Home আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৯

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৯

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৯
সালমা খাতুন

সকালের নরম আলো নিঃশব্দে জানালার ফাঁক গলে কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়েছে। সাদা দেয়ালের ওপর ঝরে পড়া সেই আলোকছায়া এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে গোটা ঘরে। দূর থেকে ভেসে আসছে কিছু নাম না-জানা পাখির কিচিরমিচির শব্দ, আর বাইরে রাস্তায় শুরু হয়েছে দিনের প্রথম গাড়িচলা—নিয়মিত, কিন্তু বিরক্তিকর এক শব্দের ধারা।
আরমান এখনো সোফায় বসে ঘুমিয়ে। মাথাটা একদিকে হেলে পড়ে আছে, মুখে হালকা ক্লান্তির ছাপ। সূর্যের আলো তার মুখে এসে পড়তেই সে একবার চোখ কুঁচকে নিল বিরক্তিতে। একটু পরে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল চারদিকে—প্রথমে অস্পষ্টভাবে, তারপর ধীরে সোজা হয়ে বসে পড়ল।

দৃষ্টি গিয়ে পড়লো, সাদা চাদরে মুড়ে, গলা অবধি টেনে রাখা সেই মেয়েটি যেন এক নিঃশব্দ দুঃখের অবয়ব হয়ে ঘুমিয়ে আছে। চোখ বুজে আছে, তবু চোখের কোণের চারপাশে চাপা ক্লান্তি, মুখে এক ধরনের বিষণ্নতা—যা ঘুমের মাঝেও স্পষ্ট।
সেই শান্ত মুখখানার দিকে তাকিয়ে আরমানের চোখে ক্ষণিকের জন্য ঝিলিক দিয়ে উঠল এক অদ্ভুত অনুভূতি—কেমন যেন বোধের অতলে নেমে যাওয়া একটা নরম ঢেউ।
এক মুহূর্তের জন্য আরমান অনুভব করল—এই মেয়েটিকে সে যতটা বুঝেছে, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে আছে মায়ার ভেতরে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

অনেক না বলা কথা, অনেক চাপা কান্না… এবং হয়তো কোথাও লুকিয়ে থাকা এক অপূর্ণ অপেক্ষা।
কাল রাতে নার্স কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অনেক পরে, সে আবার কেবিনে ফিরে এসেছিল।
ততক্ষণে মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে, হয়তো ওষুধের ঘোরে কিংবা দিনের সমস্ত ক্লান্তি আর হৃদয়ের দহন মিলিয়ে এক ধরনের গভীর ঘুমে ডুবে গেছে।
আরমান চুপচাপ সোফায় বসে নিজের মোবাইলে ইমেইল চেক করছিল তখন। সবকিছুই স্ক্রিনের পাতায় পাতায় ভেসে উঠছিল। কিন্তু ঠিক কখন যে তার নিজের চোখ বুজে এসেছে, সে নিজেও জানে না।
আরমান ধীরপায়ে সোফা থেকে উঠে হাঁটা দিল ওয়াশরুমের দিকে। চোখে-মুখে এখনও ঘুমের আবেশ, শরীরে ক্লান্তির রেখা। কয়েক মিনিট পর, ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। হাতে নিজের রুমাল, নিঃশব্দে ভেজা মুখ আর হাত মুছে নিচ্ছে। ঠিক তখনই—

ঠক ঠক, আওয়াজে কেবিনের দরজায় টোকা পড়লো।
সাথে সাথেই শোনা গেল এক চেনা কণ্ঠ—
“আসতে পারি?”
আরমান মুখ না তুলে, স্বাভাবিক গাম্ভীর্য বজায় রেখেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
“হুম।”
দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল আবির। মুখে স্বাভাবিক এক প্রাণবন্ত হাসি, হাতে একটা ছোট ব্যাগ।
আরমান ওর দিকে না তাকিয়ে বলল,
“তুই এত সকালে এখানে?”
আবির হাসি মুখেই উত্তর দিল,

“তোদের এখানে রেখে নিজের বিছানায় ঘুম হচ্ছিল না রে ভাই। তাই ভাবলাম এসে একটু দেখে যাই।”
আরমান ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়ে বলল, তারপর ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা,
“এত সকালে তোকে ঢুকতে দিল কে? এই নার্সিংহোম তো খুব কড়া।”
আবির দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“আরে আরমান শাহরিয়ার বলে একটা নাম আছে না? সেই পাওয়ার খাটিয়েছি।”
এ কথায় হালকা এক বাঁকা হাসি খেলো গেলো আরমানের ঠোঁটে, কিন্তু মুহূর্তেই, মৃদু আওয়াজে তাদের দৃষ্টি চলে গেল বেডের দিকে। মায়া ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করছে। চোখে ঘুম আর ক্লান্তির ছায়া।
আবির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগটা নামিয়ে রেখে ওর পাশে এগিয়ে গেল। নরম হাতে সাহায্য করল বালিশে ভর দিয়ে ঠিকঠাক হয়ে বসতে।
আরমান চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরো দৃশ্যটা যেন গেঁথে নিল ভেতরে ভেতরে।
মায়া মুখ তুলে তাকিয়ে, দুর্বল কণ্ঠে বলল, “তুমি কখন এলে ভাইয়া?”
আবির পাশে রাখা টুলটা টেনে নিয়ে বসল। চোখে ছিল একরাশ স্নেহ, কণ্ঠে ছিল অভ্যস্ত দায়িত্ববোধ।

“এই তো, এইমাত্র এলাম। এখন কেমন আছো তুমি?”
মায়া মাথা একটু নেড়ে ছোট্ট করে জবাব দিল,
“ভালো আছি।”
আবির কিছুটা ঝুঁকে, মৃদু কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল,
“সত্যিই ভালো আছো তো? কোনও অসুবিধা বা কষ্ট হচ্ছে না তো? বলো আমাকে। তাহলে আমি সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলব।”
মায়া চোখ নামিয়ে বলল, “না ভাইয়া, এখন আর কোনো কষ্ট হচ্ছে না। ঠিক আছি।”
ওদের কথোপকথনের মাঝখানে কেবিনে একটা মুহূর্তের জন্য নেমে এলো গভীর এক নিরবতা। আবিরের চোখে বোনসুলভ স্নেহ, আর মায়ার কণ্ঠে ধরা পড়ে এক অনুচ্চারিত কৃতজ্ঞতা—যা সে প্রকাশ করতে পারছে না, শুধু অনুভব করছে।
আরমানের কেন জানি বিরক্ত লাগলো সব কিছু, তাই কোনো কিছু না বলেই গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেলো। আবির আর মায়া তাকিয়ে রইল ওর যাওয়ার দিকে।

সকাল দশটা…
ডাক্তারের চেকআপ শেষ। সব রিপোর্টই আশ্বস্ত করেছে—মায়ার শারীরিক অবস্থা ভালো। স্যালাইনের ক্যানোলা খুলে দেওয়া হয়েছে তার হাতে থেকে। হালকা ব্যথা রয়ে গেছে সুঁচের প্রবেশপথে, কিন্তু সে ব্যথার চেয়েও বড় যে ক্ষত, তা ছিল মনের গভীরে—
এখন মায়া আবিরের নিয়ে আসা বাড়ির পোশাক পরে প্রস্তুত হয়েছে হসপিটাল ছাড়ার জন্য। চোখে-মুখে ক্লান্তি থাকলেও সাজানো রয়েছে এক ধরণের নির্লিপ্তি। যেন কোনো কিছুতেই আর অবাক হবার মতো কিছু বাকি নেই তার জীবনে।
ওদিকে আবির আর আরমানের বাবা আনোয়ার সাহেব গিয়েছেন ডিসচার্জের যাবতীয় ফর্মালিটিজ পূরণ করতে।
আনোয়ার সাহেব একটু আগে যখন বললেন—

“আমি তোকে নিতে এসেছি মায়া মামনি। আজ থেকে তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি। আমার মেয়ে হয়ে।”
তখনই বুকের ভেতর কোথা থেকে যেন এক গোপন হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল মায়ার। চোখ ভিজে উঠল। কোনো কিছু বলার আগে, নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা অশ্রু। একটানা তাকিয়ে রইল সামনের দেয়ালে, যেন সেখানেই লুকিয়ে আছে তার সমস্ত অতীত, সমস্ত স্মৃতি। তার চাচা চাচী নাকি আজ সকালেই চলে গেছেন। তার সাথে দেখা না করেই। হয়তো ভয় পেয়েছে, যদি এখন মায়ার দায়িত্ব তাদেরকে নিতে হয়।
মনের ভেতর হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল একটাই সত্য—সে এখন এতিম। মাথার উপর ছাদ নেই। নিজের বলতে এমন কিছুই অবশিষ্ট নেই ওর।

প্রথমটায় যেতে রাজি হয়নি সে আরমানদের বাড়িতে। ভেতরের এক গোপন দ্বিধা, এক অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে আটকে রেখেছিল। কিন্তু আনোয়ার সাহেব ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছিলেন মায়াকে। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সেই মুহূর্তটা, যেদিন হাসপাতালে বসে তার প্রিয় বন্ধু—মায়ার বাবা—নিজের কাঁপা হাতটা মেয়ের হাত থেকে ছাড়িয়ে তুলে দিয়েছিলেন আনোয়ার সাহেবের হাতে। নিঃশব্দে, গভীর এক আস্থায় ভর করে বলে গিয়েছিলেন, “আমার একমাত্র মেয়েটার দায়িত্ব তোর হাতে তুলে দিলাম। এখন থেকে তুই ওর বাবা। দেখে রাখিস আমার মেয়েটাকে।”

আনোয়ার সাহেবও কথা দিয়েছিলেন—এই মেয়েটাকেই নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখবেন। যত্ন করবেন। কোনো কষ্ট আসতে দেবেন না তার জীবনে। আর তখনই মায়ার বাবা বলে গিয়েছিলেন আরও একটা কথা—
“ভালো ছেলে দেখে মায়ার বিয়ে দিস, আনোয়ার। যেনো আমার মেয়েটা সারা জীবন সুখে থাকে।‌ খুব ইচ্ছে ছিল জানিস, মেয়েটাকে সুখী হতে দেখার— কিন্তু সব ইচ্ছে তো শেষ পর্যন্ত পূরণ হয় না…
মায়ার বাবা দেখে যেতে পারলেন না মেয়েকে সুখী হতে। এটাই ছিল তার অপূর্ণতার গভীর দাগ, আর সেই দায়ের ভারই আজ আনোয়ার সাহেব তুলে নিয়েছেন মায়ার জীবনের একমাত্র ছায়া হয়ে।

আবির যখন সেই কেবিনে ঢুকল, তখন দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তেই তার চোখ বড় হয়ে গেল। সামিরা ঘুমে এমনভাবে গা ছেড়ে দিয়েছে, যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই। বিছানার এক কোণে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ও, বালিশের জায়গা দখল করেছে ওর এক হাত। বালিশ নিচে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সামিরার একটা পা আর একটা হাত বেডের বাইরে ঝুলে আছে, মুখটা আধখোলা, আর গলা দিয়ে হালকা শোঁ শোঁ শব্দ বেরোচ্ছে।
এই অবস্থায় আবিরের দুষ্টুমে মন ভরপুর আনন্দে ভরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করল, ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল সামিরার এই রাজকীয় ঘুমের। তারপর ওর মানিব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো বার করে পাকিয়ে সরু বানিয়ে, নিঃশব্দে সামিরার কানে খোঁচাতে শুরু করল।
ঘুমে বিঘ্ন ঘটতেই সামিরা বিরক্ত মুখে হাত নেড়ে আবিরের হাত সরিয়ে দিলো। কিন্তু আবির থেমে থাকার ছেলে না, আবারও একই কাণ্ড করল। এদিকে সামিরা পাশ ফিরতে গিয়ে একেবারে ধপ করে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেল।
“উফ্ মা গো!”—একটা ঝাঁকি খেয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল সে।

আবির তো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার দশা! সামিরা ততোক্ষণে চোখ কচলাতে কচলাতে ফ্লোরে উঠে বসে বোকার মতো তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথায় বুদ্ধি ফিরতেই দাঁত কিঁচিয়ে তেড়ে এল আবিরের দিকে।
“এই তুমি! নিশ্চয়ই কিছু করেছো, তাই না? আমি এমনি এমনি পড়ে যাবো না?”—রাগে মুখ লাল করে চেঁচিয়ে উঠল সামিরা।
আবির কোনোমতে নিজের হাসি থামিয়ে বলল, “আরে না রে! আমি কি করবো? তোকে ডাকার জন্য এসেছিলাম। তোকে ডাকার সাথে সাথে তুই নিজেই পড়ে গেলি, এতে আমার দোষ কী?”
সামিরা রেগেই বলল, “তা আমি তো তোমার ডাক শুনলাম না! নিশ্চয় কিছু না কিছু করেছো তুমি।”
আবির:- “শোন, তুই যখন ঘুমাচ্ছিলি, তখন দেখলাম তুই বিছানার অর্ধেক ঝুলে আছিস! আমি যদি না ডাকতাম, এমনিতেই পড়ে যেতিস। বরং আমি তো তোর প্রাণ বাঁচাতে এসেছিলাম বলা যায়!”—আবির নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, তারপর আবার হাসতে লাগল।

তারপর বলল, “বিশ্বাস হচ্ছে না তো? দাঁড়া, প্রমাণ দেখাচ্ছি।”
বলেই সে ফোনটা সামিরার সামনে ধরল। ছবি দেখে সামিরার মুখ যেন কালো হয়ে গেল।
সামিরা:- “ছিহ ভাইয়া! এসব কী? আমার এত বাজে ছবি! তুমি এই অবস্থায় ছবি তুলেছো কেন?”
চিৎকার করে উঠল সামিরা, “তাড়াতাড়ি ডিলিট করো বলছি!”
সামিরা মোবাইল কেড়ে নিতে এগোতেই আবির এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিলো।
আবির এক চোখ টিপে বলল, “না, একদম না! এই ছবিগুলো খুব মূল্যবান। পরে কাজে লাগবে।”
তারপর গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, “তুই বল, তোকে এখানে কেন রাখা হয়েছিল?”
সামিরা বলল, “মায়া আপুর খেয়াল রাখার জন্য…”
আবির:- “হ্যাঁ, তো! তাহলে তুই কতটা খেয়াল রাখলি শুনি?”

সামিরা মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বলল, “সরি ভাইয়া… কাল রাতে ভাইয়া বলেছিলে খেয়ে একটু রেস্ট নিতে… খাওয়া শেষ করে একটু শুয়েছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি…”
তারপর মুখ তুলে আবার বলল, “মায়া আপু কেমন আছে এখন? আপুর কোনো অসুবিধা হয়নি তো? আমি জানি, খুব খারাপ করেছি আমি। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ঘুমিয়ে পড়া ঠিক হয়নি…”
আবির:- “মায়া এখন ভালো আছে চিন্তা করিস না।
এরপর আবিরও কিছুটা দুঃখিত হওয়ার ভান করে বলল, “হ্যাঁ এটা তুই একদম ঠিক বলেছিস। তুই ভীষণ খারাপ। আর তাই তো তোর কথা কেউ মনে রাখেনি। সবাই তোকে হসপিটাল থেকে না নিয়েই, মায়াকে ডিসচার্জ করিয়ে চলে গেছে।”

আবিরের এই কথায় অবাক হয়ে গেলো সামিরা। ও চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “কিহ?? সবাই আমাকে না নিয়েই চলে গেছে?”
আবির:- “হ্যাঁ তো। সবাই দেখছি মায়াকে নিয়েই ব্যস্ত বাড়িতে। আমার হঠাৎ করে মনে পড়লো তোর কথা। জানিসই তো তোকে আমি কতটা ভালোবাসি। তো আমি সবাইকে তোর কথা জিজ্ঞাসা করতেই, সবার মনে পড়লো। তুই তো কুম্ভকর্ণের মতো পড়ে পড়ে ঘুমাস, তাই সবাই বলল আমি যেনো তোকে তুলে নিয়ে আসি। আমি ভাবলাম, ওই ছোটো খাটো একটা হাতির বাচ্চার মতো মানুষটাকে তুলে আনা, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই একটা জেসিবি নিয়ে আসি। ওটাতে করে তুলে নিয়ে যেতে সুবিধা হবে। তবে দুঃখের বিষয় হলো এই যে, অতো বড়ো জেসিবি টাকে এই নার্সিংহোমের ছোটো দরজা দিয়ে প্রবেশ করানো গেলো না।”

সামিরা প্রথমে অবাক হলো ওকে সবাই না নিয়েই চলে গেছে শুনে। কিছুটা মন খারাপও হলো। কিন্তু আবিরের পুরো কথাটা শুনে আবারও রেগে গেলো। ও তেড়ে গিয়ে আবিরকে কিল ঘুষি মারতে শুরু করলো। মুখে বলতে থাকলো, “কিহ? আমি ছোট খাটো হাতির বাচ্চা? আর তুমি? তুমি কি হ্যাঁ? তুমি একটা গন্ডার, জলহস্তী।”
ওদের এই দুষ্টুমির মাঝেই আরমানের গম্ভীর গলার আওয়াজ শোনা গেল— “ কি হচ্ছে টা কি?? তোরা এখানেও শুরু করেছিস?”

সামিরা দরজার কাছে আরমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখ ওর কাছে গিয়ে আবিরের নামে নালিশ জানিয়ে বলল, “ভাইয়া তুমি জানো! আবির ভাইয়া আমাকে হাতির বাচ্চা বলেছে। আবার আমাকে তুলে নিয়ে যেতে নাকি জেসিবি লাগবে।”
আবির তাড়াতাড়ি নাকোচ করে বলে উঠলো, “আরে হাতির বাচ্চা বলেনি তো। বলেছি ছোটো খাটো হাতির বাচ্চার মতো মানুষ।”
সামিরা:- “দুটো একই হলো। আচ্ছা তোমরা সবাই নাকি আমাকে না নিয়েই চলে গেছো, মায়া আপুকে ডিসচার্জ করিয়ে।”
আবির থমথমে গলায় উত্তর দিলো, “না এখনো যাইনি। তবে আর দুই মিনিটও লেট করলে চলে যাবো তোদের রেখেই।”
বলেই আরমান আবার হনহন করে চলে গেলো। আর এদিকে সামির আবিরের দিকে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “মিথ্যে বাদীর পাহাড় একটা, হুঁ।” 😏 😏
বলেই মুখ ঘুরিয়ে সামিরাও হনহন করে চলে গেলো।

মায়া ধীরে ধীরে বেড থেকে নামল। স্যালাইন খুলে ফেলার পরও শরীরে এখনো ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সামিরা ইতিমধ্যেই ওর কালরাতের পোশাক একটি ব্যাগে গুছিয়ে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ডিসচার্জের সমস্ত ফর্মালিটিও শেষ হয়ে গেছে।
মায়া প্রথম পা বাড়াতেই হঠাৎ যেন চারদিক ঘুরে উঠল তার। শরীরটা দুলে উঠতেই, নিজেকে সামলে নিলো বেডের ধরে। সামিরা এক ঝটকায় এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।
“কি হলো আপু? আবার শরীর খারাপ করছে?” — উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল সামিরা।
মায়া ম্লান হাসির চেষ্টা করে বলল, “না, ঠিক আছি। শুধু একটু মাথাটা ঘুরে গেলো…”
সামিরা ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কি পারবে? বাইরে গাড়ি পর্যন্ত…”

কথাটা শেষ করতে পারল না সে। ঠিক তখনই হনহন করে কোথা থেকে যেন আরমান এসে হাজির। এক মুহূর্তও দেরি না করে মায়াকে তুলে নিলো কোলে। তারপর কিছু না বলেই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে।
সামিরা বিস্ময়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা যেন হজম করতে পারছিল না। তারপর হঠাৎ দৌড়ে ছুটে চলল ওদের পেছন পেছন।
ওদিকে আরমান বাইরে থেকে দেখছিল কেবিনের দরজার দিয়ে মায়ার প্রতিটি নড়াচড়া। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে দেখেই, আর এক মুহূর্তও ভাবেনি সে। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই ছুটে গিয়ে কোলে তুলে নিয়েছে মায়াকে।
মায়া প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। তারপর চারপাশে তাকিয়ে দেখল অনেকে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কেউ আবার নিজস্ব কাজে ব্যস্ত। হালকা ঘেমে যাওয়া কপাল নিয়ে মায়া নিচু স্বরে বলল, “আপনি কি করছেন? নামিয়ে দিন আমাকে… আমি নিজেই যেতে পারব।”

আরমান গম্ভীর গলায়, ওর দিকে না তাকিয়েই দৃষ্টি সামনের দিকে রেখেই জবাব দিল, “হ্যাঁ, কেমন পারবে সেটা তো দেখলাম। আর তোমার জন্য সারাদিন হাসপাতালে বসে থাকার সময় আমার নেই।”
মায়া রাগে ঠোঁট কামড়ে বলল, “কে আপনাকে বলেছে আমার জন্য হাসপাতালে আসতে?”
এরই মধ্যে ওরা গাড়ির সামনে এসে পৌঁছেছে। গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আবির বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে, মুখের অভিব্যক্তি যেন সিনেমার দৃশ্য দেখছে এমন।
আরমান বিরক্ত মুখে বলল, “ওভাবে তাকিয়ে না থেকে দরজাটা খুলে দে।”
আবির যেন হুঁশ ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে দিল। আরমান মায়াকে গাড়ির ভেতরে সিটে গিয়ে সতর্কভাবে বসিয়ে দিল। মায়া কিছু না বলেই একপাশে চোখ ফিরিয়ে নিল। সামিরাও ততক্ষণে এসে পাশে বসে পড়েছে।

ঠিক তখনই আরমানের বাবা, আনোয়ার সাহেব এসে পৌঁছালেন। হাতে একটা ছোট ব্যাগ—মায়ার বাকি ওষুধ গুলো এনে দিয়েছেন, সঙ্গে শেষবার ডাক্তারের সঙ্গেও কথা বলে নিয়েছেন।
আরমান ওনার দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “তোমরা যাও ড্যাড, আমি আসছি।”
আবির এতক্ষণে নিজের অবাক ভাব কাটিয়ে উঠে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসেছে। আনোয়ার সাহেব পাশে উঠে বসলেন, সাই জানিয়ে। তারপর গাড়ি ছুটে চলল শাহরিয়ার ম্যানশনের দিকে, হাসপাতালের রেখে গেল কিছু না বলা প্রশ্ন, কিছু অপূর্ণ অনুভূতি।

শাহরিয়ার ম্যানশনের প্রশস্ত ড্রয়িংরুমে তখন সবার উপস্থিতি। মায়া এক কোণার সোফায় বসে আছে। তার পাশে বসে আছেন আনজুমা বেগম। স্নেহময় হাতে এক এক করে মায়ার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। যেন নিজের মেয়েকেই যত্ন করছেন। মায়াকে এখন একা রুমে থাকতে দিচ্ছে না কেউ। সবাই জানে—এই মুহূর্তে একাকীত্বই সবচেয়ে বড়ো বিষ। বাবার শূন্যতা আর স্মৃতির ভারে ভেঙে পড়তে পারে ও যে কোনো সময়।
তাই সবাই মিলে একসাথে ড্রয়িংরুমে। ঠিক তখনই, হঠাৎ করেই বেজে উঠল কলিং বেলের শব্দ।
ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল এক মুহূর্তে। দরজার দিকে এগিয়ে গেল এই বাড়ির এক মেড। সামান্য সময় পরেই দরজা খুলে দিল সে।

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ২৮

প্রবেশ করলেন মিসেস সাবিনা বেগম। পরিপাটি সাজ, কিন্তু মুখে অভিব্যক্তি কঠিন পড়তে। তাঁর দুপাশে দুজন মানুষ। একজনকে তো তিনি সম্পূর্ণ জড়িয়ে ধরে রেখেছেন—যেন বহুদিন পর ফিরে পাওয়া কাছের কিছু।
ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবাই চমকে তাকালেন দরজার দিকে। মিসেস সাবিনার সঙ্গে থাকা সেই দুই ব্যক্তি যেন চেনা নয়, আবার একেবারে অচেনাও নয়। তাদের আগমনে ঘরের পরিবেশে নেমে এলো একরাশ জিজ্ঞাসা আর বিস্ময়।

আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩০