আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৫
অরাত্রিকা রহমান
রায়ান বাঁকা হেঁসে মিরার পা টা তার বুকের উপর থেকে সরিয়ে নিজের কাঁধে রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“এবার একটু বেশি মানিয়েছে।”
মিরার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা দুষ্টু হাসিটা তৎক্ষণাৎ মিলিয়ে গেল। সেকেন্ডের ব্যবধানে নিজের পা রায়ানের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলল-
“দে..দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি যাই দেখে আসি বনুর রেডি হওয়া হলো কিনা।”
কথাটা বলে যেই মিরা দরজার দিকে পা বাড়াবে ঠিক তখনই রায়ান পিছন থেকে মিরাকে নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে জাপ্টে ধরলো। মিরা নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো যেন এই ভয়টাই পাচ্ছিল। রায়ান আলতো করে মিরার কানের লতি তে একটা ছোট চুমু দিয়ে মিরার ঘাড়ের নিজের নাক ঘষলো আর ফিসফিস করে হাস্কি গলায় বলল-
“অপূর্ব লাগছে…!”
মিরার চোখের চাহনি সামান্য নরম হয়ে এলো মুহূর্তে। এক সেকেন্ডের সূক্ষ্ম সময়ের ব্যবধানে বাক্যের পূর্ণতা নিয়ে একটি শব্দ উচ্চারিত হয়ে তার কানে ভেসে এলো একই কণ্ঠ হতে-
“বরাবরের মতো।”
মিরা তার উদরের উপর আবদ্ধ রায়ানের দুহাতের বাঁধনের উপর হাত রেখে নরম গলায় মিনতি করলো-
“ছেঁড়ে দিন।”
রায়ান সাথে সাথে মিরার কাঁধে মুখ গুঁজে মাথা ঝাঁকিয়ে আওয়াজ করলো-“উঁহু..!”
বোঝাতে চাইলো তার এখন ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। মিরা কিছু বলার আগেই রায়ান মিরাকে নিজের মুখোমুখি ঘুরিয়ে নিয়ে মেয়েটার গলার মুখ ডুবিয়ে দিলো। প্রাণ ভরে একটা লম্বা নিঃশ্বাসের দ্বারা মিরার শরীরের সুবাস নিজের মাঝে টেনে নিয়ে গরম প্রশ্বাস ফেললো। মিরা খানিকটা অস্বস্তি তে পড়ে রায়ানের চুলের ভাজে আঙ্গুল গলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে আবারো মিনমিনিয়ে বলল-
“হয়েছে তো..এবার ছেঁড়ে দিন।”
-“উঁহু..!”
রায়ান জেদ ধরে মিরার গলার ভাঁজে মাথা না সূচক নাড়লো। মিরা অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। রায়ানের উচ্চতা খুব বেশি হওয়ায় মেয়েটার গলা বাঁকা হয়ে আছে সেই কখন থেকে অথচ রায়ান ছাড়ার নাম গন্ধ ও নিচ্ছে না। মিরা একদম না পারতে আবারো করুন সুরে বলল-
“প্লিজ… ছেঁড়ে দিন না।”
রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার মেনে নিল মিরার আবদার-“আচ্ছা।”
-“সত্যি সত্যি ছেঁড়ে দেবেন?”
মনের অজান্তেই মিরা মুখ ফসকে প্রশ্ন টা করে বসলো। ছাড়া পাওয়ার আশায় এতো মিনতি করার পর ছেড়ে দেওয়ার কথায় বউয়ের এমন প্রশ্নে রায়ান মুচকি হাসলো। মেয়েটার গলায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিষ্টি সুরে আওয়াজ করলো-
“উহু..!”
মিরা যেন ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারলো না কি বলল সে তার ঠিক কি হলো তার সাথে। থতমত খেয়ে রায়ান থেকে দ্রুততার সাথে নিজেকে পৃথক করে নিয়ে ঠোঁট উল্টে দ্বিধায় রায়ানকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন করলো-
“আচ্ছা..আপনি আমাকে দেখলেই এমন করেন কেন? কি হয়ে যায় আপনার?”
রায়ান নিজের মাথা চুলকে একটু লাজুক ভাব ধরে রসিকতায় মিরার চার দিক প্রদক্ষিণ করতে করতে গাইলো-
“যৌবনে লাগাইছো আমার..! এই দেহে আগুন 🔥
তোর ছোঁয়ায় আসে আমার অঙ্গেতে ফাগুন..🫠”
মিরা চোখ বাঁকিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এইটা কেমন কথা? এই গান তো আগে শুনিই নি।”
রায়ান মিরার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে তার থুতনি ধরে বলল-
“এই টা তো আমার অন্তরের কথা হৃদপাখি। শুনবা কিভাবে!”
মিরা রায়ানের কথায় আর পাত্তা দিল না। এই লোকের মুখে কোনো কালেই লাগাম ছিল না। মজার বাইরে গিয়ে রায়ান গম্ভীর গলায় মিরাকে প্রশ্ন করলো-
“আজকে সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকায় তোমার খাওয়া দাওয়ার খেয়াল রাখা হয় নি। সারা দিন, কখন কি কি খেয়েছ, আর কি কি খাও নি সবকিছুর লিস্ট বলো তো পাখি।”
মিরা রায়ানের প্রশ্নে থ মেরে গেল। এখন কি জবাব দেবে সে? সারাদিনে এতো আনন্দ খুশির মাঝে তা তার তেমন কিছু খাওয়াই হয় নি বলার মতো। এইটা রায়ান কে বললে আজ আর তার নিচে যেতে হবে না। কিন্তু মিথ্যা বলার মতো ও সাহস নেই।
-“কি হলো? বলো। কি কি খেয়েছ আজ?”
মিরা কথাটা ধামাচাপা দিতে গলার জোর দেখালো-
“কি অদ্ভুত! মনে আছে নাকি কি কি খেয়েছি। কত কিছুই তো খেলাম। গোটা বাড়ি জুড়েই তো খাবার। অনেক কিছু খেয়েছি। এতো মনে নেই।”
রায়ান মিরার গলায় স্বর শুনে চোখ দুটো বাজ পাখির মতো ছোট ছোট করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“গোটা বাড়ি জুড়েই খাবার তাই না? এতো খেয়েছ যে মনেই নেই। ওয়াও। এতো লক্ষ্মী মা পেয়ে তো আমার প্রিন্সেস ধণ্য। সারাদিন সে খাবার পেয়েছে।”
বাচ্চার কথা উঠতেই মিরা কেমন চুপ করে গেল। সত্যিই তো, যেহেতু সে আজ তেমন খায় নি তার মানে বাচ্চা টাও খাবার খায় নি ভালো করে। মিরা আনমনে পেটের উপর হাত রেখে মনে মনে জিজ্ঞেস করলো তার ভেতরের ছোট প্রাণ টাকে-
“মাম্মা..তোমার কি খিদে পেয়েছে?”
অদ্ভুত ভাবেই মিরার কিছু খেতে ইচ্ছে করলো তখন। রায়ান মিরাকে সন্দেহ ভরা নজরে কেবল পর্যবেক্ষণ করছে। মেয়েটা যে খাই নি সেটা তার মুখের ভাব নমুনায় স্পষ্ট। রায়ান ভারী কণ্ঠে মিরাকে আদেশ মূলক গলায় বলল-
“আমার দিকে তাকাও।”
মিরা পিটপিট করে চোখ তুলে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ান হাফ ছেঁড়ে নিজের হাত মুঠো করে সংযম রেখে বিড়বিড় করলো-
”All the time..all the fucking time..এমন ভাবে মায়াবী চোখে তাকাবে- একটু যে বোকবো তারও সুযোগ থাকে না। একটু ভালোবেসে আদর করবো সেটুকুও পারছি না। কি এক জ্বালার মধ্যে আছি।”
রায়ান মিরাকে বাড়তি আর কিছু বলার জন্য সময় নষ্ট করলো না। বিছানার পাশের সাইড টেবিলে থেকে একটা আপেল এনে মিরার মুখের সামনে ধরল। মিরা পলক ফেলে একবার রায়ান কে আর আপেলটাকে দেখলো। রায়ান মেজাজ দেখিয়ে ধমক দিয়ে বলল-
“হা করে তাকিয়ে না থেকে এটা হাতে নাও।”
মিরা হকচকিয়ে উঠে আপেল টা রায়ানের হাত থেকে নিয়ে নিল। এবার আপেল টা নিয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রায়ান রাগে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে জোরে চেঁচিয়ে বলল-
“হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকার জন্য দেই নি ওটা। খাওওও..!”
মিরা রায়ানের চেঁচানো তে ভয়ে কেঁপে উঠলো। এই কেঁদে দেবে দেবে এমন ভাব। চোখের গন্ডি তে অশ্রু কণারা খেলা করছে। মিরা আপেল টায় কামড় দিতে যাবে ঠিক তখনই থেমে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলে বসলো-
“এখন আপেল কামড় দিতে গেলে লিপস্টিক টা নষ্ট হয়ে যাবে তো।”
মিরার এমন কথায় রায়ান রাগী নজরে মেয়েটার ঠোঁটের দিকে চাইলো। রায়ানের ইচ্ছে করলো তখনি সেই লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে সব সাজ এলোমেলো করে দিতে। মেয়েটার গায়ের শাড়ির প্রত্যেকটা ভাঁজ এখন অসহ্য লাগছে তার। এক কদম এগিয়ে গিয়ে রায়ানের পা থেমে গেল। মিরার ছলছল চোখে চোখ পড়তেই খুব মায়া লাগলো তার। এখন উল্টাপাল্টা কিছু করে বসলে কান্নাকাটিতে কোনো ছাড় হবে না তা বোঝাই যাচ্ছে। এমন না সে আদর করার সময় মিরার কান্না তার উপর খুব প্রভাব ফেলে। কিন্তু এখন বিষয়টা আলাদা। মায়ের কান্না করা বাচ্চার জন্য ঠিক না। মূলত তাই এতো সচেতনতা ছেলেটার মাঝে।
মিরা একটু ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। না জানি এই বেপরোয়া পুরুষ টা কি করে বসে এখন। রায়ান মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে আপেল টা নিয়ে নিল। মিরা কিছু টা অবাক চোখে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ানের কঠোর কণ্ঠ হতে প্রশ্ন এলো-
“চিবোতে পারবে নাকি দাঁতেও লিপস্টিক লাগিয়েছ?”
মিরা মাথা উঁচু করে নিয়ে শান্ত জবাব দিল-“পারবো।”
রায়ান ফলের ঝুড়ির দিকে তাকালো সেখানে কোনো ছুড়ি নেই। ইচ্ছে করেই রাখা হয়নি, যদি কোনো অঘটন ঘটে! তাছাড়া মিরা চট্টগ্রামে আসার পর থেকে রায়ানের ভয়ে বাধ্য হয়েই তার এনে দেওয়া ঝুড়ি ভর্তি ফল খায়। যেহেতু কামড়ে কামড়েই খায়, তাই ছুড়ির প্রয়োজন ও পড়ে না। রায়ান মাথা ঠাণ্ডা করে নিজে আপেলে কামড় দিয়ে কিছু টা অংশ কেটে নিয়ে সেটা মুখ থেকে বের করে মিরার মুখের দিকে ধরে বলল-
“আআআ করো?”
মিরা কোনো প্রকার তর্ক না করে হা করলো। এভাবেই কামড়ে কামড়ে বউকে পুরোটা আপেল খাইয়ে নিয়ে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“নিচে গিয়ে চুপ চাপ এক কোণে গিয়ে বসো। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
মিরা ছাড় পেতেই রায়ানের থেকে ছুটে পালাতে চাইলে রায়ান সঙ্গে সঙ্গে মিরার কোমর এক হাতে জড়িয়ে ধরে মিরার কানের কাছে মুখ এনে হুমকির সুরে বলল-
“চলাচলের গতি বাড়লে, হাঁটার মতো অবস্থায় রাখবো না। You are a good mom right? Free advice..Be a good wife as well…ok?”
মিরার বুকে কেঁপে উঠলো রায়ানের কথায়। একটা শুকনো ঢোক গিলে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ধীরে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। মিরা যাওয়ার পর রায়ান বুকের বা পাশে হাত রেখে সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে এলোপাথাড়ি হাত পা ছুড়ে মনের সব আবেগ চিৎকার করে বহিঃপ্রকাশ ঘটালো-
“Aaaahh..Why is she so pretty…? My heart is beating so hard..!”
মিরাকে উদ্দেশ্যে করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
“সময় আমারও আসবে। তখন তুমিও এমন ছটফট করবে আমার মতো দেখি নিও। কিন্তু ছাড়া পাবে না।”
সাজ ঘর~
ভরা ঘরে একটা ফোন শব্দ করে উঠলো হঠাৎ। রিমি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সোরায়ার সাজ সম্পন্ন হতে দেখছে খুব মনোযোগ দিয়ে। আওয়াজ হওয়া ফোনটা তার উপলব্ধি হতেই সে দ্রুত ফোন টা হাতে তুলে নিল। রুদ্রর মেসেজ-
“একটু রুমে আসো। তাড়াতাড়ি দরকার আছে।”
রিমি একটু ভাবলো কি দরকার হতে পারে! একটা মেসেজ করে জিজ্ঞেস করলো-
“কেন? কি দরকার?”
সেকেন্ডের মাঝে রিপ্লাই এলো-
“হঠাৎ করে খুব বুকে ব্যাথা হচ্ছে। একটু আসো না।”
মেসেজ টা পড়তেই রিমির মন উতলা হয়ে উঠলো। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সোরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“বনু, তুই রেডি হ কেমন। আমি একটু আসছি।”
সোরায়া চোখ বন্ধ রেখেই জিজ্ঞেস করলো-
“কোথায় যাচ্ছ? প্রথমে আপু চলে গেল এখন তুমিও চলে যাচ্ছো।”
রিমি দরজা চাপিয়ে দিতে দিতে বলল-
“তোরা ভাইয়া মেসেজ করেছে। কি যেন দরকার। আমি আসছি। তুই সাজ।”
রিমি চলে যেতেই সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলো-
“হাহ্! যত্তসব নাটক..! বউ গুলো চোখের আড়াল হতেই দুই ভাইয়ের দরকারের শেষ নেই।”
একবার চোখ মেলে নিজের ফোনের স্ক্রিন অন করে দেখলো। কাঙ্ক্ষিত কোনো নোটিফিকেশন চোখে পড়লো না বলে হাসি মুখ টা বেজার করে আবার চোখ বন্ধ করে নিল।
-“কি হয়েছে আপনার? হঠাৎ বুকে ব্যাথা করছে কেন?”
হন্তদন্ত হয়ে রিমি ঘরে ঢুকে কারো উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারলো না। ফাঁকা ঘরটা পর্যবেক্ষণ করে যখনই রুদ্র কে ডাকতে যাবে তখনি একটা শক্ত বলিষ্ঠ হাত তার কোমর আঁকড়ে ধরল। কিছু বোঝার আগেই তার পিঠ গিয়ে ঠেকলো দরজার অপর পাশে। মিটিমিটি চোখ খুলতেই রুদ্র কে সামনে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মেয়েটা। কিন্তু এভাবে ভয় দেখানোর জন্য রুদ্রর কাঁধে জোরে আঘাত করতে গেলে রুদ্র ইশারায় রিমিকে তার হাতে থাকা ফোন দেখালো। সামান্য বোঝানোর চেষ্টা যে সে এখন কারো সাথে কলে আছে। রিমি স্থির হয়ে গেল। রুদ্র নিজের চোখজোড়া রিমির উপর আবদ্ধ রেখে ফোন কানে ধরে অপর পাশের কারো সাথে কথা বলতে থাকলো। রিমি দরজার সাথেই চেপে দাঁড়িয়ে- অথচ রুদ্র তার কোমরটা ও ছাড়ছে না। রিমির হঠাৎ মনে পড়লো রুদ্রর তাকে এখানে ডাকার কারণ- তার না বুকে ব্যাথ্যা করছে..!
রিমির মাথায় আসতেই সে রুদ্রর বুকের উপর হাত রেখে খালি চোখেই কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করতে চাইলো। ফোনে কথা বলার সময়, হঠাৎ রিমির স্পর্শে রুদ্র কিছু টা মুচকি হেঁসে রিমির মুখ বরাবর হেলে এলো। রিমি চমকে তার দিকে তাকাতেই রুদ্র অদ্ভুত ঘোর লাগানো চাহুনি যে তার চোখে চোখ রেখে তার বুকের উপর রাখা রিমির হাতটা আঁকড়ে ধরে ঠোঁটের কাছাকাছি এনে একটা নীরব চুমু দিল। কানে এখনো ফোনটা বিদ্যমান। রিমি লজ্জা নিজের হাত টেনে নিতে চাইলে রুদ্র শক্ত করে তার চুড়ি ভর্তি হাতটা ধরে রাখলো। চুড়ি ভেঙ্গে যেতে পারে ঠাওড় করে রুদ্র মেয়েটার হাত ছেড়ে দিলে মেয়েটা কোনো মতো ওই দরজায় চেপে থাকা অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সরে আসতে চাইলে তার কোমরের কাছে রুদ্রর হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় হলো। রিমি চেয়েও আর সরে আসতে পারলো না। রুদ্র আলতো হাতে রিমির বুকের দিকের শাড়ির ভাঁজ ঠিক করে দিল। ডান পাশের ব্লাউজের নেক লাইনকা সোজা করলো। রিমি রুদ্রর এমন আদুরে আচরণে মুচকি হেঁসে রুদ্রর হাতের মৃদু জোরে আঘাত করে হাতটা নামিয়ে দিল। রুদ্রও ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ মুচকি হেসে রিমির গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ফোনের অপর পাশের ব্যক্তির উদ্দেশ্যে জোড়ানো গলায় বলল-
“Cut the call for now.. I’ll call you later..”
কথাটা বলে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা ছুড়ে বিছানায় ফেলে দিল সে। এবার ভালো মতো স্বস্তি করে বউয়ের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল-
“উফফফ্, শান্তি…!”
রিমি তার সাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে রুদ্রকে কোনো মতো সামলে নেওয়ার চেষ্টায় জিজ্ঞেস করলো-
“বুকের কোথায় ব্যাথা করছে দেখি! হঠাৎ বুকে ব্যাথা হচ্ছে কেন? বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
রুদ্র রিমির কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের মুখ তুলে হঠাৎ করে রিমিকে কোলে তুলে নিল। রিমি কিছু বলার আগেই তাকে বিছানার উপর শুইয়ে দিয়ে রুদ্র রিমির উপর উঠে শুয়ে পড়লো। বিছানার নিচে এখন মেয়েটার দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। রুদ্র কে এমন অস্থির দেখে রিমি আর নিজের সাজ বা শাড়ি নিয়ে পরোয়া করলো না বরং নরম হাতে রুদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো আবার-
“না বললে বুঝবো কি করে, হুম? কি হয়েছে? কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো..!”
রুদ্র অবুঝ কণ্ঠে বলল-
“অক্সিজেনের মাত্রা কম হয়ে গেছিল। শ্বাস আসছিলাম না।”
রিমি হকচকিয়ে গিয়ে বাঁকা চোখে রুদ্র্যর দিকে তাকিয়ে দ্বিধায় আওড়ালো-“কিহ্..!”
-“হুম, তাই তো তোমাকে ডাকলাম। একটু অক্সিজেন নিয়ে ছেড়ে দিবো প্রমিস। এখন নড়াচড়া করো না।”
রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল- সে কি ভেবেছিল আর এই লোকের মাথায় কি! মেয়েটা রুদ্রর কথা মতো চুপ করে
শুয়ে রইলো, ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বেশি কিছুক্ষণ এভাবে থেকে এক পর্যায়ে রিমি নরম কণ্ঠে বলল-
“আচ্ছা আপনি সত্যি বলছেন তো? কোনো সমস্যা হচ্ছে না আপনার?”
রিমি এখনো তার মিথ্যে বাহানা ধরে আছে দেখে রুদ্র হেঁসে উঠলো। রিমির উপর থেকে উঠে রিমির হাত ধরে তাকের বিছানার থেকে টেনে তুলতে তুলতে বলল-
“বুকে ব্যাথা উঠার মতো করে তো এখনো দেখতেই পারলাম না। আগে উঠো দেখে নিই।”
রিমি রুদ্রর আঁতকা টানে উঠে দাঁড়ালে রুদ্র এক পা পিছু হটে রিমিকে পা থেকে মাথা অব্দি পর্যবেক্ষণ করে দেখতে লাগলো। রিমি একটু অস্বস্তিতে নিজের শাড়ির ভাঁজ হাত দিয়ে ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। রুদ্র নিজের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে উঠলো রিমির দিকে তাকিয়ে থেকে। তারপর মজার এলেই একটু আনমনা ভাব নিয়ে ঠোঁটের উপর আঙ্গুল নাচিয়ে খুব ভাবুক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলল-
“উমম্, ঠিকঠাকই লাগছে। কিন্তু বুকে ব্যাথা করবে এমন না। So I think I am safe..”
কথাটা বলেই একটা হতাশা গ্রস্থ হাঁফ ছাড়ল সে। এই দিকে একটু আগেও রুদ্রর বুকে ব্যাথা করা নিয়ে চিন্তিত রিমি মুখ ফুলালো রুদ্রর বুকের ব্যাথা হচ্ছে না বলে। কি অদ্ভুত! বেচারি চেয়েও কিছু বলতে পারছে না আর না পারছে এই নিয়ে রাগ দেখাতে। রিমির ফুলকো লুচির মতো মুখটা অবলোকন হতেই রুদ্র ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাঁসি লুকিয়ে নিল। রিমির এখন বিন্দু মাত্র ও ইচ্ছে হচ্ছে না রুদ্রর মুখ দেখতে। তাই মেঘাচ্ছন্ন মনে গম্ভীর স্বরে বলল-
“যেহেতু আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে না আমারও এখানে আর কোনো দরকার বলে আমার মনে হচ্ছে না। আমি বরং আসি।”
মেয়েটা রাগ দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ দরজার দিকে হাঁটা ধরলো। রুদ্র জিভ কামড়ে দ্রুত পায়ে রিমির পিছনে গিয়ে তার শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরলো। আঁচলে টান পড়তেই রিমি নিজ অবস্থানে থমকে গেল। রুদ্র এখন তাকে মানানোর চেষ্টা করবে তা আন্দাজ করে সোজা মুখ করেই সেই একই রাগী কণ্ঠে বলে উঠলো –
“এখন যেন আমাকে মানানোর বিন্দু মাত্র চেষ্টা না করা হয়। আমি বিশ্ব সুন্দরী না তা আমি জানি। এতে কোনো মিথ্যে নেই আর আমার কিছু যায় আসে না।”
রুদ্র রিমির কণ্ঠে রাগের থেকেও বেশি অভিমানের সুর খুঁজে পেল। শাড়ির আঁচলটা নিজের হাতে পেচাতে পেচাতে রিমির পিঠের সাথে সেঁটে দাঁড়ালো। রিমি রুদ্রর হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শুনছে। রুদ্র ধীরে রিমির শাড়ির ভাঁজে হাত গলিয়ে মেয়েটার নরম উদরে তা প্রতিস্থাপন করলো। পুরুষালি হাতের শীতল স্পর্শে রিমির মেয়ে দেহ সাথে সাথে ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। রিমি শারীরিক প্রতিক্রিয়াতে শাড়ির উপর থেকেই রুদ্রর হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। রুদ্র রিমিকে দূর্বল হয়ে যেতে দেখে অন্য হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। দুজনের হৃদস্পন্দন আর শ্বাস প্রশ্বাস পর্বত শৃঙ্গেরও তুঙ্গে। রুদ্র পেছন থেকে রিমির ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে যত্ন মাখা কণ্ঠস্বরে বলল-
“যেই পুরুষের কাছে তার সাদামাটা বউটা বিশ্ব সুন্দরী তার কাছে এমন ভাবে শাড়ি পড়া, সুসজ্জিত বউটা ঠিক কি! সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই।”
রিমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে গেল। রুদ্র রিমির হাত উপেক্ষা করে রিমির উদরের উপর নিজের স্পর্শ আরো দৃঢ় করলে রিমি মৃদু আর্তনাদ করলো-“আউউউ্..!”
রুদ্র ঠিক তখনই রিমির কানে কানে বলল-
“রিমি..আমার চুমু টা প্যান্ডিং আছে। এই পারিশ্রমিকের দাবি আমি ছাড়বো না।”
রিমির সকল ব্যাথা ছুটি নিল। রুদ্রর কথায় চোখ দুটো বড় বড় করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“মা..মানে?”
রুদ্র বাঁকা হেঁসে বলল-
“নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তাকে তার পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দিতে হয়। এই দিকে আমি গোটা দিন পার হয়ে যাওয়ার পর চাইছি। আপনার তো খুশি হয়ে আমাকে সাথে আরো কিছু বকশিশ দেওয়া উচিত।”
রিমি শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে রুদ্রর দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো। রুদ্রর চোখে চোখ মিলতেই সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল লজ্জায়। রুদ্র এক ঝটকায় রিমিকে ঘুরিয়ে নিজের মুখমুখি করে নিল। রিমি হকচকিয়ে রুদ্রর প্রসস্থ বুকের পাঞ্জাবি মুঠোয় নিয়ে নিজের মুখ লুকিয়ে এক নাগাড়ে বললে গেল-
“তখন ওইটা মিরা বলতে বলেছিল। কসম আমি ইচ্ছে করে বলি নি। মিরা জোর করেছিল। সত্যি বলছি।”
রুদ্র রিমি কে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় চুমু খেয়ে বলল-
“মিরাকে এর জন্য একটা চকলেট দিয়ে দিব নি। পাওনা আছে ওর। এতো বড় ডিল পেয়েছি ওর জন্য, কিছু না দিলে খারাপ দেখায়। ভাবি হিসেবে ও তোমার জন্য বেস্ট।”
রিমি তৎক্ষণাৎ রুদ্রর দিকে মুখ উঁচু করে তাকালো। কি ভেবে কথাটা সে বলল আর রুদ্র কি বলছে কিছুর আগা মাথা পেল না। রুদ্র মিষ্টি হাসি ঠোঁটের কোণায় রেখে দুই চোখ বন্ধ করে রিমি দিকে নিজের ঠোঁট জোড়া গোলাকার পাকিয়ে এগিয়ে দিয়ে বলল-
“We are getting late.. do it fast..”
রিমি একটু ছটফট করলো রুদ্রর শক্ত হাতের বাঁধনে। রুদ্রর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়লো। ছাড়ার বদলে আরো শক্ত করে মেয়েটার কোমর আঁকড়ে ধরে হুমকির স্বরে বলল-
“আর একবার নড়লে, তোমার পড়নের শাড়ি দিয়েই আজ হাত বাঁধবো বলে দিচ্ছি।”
রিমি চমকে গেল। চুমু দেওয়া তো বড় কথা নয়, লিপস্টিক নষ্ট হয়ে যাবে এইটা বড় ভাবনার বিষয়। তবুও আর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে রুদ্রর দু গালে টুপ করে পর পর দুটো চুমু দিয়ে বলল-
“হয়েছে এবার? একটা দেওয়ার কথা ছিল আমি আপনার কথায় বকশিশ সহ দিলাম। এখন ছেঁড়ে দিন।”
রুদ্র বিরক্ত ভাব নিয়ে বলল-
“আমি রেডি ছিলাম না। আবার করো।”
-“কিহ্!”
-“আরে, হুট করে দিলে কি আর ফিল নেওয়া যায় নাকি? আমাকে তো রেডি থাকতে হবে নাকি? আচ্ছা যাও দু’টো দিতে হবে না। একটাই দাও…(ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে) এখানে।”
রিমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল রাগ রাগ মুখ করে। এখন সে নড়ছেও না চড়ছেও না, ছেঁড়ে দেওয়ার জন্য কোনো আকুতি ও নেই। রুদ্র মুখ গোমড়া করে নিয়ে হঠাৎ রিমিকে ছেঁড়ে দিল। হঠাৎ মুক্তি পেয়ে রিমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট রাগ দেখতে পেল ছেলেটার মুখে। তবে এতক্ষণ ধরে যা চাইছিল তা হওয়ায় খুশি মনে রুদ্রর পাঞ্জাবি টেনে ধরে ছেলেটাকে নিজের কাছে টানলো। উচ্চতার সামঞ্জস্যতা হতেই এক সেকেন্ডের জন্য ছেলেটার ঠোঁট নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পালালো। হঠাৎ করে কি হলো রুদ্র কিছু বুঝে উঠার আগেই রিমির অস্তিত্ব অগোচরে চলে গেল। রুদ্র ঘর থেকে পুনরায় চেঁচিয়ে বলল-
“আমি এবারও রেডি ছিলাম না। This is cheating..”
তার কথা শোনার মতো কেউ নেই দেখে মেঝেতে সজোরে পা মেরে বিড়বিড় করতে করতে বলল-
“ধুর ছাই, খেয়াল করলেই তো ধরে রাখতে পারতাম। আর একটু সময় নিয়ে চুমু দিলে কি হতো ওর?”
সন্ধ্যা ৭টা~
বাড়িতে ধীরে ধীরে মেহমানদের আগমন শুরু হয়েছে। মেহমান বলতে মিরা আর সোরায়ার ছোটবেলার খেলার সাথীদেরই ডাকা হয়েছে নাচগান করতে। গুরুজন বলতে কিছু আত্মীয় ছাড়া কেউ আজ আসেন নি। তারা কাল সকাল অর্থাৎ বিয়ের দিন সকালের গায়ে হলুদেই আসবেন। মিরা রিমিকে নিয়ে একসাথে সোরায়ার সাজ শেষ হলে তাকে উপর থেকে নিচে নামিয়ে এনেছে। সোরায়াকে মেহেদী স্টেজের মধ্যমণি করে বসিয়ে দিয়ে হাতে হাতে কিছু শুকনো খাবার সাজিয়ে সোরায়ার সামনে রাখছিল।
ঠিক তখনই রোকেয়া বেগম ব্যস্ত কণ্ঠে মিরা আর রিমিকে ডেকে চেঁচিয়ে উঠলেন-
“মিরা..রিমি..কই তোরা? ছেলের বাড়ি থেকে তত্ত্বের ডালা এসে গেছে। মেহমান দের স্বাগতম জানানোর একটা লোক নেই গেইটে। কিরে..? জলদি আয়।”
চাচির ডাকে মিরা রিমি একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে একসঙ্গে সোরায়ার দিকে তাকালো। সোরায়া অবাক চোখে পর পর একবার মিরা অবার রিমির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
“কি..? আমার দিকে কি দেখ?”
মিরা আর রিমি একসাথে সোরায়ার প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন সূচক কণ্ঠেই বলল-
“মাহির ভাই…?”
সোরায়া এক সেকেন্ডের জন্য মাথা দ্রুত না সূচক নাড়িয়ে বলল-
“না না, উনার আসার কথা না তো। উনি তো বলেছিলেন উনার কিছু কাজিন আসবে। ওরাও মেহেদি পড়বে আমাদের সাথে।”
সোরায়ার কথা মিরা রিমি দুজনে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো- “ধুর..!” তারপর একজন আরেকজনের হাত ধরে মুখটা ঝুলিয়ে ড্যাংড্যাং করে হেঁটে মূল দরজার দিকে চলে গেল। সোরায়া ভ্রু কুঁচকে তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনা হয়ে নিজে নিজে বলল-
“আজব তো। উনি না আসলে আমার কি করার আছে! আমি কি একবারও আসতে না করেছি ওনাকে? ভাল্লাগে না।”
সাজানো ডালা হাতে একের পর এক ছেলে পক্ষের লোক প্রবেশ করছে। মিরা আর রিমি মিলে অমায়িক সংবর্ধনায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বাড়ির ভেতরে। বাড়ির বড় রা অন্যান্য আত্মার সজনদের নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আর রায়ান রুদ্র মেহমানদের খাওয়ার জায়গায় সব কিছুর আয়োজন ঠিক আছে কিনা সেটা দেখছে।
রায়ান মিরার জন্য খাবার নিতে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার ফোন রিং হলো। রায়ান তড়িঘড়ি করে ফোনটা পকেট থেকে বের করে চোখের সামনে আনতেই দেখলো মাহিরের কল। রায়ান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে উচ্ছসিত কণ্ঠে কথা বলল-
“কিরে নতুন জামাই, খবর কি? দিন কাল কেমন যায়?”
অপর পাশ থেকে মাহিরের উৎকণ্ঠিত গলা ভেসে এলো-
“দোস্ত তুই কই?”
-“আমি তো আমার শশুর বাড়িতেই। কেন?”
-“আসসালামুয়ালাইকুম আপু, কেমন আছেন? আমি মিরা, কনের বড় বোন।”
ফোনের অপর পাশ থেকে মাহিরের কণ্ঠের বদলে পরিচিত এক মেয়ে কণ্ঠ ভেসে আসতেই রায়ান কৌতুহলে মাহিরকে জিজ্ঞেস করলো-
“মাহির…ওই শালা! তুই কই? মিরার না ওটা”
অপর কাস থেকে ফিসফিসানি আওয়াজ এলো-
“আমিও আমার শশুর বাড়িতেই। তাড়াতাড়ি মেইন গেটে আয় ভাই। এবারের মতো বাঁচিয়ে দে।”
-“তোর আসার কথা ছিল আজ? কই চড়ুই পাখি তো কিছু বলল না! কাল বিয়ে তুই আজ এখানে কি করিস?”
-“বাল, তুই তোর সব প্রশ্ন আপাতত রাখ। এখান থেকে আমাকে বাঁচা। তোর আর তোর ভাইয়ের বউ তো আমার কাজিন দের জড়িয়ে ধরে ওয়েল কাম করছে।”
-“তো..!”
-“তো মানে..! আমাকেও যদি করে তখন?”
-“তুই বেডা মানুষ, তোকে কেন করবে?”
-“আরে ভাই, আমি তো মাহির হয়ে আসি নি। মাহিরের কাজিন হয়ে আসছি।”
-“মানে কি ভাই..!?”
-“বোরখা পড়ে আছি রে ভাই। মিরা ভাবি আর রিমির থেকে এবারের মতো বাঁচিয়ে দে।”
রায়ান রেগে চিৎকার করার আগেই ফোনটা কেটে গেল। রায়ান সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিল মেইন গেটের দিকে।
মিরা রিমি সবাইকে জড়িয়ে ধরে স্বাগতম জানাচ্ছে দেখেই মাহির বাধ্য হয়ে রায়ান কে কল করে ডাকলো। নয়তো নিজের বউ টাকে এক নজর দেখেই চলে যেত বেচারা। মিরা পাত্র পক্ষের একজন এখনো ডালা হাতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। মিরার চোখে কিছু অদ্ভুত ধরা পড়লো। সবাই জমকালো জামা কাপড় পড়ে এসেছে অথচ পেছনের এই একজনই কেবল প্লেইন কালো বোরখা পড়া, তাকে মেয়ে মানুষের তুলনায় একটু বেশিই লম্বা মনে হলো মিরার। নেকাব দিয়ে চোখ মুখ সব ঢাকা। প্রথমে একটু অবাক লাগলেও পরবর্তী তে মিরার মনে হলো পর্দা তো পর্দাই, যারা পর্দা করে তারা তো বিয়ে বাড়িতেও করবে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর উচ্চতা তো আল্লাহর দান, লম্বা হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু না। মিরা অতিরিক্ত চিন্তা না করে মুখে মিষ্টি একটা হাসি নিয়েই ভদ্র মহিলার দিকে এগিয়ে গেল। মিরা উচ্ছসিত হয়ে বিনয়ের সাথে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সালাম দিল-
“আসসালামুয়ালাইকুম, বেয়ান সাহেবা।”
মাহির শক্ত হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। সালামের উত্তর ও নিচ্ছে না। এই দিকে মিরাও দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছে। কিছু না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা পাও সন্দেহ জনক। মাহির বুদ্ধি করে কেবল নিজের এক হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ড সেট করতে। মিরা হটকারীতায় আর মাহিরের হাতের দিকে চাইলো না উল্টো সেটা উপেক্ষা করে নিজের থেকে কোলাকুলি করতে উদ্যত হয়ে বলল-
“আরে, কিসের হাত মেলানো? বেয়ানের সাথে কোলাকুলি করতে হয়। কেমন আছেন আপু?”
মাহির নেকাবের আড়ালে ঘাবড়ে চোখ বন্ধ করে নিল।
-“Spot…”
হঠাৎ চিৎকারে মিরা থেমে গেল। রায়ান হন্তদন্ত হয়ে মিরার সামনে এসে মাহিরকে নিজের পিছনে লুকিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলো-
“কি হচ্ছে এখানে?”
মাহিরের বুকের ধুকপুকুনি একটু কমে এলো। স্বস্তি তে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মনে মনে রায়ানের কৃতজ্ঞতা আদায় করলো-“ভাই আমার, বাঁচিয়ে নে এবারের মতো।”
পিছন থেকে মিরা বিরক্ত মুখে চেঁচিয়ে রায়ান কে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“এমন করলেন কেন?”
রায়ানও মেজাজ দেখিয়ে মিরাকে জিজ্ঞেস করলো-
“যাকে তাকে জড়িয়ে ধরতে যাও কেন?”
মিরার কপালে আশ্চর্যতার ভাঁজ দেখা দিল। রায়ানের এমন প্রতিক্রিয়ার সে কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছে না।
-“এভাবে বলছেন কেন? আপুরা কি ভাববে? ওয়েল কাম করছিলাম তো কোলাকুলিতে সমস্যা কই?”
রায়ান চেয়েও মিরাকে বোঝাতে পারবে না যে সামনে কোনো মেয়ে না , ওটা মাহির। রায়ান মিরার মন রাখতে মাহিরের দিকে ঘুরে গিয়ে মাহির সাথে কোলাকুলি করতে উদ্যত হয়ে বলল-
“এভাবে ওয়েল কাম করতে হলে আমি করি। তোমাকে করতে হবে না।”
ছেলে হিসেবে মাহির ও বোরকার আড়ল থেকে রায়ানের কথায় সম্মতি জানিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। মিরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে রায়ান আর অন্য এক মেয়েকে কোলাকুলি করার চেষ্টা দেখে সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের হাত টেনে ধরে পিছনে টালো। আর নিজের পিছনে রায়ান কে লুকিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো-
“আরে, অদ্ভুত তো..! আপনি একটা মহিলাকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছেন কেন?”
মাহিরের ইচ্ছে করলো নিজের মাথা টা দেয়ালের সাথে বাড়ি দিতে। মিরা সিনক্রিয়েট না করে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৪
“থাক আর ওয়েল কামের দরকার নেই। আপনি ভেতরে যান।”
অনুমতি পাওয়ার পর মাহির আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো। রিমি বাকি সবাই কে নিয়ে অনেক আগেই ভেতরে চলে গেছে। মিরা রায়ানের সাথে এবার তুমুল এক ঝগড়া করার উদ্দেশ্যে পিছন ফিরে দেখল তার পিছনে কেউ নেই। আশে তার চোখ ঘুরিয়ে দেখতেই খেয়াল করলো রায়ান ওই বোরকা পরা নারীকে নিয়ে বাড়ির পিছন দিকে যাচ্ছে। মিরা নিজের চোখ কে যেন বিশ্বাস ই করতে পারলো না। ঠিক তখনই তার নজর গেল ভদ্র মহিলার পায়ের দিকে- মহিলা মানুষের পায়ে পুরুষ মানুষের জুতা! মিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সব মাথার উপর দিয়ে গেল কিন্তু আজকালকার যুগে এসে মাহিরের থেকে শেষ মেষ বোরকার আইডিয়া সে আশা করে নি। কোমরে হাত বেঁধে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বিড়বিড় করলো-
“মাহির ভাই.. it’s gonna be fun to catch you..”
মিরা রায়ান আর মাহিরের দিকে আর পাত্তা না দিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
