Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

মনে ব্যথা নিয়ে তাওসিফ ঘরে চলে গেছে। অনেকটা সময় নাওফিল তবুও একাই বসে থেকে তার আর দীধিতির জীবনের গল্পের বহু জায়গার লুপ লাইন নিয়ে ভাবল৷ যে জায়গাগুলো সহজে ধরা পড়ছে না। অথচ মনের মধ্যে তার জন্য কেমন একটা উস-খুস উস-খুস লাগছে। জাকির শেখ যেদিন বাসায় এলেন আর যতটা সময় ছিলেন। তার সর্ব সময়টাই নাওফিল সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখেছে৷ সাধারণ কথাবার্তা, আলাপচারিতা ছাড়া বিশেষ কিছু নেই৷ পুত্রবধূর মুখ দেখে জাকির শেখ দামী নেকলেস দিতেও ভুল করেননি। কেবল তাদের রুফটপে আসার সময়টুকুতে কী ঘটেছে সেটাই জানা যায়নি। সেদিন তাদের দুজনের মাঝে ওখান থেকেই কিছু একটা হয়েছিল, তা নিশ্চিত নাওফিল। তবে আজকে রাতেই দীধিতির থেকে কিছু অন্তত জানতে পারবে বলে ধারণা করছে সে।
কার্নিশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে নাওফিল সময় দেখল, রাত একটা বাজতে যাচ্ছে৷ হঠাৎ ইয়াসিফের কথা মনে পড়ল৷ প্রায় মাস একটা হতে যাচ্ছে ছেলেটা লাপাত্তা। রাঙামাটি থেকে যেদিন ফেরার কথা ছিল তার, সেদিন দুপুরে হঠাৎ কল করে ওকে আর তাওসিফকে জানাল সে জরুরি একটা মিশনে ঢুকছে৷ মা’কে যেন সামলে নেয় তাওসিফ। যদি কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পারে সে, তবে যেন রাঙামাটির পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলে ওরা৷ এরপর তার সাথে কোনো যোগাযোগ ছাড়া এক সপ্তাহ কাটলে বেশ চিন্তিতই হয়ে পড়েছিল দু ভাই৷ তখন পুলিশ সুপারের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারে, ব্যক্তিগত একটা মিশনে নেমেছে ইয়াসিফ। দুটো মেয়ের ছবি দিয়ে গেছে তাদের কাছে, সাথে আরও কিছু তথ্য। মিশনে যাবার আগে বলে গেছে সে, যদি কোনো প্রয়োজন পড়ে তার তাহলে সে কোনোভাবে সিগন্যাল পাঠালেই তবে যেন জড়িত হয় সকলে তার মিশনে। নচেৎ যা-ই কিছু হোক, তার কাছে যেন কেউ-ই না আসে৷

এমন কাজকর্ম তো নতুন নয় দুষ্প্রয়াসী ইয়াসিফের। মাসের পর মাস বাইরে পড়ে থেকেছে আন্ডারকভার অফিসার হিসেবে। ঠিক গোয়েন্দা অফিসার জায়িন মাহতাবকেই যেন দ্বিতীয়বার ফিরে পেয়েছে শেখ বাড়ি। বলা হয়নি কখনও, নাওফিলও এজন্যই নিজের বাবার প্রতিচ্ছায়া ইয়াসিফকে তাওসিফের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
ঘরে ফিরে এলো নাওফিল৷ আবছা আলোয় বিছানা শূন্য দেখতে পেয়ে ব্যালকনির দিকে নজর গেল৷ দরজা খোলা। নিঃশব্দে সেখানে এসেও পেলো না দীধিতিকে। কিরণের কাছে গিয়ে শুলো না তো আবার? ঘটনাটা রুনা দেখে নিলে মন্দ হবে না অবশ্য। ওর আর দীধিতির সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, তা দেখানোর জন্যই তো তাকে নিয়ে আসা। কিন্তু তাই বলে নাওফিল পুরো রাত বউ ছাড়া থাকতে রাজি নয়!
বেরিয়ে এসে কিরণের ঘরে টোকা দেবার আগে একবার লিভিংরুমে এসে চেক করে নিলো৷ আর সেখানেই এসে সোফাতে এক কাত হয়ে ঘুমাতে দেখল দীধিতিকে৷ মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ডাকল তাকে, ‘স্মরণ, ঘরে চলো। স্মরণ?’

খুব বেশি গাঢ় হয়নি ঘুম দীধিতির। দুবার ডাকেই সজাগ হয়ে ডাকের উৎসের দিকে চোখ মেলে তাকাল৷ নাওফিলকে আর কোনো কথা খরচ করতে হলো না৷ একবার ওকে দেখেই দীধিতি উঠে পড়ল সোফা ছেড়ে। নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই নাওফিলও তার পিছু নিলো। সে সময়ই ঝট করে নিচে তাকাল একবার৷ গেস্টরুমের দরজা মুখে রুনাকে চোখে পড়ল তখন৷ নাওফিল তাকানোর মুহূর্তেই সে ঘরে ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু তবুও নাওফিলের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি সে৷
ঘরে এসেই দীধিতি কিন্তু বিছানা কোন ঘেঁষে শুলো না। বরং একদম মাঝ বরাবর আসনপিঁড়ি হয়ে বসল। নাওফিল বুঝল আজকের ঘটনার জন্য একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে বউ। এমনটা তো সে ধারণায় করেছিল। তবুও গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল, ‘সরে বসে আমার শোয়ার জায়গা দাও।’
একচুলও সরল না দীধিতি৷ ভূতে ধরা মানুষের মতো মুখ গোঁজ করে বসেই রইল। একটুক্ষণ দাড়িয়ে তা দেখে নাওফিল পাশের অল্প জায়গাতেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। চোখটা যখন বুঝল অমনি মাথার নিচের বালিশটা সরে গেল। অর্থাৎ দীধিতি টেনে নিয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে নাওফিল তাকাল তখন তার দিকে, ‘কী হচ্ছে?’
-‘উঠে বসো।’ প্রচণ্ড গুরুগম্ভীর স্বর দীধিতির।
কথামতো উঠে দীধিতির পাশেই বসল নাওফিল। চকিতে প্রশ্ন ছুঁড়ল দীধিতি, ‘আমি কি একবারও জানিয়েছি আমার রান্নাবান্না করতে কষ্ট হয়?’

-‘জানাওনি? কী বলো? মনে করে দেখো। এক সপ্তাহ যাবৎ প্রতি বেলা জানিয়েছ।’
বুঝতে পারল দীধিতি নাওফিলের ইঙ্গিত। ‘তাই বলে ওই মেয়েটাকে ডেকে আনবে তুমি? তোমার আগের ফ্ল্যাট থেকে একেই না তুমি অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলে?’
-‘হুঁ, তাতে কী? সে আমাদের বাড়ির পুরোনো এবং সব থেকে বিশ্বস্ত সার্ভেন্ট। আর ওর রান্নার হাতও চমৎকার৷ বাইরের লোকের রান্নায় যখন খেতে হবে তখন ভালো রাঁধুনিকেই আনা বেটার।’
-‘তো তুমি ঠিক করে নিয়েছ এখন থেকে ও এখানেই থাকবে?’
নির্বিকার গলায় জবাব দিলো নাওফিল, ‘যতদিন পর্যন্ত আমার সংসার আগের মতো না হচ্ছে ততদিন তো একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। তাছাড়া টানা চারমাস তুমি সংসার সামলে, স্বামীর খেদমত করে খুব বোর হয়ে গেছ৷ একজন বিবেকবান স্বামী হিসেবে আমারও তোমার খেয়াল রাখা উচিত। তাই তোমার যতদিন মন চায় ততদিন সেই ব্যচেলর দীধিতির মতোই এনজয় করো সব কিছু। আমি কোনো আপত্তি করব না। যদি চাও তো তোমার ফ্রেন্ডদের সঙ্গে দেশের বাইরে কোথাও ট্যুরের ব্যবস্থা করে দিই৷ মন, শরীর, দুটোই খুব চাঙ্গা হবে এতে। তারপর মন চাইলে বাসায় ফিরে সংসারকে হাতে তুলে নিয়ো আবার। না নিলেও প্রবলেম নেই। আই উইল ম্যানেজ। তোমার যেটা প্রয়োজন শুধু সেটা মুখ ফুটে আমাকে বোলো৷ সাধ্যের মাঝে হলে মুহূর্তেই তা পূরণ করব ইন শা আল্লাহ।’
শান্ত সুরের কথাগুলোতেই যে কত ধারাল খোঁচা দিলো নাওফিল, তা দীধিতির অনুভব করতে সময় লাগেনি। ব্যথাহত চোখে চেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করল দীধিতি, ‘পূরণ করবে বলছ?’

-‘বললামই তো করব।’
এ সুযোগেই দীধিতি জানাল তার অভিমানী অভিযোগ। ‘বিয়ের পরদিন আমি জানিয়েছিলাম তুমি রাজনীতিতে জড়াও তা আমি চাই না। আমি সাধারণ, নির্ঝঞ্ঝাট সংসার চাই। আমার ধারণা ছিল তুমি কথাটা মনে রাখবে। এবং সত্য হলো, আমার এই সাতদিনের অস্বাভাবিক আচরণের কারণটা একটু হলেও তুমি ধরতে পেরেছিলে। কিন্তু বুঝেও তা গুরুত্ব দাওনি। বাপ-দাদার আদেশকে শিরোধার্য ভেবে মেনে নিয়েছ।’
জবাবে নিশ্চুপ দেখাল নাওফিলকে। এ ব্যাপারটার কিছুটা আন্দাজ করেছিল সে সত্যই। কিন্তু সে যে মোটেও বাধ্য হয়ে রাজনীতিতে ঢুকছে না, বরঞ্চ স্বেচ্ছায় নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। দীধিতি ওর জীবনে না এলেও একটা না একটা সময় এসবের মাঝে প্রবেশ করতই সে। দেশদ্রোহী বাবা-মায়ের সন্তান যে সেই বাবা-মায়ের মতোই দেশদ্রোহী হতে পারে না… রক্তে কখনও দোষ থাকে না… জন্মগতভাবেই বাবা-মায়ের মতো কোনো সন্তান সন্ত্রাস হয় না, তা প্রমাণ করার জন্যই নিজেকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে। বুকের মধ্যে গুঁজে রাখা আপন-পর সমস্ত মানুষের এই অপবাদগুলোর কষ্ট দীধিতিকে তো কখনও দেখানো হয়নি। বলাই হয়নি সেভাবে, শৈশব থেকে যুবক কাল অবধি এই অপবাদগুলো শুনতে শুনতেই বড়ো হতে হয়েছে ওকে কেমন করে। সে-ই বা তবে বুঝবে কী করে? অন্তর্যামী নয় কেউ তারা।

বাকশূন্য নাওফিলের উদাসীনতা দেখে দীধিতির আরও বেশি কষ্ট লাগল, অভিমান হলো। এবার সে বিছানার কোন ঘেঁষেই শুয়ে পড়ল নীরবে। নাওফিলেরও সুপ্ত রাগ উধাও হয়ে গেছে দীধিতির খারাপ লাগাটা উপলব্ধি করে৷ ওপাশ ফিরে শোয়া দীধিতির বাহু স্পর্শ করে নরম সুরে বলল, ‘কথা শেষ হয়নি আমাদের৷ আমার দিকে ফেরো, স্মরণ।’
-‘আসল কথা শেষ। এরপর যে কথা হবে সব অপ্রয়োজনীয়।’
-‘সেকি অপ্রয়োজনীয় কেন হবে? তোমার আরও কিছু বলার আছে আমাকে আর আমারও তোমাকে। সেসব মোটেও অপ্রয়োজনীয় নয়।’
দীধিতি পায়ের কাছ থেকে চাদরটা টেনে নিয়ে চট করে তার মধ্যে ডুব দিলো। নাওফিল হতাশ চেহারায় নির্বাক হয়ে চাদরে মুড়ি দেওয়া দীধিতিকে দেখতে দেখতে একটু সময় বাদে পেছন থেকেই জড়িয়ে ধরল তাকে। ‘বেশ। কোনো কথাই আর বলব না এখন৷ কিন্তু গত সাতদিনের চারটাদিনই আমাকে মানসিক, শারীরিক, উভয়ভাবেই অবহেলা দিয়েছ। প্রথম তিনদিন তোমার বিরক্ত অভিব্যক্তিকে গ্রহণ করেই কাছে এসেছিলাম। আজকে সেটা মানব না।’

-‘আমার মুড নেই, ছাড়ো আমাকে।’ চাদরের ভেতর থেকেই জোড়ালো গলায় বলল দীধিতি।
-‘কিন্তু আমার মুড আছে।’
-‘তোমার মুড প্রতিদিনই থাকে৷ তাই বলে আমারও তোমাকে প্রতিদিন স্যাটিসফাইড করার মুড থাকতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।’ একই গলাতেই জবাব দিলো সে।
-‘কথা আছে এবং বাধ্যবাধকতাও আছে স্ত্রীর৷ যখন তোমার স্বামী তোমার সঙ্গ কামনা করবে, তখন তুমি অসুস্থ না থাকলে যে কোনো পরিস্থিতিতেই আগে আমাকে সন্তুষ্ট করতে বাধ্য৷ খালি মাসিক চক্রের সময়টুকু ছাড়া।’ শেষ বেলায় দীধিতির কানের সঙ্গে ঠোঁট মিশিয়ে বলল নাওফিল।
এক ধাক্কায় নাওফিলকে সরিয়ে দিয়ে চাদরের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল তখন দীধিতি৷ রেগেমেগে পা ছোড়াছুড়ি করে গা থেকেও চাদরটা ফেলে দিলো। পাশে বসে ড্যাবড্যাবিয়ে তা দেখে নাওফিল কপট বিস্ময় গলায় বলে বসল, ‘এখন কি সিনেমার মতো জামা-কাপড় খুলে ফেলে বলবে না কি, এসো ঝাপিয়ে পড়ো আমার ওপর! পূরণ করো তোমার চাহিদা! কিন্তু তুমি আমার এই শরীরটাই শুধু পাবে, মনটা না!’

-‘আমার অসহ্য লাগছে তোমার ঢং!’ চেঁচাল দীধিতি। এখন সে সত্যিই কিরণের কাছে গিয়ে থাকবে ভেবে বিছানা থেকে উঠতে গেলেই নাওফিল দ্রুত কোমর জড়িয়ে ধরল। নিজের চওড়া বুকের নিচে তাকে জাপটে নিয়ে প্রেমঘন সুরে বলল, ‘মন ফোন তো সবই দখলে আমার। তাই মন না দেওয়ার হুমকি দিলেও ভয় নেই।’
ছটফট না করলেও ঠোঁট চেপে মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখল দীধিতি৷ কোনো কথায় বলল না সে। নাওফিল সেসব দেখেও পরাস্ত হলো না। দীধিতির শুভ্র উজ্জ্বল স্কন্ধে, কণ্ঠে আর বক্ষোজ খাঁজে উষ্ণ চুমুর তাণ্ডব চালাতেই দীধিতি ওকে থামাতে তার লাভ শেপের ঠোঁটজোড়া যখন খুলল, নাওফিল অবিলম্বেই সেই ঠোঁটে ক্রোধশীল চুমুই সংঘৃষ্ট হলো। সব ভুলে দুজন নিমেষেই তা দীর্ঘ সময়ে রূপ দিলো।
বেলকনির গ্রিল জড়িয়ে থাকা মর্নিং গ্লোরির লতা মৃদু বাতাসে যখন দোল খায়, যখন বেলির আকৃষ্ট করা সুঘ্রাণ সে বাতাসেই ভেসে বেড়ায় ঘরের এ-কোন ও-কোন, নাওফিলের কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে দীধিতি তখন ফিসফিসিয়ে প্রগাঢ় কণ্ঠে আবদার জানায়, ‘আমার বুকের ওপরে তোমার প্যাশনেট চুমুটা চাই, নাওফিল।’

-‘মার্ক পড়ে যাবে সোনা।’ ফিসফিসিয়ে বলল সেও। মুখটা তখন ওর দীধিতির গ্রীবার কাছে লুকোনো।
-‘তবুও চাই।’
-‘হঠাৎ কেন এমন আবদার?’
-‘মাঝে মাঝে দেখতে সুখ লাগে।’
নাওফিল মুচকি হাসল, ‘তথাস্তু, বেগমজান।’

ঝোপটা পেরিয়েই বিশাল বাগান। আম গাছের মাঝেমধ্যেই মেহগনি গাছও রয়েছে বাগানে। নিকষ কালো সারা জায়গাটা৷ প্রশস্ত দেহের এক আম গাছের পেছনে লুকিয়েছে ইয়াসিফ, ডাকাত তিনটার হাত থেকে বহু কষ্টে ছুটে।
শুকনো পাতার ওপর এক জোড়া পায়ের মড়মড়ে আওয়াজ খুব কাছ থেকে শুনতে পাচ্ছে সে৷ ব্যক্তিটা মন্থর পায়ে হাঁটার চেষ্টা করলেও শুকনো পাতায় তা সম্ভব হচ্ছে না৷ কিন্তু ডাকাত তিনজন বড্ড জেদি। হাল ছাড়ার পাত্র নয় তারা। সারা বাগানে চিরুনি তল্লাশী চালাচ্ছে৷ এদিকে হাতের নাগালে শক্তপোক্ত একখানা ডালও মিলছে না ইয়াসিফের। রামদা’টা আন্দাজের বশেই বেশ ক’বার বাতাসে চালিয়ে গেছে ডাকাতগুলো। কিন্তু লাভ হয়নি৷ তবে একবার কপালে সেই বাতাস ছুঁয়ে গেছে ইয়াসিফের। এবার মনে হচ্ছে ওর অবয়ব ধরা পড়ে গেছে। কারণ, পায়ের আওয়াজটা ধীরে ধীরে কাছেই আসছে কেবল। মানুষটার ঘনঘন নিঃশ্বাসের শব্দও অতি নিকটে টের পাচ্ছে। কী করবে এখন? ভাবতে ভাবতেই কাজটা করে ফেলল৷ মানুষটার উপস্থিতি একদম সামনে টের পেতেই শক্তভাবে এক হাতের মধ্যে গলা আটকে ধরল তার, আরেক হাতে মুখ চেপে ধরল। ডান পা দিয়ে তার পা দু’টোও পেচিয়ে ধরল এমনভাবে, যাতে করে কোনোভাবেই ছুটতে না পারে আর পা দিয়ে আঘাতও করতে না পারে ওকে। এভাবেই চেপে ধরে রাখবে কিছুক্ষণ৷ নিঃশ্বাস নিতে পেরে মারা পড়বেই৷

কিন্তু ভাবনাটা বেশিক্ষণ টিকল না৷ এমন নরম তুলতুলে, রোগা শরীর কোনো ডাকাতেরই হতে পারে না! ওই তিনজন তো নয়-ই৷ ব্যক্তিটার উঁ… উঁ করা গোঙানির আওয়াজটাও সম্পূর্ণ এক নারীর মনে হচ্ছে৷ ভুল হচ্ছে না তো বুঝতে? বিভ্রান্ত হলো ইয়াসিফ৷ মারিহাম, মাভিশা আর যা-ই হোক ওকে বাঁচাতে দ্বিতীয়বার তারা এই বিপড় ঘাড়ে নেবে না! এতক্ষণে নিশ্চিত গাড়ি টেনে পালিয়েও গেছে দুটোই। তাহলে এটা কে? সত্যিই কি কোনো মেয়ে? সংশয় কাটাতে হঠাৎ গলা আটকে ধরা ওই হাতটা সে বুকে নামিয়ে নিলো ব্যক্তিটার। মুহূর্তেই বিদ্যুতের ঝটকা খেলো যেন হাতে। চকিতেই সেই হাতটা সরিয়ে মুখ চেপে ধরা হাতটা শিথিল করে নিচুস্বরে তার কানেকানে বিস্মিত হয়ে শুধাল, ‘সাদা চামড়া, তুমি না কি?’

-‘হুঁ।’ মারিহামের আওয়াজটা শোনাল সিনেমায় থাকা ভূতের গলার মতো৷
ইয়াসিফের একটু আগের বোকামো কাজটাতেই যে মারিহাম প্রচণ্ড রেগে, স্রেফ পরিস্থিতি শিকারে ক্রোধান্বিত চাপা কণ্ঠে ‘হুঁ’ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু বলতে পারল না বেচারি। তা বেশ বুঝল ইয়াসিফ।
এর মাঝেই এবার কিছুটা দূরে কয়েক জোড়া পা চলার মড়মড়ে আওয়াজটা শুনল ওরা। মারিহাম খাদে নামানো গলায় দ্রুত জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফকে, ‘নাইফ চালাতে জানো?’
-‘উহুঁ।’
দেরি করল না মারিহাম তার পিস্তলটা ইয়াসিফের হাতে তুলে দিতে। তখনও সে ইয়াসিফের বুকের মাঝে, বাহুডোরে মিশে। ইয়াসিফ বলল, ‘তুমি বিপদে পড়বে তাহলে।’

-‘আমি নাইফ চালানোর ট্রাই করব৷ এটা আমি ভালোই জানি৷ আশা করছি পিস্তলে তুমি পারফেক্ট।’
-‘হান্ড্রেডে হান্ড্রেড।’ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসপূর্ণ এবার ইয়াসিফ।
জল্লাদদেহী ডাকাত তিনটা ওদের উপস্থিতি ধরে ফেলেছে ফিসফাস আওয়াজ শুনতে পেয়েই। তারা প্রবল গতিতে এগিয়ে আসছে ওদের কাছে। তা টের পেলো ওরাও৷ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার ভুল করল না কেউ-ই৷ দুজন দু’দিকে দৌড়ে চলে গেল৷ এবার ডাকাত তিনজন চলার শব্দ অনুসরণ করে দু’দিকে ছুটল।

ইয়াসিফ গাছের নিচের দিকে মোটা একটা ডাল পেয়েছে। সেটা ধরে বেশ উপরে চলে এলো৷ সমস্যা হলো অন্ধকারে বোঝার উপায় নেই কিছুই। তাহলে টার্গেট করবে কীভাবে? একটু ভেবেই বুদ্ধি পেলো৷ ছোটো শুকনো ডাল ভাঙার মর্মর ধ্বনি করল সে৷ এই আওয়াজেই শত্রুকে কাছে আনবে৷ ঠিক তা-ই হলো। দুজনের তরতরিয়ে এদিকেই আসার শব্দ পেলো৷ গাছের নিচে আসতেই ইয়াসিফ অবয়ব কিছুটা বুঝল। কিন্তু গুলিটা কোথায় বিদ্ধ হবে বলা যাচ্ছে না৷ তবুও একটা অবয়বকে আন্দাজের বশেই শুট করে দিলো। আর্তনাদ করে উঠল সে৷ অথচ মারিহাম যখন শুট করেছিল তখন লোকদুটো এটুকু আওয়াজ করারও সুযোগ পায়নি। কারণ, এমন জায়গা লক্ষ করে সে গুলি দুটো ছুঁড়তে পেরেছিল, যার জন্য সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু ঘটেছে। তার মানে ওর গুলিটা এই ডাকাতের গায়ে এমন কোথাও লেগেছে, যেটা ওরকম বিপজ্জনক হয়নি। দ্বিতীয়জন আহত সঙ্গীকে ফেলেই সটকে পড়েছে সেখান থেকে। কিন্তু ইয়াসিফ না দেখতে পেলেও নিশ্চিত, গাছের অপরপাশেই সে চুপটি করে দাড়িয়ে। তাকে কীভাবে শিকার করবে? নিচের আহত জন্তুটা এখনও ককিয়ে সঙ্গীদের সাহায্য কামনা করে যাচ্ছে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৯ (২)

এদিকে মারিহাম নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে গাছের সাথে লেপটে। ওর দেহ আর মাথার চারপাশে জানোয়ারটা রামদা বাতাসেই আন্দাজের বশে চালিয়ে যাচ্ছে৷ যখন তখন গা ছুঁয়ে যাবে… এতটাই কাছে সে। মাথাটা নিচু করে বসে পড়ারও উপায় নেই। এই মুহূর্তে পিস্তলটা থাকলে প্রাণ সংশয়ে পড়ত না সে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫০ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here