Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১
অরাত্রিকা রহমান

“সামনের কালো গাড়িটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দাও।”
কিবরিয়া সরকারের মুখে শয়তানি এক হাসি। ড্রাইভার ভয়ে শিটিয়ে গেল। কিবরিয়া সরকার কঠোর কণ্ঠে পুনরায় চেঁচিয়ে একই কথা বললেন-
“বউ, বাচ্চা আর নিজের জীবনের মায়া থাকলে যা বলছি তাই করো। অন্যথায় এই জনমে আজকের পর আর দুনিয়া দেখার সুযোগ পাবে না।”
ড্রাইভারের হাত গাড়ির স্টেয়ারিং-এ শক্ত হয়ে উঠলো। বেচারার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। জীবন মরণের প্রশ্ন উঠলে বাঁচার স্বার্থে মানুষ সবকিছু করতে রাজি থাকে। ড্রাইভারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হলো না। মনের সংকোচের বাইরে গিয়ে সে নিজের ও পরিবারের জন্য আরেকটা পরিবারের নির্মম পরিণতি তে মূখ্য চরিত্রের অবদান রাখতে ধাবিত হলো।
ব্যস্ত রাস্তায় রায়ানের গাড়িটা অস্বাভাবিক গতিতে ছুটছে। রায়ানের সম্পূর্ণ মনযোগ মিরার উপরের নিবদ্ধ অথচ বেশ কয়েক মিনিট ধরে যে একটা বড় বাড়ি তার গাড়িকে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে সেদিকে তার খেয়ালই নেই। কিবরিয়া সরকারের ড্রাইভারের হাত কাঁপছে স্টেয়ারিং এর উপর। সে বারবার রায়ানের গাড়ির কাছে গিয়ে গতি কমিয়ে নিচ্ছে। রায়ানের গাড়ির কাছে যেতেই মিরার শ্বাসরুদ্ধকর আর্তনাদ গুলো শুনে সে দূর্বল হয়ে পড়ছে। গাড়ি টাকে ধাক্কা দেওয়ার মতো পাপ করার সাহস পাচ্ছে না সে।

-“আআআআহহ, আর পারছিনা। আর এই যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না। আআআআ…মাআআআ..!”
-“ঠিক হয়ে যাবে সব পাখি..আরেকটু ধৈর্য্য ধরো। এই তো চলে এসেছি প্রায়। একবার হসপিটালে পৌঁছে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবে আর ব্যাথা করবে না।”
প্রসবের তীব্র বেদনায় মিরার চোখ উল্টে যাচ্ছে। এসি চালিত গাড়ির ভেতরও মেয়েটার কপালে ঘামের ক্ষুদ্র বিন্দু জমেছে। রায়ান অসহায় অপারগতার দৃষ্টিতে কেবল মিরার ব্যথিত অবয়ব দেখে চলেছে। জীবনের কোনো পর্যায়ে নিজেকে হয়তো এতোটা অসহায় তার মনে হয় নি। যেই মানুষটার চোখে এক ফোঁটা জল তার সহ্য হয় না আজ সেই মানুষটা কেই এই অবস্থায় দেখতে হচ্ছে তার। এমনকি তার করার মতোও কিছু নেই যা মিরার কষ্ট লাঘব করতে সক্ষম। রায়ান নিজের মন শক্ত করে কেবল গাড়ি চালাচ্ছে যেন যত দ্রুত সম্ভব মিরাকে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছাতে পারে।

কিবরিয়া সরকার তার ড্রাইভারকে সজোরে থাপ্পড় মেরে রূঢ় স্বরে বললেন-
“কুত্তার বাচ্চা, তোরে আমি কি করতে কিনছি? মার ধাক্কা ওই গাড়িরে।”
ড্রাইভার বেচারে এবার আতঙ্কে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সে মিনতির সুরে অসহায়ের মতো বলল-
“স্যার আমি আপনার পায়ে পড়ি। আমারে দিয়ে আপনি এই পাপ করাইয়েন না। ওই গাড়িতে মাইয়াডা পেটের ব্যাথায় চিৎকার করতেছে। পোলাডাও কানতাছে। ওদের ছাইড়া দেন স্যার।”
কিবরিয়া সরকারের চোখের সামনে তখন যেন পৃথিবীর আর কোনো রং নেই শুধু আগুন। ছেলের মৃত্যুটা তার বুকের ভেতর এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে, যেখানে কেবল প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে রায়ানের জন্য। মস্তিষ্কে শুধু একটাই চিন্তা—যে মানুষ তার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে, তাকে সে কোনোভাবেই ছেড়ে দেবে না। কিবরিয়া সরকার ড্রাইভারের কথায় রাক্ষুসে অট্টহাসি হাসলেন। ড্রাইভার নিজেও ভয়ে জোড়সোড় হয়ে বলতে নিল—“আপনে এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নাই স্যার। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যদি আরও..!”
বাকিটা শেষ করতে পারল না সে। পরের কয়েক মুহূর্ত এত দ্রুত ঘটল যে ড্রাইভার নিজেই বুঝে উঠতে পারল না কী হচ্ছে। কিবরিয়া সরকার হঠাৎ তার দিকে ঝুঁকে সিটি বেল্ট খুলি দিয়ে তাকে সিট থেকে সরিয়ে দিতে চাইলো। তার চোখে তখন এমন এক উন্মত্ততা, যা দেখে ড্রাইভারের বুক কেঁপে উঠল।

—“স্যার! আপনে কী করতাছেন? এ্যাকসিডেন্ট হইয়া যাইবো।”
কিবরিয়া সরকারের মুখে কোনো উত্তর নেই। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে থাকা সেই একটিমাত্র বাক্য—
“আমার ছেলের হিসাব আমি নিজেই মিট মাট করমু। তোর দরকার নাই।”
পরিস্থিতি মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। চলন্ত গাড়িতে কিবরিয়া সরকার তার ড্রাইভারকে সজোরে লাথি দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন। গাড়ির দরজা খুলে যাওয়ার পর ড্রাইভার রাস্তার ধারে ছিটকে পড়লেন। দূর থেকে আসা ভারী যানবাহনের সাথে তার দেহের ধাক্কা লাগলো এবং চোখের পলকে একটি সজীব প্রাণ ঝড়ে গেল। কিবরিয়া সরকার একবারও পেছনে তাকালেন না। তবে ব্যস্ত রাস্তায় এমন অস্বাভাবিক ভাবে একজনের মৃত্যু তে অন্য সকল গাড়ি থামলো ড্রাইভারের মৃত দেহের আশে পাশে। রায়ানের গাড়ির সামনে থাকলেও বিকট চিৎকার শুনে সে গাড়ির লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে পিছনে ফেলে আসা গাড়ির ভীর ঠিকই খেয়াল করলো। আর তখনই এক অস্বাভাবিক গতি পূর্ণ গাড়িকে তার গাড়ির দিকে ধেয়ে আসছে দেখলো রায়ান। তবে গাড়িটা তার গাড়িকে ধরার আগেই সে স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে নিজের দিক পরিবর্তন করে নিল। মিরা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো-

“আআআআহহ, আস্তে চালান। আহহ্ আল্লাহ..!”
রায়ান মিরার দিকে একবার তাকিয়ে আবার লুকিং গ্লাস খেয়াল করলো। প্রতিবিম্বে কিবরিয়া সরকারের কুটিল দানবীয় হাঁসি মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল রায়ানস্পষ্ট—ঠোঁটের কোণে সেই কুটিল, অস্বাভাবিক হাসি। লোকটা আর থামবে না, সেটা বুঝতে রায়ানের এক মুহূর্তও লাগল না আর না এসব কি কারণে হচ্ছে সেই বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ আছে। রায়ান নিজের গাড়ি সামলাতে সামলাতেই পরের মুহূর্তেই পাশ থেকে প্রচণ্ড ধাক্কা এল।
-“রায়ান…!”
-“ফাক… নট নাও..!”
রায়ানের গাড়ি হঠাৎ একদিকে কেঁপে উঠল। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে সে গাড়িটাকে সোজা রাখল। মিরা আতঙ্কে সিট আঁকড়ে ধরতেই রায়ান দ্রুত বলল,
—”মিরা, শক্ত হয়ে বসো! আমাদের বাচ্চা কে আগলে রাখো। তুমি আর আমাদের বাচ্চা—দুজনের কারো যেন কিছু না হয় তা আমি দেখে নেব। জাস্ট কিপ ইউর সেল্ফ সেইফ হাও এভার ইউ ক্যান।”
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে আতঙ্ক ছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তে কোনো দ্বিধা ছিল না। মিরা অসহায়ের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো-

“এসব কি হচ্ছে? ওটা কার গাড়ি? কেন ক্ষতি করতে চাইছে আমাদের?”
রায়ান এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখেই সে অন্য হাতটা মিরার পেটের ওপর রাখল। যেন নিজের হাত দিয়েই তাদের দুজনকে আগলে রাখবে। সময়ের তাড়া পরিস্থিতির চাপ দুপাশে ছুটে চলা গাড়ির মাঝখানে রায়ানের সমস্ত মনোযোগ তখন একটাই বিষয়ে—মিরাকে নিরাপদ রাখা। সঙ্গে সঙ্গে আবার ধাক্কা লাগলো
এবার আরও জোরে। রায়ান সঙ্গে সঙ্গে গতি সামলে গাড়িটাকে সামান্য ডানদিকে সরিয়ে নিল। কিবরিয়া সরকার আবার পাশ কাটিয়ে এসে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল। রায়ান শেষ মুহূর্তে ব্রেক না কষে গাড়ির দিক বদলে আঘাতটা এড়িয়ে গেল। চাকার নিচে রাস্তার ঘর্ষণ তীব্র হয়ে উঠল। মিরা কাঁপা গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলল—
মিরা এবার ব্যাথার অনুভবে বিরক্ত হয়ে উঠলো। স্বাভাবিক ভাবেই এখন পরিস্থিতির উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। সে
“রায়ান প্লিজ কিছু করুন…খুব ব্যাথা করছে। এভাবে আর সম্ভব না আমার পক্ষে। আর পারছি না আমি। প্লিজ ডু সামথিং। আমি মরতে চাই না। আমি আপনার জন্য আমাদের সন্তানের জন্য বাঁচতে চাই। আমি মরে গেলে আপনার সাথে সংসার করবে কে? যদি আরেকটা বিয়ে করে ফেলবেন আমি না থাকলে। পরে কি হবে আমার?”

—”এসব কথা বলার চেয়ে ভালো চিৎকার করো শুনি তাও ঠিক থাকতে পারবো আমি। মাথা নিচু করে বসো। কোনভাবেই উঠে বসবে না। আমি এখনো বেঁচে আছি আমাদের কারো কিচ্ছু হবে না। উল্টো পাল্টা কথা বললে নিজেই গাড়ি উল্টে দেবো রাস্তায় বলে দিচ্ছি।”
ছেলেটার নিজের বুকের ভেতরেরও তখন হৃদস্পন্দন গোটা শরীর জুড়ে ছুটছে মনে হচ্ছে। এমন সাংঘাতিক সময়ে বউয়ের মুখে এমন কথা শুনলে কি আর মাথা ঠিক থাকে?! কিন্তু মিরার সামনে সে সেটা প্রকাশ করল না। মিরা রায়ানের বকা শুনে আর উল্টো পাল্টা কথা মাথাতেও আনলো না। ভয়েই চুপ করে গেছে মেয়েটা এখন। মিরা রায়ানের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে রইল।
ফ্লাইওভারের শেষ প্রান্তটা সামনে এগিয়ে আসতেই
লুকিং গ্লাসে রায়ান দেখল—কিবরিয়া এবার আর শুধু তাকিয়ে নেই। তার ঠোঁট নড়ছে। নিজের মনেই যেন কিছু বলছে। তারপর সেই শয়তানি হাসি। কিবরিয়া নিচু গলায় বিড়বিড় করলেন—
“আমার ছেলে যেখানে আছে… তোদেরও সপরিবারে সেখানে পাঠাবো। প্রয়োজনে নিজেও মরব। কিন্তু তোদের নিয়েই।”
তারপরই সে গাড়িটা সোজা রায়ানের গাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দিল। রায়ান বুঝে গেল কি হতে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের মধ্যে কিবরিয়ার গাড়ি পাশ থেকে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে এল। রায়ান মিরার পেট থেকে হাত সরিয়ে দুই হাতেই স্টিয়ারিং চেপে ধরল।

—”মিরা, বেন্ড ডাউন অ্যান্ড হোল্ড অন টু ইউর হেড।”
ধাক্কাটা আসার ঠিক আগের মুহূর্তে রায়ান স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিল সর্বশক্তি দিয়ে। মিরা কিছু না বুঝেই শুধু রায়ানের কথা মতো নিজের মাথা নিচু করে হাত দিয়ে ঢেকে নিল। গাড়িটা আচমকা ঘুরে গেল ৩৬০ ডিগ্রি তে। চাকা রাস্তার ওপর ঘর্ষণে কেঁপে উঠল, গাড়ির ভারসাম্য এক মুহূর্তের জন্য নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু রায়ান স্টিয়ারিং ছাড়ল না। পুরো গাড়িটাকে ঘুরিয়ে সে কিবরিয়ার গাড়ির গতিপথ থেকে সরিয়ে আনল। অতঃপর রায়ান স্টেয়ারিং ছেঁড়ে মিরার উপর এসে মিরাকে সম্পূর্ণ নিজের আবরণে মুড়ে নিল।
কিবরিয়ার গাড়ি আর রায়ানের গাড়িকে ছুঁতেও পারলেন না। কিন্তু নিজের গতি সামলানোর সুযোগ পেলেন না। ফ্লাইওভারের পাশের সুরক্ষা-ব্যারিয়ার পেরিয়ে তার গাড়ি ছিটকে পড়লো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু যেন থেমে রইল। তারপর নিচ থেকে ভেসে এল পানিতে ভারী কিছু পড়ার শব্দ। কয়েক বার ঘুরে রায়ানের গাড়ি রাস্তার ওপর পাশের স্ট্রিট লাইটের খাম্বায় এসে সজোরে ধাক্কা খেয়ে থামলো। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির কাঁচ ভেঙ্গে পড়লো রায়ানের উপর। দিনে দুপুরে এমন ঘটনা সকলের কাছে আশ্চর্যকর লাগছিল। মূহুর্তের মাধ্যে ভীর জমে গেল ঘটনাস্থলে। মিরা ও রায়ানের বুকের ভেতর দ্রুত শ্বাস উঠানামা করছে। রায়ান একটু সময় নিয়ে নিজের চোখ খুললো। তার মাথা ঝিমঝিম করছে হঠাৎ। তবে সেই দিকে খেয়াল না করে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে মিরার দিকে তাকিয়ে মিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো সে—

“মিরা? এই..আমার হৃদপাখি..শুনতে পাচ্ছো? কথা বলো না..ব্যাথা করছে না আর? চিৎকার করো একবার এই?”
-“রা..য়ান..! আপনার..”
মিরার কণ্ঠে ভাঙন ধরলো। মিরার গলা কানে যেতেই রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিরা রায়ানের কপালে নিজের কম্পিত আঙ্গুল ছুঁইয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল-
“আপনার কপাল থেকে রক্ত ঝড়ছে কেন? আপনি ঠিক আছেন?”
রায়ান খেয়াল করলো তার কপালে একটা জায়গায় চিনচিন ব্যাথা করছে তবে তা গায়ে লাগছে বলে বোঝা গেল না। রায়ান তুচ্ছ জ্ঞ্যানে হেঁসে মিরার গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“তুমি ঠিক আছো?”

মিরা সহসা নিজের মাথা নাড়লো। রায়ান মিরা কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“তাহলে আমার বেঠিক থাকার কি আছে?”
মিরা রায়ানের অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ছেলেটার পিঠে ছোট ছোপ রক্তের দাগ বোঝাই যাচ্ছে কেটে গেছে। কপাল থেকেও রক্ত ঝড়ছে। হাতের ধারালো কাঁচের অংশ বিশেষ বিঁধে আছে। তবু কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই লোকটার মধ্যে। মিরা হঠাৎ জ্ঞান হারাতে শুরু করলে তার প্রসব ব্যাথা বাড়লো।
-“আআআআহহ..! আম্মুউউউ..!”
রায়ানের ধ্যান ভাঙলো। সে মিরার গালে হালকা হাতে চাপড়ে দিয়ে বলল-
“এই চোখ খুলে রাখো.. এতো কিছুর পর এখন জ্ঞান হারাবে না একদম। আমাকে দেখ। চোখ বন্ধ করবে না। সামনেই হসপিটাল আর ৫ মিনিট লাগবে। হোল্ড অন টু মি। ওকে?”
মিরা দাঁত দ্বারা ঠোঁট কামড়ে পেট চেপে ধরে মাথা অনবরত না সূচক নেড়ে বলতে লাগলো-
“আর হচ্ছে না। আর পারবো না।”

-“হবে, হবে, পারবে তুমি‌। ইউ আর মাই স্ট্রং মিসেস রাইট। ইউ ক্যান। আই নো দ্যাট। জাস্ট ব্রিথ!”
মিরা যে হাঁপিয়ে উঠেছে তা তার চোখ মুখে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রায়ান সোজা হয়ে নিজের সিটে বসে আবার স্টেয়ারিং শক্ত হাতে ধরলো। হাতের সকল শিরা উপশিরা দৃশ্যমান‌, গলগল করে রক্ত ঝড়ছে। রায়ান সেই দিকে পাত্তা না দিয়ে গাড়ি ছুটালো।
মিরা চিৎকার করে রায়ানের বাহুতে খামচে ধরলো। আবার কি মনে করে যেন ছেড়ে ও দিল সাথে সাথে। রায়ান রক্তাক্ত হাতে মিরার মুখের ঘাম, অশ্রু মুছে দিতে দিতে বলল-
“কি হলো..হাত সরিয়ে নিলে কেন? যা করতে পারলে ব্যাথা কমবে তাই করো। কামড়াও খামচাও যা মন চায় করো কোনো সমস্যা নেই।”
মিরা রায়ানের হাত নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“লেগে যাবে আপনার..হাত সরান। আপনার দুষ্টু প্রিন্সেস পৃথিবীতে আসার জন্য পাগল হয়ে গেছে মনে হয়। পেটে থাকতেই চাইছে না। নয় মাস থাকতে পেরেছে আর এখন দু মিনিট সহ্য হচ্ছে না তার। আআআআহহ..!”

রায়ান নিজের চুল খামচে ধরলো তার এই মুহূর্তে ঠিক কি অনুভব হচ্ছে তা চিন্তা করার সময় টুকু ও নেই তার কাছে। বাবা হওয়ার সময়টাকে না সে উপভোগ করতে পারছে আর না তার আদরের বউকে এই যন্ত্রণায় দেখতে পারছে। মিরা কাঁপতে কাঁপতে তার দিকে তাকাল। রায়ান কিছুক্ষণ শুধু তাকে দেখল। তারপর মিরার পেটের ওপর নিজের হাত রাখল। সেই মুহূর্তে তার চোখে কোনো বিজয়ের উচ্ছ্বাস ছিল না, শুধু একটাই স্বস্তি—”সে মিরাকে আর তাদের অনাগত সন্তানকেও নিরাপদ রাখতে পেরেছে।”
অতঃপর তারা হসপিটালে পৌঁছেই গেল। ডক্টর চৌধুরী বাড়ির পরিচিত হওয়ার ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্টের কোনো সমস্যা হয় নি। মিরাকে জটিল ভেতরে নিয়ে যাওয়ার আগে অব্দি মিরা রায়ানের হাত শক্ত করে ধরে ছিল নিজের হাতের বাঁধনে। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মিরাকে সাহস দিয়ে বলল-
“অপেক্ষায় থাকবো। আমার সব সুখ তোমার কাছে আমানত। ফেরত না পেলে দাবি রয়ে যাবে কিন্তু। এই দাবির মুক্তি নেই, আমি দেব না মুক্তি।”
-“আমার কিছু হয়ে গেলে আবার বিয়ে করবেন না তো?”
মিরার মুখে এমন কথা শুনে রায়ানের অভিমান হলো খুব তবে মিরার মায়া ভরা মুখটা দেখে মেয়েটার মনে উচাতন বুঝার ক্ষমতা তার আছে তাই সেও একই ধাঁচের জবাব দিল-
“তোমার কিছু হয়ে গেলে সত্যি সত্যি করে নেব। তাই বলছি, তাড়াতাড়ি লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমার কাছে ফিরে আসবে।”

মিরারও খুব অভিমান হলো এই জবাবে কিন্তু রায়ানের চাহিদা যে তার মধ্যেই ন্যস্ত সেটা তার অজানা নয়। তাই রায়ানের কথা মেনে নিয়ে তাকে উপদেশ দিল-
“ঠিক আছে। তবে যদি আবার বিয়ে করেন ভালো একটা মেয়ে খুঁজে তারপর করবেন।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল কি করে মেয়েটাকে নিজের মনের ভয়টা বোঝেবে সে নিজেও জানে না। তাই হেঁয়ালি করে মনের কথাই ব্যক্ত করলো-
“যথা আজ্ঞা, খুঁজলে তোমাকে পাবো তো?”
-“আমার মতোই লাগবে?”
রায়ান কান্নায় ভেঙে পড়লো মিরার প্রশ্নে। মিরার হাত কপালে ঠেকিয়ে অনবরত মাথা না সূচক নাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল –
“না, তোমাকেই লাগবে।”
মিরা হেঁসে উঠলো। এমন অসহায় অবস্থায় একজন পুরুষ মানুষ কে এতোটা আকর্ষণীয় লাগতে পারে তার ধারণা ছিল না। ডক্টর রায়ান কে ডেকে নিয়ে আলাদা কথা বলতে লাগলেন।
-“মিস্টার চৌধুরী..আপনার ওয়াইফের ইন্ট্যান্স ব্লাড ফ্লো হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক নয়। ডেলিভারি তে কম্প্লিকেশন বাড়বে। আমি আমাদের হসপিটালের ব্লাড ব্যাংকে বলে দিয়েছি যদি তাতে কাভার না হয় কাউকে রক্ত দিতে হতে পারে। সুতরাং রক্তের যোগার করে রাখুন।”

-“ডোন্ট ওয়ারি অ্যাবাউট দ্যাট। আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই ওয়াইফ টু গেট ব্যাক টু মি। এনি হাও।”
ডক্টর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়ার্ড বয় এবং নার্স কে মিরাকে ভেতরে নিয়ে যেতে বললেন। মিরা এক নজর রায়ানের দিকে তাকালো। অতঃপর তার পাশের একজন ওয়ার্ড বয় কে ডেকে বলল-
“কাউকে একটু বলুন না ওনাকে একটু দেখতে, প্লিজ। অনেক জায়গায় কেটে গেছে ওনার। রক্ত ও পড়েছে খুব এখনো পড়ছে। ওনার ট্রিটমেন্টের দরকার।”
ডক্টর সাহেবা মিরার কাছে এসে মিরার কথা শুনে বললেন-
“হি ইজ ওকে মিসেস চৌধুরী। আমি বলে দিয়েছি অন্য ডক্টর দের। আপনি চিন্তা করবেন না। বাচ্চার উপর ফোকাস দিন। এখন আপনার সঙ্গ ওর বেশি প্রয়োজন।”
মিরা রায়ানের দিকে দেখলো তবে রায়ান মিরার দিকে আর তাকালো না। ছেলেটার আর সাহসই নেই। মিরা নিজের চোখ বন্ধ করে সব চিন্তা গিলে ফেলল। মিরাকে জটিল ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলে। রায়ান সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকিয়ে ডক্টর কে ডাকলো-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (৩)

“ডক্টর..!”
-“ইয়েস মিস্টার চৌধুরী, এনি প্রবলেম?”
রায়ান নির্দ্বিধায় অকপটে বলল-
“যদি কোনো পরিস্থিতিতে বাচ্চা আর মার মধ্যে যেকোনো একজনকে বাঁচাতে হয়..কোনো প্রকার সময় নষ্ট না করে..জাস্ট সেভ মাই ওয়াইফ ওকে?”
ডক্টর সাহেবরা অবাক হয়ে কেবল তাকিয়ে রইলেন। এমন অভিজ্ঞতা এর আগে তার কখনো হয় নি।দুজন মানুষ নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে ফেলার দ্বার প্রান্তে এসেও কেবল একে অপরের চিন্তাই করে যাচ্ছে।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (২)