অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৬
তেজরিন উম্মীদ
রুশদীর অবস্থা তখন তথৈবচ। লজ্জার তীব্র দহন তাকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, ঘর থেকে বের হওয়ার ন্যূনতম সাহসটুকুও সে সঞ্চয় করতে পারছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, বাহিরে কারো মুখোমুখি হওয়া মানেই একরাশ অস্বস্তির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া। ফারাজ তাকে হাজারটা বুদ্ধি দিলেও রুশদী নিজ সিদ্ধান্তে অটল—গলার কাছের এসব দাগ সরা না অব্দি সে রুম থেকে বের হবে না।
সকালের নাশতার টেবিলে রুশদীর অনুপস্থিতি দেখে রাইমা খান যখন ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, ফারাজ অত্যন্ত নিপুণভাবে তা এড়িয়ে গেল। শান্ত গলায় বলল, “রুশদীর মুডটা আজ বিশেষ ভালো নেই , ও একটু একা থাকতে চাইছে।” রাইমা খান মনে করেন,হয়ত আবার বাবার কথা মনে করে মন খারাপ রুশদীর।নিজে নাস্তা করে, ফারাজ নিজেই খাবারটুকু নিয়ে রুশদীকে ঘরে দিয়ে এসেছিল।এরপর অফিসে চলে গিয়েছিল সে।
অফিস থেকে যখন ফিরল, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা। বাড়িতে পা দিয়েই সে প্রথমে শের-এর খোঁজ নিল। জানতে পারল, ক্লাব থেকে ফিরে শান ও সিফাত ওদের সঙ্গে শের এখন সিকদার কুঞ্জেই আছে।
ফারাজ ধীরপায়ে ঘরে ঢুকল। দরজা ভেজানো ছিল, তবে ভেতর থেকে লক্ করা ছিল না। পুরো ঘর জুড়ে অন্ধকারের রাজত্ব, কেবল কোণের নীলচে ডিম লাইটের মৃদু আভা সেই আঁধারকে সামান্য আলগা করে রেখেছে। ঘরে ঢুকেই ফারাজের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। রুশদী অবেলায় এভাবে ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর মেয়ে নয়। তবে কি শরীরটা খারাপ করল?
রুশদীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে ফারাজ বড় আলোটা আর জ্বালল না। পরনের অফিসিয়াল স্যুট আর হাতের ব্র্যান্ডের ঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল। তারপর বিছানার পাশে গিয়ে বসল। ব্ল্যাঙ্কেটের ভাঁজ থেকে রুশদীর মুখখানার সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছে—ঠিক যেন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা কোনো এক মায়াবী রাজকন্যা।
ঘুমন্ত অবস্থায় রুশদীকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। অবাধ্য চুলগুলো কপালে এসে লুটিয়ে পড়েছে, দীর্ঘ চোখের পাপড়িগুলো স্থির। তার সেই চঞ্চলতা বা তর্কাটে স্বভাবের লেশমাত্র নেই এখন; এক অদ্ভুত প্রশান্তি এবং কোমলতা তাকে ঘিরে রেখেছে। ফারাজ অপলক তাকিয়ে রইল—তার সেই বজ্জাতএবং তর্কবাজ বউটার এই রূপ যেন এক নতুন ঘোর তৈরি করল তার মনে। সে আনমনেই রুশদীর কপালে হাত রাখল। পরক্ষণেই মনে হলো, এই মেয়েটার প্রেমে সে বুঝি বারবার নতুন করে পড়ে।
কপালে স্পর্শ করতেই ফারাজ টের পেল, শরীরটা সামান্য গরম। খুব বেশি না হলেও হালকা জ্বর এসেছে মেয়েটার। ফারাজ কিছুটা ঝুঁকে এল রুশদীর দিকে। আদুরে স্বরে ডাকল—
“রুশদী, এই রুশদী…!
রুশদীর তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা নিমেষেই কেটে গেল। সে অনেকটা চমকে উঠে ঝাপসা চোখে সামনে থাকা অবয়বটির দিকে তাকাল। অন্ধকার আর ঘুমের ঘোরে চট করে মানুষটাকে চিনতে না পেরে যখন খানিকটা কুঁচে উঠল, তখনই ওপাশ থেকে শান্ত অভয়বাণী এল—
“আমি।”
রুশদী এবার ধাতস্থ হলো। ফারাজের গলার স্বর চিনতে পারলেও হঠাৎ ঘুম ভাঙায় মাথায় এক ধরনের ঝিমঝিম অনুভব করল সে। মুখে হাত বুলিয়ে আড়মোড়া ভেঙে অস্ফুট স্বরে বলল, “হুম।”
ফারাজ তার মুখের দিকে ঝুঁকে এসে গভীর চোখে তাকাল। “শরীর খারাপ লাগছে? অবেলায় এভাবে ঘুমোচ্ছ কেন?”
রুশদী চোখ নামিয়ে উত্তর দিল, “এমনি, তেমন কিছু না।”
ফারাজ আবারও তার কপাল ছুঁয়ে দেখল। “কপাল তো হালকা গরম। জ্বর এসেছে নাকি?”
ফারাজ সামান্য সরে গেল। রুশদী শোয়া থেকে উঠে বিছানার হেডে বালিশ ঠেস দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। নির্লিপ্ত গলায় বলল, “দুপুরের দিকে একটু এসেছিল, এখন বোধহয় সেরে গেছে।”
“ওষুধ খেয়েছিলে?” ফারাজের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট উদ্বেগের সুর।
“নাহ্।”
নিজের শরীরের প্রতি এমন চরম অবহেলা দেখে ফারাজের মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। ধমকের সুরে প্রশ্ন করল, “খাওনি কেন?”
“এমনি, ইচ্ছে করেনি।”
রুশদীর এই স্বভাবটা নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই সে নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ভীষণ উদাসীন। অসুখ হলেও ওষুধ গিলতে তার অনীহা পাহাড়সমান। আসলে নাহিদা কখনও তার অসুস্থতায় বিশেষ তোয়াক্কা করেননি, আর বাবা আনাস হকেরও মেয়ের ওষুধের ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। অবহেলার সেই তিক্ত স্মৃতি থেকেই হয়তো নিজের ওপর রুশদীর এই মায়াহীনতা।
ফারাজ উঠে গিয়ে রুমের বড় লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। তীব্র আলো চোখে পড়তেই রুশদী যন্ত্রণায় চোখ দুটি খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। ফারাজ প্রশ্ন করল, “দুপুরে খেয়েছিলে কিছু?”
“নাহ্।”
“কেন?”
“খেতে ইচ্ছে করেনি, তাই।”
ফারাজ স্থির দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকাল।রুশদী প্রায়ই না খেয়ে থাকে। রাইমা খানের পীড়াপীড়িতে কখনও বসলেও দু-এক লোকমা মুখে দিয়েই উঠে পড়ে। ফারাজ লক্ষ্য করল, রুশদী সকালে যে জামাটা পরেছিল, এখনো সেটাই পরে আছে। ভ্রু কুঁচকে সে জিজ্ঞেস করল, “দুপুরে গোসল করোনি তুমি?”
রুশদী ব্ল্যাঙ্কেট টা গায়ের ওপর আরও একটু টেনে নিয়ে বলল, “জ্বরের কারণে শরীরটা ঠান্ডা হয়ে আসছিল, তাই আর করিনি।”
ফারাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল। “উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও। নিচে তো নামবে না জানি, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
রুশদী নিঃশব্দে মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। সে বাথরুমে ঢুকে পাক্কা এক ঘণ্টা সময় লাগিয়ে গোসল করল, তাও আবার কনকনে ঠান্ডা পানিতে! এমনিতেই শরীরে জ্বর ছিল, তার ওপর এই অসময়ে ঠান্ডা পানি ঢালায় জ্বর যেন এবার দ্বিগুণ বিক্রমে জাঁকিয়ে বসল।
গোসল সেরে কাঁপতে কাঁপতে ওয়াশরুম থেকে বের হলো রুশদী। ঠান্ডায় তার দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। দ্রুত এসির সুইচ বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। ফারাজ রুমে ঢুকে রুশদীর ভেজা চুল আর কাঁপাকাঁপি দেখে নিজের রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। তবে সেই রাগটা ভেতরে চেপেই সে থমথমে গলায় বলল, “কে বলেছিল এই অবস্থায় পাকনামি করে এতক্ষণ গোসল করতে? এখন বসে কাঁপছে। ”
রুশদী থরথর করে কাঁপছে, কথা বলার মতো শক্তিটুকুও যেন তার ফুরিয়ে এসেছে।ফারাজ দ্রুত ফ্রেশ হয়ে একটি আরামদায়ক টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নিল। এরপর বাসার কাজের লোকবদিয়ে আনানো খাবার নিয়ে বসল। বিছানার পাশে বসে এক লোকমা ভাত রুশদীর মুখের সামনে ধরতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি খাব না!”
ফারাজ এবার আর নরম থাকল না। কঠোর গলায় শাসন করে বলল, “কানের নিচে দু-একটা বসিয়ে দিলে তখন সব ফালতু কথা মুখ দিয়ে বের হবে না। দুপুরেও খাওনি, এখনো খাবে না? এই খালি পেটে ওষুধ খাবে? শরীর যে জ্বরে পুড়ছে সে খেয়াল আছে? একদম কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নাও রুশদী, আমায় রাগিও না।”
অযথা তর্ক করার মতো শক্তি বা মানসিক অবস্থা কোনোটাই আজ রুশদীর নেই।সে বাধ্য মেয়ের মতো ফারাজের হাতে খাবারটুকু খেয়ে নিল। খাওয়ার পর ওষুধ গিলতে একটু আপত্তি করতে চেয়েছিল, কিন্তু ফারাজের তীক্ষ্ণ চাহনি আর হুঙ্কারে সেই সুযোগও মিলল না। খাওয়া শেষে এক মুহূর্ত দেরি না করে সে বালিশে মাথা রাখল। শরীরটা আজ বড় বেশি কাহিল লাগছে তার।
রুশদী ঘুমিয়ে পড়লে ফারাজ ঘরের বড় আলোটা নিভিয়ে ডিম লাইটের নীলচে আভা জ্বালিয়ে দিল। টেবিলে ল্যাপটপ নিয়ে বসল সে; অফিসের কিছু কাজ বাকি ছিল। কাজ শেষ করতে করতে ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত একটা। দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে বসে থাকায় শরীরটা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। আড়মোড়া ভেঙে সে উঠে এসে বিছানায় গেল। মাঝে কয়েকবার উঠে রুশদীর জ্বর পরীক্ষা করেছিল সে; এখন আর তেমন উত্তাপ নেই শরীরে। তবে জ্বরের ঘোরে রুশদী একদম জড়সড় হয়ে পা গুটিয়ে শুয়ে আছে। ফারাজ ধীরপায়ে শুয়ে তাকে আলতো করে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল।
তন্দ্রাচ্ছন্ন রুশদী হঠাৎ এই বাহুবন্ধনে সজাগ হয়ে উঠল। ঘুমকাতর কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে ডাকল, “হুম… ফারাজ!”
ফারাজ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা স্বরে বলল, “ইয়েস মিসেস খান!”
রুশদী সামান্য নড়েচড়ে উঠে বলল, “ছাড়ুন প্লিজ, এমনিতেই সারা শরীরে বড্ড ব্যথা!”
ফারাজের ঠোঁটে তখন এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি। সে কানে কানে বলল, “জানি তো! তোমার এই ছোট্ট শরীরটা শারফারাজ খানের লেড নিতে পারেনি, তাই এই অবস্থা।”
অন্ধকারেও ফারাজের কথায় রুশদী শিউরে উঠল।চোখ দুটো বড় বড় করে তাকালো সে। লজ্জায় তার দুই গাল রক্তিম হয়ে উঠল। অন্ধকারে সবটা স্পষ্ট না হলেও ফারাজ টের পেল তার বউয়ের আড়ষ্টতা। রুশদী কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, “সব সময় ফালতু কথা বলবেন না। আমার এমনিই জ্বর এসেছে।”
ফারাজ এবার হেসে ফেলল। “বউ, আমি ভাত খাই, সুজি না। সব বুঝি আমি। ভেবেছিলাম আজকেও একটু আদর করব তোমাকে, কিন্তু তুমি তো প্রথম রাতেই কাহিল হয়ে পড়লে! আমার আশা আর পূর্ণ হলো না।”
রুশদী এবার মরিয়া হয়ে তাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল। “এই ছাড়ুন তো আমাকে! চুপচাপ ঘুমান। নিজে ঘুমান আর আমাকেও শান্তিতে ঘুমাতে দিন!”রুশদী ফারাজের বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে ফারাজ তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। গভীর স্বরে বলল, “এত অস্থির হচ্ছ কেন? নাকি কালকের ঘটনার লজ্জাটা এখনো কাটাতে পারোনি বলে দূরে থাকতে চাইছ?”
রুশদী অসহায়ের মতো বলল, “উফ! আপনি কি একটু চুপ থাকবেন?”
ফারাজ এবার একটু নরম হলো।
“আচ্ছা, শরীরটা এখন কেমন? ভালো লাগছে?”
রুশদী শান্ত হয়ে ভাবল, লোকটার বোধহয় পাগলামি একটু কমেছে। মৃদুস্বরে জবাব দিল, “হুম, জ্বর নেই আর।”
কিন্তু ফারাজের দুষ্টুমি যেন শেষ হওয়ার নয়। সে আচমকা রুশদীর গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে আলতো এক চুমু খেয়ে ফিসফিস করল, “তবে কি আজকেও একটু আদর করা যায় তোমাকে?”
রুশদী আঁতকে উঠে বলল, “নাহ্! একদম না। দূরে যান আপনি!”
ফারাজ মুখ তুলে কৌতুকের ছলে বলল, “স্বামীকে এভাবে না করছ? জানো তো, অবাধ্য স্ত্রীকে সকাল হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা অভিশাপ দেয়?”
রুশদী দমে গেল। কথাটি সে আগে শুনেছে, কিন্তু জ্বরের কারণে শরীরের এই প্রচণ্ড ব্যথা। ফারাজের সামান্য স্পর্শও যেন ব্যথায় শরীরে কাঁটার মতো বিঁধছে। রুশদীকে এভাবে চুপসে যেতে দেখে ফারাজ শব্দ করে হেসে উঠল। তাকে নিজের বুকের সঙ্গে সজোরে মিশিয়ে নিয়ে বলল, “ঠিক আছে, এত ভয় পেতে হবে না। আজ না হয় আদর না-ই করলাম, এসো গল্প করি।”
রুশদী অবাক হয়ে তাকাল। “কী গল্প?”
“আই লাভ ইউ!”
রুশদী স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো উত্তর এল না তার ঠোঁট চিরে। ফারাজ হালকা অভিমানের সুরে বলল, “এই খাটো পটল, তুমি কি আমায় একটুও ভালোবাসো না? কোনোদিন তো আমার লাভ ইউ এর উত্তর দিলে না!”
রুশদী এবার অন্ধকারে একটু হাসল। নিজের দুই হাত দিয়ে ফারাজকে জড়িয়ে ধরল সে। মাথা উঁচু করে ফারাজের কানের কাছে মুখ নিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ স্বীকারোক্তিটা দিল, “আই লাভ ইউ টু শের-এর পাপা! আপনার এই খাটো পটলও আপনাকে খুব ভালোবাসে।”
ফারাজ বিস্ময় মেশানো আনন্দ নিয়ে বলল, “কাকে ভালোবাসো বললে?”
“শের-এর পাপাকে!”
“সেটা তো আমিই!”
“তাহলে আপনাকেই ভালোবাসি।”
ফারাজ একরাশ তৃপ্তি নিয়ে হেসে উঠল, রুশদীও সেই হাসিতে যোগ দিল। শরীরটা একটু ব্যথা করলেও রুশদী আজ নিজেকে আলগা করল না। উল্টো জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আপনি আমার প্রেমে ঠিক কবে পড়েছিলেন?”
“উমম… আমি তো তোমার প্রেমে পড়িনি রুশদী!” ফারাজের উত্তাল জবাব।
, “তাহলে বিয়ে কেন করলেন?”
ফারাজ তার কপালে গভীর এক চুম্বন একে দিয়ে বলল, “আমি তোমার প্রেমে পড়িনি, সরাসরি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। এক সময় তুমি আমার অভ্যাস হয়ে উঠেছিলে, কেন বা কীভাবে—তা আজও আমার কাছে অজানা।”
“আপনি তবে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবেসেছিলেন?”
ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হুম, তখন হয়তো কারণ ছিল না, কিন্তু এখন হাজারটা কারণ আছে। তোমাকে এতটাই ভালোবাসি যে, এই এক জনম তোমার সঙ্গে পার করে দিলেও মনে হবে অনেকটা সময় কম পড়ে গেল। ভালোবাসা তো কারণ খুঁজে হয় না রুশদী, ভালোবাসা হলো একটা আশ্রয়। আমার সেই আশ্রয়ের নাম তুমি। তোমার এই পাগলামি, এই জেদ—সবটুকু নিয়েই তুমি আমার পূর্ণতা। বিশ্বাস করো, কোনো এক কঠিন মুহূর্তেও তোমার প্রতি আমার এই ভালোবাসার এক বিন্দু কমবে না।
রুশদী ফারাজের বুকের ওপর মাথা রেখে পরম আবেশে শুয়ে আছে। বাইরের জানলা দিয়ে আসা চাঁদের স্নান আলোয় ঘরের আধো-অন্ধকার যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। চারপাশটা একদম নিঝুম, কেবল ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর দুজনের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ রুশদী খুব নরম স্বরে প্রশ্ন করল, “এত কেন ভালোবাসেন আমায়?”
ফারাজ ওর চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় জবাব দিল, “কারণ তুমি আমার!”
“আচ্ছা ক্যাপ্টেন, আমি কেমন?” রুশদী এবার ফারাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
ফারাজ একটু সময় নিল, তারপর গভীর চোখে রুশদীর চোখের মণি দুটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল, “আমার জন্য তৈরি নারীকে মন্দ বলি কি করে রুশদী? তুমি আমার সেই পূর্ণতা, যা ছাড়া আমি ছিলাম এক অসম্পূর্ণ কবিতা।”
“আপনার আর কয়েকটা বাচ্চা থাকলে ভালো হতো, আমাকে আর কষ্ট করে বাচ্চা নিতে হতো না।”
ফারাজ হো হো করে হেসে উঠল। “ওরেহ্ চালাক! অত টেনশনের কিছু নেই। তোমার ওপর যখন এত চাপ, তবে বরং আরেকটা বিয়ে করে ফেলি? কী বলো? করি… করি!”
মুহূর্তেই রুশদীর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে ফারাজের টিশার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে শাসানোর সুরে বলল, “একদম মেরে ফেলব! আমি ছাড়া অন্য কোনো নারীর দিকে তাকালে আপনার খবর আছে। আপনার ভাগ আমি অন্য কাউকে দিতে পারব না, কোনোদিন না!”
ফারাজ এবার ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রুশদীর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল, “পাগলী একটা! আমি নিজেই তো তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার ভাগ অন্য কাউকে দিতে পারব না। দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্নই আসে না। আমার হৃদয়ের সবটুকু জায়গাজুড়ে কেবল তোমারই রাজত্ব।”
“এত ভালোবাসেন? এভাবে সারাটা জীবন ভালোবাসতে পারবেন তো?”
“কথা দিলাম রুশদী, পুনর্জন্ম হলেও আমি ঠিক এভাবেই তোমাকে ভালোবেসে যাব।”
“পুনর্জন্ম হবে না, এই জীবনেই আপনার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আমাকে পূর্ণ করে দিন। আমার আর কিচ্ছু চাই না।”
আকাশের নীল ক্যানভাসে তখন অজস্র তারার মেলা। সিকদার বাড়ির বিশাল ছাদে মাদুর পেতে শুয়ে আছে শান, সিফাত আর ছোট্ট শের। শান আর সিফাতের ঠিক মাঝখানে শের শুয়ে নিস্পলক চোখে আকাশের ঝিলিমিলি দেখছে। নিস্তব্ধ রাতটাকে খানিকটা চঞ্চল করে শান আচমকা প্রশ্ন করল, “শের, আমাকে কতটুকু ভালোবাসিস রে?”
শের এক মুহূর্ত দেরি না করে শানকে জড়িয়ে ধরল। আধো আধো গলায় বলল, “মম আর পাপার পর তোমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি চাচু! ইউ আর মাই হিরো!”
শের মুখে এমন স্বীকৃতির পর শানের বুকটা গর্বে ভরে উঠল। পাশে শুয়ে থাকা সিফাত এবার কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে শেরের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, “আর আমাকে কতটুকু ভালোবাসিস রে শের?”
শের সিফাতের দিকে এক পলক তাকিয়েই মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। স্পষ্ট স্বরে বলল, “তোমাকে আমি একটুও ভালোবাসি না। আই হেট ইউ সিফু ডিলার! তুমি দেখতে একদম সাদা হাঁসের মতো।”
শেরের মুখে এমন কথা শুনে শান বিজয়ের হাসি হাসল এবং ওকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। শের নিজের সফলতায় নিজেই মজা পেয়ে ‘হি হি’ করে হেসে উঠল। সরাসরি মুখের ওপর এমন অপমান সইতে না পেরে সিফাত এক ঝটকায় শোয়া থেকে উঠে বসল। চিৎকার করে বলল, “এই চেংটা বাঁদর! কী বললি তুই? আমাকে সাদা হাঁসের মতো দেখতে?”
শান পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল, “আরে তুই খ্যাপছিস কেন? ও তো তোকে কত সুন্দর একটা নাম দিয়েছে—সাদা হাঁস! বেশ তো মানিয়েছে তোকে।”
সিফাত রাগে গজগজ করতে করতে বলল, “তাহলে তোকেও এই নামেই ডাকুক না।”
শান হাসিমুখে শেরকে বলল, “শের, তুই আমাকে সাদা হাঁস ডাকবি? ঠিক আছে?”
শের মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “ওকে চাচু!”
সিফাত এবার শেরকে পটাতে গিয়ে বলল, “শের, আমাকেও ওইরকম সুন্দর কোনো নামে ডাকবি তো?”
শের তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “সিফু ডিলার! সিফু ডিলার!”
সিফাত রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “পাজির হাড়, চেংটা বাঁদর একটা!”
শের এবার আরও জোরে বলল, “সিফু ডিলার!”
শের শানের সব কথা এক কথায় শুনলেও সিফাত কিছু বললেই সেটা কানে তোলে না। শানের সঙ্গে শেরের সম্পর্কটা একদম বাবা-ছেলের মতো অটুট; আর সিফাতের সঙ্গে যেন জন্মজন্মান্তরের আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক। সারাক্ষণ দুজনের টম এন্ড জেরি ঝগড়া লেগেই থাকে। সিফাতও নাছোড়বান্দা, সবসময় ওর পিছনে লেগে থাকে। তবে শের মুখে যাই বলুক না কেন, সিফাতকে কিন্তু শের মনে মনে ঠিকই পছন্দ করে। শুধু সিফাতের সামনে সেটা কখনও স্বীকার করে না।
ভোরের আজানের সুমধুর সুর কানে আসতেই রুশদীর তন্দ্রা টুটে গেল। চোখ মেলতেই নিজেকে আবিষ্কার করল ফারাজের বাহুবন্ধনে একপ্রকার বন্দি অবস্থায়। রুশদীর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। মাঝেমধ্যে ভাবলে বড় অবাক লাগে—সে এখন বিবাহিত! তার একজন স্বামী আছে, পাঁচ-ছয় বছরের এক চঞ্চল ছেলে আছে, আছে আগলে রাখার মতো এক সাজানো সংসার। জীবনটা কতটা আমূল বদলে গেছে তার!
আগে যার দিন কাটত আগুনের পাশে রান্নাঘরের ব্যস্ততায়, এখন তাকে খাবারটুকুও নিজের হাতে বেড়ে খেতে হয় না। তার ওপর বাড়ির প্রতিটি মানুষের উপচে পড়া ভালোবাসা তো আছেই। কোথাও একটা পড়েছিল—যে মেয়ে বাবার বাড়িতে সুখ পায় না,তার সুখ হয় শশুর বাড়িতে। রুশদী আজ তার জীবন্ত প্রমাণ।
ফারাজের শান্ত মুখখানার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল রুশদী। লোকটা কী অঘোর শান্তিতে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুচ্ছে। রুশদী ভাবল, এই মানুষটাকেই সে কিনা বিয়ের সময় কতবার ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল! অথচ এমন জীবনসঙ্গী কি আর কখনো তার কপালে জুটত? রুশদী আনমনে ফারাজের মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল। লোকটার সবকিছুই তার পছন্দ, শুধু এই ক্লিন শেভ’লুকটা সে একদম নিতে পারে না। সামান্য দাড়ি রাখলে ওকে যে কী মারাত্মক সুন্দর দেখাত, তা যদি ও বুঝত! রুশদী মনে মনে হাসল। তারপর একদম গোপনে, অত্যন্ত সন্তর্পণে স্বামীর কপালে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছোঁয়াল—যাতে ঘুমের ঘোরে ফারাজ টেরও না পায়।
হঠাৎ রুশদীর মনে হলো, আজ ফজরের নামাজটা পড়া দরকার। অনেকদিন ফজরের সময় ওঠা হয় না। সেই ভেবে শোয়া থেকে উঠতে গেলেই বিপত্তি বাধল। ফারাজের লোহার মতো শক্ত বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করা যেন অসম্ভব হয়ে উঠল। ধস্তাধস্তি করে হাত সরাতে গেলেই ফারাজ জেগে গেল। ঘুম জড়ানো ভারী কণ্ঠে সে বিড়বিড় করল, “এত নড়াচড়া কোরো না তো রুশদী, চুপচাপ ঘুমাও।”
রুশদী নিচু স্বরে বলল, “নামাজ পড়ব, আমাকে ছাড়ুন এখন।”
অন্য সময় হলে ফারাজ হয়তো কোনোভাবেই তাকে ছাড়ত না, কিন্তু নামাজের কথা শুনে সে আলগা করে দিল বাহুবন্ধন। রুশদী যাওয়ার আগে ফারাজকেও উঠতে বলল নামাজের জন্য, কিন্তু সে পাশ ফিরে শুয়ে রইল। রুশদী আর জোর করল না। ধীরপায়ে উঠে ওজু সেরে সে পবিত্রতার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে ফজরের সালাত আদায় করতে দাঁড়াল।
মিতু নিজের জন্য বরাদ্দ করা গেস্ট রুমের বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে। সারা রাত কান্নায় তার চোখের পাতাগুলো ফুলে ভারী হয়ে উঠেছে। সহজ-সরল মনের মেয়ে সে; সিফাতের ওই এড়িয়ে যাওয়া বা উদাসীনতা তার কোমল মনে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। সকালে যখন খান পরিবারের সবার সাথে সে নাশতার টেবিলে বসল, রুশদী বোনের চোখের কোণে লেগে থাকা বিষাদটুকু ঠিকই লক্ষ্য করল। তবে সবার সামনে কোনো অপ্রীতিকর প্রশ্ন করে তাকে আর বিব্রত করল না।
সকাল গড়াতেই সিকদার বাড়ি থেকে শানরা এল। শেরের স্কুল আছে; ক্লাস মিস হওয়া মানেই শের তো বটেই, এমনকি শানদেরও ফারাজের কাছে বকা শুনতে হবে।
এদিকে সিফাত খান বাড়ির লনের দোলনায় একা বসে মনোযোগ দিয়ে ফোন টিপছে। মিতু দূর থেকে ওকে দেখে বুকটা দুরুদুরু করে উঠল, কিন্তু মনের টান উপেক্ষা করতে না পেরে ধীরপায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল।
সিফাত ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাতেই মিতুকে দেখল। তার চোখেমুখে কোনো বিশেষ আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল না। আসলে চট্টগ্রাম যাওয়ার পর নিছক সময় কাটানোর জন্য সে মিতুর সঙ্গে একটু আধটু ফ্লার্ট করেছিল। কিন্তু মিতু যে এতটাই সাদাসিধে যে ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে তাকে ভালোবেসে বসবে, তা সিফাতের ভাবনার বাইরে ছিল। মিতুর লাজুক হাবভাব দেখে সিফাত আবার একটু প্রশ্রয় দিল। তার কাছে এমন বোকাসোকা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে মন্দ লাগে না।
“হেই মিস ফুল! তুমি ঢাকা কবে আসলে?” সিফাতের কণ্ঠে সেই চিরচেনা মাদকতা।
‘মিস ফুল’ সম্বোধনটা কানে যেতেই মিতুর বিষণ্ণ মনটা যেন শরতের মেঘের মতো এক লহমায় হালকা হয়ে গেল। জড়তা কাটিয়ে বলল, “অ… অনেকদিন আগেই এসেছি।”
“বসো এখানে!” সিফাত দোলনার পাশের ফাঁকা জায়গাটুকুতে বসার ইশারা করল।
মিতু একটু ইতস্তত করল; যদি বসার সময় শরীরের কোনো অংশ সিফাতের সঙ্গে লেগে যায়! সেই সংকোচ দেখে সিফাত হেসে বলল, “হেই মিস, লজ্জা না পেয়ে বসো তো। এটা তোমাদের গ্রাম না যে কেউ কিছু বলবে। এখানে সবাই চিল!”
মিতু খুব সাবধানতার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে দোলনার কোণায় বসল। সিফাত ফোনটা পাশে রেখে দোলনার ওপর হাত এলিয়ে আয়েশ করে বসে বলল, “জানো, আমার না শ্যামলা মেয়ে ভীষণ পছন্দ। ঠিক তোমার মতো।”
মিতু বিস্ময় আর লজ্জায় রাঙা হয়ে নিচু স্বরে বলল, “সবার তো ফর্সা মেয়েই পছন্দ হয়!”
সিফাত ওর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। “হুম, সবাই তো আর আমার মতো নয়। আমি তো নিজেই ফর্সা, আমার লাগবে শ্যামলা। আসলে ফর্সা স্কিন এখন বড্ড কমন, জাস্ট বোরিং! আমার কাছে শ্যামলা মেয়েদের ম্যাজিকটাই আলাদা। ইউ নো, ইটস লাইক ডার্ক চকলেট—একটু ক্লাসি, একটু ডিফারেন্ট আর ভীষণ অ্যাডিক্টিভ। তোমার এই স্কিন টোনটাই তোমাকে একদম ইউনিক করে তোলে, মিস ফুল।”
এই এক মুহূর্তের প্রশংসায় মিতুর বুকের ভেতরটা ওলটপালট হয়ে গেল। গতরাতের জমানো সব অভিমান, চোখের জল আর একাকীত্বের কষ্ট এই এক কথাতেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে মাথা নিচু করে ওড়নার কোণা আঙুলে জড়াতে লাগল; লজ্জায় তার কান দুটো যেন ঝাঁ ঝাঁ করছে।
অথচ বাস্তবটা ছিল ভিন্ন। সিফাত আদতে প্রচণ্ড সৌন্দর্যপূজারী; মফস্বল বা গ্রামের সাধারণ মেয়েদের দিকে সে ফিরেও তাকায় না। কিন্তু মিতুর সঙ্গে সে কেন এভাবে নিয়মিত ফ্লার্ট করে যাচ্ছে, তার সঠিক কারণ হয়তো সিফাত নিজেও জানে না।
ওদের এভানে বসে থাকতে দূর থেকে দেখল সিফাত এর মা শানজানা খান।
ফারাজের আজ আবার ট্রিপ পড়েছে।রুশদী মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভাবে লোকটা কি অতিমানব? নিজের বাবা শেহজাদ খানের বিশাল বিজনেস সাম্রাজ্য সে একাই সামলায়, আবার এর মাঝে পাইলটের কঠিন পেশাটাও দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। একটা মানুষ একই সাথে এত কিছু কীভাবে সামাল দেয়, তা রুশদীর সাধারণ বুদ্ধিতে কুলায় না।
গত দুদিন শেরের সাথে দেখা হয়নি। পুচকুটা আশেপাশে না থাকলে ঘরটা বড্ড খালি খালি লাগে, প্রাণহীন মনে হয়। মিতুর সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব সেরে রুশদী নিজের পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। অনেকদিন পর আজ তিথির কল এসেছে। বিয়ের পর আগের মতো আর আড্ডা দেওয়া হয় না, কলেজের সেই সোনালী দিনগুলো এখন কেবলই স্মৃতি।
তিথির সাথে কথা শেষ হতে না হতেই স্কুল থেকে ফিরল শের। ঘরে ঢুকেই এক লাফে সে রুশদীর কোলে চড়ে বসল। রুশদী ওর ঘামভেজা মুখটা মুছে দিয়ে বেশ ক’টা আদুরে চুমু খেল। তারপর কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাল মমকে না বলে কোথায় গিয়েছিলে তুমি, শুনি?”
শের রুশদীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “চাচুরা এসেছিল তো, তাই ওদের সাথে সিফু ডিলারদের বাসায় ছিলাম।”
“ভাইয়ারা এসেছে আজ?”
“হুম।”
“ওহ্! তাই তো বলি, চাচুদের পেয়ে মমকে একদম ভুলে গিয়েছিলে? বুঝি বুঝি, তুমি আর আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না, তাই তো?” রুশদী মুখটা গম্ভীর করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
প্রিয় মম-এর মুখভার দেখে শেরের মনটা তপ্ত দুপুরের মতো শুকিয়ে গেল। এখন মম-এর মুড ঠিক করার দায়িত্ব যে তারই! সে তার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে রুশদীর গাল দুটো ধরে টেনে নিজের দিকে ফেরালো। তারপর জাদুকরের মতো চোখে মুখে রহস্য এনে ফিসফিস করে বলল, “আবরা কা ডাবরা… মম-এর মন ভালো হয়ে যা… ফু! ফু!”
রুশদীর প্রচণ্ড হাসি পেলেও সে নিজেকে সামলে রাখল। দেখাই যাক, এই খুদে জাদুকর আর কী কী করতে পারে! মম-কে হাসাতে না পেরে শের এবার কোল থেকে নেমে পড়ল। পরনে তার ছোট্ট স্কুল ইউনিফর্ম, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। সে এবার অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি করে নাচতে শুরু করল। শেরের সেই উদ্ভট নাচ আর কচি মুখের অভিব্যক্তি দেখে রুশদী আর স্থির থাকতে পারল না; খিলখিল করে হেসে ফেলল সে।
অস্তরাগের রঙ পর্ব ২৫
রুশদী হাসতেই শের এক দৌড়ে এসে আবার তাকে জড়িয়ে ধরল। রুশদী ওকে কোলে তুলে নিয়ে ওর ছোট্ট নাকে একটা টোকা দিয়ে বলল, “তুমি এত পাকনা কেন, বল তো?”
শের দাঁত বের করে হেসেই খুন। সে হিক্কা তুলে হাসতে হাসতে বলল, “ফরমালিন দিয়ে পাকিয়েছে বোধহয়! হি হি!”
