Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

-‘দাঁড়া, ফোনটা নিয়ে যা।’
ইয়াসিফের হাত থেকে ফোনটা নিতেই স্ক্রিনে দীধিতির বধূ রূপের ছবি দেখতে পায় নাওফিল৷ নিকাবে ঢাকা মুখটার মাঝে আজ চোখদু’টোই বিশেষ আকর্ষণ। চোখে আজ নীল লেন্স ব্যবহার করেছে দীধিতি! একটু বেশিই মানিয়েছে মনে হচ্ছে! অনিমেষ চোখে প্রতিটা ছবিই নাওফিল দেখে, দেখা শেষে একটু পর বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে, ‘ওরা কি বোকা? ছবি যখন তুলে দিলোই নিকাব ছাড়াও কিছু তুলত।’
-‘আসলেই। মুখটা দেখার জন্য মনটা আনচান আনচান করছে খুব।’ ঠাট্টা গলায় ইয়াসিফ নাওফিলকে দেখতে দেখতে বলে বসল।

সম্বিৎ ফিরল বোধ হয় নাওফিলের তখনই। ফোনটা মুহূর্তেই পকেটে পুরে ইয়াসিফের দিকে এক নজর তাকিয়ে চলে যায় শেখ বাড়ির বাউন্ডারির ওপাশে থাকা বাংলো বাড়িটার উদ্দেশ্যে।
ইয়াসিফ ফিরে আসে বাসার ভেতর৷ ফারহানকে খেতে দেওয়া হয়েছে ওর ঘরে। সেখানে গিয়ে দেখল তুষার ফারহানকে বলছে, ‘ভাই, বিয়ে পড়ানোর কায়দা কানুন একটু শিখিয়ে দেন না আমাকে! নিজের বিয়ে নিজে পড়ানোর মহৎ ইচ্ছা আমার।’
খাবারের শেষ পাতে ফারহান দই তুলে নিয়ে খেতে খেতে বলল, ‘আজকে শিখে নিস সবাই। কাজী হওয়া অনেক পুণ্যের কাজ৷ আব্বা অবসর নিলে ভেবেছি নামের পাশে পারমানেন্ট কাজী বসিয়ে দেব। বিশাল একটা অফিসও খুলে নেব।’
ইয়াসিফকে তখনই সবাই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। এই ছেলেটার মুখ থেকে কখনই চঞ্চলতা বিলীন হতে দেখা যায় না৷ অথচ সারা বাড়িতে গম্ভীর মুখ করে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে আজ ওকেই। চোখের তারায় কেমন চিন্তার আভাসও৷ দরজার মুখে দাঁড়ানো ওর সেই চিন্তিত মুখ দেখে বাকিরাও চিন্তায় পড়ে গেল৷ রাতুল এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘নাওফিল কোথায়, ভাই? ওর মুড কি অফ?’
চোখ তুলে রাতুলকে দেখে জবাব দিলো ইয়াসিফ, ‘হওয়ারই তো কথা। আর মিহাদের মুডের কথা না-ই বা বলি।’

ফারহানের খাওয়া শেষ। জাকির শেখও এলেন তখন। সবাইকে আরাম করে গা এলিয়ে থাকতে দেখে রেগে গেলেন, ‘কী ব্যাপার? তোরা এক জায়গায় শুয়ে বসে আড্ডায় মেতেছিস কোন সেন্সে? ক’টা বাজে দেখিসনি? মিহাদ কই? আব্বা খুঁজছেন ওকে। দীধিতির ওখানেও অপেক্ষা করছে সবাই কাজী আসার। তাড়াতাড়ি যা ফারহানকে নিয়ে।’
তড়িঘড়ি করে শিহাব, সবুজ, রুমান, তুষার বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল। একেকটা শুয়ে, বসেই ছিল এতক্ষণে৷ ইয়াসিফ বলল তখন, ‘নাওফিল ডেকে আনতে গেছে মিহাদকে। আমি ফারহানকে নিয়ে এখনই যাচ্ছি ভাবির কাছে।’
-‘যা তাড়াতাড়ি। মিহাদ কোন আক্কেলে বাড়ির বাইরে গেছে এখন?’ গজগজ করতে করতেই তিনি চলে গেলেন।

ফারহানও আর দেরি করল না। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে ইয়াসিফের সঙ্গে চলে এলো অতিথিশালায়৷ দীধিতির ঘরে তামান্নারা তিন বান্ধবীসহ, অনুপমা, কিরণ, ঝুমুর, সৌরভের বাবা-মা, সকলেই আছেন। শুধু সৌরভ ছাড়া। নাওফিলের কিছু আত্মীয়ারাও এসে দীধিতিকে দেখে দেখে যাচ্ছেন। ঘরে পা দেওয়ারই জায়গা নেই। ইয়াসিফ এসে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল, মুহূর্তেই সবার দৃষ্টিও আকর্ষণ করে ফেলল৷ অনুরোধের গলায় বলল, ‘ভাবির সঙ্গে একটু কথা ছিল। মানে ভাইয়ার ব্যাপারে আরকি!’
কিরণ, ঝুমুর আর সৌরভের বাবা-মায়ের দৃষ্টি থমকে গেছে ইয়াসিফের মুখে৷ ঝুমুর তো এগিয়েই এলেন, ‘আপনি নিহাদ না? কিরণের কলেজের টিচার?’
ইয়াসিফের সাথে আজই দেখা হলো তাদের। ইয়াসিফ অবশ্য পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল এমন মুহূর্তটার জন্য৷ সে বিনয়ের সাথে হাসল, ‘জি আন্টি। গেস্ট টিচার হওয়ার কথা ছিল, শিক্ষকতায় এক্সপেরিয়েন্স কেমন হয় তা জানার জন্য। কিন্তু শিক্ষকতা করার ধৈর্য নেই আমার আসলে। তাই চলে এসেছি। আপনি আমাকে প্লিজ তুমি করে বলুন।’
সহজ স্বীকারোক্তি। তবুও কথাগুলো কেমন খাপছাড়া লাগল ঝুমুরের। জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি মিহাদের ভাই, তাই তো?’

-‘হ্যাঁ, আমরা টুইন। আমি ইয়াসিফ শেখ। নিহাদ নিকনেম।’
-‘ব্যাপারটা তাহলে হলো তুমি স্মরণ আর ওর পরিবারের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতেই আমার বাসায় এসেছিলে৷ আমি ঠিক বলছি?’ কাঠকাঠ গলায় শুধালেন ঝুমুর।
ইয়াসিফ মনেমনে হাসলেও চকিতেই মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ জানাল। কিরণ আজও জানে না সেদিনের গুপ্তচর মানুষটি ইয়াসিফই। নয়ত এতদিনে গলাবাজি করে মা’কে, দীধিতিকে জানানো হয়ে যেত। ইয়াসিফকে এই প্রথম অপছন্দ করল একমাত্র কিরণই৷ সেই প্রথম দিনে ইয়াসিফের করা ব্যবহারের জন্যই মূলত। তাই ওর সঙ্গে সৌজন্যতার ধারেকাছেও গেল না সে।
তামান্না দেখল ইয়াসিফের পেছনে তুষার, রাতুল, রুমান, সবুজসহ আরও একজন মানুষ। গাত্রবর্ণ কালো সে মানুষটির। অথচ দেখতে কী অমায়িক! সাদা শার্ট, কালো স্যুট প্যান্টে এই প্রথমবার কোনো ছেলেকে এক দেখাতে অসম্ভব ভালো লেগে গেল তামান্নার। হাতে কীসের একটা ব্যাগ তার। উৎসুক চোখে ঘরের ভেতরের পরিবেশ দেখছে সে। বসে থাকতে পারল না আর তামান্না। ইয়াসিফ আর ঝুমুরের কথার মাঝেই সে এসে দাঁড়াল ঝুমুরের পাশে৷ ঠোঁটে হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফকে, ‘কী এমন কথা ব্রাইডের সাথে, বেয়ায়? বলুন, আমরাও শুনি।’

যাক, আপাতত ঝুমুরের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে রেহাই মিলল এই সুযোগে৷ ইয়াসিফ কিছু বলার পূর্বেই তুষার সামনে এসে বলল, ‘বেয়ানের কমনসেন্স নেই দেখি। ব্রাইডকে মেসেজ পাঠানো হলে সেটা শুধু ব্রাইডই জানতে পারবে। বেয়ানদের কেন জানতে হবে তা?’
তন্বী তখন জবাব দিলো, ‘তাহলে মেসেজটা স্বয়ং বরই এসে দিতো। বেয়ায়দের মাধ্যমে যেহেতু পাঠানো হয়েছে, তাহলে বেয়ায়রা জানতে পারলে বেয়ানরাও জানতে পারবে না কেন?’
এভাবে চলতে থাকলে সময় বয়ে যাবে। কথাগুলো আর জানানো হবে না দীধিতিকে। তাই ইয়াসিফ তুষারদের আপাতত রসিকতা বন্ধ করতে ইশারা দিয়ে তামান্নাকে কাছে ডেকে চাপাস্বরে বলল, ‘কথাগুলো জানানো একটু জরুরি৷ যেহেতু তাওসিফ আসতে পারছে না তাই আমাকেই বলতে হবে। আর কথাগুলো বলার জন্য স্পেসও প্রয়োজন আমার আর দীধিতির। একটু ম্যানেজ করবেন, তামান্না?’
-‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’

ঝুমুরকে কানেকানে কথাগুলো জানিয়ে একে একে সবাইকে নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল। ইয়াসিফও ফারহানকে কিছু সময়ের জন্য তুষারদের নিয়ে ঘরের বাইরে অপেক্ষা করতে বলল।
দীধিতি তখন চোখদুটো বুঝে, মাথা নুইয়ে বসে ছিল। প্রচণ্ড পরিমাণে মাথা ধরেছে ওর৷ কান্নাকাটি না করতে পারলেও বারবার চোখজোড়া ভিজে আসছে বলেই তা লুকোনোর জন্য চোখ বুজে বসে থাকা। ঘরের মাঝে এত মানুষের সমাগম ছিল যে, কে কী কথা বলছে তা কানে আসলেও মস্তিষ্কে জায়গা পায়নি ওর। ইয়াসিফ ওর কাছে এগিয়ে এসে চেয়ারটা টেনে বসল। হঠাৎ নিস্তব্ধতা, আবার চেয়ার টানার শব্দ পেয়ে মাথা তুলে তাকাল দীধিতি৷ রক্ত জমাট বেঁধে থাকার মতো লালচে চোখজোড়া দেখে ইয়াসিফ সে চোখে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড৷ আর দীধিতি তার আকস্মিক উপস্থিতি এবং পুরো ঘর ফাঁকা দেখে অপ্রস্তুত আর বিস্মিত হলেও মেকি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে উঠল, ‘ভাইয়া, আপনি হঠাৎ?’
-‘কাজী এসেছে, ভাবিজান। কবুল বলার সময় চলে এলো যে আপনার!’

ধক্ করে উঠল বুকের বাঁ পাশটায়। সত্যিই তবে আজ থেকে নাওফিল ওর জন্য নিষিদ্ধ পুরুষ হয়ে যাবে চিরকালের জন্য? লাল আর খয়েরী রঙের মিশেলে ম্যাট লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁটটা চেপে ধরে কান্না রোধ করার প্রচেষ্টা চালাল দীধিতি। মাথাটা নুইয়ে ফেলল ফের। ইয়াসিফ বলতে শুরু করল তখন, ‘তার আগে আমার তরফ থেকে বিশেষ কিছু কথা আপনাকে উৎসর্গ করতে এসেছি৷ আশা করি কথাগুলো একদম নিজের বিবেকবোধ থেকে বিচার করবেন৷ আই রিপিট, নিজের বিবেকবোধ থেকে। বিয়ে নিয়ে তামাশা করাটা শেখ বাড়িতে প্রথম শুরু করেছিলেন আমার প্রাণপ্রিয় ছোটো চাচা। এরপর করলেন আমার সম্মাননীয় প্রিয় বড়ো চাচা। আমার বড়োচাচি চাচার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান শ্বেতকায় এক নারী। তিনি মারা যাবার অনেক বছর পর দ্বিতীয় বিয়েটাও চাচা করলেন পরিবারকে না জানিয়ে। একদিন হুট করে বউ নিয়ে হাজির হলেন বাসায়, সবাইকে বললেন, “খুশি শুধুমাত্র জাদের মা হওয়ার জন্য এসেছে এ বাড়ি। তার প্রথম পরিচয় হবে জাদের মা, দ্বিতীয় পরিচয় হবে আমার স্ত্রী।” মানে আমার ছোটো ভাই নাওফিলের কথা বলেছেন।
তারপর বহু বছর পর সেই বিয়ে নিয়ে আবারও একবার তামাশা হলো আপনার আর তাওসিফকে কেন্দ্র করে। তামাশাটা কে শুরু করল সে কথাতে যেতে চাইছি না। ভাবিজান, আমি এ পরিবারের দ্বিতীয় নষ্ট ছেলে। প্রথম জন ছিলেন আমার ছোটো চাচা জায়িন। তাই বিয়ে নিয়ে তামাশা করার কথা আমার থাকলেও করল পরিবারের সব থেকে ভালো ছেলেটা। রীতিমতো আঘাতটা তাই বেশিই পেয়েছে আমার আব্বু আম্মু। ভালো ছেলেদের নিয়ে আশাটা বেশি থাকে না? এজন্যই আরকি। তো এই বিয়েটা আজ হওয়ার পর যদি কখনও তারা দেখে তাদের সেই ভালো ছেলেটা সব থেকে অসুখী তার বিবাহিত জীবনে। তাদের মনের অবস্থাটা আরও কত শোচনীয় হবে? একটু কল্পনা করবেন প্লিজ। আমাদের জীবন সত্যিই মুভি, ড্রামাকেও হার মানায়। তবুও আমাদের জীবন কখনই সিনেমা বা উপন্যাসের মতো হতে পারে না। যেমন লেখক তার পরিকল্পনা অনুযায়ী তার গল্প সাজায়, চরিত্রগুলোর শেষ গন্তব্য কোথায় হবে, পরিণতি শেষে কী হবে, তা লেখক সাজালেও বা জানলেও আমাদের স্রষ্টা যিনি তিনি কিন্তু আমাদের জানান না আমাদের শেষ পরিণতি কী হবে বা আগামীতে কী হবে। তাই আগামীর চিন্তাকে ফার্স্ট প্রায়োরিটি না দিয়ে বর্তমানকে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দেওয়া উচিত৷ আপনার বর্তমান কর্মই আপনার আগামী নির্ধারণ করবে। বিয়ে সম্পর্কটা বর্তমান সময়ে খুবই হালকা, নাজুক একটা সম্পর্ক৷ কিন্তু সাদা কালোর যুগে এই সম্পর্কের ওজন এতটাই ভারী ছিল যে, স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই সেই ভার বয়ে চলতে হত কবরে না যাওয়া অবধি। তার মাঝে যত বাধা বিপত্তিই আসুক, একজন আরেকজনকে খুব সহজে ছেড়ে যাবার চিন্তাটা করতে পারত না।

জীবন একটাই, এই জীবনে আপনার ভালোবেসে যেতে হবে একজন পুরুষকেই৷ আপনি বুকে অন্য একজনকে পুষে মুখে আরেকজনের জন্য লোক দেখানো ভালোবাসা প্রকাশ করবেন, এটা না আসলে ধোঁকাবাজ, পাপী, অমানুষদের বৈশিষ্ট্য। বুকে পুষে রাখা মানুষটিকে পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আপনি যদি তাকে ত্যাগ করে নিজের স্বার্থে ভিন্ন কাউকে গ্রহণ করেন, কী মনে হয় আপনার? আপনি কি নিজেকে প্রকৃত মানুষ বলে বিবেচনা করতে পারবেন? আজ না হোক, দশ বা বিশ বছর পর হলেও এই সুযোগ গ্রহণ না করার জন্য বুকটা হাহাকার করবেই আপনার। আমাদের জীবনে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য অনেকরকম থাকতেই পারে। কিন্তু তা পূরণ করতে গিয়ে এই একটা জীবনের সকল সুখকে বিসর্জন দিয়ে দিতে হবে? মানুষ বলে জীবনটা নাকি ছোট্ট! কিন্ত এতটাও ছোটো না যে, গোটা জীবনে এক কিঞ্চিৎ সুখ না পেলেও চলবে৷ চলবে কি? ক্ষণে ক্ষণে মনে হবে না জীবনটা শেষ করে দিই? কী আছে জীবনে? নিশ্চয়ই মনে হবে৷ আপনার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য পূরণ হলে তৃপ্ত হবেন। সেই তৃপ্তি নিয়ে থাকতে পারবেন এক বছর, দুই বছর, সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। কিন্তু সুখকে পায়ে ঠেলে বাঁচার মতো করে বাঁচতে পারবেন না ঠিকঠাক ছয়টি মাসও। তো একশো কথার এক কথা হলো, নাওফিলকে পাওয়ার সুযোগটা নিয়ে আমি ইয়াসিফ আপনার সামনে এসে বসেছি, বুঝেছেন ভাবিজান? অনুরোধ করছি না, একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে সুযোগ দিচ্ছি। এই মুহূর্তে তাওসিফকে নয়, নাওফিলকে বিয়ে করুন।’

ঝট করে মাথা তুলল দীধিতি। বিস্ফোরিত চোখে ইয়াসিফের দিকে চেয়ে রইল নির্বাক হয়ে। ছোটো ছোটো করে কেটে রাখা চুলে আঙুল ডুবিয়ে নির্বিকারভাবে চুলগুলো নাড়িয়ে চলছে তখন ইয়াসিফ। না তাকিয়েও বুঝতে পারছে সে দীধিতির অবাক হওয়া মুখটার অভিব্যক্তি। অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল তারপর দীধিতি, ‘নাওফিল বিয়ে করবে আমায়?’
এটা শুধুই প্রশ্ন ছিল না। এ কথায় আকুল আবেদনও ছিল। যেন নাওফিল সেদিনের কথা ভুলে ওকে আজ গ্রহণ করে নেয়।
-‘আপনি রাজি কি না সেটা বলুন৷ আপনার সম্মতি আগে প্রয়োজন।’
-‘আমি ওকে চাই…. ওকেই চাই৷’
ইয়াসিফ হাসল৷ কিন্তু তা ঠোঁটে ভেসে উঠল না। ফোনটা পকেট থেকে বের করে রেকর্ডিং অফ করল। তারপর ফারহানকে কল করে বলল, ‘ভেতরে আয়, শুধু তুই আর নাওফিলের বন্ধু চারজন।’
ফোন রাখতেই হুড়মুড় করে প্রথমে ভেতরে এলো শিহাব।তারপর একে একে বাকিরাও। ইয়াসিফ দীধিতিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার বাসায় যে বিয়ের কাগজটা গিয়েছিল। মানে মিথ্যা যে কাগজটা সেটা আন্টি দেখার পর এখানে এসে যখন জানল আপনি যাকে বিয়ে করছেন তার নাম তাওসিফ৷ তখন সামলেছিলেন কী করে? না কি বাসা থেকেই সামলে নিয়েছিলেন সেদিনই?’
চোখের পানি মুছে নিয়ে দীধিতি বলল, ‘বলেছি তাওসিফ ওর নিকনেম৷’

-‘আর কাগজের নামটা সেদিন মিস্টেক ছিল এটা জানাননি?’
মাথা নেড়ে না জানাল দীধিতি৷ এমনটা বলা ছাড়া অন্য কিছু মাথায়ও আসেনি ওর। ইয়াসিফ তুষারদের দিকে তাকিয়ে বিশাল একটা হাসি দিলো তখন৷ হেসে বলল ওদের, ‘মিথ্যেটাই সত্য হোক, ভাইসব!’
বলেই ফারহানকে বরের নামসহ, বাপ-মায়ের নাম লিখে নিতে বলল। তারপর কল করল নাওফিলকে, ‘কীরে পেলি ওকে?’
-‘হি ইজ ড্রাঙ্ক! কী খেয়ে মাতাল হলো ও জানিস? জীবনেও মদ ছুঁয়ে দেখার ছেলে না, ভাই৷ অথচ আমি ভেবে পাচ্ছি না মহুয়া কই পেল সে? কোনো হুঁশজ্ঞান নেই ওর! আমি কী করব? আল্লাহ!’
-‘তুই আপাতত ফিরে আয়৷ আমি এসে দেখছি।’
-‘মানে ফিরে আসব কেন? ওর নেশা কাটাব কেমন করে সেটা বল৷ তুষার, শিহাব, ওদের কাউকে পাঠা।’
-‘পাঁচ মিনিটে নেশা কাটবে তোর মনে হয়?’
-‘কিন্তু ও মহুয়া পেল কই? ওকে দিলো কে?’
-‘আমি!’
-‘কী?’
-‘কী কী? তুই আমাকে জিজ্ঞেস করে মাথা খাচ্ছিস! তো কী বলব? বললাম ফিরে আয় ওকে রেখে। আমি আসছি৷ আমি খাই আমি জানি কীসে কাটানো যাবে নেশা৷ সময় লাগবে। ততক্ষণে বিয়েটা তো থামিয়ে রাখতে হবে।’

-‘হুঁ, ফাস্ট আয় তাহলে।’
ফোন কাটতেই দীধিতি শক্ত গলায় বলে বসল, ‘ও সজ্ঞানে মত না দিলে আমি ওকে বিয়ে করব না, ভাইয়া।’
ইয়াসিফ কোনো জবাব দিলো না বিপরীতে। সবুজকে বলল, ‘আন্টিদের ডেকে আনবি। তবে শুধু ভাবির ফ্যামিলি আর ফ্রেন্ডস। আর কেউ না।’
-‘কিন্তু ঘাপলাটা বুঝে যাবে না? নাওফিলের নাম নিয়ে না হয় সংশয় থাকল না। বাপ মায়ের নাম শুনলেই তো বুঝে যাবে।’
-‘গেলে যাবে। আগে বিয়েটা হোক৷ তারপর বাদবাকি ম্যানেজ দেওয়া যাবে।’
সবুজ চলে যেতেই তারপরই জিজ্ঞেস করল দীধিতিকে, ‘নাওফিল নামটা এ পরিবারের ছোটো ছেলের, আপনার ফ্যামিলি তা জানে না, তাই তো? সেদিন আন্টি এসে যখন কথা বললেন আব্বু আর কাকুর সঙ্গে তখনও জানতে পারেননি?’

-‘না, কিরণ তো বলল শুধু ছোটো ছেলের বিয়ে কথাটাই নাকি বলেছিল। ইভেন আপনার নামধাম, পরিচয়ও উল্লেখ করেনি সেদিন।’
-‘ভালো কথা তবে।’
বলতে বলতেই ঘরে এসে পড়ল সবাই৷ তখনই ইয়াসিফের কাছেও কল এলো জাহিদ শেখের থেকে। তাওসিফের কথা জিজ্ঞেস করলেন তিনি, দীধিতির কবুল পড়ানো শুরু হয়েছে কি না তাও জিজ্ঞেস করলেন৷ দেনমোহর নির্ধারণ সেদিনের আলাপেই হয়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে আর কোনো কথা উঠেছে কি না সেটাও জিজ্ঞেস করলেন। ইয়াসিফ ফাঁকে এসে তাকে নিশ্চিন্ত করে বলল, ‘বিয়ে পড়ানো হয়ে গেছে, আব্বু। তোমরা তো কেউ এলে না।’
জাহিদ শেখ কিছুটা মিইয়ে পড়া গলায় বললেন, ‘তোর মায়ের সাথেই ঝগড়া করব না কি বিয়ে অ্যাটেন্ড করব? তোর দাদী যেতে চেয়েছিল। কিন্তু হাঁটুর ব্যথায় আবার ঘরে এসে বসে আছেন। তার কাছে এসে বসে আছে তোর বড়োচাচি। তোর ফুপু, কাজিন, ওরা সবাই তো আছে, না?

-‘হুঁ, সবাই-ই আছে।’
-‘তাহলেই হবে।’
কথা শেষ করে ফোন রেখে ইয়াসিফ ঘরে এসে ফারহানকে বলল ঝটপট বিয়ে পড়ানো আরম্ভ করতে। তামান্না কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি, প্রথম দেখায় যে ছেলেটিকে ওর এত ভালো লেগে গেল শেষে কি না সে বিয়ের কাজী হয়ে প্রকাশ পেল! অজস্র দুঃখে ফারহানের মুখটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে গিয়েও পারল না সে। মনটা হয়ত চিরস্থায়ী বাঁধা পড়ে গেছে ওই মুখেই। যাকগে, এক জীবনে আর কী-ই বা আছে? না হয় কাজীর বউই হবে সে!
অবশেষে নাওফিলকে বর মেনেই কবুল পাঠ করল দীধিতি। ইয়াসিফ পুরো সময়টা নিজের ফোনে ধারণ করে ছুটল এবার ফারহানকে নিয়ে নাওফিলের কাছে। দীধিতির পরিবারকে আপাতত কিছু সময়ের জন্য তুষার, সবুজ সামলে নেবে। আগে বিয়েটা সম্পন্ন হওয়া জরুরি।
নাওফিল তখন সবে শেখ ভিলার মূল ফটকে এসে ঢুকেছে। দূর থেকে ইয়াসিফ তাকে দেখে ফারহানকে জিজ্ঞেস করল, ‘মেয়ের বাড়ির লোকের থাকা কি আবশ্যক বর কবুল বলার সময়?’
-‘তা তো আবশ্যকই। নয়ত তারা জানবে কী করে বর কবুল বলেছে?’
-‘ব্যাটা বিয়েটা লিগ্যাল হবে কি না সেটা বল?’
-‘হ্যাঁ, লিগ্যাল তো হবেই।’

নাওফিল ফোনের দিকে চোখ রেখে এগিয়ে আসছে। ইযাসিফ আর এগোতে দিলো না ওকে। ছুটে গিয়ে ওকে টেনে আনল গুটি কয়েক দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর কাছে। ফারহানও পিছু পিছু এলো৷ ততক্ষণে তন্বী আর ঐশীকে নিয়ে শিহাব, রুমান চলে এসেছে৷ ওরা দেখবে নাওফিলের কবুল বলা৷ যদিও বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি ওদের কারোরই৷ তন্বী আর ঐশী তো কিছুই হজম করতে পারছে না। তবে আপাতত সকল কৌতূহল দমিয়ে রেখে বিয়েটা সম্পন্ন হয় কি না সেটাই দেখতে চায় সকলে।
-‘তুই যাবি ভাই’র কাছে, তা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিস কেন আবার?’
নাওফিলকে কোনো জবাব না দিয়ে ইয়াসিফ নিজের গাড়ির দরজাটা খুলে ওকে নিয়ে ভেতরে বসল৷ ফারহানকেও ইশারা করল ভেতরে আসতে৷ রুমান, শিহাব, তন্বী আর ঐশী এগিয়ে আসলে ওদের দরজার মুখেই দাঁড় করিয়ে রাখল। ইয়াসিফ শক্ত গলায় বলল নাওফিলকে, ‘জাদ, তুই কি জানিস জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে তুই ভীষণ ইম্যাচিওরের মতো কাজ করছিস? তাও শুধু নিজের সেল্ফ-উইল আর ইগো থেকে? তাবাসসুমকে বিয়ে করার জন্য হ্যাঁ করে দিয়ে ছুটে পালাতি তো অস্ট্রেলিয়ায়। আই নো দ্যাট। একদম স্বার্থপর সাজছিস তুই তোর জীবনের এই গল্পে। স্বার্থপর কেন বলছি সেটা বুঝেছিস?’

কথার মাঝেই আবার ফোন বেজে উঠল ইয়াসিফের। জাকির শেখ কল করছেন এখন। বিয়েটা হওয়ার কথা যেখানে বিকাল পাঁচটায়৷ সেখানে বরের হদিস নেই এখনও। কী হচ্ছে না হচ্ছে ভেবেই চিন্তাতে বড়োদের মাথা ফেটে যাচ্ছে। ইয়াসিফ আর নাওফিলের ওপর সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছেন তারা।
আপাতত ইয়াসিফ ফোনটা মিউট করে রেখে বলতে শুরু করল আবার, ‘ছোটো বেলা থেকে মিহাদ তোর জন্য বহুবার মার খেয়েছে আব্বু আম্মুর কাছে৷ তুই যেদিন ওকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিলি সেদিনই আব্বু-আম্মু ডিসিশন নিলো তোর সঙ্গে আর আমাদের মিশতে দেওয়া হবে না। তাই দাদার সঙ্গে, বড়ো কাকুর সঙ্গে ঝামেলা করে আব্বু আমাদের নিয়ে চলে এলো ঢাকা৷ আমরা তোর থেকে দূরে গিয়েও কিন্তু তোকে ছেড়ে থাকতে পারিনি৷ তোকে যখন উত্তরার স্কুলে এনে ভর্তি করল বড়ো কাকু, তখন আমরা আমাদের স্কুল ছুটির পর লুকিয়ে হলেও তোর সঙ্গে এসে দেখা করে যেতাম। ধরা পড়লে মিহাদ নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে মার খেয়েছে রোজ রোজই। আজও মিহাদ তোকে আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। কিন্তু তুই কি ওর মতো করে ওকে বাসিস ভালো? বাসলে ওর মনের অবস্থাটা অনুভব করতি৷ হ্যাঁ, দীধিতিকে ওর অপছন্দ নয় ঠিক৷ ওকে বিয়ের রাত থেকেই গ্রহণ করেও নিতে পারত মন থেকেই৷ যদি না দীধিতি তোর মনের মানুষ হত৷ তোর সামনে কখনও মিহাদ দীধিতির সঙ্গে নরমাল হতে পারবে বলে মনে হয় তোর? কিংবা হোক তোর আড়ালেই৷ ও সেদিন সরাসরি বলল, দীধিতিকে দেখলেই ওর ছোটো ভাইয়ের বউ ফিলিংস হয়৷ সেই মেয়েকে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বীকৃতি দিতে পারবে ও খুব সহজেই? ওর বিবাহিত জীবনটাকে কি তুই জেনে-বুঝে কিংবা জেদের বশেই জটিল আর অসুখী করে দিচ্ছিস না? পরে নিজেকে মাফ করতে পারবি তো যখন দেখবি তোর বড়ো ভাইটা ভেতর থেকে আহত? দীধিতির কথা বাদই দিই। সে তোর জীবনে খুব বেশিদিন আসেনি৷ সে পর, তার ভালো থাকার চিন্তা না করি আমরা। কিন্তু আমাদের ফ্যামিলি ম্যান বড়ো ভাইটা কেন ওকে বিয়ে করে অসুখী হবে, বল?’

বুকের গভীরের জেদের দেওয়ালটা এবার বুঝি চুরমার হলো নাওফিলের৷ যে দেওয়ালের জন্য অপর পাশের মানুষটার মনঃকষ্ট দেখতে পারেনি সে। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেল না? আজ বিয়ের আসরে বিয়ে না হলে দীধিতির সম্মান, ওর মায়ের সম্মানেরই বা কী হবে?
মাথা নুইয়ে মুখ দু’হাতে চেপে ধরে রইল নাওফিল। ওর বোধশক্তি এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল কী করে? ইয়াসিফ কথাগুলো না বললে কি এই বোধদয় ফিরত আজও? কথাটা ভাবতেই ভাবতেই ইয়াসিফ ক্ষুণ্ন কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তোকেও আজ এই বুঝগুলো দিতে হলো আমায়? এমন দিনও এলো? কীভাবে ইল-জাজড্ হলি তুই? তুই দীধিতির ফিলিংস নিয়েও খেলেছিস৷ ইয়েস, আমি এটাই বলব। শুরুতে তাকে নিজের ভালোবাসা বোঝালি, ভালোবাসিয়েও ছাড়লি৷ তারপর আবার তাকে দূরে ঠেলে দিতে ফিল্মি কায়দায় নিজেকে ভিলেন দেখালি৷ ওকে ফাইন, বোরিংনেস দূর করতে টুকটাক ফিল্মি শটও প্রয়োজন আমাদের সবার জীবনে। টুইস্ট থাকে৷ তারপরের কাহিনিতে যাই। এরপর দীধিতি তোর পরিকল্পনা অনুযায়ীই তোকে ত্যাগ করল, অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আজ সে তোর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত গেম খেলতে আরম্ভ করেছে, তুইও টের পেয়ে ডাবল গেম খেলতে শুরু করলি৷ সাত মাস যাবৎ তার থেকে দূরে থেকে, পরিবার থেকে দূরে থেকে নিজেকে ফিট করলি। হঠাৎ চিন্তাধারাও বদলালি। তখন আবার এই গেম খেলাখেলি বন্ধ করতে হবে বলে মনে হলো তোর। ঠিক করলি পুনরায় দীধিতিকে ভালোবাসার আর্জি জানাবি। জানালিও, আর ফলাফল প্রত্যাখ্যান। যেটা তোর ইগোতে লাগল, সহ্য হলো না। তাই জেদ করলি তাকেই ভাবি বানাবি। মানে যা মন চেয়েছে তা-ই করেছিস দীধিতির সাথে। এতটা পাগলামো, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বার্থপরতা তোর ব্যক্তিত্ব, তোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যায়?’
কতক্ষণ চুপ থাকল নাওফিল, তারপর বলে উঠল, ‘আই রিগ্রেট, আরও আগে কেন বললি না কথাগুলো? আমি ভাই’র ফিলিংস নিয়েও হেলাফেলা করছি!’ মাথার চুলগুলো হাতের মুঠোয় চেপে ধরে আফসোস করতে থাকল ও।

-‘আজকের দিনটাতে এসে না দাঁড়ালে আমি নিজেও এত কিছু উপলব্ধি করতে পারতাম না।’
-‘কী করব এখন? কী করতে বলছিস? বিয়ে আজ না হলে দীধিতির সম্মান থাকবে না৷ প্রচণ্ড অসম্মান নিয়ে ওর পরিবারকে ফিরে যেতে হবে। এটাও হতে দিতে পারি না।’
-‘বিয়ে হবে না কেন? তুইও কি মহুয়া গিলে মাতাল হয়েছিস যে কবুল বলতে পারবি না?’
নিমিষেই অগ্নিশর্মা চোখ করে তাকাল নাওফিল। আর অমনিই ধমকে উঠল ইয়াসিফ, ‘থাপ্পর দিয়ে গাল ফাটাব চোখ রাঙালে। এতক্ষণ যাবৎ বোঝালাম না ইগো ধরে রেখে জাজ করবি না কিছু? রাগ, ক্ষোভ, যা আছে বিয়ে করেও সেটা প্রকাশ করতে পারবি। বরং সেটাই আরও বেশি বেটার। একবার হারিয়ে গেলে আর তো এই ভালোবাসা কখনও ফিরে নাও পেতে পারিস৷ জীবনভর আফসোস করার থেকে একবার না হয় নিজের ইগোকে হার্ট করলি। তাছাড়া তুই-ই দীধিতিকে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য করেছিস। এটা ভুলে যাস না। তোদের মাঝে আরও ক’মাস আগে সম্পর্কটা তৈরি হলে আজ দীধিতি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হতেই পারত না।’
-‘আমি সেকেন্ড টাইম ওকে প্রপোজ করতে পারব না।’ জিদ্দি কণ্ঠেই বলল নাওফিল।
ইয়াসিফও দেরি করল না। দুম করে ওর পিঠের মাঝে কিল দিয়ে বসল। নাওফিল উঁহটুকু করার জো পেল না। তখনই ফোনের ভিডিয়োটা ওর সামনে চালিয়ে দিলো ইয়াসিফ। স্পষ্ট শুনতে পেল দীধিতি ওকে কবুল করেছে৷ তারপর অডিয়ো রেকর্ডিংটাও চালু করে শোনাল৷ পুরো রেকর্ডিংটা ধৈর্য ধরে শোনার পর নাওফিল থমথমে মুখ করে রইল আরও কতক্ষণ। অতঃপর সে অভিব্যক্তিতেই ফারহানকে বলল, ‘খাতাটা দে ফারহান ভাই। সাইন করব।’

-‘ওরে দাঁড়া ভাই! নিহাদ, কাল রাতে তো এত বিস্তারিত কিছু বললি না আমায়। শেখ বাড়ির ঐতিহাসিক বিয়ের কাজী হতে পেরে আমি তো প্রাউউ ফিল করছি।’
-‘আগেভাগে স্পয়লার দিলে কি আর সিনেমাটা এখনের মতো উপভোগ করতে পারতি? নে বিয়ে পড়ানো শুরু কর।’ বলেই ইয়াসিফ ঐশীকে ডাকল।
ঐশী রাজ্যের বিস্ময় দাঁড়িয়ে ছিল তন্বীর পাশে। ওরা দুজনই এগিয়ে এলো একসঙ্গে। ইয়াসিফ বলল, ‘ভিডিয়ো শুরু করেন, বেয়ানরা।’
গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা এখন ছয়। নাওফিলের চার বন্ধুই এসে উপস্থিত হয়েছে সেখানে৷ দীধিতির মায়ের নাকি ব্লাড প্রেসার সাংঘাতিক কমে গেছে ইতোমধ্যে। বিয়েটা এ বাড়ির বড়ো ছেলের পরিবর্তে ছোটো ছেলের সাথে কেন হয়েছে তা বোঝানোর জন্য সবুজ আর রাতুলের কাছে নাওফিল দীধিতির না হওয়া প্রেম কাহিনি শুনে তিনি অত্যধিত মানসিক চাপটা নিতে পারেননি। এখন সেখানে তাকে নিয়েই ব্যস্ত সবাই।
আসরের আজানের আগ মুহূর্তে গাড়িতে বসে নাওফিল দীধিতিকে কবুল করল শেষমেশ। তখন এক রবে ওর চার বন্ধু চেঁচিয়ে উঠল আনন্দে। তন্বী আর ঐশীও কেন যেন খুশি হলো খুব, নাওফিলের প্রতি রাগ থাকা সত্ত্বেও
কবুলের মুহূর্তটা ভিডিয়ো করে নিয়ে ওরা দুই বান্ধবী ছুটল দীধিতির কাছে।
আর ইয়াসিফ তুষার আর শিহাবকে নিয়ে ছুটল বাংলো বাড়িতে। আধা ঘণ্টার মাঝে তাওসিফকে হুঁশে আনা জরুরি এখন। ফারহানকে বাসার ভেতর পাঠিয়ে দেওয়া হলো সবুজ আর রুমানের সঙ্গে। ওদের তিনজনের কাজ বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছে সেটা জানানো। তবে কিছু সময়ের জন্য বর বদলে যাওয়ার গল্পটা চেপে রাখতে হবে৷

আর নাওফিল! সবাই যে যার মতো ছুটলেও সে একইভাবেই গাড়ির মধ্যে বসে রইল। মনে করল দীধিতিকে প্রথম দেখার দিনটা, ওকে প্রথম ভালো লাগার সময়টা। কিন্তু ভালোবাসা উপলব্ধি হলো কখন? জানে না ও। দীধিতিকে নিয়ে একের পর এক পরিকল্পনা সাজাতে সাজাতে এরই মাঝে হয়ত ভালোবাসাটাও হয়ে গিয়েছিল। আর এই ভালোবাসাটাই হলো দীধিতিকে নিয়ে ওর পরিকল্পনাগুলোকে বদলে দেওয়ার কাল। ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষের ক্ষতি করা যায়? যায় না তো। তাই জন্যই তো সুদূর অস্ট্রেলিয়াতে একাকী দিন যাপনের সময় দীধিতিকে যখন চরম মিস করতে থাকল তখনই নিজের জীবনের লক্ষ্যকে কিঞ্চিৎ বদলাল। যে লক্ষ্য ছুঁতে নিজেকেও খারাপ হতে হবে না আর খারাপ সঙ্গীরও প্রয়োজন পড়বে না। প্রয়োজন পড়বে শুধুই ভালোবেসে একে অপরের পাশে থাকার।
স্তব্ধ মুখখানিতে সহসা আলতো হাসি ফুটে উঠল নাওফিলের৷ ঝুঁকিয়ে রাখা মাথাটা তুলে জানালার বাইরে তাকাল, অধর কামড়ে ধরে হেসে। স্বগোতক্তি করল, ‘আমরা তিন ভাই চাইলে বেস্ট অ্যাক্টর হওয়ারও যোগ্যতা রাখি। বলতেই হবে দুর্দান্ত ছিল নিহাদের অ্যাক্টিং স্কিল!’
গাড়ি থেকে নেমে শেখ ভিলার বাইরে বেরিয়ে এলো সে৷ সিকিউরিটি গার্ড দুজন ওকে দেখে সালাম জানালে মুচকি হেসে সালামের জবাব দিয়ে নিরাপদে গিয়ে দাঁড়াল৷ ফোন করল ইয়াসিফকে। রিসিভ হতেই জিজ্ঞেস করল, ‘অত ঘটা করে বাসর সাজাবি না বলে দিচ্ছি।’
-‘মিহাদ ওর মনমতো সাজাচ্ছে। আমার ওসব সাজানোর শখও নেই, সময়ও নেই। ফোন রাখ তুই। এরপরের কাহিনি সামাল দেওয়ার জন্য ভাব। মিহাদ অস্ট্রেলিয়ার টিকিট কেটে ফেলেছে নাকি। ও আজ রাতেই চম্পট দেবে জেরিন আন্টির কাছে।’

তখনই তাওসিফ এসে ফোনটা নিয়ে নিলো ইয়াসিফের থেকে। নাওফিলকে বলল, ‘আমি পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ফিরছি না। আমি তো পাঠা, তাই বলিটা আমাকেই বানাবি তোরা বারবার৷ কিন্তু এই শেষ… আর না। আন্টিকে বলেছি আমার জন্য মেয়ে দেখে রাখতে। ওখানে গিয়ে বিয়েশাদি করে একবারে বাচ্চা নিয়ে ফিরব দেশে৷’
নাওফিল হেসে বলল, ‘আমাকে এসব বলছিস কেন? আমি এসব গুটিবাজি করতে বলেছিলাম না কি আজকে? তোদের দুইজনের প্ল্যান এটা। আমার কাছে আমার সেল্ফ রেসপেক্ট ভীষণ দামী। রিজেক্ট হওয়ার পর আমি নাওফিল আর জীবনেও ওকে বিয়ের প্রপোজাল দিতাম না।’
-‘আমার সেল্ফ রেসপেক্টও দামী অনেক। মিলি শালির আগে আমি যদি বিয়ে না করেছি! দেখিয়ে দেব ওকে।’
ইয়াসিফ ফোনের কাছেই ছিল বলে ওদের কথাগুলো শুনে নিয়ে বলল, ‘তোরা তো বাংলাদেশের প্রিন্স চার্মিং৷ তোরা রিজেক্ট হতে পারিস না কি? রিজেক্ট তো তোরা
করতে পারিস। ভেড়ার বাচ্চা একেকটা! নিজেদের দোষ চোখে পড়ে না তোদের? মিলি তো কমই করেছে৷ আমি ওর জায়গায় থাকলে জুতা খুলে গন্ধওয়ালা মোজা দিয়ে মারতাম। আর দীধিতির জায়গায় হলে প্রপোজের বদলে
ওইদিন কিচেনে চড়াত্ করে থাপ্পর কষে দিতাম গালে।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৯

নাওফিল আর কিছু শুনতে চাইল না। ফোনটা রেখে দিয়ে নিজের দোষগুলোই স্মরণ করতে করতে হেঁটে সামনে এগিয়ে গেল। মাগরিবের নামাজ আদায় করে তারপর বাড়িতে পা দেওয়ার চিন্তা।
আজকের বিয়েটা একমাত্র ওর জন্যই এত নাটকীয়ভাবে হলো, এটা বিনা তর্কেই মেনে নিতে রাজি নাওফিল। দীধিতিকে দূরে ঠেলে না দিলে এত কিছু ঘটতই না। তবে নিশ্চিন্ত এজন্যই যে, ভুল করলেও ভুলটা গতকাল রাতেই বুঝতে পেরেছিল সে৷ তাই তো জেদ ভুলে গিয়ে দীধিতিকে নিজের করে নিতে পারল আজ। ধন্যবাদ প্রাপ্য অবশ্যই ইয়াসিফ। এমন নাটকীয়তা না রাখলে সরাসরি আবারও যদি সে দীধিতিকে বিয়ের প্রস্তাব দিত, নিঃসন্দেহে দীধিতি দ্বিতীয়বারও প্রত্যাখ্যান করত। তবে বউটা ওর ভীষণ দুর্বল আর কোমল মনের না হলে এত সহজেও তাকে আবেগপ্রবণ করা যেত না। তবে এবার পালা বউয়ের ভুলগুলোকেও ধরিয়ে দেওয়ার।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here