আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি
নিজের চোখকে অবিশ্বাস কে করতে চায়? একটা সুন্দর মুখের আড়ালে এমন অসুস্থ চরিত্র লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটাও তো আন্দাজ করার মতো ছিল না। সে কি সত্যিই দেখেছে নাওফিলকে? না কি ওটা অন্য কেউ?
হঠাৎ কানে এল দীধিতির, মাস্টার বেডরুম থেকে কারও হেঁটে আসার শব্দ। ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে সে। এভাবে এখনো এখানে দাঁড়িয়ে পড়ে ভাবনাচিন্তা করাটা বোকার মতো হবে কাজটা। ড্রয়িংরুমের মাঝখান থেকে ছুটে এসে বেরিয়ে যাবার জন্য দরজাটা টান দিলো সে। আশ্চর্য! দরজাটা খুলল না কেন? সে তো ওই ঘরে যাবার আগে দরজাটা খুলে রেখেই গিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে দরজার হ্যান্ডেল লকটা ধরে টানাটানি শুরু করল। কিন্তু খুলতে চাইছে না কেন লকটা?
এবার ওর অতি নিকটেই হেঁটে আসার শব্দটা এসে থামল। যখন নিজের খুব কাছে কারও উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, তখন মনে হয় শরীরটা ভারী হয়ে আসছে। দীধিতি স্পষ্ট বুঝতে পারছে নাওফিল তার খুবই কাছে৷ পিছু ঘুরলেই তার বুকের সঙ্গে ধাক্কা খাবে সে। কিন্তু এখন তো পিছু ঘুরে তাকানোর সাহসটুকুও ওর নেই। হঠাত পেছন থেকে একটি রক্তাত হাত এসে হ্যান্ডেল লকটার ওপর রাখল। দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিলো ও। হাতটার কব্জিতে খেয়াল করল লম্বা একটা কাটা দাগ। এই দাগটা দেখার পর অবিশ্বাস করার মতো আর জায়গা রইল না, ছেলেটা নাওফিলই তবে। দরজাটা খুলে গিয়েছিল ওর টানাটানিতে। কিন্তু তা ও বুঝতে পারেনি। নাওফিল সেটাই লক করে দিলো আবার।পাদু’টো থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে ওর। আচমকা বাহু টেনে ধরে নাওফিল নিজের দিকে ফেরাল ওকে। নাওফিলের রক্তে মাখা বিভৎস মুখটা একটা সেকেণ্ডও দেখার সুযোগ পেল না দীধিতি। তার পূর্বেই গলায় বলিষ্ঠ হাতের চাপ পড়ে হাঁসফাঁস করতে আরম্ভ করল সে। চোখটা একটু মেলে দেখতে পেল সব থেকে বিচ্ছিরি হাসিটা। সাদা দাঁতগুলোও রক্তের মতো লাল। দীধিতির বুঝতে বাকি নেই, ওই লাশটার হৃৎপিণ্ডটাই বোধ হয় কাচা চিবিয়ে খেয়ে এসেছে নাওফিল। এটুকু চোখের পর্দায় ভেসে উঠতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ও।
প্রতিটা মানুষের জীবনে সুখের পায়রাকে হত্যা করার পিছে কোনো না কোনো অভিশাপরূপি মানুষের অস্তিত্বই থাকে। দীধিতির জীবনে এতদিন এমন একটি অভিশপ্ত মানুষের স্থান শূন্য ছিল। নাওফিল নামক নরপিশাচ মানুষটা হঠাৎ এসে সেই শূন্য স্থান পূরণ করার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে যেন। একটা মানুষও জানে না এই সুন্দর চেহারার মানুষের শয়তান সত্তার কথা। বিশ্বাস করানোর মতো কোনো কিছু হাতেও নেই তার। কিংবা আর কেউ জেনে থাকলে তাদের হাতেও হয়তো কোনো প্রমাণ নেই। আর এই সুযোগেই কত না কত মানুষকে ওর শিকার হতে হচ্ছে এবং হবে।
আজ দুপুরে সেও হয়তো আরেকটি শিকার হতো নাওফিলের। কিন্তু সেই সময়টাতেই সবাই চলে এসেছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল সে। আর তারপর তার সামনেই কত সুন্দরভাবে নিজের ওই অপ্রকাশ্য চেহারাকে ‘প্র্যাঙ্ক’ বলে চালিয়ে দিলো নাওফিল। কেউ আসল ঘটনার কিচ্ছুটি টের পেল না অবধি। সেও কোনোভাবে সত্য ঘটনা কাউকে বিশ্বাস করাতে পারল না বলে অবশেষে বাকিদের মতো তাকেও প্র্যাঙ্ক বলে বিশ্বাস করে নেওয়ার নাটকটা করতে হলো।
রাতের খাবারটা সামনে নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে দীধিতিকে বসে থাকতে দেখে তামান্না এসে হঠাৎ খাবারের প্লেটটা সরিয়ে নিলো। হুঁশ ফিরল তখন দীধিতির। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তামান্নাও ওরই মতো ভ্রু কুঞ্চিত করে ফেলল, জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কি এখনো নাওফিল ভাইয়ার প্র্যাঙ্কটাকে সত্যি ভাবছিস?’
প্রশ্নটা মেজাজ খারাপ হবার জন্য যথেষ্ট ওর। এই প্রসঙ্গে আর কারও সাথে কথা বলার মতো ইচ্ছা করছে না।
-‘আমি মানুষটা ভিতু টাইপ না তা জানিস?’
-‘হ্যাঁ জানি তো। কিন্তু সামনাসামনি এমন ভয়ানক চেহারা কোনোদিন দেখিসনি বলেই হয়তো আজ ভয় পেয়েছিলি খুব আর জ্ঞান হারিয়েছিলি।’
-‘জান হারানোর ভয় কে না পায়? আমার গলা চেপে ধরা হয়েছিল, তামান্না। কতটা জোরে চেপে ধরলে কেউ জ্ঞান হারাতে পারে এটা আইডিয়া করছিস না কেন? প্র্যাঙ্ক করলে কেউ সিরিয়াসলি মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরবে না, রাইট?’
তামান্না জবাব দেবার আশায় মুখ খুলতেই দীধিতি আগের সুরেই বলল আবার, ‘আমি ভাই মেনে নিয়েছি ওটা প্র্যাঙ্ক। আর কোনো কথা বলতে চাই না এ নিয়ে। জাস্ট একটা কথা ঐশীকে বলে দেবো আবারও, ওই নাওফিল নামক পুরুষটাকে আমি ফেস করতে চাই না এই জীবনে। তার জন্য আমি ওর বিয়েটাও অ্যাটেন্ড করার চিন্তা মাথা থেকে একেবারে বের করে দিয়েছি। এ নিয়ে যেন ও ভবিষ্যতে কোনোরকম অভিযোগ না নিয়ে আসে।’
খাবারের প্লেটটা আগের জায়গাতে রেখে তামান্না জিজ্ঞেস করল, ‘তোর গলা কি ব্যথা?’
-‘না।’ মুখ ভার করে উত্তর দিলো দীধিতি।
-‘মারার উদ্দেশ্য গলা চেপে ধরলে কতটা চাপ দিয়ে ধরতে হয় সেটা আগে আইডিয়া করার চেষ্টা কর তুই। এক লোকমা ভাত গিলে খা তো। আর দ্যাখ তো গলায় কোনো ব্যথা অনুভব করিস কি না?’
বলেই চলে গেল তামান্না। ওর কথা কানে এলেও দীধিতি মাথাতে ধরাল না কথাটা। এমন অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নিয়ে ভাবার আর প্রয়োজন নেই। খাওয়ার পর্ব চুকিয়ে প্রতিদিনকার মতো অপেক্ষা করতে থাকল সে রাতের নিস্তব্ধতা বাড়ার জন্য। পড়াশোনার উপযোগী সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে সে এই সময়টাকে।
সাদা খাতার ওপর মনোযোগ দিয়ে পরিসংখ্যান অঙ্কের হিসাবটা সমাধান করার প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ যায় তখনই মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে ওর মোবাইলের ম্যাসেজ টোনে। রাত বাজতে চলেছে দু’টোর বেশি। মেসেজটা সিম কোম্পানির নয় তা সে নিশ্চিত। এছাড়া যে খুব গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে, এমনটাও মনে হচ্ছে না ওর। তবে কৌতূহল বাড়ানোর মতো হবে এই মেসেজটি, কেন যেন এটাই সর্বশেষ মনে হলো। ফোনটা টেবিলের ওপর উলটে রাখা ছিল। হাতে তুলে নিয়ে লক স্ক্রিনেই দেখতে পেল মেসেজটা হোয়াটসঅ্যাপে এসেছে। এক মুহূর্ত দেরি করল না সে সিন করার জন্য।
‘Didhiti, Why are you so brave? What would have happened if you get a little more scared? You know, how much you loss yourself without being afraid?’
এরপর আরেকটি মেসেজ এল, ‘Tomake ami pochondo kore felechi, Didhiti. Ami amader majhe ekta sundor dirgho somporko gorte chai. Yes, I proposing to you.
মেসেজদু’টো সিন হতেই রিমুভড হয়ে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে চলে এল দীধিতি। সরাসরি কল করল ওই নাম্বারটিতে। দ্রুত রিসিভও হলো ওপাশ থেকে। নাওফিলের কণ্ঠই ওপাশ থেকে শোনা গেল এবার। এই ভারী কণ্ঠ চিনতে একটুও ভুল হবার কথা নয় ওর
-‘আমি তোমাকে সরাসরি প্রপোজ করেছি বলে তুমি আবার বেশি অ্যাটিটিউড দেখিয়ো না, দীধিতি। আমি আমাদের সম্পর্কটাকে শুধু প্রেমের সম্পর্কে না, বিয়ের সম্পর্ক অবধি টানতে ইচ্ছুক।’
-‘যদি সময়টা দশ বারোদিন আগের হতো, তাহলে হয়তো ভেবে দেখার ইচ্ছা হতো আমার। আজকের ঘটনার পর যেখানে আপনার মুখই দেখতে চাই না, সেখানে কোনো সম্পর্ক তৈরির কথা ভাবা তো বহু দূরের ব্যাপার।’
-‘যা দেখেছ ভুলে যাও। তোমার কোনো ক্ষতি করব না আমি। শুধু আমার প্রস্তাব গ্রহণ করো। ভেবে দেখার জন্য আগামী সাত দিন সময় দিচ্ছি। যেহেতু একটুখানি ভয় পেয়েছ সেটা এতদিনে কেটে যাবে আশা করি। আর প্রমিজ করছি আগামী এই সাতদিন কোনো ভয়ের মুখোমুখি করব না তোমাকে।’
কলটা কেটে দিলো নাওফিল। আর সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা মেসেজ পাঠাল সে। তবে সেটা একটা ভিডিয়ো। ভিডিয়োটা দেখতেই দীধিতির হাত কেঁপে উঠে ফোনটা নিচে পড়ে গেল। অসুস্থ ভেবেছিল সে নাওফিলকে। কিন্তু তার ধারণা যে ভুল। এই ছেলেটা সুস্থ মস্তিষ্কেরই একটা জানোয়ার।
-‘আম্মু, আমি হাত-পা ভাঙিনি কিংবা এক চোখ কানা হয়ে যায়নি যে একদিনের সামান্য দুর্ঘটনায় আমি ছয় মাস বিছানাতে পড়ে থাকব।’
-‘এই তোকে ছয় মাস বিছানাতে কে পড়ে থাকতে বলেছে? দশটা দিন বাইরে না বের হলে হচ্ছিল না? এত বড়ো দামড়ি মেয়ে বাথরুমের মধ্যে স্লিপ কাটে কীভাবে বুঝি না। এমনি এমনি তো আর বলি না তোর থেকে কিরণ অনেক বেশি ম্যাচিওরড।’
-‘বয়সে পাঁচ বছরের ছোটো। আর ও কিনা আমার থেকে ম্যাচিওরড? ঠিক আছে, বিয়েটাও ওকেই আগে করিয়ো। রাখছি, ঐশীর বাসায় চলে এসেছি আমি।’
ফোনটা কেটে রিকশা থেকে নেমেই দীধিতি কল করল তন্বীকে। রিং বাজছে, কিন্তু রিসিভ হওয়ার নাম নেই। ওরা এসে পৌঁছেছে কিনা কে জানে? ওকে হোস্টেল রেখে দু’জন মার্কেটে গিয়েছিল৷ সেখান থেকেই সরাসরি ঐশীর বাসায় চলে আসার কথা। ভাবতে ভাবতে বাসার ভেতর ঢুকে পড়ল ও। আজ রুমানদের বাসা থেকে বিয়ের দিন-ক্ষণ আর অন্যান্য জরুরি বিষয়ে আলোচনা করতে আসবে। যেহেতু ঐশীর বিয়েতে চাইলেও থাকার ইচ্ছা নেই ওর, তাই আজকের ডাকে আর ঐশীকে ফেরাতে পারল না। সেদিনের পর সময় কেটে গেছে ন’দিন। এর মাঝে একদিন বাথরুমে পা পিছলে পড়ে হাতে আর কোমরে বেশ ব্যথা পেয়ে বিছানায় পড়েছিল সে তিনদিন। নাওফিল তার কথা রেখেছে। শুধু সাতদিন নয়, সাতদিন পার হয়ে ন’দিন কেটে যাবার পরও সে ওকে আর বিরক্ত করেনি। এ কারণেই ঐশীর এক ডাকে চলে এসেছে সে।
বাসায় ঢুকে জানতে পারল তন্বী আর তামান্না এখনো আসেনি। এই দুইটা মেয়ে মার্কেটে ঢুকলে এত বেশি ঘুরতে পারে যা ধৈর্য সীমার বাইরে! ঐশী ওর ভাবিকে আর দীধিতিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার কি আজও শাড়ি পরে ওদের সামনে যেতে হবে?’
ভাবি মুহূর্তেই জবাব দিলেন, ‘অবশ্যই, জিজ্ঞেস করার কী আছে? আম্মা তো শাড়ি আর গয়না বের করেও রেখেছেন।’
দীধিতিকে চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করতে দেখে ঐশী এক ধমকে জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘এই বেয়াদব! তুই লুচ্চাদের মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?’
ঠোঁট চেপে হেসে দীধিতি ভাবিকে বলল, ‘অহনা ভাবি, তোমার ননদের দিকে কি খেয়াল করেছ?’
অহনা ঐশীর দিকে জহুরি চোখে চেয়ে দেখতে থাকল। তারপর সেও হঠাৎ মিটিমিটি হেসে বলল ঐশীকে, ‘কী ব্যাপার ননদিনী? বিয়ের আগেই শেপড পরিবর্তন হয়ে গেছে। হায় হায়! আমার এত ইনোসেন্ট ননদটাকে রুমান বিয়ের আগেই… ‘
কথা শেষ হবার আগেই ঐশী লজ্জায় পড়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ছিঃ! তোমরা আমাকে এত খারাপ ভাবলে? আরে ফোমেরটা পরেছি বলে বেশি বেশি লাগছে। ও কোনোসময়ই এসব বাজে কাজ করেনি।’
দীধিতি আর অহনা হাসাহাসির মাঝে ঐশীর মা এসে জানালেন রুমানরা চলে এসেছে। অহনা শাশুড়ি মা’কে কাজে সাহায্য করতে চলে গেল। দীধিতি ব্যস্ত হয়ে পড়ল ঐশীকে প্রস্তুত করে দিতে। এর মাঝে তন্বী আর তামান্নাও চলে এল। ঘরে ঢোকার পর থেকে ওদের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। দীধিতি জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পেল না ওদের থেকে। ঐশীর গোছানো শেষ হতেই অহনা এসে জানাল রুমানের মা আর ভাবি ডাকছে ওকে। এই ন’দিনের মাঝে রুমানের বড়ো ভাইয়ের বিয়েটাও হয়ে গেছে। রুমানের ছুটি শেষের দিকে তাই ওদের বিয়ের দিন-ক্ষণটা দ্রুত পাকাপাকি করে চলে যাবে সে।
দীধিতি, তামান্না আর তন্বী ঐশীকে নিয়ে বসার ঘরে এসেই দেখতে পেল সোফার মাঝামাঝিতে নাওফিল বসে আছে। নাওফিলকে দেখার পর থেকে বাকিদের দিকে চোখে পড়ল না দীধিতির। না হলে সে দেখতে পেত নাওফিলের পাশে বসা রাতুল, তুষার, রুমান দীধিতিকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। চোখে ক্রোধ ফুটিয়ে দীধিতি ঐশীর দিকে তাকাল। ঐশী চোখের চাউনিতে অসহায়ত্ব বুঝিয়ে বলল, ‘আমি জানতাম না।’
সময়টা মধ্যাহ্ন। তাই খাবারের আয়োজন করা হলো দ্রুত। সবাই খেতে বসেছে। ঐশী দীধিতিদের সাথে খাওয়ার বাহানায় ঘরে বসে আছে ওদের সাথে। অহনা এসে ডেকে গেল ওকে। তামান্না দীধিতিকে বলল, ‘আমরা ড্রয়িংরুমে এসেই চমক পেয়েছি। ভাবলাম তুইও আমাদের মতো চমকা একটু।’
ঐশী যাবার আগে ওদের বলে গেল, ‘তোরা বস। আমি তোদের খাবার ঘরে আনছি কিচেন থেকে। ওরা খেয়ে তারপর আলোচনাতে বসবে। ডাইনিং এ আর যেতে পারবি না তখন।’
তন্বী বলল, ‘তুই যা, গিয়ে খেতে বস। আমাদের চিন্তা করতে হবে না।’
অহনা আবার এল, এসে দীধিতিকে বলল, ‘বোন, তোরা সব নিজেদের মতো করে নিয়ে খেয়ে নে। আমরা তুলে দেবো তারপর খাবি এসব চিন্তা করিস না। ঐশীকে নিয়ে যাচ্ছি।’
ওরা যেতেই তামান্না বলল, ‘আমার সিরিয়াসলি খিদে পেয়েছে। ভাবি যখন বলেই গেছে তখন আর বসে থেকে লাভ কী?’
মুখ কুঁচকে ফেলল তন্বী, ‘তাই বলে অন্যের বাসার কিচেনে ঢুকব খাবারের জন্য? কেমন যেন লাগছে।’
দীধিতি উঠে পড়ে বলল, ‘বস তোরা, আমি গিয়ে নিয়ে আসছি।’ তামান্না খুব খুশি হলো এতে।
কিচেনে যেতে হলে ডাইনিং সাইডটা পার করেই যেতে হয়। না চাইতেও আড়চোখে দীধিতি সেদিকে তাকাল। একটা জিনিস দেখে আজ দীধিতির সব থেকে ঘৃণা জাগল। পশুর মতো চরিত্র নিয়ে নাওফিল মানুষের সামনে ধার্মিক সেজে বসে থাকে। যোহরের নামাজ আদায় করে ওরা এসেছে। মাথা থেকে টুপিটাও খোলেনি। টুপি পরে এত সুন্দরভাবে খাচ্ছে নাওফিল, এমন বেশে ওকে যেই দেখবে সেই ওর প্রতি মুগ্ধ হবে।
দীধিতিকে রান্নাঘরে যেতে দেখেই পাশ থেকে রুমান খোঁচা মেরে নাওফিলকে ইশারায় রান্নাঘর দেখাল। ফিসফিস করে বলল, ‘যাবার আগে তোকে চোখ দিয়েই গিলতে গিলতে যাচ্ছিল।’
কথাটা শোনা মাত্রই নাওফিল সটান দাঁড়িয়ে পড়ল, রুমানের বাবা জিজ্ঞেস করল, ‘উঠে পড়লি যে? তোর খাওয়া শেষ?’
-‘না মামা, একটু ঐশী ভাবিদের রান্নাঘরটাই ঘুরতে যাব।’
তুষার খাওয়ার মাঝে হাসতে গিয়ে বিচ্ছিরিভাবে মুখ থেকে ওর খাবার ছুটে পড়ল নিজের প্লেটের মধ্যেই। বোকার মতো ঐশীর পরিবার চেয়ে আছে নাওফিলের দিকে। রাতুল বলে বসল তখন ঐশীর মা’কে, ‘আন্টি, আসলে রান্নাঘরে আমাদের আরেকজন হবু ভাবি আছে। গত ন’দিন ধরে ভাবির মুখ দর্শন করতে পারেনি আমাদের ভাই।’
অহনা তখন বিস্ময় চেহারায় বলল, ‘দীধিতিকে যেতে দেখলাম। ওরও কি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে? কবে? কিছু তো বলল না।’
রুমানের পুরো পরিবার হাসছেন খেতে খেতে। রুমান জবাব দিলো, ‘জানানোর মতো করে এখনো কিছু হয়নি আসলে। ভাবি, আমার ভাইটা কি যাবে আপনাদের রান্নাঘরে ঘুরতে?’
ঐশীর ভাই-ভাবি, বাবা-মা হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে আছে নাওফিলের দিকে। আর নাওফিল এখনো দাঁড়িয়ে আছে একদম রোবটের ভঙ্গিতে। যেন অনুমতির অপেক্ষাতে আছে শুধু। চেহারা গম্ভীর, চোখের পলকও ফেলছে কত দেরিতে। এত সুন্দর ছেলেটা এমন অদ্ভুত কেন? ওর পরিচয় জানার পর থেকে ওকে একটু আলাদাভাবেই যত্নআত্তি করছিলেন ওঁরা। ঐশীর মা রুমানের পরিবারের ভাবসাব দেখে বুঝতে পারলেন এঁরা জানে বোধ হয় নাওফিল আর দীধিতির সম্পর্কের কথা। তাহলে নিশ্চয়ই ওদের দু’জনেরও বিয়েথা ঠিকঠাক হয়ে আছে। তাই তিনি আর উলটাপালটা কিছু ভাবলেন না। মুচকি হেসে নাওফিলকে বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই বাবা। তুমি যাও, ঘুরে আসো।’
উত্তরে শুধু মাথাটা নাড়িয়ে নাওফিল সোজা রান্নাঘরে চলে গেল।
তিনটা প্লেট সাজিয়ে দু’টো প্লেট হাতে নিয়ে পেছনে ফিরতেই ছোটোখাটো একটা চিৎকার দিয়ে বসল দীধিতি। তবে চিৎকারের আওয়াজ বাইরে যাবার আগেই নাওফিল মুখ আটকে ধরল ওর। নিজের ঠোঁটের ওপর অনামিকা আঙুল চেপে ধরে ইশারায় চুপ থাকতে বলল।
-‘ডাইনিং এ সবাই খাচ্ছে। তোমার চিৎকার শুনলে অন্য কিছু ভেবে বসবেন ওনারা।’
গা থেকে খুব সুন্দর একটা ঘ্রাণ আসছে নাওফিলের। ঘ্রাণটা রজনীগন্ধার মতো। সেই সাথে সাদা টুপিতে নাওফিলের মুখটা যেন অন্যান্য সময়ের থেকে একটু বেশিই উজ্জ্বল লাগছে। কিন্তু মুগ্ধ চাউনিতে লাগাম টানল দীধিতি। এই সুন্দরের পেছনেই তো ধোঁকা।
কথা বলার জন্য মুখটা খোলার পূর্বেই নাওফিল নিজের মাথার টুপিটা হঠাৎ করে ওর মাথায় পরিয়ে দিলো, কাছে এগিয়ে এসে ক্যাবিনেটের ওপর থাকা ছুরিটা হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সাতদিন শেষ হয়নি এখনো?’
কোনো জবাবও দিতে পারল না দীধিতি। শুধু ছুরিটার দিকে চেয়ে আছে ভয়ার্ত চোখে। পাশ কেটে পালিয়ে যাবার মতোও অবস্থা নেই ওর। পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে নাওফিল। নিজের হাতদু’টো বন্দি খাবার প্লেটের জন্য। এই মুহূর্তে ছুরিটা তার গলায় বসিয়ে দিলেও তো সঙ্গে সঙ্গে আটকাতে পারবে না সে। আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো তার গলা দিয়ে কথাও বের হতে চাইছে না। এতটাই ভয় পাচ্ছে কি সে? নাওফিলের হাতটা থেমে নেই। হাতের মধ্যে ছুরি নাড়াচাড়া করতে করতে দীধিতিকে দেখছে সে। অপরিকল্পিতভাবে একটা সুন্দর মিল ঘটে গেছে আজ ওদের মাঝে। দীধিতির পরনেও কালো সেলোয়ার-কামিজ আর তার পরনেও কালো পলো টি-শার্ট, প্যান্ট। খুব কাছ থেকে দীধিতিকে এর আগেও একবার দেখার সুযোগ পেয়েছিল সে। কিন্তু সেদিন গাড়ির মাঝে আলো-আঁধারি ছিল বলে আজকের মতো এত স্পষ্টভাবে দেখতে পায়নি। কী মিষ্টি এই মেয়ের মুখটা! আর সেই মেয়েটা কিনা তার মতো ভাগ্য খারাপ মানুষের নজরে পড়ে গেল? থুঁতনি, সরু নাক, নাকের আশপাশ আর ভ্রুজোড়ার মাঝে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে দীধিতির। নাকটা বেশি পছন্দ হলো নাওফিলের। নিজেকে নিজে কথা দিয়েছিল সে, আব্বুর মতো সেও তার দেখা পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর মেয়েটিকে বিয়ে করবে। আর সেই সুন্দর মেয়েটির খোঁজ পেয়ে যায় সে কলাবতী বিচে গিয়েই। হঠাৎ ছুরিটা দীধিতির চোখের নিচে ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এমন দেবে গেছে কেন চোখদু’টো? আমি কি না ঘুমিয়ে ভাবতে বলেছিলাম আমাকে নিয়ে?’
-‘কসম ভাই, আপনার কাছে কীভাবে রিকুয়েষ্ট করলে আপনি আমাকে রেহাই দেবেন বলেন? আমি ঠিক সেভাবেই রিকুয়েষ্ট করব।’
ছুরিটা সরিয়ে নাওফিল সরু চোখে তাকিয়ে রইল, দীধিতিও বলতে থাকল, ‘আমি ভয় পেয়েছি বিশ্বাস করেন। প্রচুর ভয় পেয়েছি। ভয়ের চোটে সেদিন বাথরুমে ঢুকেও আপনার করা খুনের ঘটনায় দেখেছি শুধু বাথরুমের ফ্লোরে। তারপর বাথরুম থেকে দ্রুত বের হতে গিয়ে ঠাস করে পড়েও গিয়েছি। সেই পড়ার পর তিনদিন বিছানাশয্যা হয়ে ছিলাম। আপনি বুঝতে পারছেন সেদিনের ঘটনাটা আমার ওপর কতটা ইফেক্ট ফেলেছে? আমি প্রমিজ করছি, জীবনে কোনোদিন কোথাও আমার ওই অভিজ্ঞতার কথা ভুল করেও জানাব না কাউকে। আর মাত্র কয়েকটা মাস। তারপরই আমি চলে যাব ঢাকা ছেড়ে। তারপর আপনি আপনার আশেপাশে জীবনেও আমাকে দেখতে পাবেন না।’
কথা শেষ হতেই নাওফিল আবার ছুরিটা দীধিতির মুখের সামনে ধরল। সেই ছুরির দিকে তাকাতে গিয়ে দীধিতির চোখদু’টোই ট্যারা হয়ে গেল। ওকে চমকে দিয়ে হঠাৎ করেই ছুরিটা ওর কাঁধের ওপর নিয়ে এক টান দিয়ে বসল নাওফিল। চকিতে চোখদু’টো খিঁচে বন্ধ করে ফেলল দীধিতি। তেলাপোকাটা দু’খণ্ড হয়ে কাঁধের ওপর পড়ে রইল। বন্ধ চোখের পাতার ওপর ফুঁ দিতেই চোখ মেলল ও, নাওফিল মৃদুস্বরে বলল তখন, ‘প্রমিজ করেছিলাম আমিও।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩
সাতদিনের মাঝে আর ভয় দেখাব না। সাতদিন ওভার করেও নক করিনি। সময়টা বেশিই দিয়েছিলাম। সিদ্ধান্ত বদলেছি… বিয়ে করব খুব তাড়াতাড়ি। উহুঁ, এবার প্রপোজ নয়… সরাসরি মতামত জানালাম। সেদিনের প্রপোজাল অ্যাক্সেপ্ট করলে আমাকে কিছুদিন চেনার সুযোগ পেতে। ভালোই হয়েছে, হালালভাবে কাছাকাছি এসে চিনে নেবে। চলো, রুমানের বাবা-মা আর ভাই-ভাবি তোমার সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমার আব্বু আম্মুর আগে মামা-মামি জেনে গেছেন আমার বিয়ের পরিকল্পনার কথা। একটা অজানা তথ্য জানাই, রুমানের বাবা-মা আমার মামা-মামি হন সম্পর্কে৷ আমার আম্মুর খালাতো ভাই হন হাকিম মামা।’
বলেই দীধিতির মাথা থেকে টুপিটা তুলে নিলো, আদেশ করে গেল যাবার আগে, ‘ওড়নাটা সুন্দরভাবে গায়ে জড়িয়ে, মাথায় দিয়ে তারপর এসো।’
