Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২২
ইসরাত জাহান দ্যুতি

অনায়াসে গড়িয়ে পড়া চোখের পানি মুছে নিয়ে দীধিতি জানতে চাইল, ‘তারপর বলো আন্টি?’
ফোনের ওপাশে তখনও একান্ন বছর বয়সী জাইমা কেঁদে চলেছেন মুখ চেপে ধরে। কিছুটা শান্ত হওয়ার পর ভেজা কণ্ঠেই বললেন, ‘রেজা তোমাকে নিয়ে খুব ঘিঞ্জি একটা এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতে শুরু করল৷ ওর গোয়েন্দা বিভাগে কিন্তু পদন্নোতি ঘটেছিল জায়িনের অপকর্মের সমস্ত প্রমাণ সাবমিট করার জন্য। কিন্তু তোমার জন্য ওকে চাকরি থেকে আপাতত অব্যহতি নিতে হয়েছিল। ওকে আর্থিক সহায়তা করত অবশ্য একজন। নাম রাজেশ মল্লিক। এই গোয়েন্দা অফিসারই জায়িনকে এক্সপোজ করেছিল দেশের সামনে।

মাস দুই পর আলিয়া যখন জানাল জায়িনের বন্ধুরা ফিরে এসেছে অস্ট্রেলিয়া, তখন রেজা তোমাকে নিয়ে ভালো পরিবেশে ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করে৷ তোমাকে নিয়ে ও এতটাই ভয়ে থাকত যে তোমাকে দেখাশোনার জন্য কোনো আয়া রাখতেও রাজি ছিল না। আমার সঙ্গে যোগাযোগ হলে আমি শেষমেশ ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে বললাম। সত্যি বলতে কী জানো, আমি দেড় বছরে ভালোবেসে ফেলেছিলাম রেজাকে। ওর মুখে ওর ভালোবাসার মানুষটার কথা যেদিন শুনলাম, সেদিন বুক ভেঙেচুরে কান্না পাচ্ছিল। তাই বলে তোমার প্রতি আমার এক বিন্দু ভালোবাসাও কমেনি। রেজাকে কোনোদিন জানাইনি, আমি ধর্ষিতা অযোগ্য জাইমা তাকে খুব ভালোবাসি। রেজা রাজি হচ্ছিল না বিয়ে করতে। তারপর রাজেশ মল্লিকের পরামর্শে আর বোঝানোর ফলে বিয়ে করতে রাজি হয় ও৷ ঝুমুরকে সিলেক্ট করে দিয়েছিলেন তিনিই। বিয়ে করার পরই রেজা ঝুমুরের সঙ্গে থাকত না৷ কাজের বাহানায় তোমাকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটেই থাকত।

তারপর রাজেশ মল্লিকের নির্দেশে একজন আয়া রাখে রেজা তোমার জন্য। আয়ার কাছে রেখে ও ঝুমুরের সঙ্গে দেখা করতে যেত ঝুমুরের বাড়িতে। ঝুমুরকে তখনও জানতে দেয়নি রাজেশ মল্লিক তোমার কথা৷ বিয়ের একটা দুটো মাস এভাবেই চলছিল। ওদিকে ঝুমুর অধৈর্য হয়ে পড়ছিল রেজাকে কাছে না পেয়ে। ও স্বাভাবিক সংসার চাইছিল৷ এর মাঝে আবারও দেশে আসে জায়িনের বন্ধুরা। সব কিছু চিন্তাভাবনা করে শেষে রাজেশ মল্লিক বুদ্ধি দেন রেজাকে যশোর চলে যাওয়ার জন্য৷ সেখানে থাকার ব্যবস্থা, জীবিকার ব্যবস্থা, সবই তিনি করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন। তোমার কথা চিন্তা করে রেজা চলে যায় যশোর। ঝুমুরকেও নিয়ে যায় সাথে। তবে ঝুমুর যখন তোমার কথা জানতে পারে তখন সে তোমাকেসহ রেজাকে না পারছিল মানতে, না পারছিল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। যাকগে, এ ব্যাপারে কিছু না বলি। এরপর আমি সুযোগ পেলেই এসে দেখে যেতাম তোমাকে। তাতে ঝুমুর অসন্তুষ্ট হলেও আমার করার কিছু ছিল না। ও হ্যাঁ, ঝুমুর জানত আমার আর রেজার সম্পর্কের কথা৷ ও রেজাকে খুব পছন্দ করে ফেলেছিল বলে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে রেজাকে বিয়ে করে৷ ঝুমুরের বাবার বাড়িতে কিন্তু রেজাকে মেনে নিতে পারেনি ওর ব্যাপারে সব কিছু জেনে। কিরণ হবার পর তারা সব স্বাভাবিক করেছে। এমন করেই বছর চার আমি দেশে এসে তোমাকে দেখে গিয়েছি। কিন্তু আমার জন্য ঝুমুর আর রেজা সংসারে অশান্তি তৈরি হতে থাকে জটিলভাবে৷ বুকে পাথর চেপে তখন সিদ্ধান্ত নিই, আর আসব না দেশে৷ যেদিন তুমি অ্যাডাল্ট হবে সেদিন তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব।’

-‘বাবার মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক ছিল, আন্টি?’ কম্পিত স্বরে শুধায় দীধিতি।
সে প্রশ্নকে অবহেলা করে জাইমা অনুরোধ গলায় আবদার ধরে, ‘আমাকে সেই দেড় বছরের স্মরণের মতো মাম্মাম বলে ডাকবে, সোনা? তোমার মুখের প্রথম বুলি ছিল মাম্মাম।’
-‘মাম্মাম! আ’ম স্যরি৷ আমিও আন্টি ডাকতে চাইনি। আন্টি ডেকে একটুও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। মাম্মাম বলেই ডাকব তোমাকে। এবার বলো না আমার বাবার মৃত্যু কি স্বাভাবিক? তাকে হত্যা করেছে জায়িন মাহতাব, তাই না?’
জাইমা নিশ্চুপ বনে গেলেন। তা দেখে দীধিতির সন্দেহ আরও গাঢ় হলো, ‘বলো প্লিজ, মাম্মাম৷ আজ সব অজানা সত্য প্রকাশ হোক।’

সত্যিই আজ সবটা জানানোর সময় চলে এসেছে। জাইমা চুপ থেকে প্রস্তুত করে নিলেন নিজেকে। তারপর ঢোঁক গিলে শীতল গলায় বললেন, ‘হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেটা জায়িন কি না জানি না। কারণ, স্বশরীরে জায়িন দেশে আসেনি আর। ব্রিজের ওপর ড্রাইভিং করে যেদিন কাজ থেকে ফিরছিল রেজা যশোরে, সেদিন ওর গাড়িটাকে পেছন থেকে ট্রাক এসে ধাক্কা মেরে। ব্রিজের রেলিং ভেঙে নদীতে পড়ে রেজা গাড়িসহই। নিশি রাতের আঁধারে ট্রাক চালক ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে বোধ হয় শুধু পর্যবেক্ষণ করেছিল গাড়িটা নদীতে পরেছে কি না! কিন্তু আল্লাহ যাকে বাঁচিয়ে রাখতে চান তাকে মারার ক্ষমতা কার? রেজা গোয়েন্দা সংস্থার একজন দক্ষ এজেন্ট। প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করে বেঁচে ফেরার প্রশিক্ষণ সে সেই রাতেই কাজে লাগায়৷ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই পানিতে ডুবে যাওয়া গাড়ির ডোর ওপেন করে বেরিয়ে আসে। বসন্তকাল, নদীতে পানি কম ছিল বলেই সেদিন সাঁতরে পাড়ে আসতে পেরেছিল। রাজেশ মল্লিককে ইনফর্ম করে পাড়েই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে। সেখানে রাজেশ মল্লিক পৌঁছনোর পর ওকে হসপিটালে নিলেও ডক্টর জানায় ও ব্রেইন স্ট্রোক হয়ে গেছে। মৃত্যুর মুখে গিয়েও বোধ হয় তোমার চিন্তা করেই নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারেনি। রাজেশ মল্লিক কী করবেন ওকে নিয়ে? ওই মুহূর্তে তার আমার কথায় মনে আসে। ঝুমুরকে জানাতে চাননি তখন তিনি।

ঝুমুর জানলে যদি শত্রুরাও খোঁজ পেয়ে যায়! সেই ভয়ে আমাকে দেশে আসতে বলেন৷ আমি ওই রাতের ফ্লাইটেই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হই। হসপিটালে আসার পর অনেক চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিই, রেজাকে চিকিৎসা করাব মুম্বাইতে ফিরে। রাজেশ মল্লিকও রাজি হন। আমি রেজাকে নিয়ে চলে আসি এখানে৷ ট্রিটমেন্ট শুরু করি ওর। বারোদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর রেজা পৃথিবী ছাড়ে। ওর লাশটা আমি আর দেশে নিয়ে যেতে দিইনি। আমার সারা জীবনের প্রাপ্তির মাঝে ও আর তুমি ছিলে বড়ো প্রাপ্তি। তাই আমার এখানেই ওকে কবর দিই। এটুকুই আমার সারা জীবনের সান্ত্বনা। আর পারিনি নিজেকে অন্য কারও সাথে জড়াতে। সারা পৃথিবীর কাছে জায়িন মাহতাব প্রথমে হিরো হলেও পরবর্তীতে শয়তান রূপে নিজেকে প্রকাশ করে। জায়িনের কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। ছিল শুধু একজন সুন্দর মনের নারীর ভালোবাসার। অথচ রেজার মতো একজন সামান্য, এতিম, অসহায়, অসুন্দর ছেলেকে ভালোবেসেছিল তিনজন নারী। যাদের আজও ওর জন্য বুকের মধ্যে পোড়ে। একজন শ্রেষ্ঠ বাবা বলেই তারা সন্তানরাও তাকে মিস করে৷ আমার জীবনের এই গল্পে অলরাউন্ডার, সুপারহিরো জায়িন মাহতাব নয়। যে চাইলে সব কিছু হাসিল করতে পারে৷ আমি বিশ্বাস করি এই গল্পে সুপারহিরো যদি হয় কেউ, সে কেবল আমার স্বামী রেজা হক।’ আবারও ডুকরে কেঁদে উঠলেন জাইমা।

-‘মাম্মাম, তুমি আর কেঁদো না। আমি নিশ্চয়ই আসব একদিন তোমার কাছে। আমার জন্মদাতার পরিচয় জানার পর আর বাবার হত্যাকারীকে খুঁজে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পর একদিনও অপেক্ষা করব না তোমার কাছে আসতে। নিজেকে কলঙ্কিত করে, মনের বিরুদ্ধে কারও বউ সেজে শেখ পরিবারে প্রবেশ করার পর আমি পারব কি না তাদের পরিচয় জানতে, জানি না। শেখ পরিবারে টিকে থাকাটা আমার জন্য খুব কঠিন হবে৷ দোয়া কোরো আমার জন্য৷ আম্মু এসব কিছু জানার পর খুব অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমি দুশ্চিন্তায় আছি শুধু তাকে নিয়ে।’
-‘জাকির শেখ অথবা নাওফিল নিশ্চয়ই জানবে। রেজার সঙ্গে জাকির শেখের যোগাযোগ ছিল। জাকির শেখ তো রেজার মাধ্যমেই নিজের ভাই সম্পর্কে সবটা জেনেছিল। রেজা দেশে ফেরার পর আমার ধারণা জাকির শেখও রেজাকে প্রোটেকশন দিয়েছিল। প্রায়ই রেজাকে কলে কথা বলার সময় শুনতাম জাকির ভাই বলে সম্বোধন করতে। আর সেটা জাকির শেখ ছাড়া অন্য কেউ হতেই পারে না। মাহতাব শেখও সবটা জানবেন বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু আমি শুধু তোমাকে নিয়ে চিন্তা করছি। শেখ পরিবার তোমার জন্য ভালো নাও হতে পারে। তোমার এখনই ও বাড়িতে প্রবেশ করা ঠিক হবে না হয়ত। তার আগে তোমাকে মজবুত হতে হবে সব দিক থেকে। যেন তোমাকে কেউ ক্ষতি করতে চাইলেও না পারে।’

-‘সেটা কী করে? আমার ব্যাপারে জাকির শেখ নিশ্চয়ই খোঁজ না নিয়ে বসে নেই। আমি রেজা হকের সন্তান। এটা জানার পর তিনি আমাকে কেমনভাবে গ্রহণ করবেন? ভালো না কি খারাপ? তা ঠিক বুঝতে পারছি না৷ এমনিতে তিনি কিন্তু আমাকে মোটেও সহ্য করতে পারেন না। নিজের পরিবারের ছেলেদের ভালোর জন্য তিনি বোধ হয় আমাকে খুন করতেও পিছুপা হবেন না।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২১

-‘তোমার পেছনে আমার অস্তিত্ব সব সময় থাকবে। তোমার ভালোর জন্য আমিও সব কিছু করতে পারি, সোনা৷ শেষকালে সবাই-ই স্বার্থপর রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এত ভালো মানুষ নাকি জাকির শেখ৷ অথচ নিজের ভাই, ভাইয়ের ছেলেদের জন্য সে যে কতটা খারাপ হতে পারে তা তোমার মাধ্যমেই বুঝলাম। বহুদিন যোগাযোগ হয় না রাজেশ মল্লিকের সঙ্গে। এতদিনে তিনি অবসর নিয়েছেন কি না জানি না৷ কিন্তু তোমার জন্য আমি আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করব, তোমাকে প্রস্তুত করতে। নিশ্চিন্তে থাকো, মা। তোমার মাম্মাম প্রাণ থাকতে কখনও তোমাকে একা হতে দেবে না। আমি খুব করে চাই তুমিও তোমার বাবার মতো অনেস্ট ইনটেলিজেন্স এজেন্ট হও। স্বয়ং রাজেশ মল্লিক তোমাকে তৈরি করবে।’
-‘আমার ফার্স্ট গোল তবে নিজেকে প্রস্তুত করা হোক। তারপর শেখ পরিবার হবে আমার ফাইনাল ডেসটিনেশন।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here