আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪৪
সালমা খাতুন
মিসেস সাবিনা বেগম এবং সামিরার রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো মায়ার ঠিক সামনে। মায়া মনে এক রাশ ভয় নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে, কোলের উপর রাখা দুই হাত একে অপরের সাথে কচলাচ্ছে। চোখ তখনো ছলছল। আরমান টেবিলে রাখা খাবারের প্লেট টা তুলে নিয়ে নিজের কোলে রাখলো। তারপর কিছুটা খাবার নিয়ে মায়ার মুখের সামনে ধরলো। গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করলো আরমান—“হাঁ করো।”
মায়ার কোনো ভাবান্তর নেই, ও এক ভাবেই বসে আছে নির্বাক ভঙ্গিতে। আরমান এবার ধমকে উঠলো, “কি হলো? কথা কানে যায়া না?”
আরমানের ধমকে কেঁপে উঠলো মায়া। চোখ থাকা পানি টুপ করে হাতের উপর পড়লো। যা নজর এড়ালো না আরমানের।
মায়া মাথা নিচু রেখেই ছোটো করে মুখ খুলল। আরমান ওর হাতের খাবার মায়ার মুখে দিলো। এভাবেই ধীরে ধীরে নিশ্চুপ ভঙ্গিতে আরমান মায়াকে পুরো খাবার টা খাইয়ে দিলো। খাবার খাওয়ানো হয়ে গেলে, আরমান প্লেট টা টেবিলে রেখে, ওখানে থাকা মায়ার মেডিসিনের বক্সটা তুলে নিলো। তারপর মায়ার এই সময়ের মেডেসিন গুলো পাতা থেকে ছাড়াতে শুরু করলো।
মায়া আরমানকে মেডিসিন নিতে দেখে মিনমিন করে বলল, “আমি ওগুলো খাবো না, ভীষণ তেঁতো। গলায় আঁটকে যায়।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আরমান— “আমি খাইয়ে দিচ্ছি, দেখো তেঁতো ও লাগবে না আর গলায় আঁটকেও যাবে না।”
আরমানের বলা কথার প্রতিউত্তরে মায়া আর কিছু বলার সাহস পেলো না। লোকটাকে দেখলেই প্রচন্ড ভয় লাগে ওর, ওর থেকে অনেক উঁচু পুরো স্বাস্থ্যবান এই পুরুষটার সামনে নিজেকে এক বাচ্চা মেয়ের মতো লাগে। আর মুখে তো কোনো সময় হাসি নেই, সব সময় গম্ভীর হয়ে থাকে। মায়া নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠলো, “গম্ভীর মুখো, গম্ভীর সাহেব।”
মায়ার বিড়বিড় করে বলা কথাটা আরমানের কানে গেলো কি? মনে হয় গেলো, আর তার জন্যই হয়তো আরমানের হাত থেমে গেলো। আরমান অনেক কষ্টে এক হাতে করেই মেডিসিন গুলো ছাড়াচ্ছিল, মায়ার বলা কথাটা কানে যেতেই ওর হাত থেমে গেলো। হৃদয়ে বয়ে গেলো এক শীতল হাওয়া।
মায়ার ব্রেন থেকে সমস্ত স্মৃতি মুছে গেলেও, হয়তো মায়ার হৃদয়ে কোথাও এখনো রয়ে গেছে আরমান শাহরিয়ার নামক মানুষটি, মায়ার ভাষায় মায়ার ‘গম্ভীর সাহেব’। আরমানের মনে আশা জাগল, তার মায়াবতী তাকে চিনতে না পারুক কিন্তু সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে দোষ কোথায়? হ্যাঁ ও আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করবে, নতুন ভাবে।
ওদের প্রথম শুরুটা ছিল বিষাদে মোড়া। শুরুটা হয়েছিল ওর নিষ্ঠুরতা দিয়ে, তুচ্ছতাচ্ছিল্যভরা ব্যবহার দিয়ে। একটা নিরপরাধ হৃদয়কে উপেক্ষা করে গড়ে উঠেছিল অহংকারের প্রাসাদ। তবু সেই প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়েছিল এক অব্যক্ত প্রেম, যা হয়তো তখন ও স্বীকার করতে পারেনি, কিন্তু সময় জানে—ওদের প্রথম শুরুটা ছিল বিষাক্ত ময়, তবুও ভালোবাসায় গাঁথা। ওদের প্রথম পরিচয়টা ছিল ভুলে ভরা, কিন্তু হৃদয়ে ছিল সত্য— যা ও বুঝেও বুঝতে পারেনি।
এসব ভাবনার শেষে, আরমানের অন্তরে জন্ম নিল এক গভীর অথচ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা—
“এই বারের শুরু টা হবে নুতন ভাবে, যেখানে থাকবে না কোনো নিষ্ঠুরতা—
আমার ভালোবাসা এবার আর ক্ষত নয়, মলম হবে।
আমার ভালোবাসা এখন আর কাঁটা নয়, বরং নরম ছোঁয়া।
এবারের ভালোবাসা আর শাসন নয়, শুধু নীরব সঙ্গী হওয়া।
আগের ভালোবাসা ছিল দাবির, এবার শুধু দেবার।
‘আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা’ এবার হবে ‘আমার যত্নময় ভালোবাসা’।”
এখান থেকেই সূচনা হলো এক নতুন গল্প….
আরমানের ভাষায় “আমার যত্নময় ভালোবাসা”
আরমানের মনে কিছুটা শান্তির ছোঁয়া থাকলেও মুখটা ওর স্বভাব সুলভ ভাবেই গম্ভীর। আরমান মেডিসিন হাতে নিয়ে মায়াকে আগে মুখে পানি নিতে বলল। মায়া মুখে পানি নিলে আরমান ওকে মুখটা একটু তুলে হাঁ করতে বলল, এরপর মায়া হাঁ করলে আরমান মায়ার মুখে মেডিসিন দিয়ে দিলো। আর মায়া তা টুক করে গিলে নিলো পানির সাথে, কোনো রকম তেঁতো লাগলো না।
আর বিষয়টা মায়ার মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলো, “আরে বাহ! তেঁতোই তো লাগলো না। আপনি খুব ভালো গম্ভীর সাহেব, সামিরা খাওয়াতে পারে না তাই তেঁতো লাগে। এবার থেকে আমি প্রতিদিন আপনার হাতেই খাবো। খাইয়ে দেবেন তো আমায়?”
মায়া শেষের কথাটা কিউট ফেস করে আরমানকে জিজ্ঞাসা করলো। আর আরমান? ওর মনের অনুভূতি মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। মায়া ওর সাথে সাথে ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠেছে, এই বিষয়টা ওর হৃদয়কে প্রশান্তি দিচ্ছে। আরমান মায়ার কথার উত্তরে ছোটো করে বলল, “হুম দেবো।”
মায়া এখন বাগানের মাঝখানে দোলনাটায় বসে আছে। সামিরার সাথে অনেকক্ষণ আগেই সে এখানে এসেছে। চারপাশের ঘন সবুজে ভরা গাছপালা, বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের নরম সুবাস—সব কিছুতেই মায়ার মনে আজ এক অদ্ভুত রকম আনন্দ। অবুঝ শিশুর মতো পুরো বাগানটা সে ঘুরে ঘুরে দেখেছে, কখনো ছুটে বেড়িয়েছে ঘাসের উপর দিয়ে, কখনো থেমে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখেছে পাখিদের কোলাহল।
এখন সন্ধ্যা নামতে চলেছে। আকাশের রঙ হালকা কমলা ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে, অথচ মায়া এখনও বাগান ছাড়তে চাইছে না। সামিরা তাকে অনেকবার বুঝিয়েছে, বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে—কিন্তু মায়া আজ যেন নাছোড়বান্দা। সে থাকতে চায় এই সবুজের মাঝে, আকাশের নিচে, প্রকৃতির নরম হাওয়ায়।
সামিরা নিজের ফোনটা রুমে ফেলে এসেছিল, তাই বাড়ির ভেতরে ফিরে গেছে সেটা আনতে। মায়া এখন একাই দোলনায় বসে আপন মনে দোল খাচ্ছে। হঠাৎ দোলনার গতি একটু বেড়ে গেলো। মায়ার মনে এক বিন্দুও ভয় জন্মাল না, বরং চোখেমুখে হাসি ফুটে উঠলো—ভীষণ ভালো লাগছে তার। মনে হচ্ছে যেন কেউ খুব আদর করে, খুব যত্ন করে পেছন থেকে দোলাচ্ছে তাকে। দোলনাটা ধীরে ধীরে এক ছন্দে দুলে উঠলো, ঠিক যেন মায়ার মনের আনন্দের তালে।
কিছুক্ষণ পর, সেই ব্যাক্তির হাত দোলনার গতি আস্তে আস্তে থামিয়ে দিলো। এরপর একজোড়া পা এসে থামলো মায়ার পাশের ফাঁকা জায়গাটায়। ব্যাক্তিটি ধীরে ধীরে বসল—একটু দূরত্ব রেখে, মুখে এক সহজাত মৃদু হাসি।
“কি ব্যাপার মায়া পরী? খুব খুশি মনে হচ্ছে?”—আবেগমাখা কণ্ঠে বলল আসিফ।
মায়া কোনো উত্তর দিলো না। সে শুধু চুপচাপ চেয়ে রইলো তার মুখের দিকে, চোখে একরাশ ভাবনা। চেনার চেষ্টা করছে যেন। চেনা, আবার অচেনা—এই দুইয়ের মাঝে দোল খাচ্ছে তার দৃষ্টিপাত।
আসিফ বিষয়টা বুঝে নিয়ে হেসে বলল, “আরে, আবার ভুলে গেলে? আমি তোমার ডক্টর সাহেব! মনে নেই সেই দিন আমরা চারজন—তুমি, আমি, সামিরা আর রুবি একসাথে লুডু খেলছিলাম? তখন তুমি আমায় নাম দিলে ‘ডক্টর সাহেব’…”
মায়া— “হ্যাঁ মনে পড়েছে, আপনি তো সেই ডক্টর সাহেব। আচ্ছা আমি শুধু বার বার ভুলে যাই কেনো?”
আসিফ— “ভুলে গেলেও সমস্যা নেই মায়া পরী, আমি আছি তো তোমায় সব কিছু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।”
মায়া ওর কিছু হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভাবে বলল, “আচ্ছা জানেন, আমার কোমরে না অনেক সুন্দর একটা জিনিস আছে, চকচক করে, অনেক সুন্দর দেখতে ওটা। আপনি কি জানেন ওটা আমাকে কে দিয়েছে? কিভাবে পেলাম ওটা আমি? আমার তো মনে নেই।”
আসিফ মায়ার বলা কথাটা শুনে কিছু একটা ভাবলো, তারপর বলল, “আরে ওটা তো আমিই দিয়েছিলাম, ভুলে গেলে? তুমি আর আমি তো দুজন খুব ভালো বন্ধু ছিলাম, অনেক আগে থেকেই। তখন তোমাকে আমি ওটা দিয়েছিলাম।
মায়া— “আপনি দিয়েছিলেন? আপনি আমার বন্ধু? সামিরা আর রুবির মতো?”
আসিফ মাথা নাড়িয়ে সাই জানাল, “হ্যাঁ তো। তুমি আমি খুব ভালো বন্ধু।”
মায়ার আবার কিছু মনে পড়েছে এমন ভাবে জিজ্ঞাসা করলো, “আচ্ছা আপনি জানেন আমি সামিরার ভাবী মনি। ভাইয়ার বউ। আচ্ছা বিয়ে মানে কি? আর বউ কাকে বলে?”
আসিফ হালকা হেসে বলল, “বিয়ে মানে তো একটা প্রতিজ্ঞা… সারা জীবন পাশে থাকার। আর বউ? একটা পুরুষ মানুষ যেই নারীকে বিয়ে করে সেই নারী হচ্ছে বউ। বউ তো সেই নারী, যাকে একটা পুরুষ প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, যাকে রক্ষা করার জন্য সে দুনিয়ার সব কিছু ত্যাগ করতেও প্রস্তুত থাকে। যেমন আমি—যদি কোনোদিন বিয়ে করি, তবে ঠিক এমন কাউকে চাই, যাকে আমি সব ভুলে, সব হারিয়ে ভালোবাসতে পারি।”
একটু থেমে মায়ার চোখে তাকিয়ে…
“আর তুমি তো জানোই না… তোমার জীবনের অনেক কিছু আমি জানি, এমন অনেক মুহূর্তের সাক্ষী আমি… তুমি হয়তো ভুলে গিয়েছো, আমি তো ভুলিনি মায়া… তোমারও বিয়ে হবে, তুমিও কারোর না কারোর বউ হবে। তোমার সাথে বিয়ে হওয়া মানুষটা তোমাকেও ভালোবাসবে, আগলে রাখবে… তাই না?”
আসিফের কথা গুলো শুনে মায়া যেনো গভীর ভাবনায় ডুবে গেলো। আসিফ হঠাৎই মুখে একটা বাঁকা হাসি নিয়ে বলল, “আর মায়া পরী তুমি কি জানো? আমি সামিরার ভাইয়া হয়।”
মায়া কি বুঝলো জানা নেই, তবে হঠাৎ করে বলে উঠলো— “ডক্টর সাহেব! আমার কি আগেও বিয়ে হয়েছিল? আমার মনে পড়ছে না কেনো? আচ্ছা ডক্টর সাহেব, আপনি বিয়ে করবেন আমায়?”
আসিফ চমকে উঠলো মায়ার কথাটা শুনে। মায়ার দিকে তাকালো ও। মায়ার মুখ দেখে মনে হচ্ছে না যে এখন ও ওর বাচ্চামো থেকে কথাটা বলেছে। মায়ার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত অসহায় আকুতি।
আসিফের মুখে ফুটে উঠলো বিজয়ের হাসি। ও বলল, “না তোমার বিয়ে হয়নি। তবে তুমি চাইলে অবশ্যই আমি তোমাকে বিয়ে করবো। বউ হবে তুমি আমার। অনেক যত্ন করবো আমি তোমার, ভালোবাসবো, আগলে রাখবো, আর তুমি যেটা চাও সেটাই দেবো।”
মায়া উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলো, “তাহলে চলুন আমারা এখনি বিয়ে করবো। কিন্তু বিয়ে কিভাবে করে?”
আসিফ— “বিয়ে তে অনেক লোকজন আসে, অনেক সুন্দর করে ঘর বাড়ি সাজানো হয়। বিয়ে করলে তোমাকে বউ সাজতে হবে। আর বউ সাজলে অনেক সুন্দর লাগে মেয়েদেরকে।”
কথাটা বলেই আসিফ নিজের ফোন পকেট থেকে বের করে, তাড়াতাড়ি ফোনে ঘাটাঘাটি করে কিছু ছবি বের করলো। তারপর মায়াকে দেখাতে লাগল, “এই দেখো, বিয়ে করলে এমন ভাবে বউ সাজে সবাই। আর এই দেখো, এইভাবে ঘর বাড়ি সাজানো হয়।”
বলতে বলতেই বেশ কিছু ছবি আসিফ মায়াকে দেখালো। মায়া আসিফের হাতে হাত দিয়ে বলল প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে বলল— “ডক্টর সাহেব? আমিও বউ সাজবো, চলুন আমরা এখনি বিয়ে করবো।”
আসিফ মুখভঙ্গি নিরাশ করে বলল, “কিন্তু বিয়ে করতে গেলে তো সবাইকে লাগে। আর আমাদের বাড়ির কেউ রাজি হবে না তোমার আমার বিয়েতে। কেউ দেবেই না আমাদের বিয়ে।”
মায়া কৌতুহল চোখে চেয়ে প্রশ্ন করলো, “কেন? কেন? কেন রাজি হবে না সবাই? কেন আমাদের বিয়ে দেবে না?”
আসিফ— “কেনো সেটা তো জানিনা। তবে একটা উপায় আছে বাড়ির সবাইকে রাজি করানোর।”
মায়া— “কি উপায়?”
আসিফ— “তুমি যদি অনেক জোড় করো সবাইকে তাহলে সবাই রাজি হতে পারে। তবে তোমাকে অনেক অনেক জোড় করতে হবে, জেদ করতে হবে। তুমি যদি খুব কান্নাকাটি শুরু করো তাহলে সবাই রাজি হয়ে যাবে।”
“সবাইকে কিসে রাজি হয়ে যাবে ভাইয়া?”
আসিফ কিছুটা চমকে উঠলো সামিরার গলার আওয়াজ শুনে। তাড়াতাড়ি ওর হাতে থাকা ফোনটা পকেটে ভরে নিলো। তারপর ও কিছুটা হাসার চেষ্টা করে বলল, “ মায়া সবার থেকে কিছু চাই। হঠাৎ ওর মনে একটা ইচ্ছা জেগেছে, আর সেটাতেই সবাইকে রাজি করানোর কথা বলছিলাম।”
সামিরা— “আচ্ছা তাই বুঝি? তা কি সেই ইচ্ছা শুনি।”
মায়া কিছু বলবে তার আগেই আসিফ বলল, “আরে এখন সেটা বলা যাবে না? মায়া একেবারে সবার সামনে বলবে।”
মায়া বাচ্চামো গলায় বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ সবার সামনে বলবো। ইচ্ছা আছে, অনেক বড়ো একটা ইচ্ছা।”
আসিফ বলল, “আচ্ছা চলো তাহলে ভিতরে। সবাইকে বলবে।”
মায়া— “হুম চলো।”
বলেই মায়া উঠে দাঁড়ালো। তারপর হাঁটা দিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। পিছু পিছু সামিরা আর আসিফও গেলো।
আর এই দিকে, সমস্ত দৃশ্যটা আরমান দাঁড়িয়ে দেখছিল ওর রুমের ব্যালকনি থেকে—নিঃশব্দ, অথচ চোখ দুটো জ্বলছিল আগুনে। তার সেই মায়াবতী, যাকে ঘিরে ওর সমস্ত জীবনবোধ, স্মৃতি আর কল্পনার সূক্ষ্ম আবরণ—সেই মেয়েটি আজ কারও সামনে এতো সহজে হাসছে, কথা বলছে, যেন সে-ই ওর জীবনের অংশ নয়, অন্য কারও…
দূরত্বের কারণে কথাগুলো কানে আসছিল না ঠিকই, কিন্তু মায়ার হাসিমুখ, চোখের দীপ্তি, আর আসিফের দিকে ঝুঁকে কথোপকথনের ভঙ্গিমা—এই দৃশ্যগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠছিল ওর চোখে।
মায়ার এমন সহজ সরল আচরণ, অসংকোচ হাসি আর আসিফের উপস্থিতিতে ওর সেই প্রাণবন্ততা যেন আরমানের বুকে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছিল। যে আগুন অনেকক্ষণ ধরে নিভে ছিল ভেতরে, এখন যেন আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
হঠাৎই কোনো ভাবনা ছাড়াই, পকেট থেকে ফোনটা বের করল আরমান। দ্রুত আঙুল চালিয়ে ডায়াল করল রুবির নাম্বারে। ফোন রিসিভ হতেই নিচু গলা, অথচ শীতল ও কঠোর স্বরে বলল,
“রুবি, আমি নিচে যাবো। নিয়ে যাও আমায়।”
ব্যাস এতোটুকুই। রুবির উত্তরের অপেক্ষা না করেই কল কেটে দিলো আরমান। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই রুবি এসে আরমানকে নিয়ে যেতে শুরু করল।
নিচে ড্রয়িংরুমে…
বাড়ির সকলেই সোফায় বসে আছে। বিয়ে উপলক্ষে আসা আত্মীয় স্বজন সবাই অনেক আগেই নিজ নিজ বাসস্থানে ফিরে গেছে। রয়ে গেছে শুধু আরমানের ফুপি আর আসিফ। মায়া খুশি মনে প্রবেশ করলো ড্রয়িং রুমে। ওকে দেখে আনোয়ার সাহেব বললেন, “আরে মায়া মামনি যে, শরীর কেমন আছে এখন? আর বাগান ঘোরা হলো?”
মায়া উনার পাশে বসে বলল, “হুম ড্যাড বাগান ঘোরা হয়ে গেছে। আর শরীর এখন ভালো আছে।”
সামিরা আনোয়ার সাহেবকে ড্যাড বলে, তাই মায়াও সেটা শুনেই ড্যাড বলা শুরু করেছে। মিসেস সাবিনা বেগমকে মাঝে মাঝে মম তো আবার মাঝে মাঝে আম্মু বলে।
আসিফ গিয়ে ওর মায়ের পাশে বসলো। সামিরা বলল, “ড্যাড, ভাবী মনি সকলকে কিছু বলতে চাই। ভাবী মনির খুব বড়ো একটা ইচ্ছা জেগেছে মনে, আর সেটাতে তোমাদের সবাইকে রাজী করাতে এসেছে ভাবী মনি।”
ঠিক তখনি শোনা গেল এক গম্ভীর গলার আওয়াজ, “আর সেই বড়ো ইচ্ছাটা ঠিক কি?”
কেঁপে উঠলো মায়া, ভয় ভয় চোখে তাকালো সামনের দিকে। আরমান বসে আছে হুইলচেয়ারে, পিছনে রুবি দাঁড়িয়ে আছে।
মিসেস সাবিনা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন, “আব্বু তুই সব সময় এমনভাবে কথা বলিস কেন হ্যাঁ? দেখছিস তো মেয়েটা এমনিতেই ভয় পায় তোকে। মায়া আম্মু তুমি বলো তো, কি ইচ্ছা তোমার?”
মায়া একবার তাকালো আরমানের দিকে, আরমান ওর দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এরপর মায়া মিসেস সাবিনা বেগম দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল, “তোমরা সবাই রাজি হবে তো? আমার কিন্তু ওটা চাই মানে চাই।”
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪৩
আরমানের ফুপি বলে উঠলো, “আরে মামনি তুমি আগে কি চাও সেটা তো বলো। আমরা সবাই রাজি হয়ে যাবে, আমাদের মায়া মামনি কিছু চাই আর আমরা সেটা দেবো না, এটা কখনো হতেই পারে না।”
উনার কথায় মায়ার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উচ্ছাসিত কন্ঠে বলে উঠলো মায়া….
