বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি শেষ পর্ব
Muntaha jahan
৭ বছর পর…
নিজের একমাত্র মেয়ে আনাস্তাসিয়া আইমি চৌধুরীর জন্মদিনে দেশে এসেছে এ্যাশ! আজকে তার আদরের মেয়ের জন্মদিন।
বর্তমানে তারা আছে চৌধুরী বাড়ি! পুরো বাড়িটাই সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে আর তার চার বছরের মেয়ে আইমি সেটা ঘুরে ঘুরে দেখছে।আইমি পুরো বাড়ি চক্কর দিয়ে রান্না ঘরে তার মায়ের কাছে আসলো।তাহা তখন ব্যাস্ত হাতে তার শাশুড়ি সানজিদা চৌধুরীর সাথে রান্নার কাজে ব্যাস্ত।আইমি তাহার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। শাড়ির আঁচল টেনে জিজ্ঞেস করলো,
—”পাপা কোথায় মাম্মা?
তাহা মেয়ের দিকে ঘুরে তাকালো! বললো,
—”বাহিরে কাজ করছে হয়তো।কিসের জন্য খুঁজছ তাকে?
আইমি শাড়ির আঁচল ছেড়ে দিলো।কিছুক্ষণ মায়ের দিকে গোলগাল চোখে তাকিয়ে বললো,
—”ফাইআত ভাইয়া আতবে না?
তাহা ভ্র কুঁচকে তাকালো। পরক্ষণেই হেঁসে ফেললো।মেয়ের গাল টেনে জিজ্ঞেস করলো,
—”এই জন্য বুঝি বাবাকে খুঁজছো?
আইমি উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝালো।তাহা আবারো কাজে ব্যাস্ত হতে হতে বললো,
—”এক জায়গায় চুপ করে গিয়ে বসো।একটু পরই ওরা চলে আসবে।যাও।
আইমি মায়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে বসলো।দরজার দিয়ে চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে রইলো।এরকম করেই আধঘন্টা পেরিয়ে গেলো।
আনাফ চৌধুরী সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে নাতীনিকে সোফায় বসে থাকতে দেখে তার পাশে এসে বসলেন,ওর মতো করেই দরজার দিকে তাকিয়ে আবার ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—”দরজার দিকে এতো মনোযোগ দিয়ে কি দেখো দাদুমনি?
আইমি দাদার কন্ঠ শুনে তার দিকে তাকালো।এক লাফে দাদার কোলে উঠে দাড়িতে হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
—”ওই রাক্ষস ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করছি দাদু।
নাতনীর কথা প্রথমে বুঝলেন না তিনি।কিছুক্ষণ ভাবুক দৃষ্টিতে এই রাক্ষস ভাইয়া কে সেটা বুঝতেই তিনি ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন।দাদাকে হাসতে দেখে দূরে সরে গেলো আইমি।আনাফ চৌধুরী তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
—”মানুষ রাক্ষসের থেকে দূরে থাকে আর তুমি তাী জন্যই অপেক্ষা করছো?
কথাটা বলে আবারো হাসলেন তিনি।আইমি দাদার কথা শুনে কোল থেকে নেমে গেলো।গাল ফুলিয়ে সেখান থেকে চলে ও গেলো।আনাফ চৌধুরী নাতনীর দিকে তাকিয়ে তখনো হাসছেন!
বিকাল হতে না হতেই পুরো চৌধুরী বাড়ি মেহমানে ভরে গেলো।অনেক মেহমানের সাথে চৌধুরী বাড়িতে পা রাখলো খান বাড়ির সকলে ও।
চৌধুরী পরিবারের সবাই তাদের দেখেই ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন।সবাইকে নিয়ে সোফায় বসালেন।নাস্তা পানি দিলেন।
তাদের নাস্তা পানি খেতে খেতেই সেখানে উপস্থিত হলো আইমি।সবাই দিকে একবার তাকিয়ে এগিয়ে গেলো নূরের দিকে।নূরের কোলে চড়ে ওর গালে চুমু দিয়ে বললো,
—”তোমাতে অনেক মিত করেতি ছোট মা।
নূর ও আইমির গালে চুমু দিলো।হেঁসে বললো,
—”আমি ও।
আইমি নূরের কোল থেকেই নূরের ছেলে ফাইয়াজ খান হিয়ানের দিকে তাকালো আড়চোখে।
দূরের সোফায় বসে থেকে সেটা খেয়াল করলেন আনাফ চৌধুরী। তিনি দুষ্ট হেঁসে দুষ্টমী করে বললেন,
—”দাদুমনি এতক্ষণ না রাক্ষস ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করলে? এখন কেনো দূরে তাহলে?এখন তো তোমার রাক্ষস ভাইয়া চলে এসেছে যাও কাছে যাও।
দাদার কথা শুনে তার দিকে তাকালো আইমি।আর ফাইয়াজ ভ্রু কুঁচকে আইমির দিকে তাকালো।রাক্ষস মানে?এই মেয়েটা তাকে এখানে এসেও রাক্ষস বলে ডাকে? ফাইয়াজ কিছু বললো না।গম্ভীর মুখে একবার সবার দিকে তাকালো।সবাই ই মুখ টিপে হাসছে।ফাইয়াজ বিরক্ত হলো তা দেখে।সে বিরক্ত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর চুপ করে সেখান থেকে চলে গেলো।
আইমি তার চলে যাওয়া দেখে মন খারাপ করে নিলো।ফাইয়াজ রাগি অনেক। তার মা বলেছে যারা রাগ করে তারা রাক্ষস। তাই সে ফাইয়াজকে রাক্ষস বলে ডাকে।যদিও ফাইয়াজ তার সাথে কখনো রাগারাগি করে নি,শুধু মাঝে মাঝে গম্ভীর কন্ঠে দুই একটা ধমক দিতো।
তবুও তার ভালো লাগতো ফাইয়াজকে।ছোট থেকেই ওর সাথে একসঙ্গে বড় হয়েছে। ওকে ছাড়া আর কারো সাথে কখনো কথা বলে নি।এতো বছর নূর ইহান আর ফাইয়াজ ও দেশে ছিলো। দেশে আসার পর চলে গেছে খান বাড়ি।যার জন্য ওর সাথে আর কথা,দেখা হয়নি।আর তাই সে অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। এখনই কথা বলতো কিন্তু তার দাদা সব নষ্ট করে দিলো।এখন আর কিছুতেই কথা বলবে না ফাইয়াজ।
আইমি ঠোঁট উল্টে তার দাদার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সন্ধ্যার দিকে সবাই রেডি হতে চলে গেলো।
আরাবী ও তখন রেডি হচ্ছিলো। ফাহাদ তখনই নিজের কাজ শেষ করে রুমে আসলো ।আরাবীকে রেডি হতে দেখে সে ও রেডি হতে চলে গেলো। সাদা পাজামার সাথে মেরুন রঙের একটা পাঞ্জাবি পড়ে আরাবীর দিকে তাকালো।আরাবীর রেডি হওয়া শেষ। বিছানায় বসে এখন সে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। ফাহাদ ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো।আরাবীর ৮ মাসের উচু পেটে চুমু দিয়ে বললো,
—”কষ্ট হচ্ছে?
আরাবীর মৃদু হেঁসে দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। ফাহাদ হেঁসে আবারো ও একটা চুমু বসালো পেটে,তারপর কপালে গালে।
এ্যাশ তাহাকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার এক বছর পর আবার তারা দেশে ফিরেছিলো।যদিও তাহা মাঝে একবার এসে তার অর্নাস ফাইনালের পরিক্ষা দিয়েছিলো।কিন্তু এ্যাশরা আসে নি। এসেছিলো ১ বছর ওর তাও অনাঙ্ক্ষিত একটা ঘটনা ঘরে যাওয়ার কারণে।
এ্যাশরা আমেরিকা যাওয়ার এক বছর পর খবর পায় আয়ান আফরিনের বাড়ি গিয়ে ছিলো বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে। বিয়ের দিন তারিফ ঠিক করার কথা বলেই আয়ানকে তারা সেখানে নিয়েছিলো।নিয়ে ওকে ইচ্ছা মতো মারধর করেছেন তারা।সেটার কারণ জিজ্ঞেস করলে সবাই বলেছে তাদের বাড়ির মেয়ে আফরিন নাকি তার জন্য ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আ*ত্ম-হ*ত্যা করেছে।আয়ান সেদিন সে কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সে এটা মেনে নিতে পারেনি আফরিন আর নেই। আফরিনের এমন মৃত্যুর কথা শুনে আয়ান তাদের আটকানোর সুযোগ পায় নি।এবং দেয় ও নি।সে ছিলো ঘুরের মধ্যে। আফরিনের বাবা ছিলেন সে এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি।তাই তার মেয়ের মৃত্যুতে এলাকার সবাই অনেক ক্ষেপেছিলো।যার ফল সরুপ আয়ানকে তারা ইচ্ছে মতো মেরে হসপিটালে ভর্তি করেছে।
আয়ান হসপিটালে শুনে ছুটে এসেছে এ্যাশ,নিল,ফাহাদ,কেনায়া,তাহা। নিজের প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে এভাবে হসপিটালে শুয়ে থাকতে দেখে বুঝ হওয়ার পর সেদিন প্রথমবারের কেদেছিলো এ্যাশ।সবাই সেদিন দেখেছিলো এ্যাশের কান্না।নিল,কেনায়া তাহা অবাক চোখ তাকিয়ে ছিলো এ্যাশের দিকে। যাকে কেউ কোনোদিন ও কোনো পরিস্থিতিতে কাঁদতে দেখেনি কেউ তাকে নিজের বন্ধুর জন্য কাঁদতে দেখা অবিশ্বাস্য কিছু নয় কি?তবে তাদের আরো অবাক করে দিয়েছে এ্যাশ দ্বিতীয় কাজ।আয়ানের এমন অবস্থার জন্য এ্যাশ পুরো গ্রাম বাসীকে দায় করে যার ফলে রাগে পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়।ঘটনায় কেউ মারা না গেলে ও আহত হন অনেকে।সবার ঘর বাড়ী সব জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যায়।সবাই আরো ক্ষেপে যায় আয়ানের উপর।যার জন্য সেটা চলে যায় থানায়।এ্যাশসহ সবার নামে মামলা করেন আফরিনের বাবা এবং পুরো গ্রাম।অবশ্য তাতে এ্যাশের কিছু ই করতে পারে নি তারা।উল্টো তাদের বাড়ির আরেক মেয়েকে যেতে হয়েছে জেলে। এ্যাশের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে বেরিয়ে আসে তথ্য।
আফরিন আত্মহত্যা করে নি।খ\ন হয়েছিলো।আর সেই খু\ন করেছিলো আফরিনের চাচাতো বোন ঐশী।(তাহার বেস্ট ফেন্ড) রাতের আধারে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন আফরিনকে কথা বলার অযুহাত দিয়ে ছাদে নিয়ে যায় আফরিন।তার পর ওর হাত পা বেঁধে অনেক মারধর কর।গলায় ওড়না আটকে শ্বাসরুদ করে প্রথমে মারে তারপর ছাদ থেকে ফেলে দেয়। এরকমটা জবানবন্দি দিয়েছে ঐশী।আফরিনকে কেনো মেরেছে জিজ্ঞেস করলে আয়ানকে সে ভালো বাসে এমনটা বলেছে।নিজের চোখের সামনে অন্য কাউকে তার ভালোবাসার মানুষের হতে দেখতে পারবে না।তাই সে মেরে ফেলেছে আফরিনকে।আফরিনের বাবা এতসব ধাক্কা সহ্য করতে পারেন না যার ফলে হ্যার্ট আট্যাকে মৃত্যু বরণ করেন তিনিও।নিজের একমাত্র মেয়ে ছিলো আফরিন। সেই মেয়ে বিয়ে ছেড়ে পালিয়ে ঢাকা পড়াশোনা করতে যাওয়ার পর সব মাফ করে দিয়েছেন তিনি।মেয়েকে আগলে নিয়েছেন তিনি।সেই মেয়ের এভাবে মৃত্যুটা মানতে পারেন নি।তার ফল সরুপ তিনি ও চললেন তার আদরের মেয়ের কাছে।
আয়ানকে নিয়ে আমেরিকার চলে এসেছিলো সবাই। ডাক্তার বলেছে আয়ান শারীরিক থেকে যতটা অসুস্থ তার থেকে বেশি অসুস্থ মানসিক দিক থেকে।যার ফলে তিনি প্রাণে বাঁচলে ও কোমায় চলে যাবেন।হয়েছিলো ও তেমন।আয়ান চলে গিয়েছিলো কোমায়। এরমধ্যে দেশে ঘরে গিয়েছিলো আরেক ঘটনা।এ্যাশ ফাহাদ আর ফারাহ সত্যি সামনে চলে এসেছিলো।অবশ্য সে সত্যি সামনে নিয়ে এসেছিলো ফারাহ নিজে।তাদের সত্যি হলো এ্যাশ ছিলো ফাহাদের আপন ছোট ভাই। আর ফারাহ ছিলো খান পরিবারের বড় মেয়ে। পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ার কারণে তিনি আনাফ চৌধুরীর ছেলে সাথে নিজের মেয়েকে বদলে দেন।এ্যাশের জায়গায় ফারাহকে রেখে ওকে নিয়ে চলে আসেন।সেটা শুধু সেই জানতেন।
তবে এ্যাশের যখন ৫ বছর হয় তখন সেটা জেনে যায় ফাহাদ।তার মাকে প্রতিদিন কাঁদতে দেখতো তার ভাইয়ের জন্য। যার জন্য সে মিহান খানকে হুমকি দামকি দেন এ্যাশকে ফিরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু মিহান খান এ্যাশকে ফিরিয়ে দেন না।উল্টো এ্যাশকে পাঠিয়ে দেন আমেরিকা।
তবে সত্যি কোনোদিন চাপা থাকে।সে সত্য সামনে আসে একদিন না একদিন ঠিকই। এ্যাশের যখন ১৮ বছর বয়স তখন ফাহাদ যায় এ্যাশের কাছে। সেখানে গিয়ে ওকে সবকিছু বলে।সত্যিটা এ্যাশ অনেক আগ থেকেই জানতো যার কারণে ইহান যেদিন ফোন করে এগুলো বলেছিলো সেদিন সে চুপ করে ছিলো।কিছু ই বলে নি।
সবটা সেদিনই পাল্টে যায় নূরকে আর তার ২ বছরের ছেলেকে নিয়ে আমেরিকা চলে যায় ইহান।ফাহাদ আরবীর জীবন পরিবর্তন হয়। ফাহাদ আরাবীর কাছে স্বীকার করে মিহান খানকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ওর বিয়ে ভেঙেছে সেদিন। কিন্তু তার ভালোবাসা সত্যি ই ছিলো।যেটা প্রথমে না বুজলে ও শেষে বুঝে ছিলো সে। আরাবীকে প্রথম তার মেহেদী সন্ধ্যায়ই হাসতে দেখে সে প্রেমে পরে ছিলো আরাবীর।কিন্তু সেটা তার মন মানতে নারাজ ছিলো।সে নিজেকে বুঝিয়েছে আরাবীর বিয়ে ভাঙার জন্য ই সে এতো পরিকল্পনা করে দেশে গেছে।
তবে সেটা মন কখনোই মানতে পারতো না।যার ফল সরুপ ফাহাদ নিজের মনের কথাটাই সঠিক হিসেবে ধরে নিয়েছে।আরাবীকে ভালো বাসে সে।
এসব শুনে আরাবী কিছুতেই সেদিন বিশ্বাস করে নি ফাহাদকে।ফাহাদের সেদিন বিয়ে করবে বলে ও না করাটাকে সে এটাই কারণ মনে করে ফাহাদের থেকে দূরে সরে গেছে। চলে গেছিলো অনেক দূর।
তবে ফাহাদ তো ফাহাদই তার যেটা চাই সেটা সে যেকোনো মূল্যেই নিয়ে ছাড়ে। আরাবীকে খুঁজে বের করে সে জোর করে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিলো আমেরিকা।
সে ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লাগাতে লাগাতে চলে গেছিলো আরো এক বছর।
এসব ঘটনার ৩ বছর পর তাহার বাচ্চা হলে।একটা ফুটফুটে মেয়ে।সৌভাগ্য বসত আইমির জন্মের দিন আয়ান ও সুস্থ হতে শুরু করছিলো। আইমির যখন ২ বছর বয়স তখন আয়ান পুরোপুরি সুস্থ। সুস্থ হওয়ার পর সে এসেছিলো বাংলাদেশে।ঐশীর সাথে দেখা করবে বলে গিয়েছিলো জেলে।সেখানে গিয়ে কৌশলে খু\ন করেছে। তারপর চলে গিয়েছে বহুদূর।সেটা কোথায় এ্যাশ ছাড়া কেউ জানে নাহ।
তবে আফরিনের মৃত্যুটা সবাই সাভাবিক ভাবেই নিয়েছে।কারণ আয়ান এমনটা একটা ইনজেকশন পুশ করেছিলো যেটা কোনো রিপোর্টে ধরা পড়ে নি! অবশ্য সে ইনজেকশনটা এ্যাশই দিয়েছিলো তাকে।আফরিনকে খু\ন করতে এ্যাশ সার্পোট করেছে তাকে।
সেদিন আয়ান কোথায় চলে গিয়েছিলো কেউ ই জানে নাহ। আয়ান যে বাংলাদেশ গিয়েছিলো সেটা শুধু একজন পুলিশ অফিসার জানে আর কেউ না।
তারপর চলে গেলো আরো ২ বছর।এ্যাশের মেয়ে এখন চার বছরের। সেই মেয়ের জন্মদিন পালন করতেই ৪ বছর পর এক সপ্তাহ আগে সে দেশে এসেছে সবাইকে নিয়ে!!
আইমিকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে আছে সবাই। এমন সময় সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো এ্যাশ।সাথে একজন লোক।লোকটার মুখটা মাক্সের আড়ালে তাই কেউ দেখতে পেলো না তার চেহেরাটা।সবাই উসখুস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লোকটা আর এ্যাশের দিকে। এ্যাশ লোকটাকে নিয়ে এসে আইমি বরাবর দাঁড়ালো। তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বললো মাক্সটা খুলতে।লোকটা তার মুখের মাক্স খুলতেই নিল,কেনায়া,ফাহাদ,তাহা,আরাবী,অবাক চোখ তাকিয়ে রইলো।আইমি লোকটাকে দেখেই “তাত্তু” বলে দৌড়ে গেলো।লোকটা ঝুঁকে আইমিকে কোলে তুলে নিলো।গালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—”কেমন আছো আম্মু?
—”তোমাতে কবে আততে বললাম আর তুমি আজ আতলে? এটা তিন্তু ঠিত করলে না তাত্তু!
তাদের কথা বলার মধ্যেই নিল দৌড়ে গেলো সেদিকে।দুজনকেই একসাথে জাপ্টে জরিয়ে ধরলো।ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
—”এতোদিন কোথায় ছিলি আয়ান?হঠাৎ কোথায় উদাও হয়ে গিয়েছিলি?
আয়ান নিলকে ছাড়িয়ে আইমিকে কোল থেকে নামালো।সবার দিকে একবার অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তাকালো।আস্তে করে বললো,
—”সব কথা জানতে নেই কিছু কথা গোপন থাকাই ভালো।এটা নাহয় অজানাই থাক আমি এতোদিন কোথায় ছিলাম।ফিরে এসেছি তো এখন?
—”তোকে আইমি কি করে চিনলো?
পিছন থেকে প্রশ্ন করলো কেনায়া।আয়ান ওর দিয়ে ঘরলো।মৃদু হেঁসে বললো,
—”ওর সাথে কথা হতো মাঝে মাঝে তাই।
নিল আর কেনায়া অবাক চোখে তাকালো।কথা হতো মানে? এ্যাশ কি জানতো আয়ান কোথায় ছিলো? হ্যাঁ জানতো।তাইতো ওর সাথেই আসলো আয়ান।তাহলে তাদের কেন বললো না? কেনায়া আবার জিজ্ঞেস করলো,
—”আমাদের সাথে কেন যোগাযোগ রাখলি না?আমাদের দোষ?
—”একটু একা থাকতে চেয়েছিলাম তাই দূরে ছিলাম। তার জন্যই কারো সাথে যোগাযোগ রাখিনি।
আইমিকে মিস করতাম তাই মাঝে মধ্যে ওর সাথে কথা বলতাম।
আয়ানের কথায় আর কেউ কিছু বললো নাহ।আয়ান চোখ ঘুরিয়ে ফাহাদের দিকে তাকালো।ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
—”তুমি কিছু জিজ্ঞেস করবি নাহ?
—”আবরার ফাহাদ চৌধুরীর কি কিছু অজানা থাকে কোনোদিন?
গম্ভীর কন্ঠে বললো ফাহাদ।হাসলো আয়ান।ওর কাঁধে হাত রেখে বললো,
—”মারাত্মক চালাক তুই।
আইমিকে নিয়ে কেক কাটা শুরু করলো সবাই। গম্ভীর ফাইয়াজকে টেনে নূর আইমির পাশে দাঁড় করালো।তারপর দুজনকে দিয়ে কেক কাঁটালো। আইমি কেক কেটে প্রথমেই ফাইয়াজের মুখে দিলো।ফাইয়াজ অল্প করে খেয়ে আইমিকে খাওয়ালো। একে একে মা বাবা দাদা দাদী সবাইকে কেক খাওয়ালো আইমি।তারপর তাহা কেকটা নিয়ে চলে গেলো রান্নাঘরে।কেটে দিতো লাগলো সবাইকে।
জন্মদিন উপলক্ষে টকটকে লাল একটা ড্রেস পড়েছে আইমি।হালকা লাল চুলে একটা তাজ বসালো।আইমির চোখের মনি নিল রঙের।সেই নিল চোখের আইমিকে পুতুলের মতো করে সাজিয়েছে নূর।সাদা ধপধপে ফর্সা আইমি।যার ধরুন আজকে সাজে সত্যি সত্যি পরি লাগছে ওকে। দুই হাত ভর্তি লাল চুড়ি নিয়ে লাল ড্রেসটা সেই হাতের মুঠোয় নিয়ে সারাঘর দৌড়াচ্চে আইমি। আইমির সেই দৌড়ে বিরক্ত চোখে দেখছে ফাইয়াজ।পড়ে গেলো কি হবে?ফাইয়াজ ভাবনার মধ্যেই ড্রেসে পা বেজে পড়ে গেলো আইমি।শুয়া অবস্থায়ই কাদতে লাগলো সে। তাহা রান্না ঘরে ব্যাস্ত আর বাকিসব অতিথি আপায়্যনে যার ফলে আইমির প্রতি খেয়াল নেই কারো।তাতে আরো বিরক্ত হলো ফাইয়াজ।মেয়েটার দিকে কেউ খেয়াল রাখবে?এখন যে পড়ে গিয়ে চিৎকার করলো সেটা ও কারো কানে গেলো না? আশ্চর্য। ফাইয়াজ বিরক্ত ভঙ্গিতে আইমির কাছে গেলো।ফাইয়াজকে দেখেই চুপ করে গেলো আইমি। চুপ করে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে।ফাইয়াজ ওকে ধরে তুললো।কান্নার ফলে মুখের সাজ নষ্ট হয়ে গেছে। ফাইয়াজ হাত দিয়ে সেগুলো মুছিয়ে দিলো।ওকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে আসতে আসতে বললো,
—”এতো দৌড়াস কেন? এখন পড়ে গেলি না?জন্মদিনে পড়ে গিয়ে ভালো লাগলো?
—”আমি তো খেল ছিলাম।
—”দৌড়ে কিসের খেলা?স্টুপিট!
—”তুমি তস্টুপিত।
ফাইয়াজ ওর দিকে তাকালো।বললো,
—”বেশি কথা বলছিস মনে হচ্ছে না?এতো কথা কিসের? চুম কর। নিমপাতা।
ফাইয়াজকে নিমপাতা বল ডাকতে দেখে ঠোঁট উল্টে ধরলো আইমি।মুখটা কাঁদো কাঁদো করে তাকালো ওর দিকে।যেকোনো মুহুর্তে কাঁদিয়ে বন্যা করবে এমন ভাব।হলো ও তাই আইমি কেঁদে কেঁদে বললো,
—”তুমি আমাল নাম এমল করো বতো তেনো? সুন্দল করে বততে পালো না?
তখনই সেখানে আসলো তাহা।তাহাকে দেখেই আইমির হাত ছেড়ে দিলো ফাইয়াজ। তাহা আইমিকে কাঁদতে দেখে কোলে তুলে নিলো।আইমি কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ দিলো।
—”ফাইয়াত ভাইয়া আমাতে আবালো লিমপাতা বলতে।
৪ বছর বয়স অথচ এখনো ঠিক করে কথা বলতে পারে না আইমি।যার জন্য ওর কথা শুনে রাগ হয় ফাইয়াজের।এতক্ষণ চুপ করে ছিলো।এখন নিজের নামের বারোটা করতে দেখে বলে উঠলো,
—”এখনো ঠিক করে কথা বলতে পারে না।তোতলায় আবার আমার নামে বিচার দেয়।আগে কথা বলতে শিখ বেয়াদব।
বলেই চলে যাচ্ছিলো ফাইয়াজ।আবার কি মনে করে তাকালো তাহার দিকে।গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—”ওর খেয়াল রেখো বড় মা।এতজন মানুষ কি করছো তোমরা? ও পড়ে গিয়েছে ওখানে।
বলে চলে গেলো ফাইয়াজ।তাহা তব্দা খেয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।এতটুকু মানুষ দৌড়াদৌড়ি করে খেলবে তা না। সে সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকে। এরকম বাচ্চা কি করে এতো গম্ভীর হয় বুঝে পায় না তাহা।এতো পুরো এ্যাশের ফটোকপি। এ্যাশের মতো গম্ভীর হয়ে থাকে।
তাহা আইমিকে নিয়ে সেখান থেকে নিজের রুমে দিকে যেতে যেতে বললো,
—”বেশি ব্যাথা পেয়েছ? এতো ছুটোছুটি কেন করো……
২ বছর আগে নিজের ভাইয়ের সাথে মিলে তাহা আর আইমিকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলো মহনা।যার কারণে ওকে ধরে পুলিশে তুলে,দিয়েছিলো এ্যাশরা।আর ওর ভাইকে এ্যাশ মেরে ফেলেছিলো।
মোহনাকে হারিয়ে অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলো নিল।সেই ভেঙে পড়া নিলকে আবারো শক্ত করেছে কেনায়া।সব সময় বন্ধুর মতো সার্পোট করে ওকে আবারো আগের নিল বানিয়েছে। এমনটা করতে করতে কখন যে নিলকে ভালো বেসে ফেলেছে কেনায়া সেটা সে নিজেও জানে না। কেনায়া যে নিলেকে ভালো বেসে ফেলেছে এটা নিল ও বুঝতে পেরেছে অনেক আগে।কিন্তু সে কখনো পাওা দেয় নি। মোহনাকেই সে ভুলতে পারে নি কখনো তাহলে নতুন কাউকে কি করে জরাবে নিজের জীবনে? তাই কখনো কেনায়াকে বুঝার আর চেষ্টা করে নি।কেনায়ার তার প্রতি এতো দূর্বলতা দেখে নিজেই সরে গেছে। এখন শুধু আইমির জন্মদিন দেখে একসাথে হয়েছে দুজন। নয়তো কেনায়া আর নিল কখনো সামনা সামনি হয় না। কেনায়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে।এখান থেকে আমেরিকা ফিরে গেলেই ওর বিয়ে আমেরিকান একটা ছেলের সাথে।
কেনায়ার বিয়ে এই বিষয়টা মানতে কষ্ট হচ্ছে নিলের।কই আগে তো কখনো এমন ফিলিং স হয়নি কেনায়ার উপর।তাহলে এখন কেনো এমন হচ্ছে? তবে সে ও কি আবারো ভালো বেসে ফেলেছে কাউকে?সেটা কি কেনায়াই?
নিলের ভাবনার মধ্যেই দেখলো বাগানের একপাশে দাড়িয়ে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে কেনায়া।ভিতরের এতো সব আয়োজন ভালো লাগছিলো না নিলের।মনে পড়ছিলো মোহনার সেই নোংরা কান্ডের কথা। তাই এসেছিলো বাইরে।
নিল কেনায়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।কেনায়া তার ফোনের কথা শেষ করে তাকালো ওর দিকে। অপ্রস্তুত ভাবে হাসলো।এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
—”তুই এখানে কি করছিস নিল?
—”আমাকে বিয়ে করবি কেনায়া?
কেনায়া কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।মস্তিষ্ক বুঝতে সক্ষম হলো না সে কি ঠিক শুনেছে? নিল কি আসলেই এটা বললো না তার ভ্রম এটা?
—”কি বললি? আবার বল।
—”বিয়ে করবি আমায়? দেখ ঘুরিয়ে পিছিয়ে কথা বলতে পারি না।সোজাসুজিই বলছি।আমার মনে হয় দ্বিতীয় বারের মতো ভালো বেসেছি আমি। সেটা ও তোকে। যদি ও আমার এই অনুভূতি সম্পর্কে অবগত না আমি।তবে আমাদের কাছে সময় নেই এটার সম্পর্কে অবগত হওয়ার।কারণ এখান থেকে ফিরে গেলেই তোর বিয়ে। তাই আমি চাই না তোকে হারাতে।এখন বল রাজি তুই? বিয়ে করবি আমায়?
কেনায়া কি বলবে বুঝতে পারছে।সত্যি সে নিলকে ভালোবাসে কিন্তু তার আব্বু যে বিয়ে ঠিক করলো?
—” উওর দে কেনায়া হ্যাঁ কি নাহ?
—”নিল আমি…
—”হ্যাঁ কি নাহ?
কেনায়া চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে এক শ্বাসে বলে উঠলো,
—”হ্যাঁ।
—”তোর বেচে বেচে আমার মেয়ের জন্মদিনের দিনই বিয়ে করতে হবে?
কাজী অফিসে বসে আছে তাহা,কেনায়া,নিল,ফাহাদ,আয়ান,ইহান আর নূর।কেনায়া আর নিলকে বসানো হয়েছে পাশাপাশি। কাজী কাগজ পএ ঠিক করছিলেন তাদের। পুরো ঘরেই ছিলো নিস্তব্ধতা। এমন সময় এ্যাশের কন্ঠ থেকে বেরিয়ে আসলো এমন কথা।সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে।নিল ডেবিল হেঁসে বললো,
—”অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে আর নষ্ট করতে চাই না।আজ বিয়ে না করলে তোর মেয়ে আর আমার ছেলের বউ করতে পারবো না।তাই আজকের দিনটাই বেঁচে নিয়েছি।এখন প্রতেকটা দিন আমার কাছে অনেক মূলবান।
এ্যাশ চোখ মুখ খুচকে বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো,
—”তোর ছেলে করবে আমার মেয়েকে বিয়ে?ভুলে যাচ্ছিস আমার মেয়ে জন্মে গেছে।৪ বছর ওর। আর তুই মাএ বিয়ে করছিস।
—”ছেলের বউ ছেলের থেকে বড় হলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। বউ সুন্দরী হলেই যথেষ্ট।
—”তোকে আমি…
নিলের দিকে তেড়ে আসতে নিলেই এ্যাশকে আটকালো ফাহাদ।দুই বন্ধুর ঝগড়া দেখে কাজী সহ সবাই হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
কাজী হাসতে হাসতেই কাগজ গুলো নিল আর কেনায়ার সামনে রাখলো।জায়গা দেখিয়ে দিলো সাইন করার।নিল আর কেনায়া সময় নিলো নিলো না।ফটাফট সাইন করিয়ে নিলো।তারপর ইসলামি মতে তিন কবুল বলে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলো। বিয়ে শেষ হতেই কেনায়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো।কেনায়াকে এমন লাল হতে দেখে এ্যাশ বললো,
—”তুই লজ্জা ও পাস কেনায়া? জানতাম না তো।
এ্যাশের এমন কথায় আরো লজ্জা পেলো কেনায়া।
—”চুপ কর তুই। ফাজিল।
সবাই মিলে হাসিমজা করতে করতেই বেরিয়ে গেলো কাজী অফিস থেকে। আয়ান একবার চোখ ঘুরিয়ে কেনায়া আর নিলের দিকে তাকালো। মনে পড়ে গেলো আফরিনের কথা।বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ শ্বাস। চোখের কোণায় জমা হওয়া জল গুলো মুছে নিলো সে।আকাশের পানে তাকিয়ে বললো,
—”তুমি তো আকাশে আছো আফরিন।সেখান থেকে কি তুমি দেখতো পাও আমায়? আমার এমন একাকিত্ব দেখে নিশ্চয়ই ভালো লাগে তোমার? দেখেছ তুমি ওখান থেকে? সবার জীবনের পূর্ণতা? দেখছো? আমার হাহাকার ও কি দেখছো তুমি? কি করে এতো স্বার্থপর হলে? কি করে পারলে এতো তাড়াতাড়ি চলে যেতে?মৃত্যুর আগে কি একবার ও মনে পড়েছে তোমার আমার কথা?
গলা ধরে এলো আয়ানের।ভাঙা গলায় আবারো ও বললো।
বিষাক্ত প্রেমের অনুভূতি পর্ব ২৩
—”পরের জন্মে তুমি আমার হয়েও আফরিন।তোমাকে আগলে রাখবো দেখো।এভাবে আর হারাতে দিবো না।”ভালোবাসি তোমায় অনেক অনেক বেশিই ভালোবাসি,তোমাকে না পাওয়া অব্দি আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য। তুমি আবারো ও জন্ম নিও আমার “আফরিন হয়ে” আমায় আবার ও তুমি ডুবিও #বিষাক্ত_প্রেমের_অনুভূতি তে।
সমাপ্ত
