অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭০
সুমি চৌধুরী
অবশেষে কান্নার সেই বিষাদময় পর্ব শেষ করে রিদিকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। অতিরিক্ত কান্নাকাটি আর ক্লান্তি সইতে না পেরে গাড়িতে বসেই শুভ্রের বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল রিদি। শুভ্র তার সেই মনমোহিনীকে এক হাত দিয়ে পরম আদরে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল। ঘুমন্ত রিদির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে শুভ্রের ভেতরটা ভালোবাসায় ভরে উঠল, সে আলতো করে একের পর এক চুমু খেতে লাগল তার কপালে আর গালে।
সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে ঈশান শান্ত মুখে গাড়ি চালাচ্ছে। তার ঠিক পাশের সিটে বসে আছে শুভ্রা। সারাদিনের এতসব ধকল আর অতিরিক্ত ক্লান্তিতে শুভ্রার চোখের পাতাও ভারী হয়ে আসছিল। গাড়ি চলার মৃদু ঝাঁকুনিতে ধীরে ধীরে সেও একসময় ঘুমে ঢলে পড়ল। আর অবচেতন মনেই ঘুমের ঘোরে তার মাথাটা আলতো করে গিয়ে ঠেকল পাশে থাকা ঈশানের শক্ত কাঁধের ওপর। ঈশান স্টিয়ারিং ধরে থাকা অবস্থাতেই এক পলক পাশে তাকাল। শুভ্রার ওই ক্লান্ত, শান্ত মুখের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার সোজা সামনের রাস্তায় মন দিল।
দীর্ঘ জার্নি শেষে অবশেষে গাড়ি এসে থামল চৌধুরী বাড়ির আলিশান গেটের সামনে। শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে রিদিকে পরম যত্নে নিজের কোলে তুলে নিল। তন্দ্রাচ্ছন্ন রিদিকে কোলেই নিয়ে সে সোজা নিজের রুমে চলে এল এবং বাসর রাতের জন্য সুসজ্জিত খাটের ওপর তাকে আলতো করে শুইয়ে দিল। মেয়েটা এখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। শুভ্র কিছুক্ষণ তার সেই চেনা মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তারপর আলতো পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
অন্য দিকে, নিজের রুমে এসে শুভ্রা ভারি জামা চেঞ্জ করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিল। কিন্তু ভেতরটা কেমন যেন ছটফট করছে, বিছানায় শুয়েও কোনো শান্তি পাচ্ছিল না সে। মনটা ভালো লাগছিল না দেখে একাই ধীর পায়ে ছাদে চলে এল একটু রাতের ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগাতে।ছাদে পা রাখতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে একটা লম্বা অবয়ব শুভ্রার নজরে পড়ল। ছাদের এক কোণায়, রেলিংয়ের একদম সামনে কেউ উল্টো দিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা অবশ্য এতে বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। সে কৌতুহল নিয়ে আরেকটু এগিয়ে যেতেই দেখতে পেল, ওখানে আর কেউ নয় স্বয়ং ঈশান দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত পকেটে গুঁজে সে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।শুভ্রা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ সে দূর থেকে ঈশানের চওড়া পিঠের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল তার। সে আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে কোনো কথা না বলে, চুপচাপ পেছন ফিরে চলে আসতে চাইল।কিন্তু ঠিক তখনই, শুভ্রার দিকে না তাকিয়েই ঈশান হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল,
“কথা বলবে না আমার সাথে?”
ঈশানের সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা যেন তীরের মতো সোজা গিয়ে শুভ্রার কলিজায় লাগল। তার পায়ের পাতা দুটো ওখানেই থমকে গেল, এক কদমও সামনে বাড়ানোর শক্তি রইল না। সে শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল, যাতে ভেতর থেকে উপচে আসা কান্নার শব্দটা কোনোভাবে বাইরে বেরিয়ে না আসে। সে কথা বলতে চায় না, নতুন করে আর কোনো মায়া বাড়াতে চায় না নিজের মনে। কী লাভ এত মায়া বাড়িয়ে? এই একপাক্ষিক মায়ার কি আজও কোনো দাম আছে? শুভ্রা তা জানে না।সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে শুভ্রা যখন কিছু না বলে আবার চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই ঈশান পেছন থেকে আবার বলে উঠল,
“ইগনোর করছো?”
শুভ্রার মনে হলো ঈশান যেন ইচ্ছে করে তার কলিজায় ধারালো ছুরি চালাচ্ছে। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলেও সে বহু কষ্টে নিজেকে সামলাল। ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে, মাথাটা একদম নিচু করে ভাঙা গলায় বলল,
“জ্বি জ্বি ঈশান ভাইয়া, বলুন?”
ঈশান এবার রেলিং থেকে পিঠ টান টান করে শুভ্রার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। একটা পা রেলিংয়ের নিচের অংশে ঠেকিয়ে, দুই হাত পকেটে গুঁজে সে শুভ্রার ওই মাথা নিচু করে থাকা অবয়বটার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
“কংগ্রাচুলেশন, শুভ্রা।”
শুভ্রা আচমকা চমকে উঠে মাথা তুলল। ঈশানের সেই ভাবলেশহীন, শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় শুধাল,
“মানে?”
ঈশান মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো চঞ্চলতা নেই, যেন এক অদ্ভুত উদাসীনতা। সে বলল,
“পাগলি একটা! বলছি, পরশু তো তোমারও বিয়ে। তাই তোমার এই নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি।”
কথাটা শোনামাত্র শুভ্রার বুকের ভেতরটা যেন কেউ হাত দিয়ে নির্মমভাবে মুচড়ে দিল। গলার কাছটায় এক দলা কান্না এসে দলা পাকিয়ে গেল, কোনো কথাই যেন মুখ গলে বের হতে চাইছে না। চোখের কোণটা ভিজে ওঠার আগেই সে জোর করে নিজেকে শক্ত করল। অনেক কষ্টে কোনো রকমে ঠোঁট জোড়া কাঁপিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ।”
বলেই সে কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। দুজনেই একদম নিস্তব্ধ। ছাদের ওপর শুধু রাতের হালকা বাতাস আর দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটার পর, হঠাৎ করেই চারপাশের আবহওয়া বদলে গেল। প্রচণ্ড জোরে বাতাস শুরু হলো চারদিকে। বাতাসের বেগ এতই তীব্র ছিল যে, শুভ্রার কাঁধ থেকে ওড়নাটা এক ঝটকায় খুলে বাতাসে উড়তে লাগল, আর তার পিঠময় ছেড়ে দেওয়া চুলগুলো পাগলের মতো মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়তে লাগল।সে অনেক কষ্টে উড়তে থাকা ওড়নাটা টেনে তুলে কোনো রকমে বুকের ওপর চেপে ধরল। তারপর চুলগুলো এক হাত দিয়ে সরিয়ে ঈশানের দিকে তাকাল। দেখল, ঈশান ততক্ষণে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ মনে করল না। সে ধীর পায়ে ঈশানের একটু কাছে এগিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“প্রচণ্ড বাতাস হচ্ছে ঈশান ভাইয়া, মনে হচ্ছে এখনই বৃষ্টি নামবে। নিচে নেমে আসুন।”
ঈশান শুভ্রার দিকে না তাকিয়েই আকাশের দিকে মুখ করে শান্ত গলায় বলল,
” থাকি না। অনেক দিন ধরে বৃষ্টিতে ভিজি না, আজ একটু ভিজি। তুমিও থাকো, দুজনে মিলে একসাথে ভিজি।”
ঈশানের এই আকস্মিক আর অদ্ভুত প্রস্তাবটায় শুভ্রা যেন ঠিক সেখানেই জমে বরফ হয়ে গেল। বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কান্নার বাঁধটা আর ধরে রাখতে পারল না সে। মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে দিল সে। এই লোকটা এমন কেন করছে? কেন এড়িয়ে যাওয়ার পরও এভাবে মায়ার জাল বুনছে? সে যে এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছে না!শুভ্রার সেই স্পষ্ট কান্নার আওয়াজ ঈশানের কান অবধি পৌঁছাল, কিন্তু সে কিছু বলল না, কোনো সান্ত্বনা দিতে এগিয়েও এলো না। কারণ, এই কান্নার গভীর মানেটা সে খুব ভালো করেই জানে কিন্তু সেই মানেটা সে এই মুহূর্তে কোনোভাবেই বুঝতে চায় না, নিজের মনের কাছে স্বীকার করতে চায় না।কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশ অন্ধকার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে পড়ল। শুভ্রা ঈশানের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে ভিজতে থাকল, আর ঈশান সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের জল গায়ে মাখল। দেখতে দেখতে দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজে একদম চপচপে হয়ে গেল।ঠিক তখনই হঠাৎ আকাশ চিরে সজোরে শব্দ করে একটা বিকট বজ্রপাত হলো। সেই মেঘের গর্জনে ভয়ে শুভ্রা একদম কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে গিয়ে ঈশানকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার দুই হাত ঈশানের বুক বরাবর চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“আমার ভীষণ ভয় লাগে!”
শুভ্রার এই আকস্মিক ছোঁয়ায় ঈশানের পুরো শরীর এক লহমায় শিউরে উঠল। বুকের ভেতর বন্ধ থাকা হার্টবিটটা যেন আচমকা দ্বিগুণ বেগে ধকধক করে বাজতে শুরু করল। সে কোনো কথা বলল না, শুভ্রাকে সরিয়েও দিল না, শুধু চুপচাপ নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে রইল।শুভ্রাও এক অদ্ভুত শান্তিতে ঈশানের চওড়া পিঠে নিজের মুখটা গুজে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল। বৃষ্টির এই রিনিঝিনি শব্দের মাঝে শুভ্রার হুট করেই কেমন যেন নিজের ভেতরের সব ঝড় শান্ত হয়ে গেল, এক টুকরো অপার্থিব শান্তি বয়ে গেল তার মনের ভেতর। তার মনে হতে লাগল এই আশ্রয়ে শুধু সুখ আর সুখ, যে সুখের ছোঁয়া সে হয়তো এই পৃথিবীর আর কোনো মানুষের কাছে কোনোদিন পাবে না।অন্যদিকে শুভ্র ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে একটা কালো শার্ট আর সাদা জিন্স প্যান্ট পরে বের হয়ে আসে। ঘরে এসেই তার কানে আসে জানলার বাইরে ঝমঝমিয়ে পড়তে থাকা বৃষ্টির শব্দ। সে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখে বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এরপর সে বিছানার দিকে তাকায়। রিদি এখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। মেয়েটার ক্লান্ত মুখখানা দেখে মনে হয় না যে কাল সকালের আগে তার এই ঘুম ভাঙবে।
শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু হাওয়ার খোঁজে ছাদের উদ্দেশ্যে পা দিল।হাঁটতে হাঁটতে ছাদের দরজার কাছে পৌঁছাতেই তার পায়ের গতি আচমকা থমকে গেল। অন্ধকারের মাঝে বৃষ্টির ঝাপসা আলোয় ছাদের রেলিংয়ের কাছে দুটো মানুষের অবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখল, মনে হচ্ছে কেউ একজন পেছন থেকে কাউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। শুভ্র প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না যে এই ঘোর বৃষ্টির মধ্যে ছাদের কোণে কে হতে পারে এই দুইজন। মনের ভেতর কৌতুহল নিয়ে সে দরজা পেরিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ছাদে পা রাখল।ধীরে ধীরে সে যখন ওই অবয়ব দুটোর আরও কাছে এগিয়ে এলো, তখন এক ঝটকায় তার পা দুটো সেখানেই জমে গেল। কারণ, বৃষ্টির ঝাপসা আলো ছাপিয়ে সামনের মানুষ দুটো এখন তার খুব চেনা। ওখানে আর কেউ নয় শুভ্রা আর ঈশান দাঁড়িয়ে আছে, আর শুভ্রা পরম আস্থার সাথে ঈশানকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই দৃশ্য দেখেও শুভ্র মুখে কিছুই বলল না, এমনকি কোনো শব্দও করল না। সে শুধু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর ধীর পায়ে ওখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ নিজের রুমে চলে আসলো।রুমে ঢুকে বিছানার দিকে তাকাতেই শুভ্র দেখল রিদি সেখানে নেই। ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ তার কানে এলো। তার মানে মেয়েটা এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকেছে। শুভ্র আর কিছু না ভেবে চুপচাপ বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল এবং পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে লাগল।কিছুক্ষণের মধ্যেই রিদি ফ্রেশ হয়ে একটা কালো রঙের থ্রি-পিস পরে নিজের ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বের হলো। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে শুভ্র ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকায়। মুহূর্তের মধ্যে দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায়। শুভ্রকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রিদি লজ্জায় চোখ নামিয়ে সোজা আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আবার চুল মুছতে থাকে।
শুভ্র বিছানা থেকে উঠে রিদির ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। আয়নার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“অজু করে আয়?”
রিদি হুট করে চমকে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে আয়নায় শুভ্রের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“কেন?”
শুভ্র মৃদু হেসে বলল,
“দুজনে মিলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ব। কথা না বাড়িয়ে অজু করে আয়, তোর অজু শেষ হলে আমি যাব।”
রিদি তোয়ালেটা পাশে রেখে শুভ্রের দিকে ঘুরে তাকিয়ে চঞ্চল গলায় বলল,
“তাহলে চলেন, দুজন একসাথেই অজু করে আসি?”
শুভ্র একটা মুচকি হাসি দিল। মাথা নাড়িয়ে নরম সুরে বলল, “ওয়ান মিনিট।”
বলেই শুভ্র আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে নিল। ছাদের বৃষ্টিতে হালকা ভেজা শার্ট আর প্যান্ট চেঞ্জ করে সে একটা কুচকুচে কালো পাঞ্জাবি আর সাদা প্যান্ট পরে নিল। পোশাক বদলে সে আবার রিদির ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। কালো পাঞ্জাবিতে শুভ্রকে এতটা আকর্ষণীয় লাগছে যে রিদি একদৃষ্টিতে হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
শুভ্র রিদির ওই বোকা বনে যাওয়া চাহনি দেখে হাসল। তারপর আলতো করে রিদির বুকের ওপর থাকা ওড়নাটা দুহাতে তুলে নিল এবং রিদির মাথায় খুব সুন্দর করে পেঁচিয়ে ঘোমটা দিয়ে দিল।রিদির মুখের দিকে চেয়ে বলল,
“এখন চল।”
তারপর দুজনে একসাথে ওয়াশরুম থেকে অজু করে এসে রুমে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে নিল। নামাজ শেষে শুভ্র জায়নামাজে বসেই পাশে ঘুরে রিদির নরম গালটা আলতো করে ধরে তার কপালে গভীর ভালোবাসায় একটা চুমু খেল। তারপর সেই ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে পরম আকুলতায় বলল।
“শুধু এই জন্মে নয়…
একটা মানুষের যতবার জন্ম সৃষ্টিকর্তা লিখে রেখেছেন,
প্রতিটা জন্মেই যেন আল্লাহ তোকে শুধু আমার জন্যই সৃষ্টি করেন।
প্রতিটা জীবনে যেন তুই-ই আমার প্রথম ভালোবাসা হস,
আমার শেষ আশ্রয় হস…
আর প্রতিবারই যেন আমি নতুন করে তোকে খুঁজে পাই,
নতুন করে ভালোবাসতে পারি,
ঠিক আজকের মতোই, নিঃস্বার্থ আর সীমাহীন ভালোবাসায়।”
শুভ্রের পবিত্র আর আকুল করা কথাগুলো রিদির মনের একদম গভীরে গিয়ে আঘাত করল। সে আর নিজের ভেতরের আবেগের বাঁধ ধরে রাখতে পারল না। জায়নামাজে বসা অবস্থাতেই সে হাঁটু গেড়ে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে দিল।বুকের ভেতর জমে থাকা সব সুখ আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে রিদি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল।
“শুভ্র ভাইয়া, আমি যে কত বড় ভাগ্যবতী, তা হয়তো আমি নিজেও জানি না। যে মানুষকে পাওয়ার জন্য আমি রাতের পর রাত জায়নামাজে চোখের জল ফেলেছি, আজ সেই মানুষটা আমার সামনে বসে আমাকে এভাবেন চাইছে এর চেয়ে বড় আর কোনো পাওনা আমার এই জীবনে হতে পারে না।আপনি তো শুধু আমার এই জন্মের ভালোবাসা নন ভাইয়া, আপনি আমার রূহ বা আত্মার সাথে মিশে গেছেন। সৃষ্টিকর্তা যদি আমাকে হাজারটা জীবনও দেন, আমি প্রতিটা জীবনে, প্রতিটা সেকেন্ডে শুধু আপনাকেই চাইব। আপনার এই বুকের চেয়ে নিরাপদ কোনো আশ্রয় আমার এই পুরো দুনিয়ায় আর কোথাও নেই। আমি কোনো রূপ-রঙের মোহ চাই না ভাইয়া, আমি শুধু আপনার ওই খাঁটি ভালোবাসাটা আজীবন আগলে রাখতে চাই।আল্লাহর কাছে আমারও শুধু একটাই চাওয়া যে পবিত্র বন্ধনে আজ আমরা আবদ্ধ হলাম, মৃত্যুর পরেও যেন জান্নাতে আমাদের এই জোড়া অক্ষত থাকে। আপনি কখনো আমাকে ছেড়ে যাবেন না ভাইয়া, আপনার এই ভালোবাসার আলো ছাড়া আমি যে এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না।”
রিদির ওমন আকুল করা কান্না আর ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে শুভ্রের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মায়ায় মুচড়ে উঠল। সে নিজের দুহাতে রিদির মুখটা আলতো করে ওপরে তুলল। তারপর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে রিদির গাল বেয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো পরম যত্নে মুছে দিয়ে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম অথচ গভীর কণ্ঠে বলতে লাগল।
“পাগলি একটা, এমন করে কাঁদিস না তো! তোর চোখের এই জল দেখলে আমার বুকটা ফেটে যায় । তুই বললি না তুই কত বড় ভাগ্যবতী? আসলে ভাগ্যবতী তুই নোস রিদি, সবচেয়ে বড় ভাগ্যবান তো আমি। যে মেয়েটা আমার মতো একটা ছেলেকে নিজের পুরো দুনিয়া বানিয়ে নিয়েছে, যে আমার ভালোবাসার সুবাস ছাড়া নিজের অস্তিত্বই কল্পনা করতে পারে না তাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পাওয়া তো আমার সাত জন্মের ভাগ্য।আজ থেকে এই শুভ্র শুধু তোর, একান্তই তোর। তুই যেমন আমার বুকেই তোর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাস, ঠিক তেমনি এই অবাধ্য শুভ্রেরও শান্ত হওয়ার একমাত্র জায়গা কিন্তু তোর এই কোলটাই। তোকে ছেড়ে যাওয়ার কথা তুই স্বপ্নেও ভাবিস না। তুই ছাড়া আমার এই জীবনে আর কোনো ডিরেকশন নেই, কোনো গন্তব্য নেই।আজ এই জায়নামাজে বসে তোকে কথা দিচ্ছি, জীবনের প্রতিটা মোড়ে, প্রতিটা কঠিন পরিস্থিতিতে আমি তোর হাতটা এভাবেই শক্ত করে ধরে রাখব। তোর সব আবদার, তোর সব পাগলামি আমি সারাজীবন এভাবেই মাথায় করে রাখব। তুই শুধু এভাবেই আমাকে ভালোবেসে যাস রিদি, বাকি দুনিয়াটা আগলে রাখার দায়িত্ব আমার।”
কথাগুলো শেষ করে শুভ্র রিদির কপালে আরও একবার আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল, যেন তার প্রতিটা কথার সত্যতার সিলমোহর এঁকে দিল সেই স্পর্শে।তারপর দুজনে একসাথে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। রিদি শুভ্রের চওড়া বুকে মাথা রেখে পরম শান্তিতে চোখ বুজল। এ যেন এক পৃথিবীর সব ক্লান্তি ভোলানো আশ্রয়। চোখ বন্ধ রেখেই সে একটুখানি নড়েচড়ে বসল, তারপর নরম গলায় আবদার করল,
“আমাকে একটা গান শোনাবেন?”
শুভ্র একটু মৃদু হেসে নিচু গলায় শুধাল,
“গান শুনবি?”
রিদি শুভ্রের শার্টের বোতামটা আঙুল দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“হুম।”
শুভ্র তার কপালে নিজের চিবুক ঠেকিয়ে বলল,
“কী গান শুনতে ইচ্ছে করছে তোর, বল?”
রিদি শুভ্রের বুকের ওমে আরও একটু লেপটে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আপনার মনে যে সুরটা এই মুহূর্তে আমার জন্য বাজছে, আপনি সেটাই শোনাবেন।”
“আচ্ছা,” বলে শুভ্র রিদির মাথায় পরম আদরে বিলি কেটে দিতে দিতে চোখ বন্ধ করল। ঘরের মৃদু আলো আর বাইরের বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দের সাথে মিলিয়ে সে একদম নিচু, জাদুকরী আর আকুল করা গলায় গেয়ে উঠল।
ঘুম না আসা রাতে তুমি আমার কল্পনাতে,
জোছনা মাখা চাঁদে তুমি আমার বন্দনাতে,
এসে তুমি দাও দেখা,
এভাবে কি যায় থাকা,
আছি আমি কাছাকাছি,
তোমার অপেক্ষাতে,
ঘুম না আসা রাতে তুমি আমার কল্পনাতে,
জোছনা মাখা চাঁদে তুমি আমার বন্দনাতে,
গানটার শেষ কলিটুকু গেয়েই শুভ্র নিচের দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল রিদি হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু না, সে রিদির দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা তার দিকে কাজলকালো বড় বড় চোখ দুটো মেলে পরম মুগ্ধতায় তাকিয়ে আছে।শুভ্র ওর নাকে নিজের নাক ঠেকিয়ে দুষ্টুমি করে বলল,
“কী রে, এখনো ঘুমাসনি?”
রিদি সাথে সাথে এক অদ্ভুত লজ্জায় শুভ্রের বুকে নিজের মুখটা পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলল। তারপর ভেতর থেকেই জড়িয়ে যাওয়া চঞ্চল গলায় বলল,
“ধুর! এত কিউট একটা বর যার একদম বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে রাখে, তার চোখে আর ঘুম আসে বলুন? তার ওপর আপনার এই জাদুকরী কণ্ঠের এত মায়া! এত সুন্দর গান কীভাবে গান আপনি? আপনার তো কোনো বড় ব্যবসায়ী না হয়ে দেশের সেরা গায়ক হওয়া উচিত ছিল।”
শুভ্র রিদির এই মিষ্টি প্রশংসায় আলতো করে হেসে উঠল। ঘরের নিস্তব্ধতা যেন সেই হাসির শব্দে আরও মধুর হয়ে উঠল। সে রিদির চিবুকটা আলতো করে ধরে মুখটা ওপরে তুলল, তারপর চোখের ভ্রু নাচিয়ে গভীর অথচ রসিকতার সুরে বলল,
“আরে পাগলি, আমি তো গায়কই।”
রিদি এবার সত্যি সত্যি ভ্রু কুঁচকে শুভ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কীভাবে? আপনি আবার কবে থেকে গায়ক হলেন?”
শুভ্র ওর ঠোঁটের কোণের ভুবন ভোলানো হাসিটা আরও চওড়া করে বলল,
“গায়ক কি শুধু তারাই, যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজারটা পাবলিকের সামনে গান শুনিয়ে হাততালি কুড়োয়? কিছু গায়ক এমনও থাকে রে রিদি, যারা নিজেদের সুর আর তাল শুধু একজনের জন্যই জমিয়ে রাখে, নিজের সেই একদম একান্ত মনের মানুষটার জন্য। আর আমি হলাম ঠিক সেই জাতের গায়ক। আমি অন্য কারো জন্য নই, আমি সারাজীবনের জন্য শুধু তোর একার গায়ক।”
শুভ্রের এই অমোঘ আর ভালোবাসায় মাখানো জবাবটা শোনামাত্র রিদির পুরো মনটা এক অপার্থিব সুখে ভরে উঠল। সে খিলখিল করে হেসে উঠে আবার শুভ্রের বুকে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার মনে হলো, এই বুকের ধকধকানিটাই আসলে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গান, যা সে আজীবন এভাবেই জড়িয়ে ধরে শুনে যেতে চায়।শুভ্র রিদির চুলে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে নিচু গলায় বলল,
“ঘুমিয়ে যাবি?”
রিদি শুভ্রের বুকে নাক ঘষে আধো-আধো গলায় বলল, “হুম।”
শুভ্র ওর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা গলায় বলল,
“সত্যি ঘুমিয়ে যাবি?”
রিদি চোখের পাতা পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
“হুম, তো আর কী করব?”
শুভ্র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চাতুরী হাসি ফুটিয়ে রিদির একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“একটু আদর করতে দিবি না?”
শুভ্রের এমন সরাসরি আর চনমনে কথায় রিদি মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে আবার শুভ্রের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে আবদারের সুরে বলল,
“আবার!”
শুভ্র রিদিকে নিজের বাহুডোরে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর কানের লতিতে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে গভীর অথচ মাতাল করা কণ্ঠে বলল,
“তোর মতো এমন মোহময়ী সুন্দরী বউ চোখের সামনে থাকলে কি আর নিজেকে ধরে রাখা যায় রে পাগলি? আয় না, আজকেও কালকের মতো দুজনে নিজের অজান্তেই একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাই।”
রিদি লজ্জায় আর কিছু বলতে পারল না। মুখ ফুটে কীভাবে বলবে যে, এই মুহূর্তে তার নিজেরও তীব্র ইচ্ছে করছে শুভ্রের গভীর ভালোবাসার সাগরে নিঃশর্তভাবে ডুবে যেতে? শুভ্র রিদির এই চেনা নীরবতা আর লজ্জারাঙা মুখটাকেই সম্মতি হিসেবে ধরে নিল।সে ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে রিদিকে নিজের বুক থেকে আলতো করে সরাল। তারপর সোজা করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, ধীর পায়ে রিদির ওপরে উঠে এলো। শুভ্র নিজের শরীরের পুরো ভার রিদির কোমল শরীরের ওপর ছেড়ে দিল। তার এক হাত রিদির কোমরে আর অন্য হাত চুলে বিলি কাটতে লাগল। এরপর সে মুখ ডুবিয়ে দিল রিদির গলার খাঁজে আর নরম গালে। রিদির ঘাড়ে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে এক অদ্ভুত নেশালো, মাতাল করা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল।
“আজ যদি একটু বেশি বেসামাল হয়ে পড়ি, তবে লক্ষ্মী মেয়ের মতো সহ্য করে নিস। আমি সত্যি আজ বড্ড বেসামাল হয়ে যাব। আজ তোকে আমি ভালোবাসার এমন এক গহীন রাজ্যে নিয়ে যাব, যেখানে সুখ আর তীব্র যন্ত্রণা সব একাকার হয়ে মিশে আছে।”
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৯
কথাগুলো শেষ করেই শুভ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে পরম আবেশে, অত্যন্ত তীব্র আর গভীর এক ভালোবাসার টানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল রিদির মাঝে। সময়ের নিজস্ব গতিতে, ভালোবাসার সেই উষ্ণতায় দুজনের শরীর থেকে কাপড়ের শেষ আবরণটুকুও একসময় খসে পড়ল। শুভ্র তার এক বুক জমানো উথাল-পাথাল ভালোবাসা দিয়ে রিদিকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল পরম সুখের জোয়ারে। সমস্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে, পৃথিবীর সব নিয়ম ভুলে সে রিদিকে নিজের আত্মার সাথে, নিজের শরীরের সাথে সম্পূর্ণ মিশিয়ে নিল।প্রথম রাতের সেই চেনা মাদকতা পেরিয়ে, দ্বিতীয়বারের মতো তারা আজ আবারো একে অপরের মাঝে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল। সুসজ্জিত বাসর ঘরের সেই নিস্তব্ধতার মাঝে তখন কেবল দুটি তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের ওঠানামা, আর জানালার বাইরে একটানা ঝমঝমিয়ে পড়তে থাকা বৃষ্টির রোমাঞ্চকর শব্দ।
