Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সায়ংসন্ধ্যায় মেখলাবৃত অচেনা নিকটবর্তী চারদিকটা দর্শনের আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখাটা একজন ভ্রমণ তৃষ্ণার্তকে মানায় না নিশ্চয়ই! প্রাতঃসন্ধ্যা সময়টাই দীধিতির কাছে আল্লাহর সৃষ্ট ঐন্দ্রিয়িক এক মধুর ক্ষণ মনে হয়। একদম প্রেমে পড়ে যাবার মতো। তার ওপর এখন তো সে সফরের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। এই সময়গুলোর একটা সেকেণ্ডও সে অকারণে ব্যয় করবে না।
মাগরিবের আযান হয়েছে মিনিট পাঁচেক হলো৷ অদূরেই আরও দু’টো, তিনটা মাইক্রো থেমেছে নামাজ আদায়ের জন্য। তার মধ্যে কালো মাইক্রোটা ওদের গাড়ির পাশাপাশিই আসছিল। নিজেদের গাড়িটাও থামিয়েছে ওরা। ভেতরে ঐশী, তামান্না, তন্বীসহ সিনিয়র আপুরাও ঘুমিয়ে। তার বন্ধুরা আর সিনিয়র ভাইগুলো মনে হয় না নামাজ আদায় করবে। সামনের দোকানে ওদের দেখা যাচ্ছে চা, সিগারেট খেতে।

ফাঁকা রাস্তা, রাস্তার বাম পাশে সারি সারি গাছ। সমতল থেকে বেশ উচুঁতেই রাস্তাটা। বাম পাশেই সমতলে ফসলি জমি ক্ষেত। ডানপাশে মসজিদ, চায়ের ছোটোখাটো একটি দোকান, সেদিক দিয়ে দীর্ঘ একটি পথ নেমে গেছে। বোধ হয় মানুষের বসতি অঞ্চল প্রবেশের রাস্তা ওটা। মাইক্রো থেকে দীধিতি একাই নামল। নামাজের ওয়াক্ত বলে একটা নিস্তব্ধ ভাব চারপাশে। তবে আকাশ পানে তাকালে আপন নীড়ে ফিরে যাওয়া পাখির ঝাঁক দেখা যায়, পক্ষীকূজনে মাতোয়ারা সাঁঝ। গ্রাম অঞ্চলের ফসলি ক্ষেতের মাঝ দিয়ে চিকন যে মেঠোপথ থাকে, সেই মেঠোপথে নামল সে। কিন্তু নামার পর মনে হচ্ছে তার, এই সুন্দর সন্ধ্যালগ্ন একা উপভোগ করা অন্যায় হয়ে যাবে তার বান্ধবীদের সঙ্গে। ওদের গল্প শোনালে একটা গালি শোনাও মিস যাবে না ওর। ফিরে গিয়ে রাস্তাতে এসে দাঁড়াতেই নিজেদের গাড়িটাকে দেখতে পেল না। মুহূর্তেই সম্ভাবনা আশঙ্কায় বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠল ওর। সামনের চায়ের দোকানটাতেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ইস! সে কি খুব দূরে চলে গিয়েছিল যে গাড়ি স্টার্ট দেবার শব্দটাও কানে পৌঁছল না? তাদের সাথে থামা মাইক্রোগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদ থেকে মুসল্লি বের হচ্ছে আস্তে আস্তে। তার সঙ্গীরা কেউ-ই যে মসজিদে যায়নি তা সে নিশ্চিত। এত বেশি দায়িত্বহীন কীভাবে হতে পারল ওরা? গাড়িতে ওঠার সময়ও কেউ কি খেয়াল করেনি একবার? নিজের দোষটা একটুও মনে করতে চাইছে না সে। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ছে ভাই আর বন্ধুদের ওপর। কটিবন্ধ বেল্ট ব্যাগটাও গাড়িতে রয়ে গেছে৷ এ কী বিপত্তিতে পড়ল সে! তেইশ বছরের এত বড় একটা মেয়ে হয়েও নিজেকে এখন তেরো-চৌদ্দ বছরের হারিয়ে যাওয়া কিশোরী মনে হচ্ছে ওর, কান্না পাচ্ছে খুব।

তাদের গাড়ির পিছে কালো যে মাইক্রোটি থেমেছিল সেই গাড়ির কাছে ক’জন ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেকের মাথাতে সাদা টুপি, পরনের প্যান্টও টাখনুর ওপরে গুটিয়ে রাখা। প্রত্যেকেই ক্যাজুয়াল পোশাকে। ওদের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল দীধিতি। ওকে দু’জন দেখেও তেমন আকর্ষণ বোধ করল না। পথচারীদের যেমন গুরুত্বহীন নজরে দেখে মানুষ, ওরাও সেভাবেই দেখে নজর ফিরিয়ে নিয়েছে। ওদের সব লক্ষ করে খারাপ মনে হলো না। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করল ওদেরকে দীধিতির। এগিয়ে এসে কণ্ঠে বেশ জড়তা নিয়ে সে ডেকে উঠল ওদের উদ্দেশ্যে, ‘একটু হেল্প করবেন ভাইয়া।’
কোনো জরুরি বিষয়ে মনে হচ্ছে কথা বলছিল ছেলেগুলো। ওর ডাক শুনতে পেল কিনা, কিংবা শুনেও পাত্তা দিলো না নাকি, বুঝতে পারল না দীধিতি। খুব বেশি বিব্রতবোধ করছে সে। এরা সাহায্য না করলে উপায়ও নেই কোনো। দ্বিধা নিয়ে আবার ডেকে উঠল, ‘ভাইয়া? প্লিজ একটু হেল্প করবেন?’
প্রথম ডাকে একজনও তাকায়নি। দ্বিতীয়বার কি অনেক জোরে ডেকেছে সে যে সবাই এক সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ওর দিকে? এতে আরও বেশি বিব্রত হয়ে পড়ল সে৷ একজন জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘কী হেল্প প্রয়োজন?’
একটু সংকোচ কমল দীধিতির, জবাব দিলো, ‘আপনাদের গাড়িটার সামনেই একটা সাদা গাড়ি ছিল।’
সেই ছেলেটিই কথা বলতে থাকল, ‘ছিল। একটু আগেই চলে গেছে ওটা।’

-‘গাড়িটা আমার ছিল৷ মানে আমার বন্ধুরা…’
-‘ঘটনা হলো আপনাকে রেখেই দৌঁড়েছে ওরা, তাই তো?’
অসহায় চেহারায় মাথা ওপর নিচ করে হ্যাঁ জানাল দীধিতি। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল এবার, ‘তো আমাদের থেকে কেমন হেল্প আশা করছেন আপু?’
-‘আমি একটা কল করতে চাইছি৷ আমার ব্যাগটাও থেকে গেছে গাড়িতে।’
বলতে দেরি ছেলেটি ফোন এগিয়ে দিতে দেরি করল না।
বিপদে পড়লে বিপদ কি চারপাশ থেকেই জাপটে ধরে? এক পাশও ফাঁক রাখে না, যে সেই ফাঁক থেকে উদ্ধার হওয়া যাবে। কল রিসিভ হলো না ওপাশ থেকে। নিশ্চয়ই গাড়িতে গান বাজিয়ে নাচানাচি করছে ওরা! ফোনটা সব সময় হাতের মধ্যে রাখলেও দরকারের সময় মানুষ ফোন থেকে শত শত মাইল দূরে থাকে যেন। কতক্ষণই বা এই ছেলেগুলোকে দাঁড় করিয়ে রাখবে সে? ছলছল চোখে ছ’জনের নাম্বারে ছ’টা মেসেজ পাঠিয়ে দিলো। নাম্বারগুলো ডিলিট করল না, যাতে ছেলেগুলো ওকে কোনো ধান্ধাবাজ না ভাবে। ওদেরকে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না ওরা কেউ রিসিভ করছে না কেন? আমি মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনারা…’
কথাটা সম্পূর্ণ করার পূর্বেই একটা ভারী কণ্ঠ ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, ‘মেসেজের রিপ্লাই আসা অবধি দাঁড়িয়ে থাকব?’

কণ্ঠটাই রাগ, বিরক্ত টের পেয়ে কেন যেন দীধিতির কান্না পেল খুব। চোখে জমে থাকা জলসাগর থেকে এক ফোঁটা জল টুপ করে গড়িয়ে পড়ল গাল বেঁয়ে। ছেলেটির দিকে তাকানোর সাহস পেল না সে, বলল, ‘আমি এমন কিছু অনুরোধ করতে চাইনি। আমি মেসেজে জানিয়ে দিয়েছি এখানকার কথা৷ ওই দোকানে বসে অপেক্ষা করব ওদের ফেরা অবধি। এইটুকু উপকার করেছেন তাই থ্যাঙ্কস বলতে চাইছিলাম।’
ভারী কণ্ঠটা থেকে কোনো জবাব এল না। গাড়ির দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে এবার দীধিতি তাকাল। ছেলেটি বোধ হয় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেছে। সে আর দাঁড়াল না। রাস্তার ডান পাশে চলে গেল, দোকানটার ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াল। ছ’সাতজন ছেলে ছিল ওরা। ওদেরকে গাড়িতে উঠে পড়তে দেখল সে। নিজের ওপর আর নিজের সঙ্গীদের ওপর তীব্র ক্রোধ হচ্ছে ওর।

ড্রাইভিং সিটে বসে রাতুল জানালার বাইরে চেয়ে দীধিতিকে দেখতে থাকল। পাশের সিটে বসা তার বন্ধু নাওফিলকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে পড়ে পেছনে ঘুরল। দীপ্ত, শিহাব, সবুজ, রুমান, তুষার, প্রত্যেকেই দীধিতিকে দেখছে। নিজেদের মাঝে আলোচনা করছে ওকে নিয়ে। রাতুল নিজের ফোন চেক করল কোনো মেসেজের রিপ্লাই এল কিনা। সেও কল করল ওদের নাম্বারে দু’বার। কোনো জবাব নেই। কখন দেখবে কল, মেসেজ আর কখন মেয়েটাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এই আশায় কি ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে ওদের? কক্সবাজার যাচ্ছে ওরা। মেয়েটার গাড়িও তাদের গাড়ির পাশাপাশিই আসতে দেখেছিল। গন্তব্য ওদেরও হয়তোবা ওদিকেই। মেয়েটাকে সাহায্য করার চিন্তা করলে ওদের গাড়িতে তুলতে হবে। কিন্তু গাড়িতে তো শুধু ওরা ব্যাচেলর নেই। শিহাবের বাবাও সিটের পিছে বমির ওষুধ খেয়ে মহিষের মতো পড়ে ঘুমোচ্ছে। লোকটার বয়স পঞ্চান্নর কোঠায় হলেও মনটা এখনো তাদের মতো প্রাণবন্ত, উজ্জীবিত। বাচ্চাদের মতো বায়না ধরেছিলেন ওদের সঙ্গে ট্রিপে আসার জন্য। মানুষটাও খুব রসিক। জেগে থাকলে এতক্ষণে পুরো গাড়ি মাতিয়ে রাখতেন। এতগুলো ছেলের মধ্যে হঠাৎ একটা মেয়ে দেখলে নির্ঘাত হকচকিয়ে যাবেন, সন্দেহও করতে পারেন ওদের। নাওফিল কোনো সিদ্ধান্ত পেশ করলেও একটা গতি হতো মেয়েটার। এ চিন্তাটা করেই রাতুল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল নাওফিলকে। নাওফিলও তখনি ফোন থেকে নজর উঠিয়ে তাকাল ওর দিকে, জানালা দিয়ে তাকিয়ে একবার দীধিতিকেও দেখল৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে বোধ হয় সে। আস্ত একটা হাদারাম!

বিড়বিড় করে গালিটা দিয়ে নাওফিল বলল, ‘কেউ ডাক মেয়েটাকে। দ্যাখ আমাদের সাথে যেতে রাজি হয় কিনা।’
বন্ধুগুলো এমন একটি কথা শোনার অপেক্ষাতেই ছিল যেন। রাতুলই ডেকে উঠল দীধিতিকে, হাতের ইশারাতেও ডাকল। দীধিতি ভাবল ওর বন্ধুদের থেকে নিশ্চয়ই কল এসেছে। দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকল সে। সন্ধ্যা মরে চারপাশে আঁধার নামবে নামবে ভাব। হঠাৎ গা ছুঁয়ে তুমুল বাতাস অনুভব করল দীধিতি। গরমের মাঝে এই বাতাসটুকু ভালোই লাগল ওর। গাড়ির কাছে এগিয়ে আসতেই সত্যি সত্যি রাতুলের ফোন বেজে উঠল। দীধিতির বন্ধুদের থেকেই কলটা এসেছে। কল রিসিভ করে রাতুল ফোন এগিয়ে দিলো ওকে। ফোনের ওপাশ থেকে ব্যক্তিটি দীধিতি বলে জিজ্ঞেস করে উঠতেই দীধিতি জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ আমি৷ তোদের এতক্ষণে খেয়াল হলো আমি নেই?’
দু’মিনিট কথা হলো। দীধিতি রাতুলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলো বন্ধুকে৷ অনেক দূর এগিয়ে গেছে ওরা৷ যেহেতু বিশ্বস্ত কারও সাহায্য পেয়েছে দীধিতি, তাই তাদের সঙ্গে করেই আসতে বলল সামনের একটা রেঁস্তোরা অবধি। সেখানেই ওরা অপেক্ষা করবে বলে জানাল। রাস্তার পাশ থেকে বাম পাশে ঘুরে এসে ওকে গাড়িতে উঠতে বলল রাতুল। ছেলেগুলোকে একটু আগেও বিশ্বাস হলে এখন হঠাৎ ভয়, অস্বস্তি, অবিশ্বাস সবই হচ্ছে দীধিতির। ওর গাড়িটা একটু ফিরে এলে কী এমন দেরি হতো?

নাওফিল তার পাশের জানালা দিয়ে দীধিতির দিকে তাকাতেই আতঙ্কে চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলল। সে খেয়াল করল না তার বন্ধুরাও তারই মতো বিস্ময় আর ভীত চোখে চেয়ে আছে দীধিতির দিকে। দীধিতির হঠাৎ মনে হলো পেছন থেকে কেউ এক গুচ্ছ চুলের আগা টেনে ধরেছে ওর৷ দাঁড়িয়ে পড়ল ও…সারা শরীরে শিরশিরে বাতাস বইছে…হিমশীতল বাতাস…খুব শীত অনুভব হলো। আশেপাশে কেউ ছিল বলে তো দেখেনি। তাহলে চুল টেনে ধরল কে? পেছন ফিরে তাকানোর জন্য ঘাড় ফেরানোর পূর্বেই নাওফিল ধমকাল ওকে, ‘গাড়িতে উঠতে কি বছর সময় লাগাবেন?’

কয়েক মুহূর্ত আগে এই কণ্ঠটারই ঝাঁঝালো কথাগুলো শুনেছিল সে৷ চট করে নাওফিলের দিকে তাকাল ওকে দেখার জন্য৷ গাড়িতে আলো জ্বলছে। সুন্দর দেখতে লম্বাটে মুখটার দিকে তাকিয়ে ভয় লাগল ওর। ছোটো ছোটো চোখদু’টোর কী গরম চাউনি! দ্রুত পায়ে ভেতরে এসে বসে পড়ল। নাওফিল এখনো সেদিকেই চেয়ে আছে শীতল চোখে। যেখানে লাল শাড়ি পরা খোলা চুলের বিদঘুটে কালো দেখতে খারাপ কিছু একটা দাঁড়িয়ে ছিল দীধিতির পিছে। পেছনে ঝুঁটি বাঁধা দীধিতির লম্বা চুলের আগা টেনে ধরে রেখেছিল ছিল সেই জিনিসটিই। সে চেঁচিয়ে উঠতেই চোখের সামনে এমনভাবে মিলিয়ে গেল ওটা যেন যা দেখেছিল সে তার সবটাই চোখের ভুল ছিল।

দীধিতি খেয়াল করল নাওফিল ব্যাতিত সবগুলো ছেলে তার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে, ভীত চাউনি প্রত্যেকের। এদের চাউনির অর্থ ভিন্ন কিছুই ধরে নিলো সে। কিন্তু সে তো বিশ্বাস করেছিল ওদেরকে। রাতুল চোখ ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত গাড়ি ছাড়ল, বাকিরাও নিজেদের মধ্যে কথায় ব্যস্ত হলো তখন৷ একটু আশ্বাস পেল দীধিতি, ইন শা আল্লাহ ছেলেগুলো তার কোনো ক্ষতি করবে না৷ ভয়, সংকোচ, দ্বীধা ফেলে সিটে গা এলিয়ে জানালার দিকে মুখ করে বসল সে। চোখে মুখে বাতাস ঝাপটে আসতেই কেমন মাতাল মাতাল অনুভব হতে লাগল ওর। মাথাটাও সিটে এলিয়ে দিলো ক্লান্ত ভঙ্গিমায়। ভাবল রেঁস্তোরা পৌঁছনো অবধি একটু চোখের বিশ্রাম দেবে। কিন্তু গাড়িতে ওঠার পূর্বেও সে ভেবে রেখেছিল ভীষণ সতর্ক হয়ে থাকবে, এবং জানালার কাছেই বসবে সে। আর ঘুমানোর চিন্তা করা তো দূর৷ ঝিমিয়ে আসা চোখদু’টো কিছুক্ষণ খুলে রাখার চেষ্টা করতে করতে হঠাৎ বাইরের দিকে চোখ পড়তে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল ও। সেই মুহূর্তে রাতুলেরও কী যেন হলো৷ বহু কষ্টে গাড়ি হার্ডব্রেক করল। পেছনে গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা জয়নাল উদ্দিনের ঘুম ভেঙে গেছে। চিৎকারের আওয়াজ আর গাড়ি ব্রেক কষার ফলে সে ধরেই নিলো গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে৷ সবাইকে একে সঙ্গে গালি দিয়ে উঠল সে, ‘ছাগলের বাচ্চারা কাকে গাড়ির নিচে ফেললি?’
শিহাব জবাব দিলো, ‘কাউকেই না আব্বা৷ আপনি ঘুমান।’

-‘কাউকেই না? কে যেন ক্যাক করে উঠল শুনলাম!’
রুমান ইশারায় শিহাবকে বোঝাল, জয়নাল উদ্দিনকে ঘুম পারিয়ে রাখার জন্য।
দীধিতি চোখ, মুখ ঢেকে ভীষণ ভয় নিয়ে গুটিয়ে বসে আছে। নাওফিল ওর দিকে ফিরে একবার দেখে তারপর রাতুলকে চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছিল? রাস্তা খারাপ না কি?’
-‘রাস্তা তো খারাপ দেখলাম না।’
-‘তাহলে ওরকম হলো কেন? রাস্তা খারাপ থাকলে গাড়ি ওভাবে উঁচু নিচু হয়।’
-‘ভাই, বিশ্বাস করবি কিনা জানি না। মনে হলো স্টিয়ারিং অন্য কেউ কন্ট্রোল করছিল এলোমেলোভাবে। খুব কষ্টে নিজের কন্ট্রোলে এনে ব্রেক করলাম। মেয়েটা ওইভাবে চেঁচিয়ে উঠল কেন?’
-‘গাড়ি ছাড়।’

গাড়ি আবার চলতে আরম্ভ করল৷ দীধিতির পাশেই দীপ্ত বসে আছে। শিহাবের বাবা আবার চোখ বুজেছেন দেখে সে জিজ্ঞেস করল দীধিতিকে, ‘আপনি চেঁচালেন কেন ওভাবে?’
ভয়ে গলা শুকিয়ে এসেছে দীধিতির। সে যা বলবে তা কি বিশ্বাস করবে ছেলেগুলো?
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে নাওফিলও জিজ্ঞেস করল এবার, ‘চিৎকার করলেন কেন তখন?’
যা দেখেছে সেটাই বলে দেবে ভাবল দীধিতি। নাওফিলের দিকে চেয়েই জবাব দিলো, ‘জানালার বাইরে চেয়ে ছিলাম। খুব বিচ্ছিরি দেখতে কিছু একটা হঠাৎ আমার চোখের সামনে পড়ল। মনে হচ্ছিল গাড়ির সঙ্গেই উড়ে উড়ে আসছে। চুলও উড়ছিল। গায়ে লাল শাড়ির মতো কিছু একটা ছিল, খুব কালো আর জিহ্বা অনেকখানি বের করে ঝুলিয়ে রাখা, ভয়ানক চোখে তাকিয়ে দেখছিল আমাকে।’
একই জিনিস গাড়ির ভেতরের প্রতিটা ছেলে দেখেছিল কিছুক্ষণ আগে, দীধিতির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। পেছন সিটে বসা তুষার। সে জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘আগেও কি এমন কিছু দেখেছেন কখনো?’
প্রশ্নটা শুনে একটু স্বস্তি পেল দীধিতি, তার কথা তাহলে বিশ্বাস করেছে ওরা।
-‘না, এমন কিছু আগে কখনো আসেনি চোখের সামনে।’
নাওফিলের দিকে তাকাল তুষার৷ সে তাকিয়েই ছিল দীধিতির দিকে। বন্ধুদের বলল, ‘জানালাগুলো বন্ধ করে দে।’
সবাই জানালা বন্ধ করতেই এসি চালু করে দিলো রাতুল। নাওফিল এবার জিজ্ঞেস করল দীধিতিকে, ‘গাড়ি থেকে কি একাই নেমে ছিলেন তখন?’

-‘হ্যাঁ।’
-‘কেন? মসজিদের গিয়ে নামাজ পড়ার জন্য?’
এমন প্রশ্ন আর নাওফিলের ঝাঁঝে ভরা কণ্ঠ শুনে দীধিতি বুঝতে পারল তাকে কটাক্ষ করেই প্রশ্নটা করা হয়েছে। কোনো উত্তর দিলো না।
-‘বাবা-মা বা বাড়ির মুরব্বিরা কোনোদিন বলেনি যে সন্ধ্যার সময় চুল ছেড়ে ঘরের বাইরে যেতে নেই? মাথায় কাপড় দিয়েও নামেননি। বড়ো কোনো সমস্যাতে পড়লে এত ফ্যাশন আর আসবে না।’
এসব কথার বিপরীতে কী বলা যায় ভেবে পেল না সে। এরকম নিষেধাজ্ঞা সে বাড়ি থাকতে অনেকবারই শুনেছে আর মানতে বাধ্যও হয়েছে৷ কিন্তু ভাবেনি এগুলো আসলেই মেনে চলা উচিত। ঠোঁট কামড়ে মাথা নুইয়ে রইল নীরবে। কয়েক পলের নীরবতা কাটিয়ে নাওফিল জিজ্ঞেস করল, ‘আয়তুল কূরসি জানা আছে?’
-‘গাড়িতে উঠেই পড়েছিলাম।’

তুষার পেছন থেকে মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘কাজে লাগেনি। পড়ায় ত্রুটি ছিল হয়তো।’
নাওফিলের কানেও পৌঁছল কথাটা। সেও বলল, ‘ওটাই হবে। ঈমানেও ত্রুটি থাকতে পারে।’
তারপর আবার প্রশ্ন ছুঁড়ল দীধিতিকে, ‘নামাজ-কালাম পড়া হয় নিয়মিত?’
উত্তরে ঘাড় নাড়িয়ে না বলল সে।
আর কিছু বলল না কেউ। একটু পর রাতুল জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘কিছু কি চোখে পড়েছিল তোর মেয়েটা যখন গাড়িতে উঠছিল?’
বিস্মিত চোখে তাকাল নাওফিল, ‘তুইও দেখেছিলি?’
-‘হ্যাঁ, খারাপ কিছু আছে বোধ হয় ওর সঙ্গে।’
-‘আগে থেকে ছিল না। আজকেই নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। জিনিসটা আসলেই খারাপ।’
-‘সমস্যা খারাপ পর্যায়ে যাবে। সহজে পিছু ছাড়বে না। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস কর দোয়া কালাম কিছু শেখা আছে কি না।’
-‘এসব বললে ভয় পেয়ে যাবে উলটো। গাড়ি থেকে নামার পর বলা যাবে।’
-‘গাড়িতেও ঝামেলা করে দিয়েছিল। বুঝতে পারছিস কী সাংঘাতিক জিনিস?’
-‘হুঁ।’

সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীধিতির শরীর খারাপ হতে থাকল। খুব শীত লাগছে তার, গায়ে কাঁপুনি উঠে গেছে। দীপ্ত শুরু থেকেই আড়নজরে দেখে যাচ্ছিল ওকে। ব্যাপারটা খেয়াল করল সে। মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ছে না কি ভাবতে ভাবতেই নাওফিল পিছু ঘুরল। দীপ্ত ইশারায় দীধিতির দিকে তাকাতে বলল ওকে। দীধিতিকে দেখে সে আস্তেই বলে উঠল দীপ্তকে, ‘জ্বর লাগছে বোধ হয়।’
-‘বুঝব ক্যামনে?’
-‘জিজ্ঞেস কর।’
জোরে আওয়াজেই ডেকে উঠল ওকে দীপ্ত, ‘এই আপু, আপনার কি খারাপ লাগছে?’
দীধিতি একবার তাকিয়ে চোখদুটো বুজে ফেলল, জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বলল, ‘শীত করছে খুব।’
এসি অফ করে দিলে তো গরমে সিদ্ধ হবে সবাই। জয়নাল উদ্দিনের ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটে জেগে যাবেন। ভালো বিপত্তি ঘটে গেল এবার! রাতুল গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলো জলদি রেঁস্তোরায় পৌঁছনোর জন্য৷ এসি তো অফ করা যাবে না। সবার ব্যাগপ্যাক একদম পেছনের সিটে। যে সিটের পুরোটা জুড়ে জয়নাল উদ্দিন শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। শিহাব হাতের কাছে যার ব্যাগটা পেল তার ব্যাগ থেকে খুঁজে সাদা একটা তোয়ালে নিয়ে দীধিতিকে ডাকল। ও পেছন ফিরে তাকাকেই তুষার তোয়ালেটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটু মোটা আছে এটা। গায়ে জড়িয়ে নিন। এসি অফ করলে আমরা গরমে টিকতে পারব না।’

কথা বাড়াল না ও। বিনা বাক্যে তোয়ালেটা গায়ে জড়িয়ে নিলো। কিন্তু তার খুব খারাপ লাগছে, ইচ্ছা করছে শুয়ে পড়তে। ভাব সুবিধার না তা দীপ্ত বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘বমি-টমি করবেন না কি আবার? এমন কিছু হলে আগে ভাগেই বলে দিয়েন।’
মাথা নেড়ে না বোঝাল দীধিতি। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে তার। তোয়ালেতে কোনো কাজ হবে না৷ আরও উষ্ণতা প্রয়োজন। হঠাৎ করে শরীরের এমন অবনতি দেখে নিজেও বেশ চিন্তাতে পড়ল সে। এতগুলো ছেলের মাঝে এই অবস্থায় পড়ে থাকলে কখন কী হয়ে যায় তার সঙ্গে, তা তো বলা যায় না। ছেলে মানুষ বলে বিশ্বাস নেই।
তুষার নাওফিলকে বলল, ‘ভাই, কন্ডিশন সিরিয়াস। আরও খারাপ দিকে যাবে বলে মনে হচ্ছে।’
-‘তো কী করব? ডাক্তার তো আর না যে ট্রিটমেন্ট দেবো।’

বাকিরা সন্ধ্যায় ওই খারাপ জিনিসটা দেখার পর থেকে নিথর হয়ে বসে সব দেখছে শুধু। ভুল করেও দীধিতিকে নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না তারা৷ তাদের ধারণা, যখন তখন ওই খারাপ জিনিসটা দীধিতির ঘাড়ে চেপে বসবে। তারপর দীধিতি ওটার মতোই জিহ্বা বের করে তাদের সামনে ভেলকি দেখাবে। ভয়ে তটস্থ হয়ে আছে ওরা।
নাওফিলের দিকে বিরক্তি নিয়ে চেয়ে তুষার বলল, ‘ডাক্তারের ট্রিটমেন্ট দরকার এখন?’
-‘একটু ফুঁ ফা দিয়ে দে ভাই।’ এতক্ষণে রুমান কথা বলল।
সবার হাসি পেলেও নাওফিল মহা বিরক্ত নিয়ে চেয়ে আছে দীধিতির দিকে। রাতুল তা দেখে মিটমিট করে হেসে ওকে বলল, ‘তুই কি একটু পাশে গিয়ে বসবি ভাই? দোয়া-দরুদ পড়ে ফুঁ টা তুই-ই দিয়ে আয়।’
দীধিতির দিকে একবার সাবধানী চোখে চেয়ে দীপ্তও হাসতে হাসতে নাওফিলকে বলল, ‘আমাকে শিখিয়ে দে, আমি দিচ্ছি।’

সবুজ বলল এবার, ‘আমাদেরও শেখা। সবাই এক সাথে ফুঁ দিই।’
না হেসে পারল না কেউ।
অপরিচিত কোনো মেয়েকে যতটুকু সাহায্য করা যায় ততটুকুই করেছে ওরা। হালকা খাবারসহ প্যারাসিটামল খাইয়ে দেওয়া হয়েছে দীধিতিকে। খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল অদ্ভুত এক অনুভূতি পেয়ে। অনুভব করছে সে, ঠান্ডা অল্প অল্প বাতাস পড়ছে তার কপাল আর চোখে, মুখে। পরক্ষণে বুঝতে পারল কেউ ফুঁ দিচ্ছিল৷ চোখ মেলে তাকাতেই গাড়ির মাঝে অন্ধকার দেখতে পেল সে। তবে রাস্তার আশেপাশের জায়গাগুলো থেকে আলো এসে পড়ছে ভেতরে।

তার ডান পাশেই বসা একজন মানুষের উপস্থিতি টের পেল সেই আলোতে, চকিতে মাথা তুলল আর দেখতে পেল ঝাঁঝালো কথার মালিক সামনের দিকে মুখ করে মেরুদণ্ড টানটান অবস্থায় রোবটের মতো শক্ত হয়ে বসে আছে। সে সোজা হয়ে বসতেই ওকে আরেকবার ভয় পাইয়ে দিলো নাওফিল। ওভাবে শক্ত হয়ে বসেই সামনে চেয়ে রয়ে বিরক্ত নিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল ওকে ‘রেঁস্তোরায় চলে এসেছি। গাড়ি থেকে নামুন এবার।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here