আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৬
কায়নাত খান কবিতা
—সরি বউ! তোর সেবা করতে এসে চু’মু খেয়ে গেলাম। কিছু মনে করিস না।’’
কিংশুকের কথার কোনো উত্তর দেয় না অরিন। যেন হঠাৎ করেই সমস্ত অনুভূতি অবশ হয়ে গেছে।একেবারে জড়বস্তুর মতো চুপ করে থাকে সে। চোখে কোনো প্রতিবাদ নেই, নেই প্রশ্ন,শুধু নিঃশব্দ একটি বুক চাপা আর্তনাদ।
কিংশুক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আলতো করে অরিনের কপালে আদুরে একটুকরো পরশ এঁকে দেয়।এমন ছোঁয়া, যার ভেতর মমতাও আছে, আবার অদ্ভুত এক দূরত্বও। কোনো কথা না বলে সে ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে নিচে নেমে যায়।
আর অরিন পড়ে থাকে সেই স্পর্শের রেশটুকু বুকে নিয়ে, যা ভালোবাসা না-কি শাস্তি, সে নিজেও আর বুঝে উঠতে পারে না।
এই মানুষটার সঙ্গে কি সত্যিই থাকা যায়? এটাকেই কি ভালোবাসা বলে? নাকি ভালোবাসার নামে শুধু বন্দিত্ব? প্রশ্নগুলো একের পর এক মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, উত্তর খুঁজে পায় না সে।
ঠিক তখনই একজন সার্ভেন্ট খাবার নিয়ে আসে। তার সঙ্গে কিংশুকও। খাবার রেখে সার্ভেন্ট চলে গেলে কিংশুক নিজে হাতে গুছিয়ে অরিনের সামনে বসে পড়ে।
— হা করো বউ..”
খুব শান্ত কণ্ঠে কিংশুক অরিনকে হা করতে বলে। তার কণ্ঠে নেই কোনো রুক্ষতা, নেই আদেশের কঠোরতা।শুধু অদ্ভুত এক যত্ন। এই মুহূর্তে তাকে দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না, গতরাতে এই মানুষটাই অরিনের জীবনে এমন ঝড় তুলে দিয়েছিল।
অরিন কিছু বলে না। চুপচাপ কিংশুকের দিকে তাকিয়ে থাকে।চোখে বিস্ময়, ভয় আর বিভ্রান্তি একসঙ্গে জমে ওঠে। এখনকার কিংশুক আর রাতের কিংশুকের মাঝে কোনো মিল খুঁজে পায় না সে। যেন তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’জন মানুষ।
একই শরীরে বাস করা দুটি আলাদা প্রাণ।একজন আগলে রাখে, আরেকজন ভেঙে দেয়।
আর অরিন দাঁড়িয়ে থাকে এই দুই সত্তার মাঝখানে, বোঝার চেষ্টা করে।কোনটা সত্যি, আর কোনটা
— হা করুন ম্যাডাম।”
শুকনো ঢোক গিলে অরিন ধীরে হা করে। বাড়তি কোনো কথা বলে না সে।না প্রশ্ন, না আপত্তি। চুপচাপ বসে থেকে খেতে থাকে, যেন শব্দ করলেই কিংশুক আবার ও রাতের মতো ভয়ংকর হয়ে যাবে। কিংশুক নীরবে সব খেয়াল করে।খাওয়ার গতি, নিঃশ্বাসের ছন্দ, চোখের ক্লান্তি।
খাওয়া শেষ হলে সে আলতো করে একটি পেইনকিলার এগিয়ে দেয়।
—-এটা?’’
— পেইন কিলার।’’
অরিন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই ওষুধটা খেয়ে নেয়। তারপর কিংশুক আরেকটা মেডিসিন অরিনের সামনে ধরে। অরিন কপাল কুঁচকে তাকায় তার পানে।
—- আই ডোন্ট নিড অ্যা বেবি।তোর ভালোবাসার ভাগ অন্য কাউকে দেওয়া সম্ভব না। হ্যাভ ইট।”
অরিন কিছু না বলে চুপচাপ মেডিসিনটি খেয়ে নেয়। অপর প্রান্তে কিংশুক ও অরিনকে আর কিছু বলে না। ধীরে পা বাড়িয়ে ঘর ছেড়ে নিচে নেমে যায়। দরজার শব্দ মিলিয়ে গেলে অরিন একা বসে থাকে।হালকা ঝিমুনিতে, ভারী মাথায়। যত্ন আর দূরত্বের এই অদ্ভুত মিশ্রণে সে বুঝতে পারে না, কোনটা তাকে সারিয়ে তুলছে, আর কোনটা আরও গভীরে ঠেলে দিচ্ছে।
মনের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করতে করতেই দু’চোখ জুড়ে নেমে আসে গভীর ঘুম। ক্লান্ত শরীর আর ভারী মন নিয়ে অরিন ধীরে ধীরে বেলকনির থাই গ্লাসঘেঁষা ডিভানের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে বসে পড়ে।চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
বাইরের নীরবতা, স্থির আকাশ আর হালকা আলো মিলেমিশে তাকে ধীরে ধীরে টেনে নেয় ঘুমের কোলে। দেখতে দেখতে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।
গভীর ঘুমে ডুবে থাকার মাঝেই অরিনের কানে ভেসে আসে অস্বস্তিকর কিছু শব্দ যেন কেউ জোরে জোরে কোথাও আঘাত করছে। বিরক্তি আর অজানা আশঙ্কা নিয়ে সে উঠে বসে। চোখ মেলতেই দেখে, কিংশুক বেলকনির থাই গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গম্ভীর কণ্ঠে কাউকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছে সে।
অরিনের কপালে অজান্তেই চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই দেখতে পায় রুমের যতগুলো জানালা ছিল, একে একে সব বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। থাই গ্লাসের বাইরে কাঠের দেয়াল বসানো হচ্ছে নিখুঁতভাবে। শব্দগুলো ক্রমেই ঘন হয়ে ওঠে, আর সেই সঙ্গে ঘরের ভেতরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে আসে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ঘরটা এমনভাবে ঘিরে ফেলা হয় যে বাইরের কোনো অংশ আর চোখে পড়ে না। আলো, হাওয়া, আকাশ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। অরিন স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।
এই তো একটু আগেও সব ঠিকঠাক ছিল।তাহলে হঠাৎ কী হয়ে গেল? অরিনের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। নিজের অজান্তেই কি আবার এমন কিছু করে ফেলেছে, যার ফল সে বুঝতেও পারেনি? বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধে। কোনো উত্তর না পেয়ে সে শুধু বসে থাকে । আত্মদোষ আর ভয় একসঙ্গে চেপে ধরে তাকে।
“কিছু ক্ষণ পূর্বে”
মিটিং শেষ করে সামান্য সময় নিয়েই দুপুরের দিকে স্টাডি রুম থেকে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে আসে কিংশুক। বেশ অনেকক্ষণ ধরে সে তার বউকে দেখেনি। এই দু’ঘণ্টা তার কাছে যেন দু’বছরের সমান। তাই তাড়াতাড়ি নিজেদের বেড রুমে প্রবেশ করে কিংশুক।
রুমে ঢুকেই সারাঘর জুড়ে চোখ বুলিয়ে অরিনকে খুঁজতে থাকে কিংশুক। বিছানা, সোফা, কর্নার।কোথাও তাকে না দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে থাই গ্লাসের সঙ্গে লাগানো ডিভানের দিকে।
সেখানে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে অরিন। ঘুমন্ত শরীরটা যেন আরও ছোট হয়ে গেছে। ক্লান্ত মুখ, এলোমেলো চুল, একদম ছোটো বিড়াল ছানার মতো।
দরজাটা ভেতর থেকে লক করে কিংশুক সোজা এসে দাঁড়ায় অরিনের সামনে। পরক্ষণেই তার দৃষ্টি সরে যায় বারান্দার দিকে।
আজও অরিন বারান্দার সাথে। কাল এতো কিছু হওয়ার পর ও সে আজ ও একই ভুল করলো? তাহলে কী তার কাছে বাইরের জগৎ টাই সব? কিংশুকের কোনো অস্তিত্ব নেই তার কাছে?
তারপর ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকায় সে। বিছানাটা একদম গুছানো, নিখুঁতভাবে ক্লিন করা। কোনো ভাঁজ নেই, কোনো ছাপ নেই। যেন সেখানে কেউ শোয়ইনি।
কিংশুকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন দানা বাঁধে। তাহলে কি অরিন তার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতে চায় না? এতোটাই ঘৃণা করে অরিন তাকে? এক যেখানে সে ঘুমায় সেখানে সে শুতে ও চায় না। ঘাড়ের রগটি কেমন যেন বাঁকা হয়ে আসে তার।
পকেট থেকে ফোন করে নিজের গার্ডদের কিছু নির্দেশনা দেয় কিংশুক। অরিনের চোখে সে ব্যতিত অন্য কিছু আর্কষণ করুক এটা কিং মানতে নারাজ। কীসের অভাব তার?
তারপর কড়া নজরে তাকায় সে অরিনের পানে।
—- লাস্ট বারের মতো মুক্ত বাতাসে ঘুমাও জান।”
“বর্তমান”
অরিন তখনো নিজের চিন্তার ভেতরেই ডুবে ছিল। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ানো কিংশুকের উপস্থিতিতে সে চমকে ওঠে। ভেতরের অজানা শঙ্কা নিয়ে ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকায় অরিন।
হঠাৎ করেই হাঁটু ভেঙে অরিনের সামনে বসে পড়ে কিংশুক। তার এই আচরণে অরিন আরও অপ্রস্তুত হয়ে যায়।ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ও চেপে ধরে তাকে। এই বুঝি কোলো অঘটন ঘটলো বলো।
আলতো করে অরিনের হাতটা নিজের মুঠোয় নেয় কিংশুক।অরিনের আঙুলগুলো কেঁপে ওঠে। সে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চায় না, আবার ধরে রাখার সাহসও পায় না।
— আজকের পর থেকে তোমার জন্য বাইরের আলো বাতাস ও নিষিদ্ধ জান।”
হঠাৎ এমন কথায় চমকে ওঠে অরিন। শরীরটা অজান্তেই শক্ত হয়ে যায় তার।
—-বাইরের আলো বাতাস বন্ধ মানে?”
কিংশুক উঠে অরিনের পাশে বসে তার মুখ থেকে চুল নিয়ে কানে গুঁজে দেয়।
—-হুম চিরতরে বন্ধ।”
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৫
কিংশুককে ধাক্কা দিয়ে উঠে দাড়ায় অরিন। ভয় এবং আতঙ্ক বাসা বেঁধে যায় তার মস্তিষ্ক জুড়ে। দৌড়ে ছুটে চলে যায়। দৌড়ার দিকে। অনেক চেষ্টা করে ও দরজা খুলতে পারে না সে। খুব জোড়ে জোড়ে ধাক্কাতে থাকে দরজাটি। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। পিন দিয়ে ও কাজ হয় না। রং পিন দেখায়।
কিংশুক এসে হাত ভাজ করে হেলায় দিয়ে অরিনের পাশে দাঁড়ায়।
—- নিড মাই হেল্প জান?”
