Home ভাব তরঙ্গ ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৬

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৬

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৬
বেলা শেখ

মেঘ বৃষ্টির লীলাখেলা এখনও চলমান। দক্ষিণা অম্বর জুরে মেঘেদের আধিপত্য। মালবাহী মিনি ট্রাক থামতেই সরোয়ার সাহেব লাফ দিয়ে ট্রাক থেকে নামেন। সঙ্গে আসা কমবয়সী ছোকরাদের তাড়া দেখিয়ে বলেন, “চার তলা বাম দিকের ফ্ল্যাট। জলদি হাত চালা বৃষ্টি এলো বলে।”
ছোকরা গুলো ট্রাক থেকে গৃহস্থালি সরঞ্জাম নামায়। অরুণাভ সরকার হাতে হাতে সাহায্য করছিল। হঠাৎ খেয়াল করে ছেলে গুলো উপরে তাকিয়ে একে অপরকে ইশারা করে মিটিমিটি হাসছে। অরুণাভ কপাল কুঁচকে উপরে তাকায়। তেমন কিছু নজর কাড়ে না বিধায় দৃষ্টি ফিরিয়েই নিবে হঠাৎ চোখ আটকায় চারতলার বাম পাশের পায়রার খোপের মতো বেলকনিতে। পত্রলেখা রেলিং ধরে এক ধ‌্যানে এদিকেই তাকিয়ে আছে। সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। তবে ছেলেগুলোর গা জ্বালানো হাসি আর ফুসুর ফাসুর একধরনের অস্বস্তিতে ফেলল তাঁকে। রাগও হলো, ছেলে গুলোর উপর না; চিঠিপত্রের উপর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার মানে হয়? অরুণাভ হাত ঝাড়া দিয়ে সরোয়ার সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল, “আঙ্কেল, আমি বরং ঘরে গিয়ে দেখি কোথায় কোন জিনিসটা রাখা যায়। আপনি কি এদিকটা…”

“আমি আছি এখানে চিন্তা নেই, বাচ্চা।”
অরুণাভ কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হেসে সিঁড়ি বেয়ে চার তলায় উঠলো। কলিং বেল চাপ দিয়ে ধরে রাখলো। দরজা খুলতে খুব বেশি দেরি হয় নি। কিন্তু মানবের মেজাজটাই গরম ছিল! বাড়ি মাথায় তুলে চেঁচিয়ে বলল, “কানে শুনো না? কখন থেকে কলিং বেল বাজাচ্ছি! কোথায় মরতে গিয়েছিলে শুনি?”
অরুণাভ থামল। নিজ কথাগুলো মনে মনে আবার আওড়ালো। এমন থার্ড ক্লাস মার্কা আচরণ সে কবে থেকে রপ্ত করলো? সেম ওন ইয়্যু অরুণাভ—নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করে পত্রলেখার দিকে তাকালো। আলাভোলা মুখটা দেখেই গায়ে ফোস্কা পড়ল। এই মেয়ে থার্ড ক্লাস মার্কা আচরণই ডিজার্ভ করে। সে নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “রাস্তা ছাড়ার জন্য নোটিশ পাঠাতে হবে?”
পত্রলেখা দরজা ছেড়ে ভেতরে চলে গেল। অরুণাভ দরজা আটকায় না। ভেজিয়ে দিয়ে ঘরে আসে। বেলকনিতে ঢু মেরে নিচে দন্ডায়মান ছেলেদের দেখে আসে। কেন? জানা নেই অরুণাভের। ঘরে এসে পত্রলেখাকে আড়চোখে পর্যবেক্ষন করল। গোমড়া মুখকে উপেক্ষা করে বলল, “তোমার জামা কাপড় শুকায় নি?”

পত্রলেখা মুখ ফিরিয়ে রাখল। অরুণাভ খানিকটা ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “চিঠিপত্র, কিছু বলছি আমি!”
পত্রলেখা নোটবুকটা তুলে নিলো। কিছু লিখে পাতা ছিঁড়ে ছুঁড়ে মারে মুখ বরাবর।‌ অরুণাভ চোখ উল্টে বিরক্ত প্রকাশ করে। মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজটা পা দিয়ে সোজা করে। ইংরেজি অক্ষরে লেখা,
“Talk to me politely. I’m a girl.”
অরুণাভ হেসে দিল। পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে বলল, “ইয়্যু আর নট আ গার্ল। ইয়্যু আর আ ডাইনী! ওই যে লম্বা বেনুনী, উল্টো পা, বড়বড় চোখ, কালো নখ, রাক্ষসের মতো দাঁত, মানুষের ঘুম হারাম করে, সুন্দর ছেলেদের বশ করার চেষ্টা করে। তুমিও তাই। ডাইনী কোথাকার!”
শুরুতে মিষ্টি মিষ্টি করে বললেও শেষে চোখ গরম করে চেঁচাল। পত্রলেখা বেলুনের মতো ফুঁসে ওঠে। কাগজে রাগ প্রকাশ করে অরুণাভের বুকে ঠাস করে লাগিয়ে দেয়। অরুণাভ বিরক্তের সাথে হাত সরিয়ে দেয়। বুকে লেগে থাকা কাগজটা উড়ে পড়ে মেঝেতে। ধমকে বলে, “এ্যাই মেয়ে খবরদার গায়ে হাত দিবে না। প্যাকেট বানিয়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে আসবো। কাক পক্ষীও টের পাবে না!”
পত্রলেখা মনে পরে দু’দিন আগে একই হুমকি নবাব পুত্তুরের বাবাও দিয়েছিল। বাবা ছেলে দুটোই ইতর! পত্রলেখা দুইহাতে দক্ষতার সাথে ইশারায় কিছু বোঝায়। অরুণাভ বোঝে না সে ভাষা। বিরক্ত হয়ে বলল, “ডোন্ট মেইক দিস ননসেন্স এগেইন!”

পত্রলেখার মন খারাপ হয়ে যায়। এভাবে বলার কি আছে! সে তো সবার মতো মুখে বলতে পারে না। ইশারা ভাষা তাঁর ভাব বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম। ছেলেটা ‘ননসেন্স’ বলে তার ভাষাকে ছোট করল! সে চুপচাপ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে অ্যানা হাত ছড়িয়ে শুয়ে ছিলো। পত্রলেখাকে দেখেই ঝাঁঝালো স্বরে মিউমিউ ডাকল। পত্রলেখা চোখ গরম করতেই বিড়াল শাবক গুটিয়ে গেল।
অরুণাভের নিজের গালে নিজেই থাপ্পড় মারার প্রবল ইচ্ছে জাগে। মেয়েটা মাত্রাতিরিক্ত অসহ্য! ধুপধাপ পা ফেলে দরজা অবদি গিয়েও ফিরে আসে। মেঝেতে পড়ে থাকা অ-পড়া চিরকুট তুলে নেয়। কপালে দৃঢ় ভাঁজ ফেলে পড়ে,

“ইতর ছেলে, তুমি একটা রক্ত চোষা ড্রাকুলা। ওই যে দুটো শিং থাকে, লাল লাল চোখ, বাঁদরের মতো লেজ, রোগা পটকা বাদুড়ের মতো বডি, কথায় কথায় চেঁচায়!”
অরুণাভের মাথায় দুটি শিং গজায়, কটমট করা ধবল দাঁত বড় হয়, চোখ দুটো লাল হয়ে আসে, পশ্চাতে একটা লেজও গজিয়েছে! পত্রলেখা বেলকনির দরজায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করতেই হেসে ওঠে। তাঁর হাসির সুর আর পাঁচটা স্বাভাবিক মেয়ের মতো সুরেলা না। একটু অদ্ভুত গোঁ গোঁ ধ্বনি। অরুণাভ কাগজটা মুঠোয় ভরে আকস্মিক তেড়ে আসে। চোয়াল ধরে পত্রলেখার মুখে কাগজ পুড়ে দিয়ে বলল, “এই কাগজের মতো তোমাকেও মুচড়ে এভাবেই খেয়ে ফেলবো চিঠিপত্র! অসহ্য একটা মেয়ে তুমি!”
পত্রলেখা চোয়াল থেকে অরুণাভের হাত সরিয়ে মুখের কাগজ বের করে। কাগজটা খুলে কুঁচি কুঁচি করে শূন্যে উড়িয়ে দিয়ে অরুণাভের দিকে ইশারা করে। অরুণাভ বুঝল তাঁকেও এভাবে কুঁচি কুঁচি উড়িয়ে দিবে! সে মিছে ভয়ের ভাণ করে বলল,

“ওরে বাবা! আমি তো ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি! মহামান্য ডাইনী দোহাই লাগে এমনটা করবেন না। সবে একুশ চলছে, এখনও বিয়ে শাদি বাকি, আব্বুকে দাদু ডাক শোনাতে হবে! প্লিজ অধমের উপর রহম করুন!”
পত্রলেখা চোখ উল্টে তাকিয়ে থাকে। অরুণাভ বেলকনি থেকে আধভেজা ওড়নাটা এনে পত্রলেখার মুখ বরাবর ছুঁড়ে মেরে বলে, “মেয়ে মানুষ, একটু তো লজ্জা শরম রাখা উচিত। কিছু ছেলে পেলে আসবে ঘরের জিনিসপত্র রাখতে। তাদের সামনে না পড়লেই খুশি হবো!”
পত্রলেখা মুখ বাঁকায়। ছেলেটা এতো ইতর কেন? এই কথাগুলোই যদি একটু ভালো ভাবে বলত কি এমন মহাপাপ হতো? যখনই কথা বলবে হয় চেঁচাবে নাহয় দাঁত কটমট করবে!
ছেলেদুটো প্রথমে খাটের সরঞ্জাম এনে বেলকনি সংলগ্ন জানালার কাছে খাট তোষক বালিশ ফেলে বিছানা তৈরি করে। অ্যানা লাফিয়ে কিং সাইজ বিছানায় হাত ছড়িয়ে শুয়ে শুভ উদ্বোধন করলো। পত্রলেখা বেলকনির দরজায় দাঁড়িয়ে। ওড়ণায় মুখটা প্রায় ঢেকে রেখেছে! হঠাৎ একটা ছেলে পত্রলেখার উদ্দেশ্যে বলে, “আপা এক গ্লাস পানি খাওয়াবেন?”

পত্রলেখা চোখ পিটপিট করে তাকাল। পানি খাওয়ানোই যায়। কিন্তু পানি টা কার ভেতর পরিবেশন করবে? গ্লাস যে নেই! কিন্তু পানির বোতল আছে কয়েকটা! পত্রলেখা দেরি করলো না। সিঙ্ক থেকে পানির বোতল পুরো করে এনে দিল। ছেলেটা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হেসে পুরো বোতল খালি করল! বোতল দেওয়ার সময় কৌশলে পত্রলেখার হাত ছুঁয়ে দিল। পত্রলেখার গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। পাশের ছেলেটা কেমন কুরুচিপূর্ণ সুরে বলল, “আপা আমাকেও যদি একটু খাওয়াতেন, পানি?”
পত্রলেখা বোতল হাতে কোনোরকম মাথা নাড়ল। পানির জন্য যাবে দরজায় অরুণাভকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। বিড়াল চোখ যে নীরবে শাসাচ্ছে। সে কাছে গিয়ে কি কি যেন ইশারা করল। অরুণাভ ভ্রুক্ষেপ না করে নীরবে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। পত্রলেখা বোতল হাতে বেরিয়ে রান্নাঘরে আসতে না আসতেই অরুণাভ ছো মেরে বোতলটা ছিনিয়ে নেয়। কল ছেড়ে পানি ভরে। পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বলে, “কচি খুকি তুমি? বোঝ না ছেলে দুটোর নেচার খারাপ? এতোটাই আলাভোলা তুমি? নাকি অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য নাটক কর?”

পত্রলেখা শান্ত চাহনি নিক্ষেপ করে। অরুণাভ ফিরেও দেখল না। বোতল পুরো করে ঘরে চলে গেল। পত্রলেখা বাকিটা সময় রান্নাঘরের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। হরিণ টানা চোখ দুটোয় ভেজা ভেজা ভাব। হালটা গোলাপী বর্ণের ঠোঁট দুটো কাঁপছে মৃদুমন্দ!
ছোট্ট রুমে কিং সাইজের খাট, খাটের পাশে ছোট্ট টেবিল, দুই ড্রয়ারের ওয়ারড্রপ ব্যস তাতেই যেন ঘর ভরে গেছে। ছেলে দুটোকে তিনশ টাকা দিয়ে বিদায় করে সরোয়ার সাহেব। বিছানায় বসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, “টোনাটুনির সংসার দেখতে কার না ভালোলাগে! আমি কিন্তু মাঝে মাঝে এসে বিরক্ত করে যাব। তোমরা বিরক্ত হলেও আসব।”

অরুণাভ কোনোরকম মাথা দোলায়। ভদ্রলোক হেসে বলল, “তোমাদের দেখলে আমার নিজের যৌবন কালের কথা মনে পড়ে। আমিও তোমাদের আন্টিকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম। খুব কম বয়সে। আমার আব্বা তো দুটো থাপ্পর মেরে বের করে দিলেন। ওঁর পরিবারও মানলো না। হাতে একটা কড়িও ছিলো না। বন্ধুদের সহায়তায় একটা বাড়িতে ভাড়া উঠি। শপিংমলে সেলস ম্যানের কাজ করে কোনোরকম সংসার চালাতাম। আমার বড় মেয়ে কোলে আসলে ধীরে ধীরে সবাই মেনে নেয়। বুঝলে আমার কথা?”
অরুণাভ অনুভূতিহীন দাঁড়িয়ে। ভদ্রলোক গলা খাঁকারি দিল। অরুণাভের পিঠ পেছনে লুকিয়ে থাকা লাজুক পাখিটির দিকে তাকিয়ে বলল, “মা? এক গ্লাস পানি খাওয়াবে?”
অরুণাভ ঘার ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। পত্রলেখা ইতস্তত ভঙ্গিতে ঘর ছাড়ে। সরোয়ার সাহেব এবার খানিকটা খাদ কণ্ঠে বললেন, “বাচ্চা, আমি বলি কি বাচ্চা কাচ্চা জলদি নিয়ে নিও। নাতি নাতনি হলে দেখবে অরুণ ভাইয়ের মন গলে যাবে।”
অরুণাভের বাবড়ি চুলে হাত বুলিয়ে ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে, “আপনি নিজেই আমাকে বাচ্চা ডাকছেন। সেই বাচ্চাকে আবার বাচ্চা প্ল্যানিংয়ের কথা বলছেন। আঙ্কেল আমার খুব লজ্জা লাগছে। প্লিজ এরকম কথা বলবেন না।”

“সে তোমার মুখচোপা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। লাল টমেটো হয়ে গেছ!” বলেই সরোয়ার সাহেব ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন। অরুণাভ দাঁত কটমট করে তাকিয়ে। কেনাকাটায় সাহায্য করেছে বলে অনেকটা বাধ্য হয়েই সহ্য করছে ভদ্রলোককে!
পত্রলেখা পানির বোতল এনে অরুণাভের কাছে দিয়ে আবারও পূর্বের স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটার মুখাবয়বে লালিমা ছেয়ে আছে। নিশ্চয়ই শুনে নিয়েছে মেয়েটা। অরুণাভ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বোতলটা বসরোয়ার সাহেবের দিকে বাড়িয়ে বলল,
“কি বলে যে ধন্যবাদ দিবো! দাম সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিল না আমার। যা বলেছিল তাই দিতাম। আপনার জন্য এতো গুলো টাকা সেভ হলো।”
সরোয়ার সাহেব মুচকি হেসে বলল, “ধন্যবাদ দিতে হবে না। টোনাটুনির সংসার শুরু হোক। একদিন দাওয়াত দিও এসে পেটপুরে ভালোমন্দ খেয়ে যাবো। কি দিবে না দাওয়াত?”
অরুণাভ জোরপূর্বক হাসি ঝুলিয়ে বলল, “অবশ্যই আঙ্কেল! পানি চাইছিলেন?”
সরোয়ার সাহেব বোতলের দিকে তাকালেন। চোখ পিটপিট করে বললেন, “বোতলে পানি কেন দিচ্ছ? গ্লাসে দাও!”

অরুণাভ লজ্জিত হেসে বলল, “গ্লাস নেই একচুয়ালি কিছুই নেই ঘরে। কিনতে হবে!”
সরোয়ার সাহেব অরুণাভের দিকে কতক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চল ওগুলোও কিনে নিয়ে আসি। টাকা আছে কিছু? না থাকলেও সমস্যা নেই। আমি কিনে দিচ্ছি পরে তুমি পরিশোধ করে দিও!”
অরুণাভ এ যাত্রায় বিরক্ত বোধ করে। তবে প্রকাশ না করে বিনয়ের সাথে বলল, “অনেক কৃতজ্ঞ থাকব আঙ্কেল! বাট আমার কাছে পর্যাপ্ত টাকা আছে। আর আমি পরে সময় বুঝে কিনে নিব। আপনাকে এমনিতেই কত কষ্ট দিলাম…”
“আমার আবার কিসের কষ্ট? বরং আমি এনজয় করছি। তুমি চল তো আমার সাথে? আরে আসো লজ্জা কিসের?”

সরোয়ার সাহেব ভেবেই নিলেন অরুণাভের কাছে টাকা পয়সা শর্ট আছে বিধায় ইতস্তত করছে। তাই একপ্রকার জোর করেই টেনে নিয়ে গেলেন। অরুণাভের বিরক্তির শেষ রইলো না। ভদ্রলোক এতো বাড়াবাড়ি কেন করছে? কোনো ভাবে কি আঙ্কেল আব্বুর সাথে কানেক্টেড? ভাবনা উদয় হতেই অরুণাভের মুখটা থমথমে হয়ে আসে।
সিঁড়ি অবদি যাওয়ার পর হঠাৎ কি মনে করে থেমে গেলেন সরোয়ার সাহেব। পিছন ফিরে ফ্ল্যাটের দরজায় দন্ডায়মান পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে খাদ কণ্ঠে বললেন, “সাংসারিক জিনিসপত্র কিনবো! যে সংসারটা করবে তাকে সঙ্গে না নিলে কেমন দেখায়, বল তো বাচ্চা?”
অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “বুঝলাম না আপনার কথা!”
সরোয়ার সাহেব চমৎকার হেসে ফিসফিসিয়ে বললেন, “মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে কেমন হয়, বাচ্চা?”
“খুবই বাজে হবে আঙ্কেল! আর তাছাড়াও ও কোথাও যাবে না। কতটা লাজুক দেখেছেন-ই তো! ভিড়ভাট্টায় ঘাবড়ে যায়। ও থাক আমি আর আপনিই গিয়ে নিয়ে আসি। চলুন?”
এবার অরুণাভ সরোয়ার সাহেবকে তাড়া দেয়। সরোয়ার সাহেব নড়লেন না। অরুণাভকেও বাহু ধরে থামিয়ে দিলেন। পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“একবার বলে তো দেখো যাবে কি-না!”
“বলতে হবে না। আমি জানি ও যাবে না।”
“আরে বাচ্চা, বল তো একবার? এখানেই দাঁড়িয়ে।”
অরুণাভের ইচ্ছে করলো সরোয়ার সাহেবের মাথার অবশিষ্ট গোটাকয়েক চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে! ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঁচু গলায় পত্রলেখাকে জিজ্ঞেস করে, “যাবে আমাদের সাথে?”
মেঘজমা অন্ধকার মুখে হাসি ফুটলো। তৎক্ষণাৎ মাথা কাত করে সম্মতি দিল পত্রলেখা। অরুণাভও কম নাকি। সে সরোয়ার সাহেবের দিকে ফিরে বলল, “দেখলেন যাবে না বলছে! চলুন?”
সরোয়ার সাহেব সুক্ষ্ম চোখে চাইলেন, “যাবে ইশারা করলো!”
“যাবে না ইশারা করেছে!”

“আরে বাচ্চা, মাথা ডানে বামে মাথা ঘুরালে যাবে না বুঝতাম। শুধু ডানে মাথা কাত করেছে মানে যাবে।”
“আমার থেকে বেশি বুঝেন আপনি?” অরুণাভ উত্তেজনায় বলে পস্তায়। সরোয়ার সাহেবের মুখের রং বদলানোর আগেই সাফাই গাইতে শুরু করে,
“আমি আসলে বলতে চাইছিলাম আমার বউ আমি বুঝবো না? পত্রলেখার অ্যাগোরাফোবিয়া আছে। অচেনা মানুষ, জনসমাগয় ভয় পায়। প্যানিক হয়ে পড়ে। তাই ও থাক আমরা যাই!”
সরোয়ার সাহেব আবারও পত্রলেখার দিকে তাকায়। মেয়েটাকে দেখলে কেমন যেন আপন আপন লাগে। স্নেহ জেগে ওঠে। কেমন কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এখনও চেয়ে আছে। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, “মা, যাবে আমাদের সাথে?”
পত্রলেখা অরুণাভের দিকে তাকিয়ে না বোধক মাথা নাড়লো। মুখটায় ম্লান হাসি লেপ্টে। সরোয়ার সাহেব অরুণাভকে নিয়েই বেরিয়ে পড়লো। পত্রলেখা দরজা বন্ধ করতে ঘরে চলে আসে। ঘরটা দেখে বিষন্ন মনটা হুট করেই ভালো হয়ে গেল। এটা কি পত্রলেখার ছোট্ট সংসার নয়? পত্রলেখা দৌড়ে বেলকনিতে চলে গেলো তাঁকে একনজর দেখতে!

মিটিং রুমে বায়ার্সদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের মাঝেই মিটিং রুমের দরজায় এসে দাঁড়াল এক স্কুল পড়ুয়া মেয়ে। পরনে স্কুল ড্রেস, কাঁধ সমান চুল গুলোয় অগোছালো ভাব, কাঁধে ভারী ব্যাগ। দাম্ভিক নাকটা মিটিং রুমের গম্ভীর দাপুটে বসের সাথে মিলে যাচ্ছে। মেয়েটা অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ভরা মিটিং রুমে চলে আসে। এত বড় স্পর্ধা অন্য কেউ করলে নিশ্চিত গর্দান চলে যেত। কিন্তু এ যে দাপুটে বসের চেয়েও দাপুটে কেউ।
অরুণ সরকার বায়ার্সদের সাথে কথা জারি রেখেই মেয়ের কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে নেয়। অগোছালো চুল সযত্নে গুছিয়ে বাহুতে আগলে নেয়। পুরো জাহানে সবচেয়ে নিরাপদ ছায়ায় অরুণিতার ঠাঁয় হয়। তাঁর গম্ভীর মুখে অহংবোধ ফুটে ওঠে নিমিষেই।
মিটিং শেষ হতেই মেয়েকে নিয়ে কেবিনে ফিরে আসে অরুণ সরকার। গায়ের ব্লেজার খুলে রেখে মেয়ের কপালে হাত রাখে। মুখটা চিন্তিত দেখালো।

“জ্বর এসেছে তো! ওষুধ খাওয়া উচিত। কি খাবে আমার মা? এক্ষুনি অর্ডার করছি।”
“খেতে ইচ্ছে করছে না, পাপা।”
পেটুক মেয়ের মুখে এ কথা শুনে অরুণ সরকারের চিন্তা কয়েকগুণ বাড়লো। ফোনটা তুলে নিয়ে বলল, “তোমার ফেবারিট তান্দুরি চিকেন অর্ডার করছি। সাথে চিজ বার্গার, বিফ চাওমিন আর রসমালাই। আর কিছু চাই পাপার চড়ুইয়ের?”
অরুণিতা কিছু সময় চুপ থেকে বলল, “উহু!”
অরুণ সরকার কানে ফোন ঠেকিয়ে আড়চোখে চায় মেয়ের দিকে। নাকটা লাল, ঘনপল্লবে ঢাকা আঁখি যুগ্ম চিকচিক করছে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি কেঁদে দিবে। অরুণ সুজনের সাথে কথা বলে এসির পাওয়ার বাড়ায়। পকেট থেকে রেবন বের করে চুল গুলো বেঁধে দেয়।
“তোমার মাম্মামের কাছে যাবে? তাঁর কথা মনে পড়ছে নিশ্চয়ই? আচ্ছা ঠিক আছে। লাঞ্চ করেই আমরা তোমার মাম্মামের কাছে চলে যাবো।”
অরুণিতার কপালে ভাঁজ পড়ে। থমথমে সুরে বলে, “কেউ আমাকে মনে করে নি আমি কেন তাঁকে মনে করতে যাবো? আমি কোথাও যাবো না।”

অরুণ সরকার আশাহত হলো। মেয়ের উছিলায় পাতাবাহারের কাছে যাবে এমন একটা পরিকল্পনা মনে মনে কষেছিল সে। কিন্তু এখানে মেয়ে যে মায়ের উপর অভিমান করে বসে আছে! সে মেয়ের পাশে বসে বলল,
“তোমার মাম্মামতো তোমাকেও সঙ্গে নিতে চেয়েছিল। আমিই নিষেধ করেছি। আমার কাছে ফাঁকা বাড়ি কবরস্থানের কোন অংশ কম লাগে না।”
“পা…পা!”
“আরে সত্যিই বলছি। আমি একা থাকা খুব ভয় পাই।”
অরুণিতা বাবার বাহু জড়িয়ে খানিকটা আহ্লাদী সুরে বলে, “আই লাভ ইয়্যু মোর দ্যান এভরিথিং ইনসাইড দা ওয়ার্ল্ড, পাপা! তুমি যেমন তোমার কলিজাকে ভালোবাসো আমি তার থেকেও বেশি তোমাকে ভালোবাসি।”
অরুণ সরকার বাঁকা চোখে চাইলে অরুণিতা হেসে বলল, “বিশ্বাস করলে না, না?”
“আমি জানি তো আমার মা আমাকে খুব ভালোবাসে! বাট ওতটাও না। পাঁচটা মাস সে আমার সাথে কথা বলে নি। আ’ল নেভার ফরগট দোস‌ ফাইভ মান্থ!”
অরুণিতার মুখটা ছোট হয়ে যায়। বাবার বাহু ছেড়ে বলে, “আমি মাম্মামের কাছে যাবো, পাপা।”
অরুণ হাসলো, “লাঞ্চ করে তারপর যাবো।”
অরুণিতা বাকি সময় টুকু চুপ রইল। অরুণ হাজার চেষ্টা করেও মেয়ের মুখে বুলি ফোটাতে পারলো না। মাঝে মাঝে তার নিজেরই ফাঁপড় আঁটকে আসে। ভবিষ্যতে কি হবে এই মেয়ের? কে সামলাবে নাক উঁচু বাপের নাক উঁচু মেয়েকে? তাঁর এতো নাখরা সহ্য করার মতো বুকের পাটা নিয়ে বোধহয় কেউ জন্মায় নি। তাই মেয়েকে সে নিজের কাছেই রেখে দিবে বলে পণ করে। একটা হাবাগোবা ছেলে খুঁজে এনে ঘরজামাই রাখবে।

“কচি বউয়ের কাছে শুতে ভাল্লাগে ওনার, আর বাচ্চা এসে গেলে দোষ দেবে বউয়ের! ওটাকে তো জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি তিনবেলা ঠুসে ঠুসে খাওয়ানো উচিত। শালা খচ্চর!”
পাতা ফ্যালফ্যাল করে তাকালো বোনের দিকে। অবাক সুরে বলে, “আপু উনি দোষ দেয় নি…”
“জামাইয়ের দোষ ঢাকা বন্ধ কর পাতু! ওটাকে হারে হারে চেনা আছে আমার। আর তুই কেন সেকেলে মানুষদের মতো কথা বলছিস? ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে বলে বাচ্চা নেওয়া যাবে না কোন হাদিসে লেখা আছে শুনি? জন্ম মৃত্যু আল্লাহর দান। আল্লাহর নিয়ামতকে নিয়ে যাঁরা হাসি ঠাট্টা করে তাদের উপর আল্লাহর লানত পড়বে। তুই তাদের কথায় কান দিয়ে নিজ ভাবী বাচ্চাকে দূরে ঠেলে দিস না। নিজের অতীতের কথা ভুলে গেলি নাকি পাতু?”

এতদিনে কেউ বুঝি পাতাকে নিজ ভুল ধরিয়ে দিতে সক্ষম হলো। পাতার চোখ আবগে ভরে ওঠে। তরতাজা হয় পুরনো ব্যথা। লতা বোনকে বুকে টেনে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝায়, “কোন সমাজের কথা ভাবছিস তুই? সমাজ তোর দুঃসময়ে সঙ্গে ছিলো? অরুণ সরকারের মতো শক্তিশালী ছায়া না থাকলে সেদিন পিষে ফেলতো। ভরা মজলিসে তোর মুখে চুনকালি মাখতো। আর তাছাড়াও প্রেগন্যান্সির ব্যাপারটা আমার মতো মিডল ক্লাস কোনো মেয়ের সাথে ঘটলে সমাজের মানুষ লজ্জায় মেরেই ফেলতো। তুই তো হাই সোসাইটির মানুষ। কেউ তোকে কিচ্ছুটি বলতে আসবে না। যা বলবে আড়ালে আবডালে।”
পাতার মানসপটে মেয়ের অভিমানী মুখটা ভেসে ওঠে। কম্পমান গলায় বলে, “আমি শুধু অরুর কথা ভাবি আপু। মেয়েটা প্রহরকে হিংসে করে এমনিতেই দূরে দূরে থাকে।”
লতা কটাক্ষ করে বলে, “দোষ অরুর না, দোষটা বংশের। সব কয়টা অহংকারী আর হিংসায় ভরপুর! শুধু আমার প্রহর সোনা ভালো!”

“দোষটা তোমার আপু। তোমার প্ররোচনায় পড়েই আমি প্রহরকে এনেছিলাম। লোকটার সামনে এখনও ভান করে থাকি প্রহর ভুলে এসেছে।”
লতা হেসে ওঠে, “কাজের মতো কাজ করেছিলি। নাহলে প্রহরের মতো কিউট বাচ্চাটাকে কোথায় পেতাম আমি? ভাই তোর বেশি হলে তুই পেটের টাকে না হয় আমাকেই দিস!”
পাতা কড়ছা দৃষ্টি ফেলে বলল, “ওঁর বাপ শুনলে আমাকে একটা আছাড়-ই মারবে। এবর্শনের কথা বলেছিলাম বলে পা ধরে বসে পড়েছিল!”
“বলিস কি পাতু!” লতার চোখ কপালে।
পাতা উপরনিচ মাথা নাড়লো। মুচকি হেসে বলল, “এতোটা ধৈর্যশীল অরুণ সরকার আমি আগে কখনোই দেখি নি আপু! দিন যত যাচ্ছে শক্তপোক্ত মানুষটা নরম হয়ে যাচ্ছে।”
লতা হামি তুলে বলল, “তোর জামাইয়ের গুনগান শোনার ইচ্ছে আমার নাই।”

“তবে আমি ওনার উপর রেগে আছি!”
লতার চোখ দুটো চকচক করে ওঠে, “খুব ভালো! বল কেন রেগে আছিস?’
পাতা মন খারাপের মেঘ জমিয়ে বলল, “ভোরকে ওই বোবা মেয়েটার সাথে বিয়ে দিলো আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন অবদি মনে করে নি। ছেলে কি ওঁর একার?”
লতা বোনের উপর চরম মাত্রার হতাশ হয়। ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় গালে। বিরক্ত প্রকাশ করে বলে,‌ “তুই একটা বেকুব! প্রথমবার আমি তোর জামাইকে সমর্থন করছি। দোষ ভোরের। পুরাই বখে গেছে ওই ছেলে! রাস্তা ঘাটে দেখা হলে চেনেই না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। ডাকলেও শোনে না। ক্রিকেট খেলবি ভালো কথা কাদের সাথে খেলছিস খোঁজ নিবি না? বখাটেদের সাথে খেলবে, মারামারি করবে! সেবার আমাদের এখানে এসেছিল খেলতে। কি নিয়ে যেন গন্ডগোল বাঁধলো। খবর পেয়ে আমি আর লাবিব এগিয়ে গেলাম। ও বাবা তোর ছেলে আমাদের গোনাতেই ধরলো না। আর কি সুন্দর তাঁর মুখের ভাষা!”

“তুমি আমাকে আগে বলো নি কেন আপু?”
“রাগ করেই বলি নি।”
পাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ভোরটা একটু খিটখিটে হয়েছে। মেজাজ ধরে রাখতে পারে না। অবশ্য দোষ ওর বাপের। সবসময় ছেলেটার সাথে ক্যাট ক্যাট করে। ছেলেটা যাই করুক তাতেই বোচা নাক ঢুকিয়ে দিবে। হাজারটা কৈফিয়ত চাইবে। জেদে জেদে এমন ঘারত্যাড়া স্বভাব হয়েছে। বাপের কথাও শোনে না। যা বলবে উল্টোটা করে বসবে। শোনার মধ্যে আমি যা বলবো তাই একটু আকটু কানে তুলে।”
“সব চাওয়ার আগেই পায় তো, তাই ঘাড়ের রগ বেঁকে ছিল। এখন ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করিস না।”
পাতা শান্ত চোখে চায়, “তুমি জানো পত্রলেখা কার মেয়ে?”
“কার মেয়ে?”
“বর্ষার বোনের মেয়ে!”
“তো?”
“তো মানে? আমার রাগ হবে না?”

লতা এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলে, “তোর কেন রাগ হবে? তোর এক্সের মেয়ে? অরুণ ভাইয়ের এক্সের বোনের মেয়ে। অরুণ ভাই এক্সের মুখোমুখি হবে। কষ্টে বুক ধড়ফড় করুক আর বিরক্তিতে মুখ তেতো হোক অরুণ ভাইয়ের হবে। তোর তো না। আর অরুণ ভাই যে পরিমাণ অহংকারী আর স্বার্থপর ওই বর্ষার ছায়াটাও ছেলের সংসারে না পড়তে দেবে না, এই গ্যারান্টি দিয়ে বললাম। তাঁর জন্য যা যা করা লাগে করবে! বেচারি মেয়েটাকেই হয়তোবা মা বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।”
“তুমি আমার কথা বুঝতে চাইছ না আপু! আমার ছেলেটা আনিকাকে ভালোবাসে। সেখানে ওই বোবা মেয়েটার সাথে কি করে সংসার করবে?”

লতা বোনের মাথায় চাটা মেরে বলে, “করবে করবে। প্রথম প্রথম রাগ দেখালেও দু’দিন পর লাড্ডু হয়ে যাবে। মেয়েটা কিন্তু ভারী মিষ্টি দেখতে। আর পুরুষ মানুষ সৌন্দর্যের পূজারী বুঝলি? সুন্দর থোবরা দেখলে তাঁরা সব ভুলে যায়।”
কথাগুলো তিতা হলেও মিথ্যে নয়। তাছাড়াও সবচেয়ে ভয়ানক জিনিস হলো‌ মায়া। একবার মায়ায় জড়িয়ে গেলে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
“আমি না একটা জিনিস খেয়াল করলাম। তুই না আগের সে-ই সাধারণ পাতা নেই। কেমন অহংকারী হয়ে গেছিস।
পাতা অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকালো।কিছু বলবে কলিং বেল বেজে উঠলো। লতা কতক্ষণ ছেলে বউকে ডাকলো। সাড়াশব্দ না পেয়ে বিড়বিড় করে নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিলো।
দরজায় দাঁড়িয়ে অরুণিতা। পেছনে অরুণ সরকারকেও আসতে দেখা যাচ্ছে। দুই হাত ভর্তি মিষ্টি, দই, আর ফলফলাদির প্যাকেট। লতা বোনঝিকে ডিঙিয়ে বোন জামাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়।

“কেমন আছ লতা?”
“ভালো আর থাকতে দিলেন কই! বোনটা আলাভোলা বলে যা খুশি তাই করবেন?”
অরুণ সরকার ভারী অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। লতাকে ডিঙিয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। অরুণিতা অবশ্য দরজায় নেই। বাড়ির ভেতরে চলে গেছে। অরুণ স্বাভাবিক সুরে বলল,
“বুঝলাম না তোমার কথা!”
লতা সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ বলল,‌ “লজ্জা থাকা উচিত!”
“কি বলছো?”
“বাংলায় বলেছি বোঝার কথা!”
এনাকন্ডা—অরুণ দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বউয়ের বোনকে ভর্ৎসনা করে। মুখে বলে, “আমি সহজ-সরল মানুষ।‌ প্যাঁচ কম বুঝি! সোজা কথা বললে সুবিধা হতো!”
“ওরে আমার সহজ-সরল মানুষ রে! লজ্জা করে না আজ ছেলে মেয়ে বিয়ে দিলে কাল দাদা হয়ে যাবেন। আর আপনি বাবা হতে উদগ্রীব!”

তীর নিশানা গিয়ে লেগেছে। অরুণ সরকারের যদি লজ্জা থাকতো সে উল্টোপথে হাঁটত। কিন্তু সে লজ্জিত না হয়ে বুক ফুলিয়ে বলল, “বাবা হওয়া গর্বের বিষয়, লজ্জার না। লজ্জা তো তোমার হওয়া উচিত। মেহমান এসেছে কই আপ্যায়ন করবে তা-না দরজা থেকেই তাড়ানোর ফন্দি আঁটছো!”
“জি, এতো বড়লোক মেহমান আমরা এফোর্ড করতে পারব না। আপনি বরং এখান থেকেই রাস্তা মাপুন!”
লতা নেহায়েত মজার ছলে বলেছিল। কিন্তু নাক উঁচু অরুণ সরকার নিজ সিদ্ধান্ত বদলে থমথমে মুখে বলল, “থাকতে আসি নি। মেয়েটার জ্বর, মায়ের কাছে আসবে বলে জেদ করছিল। তাই রাখতে এসেছিলাম !”
লতা দাঁত দেখিয়ে হেসে বলল, “আরে সেন্টি খাচ্ছেন কেন? মজাটাও বুঝেন না দেখছি। ভেতরে আসুন…”
“এগুলো নাও, আমাকে অফিস ফিরে যেতে হবে। আর্জেন্ট মিটিং আছে।”
ডাহা মিথ্যে কথা বলে অরুণ হাতের ফল পাকুর মিষ্টি দই লতার হাতে ধরিয়ে চলে গেলো। লতা কয়েকবার ডাকলো শুনলই না। লতার খারাপ লাগে, আবার মেজাজও গরম হয়। এই খাটাশ তো মজাটাও বোঝে না।

সন্ধ্যা গড়াতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আবারও ধরনীতল ছুঁয়ে দিচ্ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে এ শহর! বিকেলের চিংটেপোড়া গরমের পর এই শীতলতম আবহাওয়াটা স্বস্তিদায়ক। পত্রলেখা রান্নার কাজে ব্যস্ত। তার ক্ষুদে সংসারে আজ প্রথম চুলা জ্বলছে। অজানা আনন্দে বোধে মনটা মেতে উঠেছে তাঁর। আটা মাখতে মাখতে সে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকায়। রান্নাঘর আর ওয়াশ রুম পাশাপাশিই। ছেলেটা সেই যে গেলো আর বেরুচ্ছে না কেন? পানির শব্দও তো আসছে না! ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি? একবার ডাকবে কি? ভাবতে ভাবতে পত্রলেখা এগিয়ে যায়। দরজায় কান পেতে শোনার চেষ্টা করে। গুনগুনিয়ে গান গান গাইছে নবাব পুত্তুর। মুখ বাঁকিয়ে সে মৃদু থাপ্পড় মারলো দরজায়। গুনগুন থেমে গেলো। তবে সাঁড়া পাওয়া গেল না। পত্রলেখা লাগাতার দরজা থাপড়ায়।

“কি হয়েছে?”
সাঁড়া পেয়ে পত্রলেখা মুচকি হাসলো। একটু পরেই খট করে দরজা খুলে উঁকি দিলো নবাব পুত্তুর। শ্যাম্পুর কড়া ঘ্রাণ ভেসে আসে। পত্রলেখা চোখ পিটপিট করে তাকালো। ভেজা গায়ে সাবান ফ্যানা চিকচিক করছে। খালি গা লোভনীয় বিষয়! তবে পুরোটা দেখা যাচ্ছে না। পত্রলেখা একটু ভালোভাবে দেখার প্রয়াসে মাথা কাত করে। সাথে সাথেই ছেলেটা ক্যাট ক্যাট শুরু করে দিল।
“এ্যাঁই মেয়ে চোখ সরাও! সমস্যা কি তোমার?”
পত্রলেখা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ডানে বামে মাথা নাড়ে। অরুণাভের দিকে আঙুল তুলে পরপরই দুই হাত একত্রিত করে কানে ঠেকিয়ে ঘুমের ভঙ্গিমা দেখায়। অরুণাভ ফোঁস ফোঁস করে মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়। পত্রলেখা মিটিমিটি হেসে চুলার কাছে আসে। বেলুনি দিয়ে রুটি বেলে আর একটু পরপর ওয়াশ রুমের দরজার দিকে তাকায়।
অরুণাভ বেরিয়ে আসে একটু পরেই। ঝড়ের গতিতে চলে যায় রুমে। পত্রলেখা গোমড়া মুখে কড়াইয়ে রুটি ফেলে।

“এই মেয়ে?”
অরুণাভের তীক্ষ্ম গলা ভেসে আসে। পত্রলেখা গ্যাস বন্ধ করে ঘরের খোলা দরজায় উঁকি দেয়। অরুণাভ ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, “তোমার মা কথা বলতে চায়। তুমি বলবে কি?”
পত্রলেখার চোখ দুটোয় খুশির ঝিলিক। উপরনিচ মাথা নেড়ে এগিয়ে এসে ফোনটা কেড়ে নিলো। ফোনটা কানে ঠেকিয়ে অদ্ভুত শব্দ বুনলো বোবা প্রাণীটি! কিন্তু কেউ কথা বলছে না কেন! অরুণাভ বিছানায় গা এলিয়ে আলস্য ভঙ্গিতে বলল, “হোয়াটস অ্যাপে গিয়ে ভিডিও কল দিতে বলল। নেট কানেকশন দেওয়াই আছে।”
পত্রলেখা হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে মায়ের নাম্বার তুলে প্রথমে সেভ করে। পরে ভিডিও কল লাগায়। রিসিভ হতে সময় লাগে না। মায়ের সুন্দর মুখটা জ্বল জ্বল করছে স্ক্রিনে।
“পত্র, মা আমার, কেমন আছ তুমি?”
মায়ের স্নেহভরা ডাকে ছলছল করে হরিণ টানা চোখদুটো। মাথা নেড়ে বোঝায় ভালো আছে। পপী চৌধুরী মেয়েকে দেখে মুচকি হেসে বললেন, “কার পোশাক পড়েছ তুমি?”
পত্রলেখা মোবাইল ঘুরিয়ে অরুণাভকে দেখায়। অরুণাভ বিরক্ত মুখ বানিয়ে সরে যায়। পপী চৌধুরী হেসে বললেন,

“যাক ওতটাও বদরাগী না ছেলেটা! তোমার সব জিনিসপত্র তো হোস্টেলেই আছে। আমি ভেবেছিলাম হোস্টেলে গিয়ে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে তোমার কাছে যাবো। পরে কারিম বললে সিদ্ধান্ত বদলে নিয়েছি। জারিফ যদি জানে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে আরেক কাহিনী করবে। এমনিতেই সকাল বিকেল চেঁচামেচি করে। পুরাই সাইকো ওই জারিফ। তুমি একটু সাবধানে থেকো।”
পত্রলেখা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। পপী চৌধুরী জানতে চাইলেন, “কি রাঁধে আমার মেয়েটা?”
পত্রলেখা প্রশ্নভাজন চোখে চাইলে পপী চৌধুরী বলে, “বরুন বলছিল রান্না করছ!”
কি কি যেন ইশারা করে মেয়েটা। তাঁর মা জননী তাঁর প্রতিটি ইশারা সহজেই বুঝে কথা এগিয়ে নিয়ে যায়। নাই কাজ তাই অরুণাভ চুপচাপ অবলোকন করে মা মেয়েকে। ব্যাপারটা ভালোই লাগে তাঁর কাছে। পপী চৌধুরীকে যতটা খারাপ মা ভেবেছিল ততটাও সে নয়! কথাবার্তায় বোঝা যায় মেয়েকে ভালোবাসে। মেয়ের জন্য চিন্তাও করে।

“পুষ্প ঘ্যান ঘ্যান করছে। ওর সাথে কথা বলবে?”
পত্রলেখা উপরনিচ মাথা নাড়লো। অরুণাভের চাহনি সুক্ষ্ম হয়। মোবাইলের পর্দায় বাচ্চা একটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। অনেকটা পত্রলেখার মতোই দেখতে। কথা তো বলছে না বুলেট ছুড়ে মারছে। এক নম্বরের বাঁচাল। মেয়েটার কথা শুনে ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়লো অরুণাভের। তাঁর জানটুস কি করছে কে জানে? একটি বার ফোনও করলো না!
“আপু, তোমার কি সত্যিই বিয়ে হয়েছে? তুমি কি এখন বউ?”
পত্রলেখা আড়চোখে অরুণাভের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে মাথা নাড়লো। পুষ্প বলল, “তোমার বর কে দেখাবে না?”

পত্রলেখা ফোনের ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। অরুণাভকে দেখা যায়। পুষ্প কিছুটা সময় নিয়ে বলল, “আপু তোমার বর আমার দুলাভাই হবে তাই না?” আমি দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলবো।”
পত্রলেখা না বোধক মাথা নাড়ে। চোখ বড় বড় করে গাল ফুলিয়ে বোঝায়, সে খুব রাগী। পুষ্প নাছোড়বান্দা, “আমি একটুও রাগাবো না। সালাম দিবো, কেমন আছেন জিজ্ঞেস করবো, আর আমার আপুকে ভালোবাসতে বলবো। দাও না একটু?”
মায়ের শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো গড়গড় করে বলে পুষ্প! পত্রলেখা না না করে যায়। কল কাটতেই নিবে অরুণাভ বলল, “দাও, কথা বলছি!”
পত্রলেখা অবাক হয়। অরুণাভ ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলে, “হেয় কিউটি!”
পত্রলেখার চোয়াল ঝুলে পড়ে। ফোনের ওপাশের পুষ্প গদগদ হয়ে বলল, “তুমিই পত্র আপুর বর?”
অরুণাভ হাসলো শুধু। তাঁকে জবাব না দিতে দেখে পুষ্প মন খারাপের সুরে বলল, “তুমিও কি পত্র আপুর মতো কথা বলতে পারো না?”
“নাম কি তোমার?” পুষ্পকে ভুল প্রমাণিত করে অরুণাভ কথা বলল। পুষ্প খুশি হয়ে বলল, “আমার নাম পুষ্প কারিম! তোমার নাম কি?”

“অরুণাভ সরকার!”
“তোমাকে আমি দুলাভাই ডাকতে পারি? রাগ করবে না?”
অরুণাভ পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে বলল, “রাগ করবো। ভাইয়া ডাকতে পারো।”
“দুলা ভাইয়া ডাকি? প্লিইইজ প্লিইইইজ?” বলেই আকুতি মিনতি সব করলো পুষ্প। অরুণাভ প্রসঙ্গ বদলে বলে, “কোন ক্লাসে পড় তুমি? দেখে তো পিচ্চিই মনে হচ্ছে!”
“পিচ্চি বলবা না। আমি অনেক বড়। ক্লাস থ্রিতে পড়ি হুঁ!”
“আরে বাপরে তাহলে তো অনেক বড় আপনি!”
“হুঁ, তুমি কিসে পড়ো?” বড়দের মতো ভাব ধরে পশ্ন অরে পুষ্প। অরুণাভ হেসে বলল,
“পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি। আমি এখন শুধু খেলাধুলা করি!”
“তোমার মা বকে না?”
“না।”
“তোমার মা কত্ত ভালো। আর আমি একটু পড়া না করলেই মা বকে বকে কান খেয়ে নেয়!”
“আহারে!”
“তোমার কোলে ওটা কি? ক্যাট?”

“সি’জ মায় লিটল বেইবি অ্যানা!” অরুণাভ থেমে অ্যানার গায়ে হাত বুলিয়ে বলে, “অ্যানা সে হ্যালো?”
অ্যানা “মিয়াও” ডাকতেই পুষ্প চোখ কপাল তুলে বলে, “তোমার ক্যাট দেখছি কথাও বলে!”
অতঃপর দুজনের খুচরা আলাপ চলমান। পত্রলেখা গোমড়া মুখে কতক্ষণ অপেক্ষা করে চলে যায় অধরা কাজ শেষ করতে। একটু পর পরই দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে কথা ফুরোলো কি-না। কিন্তু তাদের কথা ফুরাবার নামই নিচ্ছে না। তাঁর রুটি বানানো হয়ে যায়। পেঁয়াজ কুচি ছেঁড়ে কড়াইয়ে তেল ঢালে। কতক্ষণ ভেজে মেরিনেট করা মুরগি ঢেলে দেয়। সময় নিয়ে কষায়। ঢাকনায় ঢেকে দিয়ে উঁকি মারে ঘরে। কিন্তু ঘর ফাঁকা। কোথায় গেলো বদরাগী ছেলেটা?

“উঁকি ঝুঁকি কেন দিচ্ছিলে?”
শব্দের উৎপত্তি স্থল খুঁজতে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী বাঁক নিয়ে পাশে তাকায় পত্রলেখা। বুকে হাত ভাঁজ করে নবাব পুত্তুর জহুরী দৃষ্টিতে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। পত্রলেখা সোজা হয়ে দাঁড়ালো। অরুণাভ ঝাঁঝালো স্বরে বলে, “কি সমস্যা তোমার?”
একটু আগেই পুষ্পর সাথে মিষ্টি করে কথা বলছিল, হাসছিল। আর তাঁর সাথে? পত্রলেখা মুখ বিকৃত করে চলে যায় চুলার কাছে। অরুণাভ পাশে এসে দাঁড়ায়।
“রান্না কতদূর?”

পত্রলেখা খুন্তি হাত প্রসারিত করে বোঝায়, বহুদূর। অরুণাভ বিড়বিড় করে একটা রুটি নিয়ে চিবোতে লাগলো। ঠিকঠাক হলেও মনটা খুঁত ধরবে বলে আঁকুপাঁকু করছে। রুটিটা রেখে দিয়ে বলল, “লবণ কম হয়েছে!”
পত্রলেখা কড়াইয়ের ঢাকনা সরিয়ে মাংস নাড়েচাড়ে। বাটিতে এক টুকরো মাংস সহ অল্প ঝোল নেয়। আধ খাওয়া রুটি সহ অরুণাভকে খেতে ইশারা করে। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে রুটি ছিঁড়ে মাংস দিয়ে খায়। কষা মাংসের সাথে লবণ কম রুটি খেতে মন্দ লাগছে না। বলাবাহুল্য মেয়েটার হাতের রান্না প্রসংসনীয়!
পত্রলেখা মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সব তৈরি করে। মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে সব পরিবেশন করে। গরম গরম রুটি, ধোঁয়া ওঠা মুরগির কষা মাংস, কড়া লিকারের দুইকাপ চা, আর মিষ্টিতে আস্ত বিড়াল শাবক। অরুণাভ চুপচাপ খেয়ে চলেছে। পত্রলেখা খায় আর চোরা চোখে চায়। একটু প্রশংসার আশায় কি?
অরুণাভ দুটো রুটি খেয়েই উঠে পড়ে। হাত ধুয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। সারাদিনের খাটুনির পর ক্লান্ত শরীর একটু বিশ্রামের খোঁজে। পত্রলেখা তখনও চপর চপর শব্দে খেয়ে চলছিল। অরুণাভ তাঁর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো,

“দেখো চিঠিপত্র, শুধুমাত্র আব্বুর কথায় এই সম্পর্কে জড়াতে আমি বাধ্য হয়েছি। এই সম্পর্কটাকে কন্টিনিও করা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব! বুঝতে পারছো তুমি?”
পত্রলেখা খাবার চিবোতে ভুলে যায়। গালে খাবার নিয়ে অরুণাভের দিকে তাকালো! অরুণাভ পূর্বের মতোই শীতল কণ্ঠে বলল, “সম্পর্কটার দায় যতটুকু আমার ততটুকু তোমারও। তুমি বলো তোমার সিদ্ধান্ত কি? তুমিও কি আমার মতো সম্পর্কটাকে কন্টিনিও করতে চাইছ না? না চাইলে বলো আমরা ডিভোর্সের পথে আগাবো।”
অরুণাভ পত্রলেখার প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায়। পত্রলেখা নতমুখে খাবারটা শেষ করে এঁটো প্লেট দু’টো নিয়ে চলে গেলো সিংকে। আয়নায় সুশ্রী মুখের মানবীকে দেখে ম্লান হেসে পরিহাস করে। একটু আগ অবদি বেহায়া মেয়েটা রঙিন স্বপ্ন বুনছিল। রঙিন স্বপ্নে বেরঙিন বাস্তবের ছোঁয়া এতো দ্রুত লাগবে বুঝতে পারে নি।
ঘরে এসে অরুণাভের দিকে তাকালো না পত্রলেখা। নোটবুক কলম হাতে তুলে নিয়ে কতক্ষণ থম মেরে বসে রইল। তারপর লিখল,

“যদি হ্যাঁ বলি তুমি কি আমাকে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিবে?”
অরুণাভ লেখাটা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভালোবাসা না থাকলে সংসার হয়?”
পত্রলেখা মুচকি হেসে লিখল, “হয় না। তুমি রেখে দিলে আমি থেকে যেতাম। তুমি যখন রাখবে না, চলে যাবো। সাভারের বাসে তুলে দিলেই হবে।”
অরুণাভ পত্রলেখার চোখে চোখ রেখে জানতে চায়, “থেকে যেতে চাইছ?”

পত্রলেখা কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাঁর নীরব চোখের ভাষা বুঝে নেওয়া খুব সহজ। অরুণাভ কিছু সময় ভেবে বলল, “আমি ভালো ছেলে না চিঠিপত্র। আর তোমাকে কখনো ভালোবাসতেও পারবো না।”
পত্রলেখা আর কিছু লিখল না। লেখার সাহস হলো না। অরুণাভও কিছু বললো না। ফোন অন করে রিলস দেখায় মনোনিবেশ করে। পত্রলেখা একটা বালিশ নিয়ে নিচে শীতল পাটিতে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। টলমল চোখ দুটো বাঁধ ভেঙেছে। সকাল হলেই চলে যাবে সে। থাকবে না কারো বোঝা হয়ে!
নাক টানার শব্দ জোড়ালো অরুণাভের কানে পৌঁছায়। ক্রন্দনরত পত্রলেখাকে দেখে নেয় একবার। রিলস ঘাঁটতে ঘাঁটতে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে, “কথায় কথায় কান্নাকাটি করে নিজেকে বেচারি প্রমাণ করা বন্ধ করো। তোমার এসব ন্যাকামি বিরক্ত লাগে আমার। থাকতে ইচ্ছে হলে থাকো। কথা হলো আমার কাছে কোনোপ্রকার এক্সপেক্টেশন রাখতে পারবে না।”

পত্রলেখার কপালে ভাঁজ পড়ে। কি বলল ছেলেটা? অরুণাভ অ্যানাকে মাঝখানে শুইয়ে দিয়ে বলল, “বিছানা অনেক বড় আছে। আমার শেয়ার করতে সমস্যা নেই। শুধু আমার সাইটে না আসলেই হলো। অ্যানা হলো বর্ডার। ওকে ক্রস করার চেষ্টা ভুলেও করবে ন! মেরে বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গায় ফেলে আসবো!”

পত্রলেখা গেল না। এতো দ্রুত গেলে তো ছোঁচা ভাববে। আর একবার সাধলে বরঞ্চ চলে যাবে। নিচে মশা খুব জ্বালাতন করে। সে অপেক্ষায় রইল। চোখে ঘুমের আবির্ভাব হয়, কিন্তু অরুণাভের ডাক আসে না। রিলসের শব্দও থেমে গেছে অনেক আগেই। কনুই ভর দিয়ে উঁচু হয়ে বিছানার হালচাল দেখে। গালে হাত ঠেকিয়ে ঘুমেশে পড়েছে নবাব পুত্তুর।

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৫

ঠোঁট বাচ্চাদের মতো উল্টিয়ে রেখেছে। সু্যোগ হাতছাড়া করে না সে। লাইট নিভিয়ে বিনা শব্দে বিছানার ওপর পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। চোখের পাতা নিভু নিভু প্রদীপের মতো যেকেনো সময় নিভে যাবে। এমতাবস্থায় কেউ একজন ঘুমের ঘোরে অ্যানা বর্ডার ক্রস করে তাঁর সীমানায় এসেছে। এসেই ক্ষান্ত হয় নি। হাত পা তুলে সাপের মতো পেঁচিয়ে নিয়েছে। পত্রলেখার নিভু নিভু চোখের প্রদীপ আবারও জ্বলে ওঠে।

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৭