লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৫
নুসাইবা আরা নুরি
সিয়াম বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তোহা সবাইকে জানানোর অনেক চেষ্টা করেছে তবে পারেনি।সব শেষ এ সিম থেকে মেহেরাজের নাম্বারে ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে ছোট করে লিখে দিয়েছে তাদের বিপদের কথা।তারপর মেহেরাজের নাম্বার ডিলেট করে দিয়েছে নিজের মোবাইল থেকে।
কাল সারারাত তোহার ঘুম হয়নি।সকালে গোসল করে শাশুড়ীর সাথে কাজে লেগে গেছে।এদিকে শ্রেয়সীর ও সারা রাত ঘুম হয়নি।সারারাত কেদেছে।কাদার কারনে চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে।ইরু সকাল থেকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে কি হয়েছে তবে শ্রেয়সী কিছু বলতে পারেনি।কারন তার মা ও নিজের কসম কাটিয়েছে যদি সে বলে দেয় আর ওই বাড়ির কেও এই কথা যানে তাহলে তার মায়ের মরা মুখ দেখবে শ্রেয়সী।
শ্রেয়সী আতকে উঠেছিলো মায়ের কথায়।সাথে নিজের উপর তীব্র ঘৃনা আর পরিবারের উপর অভিমান এর পাহাড় জমে গেছে মনে।শ্রেয়সী চাইলেও আর বলতে পারছে না। তার যেনো হাত পা বাধা পড়ে আছে।সে চাইলেও কিছু করতে পারবে না।
শ্রেয়সীর ফর্সা হাত জোড়ায় কনুই এর নিচ অব্দি মেহেদি দেওয়া।লাল টুক্টুক করছে মেহেদির রঙ।লোক কথায় শোনা যায় যার স্বামি যাকে যত বেশি ভালোবাসে তার হাতের মেহেদির রঙ তত বেশি ফুটে উঠে।একটু আগে ইরু ও কথাটা শ্রেয়সী কে বলেছিল।শ্রেয়সীর কষ্টের মাঝেও এক রাশ লজ্জা এসে হানা দিয়েছিলো তখন হৃদয়ে।
শ্রেয়সী কে সাজাতে পার্লার থেকে লোক এসেছিলো যাতে শ্রেয়সী বাইরে গিয়ে কারোর সাথে কিছু বলতে না পারে।সেখানে তোহা শ্রেয়সী। ইরু সবাই সেজে নিয়েছে। সিয়াম আগেই শ্রেয়সী আর তোহার জামা কাপড়ের দুটো ল্যাগেজ বাড়ির পিছনে রেখে এসেছে কারন পরে সবার সামনে ল্যাগেজ বের করতে গেলেও বিপদ।এতে শ্রেয়সী বা তোহা কিছুই বলেনি।তোহা কয়েকবার ফোন চেক করেছে তবে অপর পাশ থেকে কোনো রিপ্লাই আসেনি।তার মানে হয়তো মেহেরাজ সিন করেনি ম্যাসেজ।শ্রেয়সীর পাশা পাশি তোহার মন টাও খারাপ হয়ে যায়।শ্রেয়সী অনেক কষ্টে নিজের চোখের পানি আটকে রেখেছে।বাবা ভাইকে যতটা ভালোবাসতো এখন ততটাই রাগ আর ঘৃনা হচ্ছে তাদের উপর।
দুপুর দেড় টায় জুম্মা নামাজ বাদ মির্জা বাড়ি থেকে সকলে রওনা দেয় শ্রেয়সী দের বাড়ির উদ্দেশ্যে।মেহেরাজের পরনে সাদা সেরোয়ানি।মাথায় বরের টোপর।হাতে রোলেক্স এর ঘড়ি।গলায় একটা ফুলের মালা।দেখতে বেশ লাগছে মেহেরাজ কে।মেহেরাজ যে গাড়িতে বসে আছে সেই গাড়িটা ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো।
মোট দশ টা গাড়ি যাচ্ছে আজ বিয়েতে পর পর।সবার মুখেই স্নিগ্ধ হাসি।মেহেরাজের মুখেও এক রাশ স্নিগ্ধতা।নিজের স্ত্রী নিজের ভালোবাসার মানুষ কে এবার পরিপূর্ণ নিজের কাছে রাখার জন্য আনতে যাচ্ছে।মনে মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে মেহেরাজের।
ধীরে ধীরে গাড়ি ড্রাইভ করে বেশ কিছুক্ষন পর ড্রাইভার গাড়ি এনে থামায় শ্রেয়সীদের বাড়ির সামনে।বিয়ের গেট এর সামনে মেহেরাজের গাড়ি থামতেই চারিদিক থেকে সকলে ঘিরে ধরে।তারপর আলতাফ শেখ এসে গাড়ির দরজা খুলে নিজের জামাইকে গাড়ি থেকে নামায়।
গাড়ি থেকে নেমে মেহেরাজ এগিয়ে যায় বিয়ের গেটের দিকে।সেখানে কনে পক্ষের কাজিন মহল গেট ধরেছে।পুরো দশ হাজার টাকার বিনিময়ে গেট ছাড়বে তার আগে না।এই নিয়েও অনেক মজা ঠাট্টা করার পর পাচ হাজার টাকার মাধ্যমে গেট খুলে দেয় কনে পক্ষের মেয়েরা।
তারপর মেহেরাজকে মিষ্টি মুখ করিয়ে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়।বর এসেছে কথাটা শ্রেয়সীর কানেও যায় তবে এখন আর আনন্দ লাগছে না কান্নায় চোখ ভিজে আসছে।তবুও কাদতে পারছে না।মেহেরাজকে নিয়ে গিয়ে বসানো হয় স্টেজে যেখানে বিয়ে পড়ানো হবে।মেহেরাজ এর পাশে নিলয় মির্জা,, ইভান,, ফাহিম আর মিলি দাড়িয়ে আছে আর বাকি সবাইকে খেতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মেহেরাজ রা আসার পরপরই কাজি ও চলে আসে।কাজি আসতেই নিলয় মির্জার কথায় আলতাফ শেখ শ্রেয়সীকে নিয়ে আসেন।শ্রেয়সীকে নিয়ে এসে মেহেরাজের পাশে বসানো হয়।মেহেরাজ এক পলক তাকায় তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে।মাথা নিচু করে পানি ভরা চোখ নিয়ে বসে আছে।মেহেরাজের একটু খারাপ লাগে শ্রেয়সীর জন্য। প্রতিটা মেয়েকেই বাবার বাড়ি ছাড়তে হয় কিন্তু একেবারে তো যাচ্ছে না সে।
কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করে।যাবতীয় সব লেখালেখি শেষ করে শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে গলা পরিষ্কার করে জোরে বলে,
-দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া সম্পুর্ন পরিশোধ করিয়া হাজিয়ানা মজলিসে সাক্ষিগনের সম্মুখে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক আপনাকে এই বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে। আপনি কি সজ্ঞানে স্ব ইচ্ছায় মোঃ নিলয় মির্জার বড় পুত্র মেহেরাজ মির্জাকে নিজ স্বামি হিসেবে কবুল করছেন।
এটুকু বলে থামে কাজি সাহেব তারপর বলে,
-বলুন বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আলহামদুলিল্লাহ। আমি কবুল করিলাম।
কাজির কথায় শ্রেয়সীর চোখ বেয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে তারপর কোনোদিকে না তাকিয়েই বলে,
-বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।আলহামদুলিল্লাহ।কবুল করিলাম।
শ্রেয়সীর কথা শুনে কাজি বলে,
-আর একবার বলো মা।
-আলহামদুলিল্লাহ কবুল করিলাম।
-আর একবার।
শ্রেয়সী এবার চোখ তুলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মায়ের মুখের দিকে তাকায় তারপর বলে,
-আলহামদুলিল্লাহ কবুল করিলাম।
শ্রেয়সীর বলা শেষ এ সবাই একত্রে আলহামদুলিল্লাহ বলে।কাজি শ্রেয়সীর দিকে একটা রেজিস্ট্রি পেপার এগিয়ে দিলে সেখানে শ্রেয়সী স্বাক্ষর করে দেয়।তখন কাজি মেহেরাজের কাছে আসে তারপর মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
-খালপাড় বাসি মোঃ আলতাফ শেখ এর কন্যা শ্রেয়সী শেখ এর সহিত দশ লক্ষ টাকা দেনমোহরে সম্পুর্ন পরিশোধে সাক্ষিগনের সম্মুখে কাবিন নামার শর্ত সাপেক্ষে আপনাকে শ্রেয়সী শেখ স্বামি হিসাবে কবুল করিয়াছে।আপনি তাহাকে স্ত্রী হিসাবে কবুল করুন।
কথাটা বলে কাজি থামে তারপর আবার বলে,
-বাবা বলো।আলহামদুলিল্লাহ কবুল করিলাম।
কাজি বলার সাথে সাথে সাথেই মেহেরাজ বলে উঠে,
-আলহামদুলিল্লাহ কবুল করিলাম।
মেহেরাজের তাড়াহুড়োয় কাজি হেসে বলে,
-আরেকবার বলো বাবা।
-আলহামদুলিল্লাহ কবুল করিলাম।
-আরেকবার বলো।
-আলহামদুলিল্লাহ কবুল করিলাম।
সবাই আবারো একত্রে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো।নিলয় মির্জা কাবিনের দশ লক্ষ টাকা আলতাফ শেখ এর হাতে তুলে দিলেন সাথে সাথেই।কাজি রেজিস্ট্রি পেপার এগিয়ে দিলে মেহেরাজ ও স্বাক্ষর করে আজীবন এর জন্য এতো গুলো মানুষ কে সাক্ষি রেখে নিজের ভালোবাসাকে আপন করে নিলো।
কাজি মোনাজাত শুরু করলে সবাই মোনাজাত করে।তারপর সবাইকে খেতে বসানো হয়।ইভানের চোখ অনেকবার তোহাকে আজ খুজেছিলো তবে পায়নি।বার বার আশে পাশে তাকিয়েছে তবে আশ পাশেই নেয়।বিশাল এক প্লেটে আস্ত খাশি আর বিরিয়ানি দেওয়া মেহেরাজের সামনে।প্লেটে বিশাল কাতলার মাথা। মেহেরাজের পাশে শ্রেয়সী বসে আছে।শ্রেয়সী কে খাবারে হাত দিতে দেই নি মেহেরাজ নিজ হাতেই গালে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষন পর শ্রেয়সীর এক কাজিন সবাইকে পানির বোতল দিতে এসে শ্রেয়সীর দিকে কিছু একটা ইশারা করতেই শ্রেয়সী কাশতে শুরু করে তা দেখে মেহেরাজ খাওয়া থামিয়ে শ্রেয়সীর মাথায় হাত বুলাতে থাকে।তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তোহা।মিলির সাথে ম্যাচিং করা একটা লেহেঙ্গা পরেছে একই কালার একই সব।মাহি আর ইরুর একই ডিজাইন এর।
ফাহিম বেশ খেয়াল করেছে আজ ইরুকে বেশি সুন্দর লাগছে নতুন করে প্রেমে পড়ার মতো। তবে ইরু যখন খাচ্ছিলো তখন শ্রেয়সীর ভাইয়ের নজর দেখে ফাহিমের বেশ রাগ হয়েছিলো।মনে হচ্ছিলো থাবড়িয়ে মুখের নকশা বদলিয়ে দিতে।তাই মেহেরাজের বিয়ের মাঝেই ইরুর ফোনে টেক্সট করে বলে দিয়েছিলো এখন খাওয়া লাগবেনা উঠে এসো পরে খাবে।ফাহিম জেলাস না তবে পুরুষ দের খারাপ নজর চিনে।আর যতই হোক শ্রেয়সীর ভাইকে ফাহিম এখন পুরোপুরি চিনে তাই আর সহ্য হয়নি।ইরু ও উঠে এসেছিলো তখন বিনা বাক্যে।
তোহা এগিয়ে এসে মেহেরাজের দিকে একবার তাকিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে দূরে তার শশুর তার দিকে তাকিয়ে তাই তাড়াতাড়ি মেহেরাজ কে বলে,
-ভাইয়া ওকে একটু ভিতরে নিয়ে যায় আপনারা খেয়ে নেন।একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
মেহেরাজ বাধা দিতে চায়।তার মনের ভিতর হটাৎ খারাপ লাগা কাজ করে।কেমন যেনো হয়।তবে আর বাধা দেয় না।তোহা শ্রেয়সী কে নিয়ে নিচ য়লার একটা ঘরে ঢুকে যায়।পরপরই ঘরের পিছন দরজা দিয়ে সিয়াম এসে টেনে নিয়ে যায় ওদের।ইভান তোহার আশার থেকে যাওয়া অব্দি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো তবে আজ যেনো কেমন অচেনা ঠেকেছে তোহাকে তার কাছে।কেমন আতংকিত হয়ে আছে তোহা।
ইভানের ভাবনা কাটে মেহেরাজের ফোনের আওয়াজে।তার পকেটে ছিলো মেহেরাজের ফোন এতক্ষন।ইভান বাম হাত দিয়ে কষ্ট করে পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে মেহেরাজের দিকে এগিয়ে দিতেই মেহেরাজের চিন্তিত মুখ আরো চিন্তিত হয়ে যায়।চোখ জোড়া আটকে যায় স্ক্রীনে ক্যাপ্টেন লেখাতে।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৪
সাথে ভ্রু জোড়া ও কুচকে যায়।মেহেরাজ মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,
-আমার বিয়ের দিনই কি প্রতিবার আমার অফিস থেকে ফোন দেওয়া লাগে।এবার ও শালা বাসর টা হবে না।এবার যা হয় হোক বাসর সেরে তাই কাজে ফিরবো।নয়তো বউ আমার অভিমান করবে।
