আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
একটা ছোটো পাহাড়ের টিলাতে ছোট্ট ফার্ম হাউজে টানা বাইশ দিন কাটল ইয়াসিফের। কেউ ভাবতেও পারবে না এই বাইশটা দিন বন্দি ইয়াসিফের সঙ্গে কতটা অমানবিক ঘটনা ঘটেছে! কিন্তু ইয়াসিফ তবুও নির্বিকার, চঞ্চল এবং দৃঢ় মনের সেই আগের মতোই।
-‘আমরা তাহলে চট্টগ্রাম ছিলাম?’
ইয়াসিফের প্রশ্নে পাশে বসা মাভিশা ফিচেল হাসল, ‘হুঁ, চট্টগ্রাম তোমাকে ভুলবে না।’
এতগুলো দিনের নির্মম সময়গুলোকে ইঙ্গিত করে বলল মাভিশা, তা বুঝল ইয়াসিফও। মাভিশার মতোই হাসতে চেষ্টা করল সেও, ‘আমিও ভুলব না।’ গাঢ় দৃষ্টি তখন ওর
ড্রাইভিং সিটে বসা নিশ্চল, গম্ভীর মারিহামের দিকে।
-‘না ভোলারই কথা। তো তুমি বেটার ফিল করছ তো, না?’
হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকাল ইয়াসিফ। ডান হাতের আঙুলের কড়গুলোতে আঘাতের ফলে কালচে নীল হয়ে আছে, কিছুটা ফুলেও গেছে৷ ব্যথা আছে এখনও৷ এই আঙুলগুলোর ওপরই বেশি চাপ প্রয়োগ করত মারিহাম। ‘কৃতজ্ঞ তোমার কাছে, মেরি। অনেক বেশি খেয়াল নিয়েছ তুমি আমার।’
-‘ডাক্তার হিসেবে এটা তো আমার ডিউটি। বাট আ’ম স্যরি ম্যান। তোমার সঙ্গে যা হয়েছে তা দুঃখজনক। আমরা নিরুপায় আসলে।’
-‘ইট’স ওকে। আমি জড়িত না হলেও আমার ফ্যামিলির কেউ না কেউ তো জড়িতই৷ বাট থ্যাঙ্কস তোমাকে এজন্যই, তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছ৷ আর মারিহামকেও কনভিন্স করেছ আমার জন্য।’
মাভিশা হঠাৎ একটু গম্ভীর হলো তখন। মনোযোগী ড্রাইভার মারিহামের দিকে চেয়ে উদাস কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে বিশ্বাস না করা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই৷ তুমি প্লিজ আন্টকে খুঁজে পেতে সাহায্য কোরো। এলিন আন্ট খুব বেশিদিন বাঁচবেও না৷ সে শুধু কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে অ্যাটাকড্ না, লিভার ক্যান্সারও লাস্ট স্টেজে। ডক্টর নাকি বলেছিলেন তার হাতে হয়তো সময় আছে আর চার কি পাঁচ মাস। চার মাসের কাছাকাছি তো চলছেই এখন৷ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ ফ্লোরেন্সের মনের অবস্থা তাহলে কেমন।’
ইয়াসিফ নিজেও চায় না, ওই বৃদ্ধা মানুষটির কাছে না পৌঁছনো অবধি তার মৃত্যু ঘটুক। বেঁচে থাকা প্রয়োজন তার অন্তত ততক্ষণ, যতক্ষণ না জায়িন মাহতাব আর আয়মান মেহরিনের বিষয়ে কিছু না জানা যায় তার থেকে৷
-‘এমন একটা সময়ে তোমাদের তার কাছাকাছি থাকার প্রয়োজন ছিল সব সময়। তাহলে এভাবে একা এখানে আসার সুযোগ পেতেন না।’
-‘আমরা তো জানতামই না তার অবস্থা৷ আন্ট কখনও জানতে দেয়নি কাউকেই। লাস্ট কতগুলো মান্থ ফ্লোরেন্স আলাদা থাকত তার থেকে।’
-‘কেন? কী প্রবলেম চলছিল ওদের?’
-‘আঙ্কল এডওয়ার্ডকে এলিন আন্ট হুট করেই ডিভোর্স দিতে চায়৷ আঙ্কল রাজি ছিল না। আন্টকে সে খুব ভালোবাসে। ফ্লোরেন্সও আন্টের ডিসিশনকে সাপোর্ট করতে পারেনি। এর মাঝেই একদিন আন্টের পার্সনাল ডায়েরিটা হাতে পড়ে ফ্লোরেন্সের৷ একটা পেইজে লেখার পড়তে পারে। যেখানে লেখা ছিল এরকম, “সারা বিশ্বের কাছে যে মানুষদুটো ক্রিমিনাল। সে মানুষদুটো আমার জন্য এঞ্জেল৷ আমার মারিহাম, তোমার মত রত্নকে তারা আমার জীবনে উৎসর্গ না করলে আমি বেঁচে থাকার কারণই পেতাম না।” এই কথাগুলো নিছক আবেগী সংলাপ না, তাই না? কোনো অজানা সত্য লুকিয়ে এখানে। আন্টের রোজ ডায়েরি লেখার অভ্যাস থাকায় সেটা ফ্লোরেন্স বেশিক্ষণ কাছে রাখার সুযোগ পায়নি৷ ওই কথাগুলোর অর্থ কী তা জানতে বহুবার আন্টকে জেরার মুখে ফেলে ও৷ আন্ট কিছুই বলেনি। তারপর কেন সে আঙ্কল এডওয়ার্ডকে ডিভোর্স করতে চায়, তা নিয়েও খুব ঝামেলা হয় ওদের৷ এজন্যই ও রাগ করে আন্টকে ছেড়ে চলে যায় আঙ্কলের সাথে।’
-‘হয়তো মিস্টার এডওয়ার্ড দ্বারা প্রতারিত হচ্ছিলেন মিসেস এলিন।’ অযৌক্তিক কথাটা ইয়াসিফের বলা কেবল প্রত্যুত্তরে যেন মাভিশা প্রতিবার করে ওঠে৷ প্রতিবাদের ছলেই যেন আরও কথা উঠে আসে।
আর ঠিক তা-ই হলো। ‘তুমি কিছুই জানো না তাই এমনটা বলছ৷ তার প্রথম ওয়াইফ তাকে চিট করেছিল। যার জন্য অনেকগুলো বছর আঙ্কল সিঙ্গেলই ছিলেন৷ প্রচুর ডেট করেছেন হয়তো৷ কিন্তু এলিন আন্টের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আর ছোট্ট ফ্লোরেন্সের মাঝে নিজের মেয়েকে অনুভব করার পর আঙ্কল একরকম নাছোরবান্দা হয়ে পড়েছিলেন আন্টকে বিয়ে করার জন্য। আমার মম ড্যাডও তার পাগলামো দেখে এলিন আন্টকে অনেক বোঝায়। তবে আন্ট ফ্লোরেন্সের প্রতি আঙ্কল এডওয়ার্ডের নির্ভেজাল, প্রকৃত ভালোবাসা দেখে বিয়ে করে তারা শেষমেশ৷ কিন্তু সত্যি বলতে আন্টকে যতটা ভালোবাসে আঙ্কল, ততটাই আন্ট অসুখী রেখেছে সে আঙ্কলকে।’
-‘কেন?’
মাভিশা নির্দ্বিধাতেই বলে চলল, ‘এটার কারণটা জানি না আমরা৷ আমরা বলতে আমি, ফ্লোরেন্স আর আঙ্কল। আমার মম ড্যাড হয়তো জানেন। তারা আন্টকে খুব বোঝাতেন দেখতাম। আন্ট প্রচুর ড্রিঙ্ক করত৷ আঙ্কলের প্রতি উদাসীন ছিল৷ সময়ই দিতো না তাকে। সে হিসেবে আঙ্কল খুব ধৈর্যশীল প্রেমিক পুরুষ৷ তেমনই একজন ভালো বাবাও৷ বিয়ের পর সে তো ফ্লোরেন্সকে অ্যাডপ্ট করে নিয়েছিল। ফ্লোরেন্সের সব থেকে বেশি খেয়াল সে-ই রাখত৷ এটা দেখে আন্ট হ্যাপি হত আর নিশ্চিন্তও হত৷ কিন্তু সে নিজের জীবনের প্রতি কেয়ারফুল ছিল না৷ সারাদিন রাত তার উদাসীনতা, মদ খাওয়া, এসব কোন হাজবেন্ডই বা মানতে পারে? দুজনের মাঝে ঝামেলা হত প্রায়ই। তবে ফ্লোরেন্সের সামনে না কখনই৷ কিন্তু ফ্লোরেন্স বুঝত, ওর মমের জন্যই ঘরটাতে সব সময় আনন্দশূন্য অনুভব হয়।’
-‘তোমরা নেইবার ওদের?’
-‘হ্যাঁ, অনেক আগে থেকেই।’
-‘তোমরা দুজন এত ভালো বন্ধু। তাহলে দুইজন দুই প্রফেশন কেন চুজ করলে? সাধারণত যারা এমন বেস্ট ফ্রেন্ড তারা তো সব সময় এক সঙ্গেই থাকতে চায়।’ এ কথাগুলোও ইয়াসিফের বলার উদ্দেশ্য কিছু তথ্য উদ্ঘাটন করা কেবল।
-‘আমার মম ড্যাড দুজনই ডক্টর। তাই আমার স্বপ্ন আগে থেকেই এমনটা ছিল। আর ফ্লোরেন্স তো আঙ্কল এডওয়ার্ডকে নিজের আইকন ভাবে। তাই তার পেশাকেই চুজ করেছে ও।’
-‘তাদের পেশা কী?’
মাভিশা এবার দুষ্টু হেসে উঠল, ‘ওহ, তোমাকে তো জানানো হয়নি৷ ফ্লোরেন্স পুলিশ অফিসার ছিল। ওর ইন্টারোগেশনের মুখে পড়ে আর টর্চার হয়ে কিছু ডাউট করতে পারোনি?’
এজন্য কিছুটা সন্দেহ ইয়াসিফেরও হয়েছিল বটে। কিন্তু কল্পনাতীত ছিল মারিহাম আইনের মানুষ হতে পারে।
-‘কিন্তু বেচারি চাকরিটা খুব বেশিদিন করতে পারল না।’ আফসোস গলায় বলল মাভিশা।
-‘তাহলে তো তোমরা বেশিভাগই আলাদা থেকেছ পড়াশোনা, জব, উভয়ের কারণেই।’
-‘আমরা শুরু থেকেই পড়াশোনার জায়গাতে আলাদা৷ ও আমার থেকে জুনিয়র না?’
-‘তাই? কী বলো ও তোমার ছোটো? দেখে তো মনে হয় না তোমাদের৷ কত বছরের?’
-‘দেড় বছরের মতো। পড়াশোনাতে দু বছরের। মনে না হওয়ারই বা কী আছে? আমি ওর থেকে কিছুটা হেলথি। আর ও অনেক বেশিই রোগা, দেখছ না? লোকে কখনই তোমার মতো সেইম এইজ ভাবেনি।’
-‘কী জানি! মেয়েদের তো কখনও সঠিক বয়স বলতে দেখিনি।’ তিরস্কার করল ইয়াসিফ।
-‘তোমার কাছে আমার বয়স চুরি করে লাভই বা কী? তোমাকে তো আর আমার বয়ফ্রেন্ড করছি না।’ অবজ্ঞা সুরে বলল মাভিশা।
ইয়াসিফ তার কাছ ঘেঁষে এসে বসল তখন। ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি প্রপোজ করতে লজ্জা পেলে আমি করব, মেরি?’
মাভিশা হাসতে হাসতে ওকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘আমি টিপিকাল বাঙালি গার্ল না, হ্যান্ডসাম ম্যান৷ তোমাকে বয়ফ্রেন্ড করতে চাইলে বাইশ দিনে অনেক কিছু হত আমাদের, ট্রিটমেন্ট নেবার বাহানায় আমাকে যেভাবে ফ্লার্ট করতে তুমি!’
সুঠাম দেহের ইয়াসিফ একচুল না সরল। মনঃক্ষুণ্ন সুরে বলে উঠল, ‘আমাকে কোনো মেয়েই আজ পর্যন্ত অবজ্ঞা করেনি, মেরি৷’
-‘আমরাও তো করিনি। কত খাতির করলাম বলো! কেবল ওয়ে অফ অনার ভিন্ন ছিল।’ মিটিমিটি হেসে বলল মাভিশা।
ভ্রু কুঁচকে তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ, ‘এই, আমি না তোমার ক্রাশ? আবার বলছ বয়ফ্রেন্ড করার শখ নেই! ভাব খাচ্ছ কেন এখন?’
-‘লিসেন, হ্যান্ডসাম অফিসার৷ ক্রাশ অ্যান্ড বয়ফ্রেন্ড ম্যাটার আর ডিফ্রেন্ট। তবে স্বীকার করতে হবে, বয়ফ্রেন্ড হিসেবে তুমি অসম। বাট তোমার মধ্যে হাজবেন্ড ম্যাটেরিয়াল বিষয়টা নেই। আর আমার মম ড্যাড আমাকে রীতিমতো বিয়ের জন্য প্রেশারাইজ করছে বর্তমান। এখান থেকে ফিরলেই কিছু একটা হয়ে যাবে। তাই টাইম পাস করাটাও এনজয়েবল হবে না এখন।’
ইয়াসিফ দাম্ভিক এক হাসি হাসল, ‘হাজবেন্ড ম্যাটেরিয়াল পুরো ব্যাপারটাই তো আমার কাছে বোরিং। আমি বিয়েতে কোনোদিনই আগ্রহী হবো না। তুমি ওভার কনফিডেন্স কেন হচ্ছ? আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইব! হাহ্!’
কথাগুলো একটুও পছন্দ হলো না মাভিশার৷ অপমানবোধে চোখের তারায় রাগ ভেসে উঠল। সে নিজেও কখনও কোনো ছেলের থেকে অবজ্ঞা পায়নি৷ প্রথমবার পেয়েছে ইয়াসিফের থেকেই৷ ‘তুমি এখন এত গায়ে পড়ছ কেন বলো তো? রাঙামাটিতে থাকাকালীন তো চেয়েও দেখতে না। খুব চালাক ভাবো নিজেকে, না? আমি সফট্ টোনে কথা বলি বলে আমাকে সরল ভেবে পটিয়ে সব কিছু জেনে নিতে চাইছ, তা কি আমি টের পাচ্ছি না ভেবেছ?’ কণ্ঠ একটু উচুঁ হয়ে গেছে বলে মারিহাম চকিতে পিছু ফিরে তাকাল, ‘কী হয়েছে? খেপেছ কেন?’
-‘কিছু না। ঠিক আছি আমরা। তুমি সামনে মনোযোগ রাখো।’ বলল মাভিশা।
ইয়াসিফ মাভিশার কানের কাছে মুখটা এনে তখন জবাব দিলো, ‘তুমিও যে শুধু স্বার্থসিদ্ধির জন্যই আমার সঙ্গে শুরু থেকেই কোমল ছিলে এবং আছ, সেটা কি আমি বুঝিনি ভেবেছ? একজন গরম হওয়া আর আরেকজন নরম হওয়া। এটাও তোমাদের ছোট্ট পরিকল্পনার অংশবিশেষ কেবল। ভুল বললাম? মারিহাম যখন হিট করবে আমাকে, তখন তুমি সেফ করবে আমাকে। তাতে তোমার প্রতি আমার আস্থা, বিশ্বাস জন্মাবে। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে চেয়েছিলে কথা বের করে নিতে আমার থেকে৷ আর এটার পুরো পরিকল্পনায় মারিহামের। বলো, এটাও কি ভুল বললাম?’
সরু চোখে তাকাল ওর দিকে মাভিশা। ইয়াসিফের দুর্দান্ত বুদ্ধিমত্তায় মনেমনে অবাক আর মুগ্ধ হলেও তা প্রকাশ করল না। বরং অসন্তোষ চেহারা নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো জানালার দিকে।
-‘কিন্তু মূলত তুমি আমার প্রতি ক্ষুব্ধ, মেরি। কারণ, আমার রিজেকশনটা তুমি সহ্য করতেই পারোনি। তোমার ইগো এত বেশিই হার্ট হয়েছে যে, যখন আমাকে মারিহাম টর্চার করত তখন তোমার চোখে খুশির ঝিলিক বহুবার টের পেয়েছি। কী, ভুল বললাম?’
এই পর্যায়ে দুজনের অভিব্যক্তিই বদলে গেল। নিজের এই কপট আচরণ এত পরিষ্কার বুঝে যাবে ইয়াসিফ, এতটাও আশা করেনি মাভিশা। ইয়াসিফকে দেখল, সে মনোবিকারশূন্য হয়ে মারিহামকে দেখছে। ঠিক তখনই তাকে ইয়াসিফ বলল, ‘প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা খুবই ভয়ঙ্কর। আমি হিংসাপরায়ণ, প্রতিশোধপরায়ণ মানুষদের সব থেকে বেশি হিংস্র মনে করি৷ এরা নিজেদের শত্রুকে যে-কোনো উপায়ে বিনাশ করতে চায়। এই মানুষগুলোকে আমি আজীবনই এড়িয়ে চলি৷’
কথাগুলোই মনোনিবেশ করে বেশ ছোটো হলো মাভিশা নিজের কাছেই৷ এটা সত্যিই, নিজের স্বার্থে আঘাত পেলে মাভিশা কুৎসিত মানসিকতা ধারণ করে ফেলে যেন কীভাবে। সেই ব্যক্তির প্রতি আক্রোশ বা প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে তাকে আঘাত করতেও পিছুপা হয় না।
-‘বাট মেরি, তোমার প্রতি ইন্ট্রেস্টড না হওয়ার কারণ শুধু এক্সাক্ট এটা না।’
-‘তাহলে?’
ইয়াসিফ নির্বিকার গলায় বলল, ‘আমার ফেলে আসা সঙ্গিনীদের মতোই তোমার পার্সনালিটি লেগেছে। এজন্যই তুমি সুন্দরী হলেও অ্যাট্রাকশনটা আসেনি।একটু অন্য রঙের মাঝে ডুবতে চাইছি দীর্ঘদিন। কিন্তু যে মেয়েই আসে কাছে, সবাই-ই এক। একটু অন্যরকম কাউকে চাই।’
মাভিশা হাসল। বিদ্রুপ স্বরে বলল, ‘তুমি যেমন তুমি তো তেমন কাউকেই পাবে।’
ইয়াসিফ জবাব না দিয়ে হাসল। মাভিশা এবার বলল, ‘তবে সেই অন্যরকম কেউ তোমার জীবনে সত্যিই আসুক৷ আর সে এতটাই অন্যরকম হোক যে, তুমি তার থেকে নিস্তার পেতে প্রতিটা দিন তড়পাবে। কিন্তু নিস্তার আর মিলবে না।’
-‘পূরণ হোক চাওয়া।’ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল ইয়াসিফ।
এরপর না চাইতেও গাড়িতে নীরবতা নেমে এলো৷ ইয়াসিফ সামনে তাকাল আবার। মারিহামের দিকে নজর যেতেই কপালে বিরক্তির রেখা পড়ল ওর। এতক্ষণ ধরে ওরা দুটো মানুষ গল্প করছে পেছন সিটে! তবু দেখো সামনের মেয়েটার মধ্যে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা কৌতূহল নেই, ওরা কী বিষয়ে ফিসফাস করছে তা সম্পর্কে জানার৷ ‘রোবট একটা!’ বিড়বিড় করে বলে উঠল ইয়াসিফ। পরমুহূর্তেই ভাবনাতে যুক্ত হলো আয়মান মেহরিন৷ শুনেছে সে, ওই মানুষটিও অদ্ভুত অনুভূতিশূন্য ছিলেন, পুরুষ মানুষের প্রতি আসক্তিহীন৷ চুম্বকের মতো মেয়েদের যে জায়িন মাহতাবের সুন্দরতা আকর্ষণ করত, তাও মুখ থুবড়ে পড়েছিল আয়মান মেহরিনের রোবট মনের কাছে। মারিহাম যে তারই কন্যা, তা সে নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতিটা দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ করছে যেন। কিন্তু তবুও ইয়াসিফের মন সন্দিগ্ধ, দ্বিধান্বিত। নাওফিলের জন্মের পর আর কোনো সন্তান জায়িন, আয়মানের জীবনে আসেনি বলেই জানে। থাকলে অন্তত জেরিন আন্টি জানতেন। তাহলে এই মেয়েটি কীভাবে তাদের সন্তান হয়? ঢাকা ফিরেই এই সন্দেহের শেষ করতে হবে সবার আগে, সহজ উপায়ের মাধ্যমে। নাওফিল আর মেয়েটির ডিএনএ টেস্টই যথেষ্ট সত্যটা জানার। আর সেটা যে কোনোভাবে করতেই হবে।
এদিকে মাভিশা তুখোড় বুদ্ধিশালী ইয়াসিফকে নিয়ে ভাবনাতে ডুবে গিয়েছিল৷ হঠাৎ করেই ইয়াসিফকে নিয়ে কী একটা হিসাবে গড়মিল খুঁজে পেলো সে৷ চকিতেই সে হিসাবের ভুলটা ধরেও ফেলল৷ সেই সাথে বিস্ময়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে ঝট করে তাকাল ইয়াসিফের দিকে৷ বিস্ফারিত চোখে চেয়েই ডেকে উঠল ওকে, ‘ইয়াসিফ শেখ!’
ইয়াসিফ তখন মারিহামকে নিয়ে ভাবনায় মত্ত ছিল। মাভিশার অমন হতবাক কণ্ঠ নিয়ে ডাকটা কানে এলেই ফিরল তার দিকে। ‘ইয়েস?’
বিস্ময়ে কিংকতর্ব্যবিমূঢ় মাভিশা বোবা বনে গিয়েছিল কয়েক পলের জন্য। রাতের আঁধারে তার সেই মুখভঙ্গি চোখে পড়ল না তেমন। ইয়াসিফ প্রশ্নচোখেই তাকিয়ে।
-‘পুরো বাইশটা দিন তুমি আমাদের বোকা বানিয়ে গেছ!’ প্রচণ্ড ক্রোধ ছুটে এলো মাভিশার কণ্ঠ থেকে।
ভ্রু কুঞ্চিত হলো ইয়াসিফের। মাত্র এক পলের জন্য হতবুদ্ধি হলো সে মাভিশার কথার অর্থ না বুঝতে পেরে৷ কিন্তু তারপরই আসল ব্যাপারটা ক্লিক করে গেল মাথায়৷ মুহূর্তেই পাতলা ঠোঁটের কোনায় ওর দম্ভপূর্ণ তির্যক হাসি ফুটে উঠল ওর। ‘ব্যাঙকুয়েটার্স।’ বলে মাভিশাকে বিশেষায়িত করে পূর্ণ হাসি ফুটিয়ে তুলল মুখে।
মাভিশা মোটেও সে বিশেষণে গলল না। ক্ষোভে ফেটে পড়ল সে, ‘তুমি ইচ্ছা করে ধরা দিয়েছ কেন? কী উদ্দেশ্যে?’ তার উচ্চবাচ্য শুনে মারিহাম লুকিং গ্লাসে দেখার চেষ্টা করল পেছনে কী হচ্ছে ওদের মাঝে৷ ‘কী হয়েছে ম্যাভি? কীসের কথা বলছ তুমি?’
চেঁচিয়ে উঠে মাভিশা, ‘গাড়িটা সাইড করো, ফ্লোরেন্স। ফাস্ট।’
রাত এখন সাড়ে বারোটারও বেশি৷ শুনশান রাস্তার দুই ধারে গাছ-গাছালিতে ঘেরা। এমন জায়গা মোটেও নিরাপদ নয়। ইয়াসিফ মারিহামকে বারণ করল, ‘কুল ডাউন, মারিহাম। এখানে গাড়ি দাঁড় করানোটা ঠিক হবে না।’
-‘শাট আপ ইডিয়ট। ফ্লোরেন্স, এখানেই থামো। কুইক।’
জায়গাটা মারিহামেরও পছন্দ হচ্ছে না। দ্বিধা নিয়ে তবুও মাভিশার কথামতোই গাড়ি সাইড করে থামাল। ইয়াসিফ তখন মাভিশাকে বলল, ‘সিন ক্রিয়েট বা মারামারি যা-ই করো ঢাকাতে ঢুকে কোরো৷ বা গাড়িতে বসেই করো। এখানে দাঁড়ানো… ‘
-‘চুপ, বদমাশ ছেলে!’ ধমকে উঠল মাভিশা। নেমে পড়ল গাড়ি থেকে দ্রুত।
তার পেটের মধ্যে বিশ্রীভাবে মুচড়ে উঠছে। সন্ধ্যার পর থেকেই সামান্য পেটের সমস্যা দেখা দিয়েছিল তার। কিন্তু হাতের কাছে ওষুধ না থাকায় আর বেরিয়ে পড়ার তাড়া থাকায় সামান্য ভেবেই এড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন বাজেভাবে বাথরুমের চাপ এসেছে৷
ইয়াসিফ আর ফ্লোরেন্সও নামতে বাধ্য হলো। মাভিশা পেট চেপে ধরে চোখ মুখ কুঁচকে বলল ফ্লোরেন্সকে, ‘ইমিডিয়েটলি বাথরুম প্রয়োজন আমার।’
-‘হোয়াট।’ সমস্বরে বেজে উঠল ইয়াসিফ, মারিহামের হতবাক গলা।
-‘প্লিজ ডু সামথিং!’ করুণ করে অনুরোধ জানাল মাভিশা।
-‘পাশের ঝোপটাকেই বাথরুম ভাবতে হবে তাহলে। প্যান্ট নষ্ট না করে জলদি ঢুকে পড়ো প্লিজ৷ নয়ত গন্ধে… ‘ কথা শেষ করতে পারল না ইয়াসিফ, মারিহামের গরম চাউনি দেখে।
-‘ঝোপের ওদিকেই কোনো বসতি মিলবে বোধ হয়৷ ভেতরে যেতে হবে তাহলে।’ মারিহাম চিন্তা সুরে বলল।
-‘তাহলে এক্ষুনি নিয়ে চলো আমাকে৷ প্রবলেম হচ্ছে খুব।’ প্রায় কেঁদেই ফেলল মাভিশা।
ইয়াসিফের অসম্ভব হাসি পেলেও সেও খুব কষ্টে সামলে আছে। মারিহাম বলল, ‘তাহলে তো গাড়িটা এই ফাঁকা রাস্তায় পড়ে থাকবে৷ যদি চুরি হয়! এক সঙ্গে তিনজন যাওয়া যাবে না।’
-‘আমি থাকি তাহলে?’ প্রস্তাব দিলো ইয়াসিফ।
-‘নেভার। তুমি পালিয়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা কী?’
-‘ওহ প্লিজ ফ্লোরেন্স। জলদি ডিসাইড করো।’ পেট ধরেই কাতরানো গলায় বলল মাভিশা।
ইয়াসিফ আর কিচ্ছু বলল না৷ যা হচ্ছে হোক। তাতে ওর কী? লম্বা শ্বাস ছেড়ে মারিহাম সিদ্ধান্ত নিলো, ‘ইয়াসিফের সঙ্গে যাও তুমি। ও পালানোর চেষ্টা করলে যে পরিস্থিতিতেই থাকো সরাসরি শুট করে দেবে।’
চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল ইয়াসিফ তার দিকে, ‘সিরিয়াসলি! ও বাথরুম করতে বসলে আমাকে খেয়াল রাখতে পারবে?’
মাভিশা অতিশয় বিরক্তে আর পেটের বেগতিক চাপে একা একাই ঝোপের দিকে হাঁটা ধরল। ইয়াসিফ কথাটা রগড় করে বললেও ভুল বলেনি৷ মারিহাম মাভিশাকে চলে যেতে দেখে শেষে অনুরোধ গলায় বলল ইয়াসিফকে, ‘প্লিজ ইয়াসিফ৷ কোনো সুযোগ নিয়ো না। বিশ্বাস করতে চাইছি তোমাকে। যাও ওর সঙ্গে।’
ইয়াসিফ ঠোঁট ছড়িয়ে মুচকি হাসল৷ মারিহামের অনুরোধপূর্ণ কণ্ঠ ওকে অনেকটা সন্তুষ্ট করেছে৷ ‘বেশ, তুমি গাড়ি লক করে বসো। জায়গাটা ভালো না৷’
ইয়াসিফ যেতেই মারিহাম গাড়িতে ঢুকে ভেতরের লাইট বন্ধ করে দিলো। ঠিকঠাক ঘুম হয় না বলে শরীরটা ক্লান্ত লাগছে খুব৷ সিটে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজতেই আলিয়ার মুখটা তার কল্পনাতে ভাসল। বয়সের আগেই বার্ধক্যের ছাপ পড়ে গিয়েছিল মায়ের চেহারায়৷ দুর্বলও হয়ে গিয়েছিল জলদিই সে৷ কিন্তু মারিহাম তার একা থাকা, উদাস থাকা, সারাদিন বারে পড়ে থেকে মদ খাওয়া, এসব মেনে নিতে পারত না বলেই তার থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছিল অসীম। তাই তো মায়ের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগতও হতে পারেনি সময় মতো৷ এখন কী যে কষ্ট হয় তা ভেবে! কী পরিমাণ আফসোস যে হচ্ছে মায়ের মানসিক কষ্ট, শারীরিক কষ্ট তখন না জানতে পেরে! আপন বলতে মারিহাম বিশ্বাস করে, এই মানুষটি ছাড়া আর কেউ-ই নেই তার জীবনে৷ মা চলে গেলে একা পৃথিবীতে সে কী করে বাঁচবে? গলা ঠেলে কান্না আসতে চায় তার। কিন্তু চোখে পানিটুকুও আসতে চায় না। এমন কেন হয়েছে সে? কাঁদতে না পারারও কষ্টটা তীব্র যন্ত্রণার।
মিনিট পনেরো প্রায় পার হতে চলল ইয়াসিফ মাভিশা ঝোপের ওপাশে গেছে৷ ইয়াসিফকে বিশ্বাস করে ভুল করল কি না কে জানে! চোখদুটো খুলতেই হঠাৎ লক্ষ করল মারিহাম, তার গাড়ির চারপাশে বিশাল দেহী পাঁচজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের মাঝে কথা বলছে তারা। আর গাড়িটাকে বারবার দেখছে। সারা গা খালি তাদের। শুধু নিচে আন্ডারওয়্যারের মতো কিছু পরা৷ প্রত্যেকের শরীর কেমন তেল চকচকে। আলো-আঁধারিতেও তা টের পাওয়া যাচ্ছে। হাবভাব একদমই ভালো নয় এদের। হাতে দুজনের কেটে নেওয়া মোটা বাঁশ।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৮
বাকি তিনজনের হাতে রাম দা। ডাকাত! চিনতে দেরি হলো না মারিহামের। সে শুনেছে এদের কথা। তবে তো ঘোর বিপদ ওদের জন্য৷ ইয়াসিফ আর মাভিশা এখনই না চলে আসে! বসে বসে প্রার্থনা আরম্ভ করল মারিহাম।
কিন্তু বিপদ যা লেখা আছে ভবিতব্যে, তা তো হবেই। মাভিশার পিছু পিছুই ইয়াসিফ ডান পাশের ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো৷ সড়কে এসে পৌঁছতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ওপর পাঁচজন।
