আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩৫+৩৬+৩৭
ফারজানা মনি
বন্যার আর মেঘ টুকটাক গল্পগুজব করে আবারো নিচে ড্রয়িং রুমে চলে গেল।
এদিকে আবির একটা চায়ের দোকানের সামনে বসে মোবারক, রাসেল, লিমন, রাকিব, তানভীর সবার সাথে আড্ডায় মগ্ন। মোবারক তানভীর কে বলে ওঠলো: কিরে তানভীর.. হানিমুন কেমন কাটলো?
তানভীর একটু হেসে বলল: হানিমুন যেমন কাটে।
রাকিব: এভাবে বলছিস কেন? একটু ডিটেলসে বল..
তানভীর: উফফ.. আর হানিমুন; বউ তো আমাকে দেখলেই পালাই পালাই করে।
তানভীরের মুখ থেকে এমন অসহায় বাক্য শুনে আবিরসহ সকলেই হো হো করে হাসতে থাকলো।
আবির হাসি থামিয়ে বলে উঠলো: বিয়ের আগে তোকে সব সময় সাবধান করেছিলাম, বন্যার সামনে কখনো অতিরিক্ত রাগ দেখাস না। এই রাগের প্রতিক্রিয়া বন্যার মেয়েলি মনেও পড়বে। কিন্তু তুই কথা শুনিসনি। ওর সামনেই বারবার তামিম আর মিনহাজের উপর রাগ দেখিয়েছিস। এবার ঠেলা সামলা শালা..
তানভীর: শালা না আমি তোমার সমন্ধি, সম্মান দিয়ে কথা বল।
আবির চোখ দুটো ছোট ছোট করে তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলল: সমন্ধি ভাই আপনাকে তো আগেই বলেছি, পার্সোনালি দেখা করবেন.. আপনাকে সম্মানের চুড়ায় পৌঁছে দিব।
একথা শুনে এবার ও সবাই হেসে দিল।
হঠাৎ আবির বলল: তোরা থাক.. আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। আমার বউ অপেক্ষা করছে।
রাকিব অবাক কন্ঠে বলল: বাড়িতে কি তোর একাই বউ আছে আমাদের নেই? উফফ.. আবির… তুই বিয়ের আগেও এমন করতি। তখন না হয় বুঝতাম, মেঘকে হারানোর ভয়ে ওর আশেপাশে থাকার চেষ্টা করতি সব সময়। তাছাড়া মেঘ সকলের আড়ালে দাঁড়িয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করত। তাই তুই ওর অপেক্ষা আর বাড়াতে চাস নি। কিন্তু এখন কি?
আবির: কিন্তু এখন আমার বউ সদর দরজার দিকে তাকিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করে। তাই আমাকে যেতে হবে।
সময় ছুটে চলে তার নিজ গতিতে। দেখতে দেখতে আজ বৃহস্পতিবার। আবির আজকে অফিসে যায়নি। সকাল থেকেই মাহমুদা খান বারবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, আবির কখন মেঘদের নিয়ে আসছে? আবির ও জানালো: দুপুরের আগে পৌঁছে যাবে। তানভীর অফিস ছুটি হওয়ার পর ডিরেক্ট ফুপ্পির বাসায় যাবে। কিছুক্ষণ আগেই মেঘ ,বন্যা, মিম রেডী হয়ে নিচে নেমে এসেছে। আবির সকালে একটু বেরিয়েছিল । কিছুক্ষণ আগে বাড়ি ফিরেই রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নিচ্ছে।
হঠাৎ সবাই খেয়াল করলো। আবির আর আদি একই রকম পাঞ্জাবি পড়ে গলায় সানগ্লাস ঝুলিয়ে নিচে নেমে আসছে। মেঘ , মিম ,বন্যা তো অবাক। আবির কিভাবে জানলো মেঘদের পূর্ব পরিকল্পনা।
মেঘ, মিম আর বন্যা প্লান করেছিল যে আজকে একই রকম ড্রেস পড়ে সবাইকে অবাক করে দিবে। তাই সকলের অগোচরে অনলাইন থেকে তিনটা ড্রেস অর্ডার করে ও এনেছে। ওরা এখন সেই ড্রেস পরেই অবাক হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু একি! আবির ভাই তো নিজেই ওদের অবাক করে দিয়েছে। আবির নিচে নেমে এসে মেঘের সামনে দাঁড়িয়ে মেঘের হা হওয়া মুখটা আঙ্গুল দিয়ে বন্ধ করে দিল। সকলেই মুখ টিপে হেসে দিল।
ওরা রওনা হলো মাহমুদা খানের বাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছেও গেল। মাহমুদা খান তো ওদের দেখে মহা খুশি। আরিফ মিমের সামনে দাঁড়িয়ে সকালে উদ্দেশ্যে মিমের দিকে তাকিয়ে বলল: ওয়েলকাম ম্যাডাম ..
মিম জানে কথাটা আরিফ ওকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে। মিম মুখ বাঁকিয়ে মাহমুদা খানের কাছে চলে গেল। আরিফের ঠোঁটের কোণে দেখা গেল বাঁকা হাসির রেখা।
জান্নাত এসে একে একে মিম বন্যা মেঘকে জড়িয়ে ধরল। ইতিমধ্যে আইরিন ও রুম থেকে বেরিয়ে দৌড়ে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার হওয়ায় আসিফ বাড়িতে নেই।
মাহমুদা খান ওদের সবাইকে ভিতরে নিয়ে গেল।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করার পর সবাই কিছুটা রেস্ট নিয়ে আবার আড্ডায় বসেছে। মেঘতো রেস্ট করতে যেতেই চায়নি। আবির এক প্রকার মেঘকে জোর করেই নিয়ে গেছে। সর্বদা মেঘের প্রতি আবির যত্নশীল। কিন্তু বর্তমানে যত্নের পরিমাণটা যেন আর বেড়ে গেছে। আজকাল কোনো কারণেই আবির মেঘের উপর রাগ দেখায় না।
নিজেকে সর্বদাই শান্ত এবং ধৈর্যশীল রাখার চেষ্টা করে। আবির সব সময় চায় তার অষ্টাদশী হাসিখুশি মুখে থাকুক। কিন্তু বর্তমানে মেঘের এতটাই মুড সুইং হয় যে তার মুড আবির নিজেই বুঝতে পারেনা। মেঘের মুডের অবস্থা এখন এই ভাল এই খারাপ।
এই যে কিছুক্ষণ আগের কথা…
মেঘকে দুপুরে খাওয়ার পর রেস্ট এর জন্য আবির রুমে আসতে বলায় এখন মেঘের মন খারাপ। অন্যদিকে ঘুরে শুয়ে আছে, আবিরের দিকে তাকাচ্ছেই না। আবির জোর করে মেঘকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বুকে নিয়ে শুয়ে আছে।
বন্যা আর মিম এক রুমে আছে। দুজনের গল্পের মাঝেই হঠাৎ ঝংকার তুলে বন্যার ফোনটি বেজে ওঠলো। বন্যা ফোন টি হাতে নিয়েই দেখল তানভীর কল দিয়েছে। তাই ফোন নিয়ে বেলকনির দিকে গেল। বন্যার কাণ্ডে মিম মিটিমিটিয়ে হাসছে।
বন্যা: আসসালামু আলাইকুম।
তানভীর মৃদু হেসে উত্তর দিল, ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি করছো?
বন্যা: তেমন কিছু না। মিমের সাথে গল্প করছিলাম।
তানভীর: ওহ.. খেয়েছো?
বন্যা: হুম.. একটু আগে ই। আপনি খেয়েছেন?
তানভীর: হুম..
ওদের কথাপকথনের মাঝখানে মিম বলে উঠলো: বউ মনি.. তুমি কথা বলো আমি একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসছি। বন্যা ইশারায় জানালো ঠিক আছে।
মিম ছাদের দিকে চলে গেল। মাহমুদা খানদের বাগানে নানা ধরনের ফুল। দেখেই মনটা জুড়িয়ে যায়। গোলাপ, গাঁদা, কাঠগোলাপ, হাসনাহেনা, জবা সহ রংবেরঙের ফুল। মিম আলতো আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে সকল ফুলগুলোকে।
মেয়ে একটা গোলাপ ছিড়তে যাবে, ঠিক তখনই কেউ করকশ কন্ঠে বলে উঠলো: এই মেয়ে ফুল ছিড়ছো কেন?
হঠাৎ করে এই দুপুর বেলা ছাদে কারো কণ্ঠ পেয়ে মিম ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা হাত মিমের মুখ চেপে ধরল। মিম ভয়ে চোখ খিচে আছে।
আরিফ মিমের ভয়ার্ত মুখের পানে দৃষ্টি রেখে বলে উঠলো: দিনের বেলায় আমাকে দেখলে তোমার এত ভয় লাগে? তাহলে রাতে…. এটুকু বলেই আরিফ খেয়াল করল মিম পিটপিট করে তাকাচ্ছে। মিম চোখ খুলে দেখলো আরিফ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মিম আরিফের চোখের পানে তাকিয়ে ভয়ার্ত চোখে জিজ্ঞাসা করলো আ_ আ_ আপনি?
আরিফ একটু রহস্যময় হেসে বললো: হুম আমি। ভয় পেয়েছো জান?
মিম নিজেকে একটু সামলে দাঁত খিচিয়ে বলে উঠলো: ভয় পাবো কেন? আর আপনি কোথা থেকে একটু পর পর উদয় হন বলুনতো?
আরিফ: তোমার হৃদয় থেকে… তোমার অন্তর থেকে..
মিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল: পাগল লোক…
আরিফ: আমি পাগল না তুমি পাগলি.. কারণ তুমি বুঝতে পারো না যে তোমার ভেতরেই আমি উদয় হই আবার তোমাতেই অস্ত যাই। তুমি কবে তোমার মনের কথা শুনবে বলতো?
মিম এবার রেগে মেগে বলল: এই.. আপনাকে কে বলেছে যে আমি আমার মনের কথা শুনি না?
আরিফ: শুনো বুঝি??
বলতে বলতেই আরিফ কিছুটা মিমের সামনে চলে আসলো। মিম ও আরিফের সাথে তর্ক করতে করতে পিছনে পিছচ্ছে..
হঠাৎ ই আরিফ মিমের পেছনের ছাদের কার্নিশে দুই হাত রেখে বলল: মিম.. আর না..
মিম একটু পেছনে ঘুরে দেখলো: ও আস্তে আস্তে ছাদের একেবারেই কিনারে চলে এসেছে। বুঝতে পেরে ই একটা ভয়ার্ত ঢুক গিললো।
আরিফ মিম কে এক টান দিয়ে সামনের দিকে ঘুরিয়ে বলল: জান.. একবার আমার হয়ে যাও.. সারা জীবন যত্ন সহকারে রেখে দিব। যত খারাপ পরিস্থিতি ই আসুক কখনোই তোমার হাত ছাড়বো না।
মিম সামনের আকাশের দিকে ফিরে তাকিয়ে আছে। আর আরিফ পেছন থেকে তার দুই বাহু ভেতরে মিমকে রেখে ছাদের কার্নিশে দুই হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে । মিমের গায়ে আরিফের একটু স্পর্শ ও লাগছে না। তবুও মিমের হাত পা যেন অসাড় হয়ে আসছে। শরীরটা যেন মৃদু মৃদু কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে মিম বলে উঠলো: ছা_ছা_ছাড়ুন আমায় যেতে দিন।
আরিফ একটু নেশালো কন্ঠে বললো: একবার আমার হয়ে যাও না মিম.. তুমি বিহনে আমার এই একাকীত্ব আমাকে আগুনের চেয়েও মারাত্মক দহনে দহন করে । তোমাকে ছাড়া আমি আর বাঁচতে পারছি না।
মিম নিজেকে ছাড়ানোর উদ্দেশ্যে আরিফের দিকে ফিরে দাঁড়ালো। চোখ পরল আরিফের কামুক নেশালো দৃষ্টিতে..
আজ আরিফকে একটু অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে কোন একটা ঘোর আরিফ কে যেন ঘিরে রেখেছে।
মিম কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁকা করতেই, আরিফ মিমের ঠোঁটে এক আঙ্গুল ছোঁয়ালো..
মিম লক্ষ্য করল, আরিফের চোখ দুটো আজ ঘোলাটে। মনে হচ্ছে সারারাতও ঘুমায়নি। কেমন একটা নেশাক্ত দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে মিমের মুখের পানে।
মিমের হঠাৎ ই মনে হলো: আরিফ তার মুখের দিকে ঝুকে আসছে..
মিম অন্যদিকে ফিরে চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে.. তারপর কি ভাবলো কে জানে, উত্তেজিত হয়ে আরিফের গালে ঠাস করে কষিয়ে একটা চর বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ই ছুটে পালাতে চাইলো..
কিন্তু আরিফের পুরুশালী একটা হাত মিমের আরেক হাত টেনে ধরলো..
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩২+৩৩+৩৪
আরিফ মিমের দিকে না তাকিয়েই সামনের দিকে ফিরে বলল: মিম তুমি আমায় চিনতে পারলে না.. যখন তুমি আমাকে বুঝবে, পাওয়ার জন্য বারবার খুঁজবে.. হয়তো তখন আমি আর তোমার জীবনে একজিস্ট ই করবোনা। বলেই মিমের হাতটাকে ছেড়ে দিল। মিম ও ছোটে নিচে চলে গেল।
আরিফ এক নজরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল: তুমি কি করে আমাকে এতটা নিচ ভাবতে পারলে.. আমি তো শুধু তোমার কপালে কপালটা ছোঁয়াতাম…
