Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি

শেষ বাক্যটায় সেদিন দু’জনার মাঝে কয়েক পল কেটেছিল সম্পূর্ণ আচ্ছন্নতায়। কী কাতর আবেদন! কতই না সরল চাওয়া! প্রহত হয়েছিল দীধিতির বক্ষস্থল। হ্যাঁ, প্রথমবার অন্তঃকরণে অব্যাখ্যেয় যাতনা বশীভূত করেছিল তাকে, প্রথমবার পরিচয় সেই যাতনার সঙ্গে। কণ্ঠগত হয়নি সেদিন একটা শব্দ ওর। নীরবেই কলটা কেটে দিয়েছিল সে। অথচ যে সময়ে কলটা রেখে দেওয়া যুক্তিসম্মত ছিল সে সময়টাতেই দীধিতি ছিল চিন্তাশূন্য। কিন্তু সেদিন নিশিথে খুব দীর্ঘ একটা মেসেজ করেছিল সে নাওফিলকে।

-‘আমার আব্বু রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। আমাদের পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন আব্বু আর আম্মু। দু’বোন আমরা দুই রাজকুমারীর মতো বড়ো হয়েছি। আব্বু মারা যাবার পর বুঝেছিলাম, পুরুষ মানুষ একটা ঘরের শক্ত ভিত। সেই পুরুষ মানুষ হারিয়ে গেলে ঘরটা নড়বড়ে হয়ে যায়, মানুষের তৈরি কৃত্রিম ঝড়ে তখন নড়বড়ে ঘরটা একেবারে তছনছ হয়ে যেতে সক্ষম। কিন্তু আমার আম্মুর মতো একজন কর্মঠ আর শক্ত মনের মানুষ আছেন বিধায় নতুন করে ঘরটাকে মজবুত করতে পেরেছি আমরা৷ আমি আমার আম্মুর বড়ো মেয়ে। নিজেকে রাজকুমারী ভাবি না এখন আর। অতি দ্রুত আম্মুর কাছে একজন নির্ভরযোগ্য সন্তান হতে হবে আমায়, এই প্রস্তুতিতে নেমেছি। আব্বু বেঁচে থাকাকালীন যতটুকু রেখে গেছেন আমাদের জন্য আর আম্মুর ডাক্তারি পেশায় যা অর্জন হচ্ছে তাতে আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের মানুষ যথেষ্ট ভালো দিনাতিপাত করতে পারবে। কিন্তু আম্মুর বিশ্রামের উপযুক্ত সময়ে যদি আমি তার নির্ভরযোগ্য সন্তান না হতে পারি তাহলে আমার আম্মুর কষ্টকে ব্যর্থ করা হবে। অসাধারণ হওয়ার কোনো বাসনা নেই আমার, পরিবার ছাড়া কারও প্রতি এই মুহূর্তে দুর্বলতা নেই, দুর্বল হতে চাইও না। আপনার চোখে আমি আপনার এক মাত্র যোগ্য, সাহসী, আদর্শ জীবনসঙ্গী হলেও আপনি আমার জন্য সঠিক নন। আমার সাধারণ জীবনটাকে স্বেচ্ছায় জটিলতায় জড়াতে চাই না। যে কথাগুলো আর যে আবদার আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক, তা আমার চিন্তাতে ফ্যান্টাসি, অস্বাভাবিক মানসিকতার। আপনার অবিশ্বাস্য, বিচ্ছিরি রূপটা দেখার পর আমার তেইশ বছরের জীবনের প্রথম আকর্ষণ অনুভূতিকে আমি সেদিনই মিলিয়ে দিয়েছি ভাবনা থেকে। এই রূপ দেখার পরও তবু আমার কেন যেন মনে হয় আপনি মানুষটা একটু হলেও বিবেকবান। এই বিশ্বাসটুকু আমাকে করতে দিন। আমাকে মুক্তি দিন, নাওফিল।’

এরপর দু’টো মাসের মতো যাপিত করে চলেছে দীধিতি মানসিক পীড়ায়। সেদিনের মেসেজটার পর নাওফিল কল করেছিল তাকে, রিসিভ করেনি সে। রিসিভ না করার ফলে নাওফিল তাকে মেসেজের ফিরতি জবাব দিয়েছিল, ‘আমার ব্যর্থতা, দীধি। আমি তোমার প্রতিটা কথা বুঝেও তোমাকে আমি ছাড়তে পারছি না৷ এখানে স্বার্থপর আমি, তোমাকে আমার প্রয়োজন। তোমাকে শুধু ভালোবাসতেই প্রয়োজন নয়। ভালোবাসাটা তো এক সময় হয়েই যাবে। কিন্তু তোমাকে প্রয়োজন আমার সহযোগী হিসেবে। আমার আদর্শ জীবনসঙ্গী হিসেবে তোমাকেই চাই আমার। এতে তোমার দিকটাও আমি বিবেচনাতে রাখব, ভবিষ্যতের জন্য যেমনটা এখন ভেবে রেখেছ তুমি। আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে তোমাকে সবভাবে সাহায্য করার, আমার তরফ থেকে কোনো অভিযোগ করার সুযোগ তোমাকে দেবো না। আমি মিথ্যা বলি না কখনোই। এই কথাটা দীপ্তকেই না হয় জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ো। তোমাদের তথাকথিত সম্পর্কের সমাপ্তি টানো, দীধি। আর আমার পাশে এসো।’

মেসেজটা দেখার পর প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে সে। যে কাজটা গত পনেরোদিনে করার কথা ভাবেনি দীধিতি, তা করেছিল সে সেদিন রাতের পর। নিজের নাম্বারটা পরিবর্তন করে ফেলে, ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করে দেয় কিছুদিনের জন্য। এতে ঐশী, তামান্না, তন্বীর মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারেনি আর নাওফিল। এমনকি দীপ্তও পারেনি। দশটা দিন এই অস্বাভাবিক জীবন কাটিয়েও রেহাই পায়নি সে নাওফিলের থেকে। এতে যেন নাওফিল বেপরোয়া হয়ে গেল ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। বাইরে বের হতো না বলে বিগড়ে গিয়ে ওকে হোস্টেল ছাড়া অবধি করল নাওফিল। অতিষ্ঠ হয়ে দীপ্তর সাহায্য চাইবার জন্য ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেও হতাশ হয়ে পড়ল সে। লন্ডন থেকে ওর জন্য জরুরি ফোন আসায় ছুটি শেষ না হতেই সে চলে গেছে দেশ ছেড়ে। বাধ্য হয়ে তারপর মামাতো বোন ঊর্মির বাসাতে গিয়ে থাকতে হয় দীধিতিকে। ঊর্মি আর ইরফানকে সবটা জানানোর পরও কোনো সমাধান খুঁজে পায়নি এর।

সম্মাননীয় এমপির ছেলের বিরুদ্ধে চাইলেই কোনো প্রমাণ ছাড়া পুলিশের সাহায্য নেওয়া সম্ভব নয়। নাওফিলকে থামানোর মতোও কোনো ক্ষমতা নেই ওদের। বাড়িতে চলে যাবে সে? কিন্তু কিছুদিন আগেই বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। এই সমস্যার কথা মা-বোন জানলে কতখানি পেরেশানি হবে তাদের তা চিন্তা করে আরও বেশি ভেঙে পড়ে দীধিতি। সব থেকে আতঙ্কিত হয় তো সে সেদিন, যেদিন পাশের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতেই নাওফিলকে নেইলকাটারে হাতের নখ কাটতে দেখে বসে। একটা মাস কেটেছিল এমনভাবেই। ক্ষতিটা হচ্ছিল তার পড়াশোনাতে বেশি। এই এক মাসে তামান্না আর তন্বীর সাথে তুষার, রাতুল, সবুজ, শিহাব প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখত। নাওফিলের পক্ষে সাফাই গেয়ে দীধিতিকে ওদের মাধ্যমে প্রণোদিত করাই ছিল ওদের মূল উদ্দেশ্য। এতে অবশ্য সামান্যতম লাভ হয়নি। কিন্তু অবশেষে দীধিতিকে পরিকল্পনা করতে হয় পালিয়ে যাবার আর তা ঢাকার বাইরে। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টে মায়ের চাচাতো বোনের বাসা। সেখানে নিরিবিলিতে পড়াশোনা ভালো হবে, মা’কে এমন যুক্তি বুঝিয়ে পালিয়ে সেখানে চলে আসে দীধিতি। বোনের মতো তিন বান্ধবীকেও জানায় না আর ভার্সিটির ক্লাসগুলো যাতে মিস না যায় তাই ছেলে বন্ধুদের সহযোগিতা নিতে হয়। যারা ক্লাস চলাকালীন প্রতিটা স্যারের ক্লাসের ভিডিয়ো পাঠিয়ে দেয় ওকে, পাশাপাশি ওরা নিজেরাও টিচিং দিতে থাকে। এভাবেই যতটুকু সম্ভব চালিয়ে নেয় সে৷ পরিসংখ্যানের মতো একটা বিভাগে এভাবে পড়াশোনা করে কতটা এগোতে পারবে তা সে জানে না। কিন্তু পূর্বের থেকেও দ্বিগুণ পরিশ্রম দিতে থাকে সে পড়াশোনাতে।

তারপর? দু’টো মাসের কাছাকাছি তো এভাবেই চলেছে ওর। কিন্তু দীধিতি তখনো হয়তো নাওফিলকে পুরোটা আবিষ্কার করেনি। অবিশ্বাস ছিল দীধিতির নিজের বন্ধুদের প্রতি। কিন্তু সেই অবিশ্বাসের কাজ করে বসে ঊর্মি। মেয়েদের সব থেকে বড়ো দুর্বলতায় তো তার স্বামী। সেই সুযোগটাই চমৎকারভাবে কাজে লাগায় নাওফিল। ইরফান জানত দীধিতি গাজীপুরে আছে। কিন্তু কোথায় আছে তা কেবল জানাতে পারে ঊর্মি। তাই ইরফান নিজে আদেশ করে ঊর্মিকে, দীধিতির সঠিক ঠিকানার সন্ধান নাওফিলকে বলে দিতে৷ ঊর্মি মানতে না চাইলে ইরফানের কঠিন ব্যবহার পায় সে, যেন মনে হচ্ছিল নাওফিলের একান্ত অনুগত সহোদর ইরফান। দীধিতির থেকে নাওফিলের প্রতিই যেন তার টানটা বেশি। আশ্চর্য হয়েছিল ঊর্মি। দীধিতিকে অবগত না করে নাওফিলকে ঠিকানা জানিয়ে দিতে এক প্রকার বাধ্য হয় সে। আকস্মিকভাবে আবার নাওফিল পৌঁছে যায় দীধিতির কাছে। ওকে মেসেজে জানায়, ‘আমি তোমাকে খুঁজতে গিয়েই রীতিমতো প্রেমে পড়ে গিয়েছি তোমার। কেন বলি?

আমার প্রত্যেকটা সকাল শুরু হয়েছে তোমাকে খোঁজাই আর রাত নেমেছে তোমাকেই খোঁজাই। বিগত এক মাস বাইশ দিন আমার ভাবনার শেষ থেকে শুরু আর শুরু থেকে শেষ হয়েছে তোমাকে নিয়ে। এই এক মাস বাইশ দিনে আমি প্রতিটা দিন তোমাকে দেখেছি। যা আগে দেখেও চোখে লাগাইনি। এভাবে খোঁজার প্রয়োজন না পড়লে হয়তো এত দ্রুত প্রেমে পড়তাম না৷ প্রেম মানে বোঝো, দীধি? তোমার আর দীপ্তর করা ওই ন্যাকামিগুলো না। এর অর্থ অধিক। ভক্তি, ভালোবাসা, স্নেহ, আদর, মমতা, মায়া, অনুরাগ, আকর্ষণ, আসক্তি, আসঙ্গ, প্রত্যেকটা উপলব্ধি মিলিয়েই প্রেম। ঐশীদের বাড়ির কিচেনে কালো সেলোয়ার-কামিজের তরুণীকে প্রথমবার গহন দৃষ্টিতে দেখেই পাপটা করেছিলাম আসলে। চলো, সেই গল্পটাও শোনাই। গায়ের রঙও যে রজনীগন্ধার পাপড়ির বর্ণের মতো হতে পারে তা তো তোমাকে কাছ থেকে না দেখলে জানাই হতো না আমার। অত কাছ থেকে দেখেছিই আমি জীবনে দু’টো নারীকে। আম্মু আর আমার মনি সেই দুই নারী। তাই ধারণা ছিল না নারীদের গায়ের বর্ণ অনেক রকম সুন্দর হতে পারে।

তোমার ওভাল ফেসের রাউন্ড চোখদু’টোতে কোনো আকর্ষণ নেই কিন্তু। আকর্ষণীয় ছিল তো তোমার আই স্মাইলস। ওই যে হাসলে চোখের নিচের পাতার ল্যাশের জায়গাটুকু ফুলে যায়। তখন দেখতে খুব সুন্দর লাগে। এটা কবে দেখেছিলাম জানো? আমার বাসার ছাদে। মুখে কেক ছুঁড়তে গিয়েই তোমার চোখের হাসি দেখে রুখতে হয়েছিল সেদিন। কিন্তু কেকটা তো ছুঁড়তেই হতো। তাই থুঁতনির নিচে ছুঁড়েছিলাম। তোমার মুখে বোধ হয় কোনোদিন ব্রণ ওঠেনি, তাই না? একটা ছোট্ট স্পটও চোখে পড়ল না। তুমি নাক ফুঁড়াওনি কেন? আমার ধারণা তোমার নাকে চকচকে একটা ডায়মন্ড স্টোন প্রচণ্ড মানাবে। আছে না? কিছু কিছু মেয়েকে অলংকারেই মানায় বেশি।

তুমি তেমনই একজন। তোমার কানে সোনার ছোটো দুলটা দেখেই বুঝেছি এটা। কিন্তু তোমার নাক আমার নাকের মতো সুন্দর না। বিশ্বাস না হলে নিজেই দেখো সামনে এসে। ওহ হ্যাঁ, তোমার হার্ট শেপড ঠোঁটজোড়া নিঃসন্দেহে খুবই সুন্দর। এত বিবরণকে এক কথায় বলা যায় ইয়্যু আর আ ক্র্যাকার। প্রতিদিন তোমাকে নিয়ে ভেবেছি আর চোখের পর্দায় ভাসিয়েছি তোমার মুখটা। তারপরই তো এত কিছু খেয়ালে এল। এই কাজটা আগে করা হয়নি বলে ভীষণে দেরিতে মায়ায় পড়লাম তোমার। এ মাসের শেষ সপ্তাহে রুমান আর ঐশীর বিয়ে। তার আগেই চলে এসো তোমার হোস্টেলে, তোমার রুমে, তোমার বান্ধবীদের কাছে। তুমি বুদ্ধিমতী আর সাহসী মেয়ে। আমাকে নিয়ে তোমার সমস্যার সমাধানটা না হয় আমার মুখোমুখি এসেই করো।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬

কার থেকে পালিয়েছিল দীধিতি? কীসের শান্তিতে ছিল সে? এই যে মুগ্ধ করা একের পর এক বাক্যগুলো দ্বারা নাওফিল তাকে বুঝিয়ে দিলো যত দূরে যাবে সে তত বেশি তার জন্য হবে নাওফিল বেপরোয়া প্রেমিক। সুতরাং, ওর কথামতোই সমাধানটা মুখোমুখি গিয়েই করা হবে তাহলে যুক্তিযুক্ত।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here