হবেন প্লিজ? এসব ফালতু কথা বাদ দিয়ে একটু আংটিটা খুঁজুন না!” রুশদী প্রায় অনুনয় করে বলল।
“ভাঁড় মে যায়ে আংটি! ভুলে যাও তো এই আংটির কথা!” ফারাজ এবার একটু ধমকের সুরে কিন্তু ভালোবেসে বলল, “কোনো জিনিসের দামের থেকে বেশি মূল্যবান হলো তার অনুভূতি। টাকা খুব সামান্য জিনিস, এটাকে এত বড় করে দেখার কিছু নেই। সামান্য কিছু টাকার আংটির জন্য তুমি এভাবে মুড অফ করে বসে আছ, এটা আমাকে বেশি পেইন দিচ্ছে। এখন মুড ঠিক করো আর চলো, নিচে চলো!”
সিফাতের ঘরের আলো নেভানো। চারপাশে বাঁধা অন্ধকার।সিফাত ঘুমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু চোখের পাতা দুটো কিছুতেই এক হচ্ছে না। মাথার ভেতর অজস্র এলোমেলো চিন্তা আর অনুশোচনার স্রোত বয়ে চলেছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত তিনটা।
পাশেই নিজের শান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সিফাত অন্ধকারের মাঝেই সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কি সব ভেবে চলেছে। মন-মেজাজ একদম ভালো নেই। ভাবল, মনটা হালকা করতে নিজের কোনো এক গার্লফ্রেন্ডকে মেসেজ দিয়ে কিছুক্ষণ চ্যাট করবে। ফোনটা হাতে নিয়ে ইনস্টাগ্রামে ঢুকতেই স্ক্রিনে মিতুর প্রোফাইলটা ভেসে উঠল।
মিতুর হাসিমুখের ছবিটা দেখামাত্রই সিফাতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। জীবনে এই প্রথম নিজের করা কোনো আচরণের জন্য ভেতরে ভেতরে তীব্র অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল তার। মেয়েটাকে ওভাবে অপমান করাটা কি আদৌও ঠিক হয়েছে? দোষটা তো আসলে মিতুর ছিল না, দোষটা তো তারই ছিল! তার দিক থেকেই তো মিতু বারবার পজিটিভ সিগন্যাল পেয়েছিল। আর সেই প্রশ্রয় পেয়েই তো মেয়েটা তার প্রতি দুর্বল হতে শুরু করেছিল। সে যদি প্রথম থেকেই মিতুকে ইগনোর করে চলত, তবে আজ পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না। মিতুকে বোধহয় বড্ড বেশি আজেবাজে কথা শুনিয়ে ফেলেছে সে। তার চোখের সামনে মিতুর সেই কান্নাভেজা, অসহায় মুখটা বারবার ভেসে উঠতে লাগল। মেয়েটা কতখানি কষ্ট পেয়ে ওভাবে কেঁদেছিল!
সিফাত অন্ধকারের মাঝেই শানের দিকে মাথা কাত করে নিচু স্বরে ডাকল, “শান…!”
ওপাশ থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। শানের ঘুম ভাঙেনি দেখে সিফাত এবার একটু জোরে ডাকল,
“শান…!”
“কী হয়েছে?” শানের ঘুমকাতুর, জড়িয়ে কণ্ঠস্বর।
সিফাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে আচমকাই প্রশ্ন করল, “হোয়াট ইজ লাভ?”
প্রশ্নটা শুনে শানের ঘুম যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।সিফাত আর ভালোবাসা?হাস্যকর!সে বিরক্ত হয়ে বলল, “ভূতে ধরেছে তোকে? রাত তিনটায় ভালোবাসা কী, তা জিজ্ঞেস করছিস? তা জেনে তোর কী লাভ?
তুই তো কাউকে কোনোদিন সত্যিকারের ভালোবাস…”
“তোকে যা আস্ক করছি, সেটার আনসার দিবি। ফালতু কথা বাদ দিয়ে জাস্ট আনসার মাই কোশ্চেন!”
সিফাত ধমকের সুরে শানের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল।সিফাতের গলার স্বর কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল শানের কাছে। সে আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারল না। এক লাফে উঠে বসে বেডের পাশের সুইচটা টিপে ঘরের লাইটটা অন করে দিল। সিফাতের মুখের দিকে তাকিয়ে শানের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
“ইয়ার, তুই কি প্রেমে পড়েছিস নাকি? হা হা! হাউ দিস ইজ পসিবল?”
“তুই সবসময় এক লাইন বেশি বুঝিস কেন? তোকে কি আমি একবারও বলেছি যে আমি কারও প্রেমে পড়েছি?” সিফাত চটে গিয়ে বলল।
“তাহলে তোর আর ভালোবাসা কী তা জানতে হবে না, তুই চুপচাপ ঘুমা!” শান আবার শুয়ে পড়ার ভান করল।
“শান, রাগাবি না কিন্তু!” সিফাত একটু থেমে,মিতুর স্বভান গুলো মনে পড়তে থাকলো তার।নরম স্বরে কথা বলা, ভিতু চোখে তাকালো।মুচকি হাসি! সিফাত গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল,
“হোয়াট ইজ লাভ? এট্রাকশন ওড় অবজেশন?”
“দু্টোর একটাও লাভ না।”
”
দেন হোয়াট ইজ লাভ?” সিফাতের কণ্ঠে এক অদ্ভুত আকুলতা।
শান আলতো হেসে বলল, “লাভ ইজ… লাভ!”
সিফাত বিছানায় উঠে বসল। কোলের বালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে উৎসুক গলায় বলল,
“লাভ, অ্যাট্রাকশন আর অবসেশন—এই তিনটের ডেফিনেশন কী রে ভাই?”
শান শান্ত গলায় উত্তর দিল, “অ্যাট্রাকশন হলো, একটা সুন্দর ফুল দেখে সেটাকে ছিঁড়ে ফেলার তীব্র ইচ্ছা। অর্থাৎ, কেবল তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের মোহে পড়া। অবসেশন হলো, সেই ফুলটাকে ছিঁড়ে নিজের বৃত্তে বন্দি করে রাখার একটা জেদ।আর ভালোবাসা হলো, সেই ফুলটার গোড়ায় প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দেওয়া, যাতে সে নিজের মতো করে ডালপালা মেলে ফুটে থাকতে পারে…!”
“ধ্যাৎ! এত কথা আমি বুঝি না। একটু সহজ ভাষায় বল।”
“তুই কি প্রেমে পড়েছিস?”
শানের প্রশ্নটা শুনে সিফাত কিছুক্ষণের জন্য একদম চুপ হয়ে গেল।সে প্রেমে পড়ার মত ছেলে?
“নাহ্!”
“প্রেমে পড়লে এমনিতেই চিনতি ভালোবাসা কী। তখন আর সংজ্ঞা খুঁজতে হতো না, নিজেই অনুভব করতে পারতি…!”
মিতুকে অপমান করার সময় তার অশ্রুসিক্ত চোখ জোড়া মনে পড়তেই, সিফাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভাই! আমি জীবনে কখনো কোনো বিষয় নিয়ে আফসোস করি না। কিন্তু আজ কেন জানি আফসোস হচ্ছে!”
“আমি নিশ্চিত, তুই প্রেমে পড়েছিস!”
“অসম্ভব! ‘
শান যদিও বুঝছিল,এবার সিফাত সত্যি প্রেমে পড়েছে।তবুও বলল,
“তাহলে এসব ফালতু প্রশ্ন বাদ দিয়ে চুপচাপ ঘুমা। আমাকেও ঘুমাতে দে!”
সিফাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে আচমকা বলল,
“ইয়ার, শোন না। তোর আগে যদি আমি হুট করে বিয়েটা করে ফেলি, তুই কি সেন্টি খাবি?”
শান লাফিয়ে উঠল,
“মাথা ঠিক আছে তোর? কী সব আবোলতাবোল বকছিস!”
“আচ্ছা, ঘুমা তুই!”
সিফাত আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের লাইটটা অফ করে দিল। তারপর গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা ভালো করে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। সিফাতের কথাগুলো শুনে শানের মাথা ঝিমঝিম করছে। সিফাত বলে কী! বিছানায় শুয়েও সে শান্ত হতে পারল না।সিফাতের গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে দিয়ে বলল, “তোর মাথায় নিউটনের কোন সূত্র ঘুরপাক খাচ্ছে, একটু বলবি আমাকে?”
“বেশি কিছু না, শুধু চাচা হওয়ার জন্য রেডি থাক!”
“এই ভাই, সত্যি বলছি আমার মাথা ঘুরছে! কার সাথে কী কেলেঙ্কারি করে ধরা খেয়েছিস তুই, বল তো?”
“তোর কি আমা চিপা-চাপায় যাওয়া লোক মনে হয়?”
“হ্যাঁ, মনে হয়!তোকে কিন্তু আমার মোটেও সুবিধার ঠেকছে না। কার প্রেমে পড়েছিস, বল না ভাই! তুই সিরিয়াস রিলেশনশীপে আছিস আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তার ওপর আবার বিয়ে! আমি এখন খুশিতে হাসব নাকি কাঁদব, বুঝতে পারছি না।”
“খুশিতে ল্যাংটা হয়ে নাচ গিয়ে যা, শ্লা…!”
“তুই সত্যি সিরিয়াস? বিয়ে করবি?”
“কেন? আমাকে কি হিজরা যে আমি বিয়ে করতে পারব না!”
শেরের বয়স তখন সবেমাত্র বছর দুই নয় মাসের মতো। বাচ্চাটা বেশ পাকা পাকা কথা শিখে গেছে।পাপাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। ফারাজ চোখের আড়াল হলেই সারা বাড়ি মাথায় তুলে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। এই কারণে ফ্লাইটের ট্রিপে যাওয়ার সময় ফারাজকে বেশ বিপাকে পড়তে হয়। ট্যুরে গিয়েও তার মন পড়ে থাকে বাড়িতে, সারাক্ষণ একটা চিন্তাই মাথায় ঘোরে—শের আবার কাঁদছে না তো?প্রতিদিন শেরের চোখ ফাঁকি দিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে বাসা থেকে বের হতে হয়। শের যদি একবার টের পায় পাপা যাচ্ছে, তবে আর রক্ষা নেই; কান্নার রোল তুলে, কিছুতেই যেতে দেবে না।
আজকেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। ফারাজ যখন ব্যাগ গুছিয়ে বের হবে, তখনই শের ঘুম থেকে জেগে যায়। পাপাকে দেখামাত্রই সে জাপটে ধরল, কিছুতেই যেতে দেবে না।বেশ কষ্ট করেই ফারাজকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে।
ফারাজ বাসায় না থাকলে শের সাধারণত রাইমা খান কিংবা তার চাচু শানের সঙ্গেই সময় কাটায়। শান যখন শেরকে নিয়ে দুষ্টুমিতে মাতে, শের তখন কিছুক্ষণের জন্য হলেও পাপার অভাব ভুলে যায়।
আজ ফারাজ ট্রিপে চলে যাওয়ার পর শের অনেকক্ষণ কেঁদেকুটে ক্লান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। দুপুরে যখন তাকে খাওয়ানোর জন্য ঘুম থেকে তোলা হলো, সে কিছুতেই মুখে খাবার তুলতে চাইল না। রাইমা খান নিজে চামচ হাতে নিয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করলেন, মুখে নানা রকম মজার আওয়াজ করে খাওয়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। শেষমেশ শেরকে খাওয়ানোর দায়িত্ব এসে পড়ল শানের ঘাড়ে। শান হরেক রকম গল্প বলে, মজার ছলে শেরকে ভোলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কোনো কাজ হলো না। উল্টো শেরের টইটম্বুর চোখ দুটোতে জল টলমল করে উঠল। সে কাঁদোকাঁদো গলায় ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে বলল, “পাপাকে কল দাও, পাপা ছালা ভালু নাগে না!”
ফারাজ এখন ফ্লাইটে আছে। এখন তো কোনোভাবেই তাকে কল দেওয়া সম্ভব নয়। শান পরিস্থিতি সামাল দিতে শেরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “পাপা তো এখন অনেক বিজি আছে, শের। তুমি লক্ষ্মী ছেলের মতো আগে খাবারটা খেয়ে নাও, তারপর আমরা পাপাকে কল দেব, ওকে?”
কিন্তু শের নাছোড়বান্দা। পাপা ছাড়া সে খাবারও মুখে দেবে না। এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বাড়ির সবাই মিলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাকে সামান্য কিছু খাওয়ানো গেল।
রাত হতেই আবার আরেক ঝামেলা।রোজ রাতে সে পাপার বুকে মাথা রেখে ঘুমায়,আজ তো পাপা নেই। শানের সঙ্গে বিছানায় শুতে গিয়েই ছোট্ট শেরের আবার পাপার কথা মনে পড়ে গেল। সে পাপাকে ছাড়া কিছুতেই ঘুমাবে না। শান একা কোনোভাবেই শেরকে সামলাতে পারছিল না। অবস্থা বেগতিক দেখে মাঝরাতে সিফাতকেও তার বাড়ি থেকে জোর করে ধরে আনা হলো খান বাড়িতে। কিন্তু সিফাত এসেও কোনো জাদু দেখাতে পারল না। শেরের কান্না থামানো তো দূর, উল্টো তার কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। বাড়ির সবাই মিলে এক জোট হয়েও এই দুই বছরের বাচ্চার কান্না থামাতে হিমশিম খেয়ে গেল।
এদিকে বাড়িতে ছেলের এই অবস্থার কথা জানতে পেরে ফারাজ আর স্থির থাকতে পারল না। মাঝপথেই নিজের ট্রিপ ক্যানসেল করে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তবে তার ফিরতে ফিরতে রাতের পেরিয়ে সকাল হয়ে গেল।
শের তখনো ঘু মায়নি। সারারাত কেঁদে কেঁদে তার চোখের কোণগুলো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, এখনো সে কিছুক্ষণ পর পর নাক টানছে।সিফাত আর শান ওকে কোলে নিয়ে একটু শান্ত করার জন্য নিচে লনে হাঁটাহাঁটি করছিল।
তখনই খান বাড়িতে ফারাজের গাড়িটা ভেতরে প্রবেশ করল।
গাড়ির শব্দ পেয়ে শান আর সিফাত সেদিকে তাকাল। ফারাজ গাড়ি থামাতিরই দ্রুত নেমে এল। দূর থেকে পাপাকে দেখামাত্রই শের লনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আবার কেঁদে উঠল। ফারাজ গিয়ে ছেলেকেনিজের কোলে তুলে নিল। শেরের কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “সারারাত নাকি খুব কেঁদেছ? একটুও ঘুমাওনি,পপা?”
“তোমাকে ছালা ভালু লাগে না…!”
“কেন ভালো লাগে না, বাবা?”
“কেমুন কেমুন নাগে!”
“কেমন কেমন লাগে…?”
“কসটু কসটু লাগে!”
“কোথায় কষ্ট লাগে?”
শের তার ছোট্ট মাথাটা পাপা কাঁধ থেকে তুলল। তারপর নিজের কচি আঙুলটা দিয়ে বুকের বাঁ পাশে হৃদযন্ত্রের ওপর ইশারা করে দেখিয়ে বলল, “একানে…!”
“পাপা এসে গেছি তো, এখন খুশি লাগছে?”
“হুম…!” শের বাবার গলা জড়িয়ে ধরে চোখ দুটো বুজল।
…পুরোনো কথাগুলো হঠাৎ করেই আজ বড় বেশি মনে পড়ছিল ফারাজের। সে এখন নিজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস রুমের চেয়ারটায় বসে আছে। চারপাশের ফাইলের স্তূপ আর ব্যস্ততার মাঝেও ছেলের ছোটবেলার কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। গ্যালারি হাতড়াতেই সামনে এল শেরের ছোটবেলার অজস্র ছবি আর ভিডিও। ফারাজ স্ক্রিন স্ক্রল করে একটা ভিডিও প্লে করল।
ভিডিওটা বছর দুয়েক আগের হবে বোধহয়। ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে শের বিছানায় বসে মন দিয়ে তার খেলনা গাড়িগুলো নিয়ে খেলছে। তার ঠিক পাশেই আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে শান। ফারাজ ক্যামেরাটা ওদের দিকে তাক করল, শান তখন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। ফারাজের কণ্ঠস্বর ভিডিওতে শোনা গেল,
“শের, তুমি যেন কী বললা? আবার বলো তো!”
শের খেলনা থেকে চোখ না তুলেই আধো-আধো গলায় বলল, “কী বলচি…?”
“আই লাভ ইউ মানে কী?” ফারাজ ক্যামেরাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আইলাপিও মানে ভালুপাশা!”
শের এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
“ভালোবাসা যেন কী?”
“যার নেই কোনো আশা, তাকে বলে ভালুপাশা!”
একথা বলতেই শেরের কথার ঢঙে শান আর ফারাজ দুজনেই একসাথে শব্দ করে হেসে উঠল। ফারাজ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “এইসব উল্টোপাল্টা কথা কে শিখিয়েছে তোমাকে?”
শের তার ছোট্ট আঙুলটা শানের দিকে তাক করে বলল, “চাচু শিকাইছে!”
“আর কী শিখিয়েছে তোমার চাচু?”
“এক বড়ো না দুই বড়ো, ফারাজ বায়ের মন বড়ো!”
“আর?”
“ভাতের সাথে লেবু, আই লাবু বাবু!”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৮
“এসব কী আজেবাজে কথা শিখিয়েছে তোমাকে! হা হা…আর কী কী শিখিয়েছে তোমার চাচু, শুনি?”
“ভাত খাই দৈনিক, আমরা ফারাজ বায়ের সৈনিক!”
ভিডিওতে ফারাজের হাসির শব্দটা আরও জোরালো হলো।
“তা আমি কি তোমার ভাই লাগি যে ফারাজ ভাই বলছ?”
“চাচু শিকাইছে তো!”
