আমার আলাদিন পর্ব ৫৩
জাবিন ফোরকান
ইরামের হাতের একটা চপাট খেয়ে সাইবান সেই যে শান্ত হয়ে গাড়িতে বসেছে, কুয়াকাটা না পৌঁছান অব্দি সে ওভাবেই গাল ফুলিয়ে বসে রইল। কারণ? কারণ তার স্ত্রী তাকে চুমুর মাঝে ঠাস করে একটা চপাট দিয়ে বলেছে,
“অসভ্য! লোকজনের মাঝে এ কি অবস্থা?”
ইরাম নিজের জায়গায় বসে ঘুমন্ত ছেলের প্রতি মনোযোগী। তবে ক্ষণে ক্ষণে স্বামীর দিকে চেয়ে সে হাসি লোকাতে ভুল করলনা।
বিকালের মধ্যেই কুয়াকাটায় পৌঁছে গেল তারা। একটা আলিশান রিসোর্টের সামনে গাড়ি থামল। ভেতর থেকে সকলে বেরোতে না বেরোতেই রিসোর্টের দুজন স্টাফ এসে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে লাগেজ নিয়ে গেল। ইযান ঘুম থেকে উঠেছে ততক্ষণে। মায়ের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে চুপটি করে আশেপাশে দেখছে আর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল চুষছে সে। ইরাম ছেলেকে নিয়ে সকলের সঙ্গে এগোল। আশেপাশে তাকাল মুগ্ধ হয়ে।
জায়গাটা রিসোর্ট কম বরং ছোট্ট একটা শহর বেশি মনে হলো তার। জায়গাটার নাম শিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা’স। সুন্দর পাকা রাস্তা। সেই সড়কের ধারে ধারে বেশকিছু দুই তলা বাংলো। বাংলোগুলো সাদা রঙের, উপরে কমলা বর্ণের ইটের ফালির ছাদ। সবুজে ঘেরা মাঠে পার্কের মতন ব্যবস্থা। সড়ক আর পার্কের মাঝখানে বয়ে গিয়েছে স্বচ্ছ খাল। সেই খালের উপরে সাদা ব্রীজ। ইরাম মুগ্ধ নয়নে দেখল। জায়গাটা এক দেখাতেই ভীষণ পছন্দ হয়ে গিয়েছে তার। ইরামদের নিয়ে যাওয়া হলো একটি সুবিশাল দুই তলা বাংলোর সামনে। গেট পেরিয়ে ঢুকতেই অভ্যন্তরে উঠান আর তার পাশে প্রাইভেট সুইমিং পুল। বাংলোর ভেতরটাও বাড়ির মতন, পরিপাটি, গোছালো। নিচে হল ও ডাইনিং বাদেও দুই তলায় রয়েছে তিনটি বেডরুম আর বারান্দা। এতকিছু দেখে ইরাম এবার মুগ্ধের চেয়ে বেশি অবাক হলো, এর ভাড়া যে আকাশচুম্বী হবে তাতে সন্দেহ নেই। সাধারণ কোনো হোটেল রুম নিলেই হতো। এক দুই রাতের জন্য এত আলিশান ব্যবস্থার কি অর্থ? স্টাফরা যখন সকলকে বাংলো ঘুরিয়ে কোথায় কি আছে দেখিয়ে দিচ্ছে, তখন ইরাম সাইবানকে এক কোণায় টেনে নিল। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“তোমাকে ভিলা বুক করতে কে বলেছে? মাত্র চারজন মানুষ আমরা। এত বড় জায়গা দিয়ে কি হবে? বাকি সবাই তো এমনিতেই শহরে চলে গিয়েছে, এখানে থাকলে নাহয় মানা যেত।”
সাইবান জিন্সের পকেটে দুহাত গুঁজে স্ত্রীর দিকে মাথা ঘুরিয়ে কানে কানে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“আপনারা আমার কি?”
“হ্যাঁ?”
“বললাম, আপনারা আমার কি হন?”
“স্ত্রী? সন্তান?”
“উঁহু। ভুল উত্তর।”
“তবে সঠিক উত্তরটা কি জনাব?”
“দুনিয়া।”
ইরাম থমকাল। তার কানে ছুঁয়ে গেল সাইবানের ঠোঁট,
“আপনারা আমার দুনিয়া। দুনিয়ার জন্য একটু বড় জায়গা লাগেই। সো চিল অ্যান্ড লেট মি স্পয়েল ইউ রটেন, মাই প্রেশিয়াস। দুনিয়ার তোষামোদ করতে গিয়ে আমি পথে বসবনা, এটুকু ভরসা হাসবেন্ডের উপর করতেই পারেন, তাইনা?”
ইরাম আর জবাব দিতে পারলনা। শুধু চেয়ে রইল সাইবানের মুখে নিষ্পলক চোখে।
“আর যদিও বা পথে বসিও, আপনি তো সাথেই থাকবেন। আপনাকে নিয়ে শাহবাগের মোড়ে ভিক্ষা করতে বসব। ফকির বাবা আলাদিন আর ফকিন্নি মাতা ইরাম, সুন্দর হবেনা?”
নাহ, এই ছেলেকে নিয়ে আর পারা গেলনা। সাইবান ভ্রু নাচিয়ে কথাটা বলতেই ইরাম হাত তুলে ঘুষি বসিয়ে দিল তার বাহুতে। সাইবান চোখমুখ কুঁচকে বলল,
“আজকাল বড্ড বেশি হাত চলছে আপনার।”
“তোমার মতন শয়তানকে শায়েস্তা করতে পা চালানোও শুরু করা উচিত।”
“আপনাকে তো আমি রাতে বিছানায় দেখে নেব!”
সাইবানের হুমকিতে ইরাম মুখ ভেংচে হেলেদুলে হেঁটে চলে গেল। তার চলার পথে তাকিয়ে সাইবান ভাবল, আগেকার নরম, শান্ত আর অতি বোঝদার মেয়েটা ধীরে ধীরে নিজের সহজাত রূপে ফিরে আসছে, জীবনকে উপভোগ করতে শিখছে, এটা তার বিরাট পাওনা।
কিছুক্ষণ আগে ঘণ্টাখানেক সাইবানের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সারিকার। সবাই মিলে সমুদ্রবিলাস করতে কুয়াকাটায় গিয়েছে তারা। ভিডিও কল দিয়ে বোনকে সি বিচের দৃশ্য দেখিয়ে টিপ্পনী কাটতে ছাড়েনি সাইবান। সেজন্য গতকাল থেকে বিষিয়ে থাকা ভারাক্রান্ত মনটা অনেকখানি শান্ত হয়েছে সারিকার। আজকে কিছুক্ষণের জন্য চেম্বারে গিয়েছিল সে। অ্যাসিসটেন্ট দুজনকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে এসেছে। বাসায় এসে লম্বা একটা ঘুম দেয়ার পরেই শুধুমাত্র শরীরটা ভালো লাগছে। বিকাল বিকাল গোসল সেরে সে কিচেনে ঢুকেছে। মিসির গতকাল রাতে অফিসে গিয়েছে, ফেরেনি। সারিকা বেশ কয়েকবার ফোন করে মোবাইল ব্যস্ত পেয়েছে। পরে তার অফিসের সেক্রেটারির কাছে ফোন দিয়ে জেনেছে মিসির আসলেই ব্যস্ত। এটা যে শুধু ব্যস্ততা নয় বরং একটা অজুহাতও সেটা সারিকা ভালোই জানে। অথচ স্বামীকে সে দোষ দিতে পারছেনা। নিজে তার জায়গায় থাকলে হয়ত এর চেয়েও খারাপ কিছু করত। দিনের ঘণ্টাগুলো চিন্তায় চিন্তায় ব্যয় করে সে। সত্যি কি কোনোদিন আর সুখের দেখা পাওয়া হবে? অতীত ভুলে এগোনো কি সম্ভব হবে?
কিচেনে সব্জি কেটে স্যুপ বানাচ্ছে সারিকা। সঙ্গে হারিয়েছে নিজের ভাবনার জগতে। মিসির তার জন্য কোনোদিন কোনো অংশে কম করেনি। মানুষটা নিজের দায়িত্ব পালন করেছে বিনা দ্বিধায়। অথচ সারিকা পারছেনা। কেন? সে তো শুধু দায়িত্ব চায়নি কোনোদিন! একটা সুখের সংসার চেয়েছিল, অনুভূতি চেয়েছিল, আবেগ চেয়েছিল। তার আর মিসিরের মাঝে সবটাই স্ত্রীর প্রতি স্বামীর, আর স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ববোধ। এই দায়িত্বেই কি আজীবন খুশি থাকতে পারবে সে? ভাবনার মাঝেই কলিংবেল বেজে উঠল। সারিকা চমকে উঠল। এতটাই মশগুল হয়ে পড়েছিল যে হঠাৎ চমকানোয় হাতের ছুরিটা আঙুলে লেগে গেল। কয়েক ফোঁটা র*ক্ত বেরোল। সেই আঙুল ধুয়ে কোনোপ্রকার পরিচর্যা ছাড়াই সে দরজার দিকে এগোল। অ্যাপার্টমেন্ট রিনোভেশন প্রায় শেষ, টুকিটাকি কিছু কাজ বাদে। মিসির সিকিউরিটি ক্যামেরা ইনস্টল করেছে। তাই ভেতর থেকেই মনিটরে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়। দরজার পাশে লাগোয়া ছোট্ট মনিটরে সারিকা দেখল বাইরে দণ্ডায়মান এক পুরুষ। পরিধানে সাদা রঙের ঢোলা ফতুয়া আর ট্রাউজার। মাথার চুলগুলো একদম পরিপাটি করে আঁচড়ানো। চেহারায় একটা অদ্ভুতুড়ে ঔজ্জ্বল্য খেলা করছে। অমায়িক চোখের দৃষ্টি। দুহাত পিছনে বেঁধে ধৈর্য্যের সহিত ভদ্রভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সারিকা একে চেনে। তাই দরজাটা খুলল। সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে বলা হলো,
“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।”
কন্ঠে স্পষ্টত অ্যারাবিক টান, বাঙালিদের মতন দায়সারা গোছের উচ্চারণ নয়। সারিকা ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কেমন আছো, আয়দান?”
আয়দান নামক পুরুষটি সারিকার দিকে তাকিয়ে নেই। কথা বলার সময়েও তার নম্র দৃষ্টি নিজের পায়ের দিকে আবদ্ধ।
“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রহমতে ভালো আছি। মিসির ভাইয়া বাসায় আছেন?”
“না। তোমার ভাইয়া তো গত রাতে অফিসে গিয়েছে, এখনো ফেরেনি।”
“ওহ, আচ্ছা। আমার একটু কাজ ছিল, থাক পরে আসব।”
“আরে, এতদূর এসে আবার চলে যাবে কেন? বসে যাও কিছুক্ষণ। আমি শরবত করে দেই।”
“না ভাবী, ধন্যবাদ। আমি আসছি। আল্লাহ হাফেজ।”
আয়দান চলে যেতে নিল। ঠিক তখনি করিডোর থেকে প্রতিধ্বনিত হলো মিসিরের কন্ঠস্বর,
“আয়দান?”
স্বামীকে দেখতে পেল সারিকা। এলিভেটর থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে। চোখেমুখে ক্লান্ত ভাব। গায়ে জড়ানো স্যুট খোলা, শার্টটাও বেশ খানিকটা কুঁচকে গিয়েছে। আয়দানের সামনে এসে দাঁড়াল মিসির,
“ভেতরে না ঢুকে দরজা থেকে চলে যাচ্ছিস কেন? আমার বাড়ি তোর পর?”
মৃদু হাসল আয়দান। এই প্রথম পা থেকে নজর তুলে সে মিসিরের মুখের দিকে তাকাল,
“পর হলে আসতাম কি? বাড়িতে তোমার স্ত্রী, আমি একজন পুরুষ মানুষ ঢোকা অসমীচীন।”
মাথা ঝাঁকিয়ে হালকা একটু হাসল মিসির,
“তোকে এখনো চিনে উঠতে কষ্ট হয় আমার। সেই আয়দান যে কিনা…”
“অতীত তো অতীতই। তওবা করে রবের দুয়ারে ফিরে গেলে তিনি বান্দাকে কবুল করে নেন। আল্লাহ তায়ালার চাইতে কেউ বান্দাকে বেশি ভালোবাসে না, আপন মাও না। রব তো শুধু দিন গোনেন, আমাদের তওবার, যেন তিনি ক্ষমা করে আমাদের নিজের রহমতের আশ্রয়ে আগলে নিতে পারেন।”
আয়দানের কথাগুলো আধ্যাত্মিক ধাঁচের। অথচ সেগুলো হঠাৎ করেই সারিকার মনে জায়গা করে নিল। অপরদিকে মিসির মৃদু হেসে আয়দানের কাঁধে হাত রেখে ভেতরে ঢুকল। সারিকা দরজা আটকে কিচেনে গেল। হুট করে কি যেন মনে হলো তার। তাই গায়ে একটা ওড়না নিয়ে মাথায় সুন্দর করে ঘোমটা তুলে দিল। শরবত এবং নাস্তা রেডি করে সে যখন বসার ঘরে এসেছে, তখন মিসিরও ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে আয়দানের সঙ্গে সোফায় বসেছে। সম্পূর্ণ মুহূর্তে সে সারিকার দিকে তাকালনা একটুও। নাস্তার ট্রে রেখে সারিকা আস্তে করে বিপরীত দিকের সোফায় বসল। মিসির আয়দানের হাতে নাস্তার বাটি তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“জায়দানের কি অবস্থা? অনেকদিন হয়ে গেল, দেখতে যেতে পারিনি। রাগ করেছে আমার উপরে?”
বাটি থেকে ঠান্ডা দই আর ফলের টুকরো দিয়ে বানানো ফ্রুট কার্ড মুখে দিয়ে মাথা নাড়ল আয়দান।
“ভাইয়া ভালো আছে। রবের অশেষ রহমত এখন হাঁটাচলা, দৈনন্দিন সব কাজ কারো সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে করতে পারে। বিশেষ কোনো সমস্যা নেই ডাক্তার জানিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আর কোনো বাঁধা নেই।”
“যাক। অফিসে একটু কাজের চাপ যাচ্ছে। আমি এই উইকেই দেখতে যাব ওকে।”
“হুম, যেও। ভাইয়া খুশি হবে। তাছাড়া জারিনও সারাদিন মিসির চাচ্চু, মিসির চাচ্চু করে লাফিয়ে বেড়ায়।”
“বাহ্, তবে তো ভাতিজির মনের আশা এই চাচার খুব দ্রুত পূরণ করতে হচ্ছে।”
সারিকা পাশ থেকে কথাগুলো শুনল। জায়দান মিসিরের বেস্ট ফ্রেন্ড। শুধু বন্ধু বললেও কম হবে, বরং প্রায় পরিবারের সদস্যই বটে। আয়দান জায়দানের ছোট ভাই। বিয়ের সময়ে সবার সঙ্গে পরিচিত হওয়া হয়েছিল সারিকার। তাছাড়া প্রায়ই দুই বাড়ির মানুষের একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত থাকে, যেমন আজ আয়দান এসেছে। মিসিরের কাছে যতটুকু জেনেছে জায়দান লোকটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। চার বছর প্রায় কোমায় কাটিয়ে অবশেষে গত বছর সেন্স ফিরেছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ঘটনাটা ঘটেছিল মিসির আর সারিকার বিয়ের দিন। কাবিননামায় স্বাক্ষর করার পরপরই মিসির তাকে নিয়ে বন্ধুর কাছে গিয়েছিল। সেই দৃশ্যটা হাজার চাইতেও কোনোদিন ভুলতে পারবেনা সারিকা। যেভাবে কাঁদতে কাঁদতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে মিসির সেদিন নববধূর সামনে কেঁদেছিল, তা ভুলবার মতন দৃশ্য নয়।
কি নেই লোকটার মাঝে? কি নয় সে? একজন আদর্শ ছেলে, একজন ভাইয়ের মতন বন্ধু, একজন সুপুরুষ স্বামী। মিসিরের ঝুলিতে অর্জনের শেষ নেই। অথচ সারিকার ঝুলি শূন্য। না হতে পেরেছে ভালো মানুষ, না হতে পেরেছে ভালো স্ত্রী। জর্জরিত সে, অনুভূতির অভিশাপে।
“তোমার হাতে কি হয়েছে?”
ভাবনার মাঝে হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে সারিকা অবাক হলো। চোখ পিটপিট করে সামনে চাইতেই দেখল মিসির তার হাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
“ওহ…তেমন কিছুনা। ওই একটু ছুরি লেগে গেছে।”
মিসির কয়েক পলক নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। তার চেহারা কেমন থমথমে দেখাল। তারপর সে হুট করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আয়দানকে বলল,
“একটু বস। আমি আসছি।”
অতিরিক্ত কিছু না বলে হনহন করে হেঁটে সারিকার বাহু ধরে টেনে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল মিসির। বেডরুমে ঢুকে স্ত্রীকে বিছানায় বসিয়ে সে ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে এলো। সারিকা নিজের পক্ষে সাফাই গাইবার আগেই মিসির দাঁতে দাঁত চেপে গজগজ করল,
“ডেন্টাল কি ফাও ফাও পড়েছ? প্রাথমিক চিকিৎসা বলে কিছু এক্সিস্ট করে জানো না?”
“না মানে…একটুখানিই তো..”
“ইনফেকশন হলে একটুখানি অনেকখানি হতে সময় নেবে না।”
মিসিরের তরল রাগটা কেন যেন সারিকার ভালো লাগল। অ্যান্টিসেপটিকে তুলো ভিজিয়ে সে স্ত্রীর আঙুলে সযত্নে লাগিয়ে দিল। সারিকা জ্বলুনি হতেই খানিক হিসিয়ে উঠল। তাতে ঝুঁকে ফুঁ দিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষতে লাগিয়ে দক্ষ হাতে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে দিল মিসির। আরেক দফায় হালকা গলায় ধমকাল,
“নিজের যত্ন নিতে না জানলে কাজবাজের ধারেকাছে যাওয়ার দরকার নেই। দুনিয়ার সবার যত্ন নেয়ার জন্য এক মিসির বসে নেই।”
সারিকা পলকহীন তাকিয়ে রইল। সত্যিই তো। মানুষের জন্য লোকটাকে কম কিছু করতে দেখেনি সে। মিসির তো সবার যত্ন নেয়, তবে তার যত্ন কে নেয়?
কেউ না।
উত্তরটা সারিকার অন্তরকে মর্মাহত করল।
“রেস্ট নাও। দয়া করে আর কিচেনমুখী হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি অর্ডার করে দেব। চিকেন বিরিয়ানি ফেভারিট না তোমার?”
সারিকা অজান্তেই নিজের পরনের টি শার্ট আঁকড়ে ধরল, আঙুলগুলো চেপে বসল তার। সে প্রায় ফিসফিস করল,
“আমার পছন্দের খাবার কি তুমি জানো, অথচ তোমার পছন্দের খাবার কি আমি জানিনা মিসির।”
মিসির ফার্স্ট এইড কিট গুছিয়ে রাখছিল। কথাটা শুনে থমকে গেল সে। এক মুহূর্ত বসে রইল। পরক্ষণে কাজ জারি রেখে একবারে শান্ত গলায় বলল,
“আমার মায়ের হাতের বেগুন ভর্তা ভালো লাগে।”
এটুকুই। আর কোনো বাক্য বিনিময় হলোনা তাদের মাঝে। উঠে গেল মিসির। বেডরুমের দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে বাইরে আড়াল হয়ে গেল। সারিকা বিছানায় বসে ঠাঁয় চেয়ে রইল। বুকের ভেতর একইসঙ্গে একটা উষ্ণতা আর বিষণ্নতা চেপে বসল তার। হুট করে কেন যেন আয়দানের গভীরতর একটি কথা বারংবার কানে বাজল তার,
—অতীত তো অতীতই। তওবা করে রবের দুয়ারে ফিরে গেলে তিনি বান্দাকে কবুল করে নেন।
অতীত শুধু অতীত।
অস্তমিত সূর্যের টকটকে আভা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা সৈকতজুড়ে। সমুদ্রের পানির উপর তার কমলাভ প্রতিফলন কোনো শিল্পীর আঁকা চিত্রশৈলীর চেয়ে কম কিছু নয়। ইরাম দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের নোনা জলের সামনে। পরনে একটা ঢোলা কুর্তি আর পাজামা তার। বহুদিন বাদে এরকম পোশাক গায়ে জড়িয়েছে সে। পুরাতন দিনের স্মৃতিগুলো তাই বুঝি বেশি বেশি স্মরণে আসছে। রঙিন সেই কৈশোরকাল। যখন মাথার উপরে বাবার ছায়া ছিল, পরিবার নামক শক্ত খুঁটির অস্তিত্ব ছিল। জীবনে তখন কোনো চিন্তা ছিল না, ছিল না ক্লেশ, হাহাকার। ছিল শুধু সে, তার স্বপ্ন, তার অদম্য ছুটে চলা। অথচ সেই যাত্রা ফুরিয়েছে বহু বছর আগেই। পায়ের পাতায় ধীরে ধীরে সমুদ্রের নোনা জল ছুঁয়ে যাচ্ছে ইরামের। স্থির তাকিয়ে নীরবে দেখে যাচ্ছে সে। ঠিক এমন সময়েই পিছন থেকে দুইটি বাহু জড়িয়ে গেল তার কোমরে। শক্ত পুরুষালী বুকের উষ্ণতা ঠেকল পিঠে। মানুষটা কে বুঝতে তার ছায়াই যথেষ্ট।
“কি ভাবছেন?”
সাইবানের কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই ইরাম ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। আশেপাশে অন্যান্য পর্যটকরা আছে। নিজেদের মতন সময় কাটাচ্ছে। হাসছে, খেলছে, ছবি তুলছে। অন্য সময় হলে লোকের ভিড়ের কারণে সাইবানকে কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিত ইরাম। কিন্তু এই মুহূর্তে কেন যেন সেই ইচ্ছাটা হলনা। সে মাথাটা এলিয়ে দিল স্বামীর কাঁধে। অস্তমিত সূর্যের দিকে চেয়ে বলল,
“কিছু ভাবছি না। সূর্যাস্ত দেখছি।”
“হুম, দেখে নিন। প্রকৃতির সূর্য অস্ত যেতে পারে, কিন্তু আপনার জীবনের সূর্য আর কখনো অস্ত যাবেনা।”
কথাটা ইরামের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত হানল বুঝি। মধুর আঘাত। ছেলেটা কথা বলার সময় কি ভেবে চিন্তে বলে নাকি হুটহাট যা মাথায় আসে তাই চালিয়ে দেয়? কারো কথাও বা কি করে এতটা গভীর হয়? মাথা কাত করে সাইবানের চোখে চোখ মেলাল সে,
“গ্যারান্টি দিচ্ছ?”
“কয় বছরের গ্যারান্টি চান?”
“যদি বলি সারাজীবনের?”
“বিছানায় চলুন।”
চটাশ করে সাইবানের গালে আলতো চাপড় বসিয়ে দিল ইরাম। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“অসভ্য।”
তীর্যক হাসল সাইবান,
“আপনি নাহয় আপনার ভালোবাসা দিয়ে সভ্য করে দেবেন।”
“কয়দিনের অভুক্ত তুমি?”
“পঁচিশ বছর সাত মাস ঊনত্রিশ দিনের।”
“এজন্যই এত বিছানা আসক্তি? ঠিক আছে, ঢাকায় ফিরে তোমাকে আমি পাঁচ বাই সাত ফিটের বিছানা কিনে দেব।”
“স্টিলের প্লীজ। কাঠের হলে আবার সমস্যা। মাসে মাসে নতুন বিছানা কিনতে হবে।”
এবার ইরাম আর সইতে পারলনা। গাল দুটো টমেটোর মতন রেঙে উঠেছে তার। এই ছেলেকে তার কায়দায় বশ করাএ যায় না। ঠোঁটের আগায় নির্লজ্জ জবাব থাকে! ইরাম সাইবানের বুক ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল।
“সরো তুমি! কুচুপু কোথায়?”
“ডাব খাচ্ছে।”
“কিঃ!”
আঙুল তুলে দেখাল সাইবান। অদূরে সৈকতের মাঝে ডাব বিক্রি করছে এক ফেরিওয়ালা। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে অনুরাগ আর সুগন্ধা। ইযান অনুরাগের কোলে। সুগন্ধা ডাব হাতে স্ট্র দিয়ে পান করছে। অপরদিকে অনুরাগ নিজের ডাবটা ইযানের জ্বালায় খেতে পারছেনা। বাচ্চাটা ক্ষণে ক্ষণে তার স্ট্রতে মুখ বসিয়ে দিচ্ছে। অনুরাগ তাই দেখে খিলখিল করে হাসছে।
“সব জায়গায় খালি মুখ বসানোর স্বভাব, তাইনা? এই দাঁড়া পোটলা! তোর ঘেডি ধইরা এমন ওসান ওসামু!”
সাইবান ইরামকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত করে হেঁটে চলে গেল ওইদিকে। ইরাম মনে মনে বিস্তর হাসল। ভিড় ঠেলে সৈকতের বালুকায় পা ফেলে এগোল কয়েক ধাপ। ঠিক তখনি অপ্রত্যাশিত একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো পিছন থেকে,
আমার আলাদিন পর্ব ৫২
“খুব কি সুখে আছো?”
জমে গেল ইরাম। তার পদক্ষেপ থমকাল বালুকায়। নিচে তাকাতেই অস্তমিত সূর্যের উদ্ভাসে বালুচরে একটি ছায়া দেখতে পেল। তার ভয়াল অতীতের ভূতুড়ে ছায়া, যা তার গোটা অবয়বকে মুহূর্তেই গ্রাস করে ফেলল।
“তোমার সুখ তো শুধু আমার আঙিনায়, তোমার পথ যে শুধু আমাতে হারায়, কবিতা।”
