আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৮
কায়নাত খান কবিতা
—–Obsession. Obsession. Obsession.
Is it just my obsession… or my unhealthy obsession with you, jaan?
‘লাভ’ রুমে ৪৭৫০ টি ছবির মাঝে দাড়িয়ে অরিনের উদ্দেশ্যে কথা গুলো বলতে থাকে কিংশুক। কিন্তু তার কথা গুলো চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ। অরিন অব্দি পৌঁছায় নি। পৌঁছাবেই বা কীভাবে? যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে সে তো নেই। তিন বছর আগে বিয়ের দিন কিংশুককে ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছে অরিন। ঘটনাটি এতোটাই সুক্ষ্ম ভাবে সাজানো ছিল যে, এটা একটি সুপরিকল্পিত সাজানো নাটক কেউ ধরতেই পারেনি।
যতক্ষণে কিংশুকের কাছে সত্যিটা পৌঁছে যায়, ততক্ষণে অরিন লাপাত্তা। পুরো শহরে কারফিউ জারি করে ও তাকে পাওয়া যায় নি। যেখানে মানুষ সামান্য প্রতিপত্তি পেলেই তার পাওয়ার দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সেখানে বিশ্বের তৃতীয় ধনকুবের নাতি হয়ে ও নিজের হবু বউকে খুঁজে পায় নি থার্ড কিংস।
–পৃথিবীতে সব থেকে ভয়ংকর নেশা হলো মানুষের নেশা, আমাকে তোর নে শা ধরেছে রে অরিন।
মাঝের দেয়ালে থাকা অরিনের সব থেকে বড় ছবিটাই হাত রাখে কিংশুক। গত তিন বছর যাবৎ বেশিরভাগ সময় কিংশুক এই লাভ রুমেই থাকে। অরিনের বয়স অনুযায়ী, তার ঠিক কতটা পরিবর্তন হতে পারে, সেটার আন্দাজ করে AI দিয়ে অরিনের ছবি বানিয়ে সেটা প্রিন্ট করে নিজের লাভ রুমে রেখে দেয় কিংশুক। অরিনের ছোটো থেকে বেড়ে ওঠা কোনো কিছুই মিস করতে চাইনি সে।
৪৭৫০ ছবির মাঝে আজকে আরো ৫০ টি ছবি যুক্ত হবে কিংশুকের ”লাভ”রুমের দেয়ালে! পুরো রুমটির দেয়ালে শুধু অরিনের ছবি! তার ছোটোবেলা থেকে স্কুল জীবন, কলেজ জীবন এখন ভার্সিটি সব কিছুর ছবি এবং তার ফেলে দেওয়া টিস্যু থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছুই আছে যেগুলো কিংশুকের কালেকশনে রয়েছে!! খুব যত্নসহকারে কিংশুক অরিনের প্রতিটি জিনিস গুছিয়ে রেখেছে তাও অরিনেরই অজান্তে!
ভালোবাসা যখন একটা মানুষকে পুরোপুরি উন্মাদ করে দেয় তখন তাকে সাইকো লাভার বলে! কিংশুক ও ছিলো তাই! অরিনের সাইকো লাভার!!
যখন পরিমাণের থেকে বেশি ভালোবাসা হয়ে যায় তখন তাকে আনহেলদি অবসেশন বলে! আর অরিন ছিলো কিংশুকের ‘আনহেলদি অবসেশন’ ! এমন একটা অবসেশন যাকে ভুলে থাকা বা তার থেকে দূরে থাকা কিংশুকের জন্য খুবই কষ্ট কর!!
–You can run, but I will find you,,because once I claim ownership over something, it becomes mine..
দেয়ালে থাকা অরিনের ছবির ওষ্ঠে স্লাইড করতে করতে নিজের সমস্ত আবেগ, অনুভূতি তুলে ধরে কিংশুক। তার প্রতিটি কথায় ছিলো পেয়ে ও হারানোর এক বুক ফাটা আর্তনাদ। কিন্তু এই আর্তনাদ আর বেশি সময় ধরে থাকবে না। কারণ তিন বছর ধরে বাজ পাখির মতো খুঁজে ও যাকে পায়নি। তাকে এতো সহজে পেয়ে যাবে কিংশুক কল্পনা ও করতে পারেনি। যখন সমস্ত আশা গুলো এক এক করে শেষ হয়ে যাচ্ছিল, তখন একটি ছোটো ডিল তাকে তার অবসেশনের সন্ধান দিয়ে দেয়।
স্যার?”
ওমারের ডাকে ধ্যান ফিরে কিংশুকের! জিজ্ঞেসা দৃষ্টিতে তাকায় সে ওমরের দিকে!
–হেয়ার ইজ এভরিথিং, আই গট এভরি সিঙ্গেল ইনফরমেশন এবাউট রোজ ম্যাডাম।
এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে কিংশুকের মুখে! সে ইশারা করে ওমরকে যেতে বলে! আই প্যাডের দিকে তাকায়।
— বাহ! পাখিটা বেশ বড় হয়ে গেছে তো, তোকে তো এখন খাঁচায় ভরতে হবে মাই ডিয়ার চিটার রোজ।
আই এম কামিং টু মেক ইউর লাইফ হেল রোজ।
আগুনে পোড়া সেই রাতের পর কেটে গেছে তিনটা বছর।
সময় বদলেছে, দুনিয়া এগিয়েছে, কিন্তু কিংশুক থেমে আছে ঠিক সেই আগুনের সামনে।অরিনের খোঁজে সে দেশ ছেড়েছে, মানুষ ছেড়েছে, নিজেকেও ছেড়েছে।
তিন বছরের জন্য একদিনের জন্য ও সে অরিনকে ভুলতে পারেনি। বরং যতই দিন যায়, ততই তার অবসেশন একটা আনহেলদি অবসেশনে পরিনত হয়। সব থেকে বেশি যেটা কিংশুককে কুড়ে কুঁড়ে খায়, সেটা হলো কাছে পাওয়ার বাসনা। অরিনকে কাছে পাওয়ার বাসনা।
পৃথিবীতে সকল কিছুর মৃত্যু থাকলে ও অবসেশনের কখনো মৃত্যু হয় না।অবসেশন শুধু অপেক্ষা করতে জানে।
”২০২৫”
শাংহাই শহরের সবচেয়ে বড় কনভেনশন হল হলো Shanghai International Conference Center। যেখানে চায়না দেশের সব থেকে বড় বড় ধনকুবদের বিভিন্ন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়ে থাকে। তেমনি আজ ও একটি বিশেষ আয়োজনে আলোয় ঝলমল করছে হলটি।।কারণ আজ আংটিবদল।চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকারী মাস্টার ঝাং ইউ চ্যাং পরিবারের প্রতিনিধি চ্যাং এর সাথে রোজি ঝাও এর আংটিবদলের প্রোগ্রাম। রোজি ঝাও মিয়াং রু ঝাও এর একমাত্র মেয়ে। যিনি নিজে ও বিশাল এমপ্যায়ারের মালকিন। আজ তার মেয়ের সাথে আরেক বড় বিজনেস পরিবারের একমাত্র যুবরাজের আংটিবদল।
পুরো মিডিয়া, বিজনেস এলিট, রাজনীতি
সবাই হাজির। ঝাং পরিবারের সবাই এক এক করে আসতে থাকে। যুবরাজ ও এসে হাজির হয়। কিন্তু ঝাও পরিবারের কেউ এখনো আসেনি। কারণ তারা তাদের একমাত্র আদরের মেয়ে রোজি ঝাওকে সাজাতে ব্যস্ত।
সাদা আর লাল মিশ্রিত চায়নিজ গাউন পরে বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরিন। নিজেকে বার বার দেখছে। এখন সে পরিপূর্ণ নারী। বয়স ও ২১ বছর হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে যেমন পৃথিবী নিজের রূপ পরিবর্তন করেছে, ঠিক তেমনি অরিন ও। শারীরিক সৌন্দর্যের পরিবর্তন হলে ও মুখের আদল ঠিক ১৮/১৯ বছরের মেয়ের মতোই রয়ে গেছে তার। দিন দিন মানুষের সৌন্দর্য কমে, সেখানে অরিনের যেনো বাড়ছে।
আজ সে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে। কিন্তু তার মুখের আদল ঠিক আগের মতোই।
আয়রিন ঝাও এসে অরিনের পাশে দাড়ায়। তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
–ইউ লুক লাইক এ ডল মাম্মা”
–সিসা..!
–বাংলায় বল, কেউ তো নেই।
হালকা হেঁসে অরিন আয়রিন ঝাও এর দিকে তাকায়।
–মাম্মা, ওয়াট ইফ হি ফাইন্ড মি?
–নো হি ওয়েল নট,,
অরিনকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আয়রিন ঝাও।
–এতো বছর তোকে যেভাবে লুকিয়ে রেখেছি, বাকি জীবনটা ও পারবো। এখন কিং বিশ্বের দ্বিতীয় রিচ পার্সন হলে কী হবে, যদি তুই অন্য কারো হয়ে যাস। নট এভরিথিং ইউ ক্যান এচিভ বাই পাওয়ার।
মায়ের কথা শুনে মন শক্ত করে অরিন। এখন সে ছেঁটো নেই। তার উপরে মা আছে সাথে।
২০২২ সালের সেই এক্সিডেন্ট ছিলো পরিকল্পিত। ক্যাটরিনা এবং অরিনের মা মিলে পুরো বিষয়টি এতোটা সুন্দর ভাবে সাজায়, কেউ ধরতেই পারেনি। ওটা একটা সাজানো নাটক।
ক্যাটরিনা যখন অরিনকে নিয়ে পার্লারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, পরিকল্পনা অনুযায়ী গার্ডদের বলে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে যাবে। যেখান দিয়ে গেলে সহজে পৌঁছানো যাবে। হলো ও তাই। সকলে সেখানে যাওয়ার পর একটি ট্রাক এসে প্রথমে বডিগার্ডদের গাড়িতে আক্রমণ করে। যেনো এক্সিডেন্ট মনে হয়। গার্ডরা আহত হওয়ার সাথে সাথে অরিন এবং ক্যাটরিনা নেমে পরে, তারপর গাড়িতে আ গুন লাগিয়ে দেয়। এবং সেখান থেকে কিছু দূরেই হেলিকপ্টার ছিলো দাড় করানো। যেটায় অরিনের মা অপেক্ষা করছিলেন। অরিন সেখানে নিজের মায়ের কাছে চলে যায়। তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী সে হেলিকপ্টারে উঠে যায়। গার্ডরা আহত হওয়ায় সে-দিকে কেউ ধ্যান দেয়নি। তাই খুব সহজেই অরিন পালাতে সক্ষম হয়।
সে-দিন রাতে কিংশুক যখন জানতে পারে অরিন গাড়িতে নেয়, গাড়িটি ফাঁকা ছিলো, সাথে সাথে পুরো শহরে কারফিউ জারি করে দিতে বলে। তারপর হন্নে হয়ে খুঁজে অরিনকে। কিন্তু তার নোখের ও সন্ধান পায়নি কিংশুক।
তখনই বুঝে যায় এটা পরিকল্পিত সাজানো নাটক। কিংশুক ঠিক করে ৮০ বছর পর হলে ও সে অরিনকে খুঁজে বের করবে। হলো ও তাই। তিন বছরের মাথায় সে অরিনের খোঁজ পায়।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৭
ঝাং ফ্যামিলির সাথে ডিল করার সময় কিংশুকের কাছে খবর যায় অরিনকে পাওয়া গেছে। এবং তার বিয়ে সামনে। যার সাথে বিয়ে সে আজকে ডিল সাইন করেছে। ব্যাস, তারপর থেকে শুরু হয় কিংশুকের অপেক্ষা। হারানো জিনিস কাছে পাওয়ার অপেক্ষা।
