আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫২
অরাত্রিকা রহমান
কাজি সাহেব হালকা কাশি দিয়ে কলমটা ঠিক করলেন।
রায়ান মিরায়ার পাশে বসেই মুচকি হাসছে—যেন বিরক্ত করার আলাদা শখ আছে তার। মিরায়া কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যেই বলল,
“কাজি সাহেব, ইসলামের অনুযায়ী যতটুকু দেনমোহর দেওয়ার নিয়ম আছে, ততটুকুই লিখুন।” ঘরের ভেতর যেন চাপা গুঞ্জন উঠল তবে সবাই বিয়ের জন্য উৎসাহিত। মাহির, রুদ্র, সোরায়া ও রিমি ছাড়া বাড়ির বড় কেউ উপস্থিত না থাকলেও সবাই চেষ্টা করছিল সব ঠিক মতো করার।
রায়ান ঠোঁট কামড়ে সেই চেনা বিজয়ের হাসি হাসলো—যেন বছরের সাধনার জিনিসটা পেয়েছে আজ হাতের নাগালে।
কাজি সাহেব মাথা নেড়ে প্রথাগত দেনমোহর লিখে নিয়ে বললেন-
“ঠিক আছে। এখন আমি নিকাহ শুরু করছি।”
মিরায়া পাশে বসে আছে। তার দুটো হাত কাঁপছে, আঙুলে আঙুল চেপে ধরে আছে। বুকের ভিতর এমনভাবে ধুকপুক করছে যেন কেউ ভেতর থেকে দেয়ালে লাথি মারছে। এসব কেন হচ্ছে তার সে নিজেও বুঝতে পারছে না। মিরায়ার বুকের ভেতর ধাক্কাধাক্কি চলছে—আসলে শব্দে বোঝানো যায় না এমন এক মিশ্র অনুভূতি।
রায়ান সামান্য দূরে বসে থাকলেও তার চোখ যেন সরেই না তার প্রিয়তমার দিক থেকে। দৃষ্টিটা শান্ত নয়, আর না মন বাঁধ মানছে…
চোখে আছে এমন কিছু—যা মিরায়াকে একই সাথে লজ্জা, ভয় আর অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করাচ্ছে।
কাজি সাহেব গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করলেন—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম…”
ঘরে সবার মুখে নীরবতা নেমে আসে, চারদিক নিরব। ফ্যানের শব্দটাও যেন ধীরে ঘুরছে। মিরায়ার বুকের ভেতর হুহু করা দৌড়, কেউ দেখে না, কিন্তু সে অনুভব করে প্রতিটা সেকেন্ড তার কানের ভেতর ধুকধুক করছে।
কাজি সাহেব প্রথমে রায়ানের দিকেই তাকালেন,
কাজি সাহেব খাতার দিকে তাকিয়ে নাম নিশ্চিত করে নিলেন।
তারপর গম্ভীর, পরিস্কার গলায় রায়ানকে জিজ্ঞেস করলেন—
“জনাব রায়ান চৌধুরী, মৃত- মিরাজ রহমানের বড় কন্যা, মেহরিন রহমান মিরায়া কে, নির্ধারিত দেনমহরের বিনিময়ে, শরীয়ত মোতাবেক নিকাহ করতে যদি কোনো আপত্তি না থাকে তবে বাবা বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল…”
রায়ান ভ্রু তুলে একবার মিরায়ার দিকে তাকাল—
চোখে স্পষ্ট অধিকার বোধ, যেন জানান দিচ্ছে আজকের দিনটা তার। তারপর সকলের শোনার সাপেক্ষে জোরে বলল,
“ আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
রায়ানের মুখে প্রথমবার কবুল শোনার সাথে সাথে মিরায়ার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো, সাথে শরীরও থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। বাকিরাও তা খেয়াল করছে কিন্তু সোরায়া চেয়েও মিরায়ার কাছে গিয়ে বসলো না ওই সময়ে আর। রায়ান মিরায়ার শরীর কেঁপে উঠতে দেখে সাথে সাথে নিজের পড়নের কোর্ট খুলে মিরায়ার গায়ে জড়িয়ে দিলো। মিরায়া চোখ মেলে রায়ানের দিকে চাইতেই কাজি সাহেব রায়ান কে দ্বিতীয় বার বললেন-
“আর একবার বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
রায়ান মিরায়া চোখে চোখ রেখেই দৃঢ়তা নিয়ে বলল-
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
মিরায়াও পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে। কাজি সাহেব আবার তৃতীয় বারের মতো বললেন-
“আরো একবার বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
রায়ান একটু দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মিরায়ার দিকে ঝুঁকে বলল-
“আলহামদুলিল্লাহ, আমি রায়ান চৌধুরী, শুরু থেকে শেষ, জন্ম থেকে মৃত্যু, আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত- সকল পরিস্থিতিতে জীবনের কোনো অংশ বিশেষ হিসেবে নয়, বরং নিজের জীবন হিসেবে নিজের বউকে কবুল করলাম।”
ঘরের সবাই স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল রায়ানের দিকে, মিরায়াও তাদের ব্যতিক্রম নয়। মিরায়ার চোখে নোনা জলরাশি ভীর করলো মনে মনে অন্য রকমের এক শান্তি অনুভব হচ্ছে তার।
কাজি সাহেব বললেন-“আলহামদুলিল্লাহ, এবার কনের পালা।”
কাজি সাহেব মিরায়ার দিকে তাকালেন। মিরায়ার গলা শুকিয়ে গেছে। হাত দুটো ঠান্ডা। রায়ান মিরায়াকে এক হাতে জড়িয়ে রইল যেন অস্থিরতা একটু কমে। মিরায়ার মনে হচ্ছে, কথাটা বলা আসলে যতটা সহজ সবাই ভাবে, ততটা না। কেবল কবুল করে নেওয়াতে সারা জীবনের জন্য নিজেকে কারো অধিনে সমর্পিত করার গভীরতা একটা মেয়ে ছাড়া কি কেউ বোঝে!?
কাজি সাহেব মিরায়ার উদ্দেশ্যে ও একই ভাবে বললেন-
“জনাবা মেহরিন রহমান মিরায়া, রায়হান চৌধুরীর বড় ছেলে, রিভান চৌধুরী রায়ান কে, নির্ধারিত দেনমহরের বিনিময়ে, শরীয়ত মোতাবেক নিকাহ করতে যদি কোনো আপত্তি না থাকে তবে মা বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল…”
মিরায়া মাথা একটু নিচু করে। তার চোখের পাপড়ি কাঁপছে—
বুকের ভেতর যেন কেউ দরাজে ধুকধুক করছে, করবে নাই বা কেন এইদিকে রায়ান শুদ্ধু ঘরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। শরীর অষাঢ় হয়ে আসার আগেই প্রথমবার সে খুব ধীরে বলল-
“আ..আলহামদুলিল্লাহ… কবুল।”
রায়ান পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল মিরায়ার কানে-
“হৃদপাখি জোরে বলো, আমি শুনতে পেলাম না তো।”
মিরায়া খেপে চোখ বড় করে তাকালো-“বজ্জাত লোক। শ্বাস আটকে যাচ্ছে আরো জোরে বলতে বলে। উনার মতো নির্লজ্জ পেয়েছে নাকি আমাকে। যত্তসব।” মনে মনে রায়ানকে খুব করে কথা শুনিয়ে চোখ নামিয়ে নিল আবার। কাজি সাহেব হাসি চেপে ফেললেন। কাজি সাহেব আবারো কবুল বলতে বললে, দ্বিতীয়বার মিরায়া একটু স্পষ্ট নরম গলায় বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
কাজি আবার বললেন,“তৃতীয়বার…”আর সেই মুহূর্তে—
মিরায়া অনুভব করল জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত, মিষ্টি, হালকা কম্পনমাখা সুখটা ঠিক বুকের ভেতর ফুঁপিয়ে উঠছে।
মিরায়ার গলার আওয়াজ যেন বের হতে চাইছে না, হয়তো জড়তা কাজ করছিল অতীতের বিষয়গুলো নিয়ে। মন মানাতে পারছিল না মেয়েটা। রায়ান মিরায়াকে চুপ দেখে বেশ বুঝতে পারছিল মিরায়ার সবটা এভাবে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তবে বিয়ে হওয়াটা অনেক জরুরী- তার যে তার বউ টাকে খুব কাছে চাই! রায়ান হালকা গলায় মিরায়ার কানে কানে আবদার রাখলো-
“বউ..! স্বীকার করে নেও না আমায়! প্লিজ!”
মিরায়া অবিশ্বাসে রায়ানের কথা চোখ বন্ধ করে গিলে নিল-“এভাবেও কি কোনো ছেলে স্বামী হিসেবে স্বীকৃতি চায়!?” মিরায়ার মাথায় ঢুকলো না তবে দ্বিধা ও রইল না। বড্ড আবেগ সহকারে তার প্রিয় পুরুষকে স্বীকার করে নিল-
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
হাজারো কথা গলায় এসে আঁটকে গেলো। চেয়েও বাড়তি কিছু বলতে পারলো না মিরায়া। তাতে কি! এতে রায়ানের কি আদতেও কোনো যায় আসে! নাহ, একদম না। কাজি সাহেব মাশাআল্লাহ বলার আগেই সে উচ্ছ্বসিত হয়ে একসাথে বলে উঠলো-
“মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, সুবাহানাল্লাহ। আমি আমার বউ পেয়ে গেছি। উফ্ আল্লাহ! অনেক শুকরিয়া তোমার। ফাইনালি।”
এই বলে যেই রায়ান মিরায়াকে জড়িয়ে ধরতে যাবে ওই সময়ই মাহির, রুদ্র, সোরায়া, রিমি একসাথে বলল-
“আমরা সবাই আছি।”
মিরায়ার চোখে অশ্রু থাকলেও তা চোখ থেকে যে শান্তি তে গড়িয়ে পড়বে তার জো নেই। রায়ান নিজেকে সামলে নিলে। কাজি সাহেব আলহামদুলিল্লাহ বলে। তাদের বিয়ের কাবিন নামায় সই করতে বললেন। রায়ান স্বাভাবিক ভাবে সই করতে পারলেও, মিরায়া কলম ঠিক মতো ধরতে পারছিল না হাত কাঁপতে থাকার জন্য। রায়ান মিরায়ার হাতটা খেয়াল করে নিজের হাতের মাঝে নিয়ে একটু ঘষে স্বাভাবিক করতে করতে চোখে চোখ রেখে মিরায়াকে বলল-
“নিজেকে আমার নামে লিখে দাও না, হৃদপাখি। কথা দিচ্ছি, একচুলও নড়া চড়া করবো না তোমার কাছ থেকে এবার। Trust me this time, ok!”
মিরায়া রায়ানের কথায় অদ্ভুত ভাবে শান্ত হয়ে গেল। মনের আন্তাশা গুলো তাকে উৎসাহ দিল। অবশেষে বিয়ের সব কাজ সম্পন্ন হলে, জুলিয়েট আর রোমিও-র তথাকথিত বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট করে, বলা চলে ঠিক পুতুল খেলার মতো। সবাই মিষ্টি মুখ করবে তাই সোরায়া আর রিমি মিষ্টি সাজিয়ে আনলো। নিয়ম অনুযায়ী বর বউ একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে দেয় তাই সোরায়া মিরায়ার সামনে মিষ্টি নিয়ে গিয়ে বলল-
“আপু…ভাইয়াকে মিষ্টি খাইয়ে দেও। এটা নিয়ম।”
মিরায়া জেদ বজায় রেখে সোরায়াকে চোখ বড় বড় করে শাশিয়ে বলল-
“আমি এসব নিয়ম পালন করব না। তোর ভাইয়াকে বল করতে। উনি এতো শখ করে বিয়ে করেছেন, উনিই পালন করবেন সব নিয়ম।”
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে রিমিকে ইশারা করতেই রিমি রায়ানের দিকে মিষ্টি এগিয়ে দিলে সে একটা মিষ্টি তুলি মিরায়ার মুখের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে সোরায়াকে ইঙ্গিত করে মিরায়ার উদ্দেশ্যে বলল-
“বনু, তোর আপুকে বল, বিয়ে তো আমি সত্যি খুব শখ করে করেছি, আর শখের নারীকেই করেছি। সুতরাং আমার সমস্যা নেই নিয়ম পালনে।”
মিরায়ার দিকে মিষ্টি এগিয়ে দিলে মিরায়া মুখ ফিরিয়ে নিতেই রায়ান গম্ভীর গলায় বলল-
“হৃদপাখি, বিশ্বাস করো আমার ধৈর্য খুব কম। আমাকে আমার শালিদের সামনে শুধু শুধু নির্লজ্জ হতে বাধ্য করো না সোনা। সবে বিয়ে হয়েছে এখনি কিছু করে বসলে বেজে দেখাবে।”
মিরায়া দাঁত খিচিয়ে নিয়ে ঠোঁট দিয়ে অল্প একটু পরিমাণে মিষ্টি ভেঙে মুখে নেয়, তা ছাড়া করারই বা কি আছে যেই না ধমকি দিয়েছে যেকোনো মেয়ে লজ্জায় মানসম্মানের ভয় আগে করবে। তবে রায়ান ইচ্ছে করে মিরায়াকে আরো রাগাতে মিরায়ার এঁটো মিষ্টি টা নিজের মুখে নিয়ে নিল। সোরায়া রিমি ফিক করে হেঁসে উঠতেই পিছন থেকে রুদ্র মাহির এসে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে? হাসি কিসের?”
মাহির আর রুদ্র কাজি সাহেবকে খাবার খাইয়ে তাকে বিদায় দিয়ে এসেছে যেহেতু যথেষ্ট রাত হয়ে গেছিল।
মিরায়া মুখ ফুলিয়ে বসে রইল আর বিড়বিড় করে রায়ান কে বকে তো যাচ্ছেই-“নির্লজ্জ বেহায়া একটা। এভাবে ছোট বোনের সামনে কেউ এঁটো খায়! ওহ! আমিও তো, কার ব্যপারে বলছি। যে কিনা যারতার সামনে পাগলের মতো ঠোঁটে চুমু খেতে পারে তার কাছে এটা আবার এমন কি!”
রুদ্র আর মাহিরের উত্তর রায়ানই দিল-
“কিছু না রে, তোদের ভাবি লজ্জায় বিয়ের পরের নিয়ম পালন করতে চাইছিল না তাই লজ্জা ভাঙার ছোট্ট চেষ্টা করলাম। এখন দেখি আরো লজ্জা পাচ্ছে। সোনায় বাঁধানো কপাল আমার।”
সবাই জোরে হাসতেই মিরায়া বিরক্ত হয়ে রায়ানের কোর্ট টা শরীর থেকে সরিয়ে রায়ানের দিকে ছুঁড়ে মেরে সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“সবার মিষ্টি খাওয়ার খুব ইচ্ছে হয়েছে তাই না! দাঁড়া খাওয়াচ্ছি।”
মিরায়া কথাটা বলেই এক এক করে সবার মুখে জোর করে একটা একটা লাড্ডু পুরে দিলো। রায়ানের মিরায়ার এই কান্ড দেখে হেসে লুটোপুটি খাওয়ার অবস্থা। এইদিকে রায়ানকে হাসতে দেখে মিরায়া ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে বলল-
“খুব হাসি পাচ্ছে? বিয়ে তো আপনার মিষ্টি তো আপনার খাওয়া উচিত।”
মিরায়া এবার মিষ্টি নিয়ে রায়ানের কাছে যেতে নিলে লেহেঙ্গায় পা জড়িয়ে যায়। রায়ান ও তাড়াতাড়ি মিরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে তাকে সামলে নিয়ে বলল-
“Take a chill pill wifey. মাত্র তো বিয়ে হলো। বিয়ের মিষ্টি সারা জীবন খাওয়াতে হবে তোমার, তবে এভাবে ওই মিষ্টি খাবো না। অধৈর্য হয়ও না বউ, আমার বউয়ের…ওওপসস সরি, আমার বিয়ের সব মিষ্টি আমি খুব আয়েশ করে খাবো, রয়ে সয়ে। আপাতত, তোমার ঠোঁটের স্পর্শীত মিষ্টি খেয়েই ডায়াবেটিস হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।”
মিরায়ার চোখ কপালে উঠার উপক্রম -“রায়ান কি বলল এটা! কিসের মিষ্টি, কি সারা জীবন খাবে?” সব গুলিয়ে গেল এক সেকেন্ডে। রায়ান মিরায়াকে বসিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল মাহিরকে-
“কাজি সাহেব ঠিক মতোন খাওয়া দাওয়া করেছেন? বিদায় দিয়েছিস?”
মাহির মুখের মিষ্টি কোনো মতো শেষ করে মাথা নাড়ালো। ছেলে মানুষ দেখে রুদ্র মাহির পুরো মিষ্টি খেতে পারলেও রিমি আর সোরায়া মুখের মিষ্টি শেষ হচ্ছে না। মাহির সোরায়াকে আর রুদ্র রিমিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো মিষ্টি গেলার জন্য। মিরায়া এখনো মুখ ফুলিয়ে বসে আছে দেখে রায়ান সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“খাওয়ার আয়োজন কর গিয়ে। মহারানি আমার খায়নি একবেলাও।”
মিরায়া রাগি দৃষ্টি তে তাকিয়ে রায়ান কে একবার দেখে বলল-
“আমি খাইনি আর খাবোও না এই বিয়ের খাবার। আপনি গিলুন। আর হ্যাঁ বিয়ে করে নিয়েছি মানে এই না সব ঠিক হয়ে গেছে, কিচ্ছু ঠিক হয় নি আর হবেও না।”
এই বলে মেজাজ দেখিয়ে মিরায়া নিজের ঘরে যেতে নিলে রিমি বলে উঠলো-
“মিরা..বাসর ছাদ ঘরে সাজানো হয়েছে।”
মিরায়া রিমির কথায় দাঁত কটমট করে বলল-
“একা একা করতে বল বাসর। আমি কারো সাথে বাসর ফাসর করবো না।”
রায়ান মিরায়ার জেদ মানবে, তাতে তার সমস্যা নেই কিন্তু সবার সামনে নিজেদের মধ্যে কার দূরত্ব তুলে ধরা, বাসর করবো না বলা, রায়ানের গাঁয়ে সইল না। রায়ান মিরায়ার কাছে গিয়ে মিরায়াকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিয়ে ছাদ ঘরে যেতে যেতে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল-
“খেয়ে নে তোরা। আমি খাবার না, অন্য কিছু খাবো। আর যার খাওয়ার ইচ্ছা নেই সে খাবে না। গুড নাইট।”
মিরায়া হঠাৎ রায়ানের আচরণে চেঁচিয়ে উঠলো-
“হচ্ছে টা কি! বললাম তো যাবো না বাসর ঘরে। ছাড়ুন, নামান আমাকে। অসভ্য লোক কোথাকার।”
কে শুনে কার কথা ধীরে ধীরে মিরায়ার চেঁচামেচি ধীর হয়ে গেল রায়ান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে যেতে। এমন পরিবেশের সম্মুখিন হয়ে সোরায়া রিমি বেশ ভয়ে ভয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরল। দুইজনের মনেই পুরুষ জাতি নিয়ে ভয়াবহ কিছু ধারণা হলো। রুদ্র মাহির রায়ানের আচরণে হতবাক তবে পাশের মেয়ে দুটোর এমন জোড়ো শোড়ো অবস্থা দেখে মাহির রুদ্র কে অপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাহির একটু বিরক্ত হয়ে রুদ্র কে বলল-
“তোর ভাইয়ের জন্য দেখবি আমাদের কিছু হবে না। এভাবে যদি আগেই ভয় পেয়ে যায়, তাহলে কিভাবে কিছু সম্ভব!”
রুদ্র এক নজর সোরায়া আর রিমিকে দেখলো। মেয়ে দুটো কেমন আড় চোখে তাদের কে দেখছে যেন রায়ানের ব্যবহারের উপর তারা বিচার বিবেচনা করছে ছেলেদের। রুদ্র আর মাহির অস্বস্তি যে পড়ে গিয়ে একসাথে রিমি আর সোরায়াকে নিজের সাফাই দিতে বলল-
“আরে আমরা এমন না তো। আমরা খাবারই খাই।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে সোরায়া রিমি এক দৌড়ে সোজা খাবার ঘরে চলে গেল, যেন মাহির রুদ্র যা বললো তার উল্টোটা শুনেছে। মাহির আর রুদ্রর আর কি! বেচারারা এমনি করে দাঁড়িয়ে রইল হাত গুটিয়ে।
রায়ান মিরায়াকে ছাদ ঘরে এনে দরজা খুলতেই উপর থেকে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে পড়লো তাদের উপর। মূলত রিমি আর রুদ্র প্লেন করে এগুলো করেছে। রায়ান মিরায়া দুইজনেই একটু আশ্চর্য হলো। রায়ান মিরায়াকে নামিয়ে দিলে দু’জন বাসর ঘরটা দেখলো- এত সুন্দর করে প্রতিটা কোণা সাজানো যা বলার বাইরে। মিরায়া সম্পূর্ণ ঘরটা একনজর দেখে পিছনদিকে ফিরে বের হতে যাবে তখনি রায়ান ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। মিরায়া উৎকণ্ঠা হয়ে রায়ানকে প্রশ্ন করলো-
“সমস্যা কি আপনার?”
রায়ান মিরায়ার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে কেবল এগিয়ে গেল মিরায়ার দিকে। মিরায়া রায়ানকে এভাবে আগাতে দেখে এক পা একপা করে পিছতে থাকলো।
-“কি হলো? কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো! আগাচ্ছেন কেন আমার দিকে?”
ধীরে ধীরে সৃষ্ট গলা ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে পরিনত হলো-
-“কি..কি চাই? কিছু বলছেন না কেন আজব তো।”
রায়ান মিরায়ার কথার উত্তর না দিয়ে কেবল এগিয়ে গেল মিরায়ার দিকে। মিরায়া এক পা এক পা পিছিয়ে যেতে যেতে তার পিঠ আলমারি তে ঠেকে গেল। রায়ান মিরায়ার একে বাড়ে কাছে চলে এলে মিরায়া চোখ দুটো খিচিয়ে বন্ধ করে নেয়। মিরায়ার ভয়ার্ত চেহারা দেখে রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে মিরায়াকে আলমারির সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে আলমারি খুলল। মিরায়া চমকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা টাওয়াল বের করে রিমি মিরায়ার জন্য যে বাড়তি পোশাক রেখেছিল সেখানে সেগুলো বের করতে করতে বলল-
“কি ভাবছিলেন মেডাম? আপনার মাথাতেও ওসব ঘোরে আগে জানতাম না তো।”
মিরায়া থতমত খেয়ে খটমট করে বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো মুখ ফুলিয়ে। রায়ান তার বাচ্চা বউ টাকে দেখে তার প্রশংসায় বলল-
“তোমার ঠোঁটের লাল লিপস্টিক অনেক সুন্দর লাগছে বউ।”
মিরায়া এক নজর রায়ানের দিকে তাকিয়ে হাতের উল্টো পিঠ ঠোঁটে ঘষে লিপস্টিক মুছে ফেলল। রায়ান আড় চোখে তা খেয়াল করে মিরায়াকে জ্বালাতন করতে আবার অন্য কিছু নিয়ে প্রশংসা করল-
“চুলের খোঁপায় লাল গোলাপ ফুল ও মানিয়েছে তোমাকে।”
মিরায়া এবার জেদ করে খোঁপার ফুল গুলো টেনে খুলে ফেলল। রায়ান এসব বাচ্চামি দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়াকে বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে বলল-
“লাল লেহেঙ্গা টাও বেশ ভালো লাগছে তোমার শরীরে।” রায়ান যে লেহেঙ্গা টা খোলার ইঙ্গিত দিলো তা বুঝতে আর মিরায়ার বাকি নেই। চোখ বাঁকিয়ে একবার রায়ানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল-
“”অশ্লীল লোক..!”
রায়ান আলমারি থেকে কাপড় বের করে মিরায়ার দিকে এগিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে বলল-
“৫ মিনিট দিচ্ছি। জেদ না করে তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে এসো তা না হলে…!”
মিরায়া তেতে উঠে জিজ্ঞেস করলো-
“তা না হলে কি শুনি?”
রায়ান মিরায়ার দিকে আরো এগিয়ে গিয়ে বলল-
“তা না হলে আমি নিজ হাতে সেই মহান কাজ করবো। Choice is yours baby.”
মিরায়া ঠিক কিভাবে কথা বললে রায়ানের গাঁয়ে লাগবে সে ভেবে পাচ্ছিল না। ভালোবাসা এতো বেহায়া হয় কে জানতো! মিরায়া এক দৃষ্টিতে রায়ান কে দেখতে থাকলে রায়ান ইচ্ছে করে আগবাড়িয়ে বলল-
“বুঝেছি নিজে নিজে চেঞ্জ করতে চাইছো না। তা সেটা তো বললেই হয়, উঠো সোনা আমি চেঞ্জ করিয়ে দিচ্ছি। এমনিতেও বউ আনবক্স করার ফিল নিতে ইচ্ছে করছে।”
মিরায়া বুঝলো রায়ানের সাথে জেদ ধরে লাভ নেই, নেহাতই তেড়া মানুষ সে। তাই মিরায়া কথা না বাড়িয়ে থাবা মেরে রায়ানের হাত থেকে কাপড় গুলো নিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে দৌড় দিলো আর বলল-
“বউ আনবক্স এই জীবনে আর করতে হবে না আপনার।”
রায়ান ও জোরে বিরক্ত গলায় বলল-
“আমি জানি আমার কপাল পোড়া তাই তো আমার বউ আমার কষ্ট বোঝে না। একটু বুঝলে নিজে থেকেই কাছে আসতো। নির্দয় সুশীল বউ আমার।”
মিরায়া কথাটা শুনেও পাত্তা না দিয়ে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
কেয়ারটেকার কাকা সবার খাওয়া দাওয়া শেষে তাদের ঘর গুলো সুন্দর করে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সবাই খাওয়া শেষ করে যার যার ঘরে… হ্যাঁ এমনটা হওয়ার কথা তবে হচ্ছে না। রিমি বাগানে আর আর সোরায়া বাড়ির পিছনের বসার ছাউনী যে বসে অপেক্ষা করছে রুদ্র আর মাহিরের আলাদা আলাদা ভাবে। এই ব্যাপারে কেউ কারো খবর জানে না।
বাড়ির পিছন দিকে~
সোরায়া বেশ কিছু সময় ধরে হাঁটাহাঁটি করছে আর হাতে হাত ঘষছে। হয়তো কিছু নিয়ে চিন্তিত তাই এমন করছে। মাহির
সেখানে পৌছতেই দেখলো সোরায়া অস্থির হয়ে পায়চারি করছে।
-“এমন অস্থির হয়ে পায়চারি করার কারণ টা কি আমি?”
মাহির সোরায়া কে খোঁচা মেরে কথাটা জিজ্ঞেস করলো।
হঠাৎ আওয়াজে সোরায়া চমকে উঠে পিছন ঘুরে মাহিরের দিকে তাকালো। আর একটু ইতস্তত বোধ করে বলল-
“অস্থিরতার কারণ আপনি কেন হতে যাবেন? আমি এমনি পায়চারি করছি, খাবার হজম করার জন্য।”
মাহির একটু হেঁসে সোরায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার সম্মুখে দাঁড়ালে সোরায়া একটু পিছু হটে মাথা নিচু করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“স্যার, আপনি আমাকে এখানে কেন ডাকলেন? ইম্পরট্যান্ট কিছু?”
মাহির হেঁয়ালি করে বলল-
“ইম্পরট্যান্ট তো বটেই। কিছু প্রশ্ন.. না সরি মাত্র একটা সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর চাই।”
সোরায়া একটু ঘাবড়ে গিয়ে মাহিরের দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কি প্রশ্ন স্যার? আমি কি কিছু করেছি?”
মাহির খুব সিরিয়াস হয়ে বলল-
“আমার জানার পরিধি অনুযায়ী কিছু তো করেছ, এখন শুধু নিশ্চিত হতে হবে আমার।”
সোরায়া মনে মনে ভাবতে লাগলো-“হায় আল্লাহ কি করেছি আবার আমি?” মনের চিন্তা মাথায় চড়ে বসলে সে মাহির কে প্রশ্ন করলো-
“স্যার, কি সোজা প্রশ্ন সেটা? আপনি জিজ্ঞেস করুন আমি সোজা উত্তর দিচ্ছি।”
মাহির মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“আমায় পছন্দ?”
-“কিহ্…! কি বললেন?”
-“প্রশ্ন করেছি তোমাকে, আমায় পছন্দ করো? Do you like me?”
সোরায়া স্তব্ধ হয়ে গেল, গলা থেকে আওয়াজ বের হচ্ছে না তার। মাহির সোজা প্রশ্ন বলতে এমন সোজা বুঝিয়েছে তা জানলে হয়তো সে প্রশ্ন করতে বলতো না। মাহির সোরায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বলল-
“Tell me the truth, ok?”
সোরায়া ভয় পেয়ে শুকনো ঢোক গিলল।
অন্যদিকে বাগানে~
রিমি রুদ্রর অপেক্ষায় কিছুটা সময় পার করলে রুদ্র ও বাগানে চলে আসে। রিমি একটু চিন্তিত গলায় রুদ্রকে প্রশ্ন করলো-
“রুদ্র..! আপনি আমাকে বাগানে ডাকলেন যে হঠাৎ! কোনো প্রয়োজন? কি হয়েছে?”
রুদ্র ঠিক কি ভাবছিল তখন সে নিজেও জানে না। রিমিকে রিমির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে তার মনের মাঝে চলতে থাকা দ্বন্দ্ব থেকে প্রশ্ন করলো-
“রিমি…! আমাকে আপনার কেমন লাগে?”
-“জি..!”
রিমি অবাক হয়ে কয়েকবার চোখের পলক ফেলে বলল-
“আপনাকে আমার ভদ্র, যত্নবান, দায়িত্বশীল লাগে।”
রুদ্র রিমির আরো কাছে গিয়ে অশান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“উঁহু, সেভাবে নয়। ছেলে হিসেবে কেমন লাগে?”
রিমি রুদ্রর কথায় ইঙ্গিত যেন বুঝেও বুঝতে চাইলো না, সে ভালো করেই জানে তাদের একসাথে মানায় না সুতরাং ভবিষ্যতের বাড়তি কিছু তাদের জীবনে মঙ্গল জনক হবে না। রিমি কথা এড়াতে বলল-
“রুদ্র এসব হঠাৎ কি জিজ্ঞেস করছেন বলুন তো! কি হয়েছে আপনার? আচ্ছা বাদ দিন, আপনি ক্লান্ত এখন, একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবেন। ঘুমাতে যাওয়া উচিত রাত হচ্ছে আর বেশ ঠান্ডাও পড়েছে।”
রুদ্র রিমির বাকি কথার কোন পাত্তা না দিয়ে নিজের জ্যাকেট খুলে রিমির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল-
“আমি জানি না কি হয়েছে আমার। পারছি না ঘুমাতে, জানি না কেন! আপনার অনুপস্থিতিতে দম বন্ধ কারণও আমার অজানা। অশান্ত মনের হোদিশ কেবল আপনার চিন্তা মাথায় ঘুরলেই মেলে কেন? কেন কিছু ভালো লাগে না আপনার অস্তিত্বের আভাস না থাকলে? এই সব আমার অজানা। উত্তর কোথায় পাবো বলতে পারেন?”
রিমি হৃদস্পন্দন হঠাৎ তার গতি থামিয়ে দিলো কিনা তা বলা মুশকিল তবে শ্বাস আসছে না সেটা বোঝা যায়। রিমি বুঝতে পেরেছিল এমন একটা সময়ের মুখোমুখি তার হতে হবে হয়তো কিন্তু কারো মনকে ধরে রাখা তো সম্ভব নয়। রুদ্রর কথায় সে নিজের অনুভূতির প্রতিবিম্ব দেখছে কিন্তু তার খেয়াল নেই পরিস্থিতি তার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও রুদ্রর জন্য করবে না। একজন মানুষের সম্পূর্ণ অধিকার আছে নিজের আবেগের গুরুত্ব দেওয়ার।
রুদ্র কথার কোনো উত্তর রিমির কাছে নেই যার প্রেক্ষিতে রিমি চুপচাপ ওই স্থান ত্যাগ করতে চাইলে রুদ্র প্রথম বারের মতো রিমি কে নিজের একবাহু দ্বারা আঁকড়ে ধরে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“রিমি…প্লিজ আজকে অন্তত এভাবে চলে যাবেন না। নিজের মনকে বড্ড মানিয়ে আজ আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। উত্তরের অপেক্ষায় থাকতে আর ইচ্ছে করছে না।”
রিমি রুদ্রর কথা শুনলো কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখালো না। রুদ্রর হাত নিজের থেকে সরিয়ে নিয়ে রুদ্রর জ্যাকেট টা রুদ্রর হাতে দিয়ে বলল-
“কিছু প্রশ্নের উত্তর থাকে না কেন জানেন? কারণ ওই উত্তর গুলোর আদতে কোনো মূল্য বা স্বীকৃতি থাকে না। আর আমার মতে সেসকল উত্তর না জানাই ভালো।”
রিমি বাগান থেকে বাড়ির ভিতরে চলে গেলে রুদ্র রিমির যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। কিছু সময় একা বাগানে অবস্থান করে রিমির কথাটা ভাবলো-
“রিমি এমন কেন বললেন? উনি কি কিছু নিয়ে ওভারথিংক করছেন? বা উনার কি কোনো ভয় কাজ করছে?”
হঠাৎ কি ভেবে যেন বলে উঠলো-
“হতে পারে, হয়তো উনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তবে যদি আমি নিজেকে প্রমাণ করতে পারি তাহলে তো বিশ্বাস করবে! হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই হবে হয় তো, পরিবারের সব কিছু এতো এলোমেলো তাই হয় তো ভয় পাচ্ছেন উনি। এমন অযৌক্তিক বিষয়ের জন্য আমি আমার ভালোবাসা ছাড়তে পারবো না। আজ বলেন কি তো কাল বলবেন, সমস্যা কোথায়!”
রুদ্র রিমিকে সর্বোচ্চ বোঝার চেষ্টা করলো নিজের মতো করে তবে রিমির মনে সব কিছু খুব আঘাত করছে। রিমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে নিজের ঘরে এসে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে দরজার সাথেই পিঠ ঠেকিয়ে অঝড়ে কান্না করতে থাকলো। রুদ্র তার জীবনের প্রথম মানুষ যার আশেপাশে তাকে তার সুরক্ষার চিন্তা করতে হয় না। সব কিছু কেমন সহজে মিটে যায়। মায়ের পর প্রথম কেউ তার এতো যত্ন করেছে। রিমি কাঁদতে কাঁদতে সৃষ্টি কর্তার উদ্দেশ্যে আহাজারি করলো-
“আল্লাহ তুমি আমার জন্য সুখ লিখনি তা তো মেনে নিয়েছিলাম তাহলে কেন আমাকে শুধু শুধু লোভ দেখাচ্ছ একটা সুন্দর জীবনের? কেন মানুষটাকে এতো আপন লাগে কেনই বা তার অশান্ত জীবনের কারণ বানাচ্ছো আমাকে? যদি কপালেই না লিখে রাখো এসব কেন?”
বন্ধ ঘরে অনুভূতি রা শব্দের রূপ পেল তবে না রুদ্রর কান অব্দি গেল না।
এদিকে মাহির সোরায়ার মুখে কথা না দেখে বলে বসলো-
“আচ্ছা তোমরা মেয়েরা যা অনুপস্থিতিতে অগোচরে অনায়াসে বলে দাও তা সামনাসামনি বলতে সমস্যা কোথায় বলো তো?”
সোরায়া মাহিরের কথার আগামাথা কিছু না বুঝে প্রশ্ন করলো-
“মানে?”
মাহির সোরায়ার প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজের ফোন বের করে সোরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-
“জান্নাতুল রহমান সোরায়া, এই ফেইসবুক আইডিটা তোমার তো নাকি?”
সোরায়া উপর নিচ মাথা নাড়ালে মাহির সোরায়ার দিকে তার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“তাহলে নিশ্চয়ই এই আইডি থেকে আসা মেসেজ গুলো ও তোমার তাই না?”
সোরায়া ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে তার অনেক আগে কনফেশন মেসেজ টা পড়েই চোখ বড় বড় করে নিয়ে ভয়ে মাথা নাসূচক নাড়িয়ে বলল-
“না না, এইসব আমি লিখি নি। আইডি হ্যাক হয়ে গেছিল তখন।”
মাহির ফিক করে হেঁসে উঠে ফোনটা সোরায়ার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে বলল-
“Oh really! হ্যাকার দের এতো ক্ষমতা হয়েছে যে আমি তোমার স্যার হই এটাও জানে! আবার হ্যাকার হয়ে টাকার কথা না বলে প্রেমের কথা বলে! Wow, interesting.”
সোরায়া বুঝলো মিথ্যে পাও ঠিক মতো বলা হয়ে উঠে নি তার দ্বারা। কিন্তু স্বীকার করে গেলে মানসম্মান কিচ্ছু থাকবে না তাই অযুহাতে দিয়ে বলল-
“আরে স্যার, নবীন বরণের পর কেউ দুষ্টুমি করে হ্যাক করেছিল তাই হয়তো পাঠিয়েছে। আমি কিছু মনে করবেন না প্লিজ। আমার না ঘুম পাচ্ছে আমি যাই। Gd night.”
সোরায়া তখন জায়গা ত্যাগ করতে চাইলে মাহির সোরায়ার সামনে এসে তার পথ আটকছ বুকে আড়াআড়ি করে হাত বেঁধে বলল-
“আহা, ভুল হচ্ছে তোমার। মেসেজ টা নবীন বরণের অনেক আগে এসেছে সোরায়া। টাইম খেয়াল না করে মিথ্যা বলে ধরা খাওয়ার কোনো মানে হয়?”
সোরায়া মাহিরের কথায় থ মেরে গেলে মাহির সোরায়ার দিকে এগিয়ে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“এত লজ্জার কি হলো? আমি কি বলেছি মেসেজটা আমার খারাপ লেগেছে? এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে না।”
সোরায়া মাহিরের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-“খারাপ লাগে নি? তো কি ভালো লেগেছে!? কেন?”
মাহির এবার আরো কাছে যেতে যেতে সোরায়াকে আবার প্রশ্ন করলো-
“Now say it in front of me what you said in the massage… Do you really like me?”
সোরায়া মাহিরের গতিবিধি বুঝতে পারছিল না তাই নিজেও পিছাতে শুরু করলো। হঠাৎ একটা ইটের সাথে পা লাগায় ব্যালেন্স হারিয়ে পড়তে নিলে মাহির একহাতে আর হাত আর অন্য হাতে কোমর আঁকড়ে ধরে বলল-
“পালাচ্ছো? লাভ নেই। নিজের থেকে ধরা দিয়েছ যেহেতু পালানোর চেষ্টা বৃথা।”
সোরায়া মাহিরে চোখের দিকে তাকিয়ে শুরু থেকে এখনো অব্দি মাহিরের সব আচার-আচরণ বিবেচনা করে নিশ্চিত হলো মাহিরের ও তার প্রতি যথেষ্ট দূর্বলতা আছে। কিন্তু যেহেতু মাহির শুরু তে তার অনুভূতির মূল্যায়ন করে নি তাই এতো সহজে ধরা সেও দেবে না- হক না শখের মানুষ তাতে কি!
সোরায়া মাহিরের এমন অস্থির হওয়া দেখে বেশ মজা পেল তাই ইচ্ছে করেই মাহির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“পালাবো কেন হ্যাঁ? কি ছাতার মাথা বলে যাচ্ছেন তখন থেকে। ছাড়ুন আমি ঘরে যাবো।”
এই বলে আবার হাঁটতে শুরু করলে মাহির সোরায়ার হঠাৎ এমন প্রতিবাদী রূপ দেখে গম্ভীর ভাবে সোরায়ার হাত ধরে টেনে বাড়ির দেয়ালে ঠেলে দিয়ে হাতে দ্বারা দেয়ালে জোরে শব্দ করে বলল-
“আমি জিজ্ঞেস করেছি কিছু…আমাকে ভালোবাসো? ডু ইউ লাইক মি?”
সোরায়া ভাব নিয়ে আড়াআড়ি করে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখেছেন কখনো? ”
হঠাৎ দেয়ালের থেকে হাত ফসকে যায় মাহিরের সোরায়ার কথায়। এই সুযোগে সোরায়া মাহির কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলে মাহির অস্পষ্ট বলল-
“এত বড় অপমান? তাও চেহারা নিয়ে?”
তারপর বাড়ির দিকে তাকিয়ে সোরায়ার জন্য বলল-
“এই চেহারার মানুষের সাথেই থাকতে হবে সারাজীবন তোমার সুতরাং আয়না নয় আমাকে তোমার দেখার প্রয়োজন।”
দুই জগতের দুই কাহিনী প্রায় এক রাতে উল্টে গেলো। ফলাফল হয়তো এর পরে দেখা যাবে।
ছাদঘর~
মিরায়া প্রায় ৩০ মিনিট পর ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এলে মাথা মুছতে মুছতে সোজা আয়নার সামনে যায়। রায়ান ল্যাপটপ এ বসে কিছু দেখছিল তখন। অনেক দিনের কাজ জমা রুদ্র যতটা পেড়েছে ততটা চেষ্টা করেছে সামলানোর তবে যার কাজ সে যদি না থাকে সব একটু উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। সারাদিনে যতটা পেড়েছে একটু সামলেছে এখনো তাই করছে। মিরায়ার উপস্থিতিতে তার দিকে একবার তাকিয়ে নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল-
“এত রাতে শাওয়ার নিয়েছ, চুলটা শুকিয়ে নেও ঠান্ডা লেগে যাবে নয়তো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি কেমন?”
রায়ান তার শার্ট খুলতেই তার সুঠাম বুকে পিঠ আর এ্যাবস গুলো আবরন মুক্ত হলো। মিরায়া খেয়াল না করেই রায়ানের কথায় আয়নায় তাকাতেই রায়ানের উন্মুক্ত পিঠ দেখে সাথে সাথে পিছনে ঘুরলো। রায়ান ও ঘরলো। মিরায়া রায়ানকে পা থেকে মাথা অব্দি দেখলো, সাথে রায়ান ও মিরায়ার চোখ অনুসরণ করে নিজেকে দেখলো। মিরায়া হঠাৎ কি মনে করে যেন দুই হাতে চোখ দুটো ঢেকে নিয়ে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“ফ্রেশ হবেন তো ঘরে চেঞ্জ করছেন কেন? আমি তো ঘরে আছি নাকি! লজ্জা কি বেচে খেয়েছেন?”
রায়ান মিরায়ার কথায় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়ার দিকে এগিয়ে গেল, মিরায়া হাতের আঙুল ফাঁকা করে রায়ানের অবস্থা দেখতে চোখ মেলে তাকাতেই দেখলো রায়ান তার সামনে। আচমকা কিছু করার আগেই রায়ান মিরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে ড্রেসিং টেবিলের উপর বসিয়ে দিয়ে তার উপর ঝুঁকে বলল-
“তোমার বর তোমার সামনে চেঞ্জ করবে না তো কার সামনে করবে বউ? তাছাড়া লজ্জা তোমার একটু বেশি, আমি না হয় নির্লজ্জ হলাম, তা নাহলে সংসার হবে না যে..আমার সবই তো তোমার তাই লজ্জার প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। একটু আগেই তিন কবুল বলে আমাকে আর আমার সব কবুল করেছ, ভুলে যেও না। সবকিছু…!”
মিরায়ার বুক কাঁপছে শিহরণে, ছেলেটা বরাবর নিজের কথা দিয়ে মনে ঝড় তুলে ছাড়ে তার। মিরায়া চোখ গরম করে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো-
“স…সব কি..কিছু মানে?”
রায়ান দুষ্টু হেঁসে বাসর খাটের দিকে তাকালো, সাথে মিরায়াও রায়ানের ইশারায় সেদিকে তাকাতেই তার বুকের পানি শুকিয়ে গেল। কয়েকবার পলক ফেলে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ান মিরায়াকে একবার চোখ টিপে ইশারা দিলে মিরায়া রায়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চায়-
“অসভ্য অশ্লীল লোক একটা, সরুন সামনে থেকে আমার।”
রায়ান দূরে না গিয়ে উল্টো মিরায়ার হাত দুটো পিছনে আটকে ধরে মিরায়ার গলায় মুখ ডুবিয়ে কিছু টা সময় ইচ্ছে মতো বিচরন করলো। রায়ানের খোঁচা খোঁচা দাড়ি মিরায়ার গলায় বিঁধছিল। রায়ান হঠাৎ হাস্কি কন্ঠে বলে উঠলো-
“এই মুহূর্তে তোমাকে ঠিক সদ্য বিলে ফোঁটা পদ্ম ফুল লাগছে জানো? নিজেকে সামলাতে চাইছি কিন্তু পারছি না। কেন এভাবে আমাকে কষ্ট দিচ্ছো?”
মিরায়া প্রথমে ছটফট করলেও রায়ানের কথায় শান্ত হয়ে গেল। রায়ান উষ্ণ নিঃশ্বাস তার গলায় পড়ছিল বলে নরম মেয়ে দেহ মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। মিরায়ার চোখে পানি তবে তা রায়ানকে কাছে পাওয়ার সুখে না অতীত মনে করে তা বোঝা দায়। রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মিরায়ার গলায়, ছোট্ট চুমু খেয়ে মুখ তুলে নিয়ে মিরায়ার দিকে তাকায়। মিরায়াও রায়ানের চোখে চোখ রাখলে রায়ান মিরায়ার চোখের ভাষা বুঝে একটু আদর করতে এগিয়ে গেলে মিরায়া চোখ বন্ধ করে নেয়। রায়ান মিরায়াকে এমন ভাবে দেখে একটু হেঁসে ঠোঁট না ছুঁয়ে কপালে আদরের পরশ এঁকে দিয়ে বলল-
“আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি, তুমি চুল শুকিয়ে নেও কেমন?”
মিরায়া তৎক্ষণাৎ চোখ খুললে রায়ান নিজের জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে যায়। মিরায়া ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে নেমে আয়নার দিকে ফিরে ঘার কাত করে কিছু সময় নিজের গলা দেখে বিড়বিড় করলো-
“এত পাগলামি করার কি আছে এখানে সামান্য গলাই তো। দাড়ির খোঁচা তে কতটা লেগেছে আমার তার খেয়াল আছে উনার! যত্তসব কাহিনী বেডা মানুষের।”
তার হঠাৎ পিছনে ফিরে ওয়াশ রুমের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল-
“নাহ্! এই লোককে কোনো বিশ্বাস নেই। কি করবে না করবে কে জানে। রাত টা ওয়াশ রুমেই থাকুক সকালে ভয় নেই।”
এই বলে মাথায় তার যে দুষ্টু বুদ্ধি উঁকি দিল সে করলো ও তাই। ওয়াশ রুমের দরজা সামনে থেকে লক করে দিলো।
প্রায় ২০ মিনিট পর রায়ান বের হওয়ার জন্য দরজার খুলতে গিয়ে দরজা খুলতে না পেরে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে মিরায়াকে ডাকলো-
“হৃদপাখি?…মিরা…দরজা খুলছে না কেন?”
মিরায়া খাটের উপর বসে ফোনের রিলস স্ক্রল করছিল। রায়ানের ডাকে সাড়া না দিয়ে সে ওই দিকেই মন দিয়ে রাখলো। রায়ান আবারো মিরায়াকে আওয়াজ দিলো-
“এই বউ…মিরা… হৃদপাখি দরজা সামনে থেকে লক কেন করেছ তুমি?”
মিরায়া এক গাল হেসে বিড়বিড় করল-
“লোকটা যেমনি পাগলাটে হক না কেন ডাকতে পারে ভালো করে। বউ…কি সুন্দর ডাক। হিহিহি। থাকুক ওইখানেই খুলবো না আমি দরজা।”
রায়ান আকুতি করে বলল অবশেষে –
“মিরা..বেইবি, দরজা খোলো। Open the door, please.”
মিরায়া ইচ্ছে করে একটু নেকামি করে বলল-
“না, আমার ভয় করছে। খুলবো না দরজা।”
রায়ান মিরায়ার কথা শুনে বুঝলো না মিরায়া কি বোঝাতে চাইলো তবে যা বুঝলো তার অনুযায়ী উত্তর করল-
“দরজা খোল পাখি, আমি তোমার সাথে থাকলে আর ভয় করবে না।”
মিরায়া মুখ ভেংচিয়ে নিজে নিজে বিড়বিড় করল-
“এনার মাথায় কি কিছু নেই নাকি? বোঝে নি কি বললেন?!”
এবার রায়ান কে স্পষ্ট বোঝাতেই বলল-
“”আপনাকেই ভয় করছে আমার। তাই আমার আশে পাশে যে না আসতে পারেন তাই দরজা লাগিয়েছি।
রায়ান আহাম্মক হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ পরে আবারো আবেগ নিয়ে বলল-
“এমন টা করবে বরের সাথে সোনা? আমার কষ্ট হচ্ছে।”
মিরায়া কথা পেঁচিয়ে বলল-
“আপনি তো তখন বললেন আমাকে দেখে আপনার নিজেকে সামলাতে ও কষ্ট হয়। আপনার কথা ভেবেই তো দরজা আটকেছি।”
রায়ান বিরক্ত হয়ে বলল-
“মহা উপকার করেছেন মহারানি আমার। এবার দরজা খুলুন আমি আপনাকে দেখে নিজেকে সামলানোর কষ্ট সহ্য করতে রাজি।”
মিরায়া তাও রাজি হলো না-“উঁহু খোলা যাবে না।”
রায়ান আর কিছু না পেয়ে এবার গভীর কিছু নিয়ে বলল যেন মিরায়া দরজা খুলতে বাধ্য হয়-
“আচ্ছা খুলো না। বিয়ের রাতে বর বউকে নামাজ পড়তে হয় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে হয়। সেসব কিছুই করতে হবে না। আল্লাহ নারাজ হলে হক সমস্যা কই, বিয়ে তো আমি করেছি সুতরাং পাপ ও আমার। তুমি…”
পুরোটা কথা শেষ করার আগেই মিরায়া দরজা খুলে দিয়ে এক দৌড়ে জায়নামাজ নিয়ে এলো দুটো আলমারি থেকে রিমি ওই গুলো ও রেখে দিয়েছিল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে ঘরে ঢুকলে মিরায়া দুই জনের জন্য জায়নামাজ বিছায় মেঝেতে আর গিয়ে অযু করে এসে এক সাথেই নামাজ পড়তে বসলো। এর মাঝে তাদের আর কোনো তর্ক বিতর্ক হয় নি। নামাজ শেষে রায়ান আগে উঠে গেলেও মিরায়া বেশ খানিকটা সময় মুনাজাতে ছিল যা দেখে রায়ান একটু মুচকি হেঁসে উপর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল-
“হে আল্লাহ..আমার বউ তোমার কাছে এতো কি চাইছে? (মিরায়ার দিকে অপলকে তাকিয়ে বলল-) সে বিয়ে মানে না কিন্তু বিয়ে করে নামাজ পড়ে এতো দোয়া করছে। আল্লাহ কই যাবো আমি একে নিয়ে।”
মিরায়া মুনাজাত শেষ করে নামাজ থেকে উঠে জায়নামাজ টা ভাঁজ করতে করতেই পিছনের দিকে ফিরলে রায়ান মিরায়ার দিকে দুই বাহু মেলে দিয়ে বলল-
“বুকে আসো না বউ।”
মিরায়া বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছিল তাই মুখে প্রত্যাহার করতে পারলো না কিন্তু কাছেও গেল না বরং রায়ানের পাশ থেকে চলে যেতে চাইলে রায়ান নিজের থেকে এসে মিরায়াকে বুকে আগলে নেয়। মিরায়া ছুটার চেষ্টা করলো বলে রায়ান আবার সোজা হয়ে মিরায়ার হাত থেকে জায়নামাজ টা নিয়ে সোফায় রেখে মিরায়ার মুখটা নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে মিরায়ার কপালে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে চোখ দুটো যেও ঠোঁট ছোঁয়ালো হালকা অশ্রু সিক্ত চোখ গুলো কেঁপে উঠলো মিরায়ার। রায়ান মিরায়ার ঠোঁট বাদে সম্পূর্ণ মুখে নিজের অধিকারের ছোঁয়া দিয়ে একটু আদর করলো। পুরো টা সময় মিরায়ার কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না কেবল চোখ বন্ধ করে ছিল যেন চাইছিল এইগুলো তাড়াতাড়ি মিটে যাক তার আর শক্তি নেই রায়ানকে আটকানোর, সেষমেষ রায়ান মিরায়ার দুই হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে শক্ত করে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরলো।
মিরায়াও চুপচাপ মেনে নিলো আর মুখে দোয়া পড়ে শেষ করে রায়ানের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলো জোর করে যেহেতু রায়ান ছাড়তে চাইছিল না তাকে। রায়ান ঠায় দাঁড়িয়ে রইল মিরায়া হাতে কয়েকবার ফু দিয়ে একবার নিজের মাথায় আর একবার রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। রায়ান অনেক লম্বা হওয়ায় খাটের উপরে উঠে করলো কাজটা কিন্তু রায়ানকে ঝুঁকতে বলেনি। বউয়ের এই মিষ্টি কাজ গুলো রায়ানের বেশ ভালো লাগলো তাই সে মিটিমিটি হাসছিল সম্পূর্ণ সময়। মনে মনে বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫১ (২)
“লোকে ঠিকই বলে wife is cute when she is mute, কথা বললেই জ্বালা। উফফফ্ এমনভাবেই যদি আমাকে সবটা সময় সহ্য করতো আমার বউটা। শান্তি আর শান্তি।”
কিন্তু রায়ানের মনের শান্তি ঠিক বেশিক্ষণ টিকবে কিনা দেখার বিষয়
