Born to be villains part 37
মিথুবুড়ি
ইবরাত বেহরোজ আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়। পৃথিবীর চারপাশের যেকোনো সহজ-স্বাভাবিক বা সহজাত বিষয়ের মধ্যেই সে ভণ্ডামি খুঁজে পায়। আর সেটাকে নিজের মতো করে গুঁড়িয়ে দিতেই যেন তার সব আনন্দ। এই যেমন, আজ সকালেই সে ন্যাসোর ইনস্টাগ্রাম থেকে একটা ছবি টুকে নিল সে। ছবিতে ন্যাসোর মুখ ছিল না। কেবল কনুই থেকে ভাঁজ করা দুটো হাত দিয়ে মাসল দেখানোর একটা ভঙ্গি আর গড়ন। ন্যাসোর গায়ে কোনো পোশাক ছিল না, দীর্ঘক্ষণ জিম করার পর সুগঠিত শরীরজুড়ে চকচক করছিল ঘামের ফোঁটা। যেকোনো কিশোরীর বুক ধড়ফড় করিয়ে দেওয়ার মতো কিংবা গলা শুকিয়ে দেওয়ার মতো দারুণ আকর্ষণীয় একটি আগুন ছবি ছিল সেটা। কিন্তু সেই ছবির বারোটা বাজিয়ে দিতে ইবরাতের বেশি সময় লাগল না।
সে এডিট করে Good Morning লিখতে গিয়ে শুরুতেই করল ভণ্ডামি। Good-এর G বসাল ন্যাসোর ঢেউখেলানো বুকের ডানপাশে, আর D বসালে বাঁপাশে। মাঝের দুটো OO সে ইচ্ছে করেই লিখল না, কারণ ন্যাসোর টানটান, ফোলা ফোলা বুক দুটোই তো সেই OO-এর অভাব পূরণ করে দিচ্ছে,আলাদা করে অক্ষর বসানোর কোনো দরকারই পড়ল না। ছবিটা যেন এভাবেই স্বয়ংসম্পূর্ণ! আর Morning লেখাটি সে গুঁজে দিল ঠিক দুটো বুকের মাঝখানটায়, খানিকটা নিচে। তার ভণ্ডামি এখানেই শেষ নয়, এরপর ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে জুড়ে দেয়,
❝আগুনে যাব পুড়ে,
রয়েছো কেন দূরে?
দাওনা সাড়া…
তোমায় ডাকি চোখের ইশারায়,
তুমি ছুঁয়ে দিলে হায়,
আমার কি যে হয়ে যায়…❞
গানটা জুড়েই ন্যাসোকে সরাসরি ট্যাগ দিয়ে ছবিটা ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে চড়িয়ে দিল ইবরাত। তবে তার এই উদ্ভট রসিকতা আর ভণ্ডামির এখানেই শেষ হয়না। এর ঠিক পরপরই ন্যাসোর একই রকম আরেকটা ছবিতে সে ন্যাসোর বুকের বুটোর ওপর বসিয়ে দিল একটি ধোঁয়া ওঠা সিগারেটের জিআইএফ (GIF)। আর সেই ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে লাগল একেবারে অচিন্তনীয় এক গান,
❝ধরো কলকি, মারো টান
গাঞ্জা বাবার আশেকান…
মইরা গেলে সঙ্গে
কিছুই যাইবো না…❞
দ্বিতীয় স্টোরিটিতেও ইবরাত যথারীতি ন্যাসোকে ট্যাগ দিয়ে পোস্ট করে দিল। এতসব আকাম-কুকাম শেষ করে এবার সে ফোনটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে অপেক্ষা করতে লাগল ন্যাসোর গর্জনের।
তবে ন্যাসো তাকে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করাল না। মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায়ই পাশের রুম থেকে গর্জন তুলতে তুলতে তেড়েফুঁড়ে এলো সে। বাইরে ন্যাসোর ভারী পায়ের শব্দ কানে আসামাত্রই ইবরাত তড়িঘড়ি করে ছুটে গিয়ে তরতর করে একদম কেবিনেটের ওপর উঠে বসল।
ন্যাসো রুমে ঢুকছিল ক্ষিপ্ত বাঘের মতো হুঙ্কার দিতে দিতে। কিন্তু রুমে পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল। পুরো রুমে ইবরাতের কোনো চিহ্নই নেই! মেয়েটা গেল কোথায়? ন্যাসো কপাল কুঁচকে এদিক-সেদিক তাকাল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল কেবিনেটের একদম উঁচুতে। সেখানে ভয়ার্ত হরিণছানার মতো সংকুচিত হয়ে বসে আছে ইবরাত।
ন্যাসো ঘাড় তুলে ইবরাতের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধমকে উঠল, “আর ইউ গান ম্যাড? এসব কী স্টোরি দিচ্ছ, ফাজিল মেয়ে! এক্ষুনি কাটো বলছি, নয়তো একদম শুট করে দেব!”
বলেই ন্যাসো পকেট থেকে রিভলবার বের করে তাক করল। ভয়ে কেঁপে উঠল ইবরাত। সে আর দেরি না করে নাইটস্যুটের পাজামার পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত স্টোরিগুলো ডিলিট করতে শুরু করল। তবে স্টোরি কাটতে কাটতেই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে বলতে থাকে,
“এভাবে ধমকাবেন না। আমি কিন্তু মোটেও ধমক খাওয়ার মতো মেয়ে নই। আমার গাল দুটো দেখেছেন, কত ফোলা ফোলা? এবার আপনার এই বাজে ধমকে আমি যদি সত্যি সত্যি সত্যি রাগ করি, তাহলে কিন্তু ফোলা গাল দুটো একেবারে ব্লাস্ট হয়ে যাবে! তখন কিন্তু লসটা আপনারই হবে, আর আমাকে চুমু খেতে পারবেন না। ইবরাতের গালে চুমু খেতে না পারলে, কাঁদতে হবে আড়ালে।”
কথাগুলো শেষ করে ইবরাত চোখ তুলে ন্যাসোর রাগে লাল হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকাল,”আর শুনুন, এই ফাজিলমিগুলো আমি ইচ্ছে করেই করেছি, আপনাকে একটু দেখার জন্য। এখানে আসার পর থেকে তো আপনার আর কোনো দেখাই নেই। আমাকে এভাবে রুমে আটকে রেখেছেন। আপনাকে না দেখে আমার একদম দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল গলার কাছে নিঃশ্বাস আটকে গেছে। আর এখন দেখুন, আপনাকে সামনাসামনি দেখার পর কত স্মুথলি নিঃশ্বাস নিচ্ছি।”
ইবরাত বেশ নাটকীয়ভাবেই জোরে জোরে শ্বাস ফেলে দেখাল। ন্যাসোর চোখমুখ কুঁচকে এলো। তাকে দেখার সাথে নিঃশ্বাস নেওয়ার কী যে সমীকরণ, সে কিছুতেই তা মেলাতে পারল না। তবে ইবরাতের এই ছটফটে স্বভাবের দিকটা সে খানিকটা হলেও যেন বুঝতে পারল। এমন চঞ্চল একটা মেয়ে আসার পর থেকেই চারদেওয়ালে বন্দি, হাঁসফাঁস লাগাটাই তো স্বাভাবিক।
ন্যাসোর শক্ত চিবুকে এখন আর কোনো রাগের ছাপ নেই। সে বেশ শান্ত গলায় বলল,
“তোমার মতো একটা ইনোসেন্ট সোলের জন্য এই ম্যানশনটা নরক। এখানে পিশাচদের বসবাস। এখানকার মানুষের চালচলন, কথা বলার ধরন আর প্রতিটি আনাচে-কানাচে লেগে থাকা দমবন্ধ করা রহস্যের ভেতরে তুমি এমনিতেও প্রাণখুলে বাঁচতে পারবে না। এখানকার কেউ ভালো না… আই রিপিট, কেউ নয়। সবাই ছলনায় এক্সপার্ট। এখানে সৌজন্যতা নয়, নৃশংসতা শোভা পায়, যা সহ্য করা তোমার পক্ষে অসম্ভব। তাই তোমার জন্য এই রুমটাই সবচেয়ে সেফ, বুঝলে লিটল গার্ল? এবার নেমে এসো। মেডকে দিয়ে খাবার পাঠাচ্ছি, খেয়ে নাও।”
ন্যাসোর এই শান্ত অথচ গভীর কথাগুলোর ভেতরে ইবরাত যেন এক সমুদ্র ভালোবাসা দেখতে পেল, দেখতে পেল তাকে নিয়ে উপচে পড়া এক আকাশ উৎকণ্ঠা। লোকটা যে তার সুরক্ষার ব্যাপারে কতটা সচেতন, তা বুঝতে পেরে ইবরাত মোমের মতো গলে গেল। ভীষণ আহ্লাদী গলায় আবদার করে বসল,
“কোলে করে নামান না… প্লিজজজ!”
ন্যাসো ভ্রু নাচিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে, “ওপরে ওঠার সময় কি আমি তুলে দিয়েছিলাম?”
“না।”
“তাহলে কে তুলে দিয়েছিল?”
“আমি নিজেই।”
“তাহলে এবার নামোও নিজেই।”
মুহূর্তেই ইবরাতের ছোটো মনটা একদম শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেল। ফর্সা মুখটা কালো হয়ে এলো মেঘের মতো। সে অভিমানী বাচ্চাদের মতো ন্যাসোর দিক থেকে ঝটকা মেরে মুখ ফিরিয়ে নিল। ইবরাতের এই বাচ্চাদের মতো রাগ দেখে ন্যাসোর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে। কিন্তু হাসির মাঝেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল ইবরাতের গলার এক পাশে। নাইটস্যুটটা কাঁধের দিক থেকে কিছুটা সরে গেছে, আর তার ভেতর থেকে আলতো করে উঁকি দিচ্ছে সবুজ রঙের একটা ফিতা।
ন্যাসো সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিল। গলায় অস্বস্তি ফুটে ওঠে, ইতস্তত কণ্ঠে বলল, “নাইটস্যুটের সাথে ইনার কে পরে, স্টুপিট।”
সেখানে সে আর একদণ্ড দাঁড়াল না। তৎক্ষনাৎ ঘুরে
দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে কেন যেন সে আবার থামল। পুরোপুরি পেছন না ফিরে শুধু খানিকটা ঘাড় কাত করে বলল,
“অ্যান্ড আই হেইট গ্রীন!”
বাইরে বেরিয়ে এসে সশব্দে দরজাটা আটকে দিল সে। তারপর দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে লম্বা লম্বা কয়েকটা নিঃশ্বাস ফেলল নিজেকে শান্ত করার জন্য। ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের এলোমেলো অনুভূতিগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে যেমনই সামনে তাকাল, অমনি একেবারে থতমত খেয়ে গেল সে। সামনে দাঁড়িয়ে লুকাস, চোখে গোয়েন্দাসুলভ চাতুর্যের দৃষ্টি।
ন্যাসো শুকনো মুখে ঢোক গিলল। চেহারার ক্ষণিক অপ্রস্তুত ভাবটা এক নিমেষে মুছে ফেলে সে আবার সেই চেনা যন্ত্রমানবের মতো গম্ভীর রূপ ধারণ করল। গলার স্বর ভারী করে বলল, “তুমি এখানে?”
আমারও তো একই প্রশ্ন! সকাল সকাল তুমি এখানে কী করছ?”
ন্যাসোর গলা কেমন যেন শুকিয়ে আসছে, একটা সাধারণ উত্তর দিতেও সে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। কিন্তু লুকাসের এত ধৈর্য ছিল না। সে এগিয়ে এসে ন্যাসোর কানের কাছে মুখটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শোনো, আমার ভেতরে এত্তো এত্তো প্রেম, রোমান্স… তাও বউয়ের অভাবে কিছুই করতে পারছি না! আর তোমার বউ তো পারলে তোমাকে বগলদাবা করে এক কামড়ে খেয়ে ফেলে, তাও তুমি কোনো পাত্তাই দাও না। তুমি কি সত্যিই কোনো পুরুষ, নাকি স্রেফ একটা রোবট?”
লুকাসের এই ইয়ার্কিতে ন্যাসোর ক্ষিপ্ত হয়ে চোখ রাঙানোর কথা ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে তা করল না। কোনো কথা না বলে একদম নিঃশব্দে সেখান থেকে হেঁটে চলে গেল। ন্যাসোকে এভাবে নিস্তব্ধ হয়ে হেঁটে চলে যেতে দেখে লুকাস স্থির হয়ে গেল। মুখের দুষ্টুমি মাখা হাসিটা হারিয়ে গিয়ে বিষণ্নতা নেমে এলো। মনে মনে অপরাধবোধ দানা বাঁধল, মজা করতে গিয়ে সে কি ন্যাসোকে গভীর কোনো আঘাত দিয়ে ফেলল? মনে করিয়ে দিল না তো তার কোনো ভয়াবহ, রোমহর্ষক অতীত?
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না; তার নিজস্ব গতিতেই সে বয়ে যায় । দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও পাঁচটি দীর্ঘ দিন। এর মধ্যে জ্বরে একেবারে কাবু হয়ে পড়েছিল এলিজাবেথ। সেদিন সমুদ্রসৈকতে জ্ঞান হারানোর আগের সেই ঝাপসা স্মৃতি আর জ্ঞান ফেরার পর ইবরাতের কাছ থেকে পাওয়া সত্য, এই দুইয়ের ধাক্কায় এলিজাবেথের যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল।
চেতনা পুরোপুরি হারানোর আগে এলিজাবেথের নাসারন্ধ্র কিন্তু সজাগ ছিল। যে মানুষটি তার কাছে এগিয়ে এসেছিল, তার শরীর থেকে ভেসে আসছিল অচেনা ঘ্রাণ। এলিজাবেথ বুঝতে পারে, সে যাকে দেখেছিল সে রিচার্ড ছিল না, রিচার্ডের চেহারার হুবহু প্রতিরূপ। রিচার্ড তো ব্যবহার করে হেনরি জ্যাকস-এর হাতে তৈরি বিশেষ কাস্টমাইজড বেসপোক পারফিউম, যা গোটা বিশ্বে কেবল তার জন্যই প্রস্তুত করা হয়। কানাডায় থাকার সময় এই মহামূল্যবান সুগন্ধি এলিজাবেথকে উপহার দিয়ে রিচার্ড একান্তে বলেছিল,
“পরিচিত ঘ্রাণ মানুষকে অতীতে নিয়ে যায়।”
আলঝেইমারের অভিশাপে এলিজাবেথ যদি কখনও রিচার্ডকে ভুলেও যায়, তবুও যেন এই পরিচিত ঘ্রাণ তাকে রিচার্ডের উপস্থিতি অনুভব করায়, এটাই ছিল সেই উপহারের নেপথ্য আকুতি। কিন্তু সেদিন রিচার্ডের সাদৃশ্য নিয়ে আসা লোকটির শরীরে সেই চেনা সৌরভের লেশমাত্র ছিল না। ড্রাগসের প্রভাব কাটতেই স্মৃতিগুলো একে একে স্পষ্ট হতে শুরু করে। তারপর সেই মানসিক চাপ আর সহ্য করতে না পেরে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসে এলিজাবেথের।
গতকাল ফাদার রিচার্ডের চাপে পড়ে বাধ্য হয়েই এলিজাবেথের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি এলিজাবেথকে এই সাজানো মিথ্যে বিয়ে এবং সোফিয়ার রোগ সম্পর্কে সবটা খুলে বলেন। সব জানার পর একদিকে যেমন রিচার্ডকে মন থেকে পুরোপুরি ক্ষমা করতে পারেনি এলিজাবেথ, তেমনি সোফিয়ার ওপর জমে থাকা ক্ষোভও একেবারে কমেনি।
পরদিন সকালে লনের সবুজ ঘাসের ওপর রাখা একটা কালো ভেলভেট কাউচে বসে ছিল রিচার্ড। অফিসে যাওয়ার জন্য সে একদম সুসজ্জিত। সামনে থাকা ছোট কালো টেবিলটিতে বেশ কিছু ফাইল খোলা, আর তার এককোণে রাখা ছিল একটি প্যাকেট সিগারেট। রিচার্ডের দু’পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল কালো স্যুট পরা ন্যাসো আর লুকাস। দেড় মাস অফিসে না যাওয়ার মাশুল হিসেবে ড্রাগন গ্রুপ এর প্রায় ৬০ শতাংশ মুনাফা ও শেয়ার বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাও কেবল সোফিয়ার জন্য। ফাইলগুলোর দিকে খুঁটিয়ে তাকাতেই রিচার্ডের চোয়ালের শক্ত পেশি আর বিরক্তির রেখাগুলো তীব্র হয়ে ওঠে।
হঠাৎ সেই মুহূর্তে সেখানে এসে হাজির হয় সোফিয়া। রিচার্ড সোফিয়াকে দেখেও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। অনমনীয় রিচার্ডের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে সোফিয়া হাঁটুমুড়ে টেবিলের পাশে ঘাসের ওপর বসে পড়ে। তাতেও রিচার্ডের দৃষ্টি না পেয়ে সে অভূতপূর্ব আস্পর্ধা দেখায়। টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিয়ে লাইটার দিয়ে একটি সিগারেট ধরিয়ে তা সোজা বাড়িয়ে দেয় রিচার্ডের ঠোঁটের সামনে। সোফিয়ার এমন দুঃসাহস দেখে ন্যাসো আর লুকাস রীতিমতো বাক্যহারা হয়ে পড়ে। তবে রিচার্ডের চেহারায় চট করে কোনো রাগের প্রকাশ দেখা গেল না। তার শান্ত অবয়বের অন্তরালে তখন খেলা করছিল নৃশংসতার অবচেতন নকশা। নিস্পৃহ হাতে সে সোফিয়ার হাত থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটি তুলে নেয়। সেটির ধোঁয়া বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই যখন তার ভেতরের সুপ্ত হিংস্র সত্তা রূপ নিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখুনি ম্যানশন থেকে বেরিয়ে আসে এলিজাবেথ। দূর থেকে এলিজাবেথকে দেখামাত্রই রিচার্ডের ভেতরের সমস্ত হিংস্রতা মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এলিজাবেথের ভঙ্গুর শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে রিচার্ড কালবিলম্ব না করে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
সোফিয়াকে রিচার্ডের পাশে অতটা ঘনিষ্টভাবে বসে থাকতে দেখে এলিজাবেথের পা দুটো থমকে দাঁড়ায়। তার ভেতরের প্রেমিকা সত্তাটা হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হতে থাকে। তবে নিজের ক্রোধকে সোফিয়ার সামনে বিস্ফোরিত হতে দিল না সে। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়েই সোজা রিচার্ডের পাশে কাউচে শরীরের অর্ধেক ভর দিয়ে বসে পড়ল এলিজাবেথ। তারপর সুতীব্র অধিকারে তার পা দুটো তুলে দিল রিচার্ডের উরুর ওপর। পুরোটা সময় সে সোফিয়ার দিকে একবারের জন্য ফিরেও তাকাল না, যেন মেয়েটার কোনো অস্তিত্বই নেই এখানে। সোফিয়া সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এলিজাবেথের দিকে।
এই রাশিয়ান রমণীর মনের ভেতরের রাজনীতি আর কৌশল বুঝতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না রিচার্ডের। তার ঠোঁটের কোণে খেলে এেল অদৃশ্য হাসি। সবার সামনেই সে এলিজাবেথের কোমল পায়ের পাতায় ঠোঁট ছোঁয়াল। বিনিময়ে এলিজাবেথ সোফিয়ার গা জ্বালানোর জন্য লাজুক হাসি দিল, ঠিক যেন সদ্য বিবাহিত কোনো মিষ্টি বধূ।
তবে এলিজাবেথের এই নাটক এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ রইল না। সে ইচ্ছাকৃতভাবে আঙুল দিয়ে রিচার্ডের টাই ধরে টেনে তার ইস্ত্রি করা পরিপাটি স্যুটটা কুঁচকে দিতে লাগল। তা দেখে সোফিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, “উফফ… এসব কী করছ? প্রিন্স এসব একদম পছন্দ করে না!”
সোফিয়ার কথা শুনে এলিজাবেথ অবাক হওয়ার ভান করে রিচার্ডের দিকে তাকাল, “উফফ, স্যরি মি. কায়নাত! রাগ হলো বুঝি?”
রিচার্ডের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর এলো,”কখনোই না।”
এলিজাবেথ তখন ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে সোফিয়ার দিকে তাকাল, “শুনেছ?”
সোফিয়া একদম নীরব। রাগে আর অপমানে সে শুধু আঙুলে আঙুল পিষতে লাগল। এলিজাবেথ আবার রিচার্ডের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “মি. কায়নাত, আমার মনে হয় ও ঠিক শুনতে পায়নি।”
অর্ধাঙ্গিনীর এই চতুর বুদ্ধি দেখে রিচার্ড ঠোঁট কামড়ে চাপা হাসল। তারপর সোজা হয়ে এলিজাবেথের দিকে খানিকটা ঝুঁকে, তার কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “ডিড আই মিস মর্নিং কিস, সুইটহার্ট?”
এমন সময় ম্যানশনের ভেতর থেকে ফাদারের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, “সোফি, রিদ, ভেতরে আসো। প্রাতরাশ তৈরি।”
এই ম্যানশনে সবাইকে সকালের নাস্তা একসঙ্গে বসে করতে হয়, এটা ফাদারের তৈরি করা কড়া নিয়ম। কিন্তু ফাদারের ডাকার পরও সোফিয়ার মধ্যে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ না দেখে পাশ থেকে লুকাস টিপ্পনী কেটে বলল, “এই সোফা, ফাদার ডাকছে।”
এভাবে নাম বিকৃত করে ডাকায় সোফিয়া বরাবরের মতোই লুকাসের দিকে হিংস্র চোখে তাকাল। তারপর আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহন করে ভেতরে চলে গেল।
খাবার টেবিলে তখন ভারী গাম্ভীর্য নেমে এসেছে। সোফিয়া বসেছে ফাদারের পাশে, আর রিচার্ডের পাশে এলিজাবেথ। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। থমথমে নীরবতায় সবাই নিমগ্ন। এমনকি মেডরাও যেন নিঃশ্বাস চেপে একে একে খাবার পরিবেশন করে চোখের পলকে কিচেনে মিলিয়ে যাচ্ছে। তাসাকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সেদিনের ঘটনার পর থেকে সে আর ভুল করেও রিচার্ডের সামনে ঘেঁষে না।
টেবিলের নিচে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছিল ফাদারের বিড়াল লিও,মৃদু মেউমেউ শব্দ করছিল। হঠাৎ এলিজাবেথের অসাবধানতায় রিচার্ডের স্যুপের বাটিটা হাত পিছলে নিচে পড়ে গেল। আঁতকে উঠল এলিজাবেথ, “আ–আই ‘ম স্যরি!”
রিচার্ড শান্ত গলায় অভয় দিয়ে বলল, “ইটস ওকে। ডোন্ট প্যানিক।”
এলিজাবেথ কিছু একটা বলতে যাবে, হঠাৎ তার চোখ পড়ল নিচে। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া স্যুপটা আগ্রহ নিয়ে মুখে দিচ্ছে লিও। মুখে দেওয়ার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড সব স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল, কিন্তু চোখের পলকেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট। হঠাৎ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল লিও। অদ্ভুত আর অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগল বিড়ালটি। তীব্র খিঁচুনিতে শরীর দুমড়ে-মুচড়ে যেতে লাগল তার, মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল সাদা ফেনা। বিষক্রিয়ার অনসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে অবুঝ প্রাণীটি একসময় চিরতরে শান্ত হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল তার খিঁচুনি। নিথর দেহটা নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইল ঠান্ডা মেঝেতে।
সবাই হতবিহ্বল হয়ে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিল লিওর দিকে। চোখের পলকেই শেষ হয়ে গেল একটা তরতাজা প্রাণ! নিজের অতি প্রিয় পোষা প্রাণীকে এভাবে চোখের সামনে ঢলে পড়তে দেখে ফাদার স্তব্ধ।
“বি–বিষ!” এলিজাবেথের ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে। আতঙ্কিত চোখে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিওর ঠোঁটের ফাঁক গলে বের হতে থাকা সাদা ফেনার দিকে।
এলিজাবেথের কাঁপা কণ্ঠের কথা শুনে সবাই চমকে উঠে তার দিকে তাকাল। এলিজাবেথ ধীরঘেটে কাঁপাকাঁপা দৃষ্টিতে রিচার্ডের দিকে তাকাল, ওর কণ্ঠে ভাঙা কাঁচের মতো কাঁপে,
“স্যুপে বিষ ছিল! আপনাকে কেউ মা রতে চাইছে, মি. কায়নাত।”
কথাটা শোনামাত্রই যেন উপস্থিত সকলের চোখে-মুখে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তবে ফাদার রাগী চোখে তাকালেন এলিজাবেথের দিকে। শাসনের ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,
“এই মেয়ে, কী যা-তা বলছ? এই স্যুপ আমরা সবাই খেয়েছি।কই, আমাদের তো কিছু হলো না?”
এলিজাবেথ এবার সরাসরি ফাদারের চোখে চোখ রেখে শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বলল, “আমারও তো ঠিক একই কথা, মি. ভিনসেনজো। আমাদের কারও তো কিছু হলো না, অথচ ওনার বাটির স্যুপটা খেয়েই লিওর কেন এমনটা হলো? এর মানে কী দাঁড়ায়, বলুন তো?”
এলিজাবেথের ওমন তীক্ষ্ণ, হিসেবি এবং মেপে দেওয়া যুক্তির সামনে ফাদার থতমত খেয়ে গেলেন। তার ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে আরও ভঙ্গুর করে দিতে রিচার্ড পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত শান্ত, দূরদর্শী দৃষ্টিতে তাকাল ফাদারের দিকে। রিচার্ডের সেই নিস্পৃহ অথচ ধারালো চোখের চাহনি দেখে ফাদারের ভেতরের তীব্র প্রতিবাদের তেজ যেন নিমেষেই বাতাসে মিলিয়ে গেল।
ফাদার অপরাধীর মতো রিচার্ডের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন। তারপর কাঁপতে থাকা মেডদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কে করেছিস এই কাজ? সহজ মৃত্যু চাইলে সত্যি করে বল, কার কথায় এই কাজ করেছিস?”
এতক্ষণ নীরব ভূমিকা পালন করা সোফিয়া হঠাৎ করে লুকাসের কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবারটা এক হ্যাঁচকায় টেনে নিল। তারপর টেবিলের সামনে তটস্থ হয়ে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা মেডদের দিকে তেড়ে গেল। লিও মারা যাওয়ার পরপরই ফাদারের গম্ভীর আদেশে কিচেন থেকে তারা দ্রুত ছুটে এসেছিল। সোফিয়ার হাতে উন্মুক্ত অস্ত্র দেখে সকলেই ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
ফাদার আবার গর্জে উঠলেন, “আমার জানের দিকে হাত বাড়িয়েছিস তোরা! সত্যি করে বল, কে খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়েছিস? নয়তো আজ তোদের কাউকে আমি জ্যান্ত রাখব না।”
ফাদারের হুঙ্কারে কেঁপে উঠল পুরো ম্যানশন। মেডরা ভালো করেই জানে৷ আজ মুখ খুললেও তাদের কপালে মৃত্যু, না খুললেও নিস্তার নেই। একজন মেড ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আঙুল তুলে কাউকে ইশারা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার হাত সম্পূর্ণ ওঠার আগেই সোফিয়া তাকে লক্ষ্য করে গু লি চালিয়ে দিল। একটার পর একটা গুলির বিকট শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠল পুরো ম্যানশন। এক নিমিষেই সবকটা মেডকে সে গুলি করে মৃ ত্যুর খাদে ফেলে দিল।
গুলির এমন নৃশংস আর বিকট শব্দে এলিজাবেথ আঁতকে উঠে দু’হাতে কান চেপে ধরল। রিচার্ড দ্রুত এগিয়ে এসে তার শক্ত বাহুতে আগলে নিল এলিজাবেথকে। ওদিকে সোফিয়া তখন ক্রোধে ফুঁসছে। ফাদার দ্রুত ছুটে গিয়ে মেজাজ হারানো মেয়েকে নিজের বুকে চেপে ধরলেন। সোফিয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বলল, “ওদের সাহস হয় কী করে আমার প্রিন্সের ক্ষতি করার?”
ফাদার মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বুকে জড়িয়ে রাখলেও তার চোখ দুটোতেও ছিল কড়কড়ে বিস্ময়। এই মুহূর্তে সোফিয়া যেভাবে ঠান্ডা মাথায় র ক্তের হোলি খেলল, তা ফাদারকেও যেন ভেতর থেকে ভড়কে দিয়েছে। সাদা মার্বেলের মেঝেজুড়ে ততক্ষণে র ক্তের বন্যা বয়ে গেছে। ন্যাসোর চোখের ইশারায় ততক্ষণে গার্ডরা নিশব্দে লাশগুলো সরিয়ে নেওয়ার কাজে লেগে পড়ল।
ফাদার শুকনো ঢোক গিলে রিচার্ডের দিকে তাকালেন। তিনি যেমনটা ভেবেছিলেন ঠিক তেমনই, রিচার্ড অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও ধারালো চোখে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রিচার্ডের এই নীরব দৃষ্টির গভীর অর্থ ফাদারের অচেনা নয়। তিনি ফের ঢোক গিলে জড়ানো কণ্ঠে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করলেন, চেষ্টা করলেন পরিবেশটা হালকা করতে,”একজন মাফিয়ার মেয়ের রক্তে এটুকু তেজ থাকা খুব স্বাভাবিক।”
ফাদারের কথা শুনে রিচার্ড ঠোঁট কামড়ে রহস্যময় হাসল। তারপর এলিজাবেথকে নিজের পেশল বাহুর বাঁধন থেকে খানিকটা আলগা করে নিঃশব্দে ফাদারের কাছে এগিয়ে গেল। ফাদারের একদম কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে অত্যন্ত নিচু, বিষাক্ত হিসহিস স্বরে আওড়াল, “একটা অসুস্থ মেয়ের শুটিং স্কিল এতটা দুর্দান্ত?”
রিচার্ড ফাদারকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিল না। ফাদারের চোখ চড়কগাছ হওয়া চাহনিতেই যেন সে তৃপ্তি পেল। গা-জ্বালানো এক চতুর হাসি ফুটিয়ে এলিজাবেথের কাছে ফিরে গেল রিচার্ড। ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“অফিসে যাচ্ছি। ফিরতে একটু লেট হবে। রুম থেকে একদম বের হবেন না। টেক কেয়ার, বোথ অব ইউ।”
রিচার্ড আর ন্যাসো, লুকাস অফিসের উদ্দেশ্যে ম্যানশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ফাদারও সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। মুহূর্তের মধ্যে থমথমে দৃশ্যপট একদম বদলে গেল। আশেপাশে তখন আর কেউ নেই।
সবাই চলে গেলে এলিজাবেথ ধীরপায়ে গিয়ে দাঁড়াল সোফিয়ার ঠিক মুখোমুখি। এলিজাবেথের চোখে-মুখে এখন আর সেই ভয় বা অসুস্থতার ছাপ নেই। তার বদলে সেখানে স্পষ্ট রুদ্রমূর্তি ভাব। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে ক্রূর হাসি। বিপরীতে সোফিয়াকে দেখাল অস্বাভাবিক শান্ত। দুজনই তীক্ষ্ণ নজরে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কথোপকথনের সূচনাটা এলিজাবেথ নিজেই করল। সে সোফিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হাই, আমি এলিজাবেথ। মিসেস এলিজাবেথ কায়নাত।”
বিপরীতে সোফিয়া সৌজন্যের হাসি দিল। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল জোরপূর্বক মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। সে হাত মেলালো এলিজাবেথের হাতের সঙ্গে, “আমি সোফিয়া।”
এলিজাবেথের কৃত্রিম হাসি এবার আরও চওড়া হয়ে উঠল। অত্যন্ত সূক্ষ্ম খোঁচা মেরে শুধাল, “সারনেম?”
সোফিয়া থমকে গেল। খোঁচাটা ধরতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে সামলে বলতে চাইল, “সোফিয়া কায়…
কথাটা সম্পূর্ণ শেষ করতেই দিল না এলিজাবেথ। তাচ্ছিল্যে দিয়ে বলল, “যাই হোক, আই’ম নট ইন্টারেস্টেড অ্যাবাউট দ্যাট।”
সোফিয়ার চিবুকের পেশি রাগে শক্ত হয়ে এলো। তা দেখে এলিজাবেথ তার স্বামীর মতোই গা-জ্বালানো হাসি উপহার দিল।
সোফিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ইউ আর জাস্ট টু মাচ!”
এলিজাবেথের হাসি থামল। সে এবার অত্যন্ত শান্ত, হিমশীতল দৃষ্টিতে সোফিয়ার দিকে তাকাল। চোখে চোখ রেখে অকপটে স্পষ্ট গলায় জবাব দিল, “হি লাভস ইট।”
সোফিয়া এলিজাবেথের চোখে কটাক্ষ ছুড়ে দিয়ে বলল,”ইউ আর টক্সিক!”
বাতাসের গতিতে এলিজাবেথের জবাব এলো, “হি ইজ দ্য অ্যান্টিডোট।”
“ইউ আর ক্রেজি!”
“হি ক্যান হ্যান্ডেল ইট।”
এলিজাবেথের এমন অদম্য আর আত্মপ্রত্যয়ী জবাবে সোফিয়ার রাগ এবার চরম সীমানায় পৌঁছে গেল। কণ্ঠস্বর চড়িয়ে সে গর্জাল, “ইউ আর সাইকো!”
এলিজাবেথ আলতো হাসল। সোফিয়ার গলা চড়লেও তার কণ্ঠ ছুলো ম্যানশনের দূর্গ,”হি ইজ দ্য সাইকো ওয়ার্ড।”
“ইউ আর স্কিমিং টু মাচ!”
এলিজাবেথ হালকা করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসল, “হি লিসেনস।”
সোফিয়া এক পা এগিয়ে এসে এলিজাবেথের চোখের ভেতর নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বিঁধে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এই রাজ্য আমার বাবার! সুতরাং, আমার সামনে একদম উঁচু গলায় কথা বলবে না। ওয়ার্নিং দিচ্ছি, একদমই না! এই সিংহাসন আমার!”
এলিজাবেথ চমৎকার হেসে আরও এক কদম এগিয়ে এলো। সোফিয়ার চোখে চোখ রেখে উত্তরটা দিল তার ভাষার চেয়েও শক্তিশালী ভাষায়, “তোমার বাবা রাজা হলে আমার স্বামী সম্রাট, আর আমি তার সম্রাজ্ঞী। তাই আমার কথায় তেজ থাকাটাই স্বাভাবিক। রাজা আর সম্রাটের পার্থক্য বোঝ তো? তুমি যদি সিংহাসনের দাবিদার হও, তবে আমি সেই সম্রাটের সম্রাজ্ঞী—যে তার সম্রাজ্ঞীর জন্য এমন হাজারও রাজ্য নিঃশর্তে ত্যাগ করতে পারে।”
সোফিয়ার দৃষ্টি কঠিন হলো। তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এলিজাবেথ বলতে লাগল, “সিংহাসন তোমার হতে পারে, কিন্তু রাজত্বটা পুরোপুরি আমার। পুরো রাজ্যে তোমার বাবার শাসন থাকলেও, সম্রাটকে শাসন করার অধিকার কিন্তু শুধুই আমার!”
“হুঁশশশ… এভাবে আমাকে ভেঙে ফেলা যাবে না, কখনোই না। আমি ভেঙে গেলেও নতুন করে ইতিহাস গড়তে পারি। আমি গেম চেঞ্জার। পাশার গুটি কখন কোনদিকে উল্টে যাবে, তা কে জানে?”
এলিজাবেথ বাঁকা হেসে জবাব দিল, “তুমি যদি গেম চেঞ্জার হও, তবে আমি সেই গেমের ক্রিয়েটর। তুমি ইতিহাস হলে, আমি সেই ইতিহাস বদলে দিতে প্রস্তুত। আমি নারী, ধবংস করার ক্ষমতা যেমন আমি রাখি, তেমনি সব ছারখার করে দিয়েও নিজের ভালোবাসাকে ছিনিয়ে আনতে জানি। সে আমার ছিল, আর আমারই থাকবে! আর তুমি? শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে তা দেখবে। শুধু শুধু হিংসা করে নিজের স্বাস্থ্য নষ্ট কোরো না, রাজত্বটা আমারই।”
সোফিয়া মুখ বেঁকিয়ে বলল, “কথার মারপ্যাঁচে তুমি আমাকে আগুনের মতো জ্বালাতে পারবে ঠিকই, কিন্তু পোড়াতে পারবে না। একদিন সেই আগুনে তুমি নিজেই পুড়বে। শুনে রাখ আমি এক রহস্যময়ী, আর সেই রহস্যের সমাধান আমি নিজেই!”
“আগুনটা তো তুমিই জ্বালিয়েছ। তাই এই আগুনে আমি পুড়লে, তোমাকেও সঙ্গে নিয়েই পুড়ব। এই খেলায় হারলে মরব, আর জিতলে রানি হয়ে রাজার রাজত্বে রাজত্ব করব, তা-ও তোমার চোখের সামনেই।”
সোফিয়া হঠাৎ থেমে গিয়ে রহস্যময় হাসল, “যদি রাজাই না থাকে?”
এলিজাবেথ থমকে গেল, “মানে?”
“রাজার রাজত্বে যদি রাজাই না থাকে, তখন? তখন কোথায় থাকবে এই সিংহাসন আর কোথায় থাকবে তার রানি?”
এলিজাবেথের বুকের ভেতর একটা অজানা শঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠল, তার অস্থিরতা বাড়ল। সোফিয়া চলে নিতে চাইলে সে পেছন থেকে সোফিয়ার হাত খামচে ধরল,”কী বোঝাতে চাইছ তুমি?”
সোফিয়া ঠোঁট কামড়ে বিষাক্ত হেসে রহস্যের জাঁলে ফেলে ফিসফিসিয়ে বলল, “বি আ বিচ, নেভার আ বেচারি! হি ইজ দ্য মেইন কালপ্রিট। হি ইজ নট দ্য হিরো, হি ইজ দ্য ভিলেন!”
Born to be villains part 36
এলিজাবেথকে বিভ্রান্তি আর সংশয়ের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে সোফিয়া শিস বাজাতে বাজাতে সেখান থেকে চলে গেল। এলিজাবেথ নিস্পন্দ হয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটার শেষ কথাগুলো তার মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড়ের মতো পাক খেতে লাগল। রিচার্ডই আসল কালপ্রিট, মানে কী?
