ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৫
বেলা শেখ
অরুণ সরকারের বিলাসবহুল গাড়ি অফিস গেটের সামনে থামলো। দাড়োয়ান গেট খুলে অপেক্ষমান। অরুণ সরকার স্টিয়ারিং হাতে ভাবনায় বুঁদ। বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে। মনটা বড্ড অস্থির, কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। বাড়িতে পাতাবাহার একা। একদম একা না, তাঁর মধ্যে একটা প্রাণ আছে। অরুণ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছে যায়। গাড়ি পার্ক করে অরুণ বাড়ির চৌকাঠে দাঁড়ায়। কলিং বেলে আঙুল রাখলেও চাপ প্রয়োগ করে নি। কিন্তু দরজা খুলে গেছে। দরজায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লাগেজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অরুণ আকাশ থেকে পড়লো।
“এসব কি?”
পাতার স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায়। উনি এখানে কি করছে? ওনার তো অফিসে থাকার কথা ছিলো! পাতাকে মৌন থাকতে দেখে অরুণ আবারও শুধায়,
“এ্যাঁই পাতাবাহার, লাগেজ কেন হাতে?”
পাতা লাগেজের হাতল শক্ত করে ধরে। প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে, “আপনি হঠাৎ?”
অরুণের কপালে ভাঁজ পড়লো। পাতার কাঁধে হাত রেখে বলল, “কেমন অদ্ভুত ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল ভেতরটা। তাই চলে এলাম। সারাদিন ঘরবন্দি, লোক লজ্জায় বাইরে বের হও না। আসতে আসতে ভাবলাম তোমাকে নিয়ে বেরুবো। শুধু আমি তুমি। দেখি কার সাহস অরুণ সরকারের আদরের বউকে লজ্জা দেয়! কিন্তু তুমি তো আমাকে ফতুর বানিয়ে সোনা দানা নিয়ে পালানোর ফন্দি আটছিলে! আফসোস ধরা পরে গেলে!”
অরুণ হাসে শব্দ করে। পাতা কাঁধ থেকে হাতটা ঝটকায় সরিয়ে বলল, “আমার অসহ্য লাগছে সব। আপনাকে, আপনার ছেলে মেয়েদেরকে! এই মস্ত বাড়িকে। তাই লতাপুর বাড়িতে যাবো। ক’দিনের জন্য বলা মুশকিল। দুই তিন মাস বা তারও বেশি। বেবি হওয়ার আগে তো না-ই!”
“এক বেলা না দেখলে মরণ মরণ লাগে। আর তুমি….পাগল হলে নাকি পাতাবাহার?”
“হ্যাঁ আমি পাগল! আমার মাথায় ঝিঁঝিঁ পোকারা হিজিবিজি করছে। কোথাকার কোন প্রতিবন্ধীকে ধরে এনে ছেলের বউ বানিয়ে ফেলেছে। আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করে নি। করবে কেন? ছেলে কি আমার? পেটে ধরি নি তাই আমার মতামতের কোনো প্রয়োজন নেই।”
অরুণ বলতে না বলতেই পাতা চেঁচিয়ে উঠলো! অরুণ ছিটকিনি তুলে দিয়ে পাতার বাহু ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়। পাতা চেঁচামেচি করলে লাগেজ তুলে আঁছড়ে ফেলে মেঝেতে। গায়ের ব্লেজার খুলে ছুঁড়ে মারে। পরিপাটি চুল গুলো টেনে এলোমেলো করে খানিকটা বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়লো অরুণ।
পাতা লাগেজ তুলে নিয়ে বলল, “প্রহরকে স্কুল থেকে নিয়ে যাচ্ছি!”
“মেজাজ খারাপ করাবে না, পাতা।”
ধমকে পাতার রগে রগে রাগ ছড়িয়ে পড়ে। অরুণের থেকেও বেশি কর্কশ গলায় বলে, “মেজাজ খালি আপনার আছে?”
“সমস্যা কি তোমার?” অরুণ উঠে এসে পাতার হাত থেকে আবারও লাগেজ ছিনিয়ে নেয়। পাতা লাগেজ ছাড়াই পা বাড়ায়। অরুণ আবারও বাহু টেনে ধরে নরম হয়ে বলে, “আমরা বসে কথা বলি?”
“আপনার মতো জঘন্য লোকের সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। ছাড়ুন আমাকে!”
কথাটা কোথাও বিঁধলো। ইগোতে নাকি হৃদযোগে! অরুণ শীতল দৃষ্টি ফেলে প্রশ্ন করলো, “আমি জঘন্য লোক?”
পাতা চোখে চোখ রেখেই জবাব দিলো, “হ্যাঁ আপনি জঘন্য নিচু মনের লোক। কলিজা কলিজা বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলেন। আর সেই কলিজার সাথে কি করলেন? প্রতিবন্ধী মেয়েকে পরানের কলিজার ঘারে ঝুলিয়ে দিলেন। সে আবার এক্স ওয়াইফের আত্মীয়। কেন রে এক্সের জন্য নতুন করে ভালোবাসার কুঁড়ি গুজিয়েছে বুকের ভেতর? তাঁকে দেখার এতোই শখ নেমন্তন্ন করে নিয়ে আসতেন। আমি হাসি মুখে আপ্যায়ন করতাম! ছেলেকে বলির পাঠা বানানোর কি প্রয়োজন পড়লো শুনি?”
অরুণ সরকারের দৃষ্টি এখনো নরম। পাতার গালের পানি বৃদ্ধাঙ্গুলের ডগায় মুছে দিয়ে বলল, “রাগে উল্টোপাল্টা বকছো। মাথা ঠান্ডা করো পাতাবাহার। আমি সব বুঝিয়ে বলছি।”
“আমি কিছুই বুঝতে চাই না। আমি শুধু মুক্তি চাই এই অশান্তি থেকে। এখানে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো।”
বাহু আলগা হয়ে আসে। পাতা বাকিটা নিজেই ছাড়িয়ে নেয়। অরুণের হাত থেকে লাগেজ ছিনিয়ে নিলো। অরুণ বাঁধা দিলো না। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল, “আমি মরে গেলেও তো তোমাকে মুক্তি পেতে দিবো না পাতাবাহার।”
“তাহলে নিজেই মরবো!”
অরুণ কতক্ষণ বিভ্রান্ত চোখে পাতার মুখের দিকে তাকালো। মেয়েটাকে বিধ্বস্ত লাগছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এতোই যখন অশান্তি লাগছে দুটো দিন বোনের কাছেই থেকো এসো, মাথা ঠান্ডা হবে। তবে মনে রেখো শুধু দুটো দিন। আমি রেখে আসছি, আমিই নিয়ে আসবো।”
বলেই অরুণ সরকার ব্লেজার গায়ে জড়িয়ে নেয়। পাতা টু শব্দ করে না। আগে তো যাক, পরের টা পরে দেখা যাবে। অরুণ হাত ধরে নিয়ে যায় পাতাকে। সযত্নে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। গাড়ি স্টার্ট করতেই পাতা বলল,
“প্রহরের স্কুলে চলুন।”
অরুণ সম্মুখে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল, “ওলাফ কেন আবার? বলছিলে তো আমাকে আর আমার ছেলে মেয়েদের অসহ্য লাগছে। একাই দুটোদিন কাটিয়ে আসো।”
“তাহলে এটাকেও বের করে নিন?”
বাড়ন্ত পেটে হাত রেখে পাতার ত্যাড়া জবাব। অরুণ সরকার একপল চেয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। গাড়ি থামলো প্রহরের স্কুলের সামনে। অরুণ গাড়ি থেকে নামার আগে নীরবতা ভেঙে বলল, “তুমি তো জানো তোমাদের ছাড়া রাতে ঘুম হয় না আমার। প্রহরকে না নিলে হয় না?”
“না”
অরুণ নেমে যায় প্রহরকে আনতে। নার্সারি ক্লাসের ছোট ছোট বাচ্চারা শ্রেনী শিক্ষকের সাথে সমস্বরে কবিতা আবৃত্তি করছে। হাত নেড়েচেড়ে ভঙ্গিমা করছে। অরুণ দরজায় দাঁড়াতেই সবাই থেমে গেল। অরুণের মননে স্মৃতিরা কথা বলে। এমনই এক পরিবেশে এক নতুন জীবনের সূচনা লেখা হয়েছিলো।
“স্যার, কিছু বলবেন?”
অরুণ ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যরি ফর ডিস্টার্বিং। একচুয়ালি প্রহরকে নিতে এসেছি। একটু প্রবলেমের জন্য ও আজ স্কুল কন্টিনিউ করতে পারবে না। আমি প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে নিয়েছি।”
টিচার প্রহরকে ব্যাগ গুছিয়ে যেতে বলল। প্রহর খুশি মনে ব্যাগ গুছিয়ে পিঙ্কি ও টিচারকে বিদায়ী সংবর্ধনা জানিয়ে বেরিয়ে আসে। যেন চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। অরুণ মুচকি হেসে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। পথিমধ্যে প্রহরের হাজার প্রশ্ন। অরুণ ছেলের গালে চুমু দিয়ে বলল, “তোমার মাম্মাম রেগে আছে। গাড়িতে পটরপটর করবে না। পিঠে মার পড়বে। পাপা কিন্তু বাঁচাতে পারবে না!”
“মাম্মাম রেগে আছে কেন?”
“জানি না!”
“কেন জানো না?”
অরুণ ছেলের দিকে তাকায়। প্রহর গাল ফুলিয়ে নেয়। গাড়ি এসে থামলো চারতলা এক ভবনের সামনে। গেটে দারোয়ান নেই। তাই রাস্তার ধারেই গাড়ি পার্ক করে অরুণ। প্রহর জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বলল, “আমরা খালামুনির বাড়িতে কেন এসেছি মাম্মাম?”
“এতো কথা কেন বলো তুমি?” মায়ের ঝারিতে প্রহরের মুখটা চুপসে গেল। সে গাল ফুলিয়ে নেয়। অরুণ ডিকি খুলে লাগেজ বের করে। আবারও মনে করিয়ে দিলো, “শুধু দু’দিন পাতাবাহার!”
গেটের ছোট দরজার বৃত্তাকার নব ঘুরিয়ে ছেলের হাত ধরে ভেতরে যায় পাতা। অরুণ গেইটের বাইরে থেকেই লাগেজ ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। ছেলের কচি চোয়াল ধরে বলল, “নিজের আর মাম্মামের খেয়াল রেখো ছোট সরকার!”
“তুমি আসবে না পাপা?”
“না” অরুণের মুখের কথা কেড়ে নেয় পাতা। বিরক্ত মুখে দরজা লাগিয়ে দেয়। অরুণ কতক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। যেতে ইচ্ছে করছিল না তাঁর। পাতা বললে সেও সঙ্গে থেকে যেতো!
চারতলা ভবনটি রাতুল দুলাভাইয়ের নিজস্ব। উপরের তিনটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছে। নিচে ওঁনারা থাকে। পাতা কলিং বেল চাপে। দরজা খুলে যায়। অবাক কণ্ঠে লম্বা সালাম ভেসে আসে। পাতা মুচকি হেসে সালামের জবাব নিয়ে বলল, “কেমন আছো বউ? তোমার শ্বাশুড়ি বাড়িতে?”
নিশা নামের মেয়েটা লাজুক হেসে মাথা নাড়লো। ঘোমটা আরেকটু টেনে শ্বাশুড়িকে ডাকলো, “আম্মু দেখে যান কে এসেছে?”
লতা এঁটো থালা হাতে বেখেয়ালি ভাবে এগিয়ে আসে। পাতাকে দেখে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে, “আরে আরে গরীবের ঘরে হাতির পাড়া পড়লো যে! তা বড়লোকের বউ কেমন আচ….”
লতার হাত থেকে স্টিলের থালাটা পড়ে গেলো। ঝনঝন শব্দ তুলে মেঝেতে গোল গোল ঘুরে একসময় থেমে গেলো। লতা বিস্ফোরিত চোখে বোনের বাড়ন্ত পেটের দিকে তাকিয়ে। লজ্জায় পাতার কান গরম হয়। গাল ভারী হয়ে আসতে চাইছে। লতা চোখ বড় বড় করে এগিয়ে এসে পেটে হাত রেখে বোঝার চেষ্টা করলো সত্যিই নাকি ভ্রম, নাকি মুটিয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিটা উপলব্ধি করার পর বিস্ফোরিত কণ্ঠে বলল,
“কেমনে কি ভাই? কে করলো এই সর্বনাশ!”
ট্যাক্সিটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রস্থান টার্মিনালের সামনে এসে থামল। ট্যাক্সির দরজা খুলে নেমে এল অরুণাভ সরকার। গায়ে সাধারণ চেক শার্টের সব ক’টি বোতাম খোলা! ভেতরের সফেদ টি শার্ট উঁকি দেয়। স্ট্রেইট ফিট বেইজ টাওজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একবার মাথা তুলে বিমানবন্দরের বিশাল ভবনের দিকে তাকাল সে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। গভীর শ্বাস নিয়ে ধীর পায়ে প্রস্থান টার্মিনালের দিকে এগিয়ে গেল।
“মম, বরুণ ভাইয়া?”
বাদলের বিস্ময়কর কণ্ঠে বর্ষা চকিত ভঙ্গিতে পেছনে ফিরলো। সে ভাবেও নি অরুণাভ তাঁর অনুরোধ রাখবে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আবেগঘন কান্নায় ভেঙে পড়ে।
“আমি ভাবিওনি তুমি আসবে। আমি কি যে খুশি হয়েছি বলে বোঝাতে পারবো না, বরুণ। আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমি আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আছি। এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।”
কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অরুণাভ। বুকের ভেতরটায় প্রবাল ঝড় উঠেছে। সে কোনো কিছু না ভেবে ঠেলে সরিয়ে দেয় তাকে। থমথমে মুখে বলে, “ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি এগেইন।”
বর্ষা রাগলো না। মুচকি হেসে বলল, “কোনো ব্যপার না। তোমার এই ছোঁয়া টুকুই আমি জিইয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিবো। যাইহোক তোমার গা গরম লাগছিলো। চোখ মুখও কেমন শুকনো! শরীর ঠিক আছে তোমার?”
অরুণাভের কপালে বিরক্তের ভাঁজ। সে বৃষ্টির দিকে তাকালো। এগারো কি বারো বছরের একটি শিশু! চোখের নিচে ডার্ক সার্কেলের গাঢ় প্রলেপ। গায়ের সবকটি হাড় গোনা যাবে। জীবনের মানে শেখার আগেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার। অথচ চোখে তাঁর আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তোমার মা তোমার এই অসুস্থতার দায় আমার উপর চাপিয়েছে। তাই ক্ষমা চাইতে এলাম। মাফ করে দিও। ছোটবেলায় দেখতাম সবারই মা আছে। মা
আদরযত্ন করে, খাইয়ে নাইয়ে দেয়। কিন্তু আমার মা আমার কাছে থাকে না। কেন আমাকে ছেড়ে বিদেশে থাকে? তখন বুঝতাম না। আব্বুর কাছে অভিযোগ করতাম, কাঁদতাম। বুঝ হওয়ার পর আর কাঁদি নি। উপর ওয়ালা আমাকে এমন একজনকে দিয়েছেন যে তোমার মাকে অভিশাপ দেওয়ার প্রয়োজন কখনো পড়ে নি। বরং আমি শুকরিয়া আদায় করি তার চলে যাওয়ার। সে চলে না গেলে এত চমৎকার মানুষটার স্নেহ মমতা আমার কপালে জুটতো না।”
বর্ষার মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠলো। বরুণ কি সত্যিই বলছে, নাকি তাঁকে ছোট করার জন্য বাড়িয়ে চড়িয়ে বলছে! বৃষ্টি ওতশত বুঝল না। বোঝার চেষ্টাও করলো না। শুধু বললো, “মম সবসময় তোমার কথা বলে। তোমার ছবি জড়িয়ে নিয়ে কাঁদে। সে তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে। তুমি মমকে ক্ষমা করে দিও।”
“আমি ক্ষমা করার কেউ না! যাইহোক আমি শুধু তোমার জন্য এসেছিলাম বৃষ্টি। বেস্ট ওফ লাক ফর ইয়্যুর সার্জারি। ডোন্ট গিভ আপ হোপ।”
বৃষ্টি মুচকি হেসে সম্মতি দিলো। শোয়াইব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বর্ষার উদ্দেশ্য বলল,
“আমাদের এখন যাওয়া উচিত বর্ষা।”
বাদল, বৃষ্টি বিদায় নিয়ে বাবার সাথে চলে গেলো। বর্ষা শেষবারের মতো অরুণাভের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। কাতর স্বরে বলে,
“হয়তো আর বিডিতে ফেরা হবে না। হয়তো এটাই শেষ দেখা বরুণ। আমি আর কখনোই তোমাকে বিরক্ত করতে আসবো না। জানি আমি তোমার মা হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি। তবুও একটা শেষ আবদার করছি একটিবার মা ডাকবে আমাকে? একটি বার প্লিজ?”
“মরে গেলেও না!”
বর্ষার বুকে বিঁধল কথাটা। আকুতি ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো ক্ষণ। হাত বাড়ায় মাথায় একটু খানি স্নেহ ঢেলে পাপ মোচনের প্রয়াসে। অরুণাভ এক কদম পিছিয়ে শক্ত গলায় বলে, “ডোন্ট ডেয়ার!”
বর্ষার মুখটা বিবর্ণ হয়ে আসে। ব্যাগ থেকে গয়নার বক্স বের করে। বক্স খুলতেই এক জোড়া ঝুমকা দৃশ্যমান হয়। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে চাইলে বর্ষা বলল, “নতুন জীবনের শুভকামনা বরুণ। বউমা বলার অধিকার হয়তো তুমি দিবে না। এটা তোমার স্ত্রীর জন্য! পত্র মেয়েটাকে যতদূর চিনি ভালোই। তবে একটু মিচকে শয়তান টাইপের। ওর আলাভোলা মুখ দেখে গলে যেও না যেন। পস্তাতে হবে।”
“আপনার মতো না হলেই হলো!” অরুণাভ বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে নি। বর্ষা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ঝুমকার বক্স বাড়িয়ে বলে, “সুখী হও দুজন। এটা নাও?”
“আপনি ভাবলেন কি করে আমি এটা নিবো?”
“তার মানে নিবে না?”
“প্রশ্নই আসে না।”
শোয়াইবের ডাক ভেসে আসছে। বর্ষা জোর করার সাহস পেলো না। হতাশ হয়ে চলে গেল। বারবার পিছু ফিরে শেষবারের মতো দেখে নিলো সুন্দর মুখটা।
গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এল অরুণাভ। সন্ধ্যার ব্যস্ত ঢাকা তখনও ছুটে চলেছে আপন গতিতে। ট্যাক্সিতে উঠে গন্তব্য বলতেই গাড়িটি শহরের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
পথিমধ্যে রাতের খাবার আর ফার্মেসি থেকে কিছু ওষুধ কিনে নেয় অরুণাভ। জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে নির্বাক চোখে বাইরের আলো-আঁধারি দেখতে লাগল অরুণাভ। বাড়ির কথা মনে পড়ে। ভাবুক চড়ুই, ওলাফ, আম্মুর কি তাঁর কথা মনে পড়ছে না? কেউ তো একটা বারের জন্যও ফোন দিলো না।
মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কাছাকাছি একটি শান্ত গলির সামনে টেক্সি থামলো। গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলো। চারতলায় পৌঁছে পকেট হাতড়ে চাবি বের করে তালা খুলে। চার কদম আগাতেই ঘরের দরজা। অরুণাভের গা কেমন শির শির করে ওঠে। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয়। সে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। মিউ মিউ ডেকে অ্যানা পায়ের কাছে ছুটে আসে। কিছু নিয়ে অভিযোগ করছে। অরুণাভ কোলে তুলে নেয়। গায়ে আদুরে ছোঁয়া দিয়ে আড়চোখে পত্রলেখার দিকে তাকায়।
স্পোর্টস ব্যাগে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে। নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু জমা ঘাম চিকচিক করছে। গায়ে ওড়না নেই, পাশে খুলে রেখেছে। অরুণাভ ওড়না টা তুলে গায়ে ফেলে। পাশেই খাবার আর ওষুধের ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হতে যায়।
খাবারের সুস্বাদু গন্ধে ক্ষুধার্ত পত্রলেখার ঘুম ছুটে যায়। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। পাশে খাবারের ব্যাগ দেখে ভেতরের ক্ষুধার্ত বাঘ গর্জে উঠলো। নবাব পুত্তুর কখন এলো? সেই যে সাত সকালে বেরিয়ে পড়লো আর খবর নেই। ভয়ে তাঁর জান গলায় আঁটকে ছিলো। বিড়ালটা না থাকলে বন্ধ ঘরে দম আঁটকে মরেই যেতো সে। ভাবতেই বিড়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়। অ্যানা আটখানা হয়ে ডাকে, “মিঁয়াও!”
“অ্যানা!”
বিড়াল শাবক আর পত্রলেখা দু’জনেই অরুণাভের দিকে তাকায়। অরুণাভ এগিয়ে আসে। নিজ স্পোর্টস ব্যাগের চেন খুলে টাওজার আর টি শার্ট নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেলো। পত্রলেখা আবারও স্পোর্টস ব্যাগে মাথা এলিয়ে দেয়।
অরুণাভ মিনিট পাঁচ পরেই ফিরে আসে। পত্রলেখা গুটিসুটি মেরে পেট চেপে শুয়ে আছে। কোনো নড়চড় নেই। অরুণাভ মেঝেতে বাবু হয়ে বসে। খাবারের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলে, “কারো যদি ক্ষুধা লাগে, খেতে পারে। আমি দ্বিতীয়বার সাধবো না। সব অ্যানাকে দিয়ে দিবো!”
পত্রলেখা চোখ মেলে তাকালো। চোখাচোখি হলো দুজনার। চোখে পানি টলমল করতে দেখে অরুণাভের করুণা হলো। খানিকটা নরম হয়ে বলল, “ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নাও!”
পত্রলেখা উঠে বসলো। মুখটা মলিন। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “কোনো সমস্যা?”
পত্রলেখার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো। অক্ষি কোটরে জমা পানি মুছে মাথা নাড়লো। অরুণাভ বাঁকা চোখে চেয়ে বলল, “কি সমস্যা শুনি?”
পত্রলেখা হাত নাড়িয়ে ইশারায় কিছু বোঝায়। পেট চেপে ধরে। অরুণাভ অবুঝ ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। পত্রলেখার কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করে। ছেলেটা এতো বোকা কেন! সে কাঁদো কাঁদো মুখে তাকায়। অরুণাভ বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। পত্রলেখা হাল ছেড়ে উঠে ওয়াশ রুমে চলে গেল। অরুণাভ চোখ উল্টিয়ে একরাশ বিরক্ত প্রকাশ করে বলে, “নিজেই আস্ত সমস্যা, সেই সমস্যার-ই নাকি আরেক সমস্যা…”
অরুণাভের গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। কান দুটো রক্তিম আকার ধারণ করে। চোখে মুখে অস্থিরতা। যা বোঝার বুঝে যায় সে। খাবার পূর্বাবস্থায় রেখে ওয়ালেট নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
পত্রলেখা ফিরে এসে দেখে ঘর ফাঁকা। টাইলসে রক্তের দাগ দেখে চোখের আকার বড় হয়। লজ্জায় ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আসে। তড়িঘড়ি মেঝে মুছে নেয়। ছেলেটা নিশ্চয়ই দেখে নিয়েছে। কোন মুখে সামনে যাবে! ছিঃ! সে দৌড়ে বেলকনিতে চলে যায়। ওই তো গেইট পেরিয়ে ছেলেটা গলির পথ ধরেছে। সে সেখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। একটু পরেই অরুণাভকে ফিরতে দেখা যায়। পত্রলেখার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে রোদ ঝলমল করে।
অরুণাভ স্যানিটারি ন্যাপকিনের সাথে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে আসে। একটা নোটবুক, আরেকটা বলপেন। পত্রলেখা নোটবুকে গোটা গোটা অক্ষরে লিখলো,
“আমি গোসল করবো। আমার কাছে কাপড় নেই।”
লেখা শেষ হলে অরুণাভকে দেখায়। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি কি করতে পারি?”
পত্রলেখার মুখে জ্বল জ্বল করা বাতি নিভে গেলো। সে আবারও কলম তুলে নিলো। লিখল, “বসে বসে মুড়ি খাও! ইতর ছেলে!”
অরুণাভ লেখাটা পড়ে কতক্ষণ অনুভূতি হীন বসে রইল। তাঁর কি করা উচিত? ঠাস করে দু’টো চড় মেরে দেবে? নাকি বেলকনিতে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেবে। বিরক্ত মুখে স্পোর্টস ব্যাগের চেন খুলে বলল, “চলবে? না চললেও করার কিছু নেই। আমার টাকা বেশি হয় নি যে তোমার জন্য জামা কাপড় কিনে আনবো!”
পত্রলেখা থমথমে মুখে স্পোর্টস ব্যাগ হাতায়। অরুণাভের আইফোনটা বেজে ওঠে। মোহনলালের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা স্ক্রিনে ভাসে। সে ফোন হাতে বেলকনিতে চলে যায়।
“বাডি, হোয়ার আর ইয়্যু?”
“আ’ম হোম!”
“কি বলিস? এতো তাড়াতাড়ি রাগ পড়ে গেলো? অবশ্য আমি জানতাম এমনটাই হবে। বাবার দুদু খেয়ে বড় হওয়া ছেলেটা বাবাকে ছাড়া কিভাবে থাকতো! এ যে অসম্ভব!”
“ফোন কাটবো?”
মোহনলাল হেসে বলল, “বাডি, রাগছিস কেন? তোর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। তালা ঝুলছে। ভাবলাম বাড়ি ফিরে গেছিস! সত্যিই গেছিস?”
“কি মনে হয়?”
“ফিফটি ফিফটি!”
“যাই নি, যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
“বেশ সিরিয়াস কন্ডিশন দেখছি। যাইহোক সরোয়ার আঙ্কেল বলছিলো বউকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিস! বউ মানে পত্রলেখা?”
অরুণাভ কপাল ঘঁষে বলে, “ও আমার বউ না!”
“তাহলে কি বোন?”
অরুণাভ কিছু সময় চুপ থেকে বলল, “সি’জ নাথিং টু মি। আব্বুর জন্য সহ্য করছি ওকে!”
মোহনলাল মুচকি হেসে বলল, “আঙ্কেল তোর ভালোর জন্য করেছে সব!”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়ে, “ভালোর কি দেখতে পেলি তুই? আমার জীবনের কুল কিনারা কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না! নিজেকে পুতুল মনে হচ্ছে। আর তুই বলছিস..”
মোহনলাল ফোন বাম কান থেকে ডান কানে হস্তান্তর করে বলে, “ধর আঙ্কেল সেই মুহুর্তে তোদের বিয়ে করালো না। কিন্তু ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো দা গ্রেট উদীয়মান ক্রিকেটার অরুণাভ সরকার একটা মেয়ের সাথে বন্ধুর ফ্ল্যাটে হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ভাই তিলকে তাল বানানোই মিডিয়ার প্রধান কাজ। সেখানে তুই তাদের এতোবড় রিজন দিয়েছিস! আর আঙ্কেল যতই মামলা সামলে নিক এসব খবর চাঁপা থাকে না। বরং আরও ভয়ংকর হয়ে উপস্থাপন করা হয় জনসম্মুখে। ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগেই এতো বড় স্ক্যান্ডাল! প্রভাব পড়তো না বল?”
অরুণাভ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “তোকে এসব কে বলেছে? আব্বু নিশ্চয়ই?”
“তোর মতো মাথামোটা না আমি। কমনসেন্স আছে আমার। আর আমি আঙ্কেলকেই সমর্থন করছি। তুই মাঝে মাঝেই বেকুবের মতো কর্মকাণ্ড করে বসিস! এখন অন্তত ম্যাচুয়র হ।”
“হুঁ!”
“রাগ করলি?”
“না!”
“রাগ করলেও করার কিছু নাই। আমি সত্যিই বলছি। আর আনিকার সাথে কথা বলেছিস? কি বললো?
অরুণাভের ভোঁতা মুখটায় হতাশা ফুটে ওঠে। একে একে সব খুলে বলে। সব শুনে মোহন বলল, “এখন কি করবি?”
“জানি না, আমার মাথা কাজ করছে না। পাগল পাগল লাগছে। চারপাশ কেমন জটিল সমীকরণের মতো। যত সমাধানের চেষ্টা করছি ততই পেঁচিয়ে যাচ্ছি। কি করি বলতো?”
“লাইফ তোর, সিদ্ধান্তও তোকে নিতে হবে। যা করবি ঠান্ডা মাথায়। আবেগের ঠেলায় আবার কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিস না। বুঝতে পেরেছিস আমার কথা?”
“কিছু টা!”
“বুঝলেই ভালো। বিয়ে কোনো ছেলে খেলা না। অরুণ আঙ্কেল বিচক্ষণ মানুষ। তিনি নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
অরুণাভের শুনতে ইচ্ছে করে না। অনাগ্রহ প্রকাশ করে বলে, “ফোন রাখলাম ভালো থাকিস!”
“আরে শোন, লঙ্কান সিরিজ কবে খেলতে যাবি?”
“সামনের মাসের শেষের দিকে ডেইট পড়বে হয়তোবা। পরশু যেতে বলেছে। প্রস্তুতি শুরু হবে হয়তো!”
“পার্সোনাল ইস্যু পার্সোনাল রাখিস। খেলায় যেন প্রভাব না ফেলে। অনেক বড় সুযোগ পেয়েছিস আশা করি সুযোগ হাতছাড়া করবি না। বেস্ট ওফ লাক বাডি! আমি কিন্তু তোর সাফল্য দেখার জন্য ছটফট করছি।”
“আর আমি তোর!”
মোহন হাসলো। সেই হাসিতে প্রাণ নেই। বলল, “আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার বোধহয় এখানেই শেষ। আব্বু সোজাসুজি বলে দিয়েছে আমার ক্রিকেটের জন্য এক টাকাও খরচ করবেন না।”
“আঙ্কেলের সমস্যাটা কি?”
“সমস্যা না রে পাগলা। উনি বাস্তবিক ভাবছেন। ক্রিকেটে ক্যারিয়ার গড়া খুব টাফ। ট্যালেন্টের কদর ক’জন করে বল?”
অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “তুই কি বোঝাতে চাইছিস আমি টাকা দিয়ে সিলেক্ট হয়েছি!”
“আরে না, তুই তো মাল্টি ট্যালেন্টেড।”
“লক্ষ্য ঠিক রেখে খেলায় ফোকাস কর! স্বপ্ন তোর, তাঁকে জিইয়ে রাখার তাগিদও তোর হওয়া উচিত। আঙ্কেল টাকা দিবে না বলেই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেলো? নিজের খরচ নিজে চালাতে পারবি না? এতোটাই অচল তুই?”
“ওসব কথা শুধু শুনতেই ভালো লাগে। করতে গেলে বোঝা যায় কত ধানে কত চাল। কি করবো আমি? ইনকাম করতে গেলে ক্রিকেটে ফোকাস কিভাবে রাখবো?”
অরুণাভ রেলিংয়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসে বলল, “একবার আব্বুর সাথে ভালোই কথা কাটাকাটি হয়েছিল। আব্বু টাকা পয়সা নিয়ে কি যেন বলেছিলো। আমার টাকায় ফুর্তি করবে আর আমাকে জবাবদিহিতা দিবে না। এমন কিছুই হয়তো। তো আমাকে তো চিনিস! রাগ জেদ চাপলে বাপের কেন আমি নিজেরও শুনি না। জেদ ধরে ফ্রিল্যান্সিং কোর্স কমপ্লিট করলাম। প্রথম প্রথম সময় লাগলেও এখন মাসে দশ বারো হাজার অনায়াসেই তুলতে পারি। আমার মতো ছেলের দশ বারো হাজারে মাস কাটলে তোর তো বছর কেটে যাবার কথা!”
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন যেন মোহনের চোখে আবারও জাগ্রত হলো। চমৎকার হেসে বলল, “তুই বড়লোক বাপের বড়লোক ছেলে হলে কি হবে। তুই এক নম্বরের হাড়কিপ্টে আছিস! আচ্ছা আমি ফোন রাখছি। আম্মু খাওয়ার জন্য ডাকছে। লেট হলে চেঁচামেচি করবে!”
অরুণাভ ফোন কেটে কান চুলকায়। ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়টা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিলো। বন্ধুকে একটু মোটিভেট করার চেষ্টা আরকি! সে হামি তুলে রেলিং থেকে নামে। আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যেকোনো সময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হতে পারে।
অ্যানা খাবারের প্যাকেট পাহাড়া দিচ্ছিলো। অরুণাভ তাঁর পাশে বসে আনপ্যাক করে সব। আস্ত চিকেন গ্রিল, সাথে সালাদ। সমস্যা হলো ফ্রক, স্পুন কোনোটাই নেই। হাত দিয়ে ছিঁড়ে খেতে হবে। অরুণাভ লেগ পিস ছিঁড়ে কামড় বসাতেই অ্যানা গর্জে ওঠে।
‘মিঁয়াও মিঁয়াও’
এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে দিতেই অ্যানা চুপ। এরইমধ্যে পত্রলেখার আগমন। ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে আসে। চোখে মুখে লালিমা ছেয়ে আছে। নীল সাদা কালো চেক শার্ট আর ঢিলেঢালা জিন্স! সাইজে একটু বড় হলেও গায়ে ফিট এসেছে। চুল গুলো টাওয়ালে মোড়ানো! দুই হাত সমানতালে কচলাচ্ছে।
অরুণাভ বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “ঢং বাদ দিয়ে খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো!”
পত্রলেখা মুখ বাঁকায়। মুখে একটুও রসকষ নেই! সে চুপচাপ সামনে বসে। অরুণাভ নজর নামিয়ে নেয়। এতেই যেন পত্রলেখা লজ্জায় পড়ে গেলো। শার্টের কলার মুঠোয় ভরে আরেকটু জড়সড় হয়ে বসে। অরুণাভ লেগপিসটা ছিঁড়ে মেয়োনিজের বাটি সহ বাড়িয়ে দেয়। পত্রলেখার চাহনি অস্থির! রুটি বা ভাত জাতীয় কিছুই তো চোখে পড়ছে না। শুধু গ্রিল খাবে? আর এতটুকুতে পেট ভরবে?
“খাচ্ছো না কেন?”
পত্রলেখা ইশারায় কিছু বলে। অরুণাভ বুঝতে পারে না। নোটবুক পেন্সিল এগিয়ে দেয়। পত্রলেখা লিখল,
“রুটি/ ভাত আনো নি?”
অরুণাভ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এতো অসহ্যকর কেন তুমি? যা দিচ্ছি চুপচাপ খেয়ে নাও!”
পত্রলেখা মুখ লটকিয়ে মেয়োনিজের বাটির ঢাকনা খোলার চেষ্টা করে। খুলছে না বিধায় শক্তি খাটায়। ঘটে যায় অঘটন। অল্পখানেক মেয়োনিজ অরুণাভের টি শার্টে ছিটকে লাগে। পত্রলেখা জিভ কাটে। তড়িঘড়ি লেগপিস দিয়েই টি শার্টের মেয়োনিজ মুছে নেয়। রাগে হাত মুষ্টিমেয় করে অরুণাভ। দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “ইচ্ছে করছে মেয়োনিজে চুবিয়ে মারি তোমাকে!”
পত্রলেখা এক হাতে কান ধরে চোখ পিটপিট করে। অরুণাভ চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে। পত্রলেখা ঠোঁটের ডগায় মিটমিট হাসি। অরুণাভ সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজ খাওয়া শেষ করে। হাত ধুয়ে এসে মেঝেতে গা এলিয়ে দেয়। পত্রলেখা তখনও কুটুর মুটুর করে খাচ্ছে। গ্রিল চিকেন মজাই হয়েছে! মেয়োনিজ দিয়ে খেতে আরও বেশি মজা লাগছে। অরুণাভ শুধু একটা লেগপিস খেয়েছিল। বাকি আস্ত চিকেন পেটে চালান করে হাড় গুলো অ্যানার জন্য রাখে পত্রলেখা। ঢকে ঢকে পানি পান করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে সে। অরুণাভ বাঁকা চোখে চাইলে লজ্জা পায়।
“ঢং দেখলে গা জ্বলে যায়!”
বিড়বিড় করে অরুণাভ পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। চোখে ঘুম নামতে না নামতেই বিদ্যুৎ গায়েব। ঘুম হাওয়া হয়ে যায়। বেলকনি সংলগ্ন দরজা বাতাসে খুলে গেছে। বাইরের অন্ধকার জগত ক্ষণে ক্ষণে আলোকিত হচ্ছে। মুহুর্তেই বিকট শব্দে বজ্রপাত হয়। সে কি তাঁর তেজ! অরুণাভ উঠে দরজা বন্ধ করে দেয়। বাজ পরার প্রতিটি বিকট শব্দে রোমকূপ জেগে ওঠে। জানালার পাল্লা আঁটকে পত্রলেখার দিকে তাকায়। ভয়ে কুঁকড়ে আছে মেয়েটা। অরুণাভ অভয় দেয়, “ভয়ের কিছুই নেই!”
ব্যস এইটুকুই! তারপর শুয়ে পড়ে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। চ্যাংটা পোড়া গরমের পর ঠান্ডা আমেজে ঘুমটা গাঢ় হতে শুরু করেছে। বিড়াল শাবকের মতো কেউ নিঃশব্দে পাশে গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ছে। অরুণাভ টের পেলো যেন, তবে আরামের ঘুমটা ভাঙতে চাইলো না। বরং শিরশির করা গা একটু উষ্ণতা পেয়ে গভীর তন্দ্রায় নিমজ্জিত হলো।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির প্রকোপ বেড়ে চলেছে। এলোকেশি বাতাস চারিপাশ লন্ডভন্ড করে দিতে প্রস্তুত। অরুণ কন্যা জড়োসড়ো হয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। পুরো বাংলোয় সে একা। অন্য কোনো সাধারণ মেয়ে হলে হয়তোবা ভয়ে কেঁদেকুটে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো। কিন্তু অরুণ কন্যা যৎসামান্য ঘাবড়ে গেলেও ভয়ে কান্নার মতো ভাব দেখায় নি। ঘড়ির কাঁটার ঢং ঢং শব্দ সুনিশ্চিত করে বারোটা বেজে গেছে। শুকনো ঢোঁক গিলে মূল ফটকের দিকে তাকায় সে। বিড়বিড় করে কাউন্ট ডাউন করে,
“৩, ২, ১… হি’জ অ্যারাইভড!”
সত্যিই কলিং বেল বেজে উঠলো। অরুণ কন্যার মুখে দাম্ভিক হাসি। সে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজায় দাঁড়িয়ে অরুণ সরকার। চোখে মুখে ভয় আর অপরাধবোধ।
“বৃষ্টির পানিতে রাস্তা ব্লক হয়েছে তাই লেট হলো। ভয় পেয়েছো, সোনা মা?”
ঝড়ের প্রতিটি লোমহর্ষক মুহূর্তকে বুড়ো আংগুল দেখালেও বাবার আহ্লাদী সুরে অরুণিতা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার ভান আর ধরে রাখতে পারল না। লুটিয়ে পড়লো বাবার বুকে। ভীতিকর কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে, “আই ওয়াজ সো স্কেয়ারড, পাপা!”
অরুণ এক হাতে মেয়েকে আগলে নেয়। দরজা বন্ধ করে বলে, “পাপা এসে গেছে তো। আর ভয় নেই। আরে…দেখি বাবা কাঁদে না! এই অরু?”
অরুণিতার কান্নার গতি বেড়ে যায়। শব্দ হচ্ছে না, তবে ভারী দেহখানি অস্বাভাবিক হারে কাঁপছে। অরুণ বিচলিত হয়। মেয়ের মুখটা আঁজলায় ভরে কপালে সস্নেহে চুমু দেয়।
“ও মা, তাকাও আমার দিকে! কিসের ভয় হুঁ? এই দেখো পাপা এসে গেছে! কাম ডাউন পাপার চড়ুই সোনা!”
অরুণিতা ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আগে কেন আসো নি পাপা! আমার মনে হচ্ছিলো আমি মরে যাবো। মাম্মাম, ভাইটুস, ওলাফ কেউ ছিলো না। অথচ মনে হচ্ছিলো ওঁরা কথা বলছে। আমাকে ডাকছে আর জোরে জোরে হাসছে। পাপা…”
অরুণ আবারও মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেয়। বোঝানোর সুরে বলে, “সব মনের ভ্রম। চড়ুই সোনা একটু শান্ত হও? মা আমার কাঁদে না। আমার স্ট্রং মেয়েটা কাঁদলে কেমন যেন লাগে। আ’ম সরি জান। আমার সন্ধ্যা নামার আগেই চলে আসা উচিত ছিলো! কেন যে সুজনের ফাঁদে পা দিলাম। পাঁচ মিনিট বলে আঁটকে নিলো।”
নাহ্ অরুণ তাঁর কন্যাকে শান্ত করতে পারে না। মেয়েটা অনেক ভয় পেয়েছ। ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক না। সে এটা ওটা বলে মেয়েকে শান্ত করায়। অরুণিতা শান্ত হয়। তবে তাঁর ভয় কমে নি। অরুণ মেয়ের এলোমেলো চুল গুছিয়ে বলে, “আমি ফ্রেশ হয়ে এসে খাবারের ব্যবস্থা করছি। দুই মিনিট শুধু, একটু বসো?”
“নাহ্!”
অরুণ তপ্ত শ্বাস ফেলে। গায়ের ব্লেজার খুলে রাখলো। অরুণিতা তখনও বাবার বাহু জড়িয়ে। অরুণ হাসে মেয়ের কান্ডে। এ যেন সেই ছোট্ট চড়ুই পাখি!
“ক্ষুধা লেগেছে, চলো কিছু বানিয়ে নিই! কি খাবে আমার চড়ুই পাখি?”
অরুণিতা মিনমিনে সুরে বলল, “ভাত খাবো!”
“ভাতের সাথে?”
“ফিস ফ্রাই!”
“আর কিছু?”
“বেগুনের চপ!”
অরুণ সরকার রান্নাঘরে চলে যায়। ফ্রিজ থেকে বড় মাছ বের করে ভিজিয়ে রাখে। কুকারে ভাত চড়িয়ে বেগুন ধুয়ে নেয়। অরুণিতা তখনও বাবার বাহু জড়িয়ে ভীতু মুখে আশেপাশে তাকাচ্ছে। অরুণ মেয়ের হাতে ছুরি ধরিয়ে বলে, “হেল্প করবে না?”
অরুণিতা না বোধক মাথা নাড়লো। অরুণ মেয়ের কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দিয়ে বলল, “এখনও ভয় করছে আমার মায়ের?”
অরুণিতা উপরনিচ মাথা নাড়লো। অরুণ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “ওসব ভেবো না তো! আচ্ছা বলো স্কুল কেমন কাটলো তোমার? ডিবেটিং ক্লাবে নিয়মিত প্র্যাকটিস করছো তো?”
“হুঁ”
“টিউশন ব্যাচে ওত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পড়া বুঝতে অসুবিধা হয় না? আমি ভাবছি হোম টিউটর রেখে দিবো। আরেকজন হুজুর আসবে! আরবি পড়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি!”
“হুঁ!”
“হুঁ ছাড়া কথা নেই আমার মায়ের?”
“উহ্ হুঁ!”
অরুণ মেয়ের দিকে তাকায়। অরুণিতা লজ্জা পায় একটু। বাহুতে মুখ লুকিয়ে বলে, “আমি তোমার সাথে রাগ করেছি!”
“আচ্ছা?”
“হ্যাঁ!”
“অধমের অপরাধ?”
“ইয়্যু ওলসো হার্ট মি, পাপা!”
অরুণ সরকার হাসলো। কিছু বললো না। কড়াইয়ে তেল গরম হলে বেগুন বেসনে ভিজিয়ে তেলে ছাড়ে। অরুণিতার উদ্দেশ্যে বলে, “দূরে দাঁড়াও তেল ছিটকে লাগতে পারে। এক কাজ করো মাছ গুলো ধুয়ে আনো। আমার হেল্প হবে।”
অরুণিতা এক চুল পরিমান নড়লো না। ঠায় বাবার পাশে দাড়িয়ে রইলো। অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বেগুনের চপ ভেজে মাছ ধুয়ে আনলো। ফাঁকে ফাঁকে মেয়ের সাথে নানান কথা বলল। অরুণিতার জবাব ‘হুম হুঁ’ তেই আঁটকে ছিলো। কিন্তু অরুণ সরকার যখন বলল,
“আজ অফিসে সোহরাব এসেছিল…”
অরুণিতা ক্ষণিকের জন্য সব ভুলে গেলো। কৌতুহলী হয়ে শুধাল, “সোহরাব?”
অরুণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “তোমার সোহরাব আঙ্কেল! ওই যে স্কুলে পরিচয় করালাম! ভুলে গেছো?”
অরুণিতা চোখ পিটপিট করে অবুঝ ভঙ্গিতে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। অরুণ সরকার মেয়েকে মনে করানোর উদ্দেশ্যে সোহরাবের খুঁটিনাটি উপস্থাপন করে। অরুণিতা অধৈর্য হয়ে বলে,
“চিনেছি, এখন বলো তোমার অফিসে কেন এসেছিল?”
“এমনি, অফিস ঘুরে ফিরে দেখলো!”
“রবারি করার পরিকল্পনা নেই তো আবার?”
অরুণ সরকার হেসে ওঠে মেয়ের কথায়! থালায় গরম ভাত, মাছ আর বেগুনের চপ তুলে নেয়। লোকমা বানিয়ে মেয়ের মুখে খাবার দিয়ে বলে, “সোহরাব যাওয়ার সময় কি বলল জানো?”
অরুণিতা আগ্রহ ভরা চোখে খাবার চিবোয়। অরুণ মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বলে, “বলে ভাই, সবাই মেয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য গয়না গড়িয়ে রাখে। আপনি দেখছি গয়নার ফ্যাক্টরি খুলে বসেছেন। মানতে হবে আপনার মেয়ে জামাইয়ের কপাল সোনায় মোড়ানো!”
অরুণিতা হঠাৎই বিষম খায়। ব্যস্ত হয়ে পড়ে অরুণ সরকার। মাথায় চাপড় মারে। পানির গ্লাস মুখে ধরে। অরুণিতা পানির গ্লাসে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে পানি খায়! চোখে অস্থির ভাব তরঙ্গ।”
সারারাত বিরামহীন বৃষ্টি নামিয়েও মেঘমল্লার একফোঁটা ক্লান্ত হয় নি। এখনও তেজস্বী রূপে মেদিনীপুর ভিজিয়ে চলেছে। গুড়গুড় মেঘের গর্জনও শোনা যায়। একে ঠান্ডা পরিবেশ তার উপর শীতল মেঝে। শীতে উষ্ণতার দিকে আরেকটু এগিয়ে যায় অরুণাভ। হাত বাড়িয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় উষ্ণ বস্তুটিকে।
পত্রলেখা আচানক চোখ মেলে তাকায়। নিজ অবস্থান ঠাহর করতে পেরে শুকনো ঢোঁক গিলে। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ভয় আর লজ্জার সংমিশ্রণে সারা শরীর শিরশির করে ওঠে। পেট জড়িয়ে রাখা হাতটা সরিয়ে দিতে চায় সে। হাতের মালিক বাঁধন জোড়ালো করে, এক পা তুলে দিয়ে আরামে ঘুমের প্রস্তুতি নেয়। গরম নিঃশ্বাস পিঠময় জ্বালিয়ে দিচ্ছে। পত্রলেখার দম আঁটকে আসে। হাঁসফাঁস শুরু করে দেয়। এতেই যেন অরুণাভের ঘুম হালকা হলো। তা বুঝতে পেরে পত্রলেখা ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।
ঘুমের ঘোর এখনও পুরোপুরি কাটে নি অরুণাভের। চোখ মেলতে রাজ্যের বিরক্তি। মিষ্টি মিষ্টি একটা ঘ্রাণ নাকে বাজছে। কিসের ঘ্রাণ এটা? পিটপিট করে চোখ খুলে অরুণাভ। কতক্ষণ ঘোরের মাঝেই শুয়ে থাকলো। মস্তিষ্ক কার্যকর হতেই আস্তেধীরে সব পরিষ্কার হয়। হাতটা সরিয়ে নেয় আলগোছে। পা টাও নামিয়ে নেয়। দূরত্ব মেপে পিঠ ফিরে শুয়ে পড়ে। কান দুটোয় পলাশের ছোঁয়া লেগেছে!
ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৪
পত্রলেখা আঁটকে রাখা শ্বাস ফেলে। ভাগ্যিস নবাব পুত্তুর কোনো অস্বস্তিজনক ঘটনা তৈরি করে নি। করলে সবচেয়ে বেশি সেই লজ্জা পড়তো। রাতে ভয়ে সে-ই তো কাছে ভিড়েছিল। যদিও দূরত্ব মেপেই শুয়েছিল সে। ছেলেটা কখন এতো কাছে এসেছে টের পায় নি!
