Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া শেষ পর্ব 

আকাশপ্রিয়া শেষ পর্ব 

আকাশপ্রিয়া শেষ পর্ব 
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

দেখতে দেখতে আকাশ প্রিয়ার বিয়ের দিনগুলো এসে হাজির হয়েছে ক্যালেন্ডারের পাতায়। বর কনে উভয়ের পরিবারেই নিদারুণ ব্যাস্ততা। পুরানো কটেজ রেখে আকাশরা নতুন কটেজে এসে উঠেছে। হাতে গোনা এই কয়দিনের মধ্যেই রাতুলরা একদম গুছিয়ে ফেলেছে সবকিছু। করিৎকর্মা একেকজন। নিস্তব্ধতায় ঘেরা পাহাড়ের বুকে, বছরের পর বছর ধরে পরিত্যাক্ত কটেজটা মানুষে মানুষ পূর্ণ। ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। সাজিয়ে ফেলা হয়েছে, বিবাহ আয়োজনের উপযোগী করে।
আকাশ প্রিয়ার মেহেদীর আয়োজন করা হয়েছে ছোটখাটো করে। পার্লার থেকে লোক চলে আসবে খানিক পরেই। নিচে বাড়ির লোকজনও সব জমা হয়ে গিয়েছে। ওপরের ঘরে প্রিয়াকে শাড়ি পড়িয়ে বসিয়ে, সবাই বেড়িয়ে গিয়েছে সবেই। প্রিয়াকে রেখে বের হওয়ার কারণ অবশ্যই আকাশ! বিছানার কিনারায় উল্টো হয়ে বসে, হাতে সবুজ চুড়ি পরছিলো প্রিয়া।

আকাশ এসে দাঁড়িয়েছে আধখোলা দরজার সমানে, সেটা নজরেই পরেনি তার। আকাশ পিছন থেকে দেখে তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। কোমর ছড়ানো চুলগুলো খুলে রাখা। মাথায় একগাদা জুই ফুলের গাজরা ঝুলিয়ে রেখেছে। ব্যাস্ত হাত চুরি পরতে ব্যাস্ত। আকাশ আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো একটাবার, অদূরে ভাইবোনেরা দাঁড়িয়ে। তাদের ব্যাক্তিগত সময়ে হস্তক্ষেপ করতে চায়না, আবার এই মজাটুকু মিস ও করতে চায়না।
—’ আমি কিন্তু শুধুমাত্র বা’সরের জন্য দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হয়েছি। সেটা খেয়াল আছে তো।’
আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বরে ভূত দেখার মতো চমকে, লাফিয়ে উঠলো একপ্রকারে। হুট করে এহেন কথা কে বলে ওঠে! প্রিয়া বুকে হাত রেখে চোখ বুজে শ্বাস নিলো জোরে জোরে। বিয়ের আয়োজন গুলো নিয়ে গভীর মন দিয়ে ভাবছিলো কিছু একটা। হুট করেই আকাশ কোথা থেকে এলো! প্রিয়া উঠে দাঁড়ালো। একদম তৈরি সে। ভ্রু জোড়ার মাঝে সুক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে কোমড়ে হাত রাখলো। কপট রাগ দেখিয়ে বললো,

—’ কখন কোন কথা বলতে হয় জানেন না? তাছাড়া আমার বয়েই গেছে। শুধু বা’সরের জন্য বিয়েতে রাজি হয়েছি নাকি? প্রথম বিয়েতে বউ সাজা হয়নি। তাই বিয়ে করছি দ্বিতীয় বার। ‘
আকাশ ঘাড় বাঁকিয়ে ডান ভ্রু খানা নাচালো। মেয়েটার মুখে আজকাল কিশোরী বয়সের ছাপ মুচেছে। বিশ বছরের নবযৌবনা রমনী লাগে। বিয়ের এই এক বছরে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। ফুলো ফুলো গালদুটো ভরাট লাগে আরও। মুখ জুড়ে রাজ্যের মায়া কেথা থেকে যে ভর করে থাকে। আকাশ ঠোঁট টিপে হাসি আটকালো। দরজার ওখানে দাঁড়িয়েই বললো,
—’ বললেই হলো নাকি! বিয়ের পর স্বামীর কথা মানতে হয়, পাখি। এতো ছটফট করলে চলবে? আমার পাখি, আমার বুকের খাঁচায় বন্দি থাকার জন্য। একমাত্র এই আকাশে উড়াউড়ির জন্য। আর কোথাও নয়।’
প্রিয়া মুখ বাকালো। দরজা খুলে, ওভাবে হাট করা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এমন উল্টোপাল্টা বকে যাচ্ছে। বাড়ি ভর্তি আত্মীয় সজন। ছোট ভাইবোন, বন্ধু বান্ধব সবাই ছোটাছুটি করছে। কারোর কানে গেলে তখন! প্রিয়া মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ করে কন্ঠস্বর নামিয়ে ডাকলো আকাশকে।

—’ এদিকে আসুন। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো ওভাবে।’
আকাশ নড়াচড়া করলো না। বাঁকা হাসলো। বাঁকা কন্ঠেই বলে উঠলো,
—’ আজ তো আমাদের বা’সর না, পাখি। পরশু বিয়ে, ওইদিন রাতে বা’সর করবো। আজকেই কাছে ডাকছো? তাও নিজ থেকে! ছিহ্, এটা অন্যায় কিন্তু। বউদের একটু লজ্জা পেতে হয়। হবু স্বামী কে এভাবে কাছে ডাকে?’
প্রিয়া হত-বিহবল হলো এক মূহুর্তের জন্য। সে কি মাইন্ডে বললো, আর লোকটাই বা কি মাইন্ডে নিলো! আজব তো। প্রিয়া তেঁতো কন্ঠে খেঁকিয়ে উঠলো একপ্রকার,
—’ বাজে লোক। বা’সর করতে না পেরে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে একেবারে। যান তো।’
আকাশ শব্দ করে হেসে ফেললো এ যাত্রায়। এই হাসিতে বরাবরই ভীষন মুগ্ধ হয় প্রিয়া। রাগ গলে জল হয় নিমিষেই। আকাশ শব্দহীন দরজা আঁটকে দ্রুত পায়ে এসে দাঁড়ালো প্রিয়ার কাছে। মেয়েটার হাতজোড়া দখল করে নিলো নিজের লম্বা হাতের মধ্যে।

—’ আসতে চাচ্ছিলাম না কাছে। পরশু অবধি সত্যিই তর সইছে না। মাথা খারাপ লাগছে। তুমি একদিনও সময় পাচ্ছো না,এটা কেমন কথা। নাকি ইচ্ছে করে আসতে চাইছো না? হুম?’
প্রিয়া মস্তিষ্ক ঝুকিয়ে ফেলে। এতদিনও কেউ না কেউ এসে ঘুমিয়েছে তার কাছে। দু’দিন আগে তারা আগের কটেজ ছেড়ে, আকাশের পুরানো কটেজটায় উঠেছে। এটার মেরামত শেষ হওয়ার পর। এখানেও, হয় আকাশের বোনেরা শুচ্ছে তার সাথে, নয়তো শিয়া বাচ্চা সমেত এসে থাকছে। তাছাড়া তারা মা তো আছেই। সত্যিই কোনো ভাবে ব্যাবস্থা করে উঠতেই পারেনি। প্রিয়া মিহি কন্ঠে জবাব দিলো,
—’ সত্যি সুযোগ পাইনি।’
—’ সবাই ঘুমানোর পরও আসা যায়নি।’
—’ অতো নির্লজ্জ কিভাবে হবো আমি?’
—’ এখানে নির্লজ্জতার কি? ‘
প্রিয়া মাথা তুলে তাকায় না। ঠোঁট কামড়ে ধরে। লাজুক সুরে বলে,
—’ বললেই হয়? এতোটা ডেসপারেট হওয়া যায়? ঘরে কেউ না কেউ ঘুমায়। তারা ঘুমানোর পর আসবো, যদি টের পায়! ছিহ্, লজ্জার ব্যাপার না? কাল বাদে পরশু বিয়ে। এখন এভাবে…’
কথাগুলো বলতে বলতে লজ্জায় আভা এসে ভির জমালো রমনীর ফুলো গাল দু খানায়। আকাশ হাসলো মৃদু। তবে মেয়েটাকে একটু খানি খোঁচানোর সুযোগ মিস করতে চাইলো না। মুখের দুষ্টু হাসি টুকু গিলে ফিচেল কন্ঠে বললো,
—’ স্বামী ছুঁতে গেলে পালাই পালাই করে। সে নাচছে দ্বিতীয় বার বিয়ের জন্য। সবকিছুর ডোজ কিন্তু ডাবল ডাবল হবে এবার। একবার বিয়ে করেও এতো দূরে সরে ছিলে এতদিন। এবার কিন্তু ছাড় পাবে না। রাজি থাকলে তবেই বিয়ে করতে এসো। বাসর করবো না বললেই হলো নাকি!’

আশপাশের সবুজে ঘেরা উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেরকম পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নির্মান করা হয়েছিলো চৌধুরীদের এই কটেজখানা। সে বহুযুগ আগে। একসময় এটার জমজমাট বানিজ্য থাকলেও, সময়ের স্রোতে প্রায় পরিত্যাক্তই বলা চলে। কটেজটার পিছনে তাকালেই চোখে পরবে অদূরে পাহাড়গুলো। আর ঠিক পাশেই বিশাল খাদ। আশেপাশে জনশূন্য বলা যায়। লোকালয় শুরু হয়েছে, আরও একটু পর থেকে। কাঠের তৈরি দোতলা কটেজ, সেই ব্রিটিশ আমলের সময়ের তৈরি। সাদামাটা দেখতে লাগলেও বেশ জৌলুশ আছে। বিশাল জায়গা জুড়ে হওয়ায় বেশ খোলামেলাও দেখতে লাগে। সামনে দিয়ে আঁকাবাকা হয়ে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে মাঝারি গোছের একটা রাস্তা। তবে কালের পরক্রমায় এ রাস্তায় জনমানুষের চলাচল বেশ কম।

বিয়ের আয়োজনে বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেনি দু পরিবারের কেউ-ই। এলাহি আয়োজন বলাই যায়। কাঠের কটেজ টা আর ধুলো জমে,ফ্যাকাসে দেখতে লাগছে না। বরং ফেইরি লাইটের সোনালি আলোয় ঝলমল হয়ে আছে। আশেপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। কটেজের সামনের স্কয়ার ধরনের লনটা ঝকঝকে তকতকে একদম। কিনারা ঘেষে লম্বা লম্বা দেবদারু গাছের সারি। সে-সবও সোনালি আলোয় মোড়ানো। সাজসজ্জা সীমিত রাখা হলেও, দেখতে রাজকীয় ভাবটা কিভাবে যেনো চলে এসেছে।
দু পরিবার, তাদের আত্মীয় সজন সবাই প্রায় চলে এসেছে, কালকের মধ্যে বাকিরাও চলে আসবে।
বাড়ির মেয়েদের জন্য মেহেদীর আয়োজন করা হয়েছে কটেজের সামনের ওই সবুজ লনটায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে এসেছে। এতদিন জনশূন্য থাকা জায়গাটি, শেয়াল খাটাশের আস্তানা হয়ে ছিলো। আচমকাই সেখানে এতো মানুষজাতির হৈ হল্লা বেশ চোখে পরার মতো।

মেহেদী পরতে ব্যাস্ত সকলে। দু পাশে দু’জন মেহেদী পরাচ্ছে প্রিয়ার হাতে। বাকিরাও ব্যাস্ত এসবের মধ্যে। শিয়া একহাতে সামান্য একটু মেহেদী পরতেই বাচ্চার কান্নাকাটি তে উঠে চলে যেতে হয়েছে। তাকেই সামলাচ্ছে অন্ধকার মুখে। অয়নের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত প্যান্ডেলের কাজে আটকা পরে আছে। রাতুল অবশ্য মিনিট পাঁচেক পরপর এসে দর্শন দিয়ে যাচ্ছে। বেচারা নব বিবাহিত কি-না! দোতলার করিডরে, আকাশের রুম হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যে রুম। সেখানটায় দাঁড়ালে স্পষ্ট চোখে পরছে মেয়েদের আয়োজন টুকু। মৃদু স্বরে গান বাজছে, প্রিয়াকে ঘিরে হাসি তামাশার শেষ নেই সবার। মেয়েটার গায়ে সবুজ শাড়ি। মাথায় সোনালী দোপাট্টা ঝুলিয়ে রাখা। খোলা চুলগুলোর মধ্যে গুঁজে রাখা জুঁই ফুল। আকাশ কাঠের নড়বড়ে রেলিঙের ওপর হাত রেখে ঝুঁকলো। আরও খানিকটা গভীর ভাবে দেখার চেষ্টা করলো প্রেয়সী কে। কি নিয়ে কথা হচ্ছে এতো? আকাশ স্পষ্ট দেখলো, মেয়েটা লজ্জায় রাঙিয়ে উঠছে।
—’ বিয়ে টা হতে দে অন্তত। এমন ভাবে তাকিয়ে আছিস, গিলে খাবি চোখ দিয়েই। আজব পুরুষ তুই! মেয়ের বাড়ির লোক তোকে দেখলে বলবে, পাত্র’র নজর খারাপ। ‘
পিছন থেকে খ্যাকখ্যাক হাসির শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। আকাশের বুঝতে বাকি রইলো না, তার হাড়বজ্জাত বন্ধুগুলো এসে হাজির হয়েছে। আকাশ ফিরেও তাকালো না। তার আগেই হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এসে পাশে গাদাগাদি করে দাঁড়ালো রাকিব,রাতুল আর রেদোয়ান। সবকটার পরনে পাঞ্জাবি। ঘেমে-নেয়ে একাকার। ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেলো আকাশ। ছেলেগুলো সারাক্ষণ পরিশ্রমের ওপরেই।

ঘড়ির কাটা টিকটিক করছে রাত দু’টো পয়তাল্লিশ মিনিটে। অথচ মেয়েদের হৈ হল্লা এখনো শেষ হয়নি। আসমানে আজ জ্বলজ্বল করছে তাঁরকা রাশি। আকাশ এক পাক গিয়েছিলো নিচে, মেয়েগুলো প্রিয়ার কাছেই ঘেঁষতে দেয়নি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যাথা হওয়ার দশা আকাশের। মশা কামড়াচ্ছে। ঘুম ধরছে তার, সারাদিন তো ছোটাছুটি কম হয়না। কিন্তু মেয়েটাকে এক নজর কাছ থেকে না দেখে ঘুমাতে যাবে! তাই হয়? হাত ভর্তি মেহেদী পরেছে, সেটা একবার দেখবে না? অথচ বে আক্কেল মেয়ে সেই যে গল্প জুড়েছে হাটু ভাজ করে, উঠে আসার নাম গন্ধ নেই।

আকাশের মনের দুঃখ সম্ভবত বুঝলেন ওপরওয়ালা। ঝকঝকে পরিষ্কার আসমানের তাঁরা গুলো মুখ লুকালো মেঘের বুকে। গুড়গুড় শব্দ করে ডেকে উঠলো। গল্পের আসর ভাঙলো সেই শব্দে। একেকজন ব্যাস্ত হয়ে সময় দেখলো। একেকজনের চোখমুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এতরাত হয়েছে টেরই পায়নি মেয়েগুলো।
প্রিয়া যখন গুটিসুটি পা ফেলে আকাশের রুমের সামনে এসে দাড়ালো তখন আকাশ সবেই বিছানায় গিয়েছে। ঘর অন্ধকার করে ঘুমের ভান করে পরে আছে। সরু চোখে তাকিয়ে আছে দরজার পানে। প্রিয়া ইতস্তত করলো কিয়ৎক্ষন। বেশ রাত হয়েছে। আকাশ জেগে আছে কি-না সেটাও কথা। এদিকে দু হাত ভর্তি মেহেদী পরেছে। যার নামে, যার জন্য এই মেহেদী তাকে দেখাবে না! ডান হাতটা মুখের সামনে ধরলো। ড্রিম লাইটের মৃদু আলো আঁধারির মধ্যে জ্বলজ্বল করলো আকাশের নামটা। ঠোঁট টিপে হেসে ফেললো প্রিয়া। বিয়ের সময় দু হাত ভর্তি মেহেদী পরা অনেক দিনের ড্রিম ছিলো তার। প্রথমবার বিয়েতে সে-সব কিছুই হয়নি। সাতপাঁচ ভাবাভাবির মধ্যেই নিঃশব্দে দরজা ধাক্কা দিলো মেয়েটা। দরজা খোলা! নিঃশব্দেই ঘরের ভিতরে ঢুকতে চাইলো। হচ্ছে না সেটা। হাতের কাচের চুড়ি,পায়ের নূপুর সব একসাথে ঝংকার তুলেছে যেনো।
বাইরের গুড়গুড় মেঘের শব্দ হচ্ছেই। পর্দা সরিয়ে রাখা জানালা ভেদ করে বাইরের সেই আলোর ঝলকানি ঘরের মধ্যে আসছে। আকাশ দেখলো মেয়েটার চোরের মতো ঘরে ঢোকা। নড়াচড়া তো করলোই না। বরং খুলে রাখা চোখটা বন্ধ করে ফেললো। রমনীর চঞ্চল পা জোড়া এসে থামলো বিছানার একদম পাশে। হাটু ভেঙে মেঝেতে বসে স্বামীর কপালের এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে সরাতে সরাতে মিহি কন্ঠে ডেকে উঠলো,

—’ মেহেদী পরলাম কার জন্য? কাকে দেখাবো? সাহেব তো ঘুমেই কাঁদা। ‘
প্রিয়াকে ভূত দেখার মতো চমকে দিতে, তৎক্ষনাৎ চোখ মেললো। ধড়ফড়িয়ে ওঠা মেয়েটার হাতজোড়া নিজের দখলে নিলো। মেহেদী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। আকাশ পিঠে বালিশ ঠেকিয়ে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসতে বসতে বললো,
—’ মনে তো হচ্ছিলো না, যার জন্য মেহেদী পরেছো, তাকে দেখানোর কোনো ইচ্ছে আছে।’
প্রতিবাদ করে উঠলো প্রিয়া।
—’ কেনো থাকবে না? এতো আয়োজন কার জন্য হুম? দেখাবো না মানে!’
নিজের হাতের মাঝে দেখা আকাশের নামটা উদ্দেশ্য করে বললো প্রিয়া। আকাশ দেখলো। একবুক প্রশান্তি নিয়ে মৃদু হাসলো। মেয়েটা তখন মেঝেতে ওভাবেই বসে আছে। আগ্রহ নিয়ে দু হাত বাড়িয়ে রেখেছে স্বামীর দিকে। সারাদিনের ক্লান্তি তার চোখেমুখেও স্পষ্ট। ঘুমে চোখজোড়া ফুলে উঠেছে। আকাশ দু’হাতে টেনে বিছানায় আনলো মেয়েটাকে। মোমের মতো হাতভর্তি কাচের চুরি। এগুলোর শব্দেই আকাশ মূলত টের পেয়েছিলো দরজার ওপাশে তার ব্যাক্তিগত নারীটির অস্তিত্ব। বিনাবাক্যে সে-সব খুলে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললো,

—’ আজকে এখানে ঘুমাবে।’
আৎকে ওঠা দৃষ্টি আকাশের মুখের দিকে তাক করে, লাজুক কন্ঠে বিরবির করলো,
—’ তা কি করে হয়। ঘরে এরিন, আরশি, রাকা আপু ওরা শুয়েছে। আমি বলেছি আপনাকে দেখিয়েই চলে আসবো। না গেলে বিষয়টা লজ্জার হয় না?’
আকাশের নির্বিকার মুখের আদলের কোনো পরিবর্তন হলো না। মেয়েটার গা থেকে গহনাগুলো খুলতে খুলতে জবাব দিলো,
—’ ঠান্ডা মস্তিষ্ক দিয়ে ভাবলে বিয়ে জিনিসটাই লজ্জার, পাখি। তুমি রাতে বা’সর করবে তা সবাই জানে। আয়োজন করে সেই খাটও সাজিয়ে দেয়। তাহলে! ও কিছু না।’

—’ তবুও। আর একটা রাতই তো।’
—’ আমার জন্য সেটা কতটা দীর্ঘ জানো সেটা?’
প্রিয়া ঠোঁট টিপে হাসলো। দু হাতে আকাশের গ্রীবাদেশ আঁকড়ে ধরতে ধরতে ফিসফিস করে বললো,
—’ ধৈর্যের ফল কিন্তু মিষ্টি হয়।’
আকাশের হাতের অশালীন স্পর্শ তখন প্রিয়ার শাড়ির আঁচল ভেদ করে কোমড় ছুঁয়েছে। প্রিয়ার সাথে তালে তাল মিলিয়ে সে-ও জবাব দিলো,
—’ আমি মিষ্টি পছন্দ করি না, পাখি। আমার টক,ঝাল,তেঁতো সব চলবে। এবং এই মূহুর্তেই লাগবে। ‘
—’ আ..আপনি..!’
—’ একটু খারাপ হবো। তবে রুড হবো না প্রমিজ। সুস্থ স্বাভাবিক হেঁটে নিজের রুমে যেতে পারবে। স্বামীর মন রক্ষার্থে এতটুকু সহ্য করতেই পারো। পারো না? ‘

ছেলেকে নিয়ে জেলখানার একটি বন্ধ কামড়ায় বসে আছে সৌমি। রিয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছে সে। আকাশ প্রিয়ার বিয়েতে একটাবার দেখা করে ওই রাতের ফ্লাইটেই দেশ ছাড়বে মেয়েটা। শেষ একটাবার স্বামীর সাথে দেখা করতে এসেছে। ছেলেটা তার সবে কয়েকমাস বয়স। বাপের ছোঁয়া এখনো পায়নি, নাম রাখা হয়নি ছেলের। আর কখনো দেখা হোক বা না হোক। একটা বার বাপ ছেলের দর্শন প্রয়োজন।
রিয়ান নাকি দেখা করতে চায়নি। একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। সৌমি ছেলেকে আগলে বসে আছে। ক্ষনে ক্ষনে কেঁদে উঠছে ছেলেটা। জেলের এই বদ্ধ কামড়ায় ভালো লাগছে না ওর। সৌমি উঠে দাঁড়ায়। ফিডার টা মুখে গুঁজে কোলে নিয়ে দুলাতে থাকে ছেলেটাকে। তবুও থামছে না। খানিক পরপরই হু হু করে উঠছে। সৌমি ছেলের মুখের দিকে অসহায় তাকায়। এই কয়েকমাসের ছেলের মুখের আদল দেখেই বলে দেওয়া যায়, বাপের চেহারা পেয়েছে। অবিকল রিয়ান। সৌমি হাসে। ছেলেকে উঁচিয়ে চুমু খেয়ে বলে,

—’ তোমার বাবা কে ভুলতে দেবে না তুমি। তাইনা? হুম? বাবা তো মানে না তোমায়, আব্বা। তোমার চেহারা দেখেও কি মন গলবে না তার? হু? গলবে না। না গললো, আমার তুমি আছো, আর তোমার আমি। আর কি লাগে! তাইনা? খোদা আর কিছু রাখেনি আমাদের ভাগ্যে। এবার দেখবো তোমার বাবা তোমার কি নাম রাখে। তারপর আমরা চলে যাবো, হ্যা?’
রিয়ান বড্ড অনিহার সাথে ঘরে ঢুকছিলো। হ্যান্ডকাফ খুলে ভিতরে ঢুকতেই থমকালো সে। সামনের মেয়েটির পোষাক পরিচ্ছেদ বড্ড অচেনা তার জন্য। সৌমি সালোয়ার সেট পরেছে! খোলামেলা জামাকাপড়ের বাইরে এই প্রথম হয়তো শালীন পোষাকে দেখলো সে।
পিছনে শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাতেই, চোখাচোখি হলো তাদের। রিয়ান খেয়াল করলো। যে হাতে একসময় মদের গ্লাস ধরা থাকতো, সেই ব্রেসলেট, আংটি ভর্তি হাতজোড়ায় এখন একটা ছোট্ট শিশু। কোনো অলংকারের চিহ্ন অবধি নেই। দক্ষ হাত একহাতে শিশুটিকে আগলে, অন্যহাতে ফিডার ধরে আছে। রিয়ান ভ্রু জোড়া কুঁচকে এগিয়ে এলো। সৌমিও এগোলো। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,

—’ শুকিয়ে গেছো অনেক।’
—’ এখানে আমাকে জামাই আদর করতে রাখে না।’
—’ তাও ঠিক। বোসো, দাঁড়িয়ে কেনো?’
রিয়ান বসে। দৃষ্টি গিয়ে আটকায় সৌমির কোলের মধ্যে থাকা ছোট্ট প্রানটার দিকে। থমকায় সে। শ্বাস আটকে আসে। অবিকল তার প্রতিচ্ছবি। এটা তার সন্তান! যাকে জন্মের পর এই প্রথম দেখলো! রিয়ানের অবাক হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে সৌমি মৃদু হাসলো। বাচ্চাটাকে একহাতের রেখে, অন্য হাতে ব্যাগ থেকে দু’টো কাগজ বের করলো। টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললো,
—’ তোমার ছেলে এটা। না মানলেও, ডিএনএ রিপোর্ট টা মিথ্যা ছিলো না। তোমারই ছেলে ও। যা বলছিলাম, ছেলের একটা নাম রাখা হয়নি। কি রাখা যায় বলোতো?’
—’ জানিনা।’
—’ উহু, এটা সুন্দর নাম না। “জানিনা” আমার ছেলের নাম রাখবো নাকি। আজব! ভালো নাম বলো।’
রিয়ান স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। মিনিটখানেকের মাথায় আচমকা বলে ওঠে,
—’ রুশদী? ‘
হাসি চওড়া হলো সৌমির। কাগজগুলো রিয়ানের দিকে ঠেলে দিতে দিতে বললো,
—’ ঠিকাছে। রুশদী। নিবন্ধন করে নেবো ওখানে গিয়ে। তুমি কাগজগুলো দেখে নাও।’
ছেলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভ্রু কুচকে তাকায় কাগজগুলোর দিকে। গম্ভীর কন্ঠে বলে,

—’ এগুলো কি?’
—’ একটা তোমার জামিনের কাগজ। সেটা আকাশ ব্যবাস্থা করেছে। আর একটা আমাদের ডিভোর্সের। ‘
মুখ তুললো রিয়ান। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ ডিভোর্স? ‘
—’ আমরা পরশু লন্ডন চলে যাচ্ছি। আকাশ -প্রিয়ার বিয়ে জানো না নিশ্চয়? সবাইকে জানিয়ে, আয়োজন করে বিয়ে হচ্ছে। ওটা এটেন্ড করে রাতে আমাদের ফ্লাইট। আমার উকিল তোমার সাথে যোগাযোগ করবে, কাগজপত্র তার হাতেই পাঠিয়ে দিয়ো। আমি সই করে দিয়েছি। আর তোমার কাল জামিন হবে। বের হয়ে একটা সুন্দর লাইফ লিড করো। বিয়ে থা করে ভদ্র সভ্য জীবন যাকে বলে। আকাশ ক্ষমা না করলেও, একটা ব্যাবস্থা ঠিক করে দেবে। ওর কাছে ক্ষমা চেয়ো। নাও, রাখো কাগজগুলো।’
রিয়ান থমকে তাকিয়ে থাকে। একধরনের মিশ্র অনূভুতি হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে না, সেটা কি। কাগজগুলো দু’হাতে তুললো রিয়ান। থ হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। সৌমির কোলে থাকা বাচ্চারা ছটফট করছে, এখানে আর থাকতেই চাচ্ছে না সে। সৌমি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো। রিয়ানের দিকে তাকিয়ে হালকা কন্ঠে বললো,

—‘ ছেলেকে একবার কোলে নিতে চাও?’
রিয়ান তখনো পাথর হয়েই বসে আছে। কি করনীয় সে-সবের হিসেব হয়তো মেলাতে পারছে না। সৌমি বাচ্চাটাকে বাড়িয়ে ধরলো। ভাঙা কন্ঠে বললো,
—‘ চাও কি?’
ডানে বায়ে মাথা নাড়লো রিয়ান। চায়না, এটা বোঝালো। সৌমি অসহায় হাসলো। ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে নিতে নিতে বললো,
—‘ আসি। ভালো থেকো। ডিভোর্সের কাগজটা সই করে রেখো, কালকেই আমার উকিল দেখা করবে কিন্তু। ‘
সৌমি আর দাঁড়ায় না। ছোট্ট অংশটাকে আগলে বেরিয়ে আসে চারদেয়ালের কামড়া থেকে।

হলুদের ফটোশুট চলছে সেই সকাল থেকে। গাড়ি নিয়ে কটেজ ছেড়ে আরও খানিকটা ভিতরের রাস্তায় এসেছে সবাই। সবুজে মোড়া পাহাড়ের মধ্যে হলুদ পরী সেজে ছবি তুলতে ছোটাছুটি করে যাচ্ছে প্রিয়া। বলাবাহুল্য আকাশ ছুটছে তার পিছু পিছু। ফটোগ্রাফার সহ বাকিরাও মুখ টিপে হেসে যাচ্ছে। আকাশ বরাবরই ছবি তোলার ক্ষেত্রে বড্ড অনীহা দেখিয়ে এসেছে। বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা কাজিনদের আলাপ-আলোচনায়–তাকে ছবি তুলতে রীতিমতো ঝক্কি পোহাতে হতো সকলকে। তার পরেও মানানো যেতো না। তবে আজ তার ব্যাতিক্রম। বড্ড স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, বাধ্য পুরুষের মতো স্ত্রীর পিছু পিছু ছুটছে সে বেচারা। গোটা মুখজুড়ে কোত্থাও একবিন্দু বিরক্তির ছাপ টুকু অবধি নেই। আকাশের ভাই-বোনগুলো সবাই এসেছে। খানিক আগে, ওদিককার কাজ সামলে রাতুলরাও এসে যোগ দিয়েছে। তারা এসেছে মূলত ওদের তাড়া দিতে। এখানকার ফটোশ্যুট শেষ করে আবার কটেজ ফিরতে বলেছে চৌধুরী কর্তা। গিন্নিরা হলুদ গোসলের আয়োজন করেছে। রীতিমতো সে-সবও করতে হবে তো নাকি!
প্রিয়া একের পর এক পোজ শিখিয়ে দিচ্ছে আকাশকে। আকাশ সে-সবে মন দিয়ে আছে। রাতুলরা হতভম্ব একপ্রকার। বাধ্য হয়ে ছেলেটা মুখ ফসকে বলেই ফেললো,

—’ ছবি তোলার তোর এতো শখ, জানতাম না তো ভাই! আমরা কি দোষ করেছিলাম? তোর বউ তো রীতিমতো তোকে ধমকাচ্ছে পোজ জানিস না বলে। অথচ আমরা হাতে পায়ে ধরতাম এক প্রকার। তাও আসতি না।’
আকাশের উত্তর পাবে, এমন আশা করে প্রশ্নটা করেনি রাতুল। অবাক হওয়া থেকেই মুখ ফসকে বলা আরকি। বাকিরা শব্দ করে হেসে ফেলেছে। তবে সেসবের মধ্যেই শীতল কন্ঠে আকাশের কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
—’ বউ বললে পাহাড় থেকেও লাফ দিতে পারি, ফটোশুট আর এমন কি!’
হৈ হৈ করে উঠলো সকলে। প্রিয়া লজ্জা পেলো খানিকটা। ফটোগ্রাফারের উদ্দেশ্য বিরবির করে বললো,
—’ হয়েছে। আর দরকার নেই। ‘
রাতুল বত্রিশ টা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে টিপ্পনি কাটলো আকাশকে,
—’ বউ পাগল হয়ে গেলি শা’লা। বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরতে দেখলেও অবাক হবো না।’

দিনের আলো নিভে রাত, রাত পেরিয়ে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। গতরাতে বেশিক্ষণ জাগা হয়নি কারোরই। সারাদিন তীব্র ধকল গিয়েছে সবার। হলুদ গোসলের আয়োজন শেষ করতে করতে বিকেল, তারপর ছেলেমেয়ে গুলোর নাচ গান তো আছেই। বিয়ে বাড়ির চূড়ান্ত ব্যাস্ততা আজকে। কটেজ পুরো আত্মীয় সজনে ভর্তি। দুপুরের পরপর কাজি সাহেব চলে আসবেন । নামাজের পর বিয়ে পরানোর কাজটা শুরু করা হবে। পার্লার থেকে লোক এসেছে সেই ভোরবেলা। প্রিয়ার ঘরে পা ফেলার জায়গা টুকু অবধি নেই। বাড়ির মেয়ে বউরা সব গিয়ে জমায়েত হয়েছে সেখানে। অতিথিদের খাওয়াদাওয়ার পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। বর নিজেই বাকিদের সাথে তদারকি করছে সে-সবের। ছিমছাম প্যান্ডেল হয়েছে পুরোটা জুড়ে। পাহাড়ের ওপরে এক টুকরো মেঘের ওপর ঝলমলে কটেজটা। দিনের সময় ঠেলেঠুলে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সময় এলো। যোহরের নামাজ আদায় করার পরপরই বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হলো। প্রিয়ার বাবা মা কাঁদছে। তাদের সেই ছোট্ট পুতুলটাও আজ বউ সেজেছে। সংসার জীবনে পা রাখতে চলেছে। ছোট্ট পুতুলটার এখন পুতুলের সংসার ছেড়ে, সত্যিকার সংসার হবে। স্বামীঘর হবে।

কবুল পরানো শেষ হতেই, স্ত্রীর হাত খানা নিজের পুরুষালি হাতে ভাজে তুলে নিলো আকাশ। আজকে তাদের গোপনে বিয়ের একবছর। আর এই দিন-ই পুরো দুনিয়াদারী জানিয়ে দ্বিতীয় দফা তার ভালোবাসার নারীটিকে নিজের করে পেলো, সর্বসম্মতিক্রমে।
আকাশ টের পেলো তার অর্ধাঙ্গিনীর শরীরের কাঁপন। মেয়েটা ঘোমটার আড়ালে নত মুখে বসে আছে। আকাশের হাতের স্পর্শেই থরথর করে কেঁপে উঠলো, আটকে রাখা নোনাজল গড়িয়ে পরলো পেলব গালে। অশ্রুকণা গুলো গিয়ে ঠাঁই নিলো আকাশের হাতের তালুতে। যুবকের নিজেরও চোখ জ্বালা করছে, দু’হাতে স্ত্রীর মুখের ওপরের কাপড়টুকু আলগোছে সরিয়ে ফেললো। হাত বাড়িয়ে তর্জনি ছোঁয়ালো সেই বহমান অশ্রুকনায়। খানিকটা দুরত্ব ঘুচিয়ে, কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে নিচু গলায় বললো,

—’ কাঁদছেন কেনো, মিসেস চৌধুরী? স্বামী পছন্দ হয়নি?’
আকাশ অতটাও ধীরে বলেনি কথাগুলো। উপস্থিত সবার মধ্যে হাসির রোল পরে গেলো। প্রিয়া লজ্জা পেলো খানিকটা। ঠোঁট টিপে নত মস্তিষ্ক, আরও খানিকটা নত করলো। বড়রা কাজি সাহেব কে নিয়ে খানিকটা সরে যেতেই, আকাশের হাতজোড়া আদুরে ভঙ্গিতে আকড়ে ধরলো মেয়েটার ফুলো ফুলো গাল। গ্রীবা ঝুকিয়ে চুমু আঁকলো স্ত্রীর শীতল ললাটে। আদুরে স্বরেই বললো,
—’ আপনাকে বিবাহ বার্ষিকীর অনেক অনেক শুভেচ্ছা, মিসেস আকাশ এহনাজ চৌধুরী। জীবনের শেষ দিন অবধি আমি আপনাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী রুপে দেখে যেতে চাই। আপনার ভালোবাসায় নিজেকে সিক্ত করতে চাই। আমাদের পঞ্চাশ তম বিবাহবার্ষিকী একগাদা নাতিপুতিদের নিয়ে উদযাপন করতে চাই। সুযোগ দেবেন তো? ততদিন ভালোবাসবেন তো?’
কান্নারত মুখেও হেসে ফেললো প্রিয়া। ওপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো আকাশের প্রস্তাবে। মিহি আওয়াজে বললো,

—’ সুদে আসলে হাজার গুন ভালোবাসা ফেরত দিলে, একটু আধটু ভালো বাসতেই পারি।’
আকাশের মৃদু হাসিও প্রস্ব্যস্ত হলো এবারে। গাল ভরে হেসে কপালে কপাল ঠেকালো। প্রিয়ার সাথে তালে তাল মিলিয়ে বললো,
—’ ওই একটু আধটু ভালোবাসলে আমিও, সুদে আসলে ফেরত দিতেই পারি।’
—’ কথা দেওয়া রইলো কিন্তু। ‘
আকাশ শব্দ করে হেসে, বুকে জড়িয়ে নিলো স্ত্রীকে। মুগ্ধতার সাথে জবাব দিলো,
—’ কথা দেওয়া রইলো।’

আত্মীয় সজনরা একপ্রকার ঘিরে ধরে আছে নববধূ কে। চৌধুরী বাড়ির ছোট বউয়ের প্রশংসা সবার মুখে মুখে। নজর উতরিয়ে যাচ্ছে প্রায় সকলেই। আকাশ একে একে কথা বলছে সবার সাথে। অফিসের কলিগ রা থেকে শুরু করে, বিজনেস পার্টনার সবাই এসেছে। তাদের আপ্যায়নে করছে সে। প্রিয়ার আশেপাশে আরশি, এরিন রা সকলে। শিয়া তো নিজের ছেলেটার কান্নাকাটিতে অতিষ্ঠ একপ্রকার। অয়ন সামনে পরলেই দাঁতে দাঁত পিষছে বারংবার। ছেলে কাঁদছে, এতে বাপের দোষ টা কোথায় বুঝে উঠছে না অয়নের। বউয়ের ধারেকাছেও যেতে পারছে না। চোখের আগুনে ভষ্ম করে দিতে চাইছে মেয়েটা।
সৌমি এসেছে সেই দুপুরে। শিয়ার বাচ্চাটা যতটা চঞ্চল, সৌমির ছেলেটা ঠিক ততটাই শান্ত। মায়ের বুকে লেপটে ছিলো সারাদিন। এখন অবশ্য প্রিয়ার কোলে। মেয়েটা একদম তৈরিই হয়ে এসেছে। এখান থেকে সোজা রাতের ফ্লাইট ধরবে। প্রিয়ার সাথে টুকটাক কথার মধ্যেই ভির ঠেলে আকাশ এগিয়ে আসতেই, বাকিরা সরে গেলো। সৌমির মলিন হাসলো আকাশের দিকে তাকিয়ে। মলিন গলায় বললো,

—‘ জামিনের জন্য থ্যাংক ইউ। ‘
—‘ তোমার ফ্লাইট আজই?’
—‘এগারোটায়।’
—‘ যাচ্ছোই?’
—‘ না গিয়ে উপায় কি?’
প্রিয়ার আজকে বেশ কান্না পাচ্ছে। রুশদী কে বুকে আগলে হাত ধরলো সৌমির। সৌমি হাত বাড়িয়ে মুছিয়ে দিলো মেয়েটার চোখের পানিটুকু। আদুরে গলায় বললো,
—‘ তোমাদের হানিমুন কিন্তু লন্ডনে হতে হবে। এটা কথা দিতে হবে। আর আমার সাথে নিয়ম করে যোগাযোগ রাখতে হবে। বোনকে মনে থাকবে?’
প্রিয়া মাথা ঝাকালো। আকাশের দিকে ফিরে বললো,
—‘ আমার পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞ আমি আকাশ। যা যা করেছি। তা সত্ত্বেও… ‘
মেয়েটার মাথায় হাত রেখে থামিয়ে দিলো আকাশ। হাত বুলিয়ে বললো,
—‘ বোন হিসেবে যতটুকু করা যায় করেছি, সামনেও করবো। সাবধানে থাকবে। বাবাকেও সাবধানে রাখবে। আমি যোগাযোগ রাখবো।’

রাতুল, রাকিব, রেদোয়ান, রাকা, তুষিরাও এসে জমেছে এতক্ষণে। টুকটাক কথাবার্তা হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। এরইমধ্যে হাস্যজ্জল আলাপ আলোচনায় ছেদ পরলো। থমকালো সবাই। ভির ঠেলে এগিয়ে আসা একটা রুগ্ন পুরুষ মানুষের দিকে দৃষ্টি সবার। আতঙ্কিত হলো প্রিয়া। চট করে দৃষ্টি ফেললো আকাশের দিকে। আকাশ নির্বিকার। কোনো ভাবান্তর হলো না। হাতে ছোট্ট একটা প্যাকেট। কাচুমাচু মুখটা নিয়ে এগিয়ে এসেই অপ্রস্তুত হাসলো। ধীর কন্ঠে বললো,
—‘ দাওয়াত ছাড়াই এসে পরলাম। বউ বাচ্চা কে নিতে এসেছি। ‘
রিয়ান কে দেখে যতটা না চমকেছে সকলে, দ্বিগুণ চমকালো রিয়ানের মুখের এই বাক্যখানায়। বিষ্ফরিত নয়নে তাকালো সৌমি। হাতের উপহার টা আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
—‘ পায়ে ধরলে ক্ষমা করবি? নাকি নাকে খত দিতে হবে? সব করবো। ক্ষমা করা যায় কি?’
আকাশের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই। আকাশ কথা বাড়ালো না। হাত বাড়িয় উপহার টা নিয়ে রাতুলের হাতে দিতে দিতে বললো,

—‘ ক্ষমার যোগ্য তুই?’
—‘ না নই।’
—‘ আমি ক্ষমা করার কেউ নই। তখন যেটা বললি সেটা কর। তাতেই খুশি হবো আমি।’
রিয়ান আরও কিছু বলবে, তার আগেই তাকে থামালো রাকিব। নিচু গলায় বললো সময় দিতে। আকাশের রাগ,অভিমান জমে আছে। বন্ধুত্বের আঘাত এত সহজে মিটবে? সময় লাগবে। রিয়ান ছোট্ট করে ক্ষমা চেয়ে নিলো প্রিয়ার থেকে। ধীরেসুস্থে খানিক দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা সৌমির দিকে এগিয়ে গিয়ে হালকা স্বরে বললো,
—‘ আসামি হয়ে ছেলে কোলে নেওয়া, তাও প্রথম বার। খারাপ দেখাতো। এখন দাও।’
সৌমি জবাব দেয় না। ছেলেকে এগিয়ে দেয় রিয়ানের দিকে। ছেলের কপালে ছোট্ট চুমু খেয়ে বন্ধুদের দিকে ফিরে বললো,
—‘ অভদ্র ছেলেটা বাপ হয়ে গেলো। ভাবতে পারিস?’
অশ্রুসজল সবার চোখ। সৌমির দিকে ফিরে বললো,
—‘ ডিভোর্সের কাগজটায় সইও করেছিলাম। রাস্তায় ড্রেনে পরে গিয়েছে। সুতরাং সংসার টা করতেই হবে। লন্ডন তো ঘর করে দিতে পারবনা। ঢাকায় একটা ছোটখাটো বাড়ি আছে। হয়ে যাবে বলো? তাছাড়া তোমার বাপের তো টাকা আছেই। একমাত্র নাতির জন্য এতটুকু খসাবেন না?’
সৌমি ডুকরে কেঁদে উঠলো । ছেলেকে সহ জড়িয়ে ধরলো ছেলের বাপকেও।

গোটা কটেজ নিস্তব্ধতায় ঘেরা। হবে না-ই বা কেনো। রাত কতটা গভীর সে খবরও তো রাখতে হবে নাকি! বাড়িভর্তি মানুষজন। বিয়ের আয়োজন শেষে সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন। প্রিয়ার শরীরে একটা পাতলা শার্ট । সবেই পরিয়েছে আকাশ। তার নিজের শরীরে একটা শার্ট গলিয়ে আলগোছে মেয়েটার বিধ্বস্ত শরীরটা তুলে নিলো দু’হাতে। দূর্বল শরীরে মেয়েটা লেপটে রইলো আকাশের বুকের ওপর। প আকাশ তাকে বুকে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। মিটিমিটি করে তাকালো প্রিয়া। দোতলার করিডর ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিচের টিমটিমে ড্রিম লাইটের লাল আলোয় সামান্য মুখাবয়ব বুঝতে পারা যাচ্ছে। প্রিয়া ফিসফিস করে বললো,
—’ কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
—’লং ড্রাইভে।’
আৎকে উঠলো মেয়েটা। সময় কত সেটা দেখা হয়নি। তবে সাজানো গোছানো ফুলেল ঘরে আকাশ যখন প্রবেশ করে, ঘড়ির কাটা তখন রাত দশটায়।
তারপর আকাশের উন্মাদনায় সাড়া দিতে দিতে সে তান্ডবের সমাপ্তি ঘটেছে কখন তার হিসেব নেই প্রিয়ার কাছে। তবে গভীর রাত এখন! প্রিয়া কোনোমতে বললো,

—’ বুকে নিয়ে যেথায় খুশি নিয়ে যান। হাঁটতে পারবো না আমি।’
আকাশ মৃদু হাসলো । দ্রুত পায়ে নেমে এলো নিচে। সদর দরজা খুলে বেরিয়ে মেয়েটার ছেড়ে দেওয়া শরীর এনে বসালো গাড়িতে। নিজেও উঠে বসলো তৎক্ষনাৎ। ধীরেসুস্থে গাড়িটা বের করলো পার্কিং থেকে। কিছুদূর যেতেই গাড়ি থামিয়ে প্রিয়াকে তুলে নিয়ে এলো নিজের কোলের মধ্যে।
—’ এসি বন্ধ করে, কাচ নামিয়ে দিন। খারাপ লাগছে আমার।’
আকাশ শুনলো। কাচ নামিয়ে দিতেই শীতল বাতাস এসে ঝাপটা দিয়ে গেলো চোখেমুখে। ঝিরঝির বৃষ্টির ছোঁয়াও অনুভব করলো দু’জনে। প্রিয়ার বোধহয় এখন ভালো লাগলো খানিকটা। অন্ধকার হয়ে থাকা মুখটা স্বাভাবিক হলো। আবেশে চোখ বুজে রইলো আকাশের শার্টের আস্তিন চেপে। ওপরের বোতাম তিনটে খুলে রাখা। প্রিয়ার তপ্ত গাল গিয়ে ঠেকে আছে সেই বলিষ্ঠ বুকে। ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে আশেপাশের জঙ্গলের মধ্যে থেকে। পথিমধ্যে আর একটা গাড়িঘোড়ার চিহ্ন অবধি নেই। কোথায় যাচ্ছে তারা,জানা নেই প্রিয়ার। জিজ্ঞেস ও করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

আকাশ একহাতে স্টেয়ারিং চেপে অন্য হাতটা রাখলো রমনীর আধভেজা চুলে। শাওয়ার নিয়ে দেরি করেনি আর। চুলগুলো শুকিয়ে নিয়ে আসা উচিত ছিলো। মধ্যরাতের তীব্র অন্ধকার ঠেলে গাড়ি এসে যেখানে পৌছুলো জায়গাটা বড্ড অচেনা প্রিয়ার কাছে। আশেপাশে এত ঘন ঘন ছোট বড় পাহাড়ের ভিরে পথঘাটও চোখে পরতে চায়না। স্ত্রীকে কোলে তুলে আকাশ বেরিয়ে এলো গাড়িখানা লক করে। সরু একটা পথ ধরে এগোচ্ছে ফোনের আলো জ্বেলে। দু হাতের বাঁধনে থাকা রমনীর ছোট্ট দেহটা নিশ্চুপ পরে আছে। মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে আকাশের বুকের ওপর। নানা জাতের পোকামাকড়, পশুপাখির আওয়াজ আর সাথে আকাশের পায়ের খচখচ শব্দ ছাড়া আর কোনো কথা হচ্ছে না দুজনের মধ্যে। আচমকা আকাশই নিচু গলায় শুধালো,

—’ কোথায় নিয়ে যাচ্ছি, জানতে চাইলো না?’
প্রিয়া দু’হাতে পেচিয়ে ধরলো স্বামীর গ্রীবাদেশ। আকাশের কাঁধে নিজের মুখ গুঁজে বিরবির করে বললো,
—’ উমমম, নাহ।’
—’ কেনো? ‘
—’ কারণ আপনি নিয়ে যাচ্ছেন।’
—’ আমি নিয়ে যাচ্ছি বলেই কোনো প্রশ্ন থাকবে না?’
—’ থাকবে না। স্বামীর বুকে মিশে আছি। মৃত্যুর দোরগোড়ায় নিয়ে গেলেই বা কি!’
ধুকপুক করতে থাকা বুকটা, বিট মিস করে একটা। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয় যুবকের। মেয়েটা সত্যিই বড্ড ম্যাচুয়র হয়েছে আজকাল। অবশ্য বাচ্চামো, আহ্লাদপনা এসব পরিস্থিতি বুঝেই করে। তাছাড়া বরাবরই বুঝদার সে। প্রায় মিনিট দশেকের আঁকাবাকা পথ পেরিয়ে আকাশ যেখানে এসে থামলো সেটা একটা পাহাড়ের চূড়া। চূড়ায় দাঁড়িয়ে গোটা শহর দেখতে পাওয়া যায়। প্রিয়া মুগ্ধ হলো। অস্বাভাবিক রকমের মুগ্ধ যাকে বলে।
পাহাড়ের কিনারা ঘেষে ছোট্ট একটা জুম ঘরের মতো। সেটার খোলা বারান্দায় নিয়ে এসে ছোট্ট একটা দোলনায় বসাতেই থমকালো প্রিয়া। চোখের সামনে যতদূর তাকানো যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আর অন্য পাশে গোটা শহরটা। আকাশ একবুক তৃপ্তি সহকারে দেখে অর্ধাঙ্গিনীর চোখের ঝলমল আলো। বুকের মাঝে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিতে নিতে বলে,

—’ পছন্দ হয়েছে? ‘
—’খুব।’
—’ বাড়ির চাবিটা কি এখনই নেবে? নাকি কটেজে ফিরে শাড়ির আঁচলে বেঁধে দেবো?’
প্রিয়া বুকের ওপর থেকে মুখ তুললো, অবাক করা কন্ঠে শুধালো,
—’ কিসের চাবি?’
—’ তোমার বাড়ি।’
—’ আমার বাড়ি?’
আকাশ ছোট্ট জুমঘরটার দিকে ইশারা করলো। যেটায় এই মূহুর্তে আছে তারা। চাপা গলায় বললো,
—’ বা’সর রাত বলো বা বিবাহবার্ষিকী –যেটাই হোক না কেনো। একটা গিফট তো দিতে হতো বউকে। সোনারুপা, অলংকার সে-সব তো সবাই দেয়। আমি না হয় আকাশের বুকে মেঘের দেশে, আকাশের প্রতি অগাধ প্রেম নিয়ে বসবাস করা এই পরীটাকে একটা ঘর উপহার দেই! এমন আকাশপ্রিয়া রমনীকে আকাশের বুকে কিছু না দিলে চলে?’

প্রিয়া ছলছল চোখে তাকালো স্বামীর দিকে। দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিলো দুজনকে। প্রকৃতির বুকে সাদরে আমন্ত্রণ করলো যেনো। প্রিয়া মুখ তুললো। শরীরে তীব্র যন্ত্রনা নিয়ে ঘুরে মুখোমুখি হলো। দৃষ্টি তে দৃষ্টি পরলো।
যুবকের শীতল ললাটে এলোমেলো হয়ে উড়তে থাকা অবাধ্য চুলগুলোকে আঙুল ছুয়িয়ে সরিয়ে দিলো মেয়েটা। দু হাতে পুরুষালি শক্ত গালজোড়া আঁকড়ে ধরে, চুমু আঁকলো স্বামীর কপালে। ঠোঁট জোড়া স্থির হয়ে ছুঁয়ে রইলো সেখায়টায়। আবেশে চোখবুজে রইলো ছেলেটা। পুরোটা সময় অনূভব করলো নরম অধরের আদুরে স্পর্শ। গোটা টা মুখ জুড়ে আদর এঁকে তবেই ক্ষান্ত হলো রমনী৷ হরিণীর মতো ডাগর ডাগর আঁখি জোড়া তখন টইটম্বুর। আকাশ স্থির হয়ে আছে, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রমনীর সুশ্রী মুখপানে। প্রিয়া নাক টানলো। শুকিয়ে আসা অধরোষ্ঠ জিবে ভিজিয়ে, ভেজা গলায় বললো,
—’ আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি – সেটা কি জানেন আপনি?’
আকাশ নির্বিকার মুখে শুধালো,
—’ কতটা?’
প্রিয়ার ভেজা ঠোট ততক্ষণে ছুঁয়েছে আকাশের রুক্ষ অধর। সেখানটায় নিজ থেকে ছোট্ট করে আদর আকলো মেয়েটা। ফিসফিস করে বললো,
—’ এক আকাশ সমান ভালোবাসি।’

তীব্র বাতাসে এলোমেলো হয়ে আসছে প্রিয়ার খোলা চুলগুলো। চোখেমুখে লেপটে যাচ্ছে আকাশের। দু’জনেই কারোরই অবশ্য সে-সবে খেয়াল নেই। রমনীর শরীরে জড়িয়ে থাকা, আকাশের সুদীর্ঘ শার্টখানা বাতাসের সাথে ফুলে উঠছে। বুকের ওপর থেকে সরে যাচ্ছে শার্টের আস্তিন। আকাশের ঘোলা দৃষ্টি সরতে চায়না অন্যদিকে। শার্টের খোলা অংশে ভেদ করে দৃষ্টি গিয়ে আটকায় সুডৌল বক্ষবিভাজনে। খেই হারায় ছেলেটা। প্রিয়ার বাক্যটার প্রতিত্তোর না করেই মুখ ডুবায় সেখায়নে। ভেজা চুমু একে, কামড়ে ধরে নরম অংশটুকু। ব্যাথায় গুঙিয়ে ওঠে প্রিয়া। আকাশ ব্যাথা নিবারনেও বেশ সচেতন। জিবের ডগা ছুঁয়িয়ে দিয়ে লেহন করে নিলো সদ্য দেওয়া ক্ষত স্থান। মুখ তুলে বললো,
—’ এই ভালোবাসা কখনো বিলীন হলে, আমিও বিলীন হবো,পাখি।’
প্রিয়া ভেজা চোখেও অমায়িক হাসে। নিজ হাতে টেনে নেয় আকাশের মাথাটা। নিজের উন্মুক্ত বুকে চেপে ধরে শান্ত করতে চায় ঝড় উঠে থাকা বুকটা। ফিসফিস করে বলে উঠলো,
—’ আমার শুরু থেকে সমাপ্তি – সবটা আপনাতে গিয়ে অন্ত ঘটেছে, আকাশ এহনাজ চৌধুরী। আকাশের প্রতি প্রিয়ার এই এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসা – এ জনম, সে জনম, সব জনমেই বেঁচে থাকবে। এ প্রনয়ের অন্ত নেই, অন্ত নেই। ‘

বৃষ্টি নেই, গোটা আসমান এখন ঝকঝকে। পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিলো আকাশে। এখন নেই। তারাড মেলা বসেছে এখন। এখান থেকে নিচে তাকালে, সত্যিই মনে হচ্ছে আকাশের বুকে মেঘের মধ্যে বসবাস করছে তারা। প্রিয়া আচমকাই টের পেলো তার উন্মুক্ত বুকটা শীতল হচ্ছে, ভিজে উঠছে তপ্ত জলে। আকাশ কাঁদছে! প্রিয়া শক্ত করে আঁকড়ে ধরে স্বামী কে। নরম গলায় বলে,
—’ আদর চাইলে আদর দেবো। পুরুষমানুষ হয়েও কাঁদবেন তাই বলে?’
—’ কাঁদছি না।’
—’ টের পাচ্ছি তো।’
—’ আদর দাও তাহলে।’
—’ আগে বলুন কবে প্রেমে পরলেন আমার?’
—’ প্রথম দিনই, তুমি আকাশরঙা একটা শাড়ি জড়িয়ে, বৃষ্টি মাথায় ভোরবেলা বেরিয়েছিলে। আমাদের কটেজের ঠিক সামনের ওই রাস্তাটায় দেখেছিলাম তোমাকে। ‘
—’ আমি কিন্তু খেয়াল করিনি আপনাকে।’
—’ জানি তো।’
—’ তারপর?’
—’ তারপর মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে, টের পেলাম যে– আকাশ এহনাজের জীবনে কোনো এক পরীর আগমন ঘটেছে। মন টা খোয়া গিয়েছে আকাশ এহনাজ চৌধুরীর। ‘
শব্দ করে হেসে ফেললো প্রিয়া। হাসি মুখেই বললো,

—’ যে রাতে আপুকে খুঁজতে আপনাদের টেন্টের কাছে সেন্সলেস হ’য়ে ছিলাম, মনে আছে?’
—’ পুরোপুরি। ‘
—’ সেদিনই বুকের ভিতর কিছু একটা হচ্ছিলো আমার’
আকাশ নাক ঘষলো মেয়েটার বুকের ভাজে। আলতো করে চুমু আঁকতে আঁকতে বললো,
—’ এখন হচ্ছে না?’
—’ হচ্ছে। ‘
—’ মন কি চাচ্ছে?’
—’ আপনার গভীর স্পর্শ। ‘
—’ আজকাল মুখ ফুটে স্বামীর আদরও চাইছো?’
—’ আমারই তো সব। চেয়ে নিতে ক্ষতি কি!’
আকাশ মুখ তোলে। একহাতে অনাবৃত করে ফেলে রমনীর শরীরের ওপর জড়িয়ে থাকা ঢিলেঢালা শার্টটি। কাঁধের ওপর থেকে কাপড়ের অংশ নামিয়ে ফেলতে ফেলতে বললো,

—’আরেকবার আকাশ দর্শন করিয়ে আনি কেমন? নিজ মুখে আদর চাইছো। নিজেকে সামলাই কি করে।’
রমণীর লাজুক মুখটা আকাশের কাঁধে গুঁজতেই আকাশ কোলে তুলে নিয়ে এলো ছোট্ট ঘরটার ভিতর। রমনীর লতিয়ে যাওয়া দেহখানা বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে নিজে এসে আড়াল করো পুরোটা। কন্ঠদেশে গভীর করে আদর আঁকতেই গুঙিয়ে উঠলো বেচারি। সারারাত আকাশের করা ক্ষত গুলো এখনো চিনচিন করে যন্ত্রনা দিচ্ছে, তবুও বেহায়া মন, শরীর দুটোই আরেকদফা যন্ত্রণা চাইছে। আকাশ ঝড়ের গতিতে অনাবৃত করলো নিজেকে। রমনীর মাখনের মতো হাতজোড়া নিজের একহাতের বন্দি করে চেপে ধরলো বিছানায়৷ কপালে নিগুঢ় চুমু এঁকে গভীরে যেতে যেতে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,

—’ দূরের ওই নীল আকাশের প্রতি তোমার মুগ্ধতা আজীবন থাকুক। ওই আকাশের নীলিমায়, শুভ্র মেঘের বুকে লেখা থাকুক আকাশ-প্রিয়ার এক আকাশ পরিমাণ এক অপরকে ভালোবাসার গল্প। ‘
প্রিয়া জবাব দিতে পারলো না। নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। শরীর খিঁচুনি দিয়ে উঠেছে স্বামীকে নিজের দেহে স্থান দেওয়া মাত্র। আদরের মিষ্টি যন্ত্রনা, সাথে ব্যাক্তিগত পুরুষটার আদুরে কথাগুলো। চোখের কার্নিশ গড়িয়ে নোনাজল গড়িয়ে পরছে অবিরত। এই তান্ডবের মাঝেও নিজের ভেজা অধরজোড়া স্ত্রীর কন্ঠদেশে গুঁজে হাস্কিস্বরে বললো,

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৬১

—’ ভালোবাসি,পাখি। আমিও তোমাকে এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসি। আর আকাশ কি কখনো পুরানো হয়? হয়না। এ ভালোবাসা আজীবন অক্ষয় থাকুক। মৃত্যুতেও ভয় কোথায়? হালাল সম্পর্কের জেরে পরকালেও তুমি আমার। এর থেকে বড় প্রাপ্তি কি আর!’

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here