আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
নাওফিলের বাসা থেকে সকালের নাশতা শেষ করে তাওসিফ বউ আর বোনকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে বিয়ের কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। দীধিতি অনেকবার অনুরোধ করেছিল ওদেরকে, ওর বাসায় এসে নাশতাটা করার জন্য। কিন্তু রাজি হয়নি তাওসিফ। পরোক্ষ ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে সে, যদি আজ তার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা ভাইয়ের বউ হিসেবে থাকত, তবে কোনো আপত্তিই ছিল না৷ যদিও দীধিতির নিমন্ত্রণ রক্ষা করা যেত বউয়ের বড়ো বোন হিসেবে। কিন্তু ভাই থাকতে আর বউয়ের বড়োবোনের ঘরে সেবা গ্রহণের ইচ্ছাটা তার হয়নি৷ এ ব্যাপারটা দীধিতি বুঝতে পারার পর মনে মনে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করেছে৷ সেই সাথে নাওফিলের প্রতি আগের চেয়েও বেড়েছে তীব্র রাগ আর ক্ষোভ৷ যে সম্পর্কটা বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল দুজনের মাঝে, কত যত্নে আগলে রাখতে চেয়েছিল সে সম্পর্কটাকে।
মাত্র পাঁচটি মাস পরই সেই সম্পর্কটা থেকে ওকে নিষ্ঠুরভাবে বের করে দিলো নাওফিল। দূর করে দিলো ওকে নিজের জীবন থেকে৷ উদ্বাস্তু এক মানুষের মতো চারটি বছর এখানে, ওখানে কাটিয়ে বেড়িয়েছে তখন দীধিতি৷ দিন শেষে নিজের ঘর বা আপনজনের কাছে ফেরার মতো কেউ ছিল না ওর… আজও নেই। কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো গন্তব্যও নেই৷ কেবল সৃষ্টিকর্তার ডাক না আসা অবধি প্রাণটাকে দেহের মাঝে জিইয়ে রাখতে হবে বলেই কর্ম করা, খেয়ে পরে শ্বাস নেওয়া। নয়ত সেই চার বছর আগেই তো পারত এই আপনহারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে। এখন আর জন্মদাতা বা জন্মদাত্রী মানুষদুটোকে খুঁজে পাওয়ার আগ্রহও নেই। চাওয়া-পাওয়া, আশা আকাঙ্ক্ষা করার সেই মনটাই মরে গেছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে এসে হঠাৎ নাওফিলের গাড়িটা থামল। চিন্তায় বুঁদ হয়ে বসে থাকা দীধিতি একদমই খেয়াল করেনি, গাড়িটা কারাগারের দিকে এগোচ্ছিল। সাদা খয়েরী বর্ণের চেক প্রিন্টের বোরকার আস্তিনটা সরিয়ে হাতঘড়িটা দেখে নিলো সে। বেলা বারোটা এখন। এই সময়ে তো দপ্তরে থাকার কথা ছিল নাওফিলের। কারাগারে কেন এসেছে লোকটা? জিজ্ঞেস করতে মন চাইলেও কথা বের হলো না গলা থেকে৷ কারণ, আজ সকালে নাওফিলের সঙ্গে গতকালের চেয়েও বেশি ঝামেলা করেছে সে৷ ঝামেলাটা ছিল সেই গতকালের মতোই ওর পোশাক নিয়ে। কোনোভাবেই নাওফিল ওকে ওয়েস্টার্ন পরিচ্ছদে মেনে নেবে না। এমনকি সেলোয়ার-কামিজেও না। ভীষণ বাড়াবাড়ি করছিল নাওফিল ওর সঙ্গে। তাই সেও নিজের বর্তমান পরিচয় ভুলে পুরোনে রাগ আর ক্ষোভ থেকে উঁচু গলায় বহু খারাপ কথা শুনিয়ে দিয়েছে নাওফিলকে। অশালীন গালি-গালাজ করতেও মুখে বাধেনি। উপরন্তু গতরাতে ওর সঙ্গে জোরপূর্বক অন্তরঙ্গ হতে চেয়েছিল নাওফিল। সেই রাগ সারা রাতেও নিশ্চিহ্ন হয়নি বলেই সব রাগ এক সঙ্গে চেপেছিল মাথায়। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে নাওফিলের জীবনের সব থেকে স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করে কথা বলে ফেলেছিল সে৷ জায়িন মাহতাবের চরিত্র নিয়ে গালি গালাজের সঙ্গে আজ আয়মান মেহরিনকেও টেনে এনে যাচ্ছেতাই আচরণ দিয়েছে। যা পুরোটা সময় পর্যন্ত স্তব্ধ বেশেই শুনে গেছে নাওফিল। তখনো বুঝতে পারেনি দীধিতি, স্বভাবজাত শান্ত চরিত্রের মানুষটিকে সে মুখের কথাতেই যতটা ক্ষত বিক্ষত করতে পেরেছে— অতটা সে হাতে মেরেও পারত না তাকে আঘাত করতে। কিন্তু ভুলটা পরবর্তীতে বোধগম্য হলেও আর ভেতরে ভেতরে অনুশোচনা হলেও চার বছরের ক্রোধ আর অহংবোধ থেকে অনুতপ্ত দেখাতে ইচ্ছা হয়নি৷
এরপরও নাওফিল নিজের জেদেই অটল ছিল৷ দীধিতির বিষবাক্যের বিপরীতে একটাও জবাব দেয়নি৷ তবে একান্ত প্রিয় নারীর গায়ে বোরকাও না চড়িয়ে ক্ষান্ত হয়নি সে। আয়নার সামনে বোরকা, হিজাব আর মাস্ক পরিহিত দীধিতি নিজেকে আপাদমস্তক দেখার পর এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে, গানটা ফেলেই চলে এসেছিল বাইরে৷ বলা বাহুল্য, নাওফিল নিজের ঘর থেকেই দীধিতিকে পোশাক পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল। এমনকি ওর জন্য বোরকা, হিজাবও আগেভাগেই উপস্থিত রেখেছিল সে। দীধিতির ফেলে যাওয়া গানটা নিজেই অবশেষে বহন করে গাড়িতে এসে বসল যখন, রাগে দিশাহারা মেয়েটি তখনো টের পায়নি দায়িত্বপ্রাপ্ত গানম্যান হিসেবে গানটাই নেই কাছে। একটা সময় নাওফিল সেটা ওকে ফিরিয়ে দিতে দিতে অনুচ্চ গলায় বলেছিল, ‘আমার সম্পদের হেফাজত আর খেয়াল আমি ষোলোআনাই করতে জানি। কিন্তু আপনি এখনো তা জানেন না।’ কথাটায় দীধিতিকে ওর দায়িত্বহীনতাকে ইঙ্গিত করেছিল বলে দীধিতি যারপরনাই রেগে ওঠে ভেতরে ভেতরে। এতক্ষণ অবধি দুজনের মাঝে ওটাই ছিল শেষ কথা বিনিময়।
গাড়ির দরজা খুলে দীধিতি নেমে দাঁড়ানোর পরই নাওফিল নেমে পড়ে৷ সঙ্গে সঙ্গে ওর দু’পাশে সটান দাঁড়িয়ে যায় দুজন কর্তব্যপরায়ণ নিরপত্তা কর্মী। যার একজন দীধিতি আর দ্বিতীয়জন ষণ্ডা মতোন এক পুরুষ। দ্বিতীয় গানম্যানের পরিচ্ছদ দেখে যে কেউ অনায়াসেই বুঝে যাবে, তার পেশা কী। কিন্তু স্যুট, বুট পরা দীর্ঘ উচ্চতার সৌষ্ঠব অঙ্গের নাওফিলের পাশে শালীন পোশাকের দীধিতিকে দেখে ওর পেশা নিয়ে মানুষের যে ধারণা হবে তা আর ঘটা করে বলার দরকার পড়ছে না। নাওফিল তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বলার পর ব্যক্তিটি ফোন কানে ঠেকাল। ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে নাওফিলের আগমন বার্তা জানানোর পর কল কেটে নাওফিলকে বলল, ‘স্যার, অফিসরুমে আছেন উনি।’
এর মাঝেই কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার দু’জন কনস্টেবলের সাথে এসে হাজির হলেন। নাওফিলকে সালাম ঠুকে অতি ভক্তির সঙ্গে ভেতরে নিয়ে আসেন তাকে। নিজের অফিস কক্ষে তাকে বসিয়ে নাশতা পানির ব্যবস্থা করতে বেরিয়ে গেলেন নিজেই। কক্ষের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে তখন নাওফিলের গানম্যান কাম বউ। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ দীধিতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো না দ্বিতীয় বন্দুকধারী সৈনিকের সঙ্গে। ভেতর থেকে পরিচিত এক পুরুষের কণ্ঠে নিজের নাম ধরে ডাক পেতেই কক্ষে ঢুকল কিঞ্চিত বিস্ময় নিয়ে৷ ইয়াসিফকে দেখে অবাক হলেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে তাকে হ্যান্ড স্যালুট দিয়ে বসে থাকা নাওফিলের পেছনে এসে দাঁড়াল। গত দুদিন যাবৎ ইয়াসিফের মন-মেজাজ তেমন একটা ভালো ছিল না। কিন্তু এই মুহূর্তে ভাইয়ের গানম্যান ও নিজে প্রশিক্ষিত করা এসবি অফিসারকে পুরোদস্তুর বোরকাতে দেখে অনিয়ন্ত্রিত ফিচেল হাসিটা বহুকষ্টে রোধ করতে হলো তাকে। সেই সাথে গত দুদিনে ভার হয়ে থাকা মেজাজটাও হালকা হয়ে গেল জাদুর মতো। দীধিতিকে আগাপাছতলা দেখে আড়চোখে তাকাল ইয়াসিফ ভীষণ আদরে বড়ো হওয়া পাগলাটে স্বভাবের ভাইটার দিকে। স্বভাবজাত শান্ত মুখের অভিব্যক্তিই নাওফিলের। সেও তাকিয়েই আছে সামনের চেয়ারে বসে থাকা ইয়াসিফের পানে। তার চোখ-মুখে হালকা ফুটে ওঠা হাসিটার কারণ বেশ টের পেলো সে। তবুও নির্বিকারই রইল। দীধিতিকে ইশারায় বসতে বলে ইয়াসিফ জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছ তো, স্মরণ?’
-‘ইয়েস, স্যার।’
-‘অনেক সকালে করেছ নিশ্চয়ই। এখন বেলা হয়েছে। দুপুরের লাঞ্চটাও আজ একটু আগেই না হয় করে নাও।’
-‘থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার। কিন্তু তার কোনো প্রয়োজন নেই।’
-‘আছে। আছে বলেই বলছি, স্মরণ। তোমাকে এই মুহূর্তে অনেক বড়ো একটা কাজে পাঠানো হবে। তখন আর লাঞ্চের সময় পাবে না।’
ভ্রু’কুটি হয়ে এলো দীধিতির, ‘কী কাজ, স্যার? কোথায় যেতে হবে?’
-‘বলছি, অপেক্ষা করো।’
অপেক্ষাটা করতে হলো দীধিতিকে আধা ঘণ্টার মতো। জেল সুপারকে দুপুরের খাবার আনতে দেখে বিরক্ত না হয়ে পারল না সে। অফিসে বসে এই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা কেমন উদ্ভট ধরনের লাগে ওর কাছে। কেবল ইয়াসিফের কড়াকড়ি কথার জন্যই খেতে হলো ওকে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা দু’ভাই স্রেফ কফি ছাড়া আর কিছু মুখে তুলল না। তা দেখে মনে মনে তাদেরকে বেশ গালিও দিলো দীধিতি। খাবেই না যখন, তখন এত খাবারের ব্যবস্থা কেন করালো? কেন করালো, তার জবাবটা একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই পেয়ে যেত দীধিতি। ওকে একা খেতে বললে তো আর খেতো না৷ তাই তিনজনের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনটা করা, শুধু ওকে খেতে বাধ্য করানোর জন্য। কিন্তু কেনইবা এত কাহিনি করে ওর উদরপূর্তি করালো ওরা?
বাকি খাবার অবশ্য অপচয় হয়নি। খাওয়ার লোকের অভাব তো নেই। এবার ইয়াসিফ মুখ খুলল, ‘আতঙ্কবাদী জাইমাকে আগামীকাল গাজীপুর কাশিমপুরের মহিলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। যাবার আগে সে তোমার সাথে দেখা করে যেতে চায়।’
-‘চার বছর পর কেন তার আজ আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হলো?’ মনের মধ্যে কেমন একটা খটকা লাগল দীধিতির। তাই প্রশ্নটা করা। ওর অভিব্যক্তি দু’ভাই-ই লক্ষ করে দুজন এক পলের জন্য চোখাচোখি করে নিলো। অর্থাৎ চোখে চোখে কথা বিনিয়ম হলো তাদের। আর মনে মনে নাওফিল হাসলও এই ভেবে, এখনের দীধিতি আগের মতো আর বোকা নেই।
-‘ইচ্ছেটা আমিই জাগিয়েছি তার মাঝে।’
-‘কেন স্যার? আমার সঙ্গে তার কথা হলে আপনার কী লাভ?’
মুচকি হাসল ইয়াসিফ, পালটা প্রশ্ন রাখল, ‘যদি বলি লাভটা সম্পূর্ণই তোমার?’
-‘আমার লাভ? প্লিজ কথাগুলো রহস্যময় করে তুলবেন না। আমি রহস্য ব্যাপারটা ঠিক নিতে পারি না, স্যার।’ শেষ কথাটার পর ওর বাঁকা দৃষ্টি নাওফিলের দিক থেকে একবার ঘুরিয়ে আনতে ভুলল না।
-‘আচ্ছা।’ হাসিটুকু ধরে রেখেই বলল ইয়াসিফ, ‘লাভ কথাটা আসলে মজা করে বলেছি। প্রকৃত অর্থে, তুমি তার সঙ্গে কথা বলবে তদন্তের স্বার্থে। তার সন্ত্রাস জীবনের উত্থান থেকে পতন অবধি সমস্ত গল্পটা শুনতে হবে তোমার।’
-‘সে কেন বলবে? এতগুলো দিনে আপনার মতো দুর্ধর্ষ অফিসারেরা যেখানে কথা আদায় করতে পারেননি, সেখানে আমি কীভাবে পারব?’
প্রশ্নটায় নাওফিল বিরক্তি হলো খুব। বিরক্তিটা প্রকাশ করল দু আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে থাকা কলমটা ঠাস করে টেবিলের ওপর রেখে। সেটা দেখে ইয়াসিফ ইশারায় তাকে সংযত হতে বলে দীধিতিকে বোঝালো, ‘সে তোমাকে নিজের সন্তান স্নেহে লালন করেছিল৷ তোমার জন্য সেই স্নেহ আজও কমেনি। সে তোমার কাছে নিজের সন্ত্রাস পরিচয়টা সব সময়ই গোপন রাখতে চেয়েছিল। তার জন্যই এতগুলো দিনেও তোমার মুখোমুখি হতে চায়নি লজ্জায়। তুমি তার সেই স্নেহের সুযোগটাই নেবে, স্মরণ। এখন তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো, তাহলে এই চার বছরে কেন তোমাকে তার মুখোমুখি করে কথা আদায় করে নিলাম না। এর জবাবটা দিতে গেলে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে কথাগুলো বলতে হবে। যেটা তুমি এই মুহূর্তে শুনতে স্বাচ্ছন্দবোধ নাও করতে পারো। তাও যদি শুনতে চাও তাহলে বলি?’
-‘প্রয়োজন নেই’, চকিতেই বলে উঠল দীধিতি। ‘ডেঞ্জার সেলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন আমাকে।’ বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল দীধিতি।
আরও কিছু বলতে চাইছিল ইয়াসিফ৷ কিন্তু তার বদলে নাওফিল মুখ খুলল, ‘আপনার জীবনে জায়িন মাহতাবের ভূমিকা কোথায় আর কতটুকু ছিল, এই প্রশ্নটা অবশ্যই করবেন তাকে।’
-‘তা আমি জেনেছি আমার তথাকথিত বিবাহিত জীবনের আগেই।’ গমগমে গলায় জবাবটা দিলো দীধিতি। তখনই বলে উঠল ইয়াসিফ, ‘তুমি সবটাই আবার নতুন করে জানতে চেয়ো, স্মরণ। হতেই পারে, যে গল্পটা জেনেছিলে তার থেকে। পরবর্তীতে দেখলে সেই গল্পটাই থার্ড ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে গেছে।’
ইয়াসিফের কথা আর মুখভঙ্গি দেখে দীধিতির মনের ভেতর কেমন একটা করে উঠল যেন৷ কিন্তু কোনো জবাব আর দিলো না৷ জেল সুপার ওকে নিয়ে এলেন জাইমার কাছে। ওদের দুজনকে একাকী কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন।
ভেতরে ঢুকতেই দীধিতির চোখে পড়ল কয়েদি কাপড় পরনে থাকা এক বৃদ্ধাকে। ছোটো একটা টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছে মাথা নিচু করে৷ দেখে মনে হচ্ছে নির্জীব, নিথর। ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেল দীধিতি। বসল বৃদ্ধার মুখোমুখি। আলুথালু চুল পাক ধরেছে তার সামান্যই। হয়ত এই চার বছরের কয়েদি জীবনে এতখানি বুড়িয়ে গেছে মানুষটি।
-‘কেমন আছ, মাম্মাম?’ প্রশ্নটা করে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল দীধিতি। এমন প্রশ্নটা করা কি ঠিক হলো?
জাইমা চোখ তুলে তাকালেন না। চোখের কোটরে তার জল থইথই করছে। কত বছর পর আজ সেই সন্তানের মুখোমুখি হচ্ছেন। যে সন্তানকে জন্ম না দিয়েও মা হয়েছিলেন একদিন। কিন্তু এভাবে ওর মুখোমুখি তিনি হতে চাননি কখনই।
-‘কথা বলবে না, মাম্মাম?’
জড়তা, লজ্জা নিয়েই জাইমা দৃষ্টি রাখল দীধিতির মুখে। সেই নীল চোখের ছোট্ট রাজকন্যাকে আজ রূপবতী তরুণী বেশে দেখতে পেলো৷ কিন্তু মনে হলো যেন সেই একই আদল। একটুও পালটায়নি তার স্মরণ। হাতটা বাড়িয়ে ছুঁতে চাইলেন ওকে। তা বুঝতে পেরে দীধিতি এগিয়ে দিলো মুখটা। গালে হাত ছুঁইয়ে বললেন জাইমা, ‘আমাকে দেখে ঘেন্না হচ্ছে, তাই না?’
-‘নাহ, সত্যিই না।’ মৃদুস্বরে বলল দীধিতি।
-‘তাহলে এতদিনে কেন এলে না?’
-‘পরিস্থিতি আমার প্রতিকূলে ছিল না, মাম্মাম।’
-‘তোমার স্বামী নিশ্চয়ই দেখা করতে দেয়নি! বুঝেছি।’
তার ভুল ভাবনাটুকু শুধরে দিলো না দীধিতি। জানাতে চাইলো না, সে এখন স্বামী পরিত্যক্তা নারী। বলল, ‘তোমার সামনে বসা মেয়েটা এখন স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন অফিসার, মাম্মাম।’
-‘তাই? সত্যি?’ অবাক কণ্ঠে খুশিও প্রকাশ পেলো জাইমার। জিজ্ঞেস করলেন তারপর, ‘তাহলে কি আমি এই মুহূর্তে এসবি অফিসারের ইন্টারোগেশনের সামনে?’
-‘একদমই না। তুমি যে স্মরণকে সন্তান স্নেহে ভালোবেসেছিলে, সেই সন্তানের সামনে এখন।’
জবাবে নীরব থাকলেন জাইমা। শুধু চেয়ে দেখতে থাকলেন অপলক দীধিতিকে৷ তিনি প্রকাশ করতে পারছেন না, ওকে আজ এত কাছে পেয়ে এতদিনের সব কষ্ট ঝাপসা হয়ে আসছে তার।
-‘কেন আবার ফিরে গেলে সন্ত্রাসবাদ জীবনে? এমন পরিণতি কি আজ হওয়ার ছিল তোমার?’
-‘ছিল, সোনা৷ আমার পরিণতি এমনই হওয়ার ছিল।’ নিস্তব্ধতা কাটিয়ে জবাব দিলেন জাইমা।
-‘আমি তো তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাতটা এমনভাবে চাইনি। কেন ফিরলে ওই জীবনে? বলবে আমাকে?’
-‘ফিরেছিলাম আরও বহু আগেই। কেন ফিরেছিলাম?’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জাইমা। ‘এর সঠিক কোনো জবাব নেই আমার কাছে। ভীষণ নিঃসঙ্গ জীবন ছিল আমার। নিঃসঙ্গতা কী যে যাতনার! তা খুব বুঝেছিলাম তোমাকে আর রেজাকে হারিয়ে ফেলার পর৷’
জাইমার বিষণ্ণ ঘোলাটে মনির চোখজোড়াতে চেয়ে দীধিতি হয়ত একটুখানি উপলব্ধি করতে পারল, তার বুকের ভেতরের জমে থাকা দুঃখকে৷ কারণ, নিঃসঙ্গ জীবন সত্যিই কতটা যাতনার, তা যে সেও গত চার বছরে সয়ে আসছে। হাতটা বাড়িয়ে এবার সে জাইমার হাতটা স্পর্শ করল। নিজের দু হাতের মুঠোর মধ্যে জাইমার জীর্ণশীর্ণ হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘তুমি আজ সাধারণ একটা জীবনে থাকলে আজ আমিই তোমার সঙ্গী হতে পারতাম, মাম্মাম৷ আমার নিঃসঙ্গতাও ঘুচত।’
-‘তুমি কেন নিঃসঙ্গ হবে, সোনা?’ চমকে তাকালেন তিনি। ‘আল্লাহ তা’আলা তোমার জীবনকে সুখে পরিপূর্ণ করুক। আমি সব সময় এই দোয়া করে এসেছি।’
কখন যেন দীধিতির চোখদুটোও ভিজে উঠেছে। অশ্রু বিন্দু গড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিলো না সে। কান্না গিলে বলল, ‘আমাকে আজ সবটা বলবে, মাম্মাম? তোমার জীবনের সঙ্গে জড়িত থাকা সবার কথায় আমি জানতে চাই। জায়িন মাহতাব আর আয়মান মেহরিনকেও জানতে চাই তোমার ভাষায়।’
এ পর্যায়ে আবারও নীরব দেখালো জাইমাকে। তবে তিনি ভাবছেন, আর কোনো মিথ্যা গল্প তিনি দীধিতির মগজে ঢুকাবেন না। তিনি জানেন দীধিতি সুখে আছে নাওফিলের কাছে। তাই আর কোনো মিথ্যা বলে দীধিতির মনে শেখ পরিবারের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাতে দেবেন না। অতীতে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে এমনটি চাইলেও এই চার বছরে তিনি নিজের ভুলগুলোকে উপলব্ধি করেছেন৷ এখন তাই অপেক্ষাতে আছেন, কবে তার এই নিঃসঙ্গ, অভিশপ্ত জীবনের সমাপ্তি ঘটবে!
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭১
-‘জায়িন আর আয়মানকে জানতে চাও শুধু?’ প্রশ্ন চোখে তাকালেন জাইমা। তবে তার চোখে চেয়ে দীধিতির মনে হলো, তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারও কথা জানাতে চান। তাই জিজ্ঞেস করল দীধিতি, ‘আমার জন্ম দেওয়া মানুষ দুটোর কথাও তুমি জানো, মাম্মাম?’
-‘জানি’, শীতল গলায় বলে উঠলেন জাইমা। ‘সেই মানুষদুটো ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিল জায়িন আর আয়মানের সঙ্গে।’
কেঁপে উঠল দীধিতির বুকের মধ্যে। তবে আজই কি সে জানতে চলেছে নিজের জন্মদাত্রীর পরিচয়?
