আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ছোট্ট নাওফিলের বয়স সে সময় দেড় বছর। হাইপারসেক্সুয়াল ডিজঅর্ডারে ভুগতে থাকা জায়িন তখন প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিয়ে চলেছে নিজের ঘৃণ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবার জন্য। অপরদিকে আয়মানও মাদকাসক্ত থেকে মুক্তি পেতে, পুরুষ বিদ্বেষী মনোভাব দূর করতে, রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে, নিজের সকল মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সাইক্রিয়াটিস্টের শরণাপন্ন হয়েছে। সেই সাথে সাইকোলজিস্ট জেরিনও তাকে রোজ কাউন্সিলিং করাতে আসে। এর সবটাই কৃতিত্ব কেবল তাদের একমাত্র রাজপুত্র নাওফিলের ছিল। সে তখন দেবশিশু। ও জন্ম নেওয়ার পর হাসপাতালের নার্স, ডাক্তার থেকে শুরু করে বহু রোগীর স্বজনরাও ঘুরে ফিরে শুধু ওকেই দেখতে আসত। এমন চমৎকার একটি বাচ্চার বাবা হতে পেরে জায়িনের কী যে গর্ব হতো! ওর চার বন্ধুরাও মজার ছলে আফসোস সুরে বলে উঠত, ‘ও ঈশ্বর! আমরা কি জেইনের চেয়েও বড়ো পাপী? আমাদের নচ্ছার মেয়ে বন্ধুগুলোর মাধ্যমেও তো এমন একটি শিশু দিতে পারতে!’ তবে এই আফসোসের গান বেশি শোনা যেত জায়িনের বন্ধু স্যামুয়েলের গলাতেই।
কিন্তু নাওফিল জন্ম নেবার আগে এই সুখী গল্পটা ছিল পুরোটাই উলটো। সেয়ানে সেয়ানে লড়াই যাকে বলে। জায়িন আর আয়মানের মাঝে সম্পর্কটার বিবরণ দিতে গেলে এক কথায় বলতে হবে– ওরা চেষ্টা করত শুধু কে কাকে হারাবে বা কে কাকে কাবু করবে। এর মাঝে জায়িনের নিজের অস্বাভাবিক শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্য সে বিয়ের পর পরনারীর বদলে আয়মানকেই বেছে নেয়। কিন্তু আয়মানের তো এই সম্পর্কটার প্রতি ছিল সব থেকে বিতৃষ্ণা। এর কারণটাও জানত জায়িন৷ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বৃটিশ পুলিশেরা উনিশ বছর বয়সী আয়মানকে এয়ারপোর্ট থেকে যেদিন গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল, সেদিন থেকেই তো তার সরল জীবনটা নরকে পরিণত হয়েছিল। তিনটা বছর জেলে শারীরিক আর মানসিক নির্যাতন, প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার, তারপর একটা সময় কোমায় চলে যাওয়া, কোমা থেকে ফেরার পর জেল জীবন থেকে মুক্তি। কিন্তু ততদিনে আয়মান মেহরিন জীবন্ত লাশে পরিণত হয়ে গেছে। যে সন্দেহের জন্য তাকে ধ্বংস হতে হলো, সেই সন্দেহের কারণটাকেই সে স্বেচ্ছায় আপন করে নেয় কেবল প্রতিশোধের নেশায়। সন্ত্রাস জীবনে প্রবেশ করে,
আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ মাফিয়া বা গডফাদারদের সঙ্গে মিলে নিজেও এক দুর্ধর্ষ শিকারীতে পরিণত হয় সে। তার মতো কন্ট্রাক্ট কিলারকে আজও লন্ডন পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা হাতের নাগালে তো দূর, চোখের দেখাও দেখতে পায়নি কখনও। কারণ, খুনের সময় ভুলবশতও কখনই কোনো ক্লু ছেড়ে যেত না আয়মান। তবে তার জন্যই আলিয়ার বসবাস করা মুশকিল হয়ে যায় সেখানে৷ একই চেহারা হওয়ায় ধরা পড়ার ভয়েই হোক আর বোনের টানেই হোক, একটা সময় সে নিজেই বোনকে আর বোনের পেশাকে সঙ্গ দিতে শুরু করে।
আয়মানের এই ভয়ঙ্কর অতীতের গল্পটা জায়িন জানতে পেরেছিল যেদিন, তার দুদিন পরই সে আয়মানকে বিয়ে করে নেয়। কিন্তু জীবনসঙ্গী নিয়ে জায়িনের স্বপ্ন ছিল, তার বিবি হবে সব থেকে শুদ্ধ আর পবিত্র। সেই স্বপ্নকে পূরণ না করে অন্ধকার তলদেশে নিজের সাম্রাজ্যকে মজবুত করার উদ্দেশ্যেই শুধু আয়মানের মতো আবেগহীন, নিষ্ঠুর আর ধর্ষিতা নারীকে নিজের জীবনে গ্রহণ করেছিল সে।
আপাতদৃষ্টিতে সকলে এমনটিই জানে। কিন্তু জায়িনের কাছের মানুষগুলো ধারণা করে, যে ছোট্ট জাদুকে জায়িন কিশোর বয়সে ভালোবেসেছিল, তাকে আকস্মিক হারিয়ে আর বড়ো ভাইয়ে দূরত্বে মানসিক পীড়ায় ভুগে সুদূর অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমিয়েছিল, সেই জাদুকে বহু বছর পর কল্পনাতীত ফিরে পেয়ে দ্বিতীয়বার আর তাকে হারাতে চায়নি৷ তাই তো আয়মানের শত নিষ্ঠুরতা সহ্য করেও সেই তাকেই কূট কৌশল খাটিয়ে বিয়ে করে নেয়। তবে আয়মানের মতো আবেগহীন নারীকে কি আদৌ কোনো কৌশল অবলম্বন করে বিয়ে করতে বাধ্য করা সম্ভব ছিল? না, আয়মান চেয়েছিল বলেই জায়িন তাকে বিয়ে করতে পেরেছিল। কিন্তু আয়মান কেন নিজেকে ধরা দিয়েছিল? এর নির্দিষ্ট কোনো জবাব আজ অবধি কেউ-ই দিতে পারেনি। তবে কেউ যদি বলে– তার মতো হৃদয়হীনা মেয়ে জায়িনের স্বরূপ জানার পরও ভালোবেসে ফেলেছিল হয়ত। কিন্তু এ কথাটা হবে রূপকথার গল্পের মতো। কারণ, পুরুষ বিদ্বেষী আয়মান চরিত্রহীন পুরুষকে বিনা কারণে খুন করতেও দ্বিধা করত না। সেই মেয়েটিই জায়িনের হাতে ধরা দিয়েছিল স্রেফ নিগূঢ় কোনো উদ্দেশ্যেই। সে উদ্দেশ্যটি কী ছিল? সেটি কেবল আয়মানই জানত। আলিয়াও কখনও জানতে পারেনি তা।
বিয়ের পর জায়িন আয়মানকে কব্জা করার জন্যই হোক আর নিজের প্রতি তাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই হোক, নিজের অস্বাভাবিক কামবাসনা চরিতার্থ করত সে চতুরতার সঙ্গে আয়মানের খাবারের সঙ্গে উত্তেজক ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে। অর্ধ অচেতন আয়মান ঠিক তখনই ওকে কাছে টেনে নিতো নিঃসঙ্কোচে। তবে মাদকাসক্ত আয়মানকে এই ওষুধও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে ভেবে জায়িন এমন পন্থা থেকে সরে আসে একটা সময়। তাই বলে বউয়ের প্রতি দয়ালু বা কোমল হতে পারেনি সে। নিজের বাসনা নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ার ফলেই সে সচেতন আয়মানকে মাঝেমধ্যে জোরপূর্বক কাছে টেনে নিতো। ঠিক সেই সময়টিতে পাগল হয়ে উঠত আয়মান। অতীতের দূর্বিষহ স্মৃতি এসে হানা দিতো তার মানসপটে। পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে জায়িনকে ক্ষত বিক্ষত করে তুলত। অগণিতবার সে জায়িনকে হত্যা করার প্রচেষ্টাও চালিয়েছে। আর তাতে যতবার ব্যর্থ হয়েছে, ততবারই উন্মাদের মতো নিজের শরীরকেই কষ্ট দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত মাদক গ্রহণের মাধ্যমে।
এর মাঝেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তার গর্ভে দুটি প্রাণ চলে আসে তার। নিজের শারীরিক পরিবর্তনটা যখন টের পায় সে, নিজ উদ্যোগেই চেকআপ করতে চলে আসে হাসপাতাল। গর্ভধারণের রিপোর্টটা হাতে পাবার পরই সে ঠান্ডা মাথায় আরও ভয়ানক এক পরিকল্পনা করে বসে তখন। জায়িনকে মেসেজে করে খবরটা জানায় সে। এবং আরও একটি মেসেজ করে, ‘ওয়েল, আমি তোমাকে একটা শর্ত সাপেক্ষে চমৎকার দুটো বাচ্চা দান করব, জায়িন। শর্তটা হলো– রাশিয়ান মাফিয়া সংগঠনের কাছে আমার গুড ইমেজ তৈরি করে দিতে হবে তোমাকে৷ ওদের ধারণা, আমি ইউ এস এর হেলস এঞ্জেলস চক্রের হয়ে কাজ করছি। এ কারণে ওরা আমার প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে৷ আমার প্রতি ওরা ক্ষিপ্তও। অস্ট্রেলিয়ার বাইরে আমি নিরাপদ নই। তাই ওদের বিশ্বাসটা আমি ফেরত চাই। আর আমি জানি, ওদের সঙ্গে বর্তমান গুড কানেকশন হয়েছে তোমার। তাই তুমি কাজটা করতে পারলেই তোমার বেবি আমার ইউটেরাস-এ বেড়ে উঠবে। নয়ত আজই ফিনিশ হবে এই ফিটাস।’
এবং এটিই ছিল আয়মানের জায়িনকে বিয়ে করার কারণ। প্রথমত, আয়মান জায়িনের হাত পালিয়ে গিয়ে রেহাই পেলেও রাশিয়ান মাফিয়া সংগঠনের হাতে পড়ে যেত। এই সংগঠনই ওকে সন্ত্রাস জীবনে প্রবেশে সহায়তা করে। তাই একরকম এদের কাছে আয়মান ছিল ঋণগ্রস্ত এবং দায়বদ্ধ।
কিন্তু একটা সময় সে যখন নিজের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরার জন্য অন্য এক টেরোরিস্ট দলের সঙ্গে বাংলাদেশ যায়। সেখান থেকে ফিরে আসার পর প্রথমে আমেরিকা ঢুকেছিল সে। তখনই রাশিয়ান মাফিয়াদের কোনো এজেন্ট তাদের জানায়, আয়মান হেলস এঞ্জেলস চক্রের সঙ্গে ওঠা-বসা করছে। তারপরই আয়মানকে বেইমানির সাজা দিতে মরিয়া হয়ে পড়ে ওরা। এবং এদের হাত থেকে বাঁচতেই সে অস্ট্রেলিয়ার কোনো এক শহরে আশ্রয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে সে জায়িনের কবলে পড়ে। তবে জায়িনকে প্রথমে হেনস্থা করলেও পরবর্তীতে নিজে থেকেই সে জায়িনকে বিয়েতে সম্মতি জানায়। এর কারণ ছিল একটাই– তথ্য পেয়েছিল সে রাশিয়ান মাফিয়া সংগঠনের সঙ্গে জায়িনের নানারকম লেনদেন শুরু হয়েছে। বেশ ভাব জমে উঠেছে তাদের মাঝে। তাই জায়িনকে ব্যবহার করে নিজের পুরোনো দলের কাছে ফিরে যেতে চাইছিল সে।
বিয়ের পর জায়িন তার এই গোপন উদ্দেশ্যটি কোনোভাবেই খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু ওই মেসেজটির পর সে যখন অবগত হলো আয়মানের উদ্দেশ্যে, তখন আয়মানের দেওয়া শর্ত শুনে অনায়াসেই রাজি হয়ে যায়। যদিও এত সহজে ওর মেনে নেওয়ার ব্যাপারটি আয়মানের হজম হয়নি। সে নিশ্চিত ছিল, জায়িন সংগোপন তার জন্য কোনো না কোনো ফাঁদ পেতে রেখেছেই। কিন্তু সেটা কী হতে পারে? তা খুঁজতে খুঁজতেই গর্ভকালীন সময়ের সাড়ে নয়টি মাস কেটে যায়৷ আর এই সময়টুকুই ছিল আয়মানের জীবনের মোড় ঘুরে দেওয়ার মূল্যবান চাবি। কোনোভাবেই এক ফোঁটা মাদক সে নিতে পারেনি শরীরে, পারেনি জায়িনের দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে৷ এবং সেই সাথে তাকে জায়িনের কামনার শিকারও হতে হয়নি। সব কিছু মিলিয়ে স্বস্তি আর অস্বস্তি নিয়েই কিছুটা স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ পায় সে। আর উলটোদিকে জায়িনের জন্য ছিল এই ক’টি মাস অসহ্য যন্ত্রণার সমতুল্য। নিজের দেহের ক্ষুধায় কাতরিয়েছে সে প্রতিটিদিন। কিন্তু না পেরেছে আয়মানের কাছে যেতে আর না অন্য কোনো নারীর। দুজন সব সময় একে অপরকে হারানোর নেশায় মত্ত থাকত বলেই ছোটো, বড়ো কোনো সুযোগই তারা বাদ দিতো না।
আয়মান ওকে আরও একটি শর্ত আরোপ করেছিল চার মাসের গর্ভাবস্থায়। যদি কখনো সে টের পায়, জায়িন দ্বিতীয় কোনো নারীকে কাছে টেনেছে, তবে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে হলেও সে বাচ্চা গর্ভপাত করে ফেলতে একবারও ভাববে না। এই শর্তটা ছিল কেবল জায়িনকে জব্দ করার জন্য। যেহেতু কাজের সূত্রে দুজনকে এক সঙ্গেই সবখানে থাকতে হতো, তাই জায়িনের ওপর নজরদারি করাটা কষ্টকর ছিল না। তাছাড়া ওই সময়গুলোতে কেন যেন স্যামুয়েল আয়মানকে বেশ সাপোর্ট করত। এর প্রধান কারণ ছিল– গর্ভাবস্থায় আয়মান যেন মানসিক পরিতৃপ্তি পায়। ওদের দুজনের মাঝে না চাইতেও ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। স্যামুয়েল তখন জায়িনের কষ্টের চেয়েও আয়মানের কষ্টকে গুরুত্ব দিতো। তাই লুকিয়ে যদি কখনও কোনো নারীর সঙ্গে ডেটে যেত জায়িন, মুহূর্তেই আয়মানের হুমকিবার্তাও পৌঁছে যেত ওর কাছে। আর এই স্পাইগিরির কাজটা করত স্যামুয়েলই। এ ব্যাপারটার জন্য জায়িন মাঝেমধ্যেই চড়াও হয়ে উঠত স্যামুয়েলের প্রতি। জায়িনের এই দশা দেখে তখন বাকি তিন বন্ধুরা হাসি ঠাট্টা করতে ভুলত না।
এই সময়টার পর আয়মান দুটো দেবশিশু জন্ম দিলো। যাদের মাঝে কন্যা শিশুটা বাঁচল না। আয়মানকে খেপাতে জায়িন মুখে সব মময় পুত্র সন্তানের বুলি আওড়ালেও বাবা হিসেবে কখনই কামনা করেনি বা প্রত্যাশাও করেনি, সৃষ্টিকর্তা কন্যা সন্তান ওকে দিয়েও ফিরিয়ে নেবেন নিজের কাছে। মৃত সেই সন্তানকে সবার আগে কোলে তুলেছিল স্যামুয়েল। আর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা জায়িনের সারা দেহ তখন কেঁপে উঠেছিল সন্তানের নিস্তব্ধতায়৷ সেদিনই প্রথমবার ওর মনের কোনে ঝলক দিয়ে উঠেছিল একটা প্রশ্ন। নিজের পাপের সাজা কি সে পেতে শুরু করল সন্তান হারানোর মাধ্যমে? দাফনের আগ মুহূর্তে জায়িন কাফনের কাপড়ে মোড়ানো কন্যাকে বুকের কাছে জাপটে ধরে রেখেছিল অনেকক্ষণ। সবার অগোচরে অশ্রু টলমল চোখদুটোও মুছে নিয়েছিল দ্রুত। তারপর হাসপাতাল ফেরার পর সামলাতে হয় ওকে আরেক ঝক্কি। আয়মানের মানসিক অবস্থা এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, একজন সেবিকা ইতোমধ্যে খুন হতে গিয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিল। ওর দাবি ছিল, সে মৃত সন্তান জন্ম দেয়নি। কিন্তু বোকা সেবিকা সত্যটা জানিয়ে ফেঁসে যায়। পরমুহূর্তেই জায়িন উপস্থিত হলে আয়মান তখন পুরোদস্তুর দোষারোপ করে ওকে– জায়িন সব সময় পুত্র সন্তান চাইতো বলেই কন্যা সন্তানকে সে ইচ্ছা করেই মেরে ফেলে ফেলেছে।
যদিও আয়মানের পাগলামি কমে যায় একটা সময়। কিন্তু পূর্বে যতখানি বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ছিল জায়িনের প্রতি, তা আরও বেড়ে যায় সন্তান হারানোর কারণে। তারপর বন্ধুদের আর রেজা পরামর্শে দুজনেই দুজনের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে শুরু করে। আয়মান আর জায়িনের মাঝে সম্পর্ক স্বাভাবিক না থাকলেও নাওফিলের জন্য দুজনের স্নেহ আর যত্নের কমতি ছিল না। পুরোপুরি আড়াইটা বছর জায়িন নারীসঙ্গ ছাড়া দিনপার করতে পেরেছিল শুধু এই সন্তানের জন্যই। একই কারণে আয়মানও মাদক সেবন থেকে পেরেছিল দূরে থাকতে৷ নাওফিলের দেড় বছর বয়সে দুজনের দূরত্ব ঘুচেছিল এক তাণ্ডব চলার পর। সেদিন দুপুরের পর জেরিন এসেছিল আয়মানের কাউন্সিলিংয়ের জন্য। তবে এর বাইরে আয়মানের সঙ্গে জেরিনের খু্ব একটা সখ্যতা গড়ে ওঠেনি৷ কাউন্সিলিং শেষে জেরিন বিদায় নিয়ে চলে আসে তার কাছ থেকে। লিভিংরুম পার করে যাওয়ার সময় নজরে বিঁধে যায় সেদিন আহত জায়িনের উন্মুক্ত দেহ। ছোটোখাটো একটা অ্যাক্সিডেন্ট করে ঘরে ফিরেছিল জায়িন।
পেটের কাছটায় ওর কাচে কেটে গিয়েছিল বেশখানিক। শোবার ঘর অবধি না গিয়ে লিভিংরুমে বসে নিজেই নিজের ক্ষত পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিল। জেরিন তা দেখে ছটফটিয়ে উঠে ওকে সাহায্যের জন্য ছুটে যায়। একরকম জোর করেই সে জায়িনকে বসিয়ে ওর ক্ষততে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিতে থাকে। রেজার সুবাদে জেরিনের সঙ্গে জায়িনের সম্পর্ক কিছুটা বন্ধুর মতোই ছিল তখন। আবার রোজ রোজ আয়মানের জন্য বাসায় যাতায়াত ছিল বলে সেই বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আরও ভালো হয়েছিল। তবে সেটাই যে জেরিনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা জেরিন বা জায়িন কেউই কোনোদিন ভাবেনি৷ শুরু থেকেই জেরিন জায়িনের প্রতি ভীষণভাবে দুর্বল ছিল। সেই দুর্বলতা পুরোপুরি ভালোবাসাতে রূপ নিয়েছিল আয়মানের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে। তখনো সে জায়িন বা আয়মানের গুপ্ত পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিল না। তবে ওরা দুজন যে একটা নামমাত্র সম্পর্ক বহন করছে, এ ব্যাপারে অবগত হয়েছিল সে। এজন্যই জায়িনের প্রতি অনুভূতি বাড়াতে জেরিন খুব একটা ভাবেনি। নাওফিলকে সে মন থেকেই স্নেহ করত। তাই অদূর ভবিষ্যতে যদি জায়িন তার অনুভূতিকে সম্মান জানায়, তবে নাওফিলকে সন্তান স্নেহে কাছে টেনে নিতে একটুও অসুবিধা হবে না।
ব্যান্ডেজ শেষে জায়িন ওর প্রশংসিত স্বভাবজাত মুচকি হাসি ফুটিয়ে ধন্যবাদ জানালে জেরিন ওর খোলা দেহের প্রতি আকর্ষিত হয়ে বেসামাল অনুভূতিতে চুমু খেয়ে বসে চিবুকে। নিঃসন্দেহে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল জায়িন। কারণ, জেরিনের তরফ থেকে ভালোবাসা শতভাগ থাকলেও ওর তরফ থেকে তা ছিল একেবারেই শূন্য৷ জেরিনের মনের ভাব সে টের পেলেও আশ্চর্যভাবে তা নিয়ে ভাবেনি জায়িন। বলা ভালো, শারীরিক চাহিদার প্রতি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আসার পর থেকে কোনো নারীর আকুল আহ্বানকেই ও পাত্তা দেয়নি৷ তবে অতীতের মানুষটি হলে ওই মুহূর্তেই সাধারণ ওই চুমুর পুরোপুরি ফায়দা নিতে দুবারও ভাবত না।
জেরিনের অনুভূতিপূর্ণ চুমুর জবাবে জায়িন বিড়বিড়িয়ে বলেছিল, ‘ভুল করছ, জেরিন।’
-‘কেন?’ আহত সুরে জিজ্ঞেস করে জেরিন, ‘তুমি কি ভালোবাসো আয়মানকে?’
উত্তরে জায়িনের নীরবতায় জেরিনের জন্য বিপদ ডেকে আনে তখন। দুর্ভাগ্যবশত আয়মান দরজায় দাঁড়িয়ে শুরু থেকে সবটাই দেখে ফেলেছিল সেদিন। তখনো তার মানসিক সমস্যাগুলো একেবারে সেড়ে ওঠেনি৷ ভেতরে ঢুকেই সে প্রথমে জেরিনের ওপর আক্রমণ চালায়৷ কারাতে, তায়কোয়ান্দো আর মার্শাল আর্টে দীক্ষা নেওয়া আয়মানের মুষ্ট্যাঘাত এবং লাথির চোটে জেরিন যখন প্রায় চেতনাশূন্য, নিষ্ঠুর আয়মান তারপরও জেরিনের মাথাটা ঠুকে দেয় দেওয়ালের সঙ্গে। জায়িন তাকে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। যেন অসুর ভর করেছিল আয়মানের ওপর। উপরন্তু জায়িন তাকে ঠেকানোর প্রচেষ্টার কারণে সে আরও উন্মাদ রাগে ফেটে পড়েছিল। চিৎকার করে জায়িন রেজাকে ডাকতে থাকে নিরুপায় হয়ে৷ রেজাও অ্যাক্সিডেন্টে কিছুটা আহত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল ঘরে। জায়িনের অমন আতঙ্কিত কণ্ঠ পেয়ে ছুটে এসে যখন দেখে সে, রক্তে মাখামাখি জেরিন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে নিচে আর জায়িন আয়মানকে পেছন থেকে জাপটে ধরে রেখেছে। ঘটনা পুরোপুরি তখন বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতে পারে, এই মুহূর্তে জেরিনকে আয়মানের সামনে থেকে না সরালে খুন হয়ে যাবে ও মেয়েটা। যে মেয়েটাকে তখন মনেমনে ভালোবেসে রেজা মিষ্টি স্বপ্ন বোনে যখন তখন। জেরিনকে কোলে তুলে সে বেরিয়ে পড়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
আয়মানকে ধরে রাখতে গিয়ে জায়িন ক্ষত স্থানেও আঘাত পাচ্ছিল খুব৷ ব্যথার চোটে তাকে ছেড়ে দিতেই চূড়ান্তভাবে আক্রমণটা করে বসে আয়মান। কেন সে জেরিন আর জায়িনকে ওভাবে দেখে খেপে উঠেছিল, তার জবাব কিন্তু তখনো ছিল না তার কাছে। জায়িন আয়মানের প্রতিটি ঘুষি আর লাথিগুলো যতবেশি সামলে নিচ্ছিল, সে ততবেশি পাগল হয়ে উঠছিল দেখে জায়িন শেষ পর্যায়ে তাকে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সঙ্গে। আয়মানের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয় তাতে। দাঁতে দাঁত চিবিয়ে ক্ষিপ্ত জায়িন বলে ওঠে তাকে, ‘আমার জান যদি কোনোভাবে তোমার এই জঘন্য হিংস্রতা দেখতে পায়, জাদু। আই প্রমিজ, তোমার জন্য জানোয়ারের চেয়েও অধম হবো আমি। আমি ভালো মানুষ না হই, ভালো বাবা হওয়ার জন্য তোমার মতো মা’কে ওর জীবন থেকে সরিয়ে ফেলতে একটুও সঙ্কোচ করব না।’
জান! এই একটা নাম কানে পৌঁছানো মাত্রই আয়মান যেন আত্মসমর্পণ করে জায়িনের কাছে৷ তা বোঝা মাত্রই শিথিল করে জায়িন নিজের হাতদুটো। তবে কৌতূহলের কারণে আয়মানকে বাহুডোর থেকে মুক্তও করে না। জিজ্ঞেস করে ওকে, ‘কেন এমনটা করলে, জাদু? ইট ওয়াজ আ নরমাল কিস, রাইট?’
প্রশ্নটার উত্তর জানার কৌতূহল কেবল জায়িনেরই ছিল না। আয়মানও ভাবনায় মগ্ন হয়, কেন সে ওদের এক সঙ্গে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ল? টিপিকাল স্ত্রীদের মতো কি তবে সেও স্বামীর প্রতি পজেসিভ হয়ে পড়েছে? স্বামীর সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো নারীর সান্নিধ্য কি স্রেফ এজন্যই মানতে পারেনি সে?
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭২
যে মুহূর্তে আয়মান এই ভাবনায় বুঁদ হলো, সে মুহূর্তেই জায়িন তার চোখে নিজের জন্য বিশেষ কিছু আবিষ্কার করতে পেরে ভেতরে ভেতরে জয়ের উল্লাসে ফেটে পড়ল। হ্যাঁ, জায়িনের অপ্রকাশিত এক বাসনা ছিল সব সময়ই, আয়মান ওর জন্য একটুখানি হলেও দুর্বল হোক। আর তা আবিষ্কারের পর জায়িন শুধু জয়ের উল্লাসেই ফেটে পড়ল না, ওর নিজের মাঝেও কী এক ভালো লাগা অনুভব হলো যেন। বলা বাহুল্য, আয়মানের প্রতি ওরও যে দুর্বলতা আছে, তা সেও বুঝে উঠতে পারেনি তখনো। আর সেই দুপুরেই আড়াই বছর পর জায়িন স্ত্রীর সংস্পর্শে আসে। শুরুতে আগের মতোই জোরাজোরি চালাতে হলেও শেষমেশ আয়মানও মেনে নেয় ওর বশ্যতা।
