Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৭

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৭

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৭
তেজরিন উম্মীদ

নিঝুম রাত। চারপাশটা নিস্তব্ধ। শের সেই কখন থেকে গভীর ঘুমে মগ্ন। অথচ রুশদীর চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। এক বুক বিষণ্ণতা আর ব্যাকুলতা নিয়ে সে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে। মনটা তার ভীষণ খারাপ। ফারাজের একটিমাত্র কল বা বার্তার আশায় সে চাতক পাখির মতো মোবাইলের পানে চেয়ে বসে আছে। ফারাজ যখনই কোনো ট্যুরে যায়, রুশদী নিজে থেকে কখনো কল বা মেসেজ দেয় না। যদি সে ব্যস্ত থাকে? অকারণ বিরক্তির কারণ হতে রুশদীর ভীষণ দ্বিধা জাগে। কিন্তু হিসাব অনুযায়ী, ফারাজের এতক্ষণে ল্যান্ড করার কথা। হয়তো এতক্ষণে হোটেলেও পৌঁছে গেছে। তবে এখনো কেন সে একটা কল করল না? রুশদী ফোনটা বুকের ওপর আলতো করে চেপে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা অধীর আগ্রহে দুলছে—কখন স্ক্রিনটা আলো হয়ে উঠবে? কখন প্রিয় মানুষটার নাম ভেসে উঠবে? কিন্তু ফারাজের কোনো খোঁজ নেই। এক দীর্ঘশ্বাস রুশদীর ঠোঁট গলে বেরিয়ে এলো।

ঠিক তখনই আচমকা ফোনটা কেঁপে উঠল। চিরচেনা রিংটোনটা বেজে উঠতেই রুশদীর হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ফারাজ কল করেছে?একরাশ তীব্র আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে সে তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিল। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আনন্দের সেই রঙিন ফানুস মুহূর্তে চুপসে গেল। কোনো চেনা নাম নয়, স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সিম কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারের নম্বর। মুহূর্তেই মেজাজটা বিগড়ে গেল তার। একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে ফোনটা পাশে ছুড়ে ফেলে দিল সে। কিন্তু শান্তি নেই। কিছুক্ষণ পর আবার বেজে উঠল ফোন। রুশদী ভাবল, এবার নিশ্চয়ই ফারাজ! মনের ভেতরের সুপ্ত আশাটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। কিন্তু না, এবারও সেই একই উপদ্রব! কাস্টমার কেয়ার নম্বর। চরম বিরক্তিতে রুশদী কলটা কেটে দিল। কিন্তু ওপাশ থেকে যেন জেদ চেপেছে। একের পর এক কল এসেই যাচ্ছে। সে কাটতে কাটতে ক্লান্ত, বিরক্ত। এই মাঝরাতে সিম কোম্পানির কি কোনো কাজ নেই? তাকেই কেন বারবার এভাবে জ্বালানো হচ্ছে? একদিকে ফারাজের জনঢ় বুকের ভেতর একটা শূন্য উদাসীনতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে এই অসহ্য জ্বালাতন। আর সহ্য করতে না পেরে রুশদী ফোনটা সাইলেন্ট করে উপুড় করে রেখে দিল।

এদিকে হোটেলের বিলাসবহুল রুমে বসে ফারাজের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। সে একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে রুশদীকে, আর ওপাশ থেকে প্রতিবারই কলটা কেটে দেওয়া হচ্ছে। ফারাজ ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। রুশদী এমন করছে কেন? সে কি কোনো কারণে রেগে আছে, নাকি কোনো সমস্যা হলো? এক, দুই, তিন করতে করতে ফারাজ একশোবারেরও বেশি চেষ্টা করল। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মিলল না।ফারাজের ভেতরের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিল। আর কোনো উপায় না দেখে, গভীর রাতেই সে ফোন করল রাইমা খানকে। ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ফোন রিসিভ হতেই ফারাজ ব্যাকুল হয়ে বলল,
“হ্যালো আম্মি, একটু রুমে গিয়ে দেখবে রুশদীর কিছু হয়েছে কি না? ও আমার কোনো কল ধরছে না!”
রাইমা খান ছেলের কণ্ঠের এই চরম উদ্বেগ টের পেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। গম্ভীর কিন্তু আশ্বস্ত করার সুরে বললেন,
“তুমি লাইনে থাক ফারাজ, আমি গিয়ে দেখছি!”

রাইমা খান রুশদীর দরজার সামনে এসে মৃদু করাঘাত করলেন। মাঝরাতে দরজায় টোকা পড়ার শব্দে রুশদী কিছুটা চমকে উঠল। বিছানা ছেড়ে গিয়ে ছিটকিনিটা খুলতেই সামনে শাশুড়িকে দেখে সে অবাক হলো। চোখে-মুখে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আম্মি? এত রাতে কোনো সমস্যা হয়েছে?”
রাইমা খান কোনো ভূমিকা না করে নিজের হাতের ফোনটা রুশদীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। গম্ভীর কিন্তু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “ফারাজ সেই কখন থেকে তোমাকে কল করছে, তুমি নাকি কল ধরছ না! ও এখনো লাইনে আছে, কথা বলো ওর সাথে।”
ফোনটা রুশদীর হাতে দিয়ে রাইমা খান আর দাঁড়ালেন না, নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রুশদী দরজাটা আবার লক করে দিয়ে ফোনটা কানে ধরল। মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ফারাজ তাকে কখন কল করল? সে তো ফোনের দিকেই চাতকের মতো তাকিয়ে ছিল!ফারাজের নাম্বার থেকে তো কোন কল আসেনি।ধক করে ওঠা বুক আর কাঁপো কাঁপো গলায় সে বলল, “হ্যালো…!”

ওপাশ থেকে ফারাজের গলা ভেসে এলো, তীব্র ক্ষোভ আর দুশ্চিন্তা মেশানো কণ্ঠস্বর, “কল ধরছ না কেন এতক্ষণ?”
রুশদীও একটু অভিমানী সুরে উত্তর দিল, “আপনি কল দিলে তো ধরব!”
“তোমাকে আমি একশোরও বেশি কল দিয়েছি, রুশদী!” ফারাজের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট বিরক্তি।
“কই, মিথ্যা কথা!” রুশদী সোজা নাকচ করে দিল।
“তোমার ফোনটা কোথায়? আগে নিজের ফোনটা চেক করো!” ফারাজ ওপাশ থেকে প্রায় ধমকে উঠল।
রুশদী বিছানায় গিয়ে বসল এবং নিজের ফোনটা হাতে নিল। কল লিস্ট ঘেঁটে কোথাও ফারাজের নাম বা নম্বর দেখতে পেল না। সে বেশ জোর দিয়েই বলল, “কই, আমার ফোনে তো কোনো কল আসেনি! আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনি বরং এখন আমার ফোনে একটা কল দিন তো, দেখি আসে কি না!”

ফারাজ আর কথা না বাড়িয়ে লাইনের কলটা কেটে দিল। তার পরের মুহূর্তেই রুশদীর ফোনে হোয়াটসঅ্যাপের রিংটোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই রুশদীর চোখ চড়কগাছে! আবার সেই কাস্টমার কেয়ারের মতো দেখতে অদ্ভুত নম্বরটি—’২২২০০’ ভেসে উঠেছে। কল লিস্ট চেক করে দেখে, এই নম্বর থেকে মোট ২০৭ বার কল এসেছে!
রুশদী এবার নিজের কপালে হাত দিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। তার মাথা তখন নিজের বোকামির চোটে চক্কর খাচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপে কখনো সিম কোম্পানি থেকে কল আসে? হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেল, ফারাজের ওপর কোনো এক রাগের কারনে সে তার নম্বরটি একটি কাস্টমার কেয়ারের কোড নম্বর দিয়ে সেভ করে রেখেছিল। আর এই অদ্ভুত কাণ্ডের কথা একেবারে ভুলেই গেছে! ওদিকে বেচারা ফারাজ কল দিয়ে গেছে, আর সে সিম কোম্পানির উপদ্রব ভেবে প্রতিবার কল কেটে দিয়েছে! লজ্জায়, মণ্ডপাতে রুশদী এবার কলটা রিসিভ করে আমতা আমতা করে বলল, “হ্যাঁ… হ্যালো…!”

ওপাশ থেকে ফারাজ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “পেয়েছ এবার প্রমাণ? দেখেছ আমি তোমাকে কতবার কল করেছি?”
রুশদী জিব কেটে ভীষণ অপরাধী গলায় বলল, “আসলে… আমি আপনার নম্বরটা সিম কোম্পানির নম্বর দিয়ে সেভ করে রেখেছিলাম। তাই কাস্টমার কেয়ার ভেবে ভুলে কেটে দিয়েছি…”
হা?শেষমেষ এই নাম দিয়ে ফারাজ এর নাম্বার সেভ করেছে তার বউ? ফারাজ ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, “ওহে গর্ধব নারী! এমন এক গর্ধব আমার কপালেই ছিল?”
অপমানটা গায়ে লাগল রুশদীর। সে ঠোঁট উল্টে পালটা জবাব দিল, “আপনি নিজে একটা গর্ধব!”
“তুমি!”
“আপনি!” রুশদীও দমবার পাত্র নয়।
“তর্ক রাখো!শের কোথায় এখন?”
রুশদী ঘুমন্ত শের এর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “ঘুমের দেশে। অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।”

“রাতে খেয়েছ কিছু?”
প্রশ্নটা আচমকা আসায় রুশদী থতমত খেয়ে গেল,না বললেই বকার ঝুড়ি খুলে বসবে। “নাহ্… হ্যাঁ!”
“নাহ্ নাকি হ্যাঁ? কোনটা?”
“জানি না!” রুশদী সত্যিটা এড়াতে চাইল।
“তার মানে খাওনি।” ফারাজের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট শাসন, “না খেয়ে থেকে নিজেকে কষ্ট দিয়ে কী এমন মজা পাও, শুনি?”
“বহুত মজা! আপনি তা বুঝবেন না।ওসব ছাড়ুন, আসবেন কবে বলুন আগে?”
ওপাশ থেকে ফারাজের ঠোঁটের কোণের মৃদু হাসিটা যেন মুঠোফোনের তরঙ্গ পেরিয়ে রুশদীর কানে এসে পৌঁছাল। ফারাজ খুব আস্তে করে, গভীর এক আশ্বাসে বলল, “কালকে…!”
এরপর ওরা বেশকিছুক্ষন কথা বলল। রুশদী ভেবেছিল ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু না ঘুমিয়ে সে টেবিলের ল্যাম্পটা জ্বেলে বসল। সামনেই পড়ে আছে ভর্তি পরীক্ষার মোটা বইগুলো। মনটাকে শক্ত করে, সব চিন্তা দূরে ঠেলে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে আবার পড়তে বসল।

ফারাজের আজই ফিরবে বলেছিল, তবে এখনও আসেনি।এদিকে রুশদী এক বুক মহা অপেক্ষা আর ব্যাকুলতা নিয়ে সে তার স্বামীর পথ চেয়ে বসেছিল। ইদানীং ফারাজের সঙ্গে সম্পর্কটা যত গভীর হচ্ছে, লোকটাকে ছাড়া রুশদীর যেন আর কিছুই ভালো লাগে না। ফারাজ পাশে থাকলে মনের ভেতর অন্যরকম এক প্রশান্তি অনুভূত হয়, এক অদ্ভুত ভালো লাগা এসে ঘিরে ধরে তাকে। ট্রিপে কিংবা ফারাজ যখন অফিসে থাকে—রুশদীর পুরো সময়টা যেন এক চরম একঘেয়েমিতে কাটে। অকারণেই বারবার ওই মানুষটার কথাই মনে পড়ে। একমাত্র যখন সে পড়ার টেবিলে মন দেয়, কেবল তখনই সময়টা একটু দ্রুত কাটে।

মাঝে মাঝে রুশদী নিজেই ভেবে অবাক হয়, ইশশ! তার জীবনটা কত দ্রুত বদলে গেল, তাই না? বিয়ের পর মেয়েদের শুধু নাম বা পরিচয় নয়, পুরো দুনিয়াটা বলদে যায়। আগে সে ছিল স্বাধীন,চঞ্চল,একটু বেয়াদব রুমাইসা হক রুশদী; আর আজ তার পরিচয় সে মিসেস খান—মিসেস শারফারাজ খান।
আজ রুশদী একটি বিশেষ কাণ্ড করেছে, সে শাড়ি পরেছে। ফারাজ তাকে প্রায়ই শাড়ি পরে থাকার কথা বলে। কিন্তু রুশদী শাড়িতে একদমই অভ্যস্ত নয় বলে সচরাচর তা পরা হয় না। আজ ফারাজকে চমকে দেওয়ার জন্য আলমারি ঘেঁটে সে একটা আকাশী আর গোলাপি রঙের মিশ্রণের চমৎকার জামদানি শাড়ি পরেছে। শাড়িটা জড়িয়ে সে এসে দাঁড়াল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে। আলতো হাতে পিঠ অবধি ছড়িয়ে থাকা মেঘবরণ চুলগুলো খুলে দিল।চোখে সামান্য আইলাইনারের ছোঁয়া, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক আর কপালে একটা ছোট্ট টিপ—ব্যস, এই সামান্য সাজেই তাকে যেন কোনো এক রূপকথার রাজকন্যার মতো অপার্থিব লাগছিল। জামদানির জমিনে তার গায়ের রঙটা যেন আরও বেশি খোলতাই হয়েছে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে রুশদী নিজেই কিছুটা আড়ষ্ট বোধ করল, আবার একটুস খানি হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল। ফারাজ আজ দেখলে নিশ্চিত চোখ ফেরাতে পারত না!অবাক হবে নিশ্চয়ই লোকটা তাকে শাড়ি পড়তে দেখে?
ঠিক তখনই ছোট্ট শের রুমে প্রবেশ করল। মমকে এমন অপরূপ সাজে, শাড়িতে দেখে পুচকুটা দরজার কাছে গালে হাত দিয়ে একেবারে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার কচি চোখ দুটো বিস্ময়ে আর মুগ্ধতায় বড় বড় হয়ে উঠল। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো উচ্চারণ করল,

“ওাহ্..! তোমাকে কত্ত গুলা সুন্দর লাগছে মম!”
পিছন থেকে শেরের এই মিষ্টি কণ্ঠ শুনে রুশদী চমকে ঘুরে তাকাল। এই পুচকুটার এমন জহুরির মতো পারখ আর মুগ্ধ চাউনি দেখে সে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল। দুই হাত দিয়ে নিজের রাঙা হয়ে ওঠা মুখটা চেপে ধরে, লজ্জা সামলানোর চেষ্টা করে হেসে বলল,
“আসলেও এত্ত গুলা সুন্দর লাগছে আমাকে?”
শের দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে সোৎসাহে বলল, “হুম! ইউ আর দ্য মোস্ট বিউটিফুল মম অফ দ্য ওয়ার্ল্ড! তোমার মতো সুন্দর আর কেউ নেই। আমার পাপার একদম পারফেক্ট ওয়াইফ!”
পুচকু ছেলের মুখে এত বড় বড় পাকা কথা শুনে রুশদীর হেসে উঠল। সে শাড়ির কুঁচিটা এক হাতে একটু টেনে নিচু হয়ে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে শেরের মুখোমুখি বসল। শেরের তুলতুলে দুই গালে হাত রেখে নরম গলায় বলল, “ওরে আমার পাকনা ছেলে! তুমি জানো তুমি নিজে কত্ত সুন্দর? তুমি হলে পৃথিবীর সেরা সুন্দর, কারণ তোমার কাছে একটা ভীষণ সুন্দর মন আছে। আর তোমার মনটা এত ভালো বলেই তো আমাকে তোমার এত্ত সুন্দর মনে হয়। এখন ভালো ছেলের মতো মমকে একটা উম্মাহ্ দাও তো দেখি!”

রুশদী নিজের গালটা আদুরে ভঙ্গিতে এগিয়ে দিতেই শের আর কার্পণ্য করল না। সে এক-আধটা নয়, একেবারে টপাটপ আট-দশটা চুমু খেয়ে বসল মমর গালে।রুশদী ফিক করে হেসে ফেলল। এরপর খুব সাবধানে শাড়িটা সামলে নিয়ে সে শেরকে নিজের কোলে তুলে নিল। বিছানায় আরাম করে বসে পুচকুটাকে কোলের ওপর বসিয়ে শুরু হলো তাদের রোজকার গল্পগুজব আর খুনসুটি।
রুশদীর এই বাচ্চাটার সাথে কথা বলতে ভীষণ ভালো লাগে। শের যেদিন প্রথম তাকে বলেছিল,রুশদীর বাবা তাকে ভালোবাসে না তো কি হয়েছে?শের তো তার বাবাই,সে অনেক গুলা ভালোবাসে তার মেয়েকে। সেদিন থেকেই এই এক ফোঁটা বাচ্চার প্রতি তার ভালোবাসা যেন আকাশ ছুঁয়েছিল। নিজের অজান্তেই শের তার কলিজার টুকরো হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই চঞ্চল শেরের মুখটা কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে আচমকা প্রশ্ন করল, “জানো মম, আমি সবার কাছে শুনেছি সৎ মারা নাকি বাচ্চাদের একটুও ভালোবাসে না? অনেক পচা ব্যবহার করে। তুমি তাহলে আমাকে এত ভালোবাসো কেন?”

শেরের মুখে এমন একটা স্পর্শকাতর প্রশ্ন শুনে রুশদীর বুকটা এক মুহূর্তের জন্য মোচড় দিয়ে উঠল। তবে সে নিজের ভেতরের আবেগ সামলে নিয়ে আলতো করে হাসল। শেরের চুলে বিলি কেটে দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল, “অনেকে তো সৎ মা-কে পছন্দও করে না,ভালোবাসে না। তাহলে তুমি কেন আমাকে এত ভালোবাসো?”
শের এক মুহূর্তও দেরি না করে খুব সহজ-সরল গলায় উত্তর দিল, “কারণ তুমি আমার মম, তাই! এবার তুমি বলো, তুমি কেন আমাকে এত ভালোবাসো?”
রুশদী শেরকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় বলল, “আমি তোমাকে সৎ ছেলে নয়, একদম নিজের বাবু মনে করি, তাই ভালোবাসি। সত্যি বলতে, তুমি আমাকে যতটা ভালোবাসো, আমি হয়তো এখনো তোমাকে ঠিক ততটা ভালোবাসতে পারিনি। আর তাছাড়া, তোমার মতো এমন একটা কিউট বাবুকে কি না বেসে থাকা যায়, বলো?”
রুশদীর বুকে মাথা রেখে শের এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পেল, আর রুশদীর মনে হলো—রক্তের সম্পর্ক না হলেও মনের এই অটুট বাঁধন পৃথিবীর যেকোনো সম্পর্কের চেয়েও মধুর।

ফারাজের আসার কোনো খবর না পেয়ে রুশদী নিজেই তাকে কল করল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই রুশদী একটু অভিমানী গলায় জিজ্ঞেস করল, “হ্যালো, কোথায় আপনি?”
“হোটেলে আছি,” ফারাজের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
“দেশে আসেননি এখনো?” রুশদীর কণ্ঠে তখন একরাশ হতাশা।
“নাহ্! আজকে আর আসা হবে না। ট্রিপটা একটু ডিলে হয়েছে, আগামীকাল ফ্লাইট।”
কথাটা শোনামাত্রই রুশদীর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বুকের ভেতর জমানো সব উৎসাহ মুহূর্তেই দমে গেল। সে কোনোমতে বলল, “ওহ্! আচ্ছা রাখি, পরে কথা হবে।”
ফারাজ নিজেই বলেছিল আজ সন্ধ্যার মধ্যে সে বাসায় থাকবে। আর তাকে একটা বড়সড় সারপ্রাইজ দিতেই রুশদী আজ অনেকদিন পর এত কষ্ট করে শাড়ি পরেছিল। এমনিতে সে সবসময় সাধারণ থ্রি-পিস পরেই থাকে।বেচারি মন খারাপ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে শাড়ির পিনগুলো একে একে খুলতে লাগল। গহনা আর সাজগোজের অনুষঙ্গগুলো তুলে রেখে, শাড়িটা বদলে সে আবার তার চেনা রূপ—একটা সাদা আর গোলাপি রঙের মিশ্রণের থ্রি-পিস পরে নিল। মনের ভেতরের সবটুকু আনন্দ যেন এক নিমেষে উবে গেছে।
এতক্ষণ শের রুশদীর রুমেই ছিল, এখন সে মিতুর সাথে গল্প করতে গেছে। আর সিফাত হয় বাসায় ঘুমাচ্ছে, নয়তো কোনো ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছে। শানও এই মুহূর্তে লাপাত্তা।ফারাজ যখন খান বাড়িতে প্রবেশ করল, রাইমা খান তখন ড্রয়িং রুম পার হচ্ছিলেন। হুট করে ছেলেকে সামনে দেখে তিনি চমকে উঠলেন। অবাক হয়ে বললেন, “তুমি? রুশদী তো বলল তুমি আজ আসবে না!”

ফারাজ মায়ের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল একটা মিষ্টি হাসি হাসল। তখনই রাইমা খানের নজর গেল ফারাজের হাতের দিকে—সেখানে শোভা পাচ্ছে এক তোড়া তাজা লাল গোলাপ। ছেলের হাতের সেই গোলাপের তোড়াটা দেখেই বুঝতে বাকি রইল না যে আসল ব্যাপারটা কী। তিনি মুচকি হাসলেন এবং কৌতুকভরা গলায় রসিকতা করে বললেন, “ওয়াহ্ ভাই! সারপ্রাইজ..? হামারি নাসিব মে এসাব কাহা লিখা..?”
রাইমা খান মুচকি হাসতে হাসতে না দেখার ভান করে সেখান থেকে চলে গেলেন। মায়ের এমন রসিকতা শুনে ফারাজও মনে মনে হাসল। এরপর সে পা বাড়াল নিজের ঘরের দিকে। মাঝপথে করিডোরেই তার দেখা হয়ে গেল মিতু আর ছোট্ট শেরের সাথে। ফারাজ পকেট থেকে মিতু আর শেরের জন্য আনা চকলেটগুলো বের করে তাদের হাতে বুঝিয়ে দিল। তারপর শেরের মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করল, “তোমার মম কোথায়?”
শের মুখটা একটু ছোট করে বলল, “রুমে মন খারাপ করে বসে আছে!”
ফারাজের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল, “কেন? কী হয়েছে ওর?”
“আমাকে তো কিছু বলেনি!” শের কাঁধ ঝাঁকাল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি তাহলে এখন খালামণির সাথেই থাকো,” ফারাজ শেরকে আদর করে বলে রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

ফারাজ রুশদীর ঘরের সামনে এসে খুব সাবধানে, শব্দহীনভাবে দরজাটা খুলল যেন ভেতরের মানুষটা বিন্দুমাত্র টের না পায়। সে দরজার চৌকাঠে গা এলিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ঘরের ভেতরে তাকিয়ে দেখল, রুশদী পড়ার টেবিলে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু পড়াশোনায় তার মন নেই। বই খোলা থাকলেও সে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে নখের কোণ খুঁটছে, আর তার মুখে রাজ্যের মেঘ জমে আছে। ফারাজ ঠোঁট গোল করে একটা চেনা শিষ বাজাল, যাতে রুশদীর মনোযোগ কাড়ে। এরপর মৃদু বলল, “আসসালামু আলাইকুম…!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৬

সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই রুশদী একঝটকায় পেছন ফিরে তাকাল। দরজায় দাঁড়ানো ফারাজকে দেখামাত্রই তার চোখের পলকে যেন জাদুমন্ত্রের মতো মনের সব মেঘ কেটে গেল, মনমরা ভাবটা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ফারাজ সত্যি সত্যি ফিরে এসেছে! রুশদী আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না; সে চেয়ার ছেড়ে প্রায় দৌড়ে গিয়ে ফারাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। প্রিয় মানুষের বুকের চেনা ওমে মাথা রাখতেই তার অভিমানী মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৭ (২)