Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি

মানুষ বলে অতীতকে পিছু রেখেই ভবিষ্যতের দিকে এগোতে হয়। অতীতের প্রভাবই যদি বর্তমান আর ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করে তবে অতীতকে কীভাবে পিছু রেখে এগোনো যায়? এই যে অস্ট্রেলিয়া চিরকালের জন্য ত্যাগ করার শপথ করেছিলেন জনাব শেখ সাহেব। তা কি তিনি পারলেন? নাওফিলের পনেরো বছর বয়স থেকে এ দেশে যাতায়াত রাখাটা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আটষট্টি বছর বয়সটা এ যুগে একজন বৃদ্ধর বিছানাশয্যা হয়ে যাবার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আল্লাহ পাক তার ভাগ্যে ছেলে নিয়ে এমন ভোগান্তি রেখেছিলেন বলেই হয়তো এখনো তার শক্তি সামর্থ্য রয়েছে কিছুটা শরীরে। পনেরো বছর বয়স থেকে মানসিক চিকিৎসা চলছে একটি মাত্র ছেলের। গত বছর তো তিনটা মাস নাওফিলকে রেখেও গিয়েছিলেন সাইক্রিয়াটিস্ট জেরিন ইসলামের কাউন্সিলিংয়ে। এই মানুষটি কেন যেন নাওফিলকে একদম সন্তানের মতো মমতা করেন। নাওফিলকে বুকে জড়িয়ে নিয়েও বসে থাকতে দেখেছেন। তিনিও কম চেষ্টা করছেন না ওকে সুস্থ করে তোলার জন্য। তবুও ছেলেটার একেবারে সুস্থ হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই। কবে আল্লাহ পাক মুখ তুলে তাকাবেন তার ছেলের দিকে? ক্ষমতার দাপটে আইন আর জনসমাজ থেকে ছেলের অসুস্থ রূপ লুকিয়ে রাখতে পেরেছেন এত দিন। কিন্তু সেদিন নিজের ফ্ল্যাটেই একটা মেয়ের সামনে ভয়াবহ খুন করে বসেছে সে। মেয়েটিকেও মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। ভাগ্যিস অ্যাপার্টমেন্টের কোণায় কোণায় রাতুল, তুষারের বুদ্ধিতে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছিলেন। নয়তো মেয়েটাকেও কীভাবে খুন করত কে জানে! সময় মতো রুমানদেরকে কল করে পাঠিয়েছিলেন বলেই রক্ষা।

-‘মি. শেখ! ভাবনা থেকে বের হবেন কি?’
মিষ্টি কণ্ঠে ভাবনার সমাপ্তি ঘটালেন জনাব শেখ। ডক্টর জেরিন বাসায় এসে গেছেন। তিনি উঠে দাঁড়াতেই জেরিন মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিসেসকে এবার আনলেন না?’
-‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না ওর ইদানীং। এত দূর জার্নি শরীর নিতে পারবে না বলে আনিনি।’
-‘এভাবে ড্রয়িংরুমে বসে আছেন কেন? ছেলের সঙ্গে নিজেও তো একটু বিশ্রাম নিতে পারতেন।’
-‘সমস্যা নেই। অপেক্ষা করছিলাম আপনার জন্যই।’
-‘কথা হবে পরে। আগে খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম তারপর কথাবার্তা।’
-‘আপনার ছেলে বোধ হয় ঘরে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।’
-‘আমি যাচ্ছি। আপনি প্লিজ বসে থাকবেন না। আসুন, আপনিও ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হবেন।’
শেখ সাহেব গেস্টরুমে চলে গেলেন। জেরিন আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। দ্রুত পায়ে ওপরে চলে গেলেন, নাওফিলের ঘরটাই। নাওফিলের ঘুম ছেড়েছে একটু আগেই। অলসতা নিয়ে শুধু শুয়ে আছে সে৷ জেরিনকে ঘরে ঢুকতে দেখেই উঠে বসল, ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন, মনি?’
জেরিন এগিয়ে এসে নাওফিলের কপালে চুমু খেলেন। পাশে বসতেই নাওফিল বলে উঠল, ‘আব্বুকে এবার স্ট্রেস কমানোর কিছু নিয়মনীতি সাজেস্ট করে দিয়েন তো।’
জেরিনে হেসে ফেললেন, ‘বাহ্! আব্বু আসে ছেলেকে ভালো করতে আর ছেলে বলে আব্বুকে ভালো করতে।’
-‘অনেক বেশিই টেনশনে আছেন।’

মুখটা মলিন করে জেরিন বললেন, ‘টেনশনে তো তুমিই রাখছ। অনেক তো হলো নাওফিল। বয়সটা কম হয়নি ওনার। এখনো এই বয়সে তোমাকে নিয়ে এত দূর ছুটে আসছেন যখন তখন। এটাই কি কম কিছু?’
নাওফিল মাথা নুইয়ে ফেলল৷ জেরিন একটু সময় নিয়ে নাওফিলের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। গত বছর যে তিনটা মাস তার কাছে ছিল নাওফিল, সে বছর নাওফিলের জন্য সব থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি। যদি পারতেন, চিরকালের জন্য নিজের কাছে রেখে দিতেন এই ছেলেটিকে। এই মুখটা দেখলেই চোখের সামনে তিনটি মানুষের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে জেরিনের। আদৌ সেই তিনটি মানুষ এই পৃথিবীতে জীবিত আছে কিনা কে জানে! নাওফিলকে দেখলেই কষ্টটা দ্বিগুণ রূপ নিয়ে আবার বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ হয় তার।
ছলছল চোখের দিকে চেয়ে নাওফিল বুঝে গেল জেরিন কী ভেবে আবেগি হয়ে পড়েছেন। জেরিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল সে, ‘আব্বুকে কিছু একটা বলে আশ্বাস দিয়েন আমি ঠিক হয়ে যাব।’

-‘সেটা তো প্রতিবারই দিই।’
-‘এবার এমন কিছু বলবেন যেন আব্বু কিছুটা স্বস্তি পান।’
-‘তুমি ঠিক থাকলেই তো হয়। আমার কি আশ্বাস দেওয়া লাগে?’
-‘আমি এ জীবনে পারব না ওনাকে শান্তি দিতে। চেষ্টা করেছি আমি, কিন্তু পারি না তো।’
কী বলবেন জেরিন? এই ছেলের বুকে দাফন করে রাখা কষ্ট যে তার থেকেও বেশি। দু’জনেই কিছু সময় দৃষ্টি নত রেখে নিশ্চুপ রইল। হঠাৎ নাওফিল ঠোঁট চেপে হেসে উঠল। তা খেয়াল করে জেরিন জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করার পূর্বেই নাওফিল নিজেই ফোন থেকে একটা ছবি বের করে জেরিনকে দেখাল, জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন লাগে বলুন তো মনি?’
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে আছে দীধিতির একটা ছবি। মুগ্ধ হয়ে জেরিন সেই ছবিটা দেখে জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘মেয়েটা কি বাস্তবেই এতটা সুন্দর? না কি ছবিতে এমন লাগছে?’

-‘আমার কাছে মনে হয় ওকে ছবিতে সুন্দর লাগে না। যতটা নিজের সামনে দেখলে লাগে।’
জেরিনের চোখে মুখে খুশি ভাব। তিনি বুঝে গেছেন নাওফিল ছবিটা কেন দেখিয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কতদিন হলো চেনাজানা?’
-‘খু্ব বেশি দিন না। পনেরো দিনের মতো।’
-‘আব্বুকে তো তাহলে এটাই আশ্বাস দেবো এবার, ছেলেকে বিয়ে করান। জলদি সুস্থ হয়ে যাবে ছেলে।’
-‘সে বলবেন, সমস্যা নেই। কিন্তু ওর কথা বলতে যেয়েন না।’
-‘কেন? লুকিয়ে চুরিয়ে রাখার কী আছে?’
-‘আহা! ও তো আমাকে বিয়েই করতে চায় না মনি। আব্বু সরাসরি প্রস্তাব নিয়ে গেলেও ও ফিরিয়ে দেবে।’
জেরিন কথাটায় রেগে গেলেন দীধিতির ওপর, বলে উঠলেন, ‘তোমাকে রিফিউজড করার এমন সাহস কেন করল মেয়েটা? কম কী দিয়েছে আল্লাহ পাক আমার এই চাঁদের মতো ছেলেটিকে?’
নাওফিল আগের মতো ঠোঁট চেপে হেসে বলল, ‘ও ভয় পায় আমাকে।’ কথাটা বলে সেদিনের ঘটনা সবটা বলল সে জেরিনকে। জেরিন কপাল কুঁচকে ফেলে বললেন, ‘ওর সাথে কেন এমনটা করতে গেলে তুমি? এরপর আবার ওকেই বিয়ে করতে চাইছ! তোমার অমন অবস্থা দেখার পর কোন মেয়ে আসবে তোমার কাছে?’

-‘কোনো মেয়ের আসার দরকার নেই তো। ও আসলেই হবে।’
-‘তো সেটা আসবেটা কীভাবে? ভয় পাইয়ে ওর জান কাঁপিয়ে দিয়েছ। চাপে পড়ে বিয়ে করলেও তো ভালোবাসতে পারবে না কখনো তোমাকে।’
ছবিটা থেকে মুখ তুলে তাকাল নাওফিল, কথাটা শুনে ঈষৎ হেসে বলল সে, ‘ভালোবাসা কি কম আছে আমার জীবনে? আব্বু-আম্মু, দাদা-দাদী আত্মীয়, বন্ধুরা, তুমি, সবার কাছে ভালোবাসা পেতে পেতে আমি হাবুডুবু খাই। ভালোবাসার তো অভাব নেই আমার জীবনে। চাইলে এই মেয়েটিকেও ভালোবাসাতে পারতাম। আমার তো আর কারও ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের ভালোবাসা পেলেও আমার বুক তৃষ্ণার্তই থাকবে আজীবন। কারও ভালোবাসায় যে আমাকে আত্মতৃপ্তি, শান্তি দিতে পারবে না।’

নাওফিলের কম্পিত কণ্ঠের বাক্যগুলো জেরিনকে আর নিয়ন্ত্রণে থাকতে দিলো না। হু হু করে কেঁদে উঠে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। খু্ব ইচ্ছা তার, মরার আগে অন্তত এই ছেলেটিকে পরিপূর্ণ খুশি হতে দেখে যাতে। কিন্তু আর কেউ না জানলেও তিনি জানেন, এই ইচ্ছা পূরণ হবার নয়। কোনোভাবেই নয়। নাওফিল নিথরের মতো পড়ে রইল জেরিনের বুকে। একটু জড়িয়েও ধরল না তাকে। তাতে কিছু মনেও করলেন না জেরিন। ওকে বলতে থাকলেন, ‘তুমি ভালোবাসতে চাও মেয়েটিকে। সেটা কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি। আমি চাইব যেভাবেই হোক, ও-ই যেন তোমার এক মাত্র সোলমেট হয়। আর আমিও এটাই চাই, ও-ও যেন তোমাকে ভালোবাসে। জানো তো, আল্লাহ পাক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে যে ভালোবাসা দিয়েছেন সেই ভালোবাসা থেকেই পৃথিবীতে ভালোবাসা ছড়িয়েছে। এই ভালোবাসার ক্ষমতা অনেক। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না যতক্ষণ না তুমি নিজে উপলব্ধি করবে। বড়ো উদাহরণ তো ওই দু’জন মানুষ। যাদের ভালোবাসায় তুমি এই পৃথিবীতে এসেছ। তোমার আম্মিকে পেয়েই তো তোমার আব্বু নিজের সব কিছু ছেড়েছিল, তাকে নিয়ে সুন্দর জীবন পার করতে চেয়েছিল বলেই আল্লাহর জন্য নিজেকে বদলেছিল। এমনটা কি সম্ভব হতো যদি না তোমার আম্মিকে ভালোবাসত তোমার আব্বু? আমি চাই, এই সুন্দর মেয়েটি তোমাকে খুব ভালোবাসুক।’

-‘ওর ভালোবাসা পেলে কি আমি শান্তি পাবো?’
মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জেরিন বললেন, ‘দু’জন দু’জনকে ভালোবেসেই দেখো। তারপর উত্তর নিজেই পাবে।’
নাওফিল সরে এল জেরিনের কাছ থেকে, ঠোঁট কামড়ে হাসল সে, ‘তাহলে তো এবার পরিশ্রম বেড়ে যাবে আমার। যে অবস্থায় দেখেছে আমাকে আর যে ভয়টা পায় তাতে ও আমার থেকে লুকিয়ে থাকতে পারলে বাঁচে।’
-‘আমি এসব কিছু জানতে চাই না। আমার ওকেই তোমার জন্য পছন্দ হয়েছে। তাই চাই ভালোবেসে ও-ই যেন পাগল হয় তোমার জন্য।’
নাওফিল হাসতে থাকল, ‘উলটো হয়ে গেল না? আব্বু ছিল আম্মির জন্য পাগল।’
-‘কে বলেছে? আমি দেখেছি তোমার আব্বুর জন্য আম্মির পাগলামি। তোমার আম্মির ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ পেত না তার অসুস্থতায়।’
-‘ঠিক আছে, আব্বুর মতো একটা গুণ পেয়েছি আমি। ক্রেডিট অবশ্য তোমার। হিপনোসিজ করে হলেও না হয় মেয়েকে এবার ভালোবাসাব।’
কথাটা শুনে জেরিন কান টেনে ধরলেন ওর, ‘আব্বুর মতো অনেক গুণই পেয়েছ। কিন্তু এই গুণ দিয়ে আমার বউমাকে একেবারে বশ করবে না বলে দিলাম।’
বলে দু’জনেই হাসতে থাকল।

প্রতিবছর একবার, দু’বার হলেও নাওফিলকে অস্ট্রেলিয়া আসতে হয় জেরিনের কাছে। তার আটাশ বছরের জীবন বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়া আসা যাওয়া করতে করতেই পার হচ্ছে। এবার অবশ্য যেতে চেয়েছিল না ও। কিন্তু আম্মুর কান্নাকাটির চোটে না পেরেই যেতে হয়। ছিল ওখানে দশদিনের মতো। জেরিন ওকে পেলে খু্ব সহজে ছাড়তে চান না। নাওফিলও চেষ্টা করে, স্বামী সন্তান ছাড়া এই মানুষটির কাছে থেকে তার কষ্টটা একটুখানি কমাতে। আর এই সময়টা সে দেশের কারও সাথেই যোগাযোগ রাখে না। পুরোটা সময় জেরিনকে দেয়।
দেশে ফেরার পরই ধানমন্ডি আটে তার নিজের অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসে। ন’তলার এই পুরো অ্যাপার্টমেন্টটাই তার বাবার। আবার বলা যায় তারও। বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর চেয়েছিল সে দেশের বাইরে চলে যেতে। কিন্তু বাবা-মা’র জন্য পারেনি। তার পূর্ব পুরুষ থেকেই তার পরিবার ছিল বনিয়াদি। ধন-দৌলতের অভাব নেই। অফুরন্ত রেখে গেছেন স্বয়ং তার দাদাই। আর বাবার গড়ে তোলা বর্তমান ব্যবসা বাণিজ্য তো পরের কথা। বাবা চেয়েছিলেন অবশ্য নিজেদের অফিস, ফ্যাক্টরির দায়িত্ব দিতে তাকে। কিন্তু দেশে বাইরে না যেতে পারার ক্ষোভ পুষে রেখে অন্যের কোম্পানিতে জয়েন করে সে। গাজীপুরে মাল্টিন্যাশনাল বাংলাদেশ কোটস লিমিটেড কোম্পানিতেই বছর চার হলো চাকরি করছে। সপ্তাতে দু’তিন দিন গাজীপুরের ফ্যাক্টরিতে ঘুরে আসতে হয় তাকে।

আর এই কোম্পানির অফিসটা ঢাকাতে থাকলেও সেখানেও তাকে রোজ রোজ বসতে হয় না। মাস শেষে তার নিজের উপার্জনই এই চার বছরে এসে দাঁড়িয়েছে লাখের কাছাকাছি। ছেলের এই কর্মঠ রূপ অবশ্য জনাব শেখের পছন্দ ভীষণ। তাই তিনি কখনো এ নিয়ে কিছু বলেননি। তার শুধু অভিযোগ একটাই, ছেলে পরিবারের সাথে থাকে না।
দশ দিনের ছুটির পর আর একটা দিনও বসে থাকার সুযোগ পায়নি সে। কোম্পানির মালিক এসেছিল আজ ফ্যাক্টরিতে, যার জন্য সকাল সকাল চলে গিয়েছিল গাজীপুর। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে বেজে যায় বিকাল পাঁচটা। দেশে আসার পর কোনো বন্ধুর সঙ্গেও কথা বলার সুযোগ হয়নি। রুমান চলে গেছে চট্টগ্রাম, দীপ্তও খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে লন্ডন। সেও বুয়েট থেকে বেরিয়ে দেশের বাইরে জবের জন্য চেষ্টা করেছিল। আর ভাগ্যক্রমে হয়েও যায় লন্ডনে। সবুজ, রাতুল একই সঙ্গে ঠিকাদারি করে। শিহাব ভাইয়ের সাথে ব্যবসাতে বসেছে। শুধু তুষারই স্থায়ী কোনো কাজে ঢোকেনি। একটা প্রাইভেট ভার্সিটির লেকচারার হিসেবে আছে আপাতত। প্রত্যেকেই ব্যস্ত থাকলেও সময় করে আড্ডা বসায় সবুজ আর রাতুল। তারপর বাকিদেরও ফোন করে ডেকে আনে। তবে বেশিরভাগ অনুপস্থিত থাকে রুমান, দীপ্ত, নাওফিল। নাওফিলের ব্যস্ততা কম থাকলেও মন যেদিন চায় সেদিনই আসে বন্ধুদের কাছে। আর ওর দেখা না পেলে সরাসরি ওর ফ্ল্যাটে গিয়েই সবাই এক হয়।

আজ গাজীপুর থেকে ফেরার পর ফ্ল্যাটেও ঢুকতে পারেনি। দীপ্তর ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে চলে আসে টিএসসিতে। আসার পরই নিজ চোখে দেখে নেয় সব থেকে ঘৃণ্য দৃশ্যটুকু। তুষার, রাতুল চেয়েছিল অবশ্য নাওফিল অস্ট্রেলিয়া থাকাকালীনই দীপ্ত আর দীধিতির সম্পর্ক হয়ে ওঠার কথা জানাতে ওকে। কিন্তু রুমানের পরামর্শে কিছু জানায়নি ওরা। যদিও নাওফিল ঠান্ডা মাথার মানুষ। তবু এমন একটা খবর শোনার পর মাথা গরম হয়েও তো যেতে পারে। প্রত্যেকের জোরাজুরিতে দীপ্ত আজ বিকালে সবাইকে টিসএসসিতে ডেকেছে এই সম্পর্কের জন্য ট্রিট দেবে বলে। দীধিতি অবশ্য চায়নি আসতে। লজ্জাটা একটু বেশিই কাজ করছে তার। সম্পর্কের মাত্র চারটাদিনের মাথাতেই দু’জন একে অপরের গায়ের সঙ্গে আঠার মতো লেগে বসে আছে। নাওফিল ওদের সামনে দাঁড়িয়েই তা দেখতে দেখতে থু ফেলল মাটিতে। এই কাজটার অর্থ দীধিতি আর ওর বান্ধবীরা না বুঝলেও বাকিরা বুঝে গেল। দীপ্ত একটু সরে বসল দীধিতির থেকে। নাওফিল এমন অনেক কিছুই অপছন্দ করে যা দীপ্ত ভুলেই গিয়েছিল।

নাওফিল ওদের মুখোমুখি বসে বলল দীপ্তকে, ‘ট্রিট দিবি এখানে? কী খাওয়াবি বুঝলাম না। মিনিমাম ত্রিশ হাজারের বাজেট তোর। রুমানেরটা পার্সেল যাবে। আর টিসএসসিতে বসে ঝালমুড়ি খাওয়ানোর ধান্দা করছিস তুই?’
ত্রিশ হাজারের কথা শুনে বাকিরা হইচই করে উঠলেও দীপ্তর মুখটা কালো হয়ে গেল। নাওফিলকে রেগে বলল, ‘এই টাকাটা আমাদের বিয়েতে কাজে লাগবে ভাইয়ো। এত টাকা কি কেউ খালি এক প্রেমের জন্য ট্রিট দেয়?’
রাতুল নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল, ‘তুই দিবি। রুমানের থেকে বড়োলোক বেশি তুই। তোর বাজেট ওর থেকে দ্বিগুণ বেশিই তো হবে।’
-‘সব থেকে বড়ো কথা তুইও কিছুদিন পর ব্যাচেলর জীবন ঘোচাচ্ছিস। লন্ডন ফিরে যাবার আগেই তো বিয়েটা করে যাবি, তাই না? আমাদের ক্লাবেই বড়োসড়ো পার্টির ব্যবস্থা করে ফেল কাল।’ তুষার বলল।
সবুজ একটা বিরক্তি ভাব নিয়ে বকে উঠল দীপ্তকে, ‘শালা বিখাউজ, রুমান থাকতে প্রপোজটা করলি না ক্যান? ও যে মিস করে গেল।’

নাওফিল আসার পর থেকে দীধিতি, তামান্না, তন্বী আর ঐশী চারজনই জড়সড় হয়ে বসে আছে। দীপ্তর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর বুদ্ধিটা দীধিতিকে ওরাই দিয়েছিল নাওফিলের থেকে নিরাপদ থাকার জন্য। কিছু ক্ষতি করার চেষ্টা করলে যাতে দীপ্তর মতো ক্ষমতাবান ছেলের সাহায্য পায় দীধিতি। কেননা, দীপ্তর পরিবারও রাজনীতির সাথে যুক্ত। তবে নাওফিল আর দীপ্তর মাঝে এই রাজনৈতিক ক্ষমতা কার বেশি তা ওদের পুরোপুরি ধারণায় নেই।
নাওফিল পরনে মেরুন রঙা শার্ট, সাদা টাই আর কালো প্যান্ট। চুলগুলো আসার সময়ও পরিপাটি দেখেছিল দীধিতি। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সামনে বসেই পরিপাটি চুলগুলো টানতে টানতে এলোমেলো করে নিচ্ছে সে, টাই খুলে ফেলে শার্টের টপ দু’টো বোতামও খুলে দিলো হঠাৎ। গরমটা বেশিই অবশ্য বাইরে। তার ওপর এই রকম একটা খবর জানার পর নিশ্চয়ই রেগে আছে বলে আরও গরম লাগছে ওর! চেহারাটায় অবসাদ বোঝা যাচ্ছে। নাওফিলের এই অবসাদের চেহারাটা দেখে আজ আবার দীধিতির মাঝে মোহাচ্ছন্নতা অনুভব হচ্ছে ওর জন্য। কিন্তু সে দুর্বল হবে না এই চেহারায়। জেনে বুঝে এমন অস্বাভাবিক মানুষকে প্রশ্রয় দিতে পারবে না সে।

সবার কথোপকথনের মাঝে নাওফিল উচ্চস্বরে দীপ্তকে বলে বসল, ‘তোর গার্লফ্রেন্ডকে কিন্তু শুদ্ধ করে নিস ভাইয়ো। প্রথম অনুভূতিটা তো আমাকে নিয়েই হয়েছিল ওর, মনে আছে তো? বলা তো যায় না কী না কী ভেবেছে আমাকে নিয়ে আবার। যেমনটা তুই ভাবিস, ভেবে কোলবালিশ কামড়াকামড়ি করিস, চাদর ভিজিয়ে ফেলিস।’
এটা কোনো রাগ প্রকাশ ছিল না নাওফিলের। দীধিতিকে ধিক্কার জানানোর সুযোগটা ব্যবহার করবে সে এখন থেকে যখন তখন। দ্বিতীয় দিনে দীপ্তর সঙ্গে ওর চোখাচোখির কাজটা দেখে ভেবেছিল সে, হয়তো ওকে দেখানোর জন্যই করছিল দীধিতি।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪

প্রেমের অনু্ভূতি বুঝি এমনই সস্তা? সে তো জানত অনুভূতি শব্দটা খুব অর্থবহুল এবং দামী।
হলোই না হয় সে খারাপ। তাই বলে এই অনুভূতি কি এত দ্রুতই আবার অন্য কারও জন্য জন্মে যায়? হয়তো দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা জন্মাতে পারে। কিন্তু কারও প্রতি জন্ম নেওয়া অনুভূতি কয়েক মুহূর্তেই আবার অন্য কারও জন্য অনুভব হতে পারে, এটা সত্যিই নাওফিল জানত না। এ বিষয়ে তার জ্ঞান সীমিত। দীধিতির মাঝে নিজের জন্য যা দেখেছিল সে, তা কোনো অনুভূতিই ছিল না তবে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here