Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

অষ্টাদশী মেয়ে দীধিতি যেদিন জানতে পারে ঝুমুর, রেজা, কিরণ, কেউই ওর আপন মা-বাবা, বোন নয়, চুরমার হয়ে যাওয়া হৃদয়টা সেদিনই নিজের সঠিক পরিচয় জানার জন্য অস্বাভাবিক উদগ্রীব ছিল৷ ওকে ফোনের ওপাশ থেকে তখন সামলেছিলেন তখন জাইমা আর স্বশরীরে সৌরভ৷ হ্যাঁ, সৌরভও ওর জীবনের নির্মম সত্যটা জানে। কেবল জানাটুকু পর্যন্তই এগিয়েছিল সে।এরপর আর দীধিতি চায়নি সৌরভ ওর সুন্দর ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ না দিয়ে ওর ভাঙাচোরা অতীতের তালাশে সামিল হোক।

গুগল ঘেটে শেখ পরিবার সম্পর্কে যতখানি জানা সম্ভব, অতটুকুই জানিয়েছিলেন জাইমা ওকে। শিল্প মন্ত্রী মাহতাব শেখ আর তার বড়ো পুত্র এমপি জাকির শেখ এবং মেজ পুত্র জাহিদ শেখ পারিবারিক ব্যবসা সামলান। জাকির শেখের একমাত্র পুত্র নাওফিল শেখের পড়াশোনা ডুয়েটে চলছে তখনও। গাজীপুরেই তাই থাকে সে। এ ক’জন ছাড়া শেখ পরিবারের বাকি আর কোনো সদস্যের তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক চিন্তা আর পরিকল্পনা করে দীধিতি ঢাকাতে পড়াশোনা করতে আসে। জাইমা ওকে প্রথম টার্গেটে রাখতে বলেন নাওফিলকেই। ঢাকায় আসার পর ওই আঠারো বছর বয়সী দীধিতি চাইলেও নাওফিলের নাগাল অবধি পৌঁছতে পারেনি, সে ক্ষমতা আর সে উপায় ছিল না ওর। ভার্সিটিতে পড়ার মাস তিন পর পরিচয় হয় ওর তামান্নার সঙ্গে৷ মাস সাতেক পর বন্ধুত্ব হয় ওদের তন্বীর সঙ্গে। এরপর ঘোরাঘুরির নাম করে হলেও দীধিতি গাজীপুর ছুটত শেখ পরিবার সম্পর্কে জানতে৷ ডুয়েট ভার্সিটিতে তন্বীর চাচাতো ভাই পড়াশোনা করত।

তার সাথে পরিচিত হওয়ার সুবাদে ডুয়েটেও আসা যাওয়া শুরু করে ও, নাওফিলের হদিসও নিত এই ফাঁকে। মাঝেমধ্যে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে নাওফিলকে চোখের দেখাও দেখতে পেত সে। তামান্না আর তন্বী তখন জানত দীধিতি ফেসবুকে নাওফিলের ছবি দেখার পর থেকে নাওফিলকে ও খুব পছন্দ করে ফেলেছে৷ তাই সুযোগ পেলেই ডুয়েট ভার্সিটি ঘুরতে আসাটা ওদের কাছে মজাই লাগত বেশ৷ কিন্তু দীধিতির এ কথাটা যে একদম মিথ্যা, তা সর্বপ্রথম বুঝতে পারে তামান্না। সোশ্যাল সাইটে নাওফিলের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। শুধু ফেসবুক কেন ইনস্টাগ্রামেও না৷ দীধিতি কী করে তাহলে নাওফিলের সন্ধান পেল? প্রশ্নটা দীধিতিকে করতেই জবাবে এলোমেলো উত্তর দিয়েছিল তখন সে৷ যেটা বুঝতে পেরেও তামান্না আর ঘাটায়নি ওকে৷ জোর করে স্বীকারোক্তি নিতে চায়নি বলেই। তবে সত্যটা তামান্নাকে একদিন নিজে থেকেই জানায় দীধিতি। তন্বীও ওদের খুব ভালো বন্ধু। তবুও নিজের অসমাধিত অতীত আর নিজের জন্ম পরিচয় নিয়ে দ্বিধা আর হতাশায় ভোগার কথা সবাইকে বলতে দীধিতির খুব লজ্জাবোধ হত৷ তাই তামান্নাকে জানালেও তন্বীকে জানাতে ইচ্ছাটা হয়নি ওর। কিন্তু ওর এই সিদ্ধান্ত যে ভবিষ্যতের জন্য সঠিক ছিল তা আজ বুঝতে পারে দীধিতি। তন্বী শিহাবের সঙ্গে বিয়েতে আবদ্ধ হওয়ার পর বন্ধুত্বের চেয়েও যে স্বামী প্রেমে বেশি দুর্বল থাকবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাতে দীধিতির সম্পর্কে তন্বীর সবকিছু জানা থাকলে পরিকল্পনা নিমিষেই ভেস্তে যেতে পারত। হয়ত শিহাবকে এক সময় মনের ভুলে বলেও দিতে পারত।

বিবিএ প্রথম বর্ষের শেষ দিকে বন্ধুত্ব হয় ওদের তিনজনের ঐশীর সঙ্গে। দুই বছর ধরে দীধিতি শুধু দূর থেকেই দেখে গেছে নাওফিলকে। ওর কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভবই হয়নি। নাওফিলের সুন্দর মুখটা প্রতিদিন দেখতে দেখতে মনে ভালো লাগা তৈরি হলেও প্রেমে পড়ার মতো অতটা নাজুক ছিল না ওর অনুভূতি। তৃতীয় বর্ষের শেষদিকে ঐশী রুমানের সঙ্গে প্রেমে জড়ায়। এ কথা ঐশী জানানোর পূর্বেই দীধিতি, তামান্না আর তন্বী অনেকটা আন্দাজ করেছিল যে ঐশী কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। সেই ছেলেটা রুমান, তাও জানতে পেরেছিল ফেসবুকের স্বার্থেই। রুমান নিজে থেকেই ঐশীর বন্ধু বলে ওদের তিনজনকে ফেসবুকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠিয়েছিল একদিন। রুমানের প্রফাইল দেখেশুনে ভালো লেগেছিল বিধায় তিনজনই তার অনুরোধকে গ্রহণও করেছিল। তারপর থেকেই চোখে পড়ত ঐশী রুমানের আপলোড করা সমস্ত ছবিতে লাভ রিয়্যাক্ট দেয়। সেই সব ছবিতে মন্তব্য ছোঁড়াছুড়িও হয় দুজনের। ঐশী নিজে মুখে দুজনের সম্পর্কের কথা স্বীকার করার অপেক্ষাতে ছিল বলেই ওরা চুপচাপ ছিল সব বুঝেও।

হঠাৎ রুমান ওদের ছ’জন বন্ধুর ছবি যেদিন কভার ফটোতে আপলোড করে আর সেটা দীধিতির চোখেও পড়ে, সেদিন থেকেই শুরু হয় ওর চূড়ান্ত পরিকল্পনা। একে একে শিহাব, দীপ্ত, তুষার, সবুজ, সকলের ফেসবুক আইডিকেই অনুসরণ করতে থাকে সে। তারপর জানতে পারে ওদের বন্ধুমহলের কক্সবাজার ট্রিপের কথা। প্রস্তুতি নেয় দীধিতিও একই জায়গায় ট্রিপের জন্য। সেই সন্ধ্যায় নিজের ভ্রমণ গাড়ি মিস করা, নাওফিলদের কাছে সাহায্য চাওয়া, টুকরো টুকরো সব কিছুই পরিকল্পনার অংশ ছিল ওর। যা সম্পর্কে অবগত ছিল শুধুই তামান্না। তবে একটা ঘটনা, যে ঘটনা ওই সন্ধ্যায় দীধিতির মতো সাহসী মেয়েকেও আতঙ্কিত করেছিল। জিনে বিশ্বাস অটুট আছে দীধিতির। তাই বলে এমন অস্তিত্বের মুখোমুখি কখনও হতে হবে তা কল্পনাতেও ছিল না ওর। এই ঘটনার কথা নাওফিলদের ছাড়া আজও অন্য কাউকেই জানায়নি ও। অদ্ভুত এক সত্য যে, যতবার নাওফিলের কাছাকাছি থেকেছে ও, ততবারই ওর মনে হয়েছে ও আর নাওফিল ছাড়াও ওদের দুজনের আশেপাশেই আরও কারও অস্তিত্ব রয়েছে। শরীরটা কেমন ভার ভার লাগত তখন ওর। এমন উপলব্ধি হওয়ার কথাগুলোও কাউকে জানাতে পারেনি। এই উপলব্ধি ওর আদৌ সত্য কি না, এ নিয়ে সন্দিগ্ধ বলেই কারও কাছে প্রকাশ করার ইচ্ছা হয়নি মূলত৷ নিছক মনের ভুল বলেই তা এড়িয়ে গেছে ও।

পূর্ব পরিকল্পনা বদলে গেল তো সেদিন, যেদিন নিখোঁজ দীপ্তর পরিণতি স্বচক্ষে দেখল দীধিতি। লাশ নিয়ে নাওফিলের কাটাছেঁড়ার দৃশ্যটা দেখার পরও ও চেয়েছিল পরিকল্পনা বদলাতে। কিন্তু সেটা যে কেবলই সাজানো ছিল, তা জানার পর আর বদলায়নি কোনো ভাবনা৷ দীধিতি বিশ্বাস করত, নাওফিল শুধু নিজেকে ভয়ঙ্কর আর নিষ্ঠুর প্রমাণ করার চেষ্টায় করে। আদতে সে এমনটা না। এই বিশ্বাস থেকেই ও এতদূর এগিয়েছিল। কিন্তু যে ছেলে নিজের কলেজ জীবনের বন্ধুকে টানা তিনমাস ঘরবন্দি করে অমন বেহাল দশা করতে পারে তার, সে ছেলে কখনই কোমল মনের হতে পারে না। বরঞ্চ শুরুতে নাওফিলকে দীধিতি যেমনটা মনে করেছিল সাইকোপ্যাথ, ঠিক তেমনই সে। আর এমন মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে নিজের পরিচয় আর বাবার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে উপুর্যপরি ওকেই বিপদে পড়তে হবে। হতে পারে ওর সঙ্গেও খুব খারাপ কিছু করে ফেলল নাওফিল। তাই তো দ্বিতীয় টার্গেট হয় তাওসিফ এবং তাওসিফের মাধ্যমেই শেখ পরিবারে প্রবেশ করা৷ বড়ো ভাইয়ের বউ রূপে ওকে দেখে নাওফিল রেগে গেলেও কোনো ক্ষতি করার চেষ্টাও করতে পারবে না। এতদূর ভেবেই তাওসিফকে নিয়ে সেদিনের দুর্ঘটনাটা ঘটানো।

-‘দীধি! বিছানা ছাড় এবার। বিকাল হয়ে গেছে৷ আর কত শুয়ে থাকবি? তাওসিফ দেখা করতে এসেছে ছাদে। তোকে ডেকে দিতে বলল।’
জাইমার সাথে কথা বলার পর থেকে বিষণ্ন মন নিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেকুটে ঘুমিয়ে পড়েছিল দীধিতি। তামান্নার ডাক শুনে তন্দ্রা কাটলেও উঠতে ইচ্ছা করছে না৷ তাওসিফ ডাকছে কেন আবার? শরীরের ম্যাজম্যাজে ভাব নিয়ে উঠে পড়ল ও। বাথরুমে এসে চোখে মুখে পানি দেবার সময় খেয়াল করল চোখ, মুখ ফুলে খুবই খারাপ দেখতে লাগছে। তবে এমন চেহারাটা এই সময়ের জন্য একদম মানানসই। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো, এগিয়ে গেল রেলিঙের ধারে। যেখানে তাওসিফ দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে ওর জন্য।
-‘হ্যাঁ, বলুন কী বলবেন?’
চকিত হয়ে পিছু তাকাল তাওসিফ। কিছু একটা ভাবনায় মশগুল হয়ে গিয়েছিল সে। দীধিতির চেহারাটা দেখে আরও চমক পেল। জিজ্ঞেস করে উঠল, ‘এমন কেন অবস্থা আপনার? কেঁদেছেন খুব? শরীর ঠিক আছে? না হলে চলুন হসপিটাল যাই৷’

চিন্তাটা ঠিক এমনই দেখানোর কথা ছিল তাওসিফের৷ স্বামী স্বামী আচরণটা আনার জন্য আজ সারাদিন ঘরে বসে প্রচুর চর্চা করেছে সে। মনে হচ্ছে তাতে সে সফল।
তবে দীধিতিকে দেখে সংশয়ে ভুগছে সে একটু। মেয়েটার চেহারায় বলে দিচ্ছে, পুরো দিনটাই খুব কেঁদে পার হয়েছে তার। যে কান্নাটা মোটেও নকল ছিল না। কিন্তু জাদের বিশ্বাস, গত পরশু দীধিতির সঙ্গে খারাপ কিছুই হয়নি৷ যে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছিল শরীরে, তা না কি দীধিতির নিজেরই তৈরি ছিল। ওই লোকগুলোও না কি সকলেই সিনেমার মতো সাজানো ভিলেন৷ তাহলে আজকের অবস্থা দীধিতির এত করুণ দেখাচ্ছে কী জন্য?
-‘আমাকে নিয়ে চিন্তিত হবেন না। আপনি কী জন্য ডেকেছিলেন বলুন?’
তাওসিফ কাছে এসে দাঁড়াল ওর, ‘আমি একটু পরই গাজীপুর রওনা হচ্ছি৷ সেটাই বলতে এসেছি।’
-‘আমাকে কি এখানেই রাখতে চান? আপনার পরিবারকে জানাবেন না আমার কথা?’ অসহায় গলায় শুধাল দীধিতি।

-‘আমার বড়ো কাকুর সামনে বুক ফুলিয়ে বলেছি সেদিন। পরিবারকেও আলাদা করে আর বলার প্রয়োজন নেই৷ আমাকে ডাকা হয়েছে আপনার জন্যই।’
-‘তাহলে আপনি একা কেন যাবেন?’
-‘দীধিতি, আমার পরিবারে এখনই আপনাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়৷ আমার আব্বু আর আম্মু এই মুহূর্তে আপনাকে কখনই মেনে নেবেন না৷ এমনকি আমার দাদা দাদীও না৷ আমার আগে তাদের বোঝাতে হবে, পরিস্থিতি সামলাতে হবে, মানতে একেবারে না চাইলে অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে হবে আমাকে। আমাকে একটু সময় দিন আর আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন৷ আপনার দায়িত্ব আমি স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে নিয়েছি। আপনাকে একা করে ফেলে যাওয়ার মতো কাপুরুষ মনোভাব আমার নেই। তাই আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। আমি খুব দ্রুতই আপনাকে বাড়িতে নিয়ে যাব। তাছাড়া আমার সঙ্গে আপনি প্রতিদিনই কলে যোগাযোগ করতে পারবেন।’ মৃদু হেসে আশ্বাস দিয়ে গেল তাওসিফ।

-‘আমার বাড়িতেও তো জানাতে হবে। আমিই বা কতদিন এভাবে লুকিয়ে থাকতে পারব ঘরের মধ্যে? আমার এত বড়ো ক্ষতির কথা মা’কে জানানোর সাহস না থাকলেও অন্তত বিয়ের মতো বিষয়টা মায়ের থেকে লুকিয়ে রাখতে চাই না। আমিও বাড়ি যাব তাহলে। আমাদের ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপারটা আমার প্রয়োজন তাই৷’
-‘কিন্তু ওটা আমি এখনও কালেক্ট করিনি। আজ সম্ভবও নয় নিয়ে আসার।’
-‘তাহলে আমি যাই? আপনি না হয় বলে রাখুন লয়্যারকে আমার যাওয়ার কথা।’
-‘কিন্তু আজ শুক্রবার, দীধিতি। আপনি ভুলে গেছেন বোধ হয়। আপনি চিন্তা নেবেন না। কাল বা পরশু কথা বলে রাখব। আপনি তখন গিয়ে নিয়ে আসবেন। কিন্তু এই শরীরে বাইরে যেতে পারবেন? প্লিজ কষ্ট পাবেন না বা কিছু মনে করবেন না আমার প্রশ্নে। আমি আপনাকে আঘাত করতে বলছি না। আপনার সুস্থতার কথা চিন্তা করছি আমি।’

দীধিতি কোনো জবাব দিলো না। মনেমনে রাগ হচ্ছে ভীষণ ওর। তাওসিফ বিয়ের কাগজটা সেদিন সংগ্রহ করেনি, এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য লাগছে না ওর। ওর সন্দেহটাই সত্য হবে না তো? সেদিন বিয়েটা কি তবে হয়নি? তাওসিফও কি খেলছে ওর সঙ্গে? কোনোভাবে নাওফিল আর তাওসিফ দুজন একত্রে মিলে কোনো পরিকল্পনা করেনি তো ওকে নিয়ে? জাকির শেখের মতো ওরাও সন্দেহ করলে সামনের পরিস্থিতি তাহলে খুব জটিল হবে। কিন্তু কীভাবে আর কী জন্য সন্দেহ করবে ওকে? তাওসিফ নিপাট ভদ্রলোক গোছের পুরুষই মনে হয়েছে। তার মাঝে ধূর্ততা আছে বলে মনে হয় না। ওর পরিকল্পনা সম্পর্কে তো অন্তত আন্দাজ করার ক্ষমতা এই ছেলেটির নেই৷ নাওফিলেরও হওয়ার কথা না। ও বোধ হয় নিজেই বেশি বেশি ভাবছে৷ হয়ত সত্যিই তাওসিফ কাগজটা সংগ্রহ করতে ভুলে গিয়েছিল ওই পরিস্থিতিতে।
-‘ঠিক আছে সমস্যা নেই। আপনি সাবধানে যাবেন।’
তাওসিফ হাসল, ‘আমি পৌঁছেই আপনাকে কল দেব। নিজের যত্ন নেবেন৷ কান্নাকাটি করবেন না একদম। আমি পাশে আছি আপনার সব সময়। আসছি তাহলে।’
ছাদ থেকে নেমে এসেই হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ কল করল নিহাদ আর জাদকে। নিহাদ গোছগাছ করছে ঢাকা ফিরে আসার জন্য। ওকে যা খোঁজার জন্য পাঠিয়েছিল জাদ, তা পায়নি ও। তাই আর এখানে থাকার প্রয়োজনও নেই৷ তাওসিফের কল আসলেই রিসিভ করে কানে ধরল, ‘হুঁ বল, মিহাদ।’

-‘জাদ আসেনি কলে?’
-‘না, আসবে হয়ত এখনই।’
-‘জাদ ঠিকই বলেছিল দীধিতি বিয়ের কাগজটা চাইবেই৷ আমি ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার সময় এক্ষুনি ও চাইছিল আমার কাছে। কেটে এসেছি একভাবে।’
-‘স্মরণের ব্যাপারে পরে ভাবতে বল জাদকে। যার সম্পর্কে জানার জন্য এখানে আসা, তার সম্পর্কে কিন্তু কিচ্ছু পাইনি আমি। ডক্টর ঝুমুরের ল্যাপটপটা চুরি করলাম একদম খামোখাই। সাথে কিরণ মরণকেও ভোগান্তি দিলাম। বাচ্চা মেয়েটা ওই যে দরজা বন্ধ করে আছে ঘরে, আজ সারাদিনেও বাইরে আসেনি৷ খুব ভয় পেয়েছে।’
-‘এবার মনে হয় তোকে মুম্বাই যেতে বলবে ও, দেখিস!’
-‘আমার পা ধরে ঝুলে থাকলেও এক মহিলাকে তালাশ করতে মুম্বাই দৌঁড়ব না। বড়ো কাকু নিজেই সব জানে, আমার ধারণা। এই মানুষটার মধ্যে প্রচুর রহস্যের হদিস পাওয়া যাবে। শুধু শুধু আমরা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছি।’
-‘জাদ এ জীবনে বড়ো কাকুর শরণাপন্ন হবে না। আর আমার মনে হয় না কাকু আলিয়া মেহজাবিন বা জাইমার খোঁজ জানে। রেজা হকের সাথেই শুধু যোগাযোগ ছিল হয়ত তার।’
কলে এসে যুক্ত হয়েছে জাদ সবেই, ‘কার সাথে রেজা হকের যোগাযোগ থাকার কথা বলছিস?’
-‘জাকির শেখের। সব কিছু খোঁজ পাবি তার মধ্যেই। তুই একবার কাকুর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বল, জাদ।’ নিহাদ বলল।

-‘যে লোক ছোটো ভাইয়ের সন্তান চুরি করে এনে নিজের কাছে জোর করে রেখে দেয়, সে লোক ইতিহাসের সকল সত্য গড়গড় করে আমাকে বলে দেবে? বলে দেবে নাওফিলের বোন মারিহামের জন্ম-মৃত্যু রহস্য? সে যদি ভালোইবাসত ছোটো ভাইকে, ভালোবাসত ছোটো ভাইয়ের ছেলেকেও। তাহলে ছোটো ভাইয়ের যে একটা কন্যা সন্তানও জন্ম নিয়েছিল সেই সত্যটা কেন আজও কাউকে জানায়নি?’

তাওসিফ বলল, ‘কারণ হয়তবা যে জন্ম নেবার সময়ই মৃত ছিল তার কথা বলে দাদা-দাদীকে কষ্ট দিতে চাননি।’
-‘আচ্ছা ভাই মানলাম। মারিহামকে সে মৃতই জানে। কিন্তু জায়িন মাহতাব যত বড়োই অপরাধী হোক, তাই বলে তার সঙ্গে তার ছেলেকে কখনই দেখা করতে দেবে না? কথা বলতে দেবে না? তার থেকে তার ছেলেকে লুকিয়ে রাখতে হবে? এই শাস্তিটা কি কাম্য ছিল জায়িন মাহতাবের? আর আয়মান মেহরিনের কথা বাদই দিলাম। তাকে তো পাগল আর সন্ত্রাস ছাড়া মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করেনি কেউ। তাই তার মাতৃ স্নেহেরও কোনো মূল্য ছিল না জাকির শেখের কাছে, কারও কাছেই। জাকির শেখের মাঝে আসলেই অনেক সত্য, মিথ্যা লুকিয়ে আছে। পাপ, মহাপাপ সেও করেছে। কিন্তু সকলের কাছে সে কারও শ্রেষ্ঠ সন্তান, কারও শ্রেষ্ঠ ভাই, কারও শ্রেষ্ঠ স্বামী, কারও শ্রেষ্ঠ বাবা আর জনসাধারণের কাছে শ্রেষ্ঠ নেতা। তার মধ্যে কোনো জারিজুরি থাকলে তা ফাঁস হবে অতি শীঘ্রই। সে ব্যবস্থাই করছি তো। শুধু ফিরে আসার অপেক্ষা আর স্মরণের শেখ বাড়িতে প্রবেশের অপেক্ষা।’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিহাদ গোছগাছে মনোযোগ দিলো আবার, তাওসিফও হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় বসে পড়ল, তারপর বলল, ‘এবার স্মরণের কথায় আসি আমরা। বিয়ের ডকুমেন্টস চাইছে ও, জাদ। সেটা ওর হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২২

জাদ হাসল, ‘এখনই? একটু টেনশনে ভোগাই, তারপর৷’
-‘তাহলে তো সন্দেহ করবে বিয়ের কাগজ আসল না হয়ত।’
-‘সে এমনিতেও করছে। আর করাটাই তো স্বাভাবিক। প্রচুর চালাক কি না! আরও করুক, টেনশনও করুক। নাওফিল শেখ দেশে না ফেরা পর্যন্ত ওকে শেখ বাড়িতে ঢোকানো যাবে না যে, ভাই।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here