এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫০
সুহাসিনী
প্রায় দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি হয়ে গেছে বৃষ্টি পার্লারে ঢুকেছে। সাঈদের আর ধৈর্য্য কুলাচ্ছে না। অধৈর্য্য হয়ে পার্লারে ঢুকতে গেলে দেখতে পায় বৃষ্টি ধীর পায়ে শাড়ির কুচি ধরে খুব সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে আসছে।
গাঢ় কালো রঙের দামি শাড়িটা তার শরীরের সঙ্গে এমন নিখুঁতভাবে মিশে ছিল, যেন সেই শাড়িটা শুধু তার জন্যই তৈরি হয়েছে। শাড়ির সূক্ষ্ম কাজগুলো সন্ধ্যার আলোয় চিকচিক করে উঠছিল। মাথায় পরিপাটি করে হিজাব বাঁধা,চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে ম্লান গোলাপি আভা। বাড়তি কোনো আড়ম্বর ছিল না, অথচ সেই সরল সাজেই ছিল রাজকীয় এক সৌন্দর্য।
বৃষ্টিকে এই রুপে দেখার পরের মুহূর্তেই যেন সময় থেমে গেল।এক মুহূর্তের মধ্যে সে রাহি আর বৃষ্টিকে গুলিয়ে ফেললো।ভুলে বসলো তার সামনে রাহি নয় বৃষ্টি দাঁড়িয়ে।রাহিকে যেদিন প্রথম দেখেছিল সেদিন যেমন জমে গিয়েছিল সে আজকেও ঠিক একি রকম অনুভূতি হচ্ছে তার।মন বলছে সে আবার নতুন করে প্রেমে পড়ছে।
সাঈদের বুকের ভেতরটা অকারণেই ধক করে উঠল। দৃষ্টি আটকে গেল বৃষ্টির ওপর। চারপাশে মানুষের চলাফেরা, গাড়ির হর্ন, শহরের কোলাহল—সবকিছু যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। পৃথিবীতে যেন এই মুহূর্তে শুধু একজন মানুষই আছে… আর সে হলো বৃষ্টি।
অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে।
মনে হচ্ছিল, রাতের কালো আকাশ নিজের সমস্ত সৌন্দর্য মুঠো ভরে এনে জড়িয়ে দিয়েছে বৃষ্টির গায়ে। কালো শাড়িটা তাকে ঢেকে রাখেনি, বরং তার সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।যেন প্রথমবারের মতো তাকে দেখছে সাঈদ।
অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে মুগ্ধতার একটুকরো হাসি ফুটে উঠল।
নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল,
“মানুষ এত সুন্দরও হয়…!”
বৃষ্টি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছিল। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সাঈদের হৃদস্পন্দন যেন আরেকটু বেড়ে যাচ্ছিল। চোখ সরিয়ে নিতে চাইলেও পারল না সে। যেন কেউ অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে তার দৃষ্টিকে।
বৃষ্টি সামনে এসে ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে বলল,
“কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
সাঈদ যেন ঘোর কাটিয়ে বাস্তবে ফিরল। বিব্রত হয়ে হালকা কাশল সে। তারপর চোখ নামিয়ে আবার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে চিরচেনা সেই গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“এতক্ষণ লাগে একটা শাড়ি পড়তে,কতটা লেট হয়েছে ধারণা আছে। গাড়ীতে উঠ ফাস্ট।”
ঘড়ির সময় এখন সন্ধ্যা সাতটার ঘরে।
প্রেম রাহিকে নিজের সাথে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু পর পর একেক জন এসে প্রেমের সাথে কুশল বিনিময় করে যাচ্ছে।তার সাথে রাহিকেও কৃত্রিম হেসে তাদের সাথে কথা বলতে হচ্ছে।রাহির আর এসব লোক দেখানো সহ্য হচ্ছে না।তার উপর তার আবার খিদেও পেয়ে গেছে।এখন এই সন্ধ্যার সময় যদি কেউ শুনে রাহির খিদে পেয়ে গেছে তাহলে নিশ্চিত রাহিকে ছোঁচা ভাববে।তাই রাহি দাঁতে দাঁত চেপে খিদে সহ্য করছে।
প্রেম সুযোগ বুঝে রাহিকে শান্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,
“তোমারা কই ভাই বোন ছিলে?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে রাহি ভরকে গেলো।তবে মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে বললো,
“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
প্রেম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।প্রেমকে নির্বিকার দেখে রাহি বললো,
“নাহ্ আমার কোনো ভাই বোন নেই।আমি একাই।”
প্রেম সাথে সাথে কিছু বলল না।কিছুক্ষণ পর বললো,
তুমি এখানে দাঁড়াও আমি একটু আসছি।
প্রেম চলে গেলো রাহিকে রেখে। রাহি এবার একটু ছাড়া পেয়েছে।সেও মুক্ত পাখির মতো আশেপাশে হেঁটে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।এই প্রথম সে এতো বড় কোনো পার্টিতে এসেছে।এখানে সব বড় বড় লোকেদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
“তুমি ভেতরে যাও,আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”
সাঈদের কথামত ভদ্র মেয়ে হয়ে বৃষ্টি সামনের দিকে হঠাৎ ধরলো। এত এত মানুষের মধ্যে সে বুঝতে পারছে না কোথায় যাবে, কি করবে। সে খুব বিব্রতবোধ করছে। তবুও যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে সামনে এগিয়ে গেলো। এরপর এক কোণে গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। সবাই তার দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে যেন তাকিয়ে আছে। তাই আর নড়ল না সে।এমন এক কোণে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে তাঁকে খুব কম দেখা যাচ্ছে। সবার চোখের আড়ালে থাকার জন্য এমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছে সে।
প্রায় পনেরো মিনিট পর সাঈদ ভেতরে ঢুকলো। আশেপাশের চোখ ঘুরিয়ে বৃষ্টিকে খুঁজছে। হয়তোবা পেয়েও গেল বৃষ্টিকে, দেখলে খাবারের ভ্যানুর দিকে যাচ্ছে। হয়তো বা খিদে পেয়েছে। বিরক্ত হলো সাঈদ। আসতে না আসতেই এই সন্ধ্যা বেলায় খিদে পেয়ে গেছে মেয়েটার। বিরক্ত হয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।
আরেকটা বিরক্তির সুরে বলল,
“এসেই খিদে পেয়ে গেছে?”
রাহিও কিছুটা বিরক্ত হয়ে পেছনে ফিরে তাকালো। সাঈদকে এরূপ মন্তব্য করতে দেখে তার বিরক্তি আরো বাড়লো। ভ্রু কুঁচকে খেক খেক করে বললো,
“আমার খিদে পেয়েছে তাতে আপনার কি সমস্যা?”
রাহিকে সে বৃষ্টি ভেবেছে এটা স্পষ্ট।রাহি তো আর বুঝতে পারছে না যে সাঈদ তাকে না বৃষ্টিতে ধমকাচ্ছে।
সাঈদের কপালে খানিক ভাঁজ পড়লো।
“কি হয়েছে কি তোমার? এভাবে চেতে কথা বলছ কেন?”
“তাহলে কি আপনার সাথে মধুর সুরে কথা বলতে বলছেন?”
“আজব তো, ক্ষেপে যাচ্ছ কেনো অযথা?”
“ওহ্,এখন আপনার কাছে লাগছে আমি অযথা ক্ষেপে যাচ্ছি?ক্ষেপে যাওয়ার মতো কাজ করেন কেনো সবসময়?”
রাহি রীতিমতো ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে।এমনিতেই এই লোকটাকে সে দুই চক্ষে সহ্য করতে পারে না।তার উপর আবার তাকে খাওয়ার খোটা দিতে চলে এসেছে।
এরমধ্যেই অনেকের দৃষ্টি বিন্দু হয়ে গেছে তারা। সাঈদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“স্টপ দিস ননসেন্স।”
“দেখুন,আপনাকে দেখলেই আমার গা পিত্তি জ্বলে যায়।তাই বলছি দূরে থাকুন আমার থেকে।”
সাঈদ অবাক হলো।সবার তাকিয়ে থাকা দেখে সে বৃষ্টি ভেবে রাহিকে নিয়ে আড়ালে যাওয়ার জন্য রাহির হাত ধরতে যায় ঠিক ওই মুহূর্তে প্রেম সেখানে উপস্থিত হয়। অত্যন্ত জেদি গলায় প্রেম বলে,
“কিপ ইওর হ্যান্ডস ওফ মাই ওয়াইফ, মিস্টার চৌধুরী।”
অনেকক্ষণ হয়ে গেলো সাঈদকে এখনও না আসতে দেখে বৃষ্টি সামনে হেঁটে সাঈদকে খুঁজতে লাগলো।এতো বড় জায়গায় তার খুব অকওয়ার্ড ফিল হচ্ছে।এখন সে সাঈদকে কোথায় খুঁজে পাবে।এই ভাবনায় ধীরে ধীরে সামনে এগোলো।হঠাৎ একটা মহিলা এসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
“হাই কিউটি, আই অ্যাম শীলা খান্নান, ফ্রম ইন্ডিয়া। বাই দ্যা ওয়ে তোমার শাড়িটা কিন্তু অনেক সুন্দর সাথে তুমিও।”
বৃষ্টি ভদ্রতার সহিত উত্তর করলো,
“জ্বি ধন্যবাদ।”
“তোমার পরিচয়টা তো দিলে না”
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৯
বৃষ্টি নিজের পরিচয় দিতে যাবে অমন সময় সেখানে শান্ত উপস্থিত হলো।বলল,
“আরে তুমি এখানে।আমার রাজকুমারী তো তোমাকে খুঁজছে বোন আমার।”
বৃষ্টি প্রতিউত্তরে কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না।সে তো লোকটাকে চিনে না।লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টিকে খুব ভালো করেই চিনে।কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব। বৃষ্টি যেই কিছু বলতে যাবে অমনি অদূর থেকে কাছ ভাঙার শব্দ ভেসে এলো।
