Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২
ইসরাত জাহান দ্যুতি

সারাদিনের যাত্রা শেষে সকল ক্লান্তির অবসান ঘটায় সমুদ্র পাড়ের সূর্যদয়। জ্বরে দুর্বল হয়ে পড়া শরীরের কথা ভুলে দীধিতিও দৌঁড়ে নেমেছিল সমুদ্র সৈকতে। কিন্তু শরীর সঙ্গ না দিলে কি আর মন সঙ্গ দিতে চায়?
মামাতো বোন ঊর্মি আর তার জামাই ইরফানের ভরসাতেই তাকে এত দূরে ভ্রমণে আসার অনুমতি দিয়েছে বাড়ি থেকে। তাদের ওপরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দীধিতির। এই দু’জন ব্যক্তি তার ভার্সিটির বড়ো ভাই আর আপুও। এ বছর ওরা মাস্টার্স শেষ করল বলে ভার্সিটির কিছু ভালো সম্পর্কের ছোটো ভাই বোনদের নিয়ে ওদের ব্যাচটা ঘুরতে এসেছে কক্সবাজার। দীধিতির জন্যই ওরা ঘণ্টার কম সময় ব্যয় করে ফিরে এল কলাবতী বিচ থেকে খাকিকটা দূরে বুকিং দিয়ে রাখা হোটেলটাতে। নাশতার পর্ব শেষ করেই সবাই বিশ্রাম গেছে।

পরিকল্পনা তাদের দুপুরে যাবে গোসলের উদ্দেশ্যে কলাবতী সমুদ্র সৈকতে। কিন্তু চিন্তা থেকে যায় দীধিতিকে নিয়ে। ওকে কোনোভাবেই আজকে অন্তত সমুদ্রের পানিতে নামতে দেওয়া যাবে না। ওর সঙ্গে একজন থাকা জরুরি এটা ভেবে ঊর্মি থেকে যেতে চাইলেও ও চাইল না। দুপুর হতেই ঊর্মি দীধিতিকে ডেকেও জাগাতে পারল না। ঘরে লক করে ওকে রেখেই কয়েকজন চলে যায় সমুদ্রে গা ভেজাতে। সারাদিনে খাবারটা খাওয়ানোর জন্যও দীধিতিকে জাগানো যায়নি। ঊর্মি ভীষণ চিন্তাতে পড়ে যায়। ফুপু তার ভরসাতে পাঠিয়েছে ওকে। এমন অসুস্থ হয়ে থাকলে কী জবাব দেবে সে ফুপুকে? তৎপর হয়ে পড়ল ওকে সুস্থ করার জন্য।
সন্ধ্যার পর ঘুমটা ভাঙল দীধিতির। শরীরটা আগের থেকে বেশ চনমনে অনুভব করল। চোখ খুলতেই বিছানার পাশে বসা দেখতে পেল তার তিন বান্ধবীকে। ফোনের মধ্যে মুখ গুজে কী যেন দেখে হাসাহাসি করছে তিনজন। মাথাটা তুলে একটু উঁকি দিলো সে সেদিকে। তন্বী তখন ওকে জেগে উঠতে দেখে বলল, ‘উঠলি অবশেষে? জলদি জলদি ফ্রেশ হ। অনেক কিছু মিস করে গেছিস আপা। বিচে যাব একটু পরই। রাত ন’টা পর্যন্ত থাকব।’
তন্বীর কথাগুলো কানে নিলো না দীধিতি। সে কৌতূহল ওরা ফোনে যা দেখছিল তা দেখবার জন্য।

আঁধার মেলার মাঝে সমুদ্রের তরঙ্গ দেখবার জন্য শত শত মানুষের ভীড়। কিন্তু দীধিতি একটু নিরিবিলিতে যেতে চায়। ভেজা বালির ওপর খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে সে ঢেউয়ের আরও কাছে যেতে চায়। আকাশে নক্ষত্রমেলা থাকলে দর্শনটুকু আরও চমৎকার হতো। ঐশী, তামান্না আর তন্বীকে ডেকে সে এগিয়ে গেল সমুদ্রের আরেকটু কাছে। ঢেউ খেলা পানির দিকে তাকাতেই সারাদিন পর ওর মন পড়ে গেল হঠাৎ নাওফিলের কথা। আর তারপর গতদিনের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাটুকুও মনে জেগে উঠল। তা মনে করতেই শরীরে এখনো কাঁটা দিয়ে উঠছে। তাই আর মনে করতে চাইল না সে। কিন্তু বারবার নাওফিলকে স্মরণ করতে খুব ভালো লাগছে ওর। কারণ, ওর তেইশ বছরের জীবনে দেখা সব থেকে সুন্দর পুরুষটি নাওফিল। চেহারাটা এই মুহূর্তে কোনোভাবেই সে পুরোপুরি মনে করতে পারছে না। এত জলদি ভুলে গেল সে কী করে তা ভেবেই রাগ লাগছে খুব। শুধু মনে পড়ছে চোখ খুলে হঠাৎ করে দেখা ছেলেটির রোবট ভঙ্গিতে বসে থাকা মুহূর্ত। অমন করে ছেলেটি কেন বসেছিল তা সে তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝল, সে চোখ খুলে ওকে ফুঁ দিতে দেখে নেওয়াই বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল ছেলেটি। এবং চট জলদি তা সামলাতেই ভাব গম্ভীর করে নিয়েছিল। মুহূর্তটুকু মনে করে হেসে ফেলল দীধিতি। ওর আবার দেখতে ইচ্ছা করছে ছেলেটির সেই রোবট ভঙ্গিমার অভিব্যক্তি। আর কি কখনো দেখা পাবে তার? হঠাৎ করে ওর দু’পাশে তামান্না আর তন্বী দাঁড়িয়ে পড়ে গা দুলিয়ে হাসতে থাকল। দূরে কাচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ঐশী। সে অনুরোধের সুরে বলছে, ‘দোহাই লাগে তোরা কিছু বলিস না। আমি নিজে বলব ওকে।’

-‘কী হয়েছে তোদের? এসেই প্রেমে টেমে পড়েছিস নাকি কারও?’
-‘কেন কেন? তোর এমন মনে হলো কেন?’
ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল তামান্না।
-‘কয়েকটা ছেলের ছবি দেখছিলি জুম করে করে৷ তখন তো খেয়াল করেছিলাম।’
তন্বী একটু চেঁচিয়ে বলল, ‘তুই যদি জানিস কাহিনি তাহলে ঐশীকে দুমদাম কিল বসাতে বাদ রাখবি না।’
-‘জ্বরে পড়ে কত কিছু মিস করে গেলি যে!’ তামান্না আফসোস করল।
দীধিতি ডাকল ঐশীকে। ঐশী দূর থেকেই বলল, ‘ওদের কথা কানে নিস না দোস্ত। আমি তোদের সরাসরি সারপ্রাইজ দিতেই কিছুই জানাইনি।’
-‘কীসের সারপ্রাইজ?’
-‘আমার হবু জামাই আসবে একটু পর তোদের সঙ্গে পরিচিত হতে।’

কথাটা শুনেই দীধিতি গালি দেবার জন্য মুখ খুলতে গেল, আর তখনি ঐশী বলতে শুরু করল, ‘আগে শেষ করতে দে আমায়৷ গত মাসে ভাইয়ের এক বন্ধুর বিয়ে অ্যাটেন্ড করতে গিয়েছিলাম না? সেখান থেকে রুমানের সাথে পরিচয়। তবে বিশেষ কিছু ঘটেনি সেদিন। তার দু’দিন পর ও আমার নাম্বার জোগাড় করে কল করে। তারপর সরাসরি ছেলে প্রপোজও করে বসে। আমিও তখন সরাসরি বলে দিয়েছিলাম, আমার আর এখন প্রেমে ইন্টারেস্ট নেই। বিয়ে করার মতো চিন্তাভাবনা থাকলে বাসায় প্রস্তাব দিন। আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলে সত্যি সত্যিই ভাইয়ার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। ও ডিফেন্সে জব করে চার বছর হলো। চট্টগ্রাম পোস্টিং। ভাইয়া ওর ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে দেখে ভালো একটা ছেলে ও। আর তারপর পারিবারিকভাবে দেখা করে কথাবার্তা বলে আমাদের বিয়ে পাকাপাকি করে ফেলে। এ মাসে ওর বড়ো ভাইয়ের বিয়ে তাই ছুটিতে ঢাকা এসেছে। দু’মাস পরে আমাদের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হবে। আমাদের সঙ্গে ও-ও এসেছে বন্ধুদের নিয়ে এখানে। আজ দেখা করতে আসতে চেয়েছে আমার সঙ্গে। আমি তোদের আগে জানাইনি কারণ সামনাসামনি ওকে দেখিয়ে তারপর তোদের জানিয়ে সারপ্রাইজ দেবো। বিশ্বাস কর, বয়ফ্রেন্ড টাইপ ব্যাপার হলে বহু আগেই জানিয়ে দিতাম।’

দীধিতি হেসে ওকে কাছে আসতে বলল। ঐশী আশ্বস্ত হলো ওর হাসিটা দেখে, যা-ই হোক ওর ওপর অভিমান করেনি ওরা। ওদের কাছে এগিয়ে আসতেই দীধিতি বলল, ‘এই প্রথম বুদ্ধিমতী মেয়ের মতো কাজ করেছিস। সারপ্রাইজটার কথা শুনে ভুলে গেলাম তোকে দুমদাম কিল দেবার কথা।’
তন্বী বলে উঠল, ‘কিন্তু ভাগ্যবশত আমরা হবু দুলাভাইকে আগেই দেখে ফেলেছি।’
ঐশী মাঝখান থেকে বলল, ‘ওদের গল্প শুনবি? ওরা কী করেছে? তুই যে রুমানদের গাড়িতেই এসেছিস গতকাল, ওটা তো তখন জানতাম না। যখন রেঁস্তোরায় এসে দাঁড়াল ওদের গাড়ি। তারপর ওরা নামল গাড়ি থেকে তোকে নিয়ে। ওই সময় এই দুই খাসিকে অতি এক্সইটমেন্টের চোটে রুমানকে দেখিয়ে বলে দিয়েছি সব। আর ওরা আমার জামাইকে না দেখে আমার জামাইয়ের বন্ধুদের মধ্যে কোনটাকে কে নেবে তাই নিয়ে মারামারি অবস্থা। নির্লজ্জের মতো লুকিয়ে ছবি পর্যন্ত তুলে রেখেছে ওদের।’

তন্বী বলে উঠল, ‘এটা কোনো গল্প না। একটা হিংসার গল্প শোন দোস্ত। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি আর তামুর একই ছেলের চেহারাতেই ধাক্কা খেলাম। হিংসার চোটে তামু কী বলল জানিস? আমি ওই ছেলের নাভির নিচে পড়ে থাকব নাকি। আমার পায়ে ধরে থ্রেট পর্যন্ত দিয়েছে ও। যেন নজর বদলাই আমি। মানে এটা কেমন হলো বল। তুই ধরেছিস পা। তুই করবি তাহলে রিকুয়েষ্ট। তার বদলে পা ধরে তুই থ্রেট দিচ্ছিস। এটা মানা যায়?’
ঐশী সরু চোখে তাকিয়ে ওদের জিজ্ঞেস করল, ‘ওই সময়ে তোরা কখন পা ধরাধরি করলি?’
ওদের মাঝে দীধিতি কথা বলার সুযোগই পাচ্ছে না। তামান্না নায়কদের মতো চেহারায় ভাব ফুটিয়ে বলে উঠল তখনই, ‘আরে কীসের পা ধরাধরি? ওকে থ্রেট করেছি, থ্রেট। জানিসই তো সবাই আমাকে কত ভয় পায়! তনু ফনুও ভয় পেয়ে নিজেই নজর বদলে ফেলেছে।’

এতক্ষণ দীধিতি ওদের কথা শুনতে থাকলেও হঠাৎ করে সে অনুভব করল, নাওফিলের জন্য খুব উত্তেজনা বোধ করছে সে। একটু আগেই সে প্রার্থনা করছিল, নাওফিলকে আরেকটা বার দেখার জন্য। এত জলদি যে সেই প্রার্থনা কবুল হয়ে যাবে ভাবতেই তার খুবই উৎফুল্ল লাগছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনকে দমাল সে। মেয়েদের মন এমন বেপরোয়া হতে নেই। বেপরোয়া, বেহায়া হবে তো ছেলেরা মেয়েদের জন্য। মেয়েটিকে পাবার জন্য ছেলেটি হয়ে উঠবে দুঃসাহসিক৷ এসব ভাবধারা ছেলেদেরই মানায়। নিজের ভাবনার জন্য নিজেই নিজেকে রাগ করল মনে মনে। এসব ভাবনা বাদ দিয়ে চারপাশের চমৎকার দর্শনে মনোনিবেশ করল সে।

ঐশীর সাথে কথা চলছে রুমানের। রুমানরা ইনানি বিচের কাছাকাছি হোটেলে উঠেছে। ওর দু’তিনজন বন্ধু কলাবতী বিচে আসতে নারাজ আজ। তাদেরকে রাজি করিয়ে রওনা দিতে দিতে দেরি করে ফেলেছে ওরা। আসতে আসতে রাত ন’টা বেজে যাবে। এই ফাঁকে দীধিতি আর তন্বী এসেছে আচারসহ এটা সেটা কিনতে। ওদের আসার আধ ঘণ্টা পরই তামান্না বারবার কল করতে থাকল। ঘণ্টাখানিক পর তামান্না আবার কল দিয়ে জানাল, রুমান চলে এসেছে। ওরাও আর দেরি করল না। বিচে ফিরে এসে আশেপাশে কাউকে দেখতে পেল না ওদের। তামান্নাকে কল করে জানতে পারল, কাবাব তৈরি করা খাবারের একটি দোকানে গিয়েছে ওরা সবাই। তামান্নার বলা উপদেশ মোতাবেক এসে পৌঁছল দীধিতি আর তন্বী। আর এসেই বিস্ময়ে, আনন্দে হাঁ করে ফেলল। রুমান বন্ধুদের চাপে পড়ে সবার সামনে ঐশীকে আবার বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে ওর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে। আশেপাশের মানুষগুলোও ব্যাপারটা খুব উপভোগ করছে। চারপাশে হাতে তালির শব্দও। এসবের মাঝে দীধিতির চোখজোড়া খুঁজতে থাকল নাওফিলকে। আর যখন দেখতে পেল ওকে, তখনই দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেল। ওই মুহূর্তেই হৃদয়ে কম্পন অনুভব করে দীধিতি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কী যেন ছিল নাওফিলের ওইটুকু সময়ের চাউনিতে। দৃষ্টি ছিল হয়তোবা ভীষণ ধারাল। যা অন্তরও খুঁড়ে ফেলতে পারে। নয়তো সম্মোহন করে তোলার মতো। না হলে নাওফিল নজর ফিরিয়ে নেওয়ার পরও সে কেন পারছে না?

রুমানের সাথে ঐশী দীধিতিদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ওদের মাঝে এক মাত্র রুমান, দীপ্ত আর রাতুল ছাড়া দীধিতির সঙ্গে কেউ কথা বলল না। সেও অবশ্য এতটা আশা করেনি। এগারোজনের আড্ডার আসর বসার পর নাওফিল ঐশীদের সাথে একটু খোলাখুলি কথা বলল। কিন্তু সে খেয়াল করেছে দীধিতিসহ তামান্না, তন্বী তিনজনই আড়নজরে তাকেই বারবার দেখে চলেছে। তারপর ভাবনাতীত দীধিতিকে বিস্মিত করে দিয়ে সে জিজ্ঞেস করে বসল ওকে, ‘এত বারবার বাঁকা চোখে কেন দেখছ আমাকে? কথা বলতে আগ্রহী আমার সঙ্গে?’
এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েনি দীধিতি। লজ্জায় মুখটা লাল হয়েছে কিনা জানা নেই৷ কিন্তু কান গরম হয়ে উঠল তার। নাওফিলের বন্ধুরা ওর এমন সোজাসাপটা অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে অবগত। সবাই ঠোঁট চেপে হাসতে থাকল। দীধিতিকে এভাবে বলে এক সঙ্গে তামান্না আর তন্বীকেও শিক্ষা দিলো সে।

ঐশীদের খুব রাগ হলো নাওফিলের ওপর।এভাবে অপমান করার কারণটা কী তার? ভারি শয়তান ছেলে তো! দীধিতি গতদিনই খেয়াল করেছিল নাওফিলের রুক্ষ আচরণ। শুধু ওর সাহায্যটুকু পেয়েই সে ভুলে গিয়েছিল ওর এমন রুক্ষ স্বভাব আর বদরাগী আচরণের কথা। ছেলেটা কি মেয়েদের সাথে এভাবে কথা বলে আনন্দ পায়? নিজেকে নিয়ে নিশ্চয়ই খু্ব দম্ভ তার! গতকাল সে অসহায় থাকলেও আজ এমন অপমান তো মেনে নেওয়ার মতো নয়। লজ্জায় কয়েক পল নিস্তব্ধতায় কাটালেও নিজেকে সামলে নিলো দীধিতি। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে নাওফিলকে বলল, ‘বেয়ায় হন। বেয়ায়দের দিকে নজর দেবো না তো কাদের দিকে দেবো? শুধু আপনাকে নয়, দেখছি আপনার পাশে বসা দীপ্ত ভাইয়াকে, দীপ্ত ভাইয়ার পাশে রাতুল ভাইয়াকে। দীপ্ত ভাইয়া, আপনি কি আপনার বন্ধুর মতো আমার তাকানোতে লজ্জা পাচ্ছেন?’

শেষ প্রশ্নটা সরল মুখ করে দীপ্তকে শুধাল। দীপ্ত জানেই না তার দিকে দীধিতি আড় নজরে দেখেছে কি না। কিন্তু কথাটা শুনে ওর খুব ভালো লাগল। লজ্জা পাবার মতো করে মুচকি হেসে না বলল সে। রাতুল বলল, ‘বেয়ান তাহলে আগে ভাগে সিগন্যাল দিয়ে দিলেন দেখি। এতে লজ্জা কেন পাবো? লজ্জা দেওয়ার অধিকার তো আমাদের।’
এসব কথা শুনতে অস্বস্তি লাগলেও দীধিতি স্বাভাবিক রইল। নাওফিল বলল এরপর, ‘বেয়ান আমাদের দেখছি সো ফাস্ট। তো বেয়ান এতগুলো বেয়ায়দের দেওয়া লজ্জা সামলাতে প্রস্তুত হয়ে নিয়েন কিন্তু।’
জবাবে তামান্না বলল, ‘বেয়ায়রা তাহলে নিজেদের নির্লজ্জ দাবি করছেন? বেশ বেশ। লজ্জা না হয় সামলাব। তা বেয়ায় আপনি আলাপে গড়মিল করে ফেলছেন যেন সম্বোধন করতে!’
দীধিতি বিদ্রূপহাস্য চেহারায় বলল, ‘বেয়ায়ের আমার চাউনিতে পড়ে বোধ হয় মাথা আউলা ঝাউলা হয়ে গেছে।’
-‘দ্বিতীয় বাক্যে বেয়ানকে করা আপনি সম্বোধনের উদ্দেশ্য ছিল তার স্বভাব দেখে খোঁচা মারা। আর প্রথম বাক্যের সম্বোধনের উদ্দেশ্য বেয়ানের বেহায়া চাউনির লাগাম টেনে ধরার জন্য সতর্ক করা।’ কথাটা তামান্নাকে বলল নাওফিল।

দীধিতি কোনো উত্তর দিলো না আর। নিজের অহংবোধ জেগে উঠেছে তার মাঝে। যা নাওফিলকে দেখার পর হারিয়ে ফেলেছিল সে। গম্ভীর হয়ে পড়ল এবার। নাওফিলের প্রতি আগ্রহটাও ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে তার। ওকে চুপ থাকতে দেখে তন্বী নাওফিলকে জবাব দিলো, ‘আমার বান্ধবী না হয় চুরি করতে গেছে। তা বেয়ায়সাব কি সজাগ ছিলেন চোরের চোরা চাউনিতে পড়ার জন্য? দেখলেন কী করে?’
রুমান বাহবা দেবার মতো করে বলে উঠল, ‘বাহ্! দারুণ পয়েন্ট। নাওফিল ভাইয়ো, তাহলে তুমিও কি চোখকে ঘোরাচ্ছিলে ফেরাচ্ছিলে?’
নাওফিল হেসে বলল, ‘এক সঙ্গে তিনটা আয়নার রিফ্লেকশন চোখে পড়লে তো ঘুমিয়ে থাকলেও সজাগ হয়ে যেতে হয়।’

ওর কথার অর্থ সবাই উদ্ধার করতে পেরে হো হো করে হেসে উঠল একত্রে। এবার তামান্না, তন্বীও লজ্জায় পড়ে আর কোনো কথা বলল না। দীধিতি অনেক আগেই চুপ হয়ে গেছে। গল্পের মাঝে মাঝে দুই একটা কথা বলতে হচ্ছে অগত্যা। তবে দীপ্তর সঙ্গে অপ্রস্তুতভাবে চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে ওর বারবার। তাতে বুঝতে পারল, দীপ্ত চেষ্টা করছে ওকে আকর্ষণ করার। চোখাচোখি হলে কেবল সৌজন্য বজায় রাখতে একে অপরকে মুচকি হাসিও প্রদান করছে। যা দীধিতির পাশে বসে ঐশী খেয়াল করল। আর নাওফিল খেয়াল করতে বাধ্য হলো দীধিতির চাউনি দেখে। মাঝে ওর সঙ্গেও অপ্রস্তুতভাবে একবার চোখাচোখি হয়েছিল দীধিতির। তখন দীধিতির কড়া দৃষ্টি ছিল তার প্রতি৷ তারপর থেকেই চলছে দীপ্তর সঙ্গে দীধিতির এই চাউনির খেলা। ওদের দু’জনের এই খেলা দেখে নাওফিল ধারণা করে নিলো, অতি শীঘ্রই ওরা দু’জন দু’জনের মাঝে যোগাযোগটা শুরু করবে। এটা ভেবেই সে বারবার লক্ষ্য করছে ওদের এই চোখাচোখির খেলা। বিদায় নেবার পূর্বে নাওফিলের এই ধারণা কিছুটা সত্য হলো। দীপ্ত সুযোগ খুঁজে দীধিতিকে এক পেয়ে ওর পাশাপাশি চলতে চলতে এগোচ্ছে। দু’জনের মাঝে কী কথা হচ্ছে তা নাওফিল না শুনেও আন্দাজ করে নিলো৷ কিন্তু তবুও ওদের কথা শোনার অদম্য কৌতূহল হচ্ছে ওর। নিজের হাঁটার গতিও কমিয়ে দিয়ে ওদের কাছাকাছি থাকল সে।

-‘আপনি বা আপনার বন্ধুরা সবাই গতকালকের পর থেকে আমার মনে বিশেষ একটা জায়গা করে নিয়েছেন। আপনারা আমাকে ভুলে গেলেও আমি কখনো আপনাদের ভুলতে পারব না। আগামীতে আমাদের মাঝে খুব ভালো একটা সম্পর্ত তৈরি হবে এমনটা আশা রাখি। বেঁচে থাকলে দেখা তো হবে অবশ্যই।’
দীপ্তর বলা কথা না শুনলেও দীধিতির উত্তর শোনার পর নাওফিল বুঝতে পারল দীপ্তর কথাগুলো কী ছিল। এই কথাগুলোতে বোঝা গেল, মেয়েটার বুদ্ধি আর কথা বলার কৌশলও বেশ ভালো। যতটা সস্তা ভেবেছিল অতটাও নয় মেয়েটা। আত্মসম্মান আছে প্রবল। সেই সাথে আত্মবাদীও কিছুটা। এমন আত্মানুরাগপ্রদর্শী মেয়েদের তার আবার সহ্য হয় না।

হোটেল ফিরে এসেই দীধিতি একটা মুহূর্ত না বসে বাথরুমে ঢুকে গেল গোসলের জন্য। জ্বর মাত্র সেড়েছে। এই অবস্থায় এত বারবার গোসল তার ওপর রাতের বেলা, তা ঘরে এসে দেখে ঊর্মি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ডাকল ওকে, ‘দীধিতি? তুই গোসলে কেন ঢুকলি আবার?’
দরজাটা একটু ফাঁক করে দীধিতি উত্তর দিলো, ‘মাথার তালু গরম। গোসল না করলে ঠান্ডা হবে না৷ আর ঠান্ডা না হলে ঘুম হবে না।’

ঐশীরা বুঝতে পারল ওর মাথার গরম হবার কারণ৷ নাওফিলের করা অপমানের কথা সে এখনো ভুলতে পারছে না।
গোসল থেকে বেরিয়ে হেয়ার ড্রায়ারে চুল শুকিয়ে নিলো দীধিতি। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা আজ অনেক হয়েছে সবার। সবাই ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সারাদিন ঘুমিয়ে তার চোখদু’টো এখন নির্ঘুম। বিছানায় বসে ল্যাপটপে কিছুক্ষণ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে ঘুরল ফিরল। চোখে ঘুম নামানোর জন্য সংগ্রহে রাখা রোম্যান্টিক ভৌতিক উপন্যাসের একটা পিডিএফ ফাইল বের করে পড়তে আরম্ভ করল অবশেষে। তার দারুণ একটা অভ্যাস আছে। বই পড়ার পর সে নিজে নিজে কল্পনায় একটা গল্প তৈরি করে। যেখানে প্রধান ভূমিকাতে সে নিজেকে রাখে। আজকের উপন্যাসটা কিছুটা পড়ার পর আজও তার গল্প তৈরি করতে ইচ্ছা হলো কল্পনাতে। ল্যাপটপটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল, চোখ বুজে কল্পনাতে দেখতে পেল সে পোল্যান্ডের একটি শহর। কয়েক যুগ পূর্বে সেই শহরটাতে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বসবাস করতেন। সেখানে তার ক্ষমতার দাপটও ছিল খুব। শোনা যায়, ব্যক্তিটির পূর্ব পুরুষরা ছিলেন রাজবংশীয়। সেই আত্মঅহংকার আর নিজের বিত্তশালী অবস্থার কারণে মধ্যবিত্ত আর গরিবদের তিনি যাচ্ছেতাই নজরে দেখতেন।

তবে তার মতো বিত্তমান মানুষদেরকে তিনি বেশ পছন্দ করতেন। পঞ্চাশ বছর বয়সেই হঠাৎ তিনি এক মরণব্যধিতে আক্রান্ত হন। এবং তার কিছুদিন পরই দুনিয়াও ত্যাগ করেন। তিনি গত হবার পর তার বিশাল ওই সম্পত্তি আর অর্থের এক মাত্র মালিক হয় তারই একটি মাত্র মেয়ে। যার মাঝেও মানুষ তার বাবার ছায়া দেখতে পেত। কিন্তু সমস্যায় পড়ল মেয়েটি তখন, যখন বাবার ফেলে যাওয়া ব্যবসার হাল ধরতে হয় তাকে। সমস্যাটি খুবই জটিল। তার বয়স অনুসারে অত বড়ো ব্যবসা সামলানোর বুদ্ধি তখনো সে অর্জন করেনি। এই চিন্তায় যখন সে দিন পার করছিল, তখনই তার রাজমহলের মতো বিশাল বাড়ির হলঘরে এসে হঠাৎ হাজির হয় এক ভিনদেশী যুবক। যুবকটির চেহারা কল্পনা করতে চেষ্টা করল এবার দীধিতি।

কিন্তু তার অনিচ্ছার বাইরে আশ্চর্যজনকভাবে যুবকটির আদল গড়ে উঠল হুবহু নাওফিলের মতো। কালো কুচকুচে এক ঝাঁক ঢেউ খেলানো চুলে সুন্দর করে আঁচড়ে অস্পষ্ট একটা সিঁথি তৈরি করে রাখা। রাঙা ফর্সা লম্বাটে মুখটার কপালের আয়তন বেশ ছোটো। ঘন চুলের দৌলতে কপালের আয়তনটা ছোটো দেখা যায় তার। মোটা, কালো ভ্রুজোড়ার নিচে ছোটো ছোটো ডাউনটার্নড আকৃতির চোখদু’টো সহজেই ভালো লাগার মতো। ডান চোখের পাতার ওপরে চোখে পড়ার মতো ছোটো একটা তিল আকর্ষণ করার মতো। যে ছেলের চোখ আর ঠোঁট সুন্দর, সেই ছেলেকে দীধিতি কখনোই ভুলতে পারে না। ছেলেদের এই দু’টো সৌন্দর্যের ওপর সে দু্র্বল। নাওফিল মানুষটিকে সে অপছন্দ করলেও এই দু’টো সৌন্দর্য সে পছন্দ করেছিল খুব। নাওফিলের চোখ আর চিকন ঠোঁটজোড়া সব থেকে বেশি সুন্দর। আর সেই সাথে চোখে পড়ার মতো ওর প্রশংসনীয় দৈহিক গঠন আর দীর্ঘ উচ্চতাও বাদ রাখা যায় না। কিন্তু দীধিতি একেবারেই চাইছে না যুবকটিকে নাওফিল ভেবে কল্পনা করতে। চেষ্টা করল খুব তার পছন্দের কোনো নায়ককে ভাবতে তার বদলে। কিন্তু ব্যর্থ হলো। তাই সে চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে এগোলো গল্পের গন্তব্যে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১

পরনে নাওফিলের সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। ইন করা ফুল হাতা শার্টের ওপর কালো রঙের কটিমতো কিছু একটা পরা। যেটা ওই সময়ের পুরুষরা অহরহ পরত। গালে সদ্য তৈরি হওয়া তার চাপ দাড়ি। চোখের চাউনি যেন ইগলের মতো তীক্ষ্ণ আর ধূর্ত। ভাব গম্ভীরতা অভিব্যক্তিতে গালে হাত বুলিয়ে নিতে নিতে চারপাশটা পর্যবেক্ষণে যখন ব্যস্ত সে, তখন এক প্রবীণ পুরুষ এসে মাথা নুইয়ে তাকে সম্মান জানিয়ে বলল, ‘মাননীয়, আপনাকে অধ্যক্ষা ডেকে পাঠিয়েছেন ওপরে তার আলোচনা ঘরটিতে।’
জবাবে নাওফিল কাষ্ঠহাসি হাসল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here