আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি
জেরিনের ভাইয়ের পরিবার বসবাস করে ক্যানবেরাতে। কিন্তু পড়াশোনাটা হয় জেরিনের সিডনিতে। তার বাংলাদেশে যাতায়াত ছিল ততদিন, যতদিন মা মানুষটি বেঁচে ছিলেন৷ বাবাকে সে হারিয়েছে আরও আগে৷ মা দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখতে চাইতেন না বলেই তাকে মাঝেমধ্যে দেখতে যেত হতো জেরিনকে। এমনই একবার বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া ফেরার ফ্লাইটে পরিচয় হয়েছিল তার রেজার সঙ্গে। সেই থেকেই দুজনের বন্ধুত্ব৷ জায়িনও সিডনিতে থাকত বলে এক সময় রেজার মাধ্যমেই জায়িনের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায় তার৷
জায়িনের কাজের জন্য যতবার দেশ থেকে ছুটে আসত রেজা, ততবারই সে জেরিনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করত। খুব স্বল্প সময়ের মাঝেই তাকে ভালোবেসেছিল সে। কিন্তু তা প্রকাশের পূর্বেই মনটা চূর্ণবিচূর্ণ হলো– যেদিন জানতে পারল কেন আয়মান ক্ষিপ্ত হয়েছিল তার প্রতি। কষ্ট তো পেয়েছিল সে বটেই। তবে তার চেয়েও বেশি অপ্রকাশিত ক্রোধে বুকের ভেতর জ্বলে পুড়ে গিয়েছিল ওর। আর সেই ক্রোধের সঙ্গে ছিল অবিশ্বাস্য হিংসাও। জায়িনের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার পর থেকে রেজা যতখানি না মুগ্ধ হতো জায়িনের সুন্দরতা আর ব্যক্তিত্বে, ততখানিই ওর আফসোসের গ্লানি জাগত এই ভেবেই– জায়িনের মতো ভাগ্য তারও তো হতে পারত! যেখানেই পা পড়ত জায়িনের, সেখানেই নারী-পুরুষ সকলের আগ্রহের পাত্র বনে যেত মানুষটি না চাইতেও৷ এটাই একটা সময়ের পর থেকে রেজাকে বেশ হীনম্মন্যতায় ভোগাত। আর জেরিনের মনের খবর জানার পর ওর সেই হীনম্মন্যতায় রূপ নেয় জায়িনের জন্য তীব্র হিংসা এবং অস্বাভাবিক ক্রোধে। অকৃতজ্ঞের মতোই একটা সময় ভুলে যায় সে, যে নিশ্চিন্ত জীবনটা অতিবাহিত করছিল তা জায়িন বা মাহতাব সাহেবের বদৌলতেই৷
চারটাদিন জেরিনের বাঁচা-মরার লড়াই চলেছিল। সুস্থ হওয়ার পর জায়িন অপরাধবোধ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে করে দেখতে এসেছিল তাকে৷ সেখান থেকেই জেরিন স্যামুয়েলের নজরে পড়ে যায়। তবে তাকে নিয়ে রেজার মনোভাব জায়িন ব্যক্ত করেছিল বন্ধুদের কাছে। তাই ততদিন অবধি জেরিন নিরাপদ ছিল ওদের কাছে, যতদিন না রেজা বেইমানি করে জায়িনের সঙ্গে।
নাওফিল তিন বছরে যখন পা ফেলল, ঠিক তারপরই জায়িনের সঙ্গে রেজা চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তাতে অবশ্য জায়িনের মতো প্রখর বুদ্ধিমত্তার পুরুষকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা বাংলাদেশ আইনের ছিল না। কিন্তু রেজা যে ছিল ঘরশত্রু বিভিশন। জায়িনের সব থেকে বড়ো বড়ো শত্রুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করতে থাকে সে। জায়িনের বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সে শত্রুপক্ষের কাছে পাচার করার কারণে তারা জেনে গিয়েছিল জায়িনকে ধ্বংস করার অস্ত্র৷ সে অস্ত্র প্রয়োগ করেই তারা জায়িনের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান আর আমেরিকান পুলিশ বিভাগকে। তারপর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অপরাধী হিসেবেই ওকে আর আয়মানকে ফাঁসিয়ে দেয় তারা। এর কৃতিত্বের ভার বিশেষভাবে বহন করত রেজাই৷ আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরই ওদের দুজনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই শুরু হয়– শুরু হয় যাযাবর জীবন নাওফিলকে নিয়ে৷ সে মুহূর্তে জায়িনের বন্ধুরা চাইলেও প্রত্যক্ষ উপায়ে সহযোগিতা করতে পারত না৷ ওই বিপজ্জনক মুহূর্তে কেবল আলিয়াই নিজের আয়েসী জীবন ত্যাগ করে এগিয়ে আসে বোনের পাশে।
রেজার জারিজুরি জায়িনের কাছে ফাঁস হওয়ার পরই জেরিনের সঙ্গে স্যামুয়েল আর বাকি তিন বন্ধুরা অন্যায় করে বসে। কারণ, ততদিনে রেজার সঙ্গে জেরিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা পালটে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল, তার সবটাই ওরা জানত। রেজা তার সর্বস্ব দিয়েই ভালোবাসতো জেরিনকে। জেরিন হয়তো তার মতো করে ভালোবাসতে না পারলেও তাকে আপনজনই ভাবত। দুজনের পরিকল্পনা ছিল খুব শীঘ্রই বিবাহিত জীবন শুরু করবে। কিন্তু তার পূর্বেই তছনছ হয়ে যায় তার জীবনটাও আর জায়িন, আয়মানের জীবনটাও। রেজার বেইমানির সাজা জায়িন শুধু রেজাকেই দিতে চেয়েছে সব সময়। কিন্তু ওর চার বন্ধু যে ওর মতো নৈতিকতার ধার ধারত না কখনই৷ যে জন্য ওদের কাছে রেজার অন্যায়ের মাশুল দিতে হয়েছিল জেরিনকেও।
দীধিতির জন্মের সময়েও জায়িন অস্ট্রেলিয়াতেই ছিল লুকিয়ে। শুধু ভিন্ন শহরে। তবে বন্ধুদের সঙ্গে ওর দ্বন্দ চলছিল জেরিনের কারণে। আয়মানকে দিয়ে ওর বিবেকের দরজা খুলেছিল কিনা। ধর্ষিতা নারীর বুক ফাটা আর্তনাদ কতটা অসহনীয়, তা তো সে প্রতিটিদিন কাছ থেকেই দেখতে পেয়েছিল বলেই জেরিনের সঙ্গে হওয়া ওই অন্যায় ওকে প্রতিবাদী করে তুলেছিল বন্ধুদের প্রতি। নিজের দুঃসময়েও তাই জেরিনের ডেলিভারির পর সিডনি ছুটে গিয়েছিল জেরিনকে দেখতে। আশ্চর্যভাবে আয়মানও সেদিন ওকে বাধা দেয়নি৷ অধিকন্তু নিজেই আলিয়াকে সঙ্গে করে এসেছিল সেও দীধিতির মুখদর্শন করতে।
স্যামুয়েলের নোংরা মানসিকতার মাঝে একটা দিকই কেবল প্রশংসনীয় ছিল। সেটা হলো, জায়িনের মতো তারও বাবা হওয়ার ভীষণ শখ। ছোটো বাচ্চাদের জন্য অপরিসীম স্নেহ ছিল তার মনে সব সময়ই৷ এজন্যই তো বন্ধুর চেয়েও আয়মানকে সাপোর্ট দিয়েছে সে একটা সময়। দীধিতি জন্ম নেওয়ার পর তার সেই প্রশংসনীয় দিকটা জায়িনের নজরেও পড়ে। এমনকি দীধিতির জন্যই সে জায়িনের কথাতে জেরিনকে বিয়ে করতেও রাজি হয়েছিল। বলা যায়, জায়িনকে দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল সে। প্রায় চারটা দিন হাসপাতালে থাকা জেরিনকে স্যামুয়েল তাই বহুবার প্রস্তাব দেয় আর ক্ষমা ভিক্ষাও চায়। কিন্তু সব ক্ষতিই কি পূরণ হয়? এক নারীর সর্বস্ব কেঁড়ে নেওয়া চারজন জানোয়ার সমতুল্য মানুষ তাদের অন্যায়ের কোনো সাজা ভোগ করল না৷ কেবল মুখে ক্ষমা চেয়েই পার পেয়ে গেল তারা।
জেরিন সে সময় পারেনি ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কাছে পায়নি রেজাকেও৷ কতটা অসহায়ত্ব নিয়ে স্যামুয়েলদের নজরবন্দি হয়ে থাকতে হয়েছিল তাকে! আদর স্বরে দীধিতিকে যখন ‘তিয়া'(Thea) বলে ডাকত স্যামুয়েল, তার চোখে তখন দীধিতির জন্য প্রগাঢ় ভালোবাসা দেখতে পেতো জেরিন। তবুও পারেনি তার প্রস্তাব গ্রহণ করে তাকে অনায়াসেই ক্ষমা করে দিতে। শুধু মনেপ্রাণে চাইতো, কেউ এসে তাকে আর তার সন্তানকে উদ্ধার করুক স্যামুয়েলের কবল থেকে।
সৃষ্টিকর্তা জেরিনের সে প্রার্থনা কবুলও করেছিলেন। অদ্ভুতভাবে আলিয়া সেবার জেরিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সবার আড়ালে। জেরিন অবশ্য শঙ্কিত ছিল তাতে। আলিয়া যে রেজার হাতে দীধিতিকে তুলে দেবে, এ ব্যাপারটা সে পরিস্থিতিতে অবিশ্বাস করার মতোই৷ কেননা, রেজা তো তখন জায়িনদের কাছে নিকৃষ্ট শত্রু৷ সেই রেজাকে আলিয়া সাহায্য করেছিল বিনা ফায়দাতে! অর্থাৎ রেজাকে সহায়তা করে একদিক থেকে আলিয়াও করেছিল জায়িন, আয়মানের সঙ্গে বেইমানি। এর পেছনে অবশ্যই কোনো গুপ্ত উদ্দেশ্য ছিল তার। সেটা কী? তা জেরিন ভেবে না পেলেও আজীবন এজন্যই সে কৃতজ্ঞ থেকে গেছে আলিয়ার কাছে।
এরপর বাংলাদেশে রেজা পালিয়ে এলে জায়িন আর আয়মানকেও অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। তখন বাংলাদেশেও ওদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়৷ কোনোভাবে ওরা এখানে এলেও এয়ারপোর্ট থেকেই ধরা পড়ে যাবে পুলিশের কাছে৷ এমন পরিস্থিতিতে রেজাকে হত্যা করার পরিকল্পনা জায়িনের মাথাতেও ছিল না৷ সে তখন নিজের পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। কিন্তু দীধিতির কারণে স্যামুয়েলরা রেজাকে কুকুরের মতো ধাওয়া করে বেড়িয়েছে বাংলাদেশে। সে তখন বহু ভাবনাচিন্তা করে একটা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো এক পক্ষের কাছে তো তাকে মরতেই হবে৷ সে পক্ষটা হয় স্যামুয়েল নয় মাহতাব শেখ। তবে শেখ পরিবারের পুরুষদের মাঝে সে ন্যায়পরায়ণতা দেখেছিল। তাই জীবন ঝুঁকি নিয়ে হলেও স্যামুয়েলের হাত থেকে বাঁচতে জাকির শেখের শরণাপন্ন হয় সে৷ হয়তো সেদিনই সে খুন হতো মাহতাব শেখের কাছে। যদি না তার কোলে দীধিতির রূগ্ন দেহটা থাকত৷ ওই সময়ে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া দীধিতি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।
যে কেউ ওকে দেখলেই দুঃখ স্বরে মন্তব্য করে বসত, ‘বাচ্চাটা মনে হয় বাঁচবে না বেশিদিন।’ একইভাবে জাকির শেখেরও তাই-ই মনে হয়েছিল। আর এজন্যই মায়া বা করুণা করে রেজাকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য হন তিনি৷ জায়িনের সঙ্গে যখন যোগাযোগ হয় জাকিরের, রেজার ব্যাপারে সবটা জেনে সে সময় জায়িনও প্রথমবার এক বেইমানকে ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছিল দীধিতির কথা ভেবেই। বন্ধুত্বের খাতিরে তার উচিত ছিল দীধিতিকে স্যামুয়েলের হাতে তুলে দেওয়ার আদেশ দেওয়া। কিন্তু নিজের পরিণতির পর সে উপলব্ধি করেছিল, যদি স্যামুয়েলেরও কোনো একদিন নিজের মতো পরিণতিই হয়, তবে যে দীধিতির জীবনটাও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তার কথা ভেবেই নিজের দুর্বিষহ জীবনের জন্য যে রেজা দায়ী, তাকেও ছেড়ে দেয় সে।
জায়িনের মাঝে ওই সময়টিতে নিজের গর্হিত অন্যায়ের জন্য অপরাধবোধ অনুভব হতো খুব৷ ক্ষমা করতে পারার মহৎ গুণ না তৈরি হলেও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল অজান্তেই। কখনও কারও কাছে প্রকাশ না করলেও মনে মনে ভাবত সে, যদি অতীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হতো, তবে সে নিজের পাপী জীবনের সতেরোটা বছর নতুন করে সাজাতো। তার পিতৃ সত্তাই তার ভেতরের কলুষিত আত্মাকে ধীরে ধীরে শুদ্ধ করে তুলেছিল।
রেজা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দশটি বছর যে সুনিশ্চিত জীবনটা কাটাতে পেরেছিল, তার আসল কৃতিত্ব ছিল জায়িনেরই। কিন্তু একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’ ছাড় পায়নি যেমন জায়িনও, তেমন পায়নি রেজাও। প্রত্যেকেই নিজেদের কৃতকর্মের সাজা ভোগ করেছে।
দীধিতি আর জাইমার সমস্ত কথপোকথনই শুনতে পেয়েছে ইয়াসিফ আর নাওফিল। কিন্তু মারিহামের সঙ্গে জাইমার যোগাযোগ হলো কী করে, তা আর জানতে পারল না তারা। কারণ, তদন্ত কারক নিজেই বিধ্বস্তপ্রায়। মারিহামের ব্যাপারে কোনো জিজ্ঞাসা না করেই দীধিতি বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
-‘স্মরণের প্রতিও যে তোকে কখনও প্রতিশোধপরায়ণ হতে দেখব, তা কল্পনাতেও আসেনি।’ নাওফিলের জন্য কিছুটা অসন্তুষ্টিই প্রকাশ পেলো ইয়াসিফের কণ্ঠে।
কিন্তু তা শুনেও কোনো জবাব রাখল না নাওফিল৷ ওর কঠিন মুখের দিকে চেয়ে ইয়াসিফ এবার দরাজ কণ্ঠে বলল, ‘সত্যগুলো এভাবে ওকে জানিয়ে ঠিক করলি না, জাদ। ধাক্কাটা সামলাতে পারেনি বেচারি।’
-‘জানি।’ নিস্পৃহতা তবুও নাওফিলের মাঝে। যা দেখে ইয়াসিফ একটু রূঢ়ভাবেই বলে উঠল এবার, ‘তাহলে কেন করলি এমনটা? ও কি তোর, আমার মতো কঠিন ধাতুর? যতই বদলাক ও, ওর মন তো আগের মতোই নাজুক আছে।’
-‘তাও জানি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাওফিল দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। দীধিতির আগমনের অপেক্ষা স্পষ্ট ওর দৃষ্টিতে। ইয়াসিফের রাগকে তেমন গুরুত্ব দিলো না সে।
সকালবেলা দীধিতি যখন উত্তপ্ত মেজাজের সঙ্গে বলে উঠল ওকে, ‘চরিত্রহীন আর ঘৃণ্য কীটের মতো বাপ-মা’র ঔরস হয়ে আর কতখানি ভালো হবে তুমি? যে গর্ভই কলঙ্কিত, সেই গর্ভের সন্তান তো অমানুষই হবে!’ হৃদ যন্ত্রে সেই মুহূর্তে সহস্রাধিক সুচের আঘাত অনুভব করেছিল নাওফিল। প্রতিবার বাবাকে নিয়ে ধিক্কার পেলে যে কষ্ট পেতো সে, মায়ের গর্ভকে কলঙ্কিত বলায় নাওফিল আজ শুধু সেই কষ্টটাই কেবল দ্বিগুণ পায়নি, দীধিতির জন্য অসম্ভব ক্ষোভও জন্ম নিয়েছিল ওর মনে। তাই এর জবাব সে এমন পাষাণভাবে প্রস্তুত করে রাখে, যা শোনার পর দীধিতি নিজের কষ্টের সঙ্গে যেন ওর কষ্টটাও সমানভাবে অনুভব করতে পারে। এবং সেই সাথে অনুশোচনার আগুনেও যেন দগ্ধ হয়।
-‘আমাদের জীবনের এই দুঃসহ অধ্যায়টা আমি সত্যিই চাইনি এভাবে ওর সামনে উন্মোচন করতে’, বিড়বিড় করে বলতে থাকল নাওফিল। ‘এভাবে তো হওয়ার ছিল না আজকের মুহূর্তটা৷ যেমনটা ছিল না আমাদের বিচ্ছেদ হওয়ার কথাও। তবুও তো হলো।’
কঠিন মুখের আড়ালে থাকা নাওফিলের বুকের দহন দেখতে পেয়ে ইয়াসিফ আর শক্ত কিছু শোনাতে পারল না ওকে৷ কোনো কিছু বলারই সুযোগ পেলো না সে। দীধিতি চলে এসেছে। ও বেচারির অশ্রু টলমল চোখ আর ভেজা গালে চোখ পড়ে ইয়াসিফের তার প্রতিও মায়া হলো। শুধু নাওফিল ফিরে তাকাল না দীধিতির দিকে। নীরবেই এসে দাঁড়াল দীধিতি ওর পাশে৷ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে আকুতি জানাল নাওফিলের কাছে, ‘আমাকে দুটো ঘণ্টার জন্য ছাড় দেওয়া সম্ভব?’
-‘না।’ চকিতেই অস্বীকৃতি জানিয়ে নাওফিল দাঁড়িয়ে পড়ে ইয়াসিফকে বলল, ‘চট্টগ্রাম ব্যাক করে আজই মাভিশাকে নিয়ে ফিরিস। কাল ওকেও মিহাদের প্রোগ্রাম অ্যাটেন্ড করতে বলিস।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৩
-‘হুঁ, তা ভেবেই রেখেছি।’
-‘ওকে। আমি বের হচ্ছি৷ ইনশা আল্লাহ কাল দেখা হচ্ছে।’
মাথা নাড়িয়ে ইয়াসিফ সম্মতি দিতেই নাওফিল কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলো৷ পিছু পিছু আসতে হলো দীধিতিকেও। সারাদিনের কর্মপরিকল্পনা সম্পন্ন না করে তাকে যে নাওফিল মুক্তি দেবে না, তা সে বেশ বুঝতে পেরেছে।
