নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ১৮
সুরাইয়া জিয়াসমিন
_”আমি কাখনোই তোমাকে দিয়ে satisfied হয়নি।আমি ভেবেছিলাম তুমি সবসময় আমার কাছে আসবে। but সেদিন জোর না করলে এখনো হয়তোবা আমাদের ভিতরে কিছুই হতো না।তুমি সারাজীবন বাহানাই দিয়ে যেতে। তুমি কখনোই পছন্দ করোনি যে আমি তোমার কাছে আসি। সবসময় তুমি একটা না একটা বাহানা দিয়েই যাও।আমি just শব্দ হারিয়ে ফেলেছি তোমার ব্যবহার দেখে।”
আরহামের কথায় নুবার এতো রাগ হলো যা বলার মতো না।নুবা রাগে ছটফট করে উঠলো।কি রেখে কি বলবে সে বুঝতে পারলো না।রাগে এগিয়ে যেয়ে রুমে সাজানো কাঁচের সো’পিস তুলে দিলো এক আছার।সেই বিকট শব্দে ঘুমন্ত আয়রা ধরপড়িয়ে উঠলো।তবে কাঁদলো না।তাই কেউ তার দিকে খেয়ালো করলো না।
নুবাকে অতিরিক্ত রেগে যেতে দেখে আরহাম রুম ছেড়ে যেতে চাইলো।তবে এবারো নুবা যেতে দিলো না। বরং এগিয়ে যেয়ে ড্রেসিং টেবিল থেকে প্লাস্টিকের পাউডারের বোতল উঠিয়ে আরহামের পিঠে ছুরে মারলো।পরপর চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”কোত্থাও যাবি না তুই।”
নুবার ব্যবহারে আরহাম পিছন ফিরে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে নুবার দিকে তাকালো।নুবার আবারো ড্রেসিং টেবিল থেকে জিনিস নিয়ে আরহামের দিকে ছুরে মারলো তবে তা আরহামের গায়ে লাগলো না।নুবার দুঃসাহস দেখে আরহাম হতভম্ব হয়ে গেলো।নুবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে ড্রেসিং টেবিলের উপরে থাকা সব ফ্লোরে ফেলে দিলো।আরহামের দামি ঘড়ি, পারফিউম,আরো বিভিন্ন কিছু ভেঙ্গে ফেললো নুবা।আরহামের দাঁতে দাঁত চেপে আসলো। এদিকে আয়রা ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নার প্রস্তুতি নিলো। আরহাম নুবার কান্ড দেখে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”কি করছিস এই সব,তোর বাপের টাকায় কিনা।জানিস এগুলা কতটা এক্সপেনসিভ?”
নুবার আরহামের কথায় আরো রাগ হলো, এগিয়ে এসে রুমের সব তছনছ করতে করতে বললো
_”সব ধংস করে দিবো আমি,সব, কিচ্ছু রাখবো না।”
বলেই নুবা নিজের কর্ম কান্ড চলিতো রাখলো। আরহামের কলিজা কেঁপে উঠলো।এই ভাঙ্গা জিনিস গুলো যদি ভুলেও নুবার হাতে পায়ে ঢুকে যায় তবে কি হবে। আরহাম এগিয়ে গেলো নুবাকে থামানোর জন্য।এর ভিতরে আয়রা শব্দ করে কেঁদে উঠলো। আরহাম এগিয়ে যেয়ে নুবাকে ধমকে আটকানোর চেষ্টা করলো তবে নুবা একটুও থমলো না।একটা একটা করে সব ভাংতে লাগলো।এক পর্যায়ে নুবা আরহামকে ঝাড়া মেরে ফেলে ড্রেসিং টেবিলের কাঁচে ফুলের টপ ছুরে আঘাত করলো।সাথে সাথে সেই কাচ ছিটে এসে নুবার গায়ে লাগতে চাইলো। কাঁচ নুবার শরীর স্পর্শ করার আগেই আরহাম নুবাকে বুকের সাথে আগলে নিলো।ফল স্বরুপ সব কাঁচ এসে আরহামের পিঠ ছুঁয়ে নিচে পড়ে গেলো। ভাগ করে তারা দূরে অবস্থান করায় আরহামের তেমন লাগলো না তবে একটু আকটু কাঁচের আঘাতে কেটে গলো।যা খেয়াল করলো না নুবা।
নুবার এরকম বেখেয়ালি কান্ডে আরহাম ধৈর্য হারা হলো।নুবা যেই না তাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইবে সেই ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলো নুবার গালে।নুবা থাপ্পর খেয়ে আরো কেঁদে উঠলো।নাক টেনে আরহামকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো।তার মনে হলো এই সব ভাংচুর করার জন্য তাকে মারলো।এই ভেবে নুবা আরো রেগে গেলো চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”চলে যান আপনি,আমি থাকবো না আপনার সাথে।থাকবো না।ডিভোর্স দিয়ে দিবেন আমাকে। যেহেতু আপনি আমাকে দিয়ে satisfied’ই না তবে ছেড়ে দিন আমাকে।আমি একটুও থাকবো না আপনার সাথে।”
ডিভোর্স কথাটা শুনে আরহাম অনেক রেগে গেলো।পরপর রেগে তেরে আসলো নুবার দিকে। চিৎকার করে বললো
_”মুখে লাগাম দে নুবা।না হলে আমার হাত উঠে যাবে।”
নুবা আরো তেতে উঠে কান্না করতে করতে চিৎকার করে বললো
_”কি হাত উঠাবেন আপনি,ভয় দেখাচ্ছেন আমাকে।মারার কি বাকি রেখেছেন।আমি ভয় পাই না আপনাকে।চলে যান আপনি,আমি থাকবো না আপনার সাথে।চলে যান।আপনি ছিলেন না আমি ভালো ছিলাম।”
নুবার কথায় আরহামের বুকটা ভেঙ্গে আসলো।কাতর কন্ঠে বললো
_”আমি চলে গেলে তুই খুশি হবি, শান্তিতে থাকবি?”
_”হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ , আপনি না থাকলেই আমি শান্তিতে থাকি ।ছেড়ে দিন আমাকে। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিন।আর নিজের টাইপের মেয়ে খুঁজে নিন।আমি আর এই বালের সংসার করবো না। সবসময় কেটকেট অশান্তি ভালো লাগে না।”
আরহাম কিছু সময় নুবার দিকে তাকিয়ে থেকে হাঁসফাঁস করে বললো
_”সত্যি চলে যাবো?”
নুবা দাঁতে দাঁত চেপে রেগে বললো
_”হ্যাঁ চলে যান। আপনাকে ভালো বাসাই আমার ভুল হয়েছে। আপনি তার যোগ্য না।”
আরহাম ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো,চোখ দুটো লাল হয়ে তা ছলছল করে উঠলো তবে আরহাম টু শব্দ করলো না। কান্নারতো আয়রার দিকে এগিয়ে গেলো।নুবা এদিকে দুই হাত মুঠো বদ্ধ করে নিলো কটমট করে বলে উঠলো
_”কেনো এসেছিলেন আমার জীবনে। আপনাকে ছাড়া ভালোই তো ছিলাম আমি। সেদিন কেনো এসেছিলেন আপনি?কেনো? আপনি না আসলে আমার জীবনটা এখনো শান্তিপূর্ণ থাকতো।কারো মন মতো চলতে হতো না।”
আরহাম এগিয়ে যেয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো শান্ত করতে করতে বিরবির করে বললো
_”আর কারো মন মতো চলতে হবে না তোমার।নিজের মতো শান্তিতে থাকো।যা ইচ্ছা তাই করো ।আমি আর কিছুই বলবো না। কারণ আমি থাকবোই না।”
মেয়ে মানুষের মতো বিরবির করে কথা গুলো বলে,মেয়েকে শান্ত করে আলমারি দিকে এগিয়ে গেলো। পরপর লাকেজ বেড় করে নিজের প্রয়োজনীয় সব কিছু ভরে নিতে লাগলো।নুবা দুই হাত মুঠো বদ্ধ করে আরহামের কান্ড দেখতে লাগলো। কিছু জিনিস গুছিয়ে নিয়ে লাকেজের বন্ধ করে নিলো আরহাম।পরপর এগিয়ে এসে এক হাতে মেয়েকে কোলে তুলে অন্য হাতে লাকেজ নিয়ে হাঁটা দিলো সে।
আরহামের কর্ম কান্ড দেখে নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো।আয়রাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে ব্যপারটা হজম করতে পারলো না নুবা।গটগট করে এগিয়ে যেয়ে আরামের সামনে দাঁড়ালো। আরহাম নুবার দিকে এক পলক তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগলো।নুবা ফোঁস ফোঁস করে উঠলো।পরপর রাগি কন্ঠে বলে উঠলো
_”মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
আরহাম মুখ কালো করে বিরবির করে বললো
_”আমি যাবো তো মেয়েকে নিয়ে যাবো না নাকি?”
নুবা আয়রার এক হাত ধরে রাগি কন্ঠে বলে উঠলো
_”না, আপনাকে যেতে বলেছি, কিন্তু মেয়েকে না।মেয়েকে নিয়ে এক পা’ও এগোতে পারবেন না আপনি!”
আরহাম আয়রার হাত ছাড়িয়ে নিলো নুবার থেকে। এদিকে আয়রা ফ্যালফ্যাল করে তার বাবা-মা’র দিকে তাকিয়ে আছে।আসলে বেচারি ঘুম থেকে উঠে বুজতে পারছে না,এদের হলোটা কি? আরহাম মেয়ের হাত ছাড়িয়ে বলে উঠলো
_”আমার মেয়ে,আমি নিয়ে যাবো। তুমি থাকো তোমার মতো।সরো যেতে দেও।”
কিন্তু নুবা সরলো না,আরহামের “আমার মেয়ে” কথা টুকু শুনে নুবা আরো রেগে গেলো,আয়রাকে টেনে নিজের কোলে নিয়ে নিলো।পরপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো
_”আমার মেয়ে ও,আর ও কোথাও যাচ্ছে না। আপনার যেখানে ইচ্ছা যেখানে চলে যান। কিন্তু আয়রা যাবে না।মানে না।”
আরহামো কম যায় নাকি,সেও মেয়েকে নিজের কোলে টান দিয়ে নিয়ে নিলো।আর দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বললো
_”তুই চলে যেতে বলেছিস,আমি চলে যাচ্ছি। একদম ঝামেলা করবি না।”
নুবা আবারো আয়ারকে ধরে টান দিয়ে বললো
_”না না,ওকে আমি কোত্থাও যেতে দিচ্ছি না।”
এদিকে আয়রা হয়তোবা একজনের কোল থেকে অন্য জনের কোলে যেয়ে বেশ মজা পেলো তাই দাঁত বেড় করে হাসতে লাগলো।
আরহাম এবার বেশ রেখেই মেয়েকে টেনে কোলে নিলো পরপর রাগি কন্ঠে বললো
_”একদম আমার মেয়েকে তোর মেয়ে দাবি করবি না।এটা আমার মেয়ে।”
নুবা আয়রার আর এক হাত ধরে টেনে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_’আর আমি ওকে বুকের দুধ দিয়ে মানুষ করেছি।ও আমার মেয়ে। শুধু আমার। আমার,আমার,আমার বুঝলেন।”
বলেই টানতে লাগলো,এক পর্যায়ে দুইজন মিলে আয়রাকে নিয়ে ধস্তাধস্তি করতে লাগলো।আরহামের হাত থেকে লাকেজ পড়ে গেলো তবু মেয়েকে ছাড়ালো না সে।এবার আয়রা ভয়ে আর মৃদু ব্যথা পেয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলো।আয়রাকে কাঁদতে দেখে নুবার হাতের বাঁধন হালকা হয়ে উঠলো। আরহাম আয়রাকে টেনে নিতে সক্ষম হলো। আরহাম নুবার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বাচ্চাদের মতো বললো
_”ও আমার মেয়ে,তোর না। শুধু আমার।আর খরবদার একবার তোর মেয়ে বলে দাবি করবি তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। চোখের সামনে থেকে দূর হ।নিজের মতো থাক।”
নুবার ভীষণ খারাপ লাগলো আরহামের এরকম ব্যবহারে। ফুঁপিয়ে উঠলো সে তবে মুখে রাগ প্রকাশ করে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”স্বার্থপর, স্বার্থপর কোথাকার। প্রয়জন শেষ না এখন তো যাবিই।”
আরহাম নুবার সুরে সুর মিলিয়ে বললো
_”ইনটেক মাল না তুই,আমি তো used । আমার মতো মানুষের সাথে তোর আর থাকতে হবে না।”
বলেই নুবাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রুম থেকে বেড় হয়ে গেলো।নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো আরহামের কথায়।কোন কথা কোথায় টেনে আনলো সে।নুবা তো সেদিন মজা করে কথাটা বলেছিলো আর সেই কথা মনে পুষে রেখেছে এই লোক।
নুবা নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো পারলো না।পা থেকে স্লিপার খুলে আরহামের পিঠে ছুরে মেরে বললো
_”নাটক করিস আমার সাথে? আগে কেন গেলি না।এখন আমার সব শেষ করে, আমাকে নিজের মতো used বানিয়ে তারপর ঢং মারিস। আমার কাছে কেন আসলি।এখন ব্যবহার করা শেষ,সব তো পেয়ে গেছিস,মেয়েও বড় হয়ে গেছে এখন কি আমার দরকার আছে? স্বার্থপর!”
বলেই নুবা আর একটা স্লিপার আরহামের দিকে ছুরে মারলো। অবশ্য যা একটাও আরহামের গায়ে লাগলো না। কারণ নুবা তার গায়ে ছুরেনি। এদিকে জুতা ছুরে মারতে দেখে আরহাম রেগে যেয়ে পিছন ফিরে বললো
_”হ্যাঁ, প্রয়জন শেষ।তোর আর দরকার নেই আমার।যা, কি করবি করে নে।”
বলেই আরহাম কান্নারতো আয়ারকে শান্ত করতে করতে গটগট করে চলে যেতে লাগলো।নুবা রাগে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”চলে যান, আপনাদের ব্যতিতোও আমি বাঁচতে পারবো।চলে যান,এই নুবা আয়রার পাপা আর আয়ারকে ছাড়াও বাঁচতে পারবে।”
নুবার চেচানি আরহাম শুনে রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলোই।নুবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।রাগে শরীর ফেটে গেলো তার। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো তবে তা হলো না।নুবা রুমে ফিরে গেলো পরপর আবারো সব ভেঙ্গে চুরমার করে দিলো। চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”মরে যাবো আমি। মরে যাবো,,,”
বতলে বলতে নুবা হাঁটু গেঁড়ে নিচে বসে পড়লো।তার আরহামের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। আরহাম কি করে আয়ারকে শুধু তার মেয়ে বললো।আসলে সে সৎ সৎ’তি থেকে যাবে। আরহাম ভীষণ কষ্ট দিলো তাকে। ভীষণ!”
পরি রাতের রাগ টুকু পুষে রেখে নাক টেনে কেঁদে উঠলো।পরপর ভাঙ্গা শব্দে বললো
_”হ্যাঁ চলে এসেছি। কারণ আমার ভালো লাগছিলো না ওখানে।তবে এখানে এসেও শান্তি নেই।”
_”বলে আসতে পারতি? ভেবেছিলাম পালিয়ে গিয়েছিস।আর একটু হলেই তোর মা বাপরের পিন্ডি চটকাইতাম।”
পরি নাবিলের কথায় ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
_”কি বলে আসবো আপনাকে,আর কেনোই বা বলবো?apartment ফেলে রেখে গিয়েছিলেন ।আর কোনো খবর নেননি? আপনার চেলা পেলা এসে খবর নিয়ে যেতো,কেন? কারণ আপনার তো সময় নেই। মানুষটা আদেও কি বেঁচে আছে না মরে গেছে দেখার লোক নেই।ফেলে চলে গিয়েছিলেন। সাথে যে আর একজন আছে তাও একবার খবর নেননি।এতো দিন পর এসেও আমাকে শান্তি দেননি বরং অশান্তি সৃষ্টি করেছেন। শুধু অশান্তি।”
কথাটুকু শেষ করে পরি ফুঁপিয়ে উঠলো।নাবিল চেয়ে রইলো পরির দিকে।ঘুম ভাঙ্গার পর তাকে দেখে কিছুটা চম্কে উঠেছিলো পরি।পরপর নাবিল পরিকে”হসপিটালে থেকে,কেনো এসেছে?” এই নিয়ে জেরা করতে থাকে।তখন পরি না পেরে কেঁদে উঠে আর এই সব বলে।নাবিল আর জেরা করলো না। কারণ তার পরির কান্না তেমন ভালো লাগছে না।
নাবিল পরিকে ছলছল চোখে তাকাতে দেখে আস্তে করে তাকে বুকে টেনে নিয়ে শুকনো ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।পরি বিরক্ত হলো নাবিলের কাজে।কই বুকে টেনে একটু শান্ত করবে তা না। চুম্মা চাম্মি শুরু করেছে।পরি নাবিলকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অশান্ত কন্ঠে বললো
_”সুযোগ পেলেই সুষে নিতে শুরু করেন। অন্ততপক্ষে একটু শান্তি তো দিন। আমার জীবন টাকে জাহান্নাম বানিয়ে রেখেছেন। একটু শান্তি দিন। শুধু শুধু কেনো এসেছেন? চলে যান।আমি একটু শান্তি পাবো।”
নাবিল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।পরির চোখে মুখে ক্লান্তির ভাঁজ।সে আর মন মর্জি করলো না পরির সাথে বরং পরির পেটে হাত বুলিয়ে দিলো।সে না চাইতেও নিজের সন্তানের প্রতি দূর্বল।তবে সে কখনোই এই সন্তানের জন্য নিজের ব্যক্তিত্ব হারাতে পারবে না।সে যেমন ছিলো তেমনি থাকবে।
ঘন্টা খানিক পড়েই নুবার রাগ কিছুটা পড়ে গেলো।নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এক পলক রুমের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো কারণ এইসব সে করেছে,তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
নুবা নিজেকে শান্ত করে ফ্রেশ হয়ে নিচে যেতে লাগলো। কারণ তার মনে হচ্ছে আরহাম তাকে ছেড়ে যেতেই পারে না।তাই নিশ্চয় মেয়েকে নিয়ে নিচেই বসে আছে।আগে তাদের খোঁজ নেওয়া যাক,তার পর না হয় রুমটা পরিষ্কার করবে।
নুবা নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে নিচে গেলো।তবু তার চোখ মুখ দেখে যে কেউ বুঝে যাবে সে প্রচুর কান্না করেছে।নুবা শুকনো ঢোক গিলে আস্তে আস্তে নিচে চলে আসলো।তবে কাউকেই নজরে পড়লো না।
নুবা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে লিভিং রুমে যেয়ে আশে পাশে তাকালো পরপর তানিয়ার দিকে তার নজর পড়লো।নুবা এগিয়ে যেয়ে তানিয়ার পাশে বসে আসে পাশে চোখ বুলিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
_”আয়রার পাপাকে কি দেখেছো খালা?”
তানিয়া টিভির দিকে মনযোগ দিয়ে বললো
_”ঘন্টা খানিক আগেই বেড় হইয়া গেছে উনি।”
নুবার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো।তাহলে কি সত্যিই চলে গেছে আরহাম।নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকে ,কম্পিত কন্ঠে বললো
_”আর আয়ার,ওকে নিশ্চয় আম্মু বা চাচিমার কাছে রেখে গেছে তাই না।”
তানিয়া টিভির দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তিত হয়ে বলে উঠলো
_”না তো,আয়রারে নিয়াই চইলা গেছে।খুবি রাগি মনে হইতাছিলো তারে। কেন কিছু হইছে?”
নুবা তানিয়ার কথা বিশ্বাস করলো না বরং তাকেই ঝাড়ি মেরে বললো
_”ধূর, তুমি কিছুই জানো না।মেয়েকে নিয়ে যাবেন নাকি উনি?”
তানিয়া নুবার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কন্ঠে বললো
_”এখনো কানা হইয়া যাই নাই আমি।আয়রারে নিয়াই বেড় হইছে।”
নুবা ফট করে উঠে দাঁড়ালো,পরপর রাগি কন্ঠে বললো
_”তুমি বেশি জানো,আর তুমি কাজ ফেলে রেখে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলে কেন?এটা তোমার কাজ নাকি? নিশ্চয় ভুল দেখেছো।ধূর আমিও কাকে কি জিগ্গেস করছি? নাটক দেখার সময় কি আর অন্য দিকে মন থাকে।”
বলতে বলতে নুবা তার মায়ের রুমের দিকে যেতে লাগলো।পিছন থেকে তানিয়া বলে উঠলো
_”আরে,আমি সত্যি দেখছি।আমি মিথ্যে কমু নাকি।”
নুবা পিছন দিকে মাথা ফিরিয়ে,আরহামের রাগ তানিয়ার উপর ঝেড়ে বললো
_”ধূর, তুমি চুপ করো তো। যতসব!”
বলেই নুবা নিজের মায়ের রুমের দিকে চলে গেলো।নুবা ত র মায়ের রুমে যেয়ে দেখলো হাজেরা বসে বসে হাতের কাজ করছে।নুবা আশে পাশে চোখ বুলিয়ে নিলো যে আয়রা আছে কিনা।না নেই আয়রা।
নুবা শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে যেয়ে হাজেরার সামনে বসলো।মেয়েকে দেখে হাজেরা এক গাল হেসে বললো
_”কিরে,কি হয়েছে,এই সময় এখানে যে?”
নুবা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বিরবির করে বললো
_”আয়রার পাপা কোথায় গেছে মা? কিছু বলে গেছে তোমাকে?নাকি আয়ারকে চাচিমার কাছে দিয়ে গেছে?”
মেয়ের প্রশ্নে হাজেরা ভুরু কুঁচকে নিলো।পরপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন তিনি। অদ্ভুত কন্ঠে বলে উঠলেন
_”না”তো। কেনো কিছু হয়েছে।কোথাও কি গিয়েছে আরহাম?”
নুবা মাথা নিচু করে নিলো পরপর ভারি কন্ঠে বললো
_”ও তুমিও দেখোনি। আচ্ছা আমি চাচিমার সাথে কথা বলে আসি। তুমি থাকো।”
বলেই নুবা উঠতে নিলো।তবে হাজের মেয়ের এক হাত চেপে ধরে মৃদু কন্ঠে বললেন
_”কি হয়েছেরে ।মুখটা এরকম কালো দেখাচ্ছে কেন। আরহামের সাথে ঝগড়া করেছিস? নাকি অন্য ব্যপার। এমন দেখাচ্ছে কেন তোকে।”
নুবা মায়ের থেকে হাত ঝাড়িয়ে নিতে নিতে বললো
_”তেমন কিছু না মা।এমনি।দেখি ছাড়ো,আগে মেয়ের খোঁজ নিয়ে আসি।”
তবে হাজেরা ছাড়ালো না,মেয়ের হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে তার এক গালে হাত রেখে আদুরে গলায় সুধালো
_”একদম মিথ্যা বলবি না, সত্যি করে বল কি হয়েছে?”
নুবা এবার আর নিজেকে আঁটকে রাখতে পারলো না।চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো তার। কিছু বলার ভাষা খুজে পেলো না। ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে উঠলো সে।পরপর হাজেরাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো।
মেয়েকে এভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখে হাজেরা বুঝতে পারলো নিশ্চয় ওই হারামজাদা বড় আকারেই তার মেয়ের সাথে বাধিয়েছে।না হলে তার মেয়েটা এভাবে কেনো কাঁদবে?
হাজেরা নুবাকে বিছানায় বসালো পরপর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
_”কি হয়েছে? মা’কে সবটা খুলে বল? কিছু নিয়ে ওর সাথে বেঁধেছে?”
নুবা নাক টেনে হাঁসফাঁস করে উঠে বললো
_”উনি হয়তোবা আয়রাকে নিয়ে চলে গেছেন মা।আমারি দোষ।আমি কেনো যে এরকম করলাম।সব আমার দোষ!”
বলতে বলতে নুবা কপাল চাপড়ে কেঁদে উঠলো।হাজেরা মেয়ের কান্না দেখে কিছু সময়ের জন্য স্তব হয়ে গেলেন পরপর বলে উঠলেন
_”কি হয়েছে,ওই অসভ্যটা কিছু করেছে। আমাকে বল আমি একদম শায়েস্তা করে দিবো।”
নুবা মাথা ঝুকালো। লজ্জাজনক বিষয়টা বলতে চাইলো না সে।হাজেরা মেয়ের গালে হাত রেখে বেশ ভাঙ্গা কন্ঠে বললেন
_”কি হয়েছে বলবি তো।কি নিয়ে লেগছে দুইজনের?যে নবাব আয়রাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেড় হয়েছেন? বল কি হয়েছে?”
নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নাক টেনে কেঁদে উঠলো।নুবাকে কিছু বলতে না দেখে হাজেরা বিচলিত হয়ে বললো
_”বলবি না মা”কে কি হয়েছে।”
নুবা নিজের মায়ের হাতের উপর এক হাত রেখে কম্পিত কন্ঠে বললো
_”মা তুমি তো আমার মা’য়ের চেয়ে বন্ধু বেশি।আমি তো সবি তোমার কাছে বলি,তবে কি আমি আমার আর উনার ব্যক্তিগতো জীবনের কিছু অংশ মেলে ধরতে পারি। আমার না নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।আমি বুঝতে পারছি না কি করবো?”
হাজেরা মেয়ের জটিল সমস্যা বুঝতে পারলেন না তাই মেয়েকে ভরসা দিয়ে বললেন
_”একবার বলেই দেখ।মা তোকে best সমাধান দিবে!”
নুবা একটু সময় নিলো।পরপর ভাঙ্গা কন্ঠে বলে উঠলো
_”তুমি ঠিকি বলেছিলে মা, তোমার কথাই খেটে গেলো।আসলছ আমি কখনোই উনার মনের মতো হতে পারিনি।উনি আজ নিজের মুখে বলেছেন যে,,,
নুবা থেমে গেলো,হাজেরার দিকে ছলছল চোখে তাকালো।পরপর মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে উঠে বললো
_”উনি আমাকে দিয়ে satisfied না মা।উনির হয়তোবা আরো বেটার অপশন দরকার।আমি কখনোই উনার মনের মতো হতে পারিনি।এবারো আমি ভুল মানুষকেই বেছে নিয়েছি।আমি এবারো ভুল প্রমানিত হলাম। আমার কপালটাই খারাপ।”
বলতে বলতে নুবা হিচকি তুলে কাঁদতে লাগলো।মেয়ের কথা শুনে হাজেরা স্তব হয়ে গেলো। পরপর মেয়েকে শান্তনা দেওয়ার বদলে কিছুটা রেগে উঠে বললো
_’আমি তোকে আগেই বলেছিলাম ওই ছেলে সুবিধার না।এখন বুঝলি তো । তখন একবার যদি আমার কথা শুনতি তবে আজ এই দিন দেখতে হতো না।”
মায়ের কথায় নুবা আরো ভেঙ্গে পড়লো।যেনো তার মা তার কষ্ট টুকু বুঝেও না বুঝার ভ্যান ধরলো।নুবা হাঁসফাঁস করে উঠলো।এক হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে কম্পিত কন্ঠে বললো
_’সেটাই আফসোস,কেনো শুনলাম না তোমার কথা। অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি।তাই আজ এই দশা।থাক ভালোই হয়েছে। আমার মতো মেয়ের সাথে এমনি হওয়া উচিত,তাই না মা।”
মেয়ের কথায় হাজেরার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে নুবাকে জরিয়ে ধরে শান্তনা দিয়ে বললো
_”চুপ কর,চলে আসবে।রাগ পড়ে গেলেই চলে আসবে।”
নুবা মায়ের ভরসা পেয়ে আরো কেঁদে উঠলো।হাজেরা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে লাগলো,পরপর বলে উঠলো
_”আমি জানি না যে আসলে তোদের ভিতরে কেনো ঝামেলা হয়েছে।তবে আশা রাখছি সব ঠিক হয়ে যাবে। ধৈর্য ধর, শান্ত হ।”
নুবা তার মা’কে জরিয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে বললো
_”আমারি দোষ ছিলো মা,আমি উনাকে কিছুই দিতে পারিনি।উনি শুধু আশা করেছেন আমার থেকে আর আমি তাকে খালি হাতেই ফিরিয়ে দিয়েছি। আমার সাথে এরকমি হওয়া উচিত। একদম ঠিক হয়েছে। আমার মতো মেয়ে আয়রার পাপাকে ডিজার্ভ করে না।আয়রা আরো ভালো মা ডিজার্ভ করে।আমি আসলেই উনার যোগ্য না।”
বলতে বলতে নুবা আরো ভেঙ্গে পড়লো।হাজেরাকে মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে ভরসা দিলেন যে সব ঠিক হয়ে যাবে।
সময় অনেকটাই পার হয়েছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।তবে আরহাম এখনো ফিরেনি।নুবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।পাশেই ইশিতা,আমিনা,হাজেরা আর তানিয়া ,রোজি বসে আছে।তারা সবাই চিন্তিত।ইতি মধ্যেই আরহাম আর নুবার যে ঝামেলা হয়েছে তা সবাই জেনেছে।
এদিকে সন্ধ্যা পাড় হয়ে যাচ্ছে তবে আরহামের বাড়ি ফেরার কনো খবর নেই।নুবার ভিতরটা পুরে যাচ্ছে।সেই দুপুর পর থেকে আয়রাকে দেখেনি।মেয়েটা কি খেয়েছে,আদেও কি খেয়েছে কিনা? কে জানে?
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নুবার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললেন
_”কি দরকার ছিলো ঝগড়া করার? একজন বকলে আর একজন চুপ থাকলেই সব সমাধান হয়ে যায়।তা না দুইজন একসাথে গলা বাজিয়ে গন্ডগোল করতে হবে।”
এদিকে ইশিতা আবার পুরো নুবার পক্ষে। কারণ সে জানে যে এই বাড়ির ছেলেরা কোন ধাঁচের। অনুমান করেছে সে। নিশ্চয় আরহামের কারনেই ঝগড়াটা বেঁধেছে হয়তোবা।তাই ইশিতা নুবার পক্ষ নিয়ে বললো
_”এক হাতে তো আর তালি বাজে না মা। নিশ্চয় দুজনেরি দোষ আছে। সেখানে একজন মুখ বুজে কেন সহ্য করবে?”
_”আমি তো সেটা বলিনি ঈশিতা। সবকিছু একটা সমাধান আছে।আমি শুধু বলেছি একজন চুপ থাকলেই ঝগড়াটা লাগে না।”
ইশিতা আর কিছু বললো না।আমিনা বেগম নুবাকে বুঝিয়ে বললেন
_”স্বামী স্ত্রীর ভিতরে টুকটাক বিষয় নিয়ে একটু গন্ডগোল হয়।তবে ঘড়ের লক্ষীই পাশে সব ঝামেলা শেষ করতে।তাই নিজেকে একটু নিয়ন্ত্রণ রাখলেই সংসারে শান্তি থাকে।”
নুবা সবটা শুনলো।তবে তার বলতে ইচ্ছে করলো
_”তোমার ছেলেকে বোঝালেও কতো বুঝার মানুষ। সবসময় উল্টা টানবে।”
আরো কিছুটা সময় যেতেই,নুবা নিজের রাগ অভিমান পাশে রেখে কম্পিত হাতে আরহামের নাম্বারে কল দিলো।তবে খচ্চর আরহাম ফোন রিসিভ করার বদলে কেটে দিলো।এতে করে নুবার আরো রাগ উঠে গেলো তবু সে ধৈর্য সহকারে ২/৩ বার কল দিলো।তবে প্রতিবারি আরহাম একি কাজ করলো।
এবার নুবা বেশ রেগে গেলো,পরপর সবার দিকে তাকিয়ে বললো
_”দেখলে তো,বারবার কেটে দিচ্ছে।এখন বলো আমি কি চেষ্টা করছি না।যদি আমার কথাই না শুনে তবে আমি কি করবো? সবসময় এমন করে!”
বলেই নুবা মোবাইল সোফায় ছুড়ে মেরে নাক টানলো।আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন পরপর বলে উঠলেন
_”আমি দেখছি, দাঁড়া।”
বলেই তিনি রুম থেকে নিজের মোবাইল নিয়ে আসলেন।পরপর ২/৩ বার রিং হতেই আরহাম কল রিসিভ করলো।আমিনা বেগম বেশ শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলেন
_”কোথায় তুই?”
আরহাম কিছু সময় চুপ থেকে শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো
_”airport’এ ।”
কথাটা শুনে আমিনা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলো,কিছুটা চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”ওখানে কি করছিস তুই?”
_”আমি চলে যাচ্ছি। কিছু সময় পড়েই আমার ফ্লাইট,সবাই ভালো থেকো। আমার জন্য আর কারো অশান্তি পোহাতে হবে না।”
ছেলের কথায় আমিনা বেগম কিছুটা চেঁচিয়ে উঠে বললেন
_”পাগল হয়েছিস তুই,মেয়েটা এখানে সেই দুপুর থেকে কাঁদেই চলেছে।আর তুই নাটক শুরু করেছিস। চুপচাপ বাড়িতে আয়।”
আরহাম মায়ের কথায়,একটু সময় নিয়ে উত্তর দিলো।গলা ছেড়ে কেশে কাঠকাঠ কন্ঠে বললো
_”আমি আর আসবো না। রাখলাম।”
কথা টুকু বলতে দেরি।নুবা ছো মেরে আমিনা বেগমের হাত থেকে মোবাইল টা নিয়ে নিলো পরপর ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”বাসায় আসুন।”
আরহাম নুবার কন্ঠ শুনে একটু চম্কে উঠলো তবু একটু অভিমান নিয়ে বললো
_”না আসবো না।”
_”দেখুন বাসায় আসুন আরুর আব্বু।মেয়েকে নিয়ে বাসায় আসুন।তার পর যা ইচ্ছা তাই করুন।তাও বাসায় আসুন।”
আরহাম এক কল কোলে থাকা আয়রার দিকে তাকিয়ে।বিরবির করে বললো
_”তুমি তো বলেছিলে চলে গেলে খুশি হবে। তুমি আমাদের ছাড়া থাকতে পারবে।তাই চলে যাচ্ছি ভালো থাকো।”
নুবা হাঁসফাঁস করে উঠলো, কান্না করতে করতে বললো
_”আমি রাগের মাথায় বলে ফেলেছিলাম, please বাসায় আসুন।”
এতো বলার পড়েও আরহাম বলে উঠলো
_”না ”
নুবা বারবার বাসায় আসার কথা বলতে লাগলো তবে আরহাম বারবরা না করতে লাগলো এই দেখে আমিনা বেগম প্রচন্ড রেগে গেলেন ছেলের বাচ্চামোতে।নুবার থেকে মোবাইল নিয়ে কিছুটা কর্কশ কন্ঠে বললেন
_”নতুন করে তামাশা করবি না বলে দিলাম।”
_”আমি কোনো তামাশা করছি না।নুবাই আমাকে চলে যেতে বলেছে।ও আমায় ব্যাতীত ভালো থাকে।তাই ও ভালোই থাকুক।”
এদিকে আরহামের কথা শুনে নরম নুবা মূহুর্তেই গড়ম হয়ে গেলো।এতো বুঝানোর পড়েও একি কথা বারবার বলছে, এতো সময় ঠান্ডা মাথায় কথা বললেও এবার চুপ থাকতে পারলো না নুবা। একদম গিন্নিদের মতো কেটকেট করে বললো
_”তুই জাহান্নামের চৌ-রাস্তায় যা, কিন্তু আমার মেয়েকে আমার কাছে দিয়ে যা।না হলে airport এ এসে আমি তোকে কবর দিবো।আর আমার মেয়ে যদি তোর টানা হেচরার কারনে অসুস্থ হয়ে পড়ে না! তবে তোর খবর আছে জানোয়ারের বাচ্চা। জানোয়ার কোথাকার আমাকে বুঝতেই পারলো না।ওর কাছে আমার কোনো মূল্যোই নেই।কুকুরের মত বলছি তাও তার তেজ দেখো।”
নুবার কথা সবার কর্ণপাত হতেই,আমিনা বেগম ভুরু কুঁচকে বললো
_”তুই মাঝখানে আমাদের টানছিস কেন। লাস্টে বাচ্চা না লাগাতেও পারতি,মা?”
মেয়ের গালি শুনে হাজেরা একটু রেগে গেলেন আর বললেন
_”স্বামীর সাথে কেউ এভাবে কথা বলে নুবা? দিন দিন অভদ্র হয়ে যাচ্ছিস!”
নুবা রাগে হাঁসফাঁস করে বলে উঠলো
_”ও এটারি যোগ্য।এর থেকে ভালো ভাষা ও ডিজার্ভ করে না।”
অন্য পাশে সবটাই শুনলো আরহাম।নুবার চেচানি শুনে নিজেও কাঠকাঠ কন্ঠে বলে উঠলো
_”মেয়ে আমার,আমি কোনো উকটো ঝামেলা ওর উপর রেখে যেতে চাই না।তাই নিয়ে যাচ্ছি।আর আসবো না তবে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবো। তাই নুবাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিও।”
আরহামের কথায় নুবা অনেকটা রেগে গেলো চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”তুই ১০০ একটা বিয়ে কর।মর তুই, আমার বিয়ে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না।আমি ১ টা করি নাকি ১০০ টা সেটা আমারটা আমিই বুঝে নিবো।”
আরহাম নুবার কথায় আরো তেতে উঠে বললো
_” ডিভোর্সের কথা তুই’ই আগে বলেছিলি তাই মুখটা বন্ধ রাখ তোর। একদম রাগাবি না আমাকে।না হলে এসে তুলে একটা আছার মারবো।”
_”তোর সাহস থাকলে আয় তুই।দেখবো কে কাকে আছার মারে।”
ক্রমাগত নুবা আর আরহামের ঝগড়া বাড়তেই লাগলো।আমিনা বেগম ছেলেকে বুঝিয়ে বললেন
_”আগে বাসায় আয়। তোদের এই ঝগড়া আর ভালো লাগছে না।”
আরহাম ঘাড় ত্যারমো করে বললো
_”আমি আসবো না। ফ্লাইটের টাইম হয়ে যাচ্ছে। রাখলাম।”
আরহামের এই কথা শুনে নুবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। আমিনা বেগমের হাত থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”তুই এক্ষনি মেয়েকে নিয়ে বাসায় আসবি।আর যদি না আছিস তবে এসে আমার মরা মুখ দেখবি।আসবি মানে আসবি।না আসলে আমি গলায় ফাঁসি দিবো বলে দিলাম।”
আরহাম খট করে কলটা কেটে দিলো।নুবা ফুঁপিয়ে উঠলো।আমিনা বেগম বিরক্তি নিয়ে বললো
_”এই সব কিরকম কথা নুবা।”
নুবা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো
_”যা বলেছি ঠিক বলেছি।”
হাজেরা বেগম এবার বেশ রেগে বললেন
_”হ্যাঁ,মর,মরলে তো বুক আমার খালি হবে।ওর আর কি,আবার বিয়ে করে ১০০ টা বউ পাবে। কিন্তু আমার মেয়েটা তো আমি হারাবো।”
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন
_”আবার তুমি কি শুরু করলে হাজেরা। তোমাদের জ্বালায় পাগল হয়ে যাবো।”
হাজের বেশ তেতে উঠে বললেন
_”তা কি বলবো আপা।এখন মনে হচ্ছে যে সবটাই আমার মেয়ের দোষ।মনে হচ্ছে পাপ করেছে ও আপনার ছেলেকে বিয়ে করে।না দাই ঠেকেছে? একটু বলবেন?ওখান থেকে বসে বসে বলছে ‘আমার মেয়ে আমার মেয়ে’,যদি তারি মেয়ে হয় তবে আমার মেয়ের কাছে রাখার তো দরকার ছিলো। আমার মেয়েটার তো কষ্ট করে ওকে পালার দরকার ছিলো না।আসলে সৎ সৎতি থাকে।”
আমিনা বেগম হাজেরার কথায় একটু রেগে বললেন
_”দেখো একদম উল্টা পাল্টা কথা বলবে না। ওদের বিষয় ওদের বুঝতে দেও। শুধু শুধু কথা বাড়িয়ে লাভ আছে।”
_”আমি কথা বাড়াচ্ছি আপা। আপনার তো ছেলে মেয়ের অভার নেই। কিন্তু আমার তো একটাই মেয়ে।আসলে আপনি কি করে বুঝবেন আমার কষ্ট। আপনার মেয়ে তো সুখে আছে তাই বুঝতে পারছেন না।”
আমিনা বেগমের হজম হলো না কথাটুকু,কেম কর্কশ কন্ঠে বললেন
_”তা তোমার কি মনে হচ্ছে, তোমার মেয়ে সুখে নেই। আমার ছেলে তাকে অসুখে রাখছে। এই যে এতো বড় আয়োজন করে অনুষ্ঠান করছে।কার জন্য করছে তোমার মেয়ের জান্যই তো নাকি? না হলে আমার ছেলের তো সখ হয়েছে উজন টাকা খরচ করে এই সব করার।”
হাজেরাও কি কম যায় নাকি সেও চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”তা কে বলেছে এই সব করতে। আমার মেয়ে বলেছে দেখেই যে করতে হবে এমন তো না।আর বিয়েটা কে করেছিলো। আমার মেয়ে কি আপনার ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছি নাকি।সেই তো জোর করেই বিয়েটা করেছে নাকি।না হলে আমার মেয়ের সখ জেগেছে এক বাচ্চার বাপকে বিয়ে করতে।”
_”একদম উল্টা পাল্টা বলবে না হাজেরা। তোমার মেয়ের মত না থাকলে কখনোই আমার ছেলে জোর করতো না। শুধু শুধু অতীতের কথা টেনে হিচরে লাম্বা করছো তুমি।”
এক দু কথায় হাজেরা আর আমিনার ভিতরে ঝগড়া লেগে গেলো।হাজেরার সহ্য হচ্ছে না মেয়ের কান্না এদিকে আমিনারো সহ্য হচ্ছে না তার ছেলে চলে যাচ্ছে।সব মিলিয়ে একদম জগাখিচুড়ী পাকিয়ে গেলো।
ইশিতা এগিয়ে এসে বললো
_”মা,কি শুরু করলেন আপনারা?”
সবকিছু বিরক্ত লাগলো নুবার কাছে। অসহ্য লাগলো সবার কথা।নুবা সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে বললো
_”তোমরা কি চুপ থাকবে? নাকি আমি কোথাও হাঁটা দিবো।এই জ্বালা যন্ত্রণা তো আর ভালো লাগছে না।”
দুইজন চুপ হলো তবে হাজেরা বিরবরি করে বলে উঠলো
_”আগেই বলেছিলাম আমি,এই বিয়ে করিস না।তবে না, আমার কথা শুনে কে। ভালোবাসা উতলে উতলে পড়ছিলো না।এবার বুঝ ঠেলা।এতো বলার পড়েও তোর কোনো মূল্যে আছে?তোর একটা কথাও শুনলো না।এবার দেখ,আর কি বলবো? বলেও লাভ আছে?”
হাজেরার কথায় আমিনা বেগম অনেক রেগে গেলেন,পরপর আরহামের নাম্বারে কল দিতে দিতে বললেন
_”আজ আসুক ওই জানোয়ারের বাচ্চা। শয়তানের বাচ্চার জন্য কত কথা শুনতে হচ্ছে।যার কথা বলার সাহস ছিলো না সেও এখন কথা শুনাচ্ছে।তাও একবার না বহুবার এই কাজ করেছে ও।আসুক আজ,,জানোয়ার খুঁজে খুঁজে আর মেয়ে পাইনি। জানোয়ারকে ১০০ বার বল্লাম দরকার নেই বিয়ে করার তবু নাটক ওর।বিয়ে করে নাটক করছে।সব নাটক ছুটাবো। শুধু আসুক।”
তবে আরহামের ফোন বন্ধ আসলো। নিশ্চয় ইচ্ছা করে বন্ধ করেছে।নুবা সবটা শুনলো,দেখলো।তার মনে হলো তার জন্যই সবটা হয়েছে।নুবা এক পলক সবার দিকে তাকালো।পরপর উঠে দাঁড়ালো। এদিকে নুবাকে উঠতে দেখে হাজেরা হাত টেনে ধরে বলে উঠলেন
_”কোথায় যাচ্ছিস?”
নুবা ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”হাত ছাড়ো, আমার জামাই সব ঝামেলা।চলে গেলেই ভালো হবে।সবাই শান্তিতে থাকো।”
হাজেরা মেয়ের কথায় বিচলিত হয়ে বললেন
_”এখন চলে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।আর কোথায় যাবি তুই? ওর না হয় যাওয়ার জায়গা আছে।তোর কি কোনো যাওয়ার জায়গা আছে?”
নুবা নাক ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো,আমিনা বেগম নুবার দিকে তাকিয়ে ধমকে বললেন
_”এখন তুই আবার নাটক শুরু করিস না। চুপচাপ বস।এতো জ্বালা আর ভালো লাগে না। জানোয়ারের জন্য আমার জীবনটা ধংস হয়ে গেলো।ও আসার পর থেকে সুখের মুখ আর দেখলাম না।”
নুবা ধমক খেয়ে বসলো তবে নিজে নিজে বিরবির করতে লাগলো
_”কারো কিছু করতে হবে না আমার জন্য,কোনো অনুষ্ঠান করে উজন টাকা খচর করতে হবে না। কিচ্ছু করতে হবে না।সব আমারি দোষ। সবসময় ভুল পথটাই বেছেনি।আমি,আমি কোনো দিনও সঠিক হতে পারলাম না।”
মিনিট খানিকো যেতে পারলো না।তার ভিতরে বাড়ির সদর দরজা ঠেলে আরহাম আয়ারকে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলো।যেখানে সবাই চিন্তিত আর তর্ক তর্কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলো তখনি কারো পায়ের শব্দে সবাই পিছন ফিরে তাকালো।
পিছনে তাকাতেই সবাই অবাক হয়ে গেলো। আরহাম দাঁড়িয়ে আছে।নুবা যেনো পিলে চম্কে উঠলো।আমিনা বেগম ছেলেকে দেখে টের পেলো নিশ্চয় বাড়ির আশেপাশেই বসে এই জাওরামি কাজটা করছিলো।না হলে airport থেকে আসতে অন্ততপক্ষে ২/৩ ঘন্টা লাগবে।
আরহাম মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইলো।এক হাতে আয়রা তার অন্য হাতে কিছু সংখ্যক শপিং ব্যাগ।সবাই উঠে দাঁড়ালো।আমিনা বেগম এগিয়ে যেয়ে হতভম্ব হয়ে বললো
_”তুই কি উড়ে উড়ে আসলি?”
আরহাম আমিনা বেগমের দিকে শপিং ব্যাগ গুলো এগিয়ে দিলো।আমিনা বেগম ভুরু কুঁচকে সুধালো
_”এগুলো কি?”
আরহাম কোনো কথাই বললো না,মায়ের হাতে শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিলো। এদিকে সবাই এগিয়ে আসলো।নুবা ছুটে এসে আগে আয়ারকে কোলে টেনে নিলো। এদিকে আয়রা চকলেট খাচ্ছিলো।দুই হাত মাখা তার , ছোট্ট ছোট্ট আঙ্গুল দিয়ে সব চকলেট ঘেটে ড্রেসে আর মুখে লাগিয়েছে।এক বেলা বাপের কাছে থেকেই কি অবস্থা হয়েছে।না গোসল দারি না পয়-পরিষ্কার।নুবা আয়ারকে কোলে নিয়ে পাগলের মতো চুমু খেলো।আয়রা নুবাকে দেখে মুখ দিয়ে “মা,মা” ডাকলো।নুবার ঠোঁট দুটো তিরতির করে কেঁপে উঠলো। দুপুরের তাদের ছাড়া বাঁচতে পারবে বলা নুবা এক বেলায় তাদের ছাড়া নুইয়ে পড়েছে।
মেয়েকে বুকে জরিয়ে নিয়ে আরহামের দিকে তকালো নুবা। আরহাম কেমন করে একবার তার দিকে তাকিয়ে উপরের দিকে চলে যেতে লাগলো। এদিকে নুবার কি হলো কে জানে। কাউকে তুয়াক্তা না করেই আয়ারকে নিয়ে ছুটে যেয়ে আরহামকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে পিঠে মুখ গুঁজে দিলো।এক হাত পিছন থেকে সামনের দিকে দিয়ে আরহামের বুকে হাত চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।পরপর বিরবির করে বললো
_”আররুর আব্বু,আমি না sorry। আমি আর কক্ষনো এরকম করবো না।”
নুবা বলতে বলতে আরহামের বুক খামচে ধরলো। এদিকে আমিনা বেগম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।সাথে হাজেরাও।একটু আগে তারা এদের দুইজনকে নিয়ে ঝগড়া করলো আর এখন দেখো দুইজন কি সুন্দর সবার সামনে জরাজরি করছে।আসলে অন্ততপক্ষে স্বামী স্ত্রীর ভিতরে নাক গলাতে নেই। অতঃপর তারা মিলে যায়, মাঝখানে যারা কথা বলে তারাই খারাপ হয়ে যায়।
আরহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নুবার হাত টুকু নিজের থেকে ছাড়িয়ে দিলো,পরপর গটগট করে সিরি বেয়ে উপরের দিকে চলে গেলো।নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চাঁপা নিঃশ্বাস ফেললো।
ইশিতা এগিয়ে এসে বিরবির করে বললো
_”ভাইয়া মনে হয় বাড়ির আশে পাশেই ছিলো। শুধু কলে হয়তোবা”আসবে না,আসবে না “করছিলো।”
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শপিং ব্যাগ খুলে দেখতে লাগলো,দেখা গেলো আয়রার কিছু ড্রেস সাথে একটা box যার উপরে নুবার নাম লেখা।
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। নিশ্চয় বাড়িতে ঝগড়া লাগিয়ে তার বজ্জাত ছেলে, আয়রাকে নিয়ে পুরো মার্কেট ঘেঁটে এসেছে ।বাড়ির সামনে এসেই নাটক করেছে airport এ বসে আছে।
নুবা আমিনা বেগমের কথায় মাথা নিচু করে নিলো পরপর লজ্জিত বোধ করলো সে।আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন
_”সংসার জীবনে টুকটাক লেগেই থাকে।তাই বলে রাগের মাথায় এমন কিছু বলতে নেই যা কখনোই সুধরানো যায় না।এই যে ডিভোর্সের কথা বললি।এটা কি ঠিক?”
নুবা নাক টেনে বিরবির করে বলে উঠলো
_”তোমার ছেলে যে উল্টা পাল্টা বলেছে তখন?”
_”পুরুষ মানুষ একটু এরকম হয়।তাই বলে তাদের সাথে তর্কে জড়াতে নেই।যখন রাগারাগি হবে তখন চুপচাপ রুম থেকে বেড় হয়ে গেলেই তো পারিস।একটু পরে রাগ পড়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যায়,তবে তোরা কি আর সেই মানুষ।তোরা দুটোই ঘ্যাড়ত্যারা।”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে আমিনা বেগমের কথা বুঝতে চাইলো।আমিনা বেগম কিছু সময় নুবার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে বললেন
_”ঝগড়াটা লেগেছিলো কি নিয়ে?যে এতো দূর পর্যন্ত গেলো?”
নুবা ফ্যালফ্যাল করে আমিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে আবারো মাথা নিচু করে নিলো পরপর বলে উঠলো
_”বলতেই হবে।খুবি লজ্জাজনক ব্যপারে!”
_”তাহলে এই সব ব্যপার আমাদের কান পর্যন্ত কেনো আসবে? এটা কি তোর কর্তব্য না যে নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয় বিষয় নিজেদের ভিতরে রেখে দেওয়া?”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে বিরবির করে বললো
_”হুম,আর এরকম হবে না।”
_”আচ্ছা,এখন রুমে যা, দ্বিতীয় বার যাতে চিল্লাচিল্লি না হয়। চুপচাপ সবটা ঝামেলা নিজ দায়িত্বে মিটিয়ে নিবি।দুটো কথা বললেও চুট থাকবি।বুঝলি?”
_”হুম।”
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আয়ারকে নিজের কাছে নিয়ে,নুবার দিকে আরহামের আনা box টা এগিয়ে দিয়ে বললো
_”এটা তোর জন্য এনেছে।দুইজন মিলে কিছুটা সময় একা কাটা তবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নুবা এক পলক মাথা ঝুঁকিয়ে আয়রার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।আর বললো
_”ওকে একটু খাওইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিও।”
_”আচ্ছা।”
নুবা আয়রার গালে চুমু এঁকে, box টা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।পরপর এগিয়ে যেতে নিলো।তখনি আমিনা পিছন থেকে ডেকে উঠলো,নুবা ফিরে তাকালো।আমিনা বেগম এগিয়ে এসে নুবার গালে এক হাত দিয়ে বিরবরি করে বললো
_”পুরুষ মানুষ একটু বেশিই আশা করে,সে যেহেতু তোর স্বামী তাই তার দিকটা বুঝাও তোর দায়িত্ব।আমি জানি আরহাম একটু অগুছালো তবে তুই যদি একটু ওকে বুঝতে শিখিস তবে অবশ্যই ও সুধরে যাবে। বুঝলি?”
নুবা আবারো মাথা ঝুকালো।আমিনা বেগম মুচকি হাসলেন।নুবা আরহামের দেওয়া box নিয়ে একটু আড়ালে এগিয়ে গেলো,পরপর box টা খুলে দেখলো।তার কেমন অনুতপ্ত হতে আরহাকে বকা দিয়ে। কেমন নিজের কাছে নিজেকে ছোটো মনে হচ্ছে।আসলেই সে ভালো কাজ করেনি।সে অনেক খারাপ একটা কাজ করেছে।সে নিজের স্বামীকে বুঝতে পারেনি।
নুবা আফসোস করতে করতে আস্তে আস্তে বক্সটা খুলতে লাগলো।বেশ সময় নিয়ে অবশেষে ঢাকনাটা সরাতেই তার চোখ আটকে গেল ভেতরের জিনিসটার দিকে।বক্সের ভেতর সুন্দর করে রাখা সবুজ রঙের একটা শাড়ি আর তার পাশে ছোট্ট একটা চিঠি।
মুহূর্তেই নুবার বুকটা কেঁপে উঠলো, চোখ দুটো অজান্তেই ছলছল করে উঠল।আঙুলের ডগা দিয়ে শাড়িটা ছুঁয়ে সে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
এত যত্ন করে আরহাম তার জন্য উপহার এনেছে—অথচ সে-ই কিনা রাগ করে মানুষটাকে কতটা কষ্ট দিয়েছে!নিজের আচরণের কথা মনে পড়তেই নুবার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।চোখের কোণ বেয়ে টুপ করে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।
নুবা নাক টেনে চিঠিটা আস্তে করে খুলে দেখতে লাগলো
_নুবা_
তুমি কখনো আমাকে পুরোপুরি বুঝতে পারোনি। আমি হয়তো ঠিকভাবে বোঝাতেও পারিনি।তবে আজকের জন্য আমি অনুতপ্ত, আমার মনে হচ্ছে আমার কারনেই এই সব হলো।অযথা তোমাকে বিরক্ত করা ঠিক হয়নি।তবে আমি সবসময় একটু বেশিই আশা করি। হয়তোবা আমার জন্য সেটা স্বাভাবিক হলেও তোমার জন্য সেটা অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। তোমার ভালো লাগে না।
তবে তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে, তাই তোমাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে, তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তুমি হয়তো আমার সেই চাওয়াগুলোকে অন্যভাবে বুঝে ফেলো।
রাগের মাথায় তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য সত্যিই দুঃখিত। আমার কথাগুলো মনে রেখো না, শুধু মানুষটাকে একবার বোঝার চেষ্টা করো।আর তোমার যদি মনে হয় আমার সাথে সংসার করা সম্ভব নয়,তবে নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারো।আমি ডিভোর্স দিয়ে দিবো। হয়তোবা আমি যা ক্ষতি করেছি তার ভরপায় করতে পারবো না তবে তোমাকে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিতে পারবো। তখন আর তোমার কারো মন মতো চলতে হবে না।আমি জানি তুমি আমার প্রতি বিরক্ত তবু আয়রার জন্য সবটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করবো।আর কখনোই তোমার কাছে যাবো না।
—আরহাম মির্জা—
চিঠির প্রতিটি শব্দ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নুবার বুকটা কেঁপে উঠলো।আরহামের কথাগুলো যেন একেকটা করে তার জমে থাকা অভিমান প্রকাশ করলো।নুবা কতটা ব্যর্থ হয়েছে আরহামকে বুঝতে তা প্রকাশ করলো।আসলে নুবা বিরক্ত প্রকাশ করতে চায়নি তবু কিভাবে যেনো কি হয়ে গেলো।
নুবার চোখের সামনে লেখা অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে এলো চোখের জলে।সে চিঠিটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইলো।মনে পড়ে গেল ঝগড়ার সময় বলা তার নিজের কথাগুলোও।
হঠাৎ করেই নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে লাগলো নুবার।আরহাম তাকে কতটা আপন করে চায়, সেটা যেন আজ নতুন করে বুঝতে পারলো।
ঠোঁট কাঁপিয়ে নুবা আস্তে করে বললো, “আমি আপনাকে এতটা কষ্ট দিতে চাইনি…”তারপর চোখের পানি মুছে আবারও চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইলো।যেনো অনুতপ্তবোধে সে পুরে যাচ্ছে।
নুবা তখন কেনো বুঝতে পারছিলো না এটা আরহামের অধিকার।আর স্বামীকে খুশি রাখা তার দায়িত্ব।তার মন মতো চলা তার কর্তব্য।নুবা সত্যিই বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেনি।নুবা কিছু সময় চুপ করে রইলো,পরপর বুকটা আরো ভারি হয়ে আসলো “ডিভোর্স” শব্দটা মনে পড়তেই।কেনো সে আগ বাড়িয়ে কথাটা বলেছিলো। আরহাম নিশ্চয় প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে।না হলে সবসময় জোর করে বেঁধে রাখতে চাওয়া লোকটা কি করে ডিভোর্সের জন্য রাজি হয়ে গেলো।
নুবা এই সব ভেবে ফুঁপিয়ে উঠলো।তার একদম ঠিক হয়নি আরহামকে নিরাশ করা।নুবা কিছু সময় চুপ থেকে শাড়ির দিকে তাকিয়ে আনমনেই ভাবলো,সে এখন কি করবে।কি করলে এই ঝামেলা শেষ হবে?তার তো আর এই অশান্তি ভালো লাগছে না। কার নজর পড়েছে তার এই সুখের সংসারে সেটাই বুঝতে পারছে না নুবা।
নুবা সবুজ রঙের শাড়িটা পরে হালকা সাজে নিজেকে সাজিয়ে নিল।সাদামাটা সাজেও তাকে আজ ভীষণ মায়াবী আর কোমল লাগছিল।চুলগুলো খোলা রেখে কাঁধের ওপর ছড়িয়ে দিল সে।আয়নায় নিজেকে একবার দেখে ধীর পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেল।হাজেরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।সে চুপ রইলো কারণ স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার ভিতরে সে আসতে চায় না,সে সবসময় চায় তার মেয়ে সুখে থাকুক।
নুবা করিডোর পার করার সময় আমিনা বেগমের সাথে তার দেখা হলো।আমিনা বেগম নুবাকে শাড়িতে দেখে মুচকি হাসলো।টের পেলো এই রাত করে কেনো শাড়ি পড়া হয়েছে।আমিনা বেগম এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বললো
_”যাক ভালো একটা বুদ্ধি পেয়েছিস।তা আজ রাত কি আয়ারকে আমার কাছেই রাখবো?”
শাশুড়ির প্রশ্নে নুবা লজ্জায় নুইয়ে পড়লো।আমিনা বেগম নুবাকে লজ্জা পেতে দেখে আর কিছু বললো না । শুধু মুচকি হেসে প্রশ্ন করলো
_”শাড়িটা,,,,
এতটুকু বলতেই নুবা বুঝে গেলো আমিনা বেগম কি বলবে তাই মাথা নিচু করে সুধালো
_”তোমার ছেলে দিয়েছে।”
আমিনা বেগম নুবার মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে বললেন।
নুবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।বুকটা ধুকপুক করছে তার।এখন রুমে গেলে কি হবে কে জানে। আরহাম যদি এখনো রেগে থাকে তবে? যদি সবকিছু ঠিক না হয়। আরহাম যদি তাকে ছেড়ে দেয়। আজগুবি কথা ভাবতে ভাবতে নুবা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো।ভিতরে ঢুকে আশে পাশে চোখ বুলাতেই চোখ আটকে গেল আরহামের দিকে।
আরহাম সোফায় হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছে, দৃষ্টি যেন শূন্যে স্থির।নুবা আরহামকে দেখে শুকনো ঢোক গিললো।তখন কি না কি বলে গালি দিলো।এখঞ যদি তা নিয়ে জেরা করে তবে?, তবে কি বলবে নুবা। নিশ্চয় নিজের কর্ম কান্ডের জন্য লজ্জা নয় মরে যাবে।নুবা দরজা লাগিয়ে দিলো।তানিয়া এসে রুম পরিষ্কার করেছে। তবে অনেক কিছুই রুম থেকে বেড় করতে হয়েছে ভেঙ্গে যাওয়ার কারনে। ড্রেসিং টেবিলেও নতুন কাঁচ লাগাতে হবে।ওটা ওভাবেই পড়ে আছে।
অনেকটা সময় নুবা দাঁড়িয়ে রইলো তবে সামনে যাওয়ার সাহস পেলো না।তাই রুমের ভিতরে ঘুরপাক খেতে লাগলো।নুবার পায়ের শব্দ পেয়েও আরহাম সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকালো না।কিছুক্ষণ নুবা নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো, অথচ ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু এক হাসি।
অনেকটা সময় পর ,নুবা শাড়ির আঁচল হাতের আঙ্গুলে গুঁজে সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো। তবে নুবাকে এগিয়ে আসতে দেখে আরহাম সোফা থেকে উঠে সরে গেলো।আরহামকে সরে যেতে দেখে নুবার বুকটা ধুক করে উঠলো।তার এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো সে নিজের সবটা হারিয়ে ফেলে নিজের ভুলের কারণে।
আরহাম সোফা থেকে উঠে যেয়ে বিছানায় বসে পড়লো।পড়নে তার টাওজার আর গেঞ্জি।মুখ ভর্তি শূন্যতা তার।নুবার মুখ দিয়ে ডিভোর্স শব্দটা শুনে আরহাম প্রচন্ড আহত হয়েছে। আরহাম টের পেয়েছে,সে এতোটাই বিরক্তিকর যে নুবাও তাকে ছেড়ে দিতে চাইছে।এর থেকে ভালো নুবার অপছন্দের জিনিস গুলো নাই করলো।
নুবা শুকনো মুখে এক পলক আরহামের দিকে তাকিয়ে,বেশ সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলো।তবে ভিতরে ভিতরে লজ্জা লাগছে তার কারণ তখন আরহামকে কি না কি বললো। আরহাম নিশ্চয় সবটা শুনেছে।
নুবা শুকনো ঢোক গিলে আস্তে করে যেয়ে আরহামের পাশে বসলো তবে একটু দূরেই, কারণ মাথা গড়ম থাকলে যদি একটা উষ্টা দেয়।তখন?
নুবা পাশে বসতে দেখেই আরহাম তেমন কিছু বললো না।নুবা আর চোখে একবার আরহামের দিকে তাকালো।পরপর সবটা সমাধান করতে নিজেই উদ্যোগ নিলো। আস্তে করে কম্পিত হাতটা আরহামের বিছানায় রাখা হাতের উপর রাখলো।
আরহাম হাত সরিয়ে নিতে চাইলো।তবে নুবা আরহামের হাতটা শক্ত করে বিছানায় চেপে ধরে চোখ মুখ খিচে ভাঙ্গা কন্ঠে বলে উঠলো
_”আমি কি অনেক বড় ভুল করেছি? আচ্ছা আমার নিজের দোষটা স্বীকার করলাম।তবে আমি কখনোই বলিনি যে আমি আপনাকে ছেড়ে দিবো বা আমি__
কথা শেষ হওয়ার আগেই আর নিজের হাতটা আরহামের কাছ থেকে সরিয়ে নিলো পরপর বিরবির করে বললো
_”আমি জানোয়ারের বাচ্চা?”
নুবা যেই ভয়টা পাচ্ছিলো সেটাই হলো।নুবা নিজের কথায় নিজেই লজ্জিত হলো।চোখ মুখ খিচে শুকনো ঢোক গিলে বললো
_”sorry,আমি বুঝতে পারিনি।রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।আপনি বারবার ‘আসবেন না ,আসবেন না
বলছিলেন ‘ তাই আমি একটু,,”
আরহাম উঠে দাঁড়ালো বিছানা থেকে পরপর বিরবির করে বললো
_”চুপ করো ,কোনো কিছুই শুনতে ইচ্ছে করছে না।”
বলেই আরহাম গটগট করে বারান্দার চলে গেলো ।নুবা ছলছল চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর অনেকটা সময় কেটে গেলো।নুবা বিছানায় বসে নিজের আঙ্গুল নিজে খুঁটতে লাগলো।তাহলে কি এখান থেকেই তাদের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরবে।নুবার নিজের কপাল চাপড়ে ইচ্ছে করলো।সবটা তার দোষ। অতিরিক্ত করে ফেলেছে সে!”
নুবা নিজেকে দোষারোপ করতে করতে শান্ত দৃষ্টিতে আশে পাশে তাকালো।পরপর নজরে পড়লো ড্রেসিং টেবিলের ভাঙ্গা কাঁচ কেমন ঝুঁলে আছে।মনে হচ্ছে একটু নাড়া দিলেই নিচে পড়ে বড় একটা বিপদ ঘটবে।নুবার হঠাৎ করেই আয়রার কথা মনে পড়লো।আয়রা তো ড্রেসিং টেবিলের সামনে যেয়ে এক এক কিছু ধরে তান যদি ভুলক্রমে আয়নাটা নিচে পড়ে গেলো তখন?
নুবা কথাটা চিন্তা করে বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো।পরপর আলতো হাতে ভাঙ্গা কাঁচটুকু খুলে ফেলার চেষ্টা করলো। তবে কাঁচ খুলার বদলে আরো এঁটে রইলো।নুবা চোখ মুখ কুঁচকে একটু জোরে টান দেওয়ায় চেষ্টা করলো, হঠাৎ করেই সেই কাঁচে লেগে নুবা অনামিকা আঙ্গুল কিছুটা কেটে রক্ত বেড় হয়ে আসলো।নুবা হালকা ব্যায়াম মৃদু শব্দ করে উঠলো।
_”ahhh”
তবে বিরক্ত হলো সে নিজের কাজেই।কেন যে পাকামি করে এখানে এসেছিলো। এদিকে নুবার মৃদু আর্তনাদো আরামের কাছে পৌঁছে গেলো। হঠাৎ করেই নিরবতায় ভিতরে নুবার আর্তনাদ। শুনে,না চাইতেও আরহাম এগিয়ে আসলো। কারণ নুবা তখন “মরে যাবো, ফাঁসি দিবো”আরো কত কি বলছিলো।সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়েই আরহাম ছুটে আসলো।
রুমে এসেই দেখলো নুবা এক হাত দিয়ে অন্য হাতের এক আঙ্গুল চেপে ধরে বেশ মনোযোগ দিয়ে তাকি আছে। আরহাম এগিয়ে যেয়ে নুবার হাতটা টেনে নিজের কাছে নিলো। হঠাৎ করে এমন হওয়ায় নুবা চম্কে উঠে আরহামের দিকে তাকালো। আরহাম নুবার কাঁটা আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বিচলিত কন্ঠে বললো
_”কি করে কাটলো?”
নুবা মাথা নিচু করে নিলো,পরপর বিরবির করে বললো
_”এমনি,আয়নায় লেগে।”
আরহাম চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে নুবার অনামিকা আঙ্গুল মুখে পুরে নিলো।আরহামের কান্ডে নুবার শরীর কম্পিত হলো। পরপর কেমন গা গুলিয়ে আসলো তার।সে বুঝতে পারলো না,এই লোক রক্ত খাওয়া শুরু করেছে নাকি? কেমন অদ্ভুত লাগলো নুবার কাছে।তবে আরহামের জিহ্বার গড়ম স্পর্শে নুবার ব্যথা কিছুটা কমে আসলো।মেজিকের মতো ব্যথা গায়েব হয়ে গেলো।নুবা প্রচন্ড অবাক হলো।
আরহাম নুবার আঙ্গুল মুখ থেকে বেড় করে নুবার শুকনো মুখের দিকে তাকালো।আরহামকে তার দিকে তাকাতেই দেখেই,নুবা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।নিচু কন্ঠে বলে উঠলো
_”sorry, আমার ভুল হয়ে গেছে।আমি রা কক্ষনো এরকম করবো না।আমি promise করছি আমি আর কখনোই ঝাড়ি মারবো না।কক্ষনো না।”
আরহাম নুবার হাত ছেড়ে দিলো পরপর কেমন ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”আমি তোমাকে অনেক বিরক্ত করি তাই না।তাই তুমিও আমাকে ছেড়ে দিতে চাও। ডিভোর্স শব্দটা উচ্চারণ করেছো।আগে জানলে আমি কখনোই তোমাকে নিজের সাথে জড়াতাম না।”
নুবা মাথা নিচু করে হিচকি তুলে কেঁদে উঠলো পরপর কম্পিত দুই হাতে আরহামের এক হাত শক্ত করে চেপে ধরে অনুনয় করে বললো
_”আমি রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।আমি শুধু তর্কে জিততে চাইছিলাম।আমি সত্যিই একদম ঠিক করিনি।আমি আমার কাজের জন্য অনুতপ্ত।তবে আমার দ্বিতীয় বার সুযোগ দেওয়া হোক।আমি আর কক্ষনো আয়রার পাপার মুখে মুখে তর্ক করবো না।কক্ষনো না। একটুও জেদ দেখাবো না।”
এবার নুবার কান্না দেখ আরহাম আর নিজেকে আঁটকে রাখতে পারলো না।এখন দুইজনেরি মাথা বেশ ঠান্ডা তাই আরহাম নিজের সবটা রাগ বিসর্জন দিয়ে নুবাকে শক্ত করে বুকের সাথে জরিয়ে নিলো।নুবা আবাক হলো, কারণ সে ভাবতেও পারেনি আরহাম এতো তাড়াতাড়ি সবটা ভুলে যাবে।তবে সে জানে ক্ষমা একটি মহৎ গুণ।
আরহাম নুবাকে দুই হাত দিয়ে জাপ্টে ধরে নুবার মাথায় চুমু খেলো,পরপর নুবার পিঠে হাত বুলিয়ে বললো
_”তুই আমাকে ছেড়ে গেলে মরেই যাবোরে নুবু।তবে তুই ভাবিস না তুই আমাকে ছেড়ে যেতে চাইলেই ছেড়ে দিবো।মেরে ফেলবো তবু তোকে ছেড়ে যেতে দিবো না। প্রথমে তোকে মারবো তার পর নিজে মরবো।”
নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ১৭
নুবা আরহামের কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠলো।বহু দিন পর আরহামকে আগের ন্যায় কথা বলতে দেখে একটু অবাক হলো নুবা, কারণ অনেক মাস হয়েছে সে এরকম পাগলামো কথাবর্তা শুনে না।
নুবা দুই হাত দিয়ে আরহামের পিঠ আঁকড়ে ধরে বিরবির করে বললো
