আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ শেষ পর্ব
ফারজানা মনি
শুক্রবারের সকাল যেন এক স্বপ্নের মতো। আকাশে হালকা মেঘের ছায়া, আবার কখনো রোদ উঠছে। বাড়ির প্রতিটা কোণা সাজানো এখনও রঙিন ঝালর, ফুলের মালায়। কোথাও হলুদের ঝলমলে ছোঁয়া, কোথাও বিয়ের লালচে রঙের সাজ।
ডাইনিং স্পেসে সকালের আয়োজন—
টেবিলে সাজানো আছে লুচি, আলুর দম, ডিম পোচ, ফলের রস, পায়েস।
মেঘ, মিম, বন্যা, তানভীর, আবির, আদি, আলী আহমেদ খান ,মোজাম্মেল খান ও ইকবাল খান— সবাই টেবিল ঘিরে বসে হাসিমুখে নাস্তা করছে।
মাইশা ,মালা ও তাদের হাজবেন্ড সহ বাকি মেহমানরা একটু আগেই নাস্তা সেরে উঠে গিয়েছে। এখন পরিবারের সবাই একসাথে বসেছে। বাড়ির তিন কর্তি সবাইকে মেহমানদারীতে ব্যস্ত। এতক্ষণ বন্যা ও মেঘ তাদের সাহায্য করেছে। আলী আহমেদ খানের ডাকাডাকিতে এখন এসে নাস্তা করতে বসল।
তানভীর আবীর কে খুঁচিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—
— “ভাইয়া, আজকে কি তোমার রোমান্স বন্ধ থাকবে, নাকি এই সকালেও নতুন প্ল্যান?” গত দুইদিন যার রঙ্গ দেখালে, আমি তো চিনতেই পারিনি এটা আমার রাগী, গম্ভীর সেই ভাইয়া।
আবির গম্ভীর মুখে বলল—
— “ আমার বউ তোর বোন হয় বেয়াদব। তুই কি করে ছোট বোন ও তার জামাইয়ের রোমান্সের খবর নেছ। ছি তানভীর.. আমিতো রীতিমতো তোকে নিয়ে হতাশ”
তানভীর বলে উঠলো—
— “ ইস যত ঢং।”
সবাই হাসাহাসির মাঝে নাস্তা শেষ হলো।
নাস্তার পর ড্রয়িং রুমের এক পাশে আহিয়া, আহিয়ান, তৃধা, মাইসার ছেলে মিলে বসেছে। ওদের হাতে গুড়া রং নিয়েছে।— কেউ লাল, কেউ হলুদ, কেউ গোলাপি। ওরা নাকি টিভিতে দেখেছে বিয়ের দিন সকালে আবির খেলা হয়।
আহিয়ান বলল—
— “ তোরা কেউ আমার মুখে আবির দিবি না। মুখে আবির লাগলে আমার ভালো লাগেনা।”
ঠিক তখনই এক মুঠো লাল রক্তে রাঙা আবি র হাতে নিয়ে তৃধা আহিয়ানের দুই গালে মেখে দিল।
তারপর তৃধা খিল খিলিয়ে হেসে আধো আধো কণ্ঠে বলল
— “ ভাইয়া… সুন্দর…!”
এটা দেখে বাকি বাচ্চাদের সে কি হাসাহাসি! ওড়না, টিস্যু, প্লেট সব ভরছে গুড়া রং দিয়ে।
আহিয়ান গম্ভীর মুখে তৃধার উপর রাগ করে সেই রঙ ভর্তি প্লেট নিয়ে গেল তার মা-বাবার রুমে… রেখে আসলো টেবিলের উপর!
সে ভাবলো— “এই রং দিয়ে পরে মজা করব…
কিছুক্ষণ পর… মেঘ গেল নিজের রুমে। দেখে টেবিলের ওপর সেই রঙ ভর্তি প্লেট।
পেছন থেকে দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে কাছে এল আবির।
চোখে সেই দুষ্টু হাসি।
আবির মেঘের কানের পাশে ফিসফিস করে বলল—
— “এই রঙগুলো কার জন্য রাখা, বলো তো?”
মেঘ হেসে বলল—
— “ওরা খেলছিলো… হয়তো ভুল করে রেখে গেছে।”
আবির ধীরে সেই গুড়া রঙ তুললো আঙুলে।
একটু পিঙ্ক, একটু হলুদ… মেঘের গালের পাশে স্পর্শ করে বলল—
— “এই লালটা তোমার লজ্জার চিহ্ন… এই হলুদটা তোমার ভালোবাসার চিহ্ন।”
মেঘ অবাক হয়ে আবিরের দিকে তাকালো…
আবির এবার ধীরে ধীরে পিঠের ওপর ছুঁইয়ে দিলো সেই নরম গুড়া রং, হাত বুলিয়ে বললো—
— “ মেঘ তুমি কি শুনতে পাচ্ছ এই বুকের ধুকপুকানি?”
মেঘ নিঃশ্বাস টেনে বলল—
— “এভাবে কেউ রং মাখায়?”
আবির হেসে বলল—
— “ভালোবাসা আর খেলায় নিয়ম নেই… তুমি জানো না?”
গোলাপি গুড়া রঙ এবার মেঘের পেটে ছুঁইয়ে দিলো আবির…
একটু শিরশিরে অনুভূতি… মেঘ থমকে গেল।
আবির মৃদু স্বরে বলল—
— “এইটা আমার… শুধু আমার চিহ্ন…”
মেঘের মুখে হালকা হাসি, চোখে ভালবাসার দীপ্তি।
আবির মেঘকে কোলে তুলে নিলো ধীরে।
— “চল, আজকের সকালটা তোর রঙে রঙিন করে তুলি।”
মেঘ হেসে ফেলে বলল—
— “পাগল…”
আবির জবাবে ফিসফিস করলো—
— “তোর জন্য পাগল… আমৃত্যু।
সকাল শেষে বিয়ে বাড়িতে পড়েছে দারুন ব্যস্ততা। আজকের অনুষ্ঠান স্পেরো ড্রিম হাউজের রুফটপেই হবে। দুপুর হতে না হতেই বাড়িতে পড়েছে অতিথির ঢল। একে একে এসে হাজির হচ্ছে সকল অতিথিরা। তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত ক্যাটারিং এর লোকসহ খান বাড়ির সকল সদস্য।
বরযাত্রীর গাড়ি এসে থামলো স্প্যারো ড্রিম হাউসের বিশাল ফটকে।
বর আরিফ, পাশে আইরিন— মাথা উঁচু করে গাড়ি থেকে নামল।
আজ বরপক্ষের বড় দায়িত্ব আইরিনের কাঁধে।
আইরিন ভারী লেহেঙ্গাটা দুই হাতে ধরে একটু এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল—
— “চলো, দেখি মেয়েপক্ষ আজ কত বড় সাহস দেখায়…”
সামনেই দাঁড়িয়ে রাদিফ।
সাদা পাঞ্জাবিতে, হাত গুটিয়ে… মুখে শয়তানি হাসি। সাথে দাঁড়িয়ে আছে মিমের বান্ধবীরা এবং মিমের সকল কাজিন।
রাদিফ বলল—
— “ওয়েলকাম আইরিন বিয়াইন! আজকে তো আমরা কনে পক্ষ, এই গেট খুলবে… কিন্তু টাকায়!”
আইরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
— “ওহ, মেয়েপক্ষ তো দেখি অনেক হিংসুটে! বিয়াই-বিয়াইন বলেই তো কিছু ছাড় দিচ্ছিলাম ভাবলাম…”
আইরিনকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই রাদিফ হেসে বলল—
— “এই রসিকতা আজ চলবে না। তুমি বরপক্ষ… গেট পাস করতে হলে… কষ্ট করে টাকা বের করো।”
পেছন থেকে আরিফ হাসছে…
এবার আসিফ আইরিনের উদ্দেশ্যে বলল—
— “আইরিন, এই ছেলেকে কাবু করতে হলে তোকেই প্রয়োজন।”
আইরিন ভুরু কুঁচকে বলল—
— ” টাকা দিতেই হবে? না কিছু অন্য শর্ত আছে?” তারপর আস্তে আস্তে বলল: রাদিফ.. সোনা চান.. তুমি জানো না আমি কত বড় ফাজিল। সময় মত আমাদের টাকা আমরাই পুষিয়ে নিব ।
রাদিফ গম্ভীর গলায় বলল—
— “শর্ত আছে, অবশ্যই আছে। আগে বলো— ‘রাদিফ জান্স, তুমি এই গেটের হিরো, তুমি না চাইলে বর ঢুকবে না’। এই লাইন বল, তাহলেই ফ্রি।”
আইরিন অবাক!
রাদিফ শয়তানি হাসল— — “বিয়াইন… না হলে টাকা!”
পেছনে তানভীর, আবির এসে হেসে ফেলে বললো—
— “আইরিন, মেনে যা… টাকা দে,
আর এবার আরিফ বেচারার বিয়ে টা হতে দে!”
আইরিন দাঁতে দাঁত চেপে রাদিফের উদ্দেশ্যে বললো—
— “আচ্ছা ঠিক আছে, টাকা দেব… কিন্তু একটা কথা মনে রাখেন… আপনি তো আমাদের বিয়াই হয়ে যাবেন সামনে… তখন সব সুদে আসলে ফিরত নিয়ে নিব!”
রাদিফ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বলল—
— “তুমি যদি আমাকে একবার রাদিফ জান্স ডাকো… আমি আজ এই গেট ফ্রি করে দেব!”
আইরিন রাগে দাঁত চেপে বলল—
— “টাকা নিন… চুপচাপ রাস্তা ছাড়েন!”
আইরিন গুনে গুনে ৫০০০০ টাকা দিল।
রাদিফ নোট হাতে নিয়ে বলল—
— “এই নিলাম। তবে মনে রেখো… আজ শুধু গেট ছাড়লাম, কাল রাস্তা, পরশু বউ… সবই ধরবো!”
আইরিন রাদিফের কথার আগামাথা কিছু না বুঝে রাগে কটমট করে বললো—
— “যত্তসব আজাইরা পাগল!”
রাদিফ হেসে বললো—
— “এই পাগল এখন থেকে সারা জীবন তোমার নামে পাগলামি করবে মনে রেখো।”
সবাই হো হো করে হাসতে লাগলো।
আইরিন গলা টান দিয়ে বললো—
— “চলো বরপক্ষ, গেট পার… যুদ্ধ জিতে গেলাম।”
রাদিফ নীরবে বললো—
— “এই যুদ্ধে আমি ইচ্ছে করে হারলাম…!”
স্প্যারো ড্রিম হাউসের রুফটপ সাজানো রাজকীয়ভাবে।
হলুদের পর আজ বিয়ের সাজ রক্তিম লাল আর সোনালী রঙে ঝলমল করছে।
প্রায় ঘন্টাখানেক আগে তামিম , মিষ্টি, মিনহাজ এসেছে। কিন্তু এইবার তারা কেউই একা না। তামিমের সাথে তামিমের ওয়াইফ। মিষ্টির সাথে মিষ্টির হাজবেন্ড ও তাদের মেয়ে, মিনহাজ এর সাথে মিনহাজের ওয়াইফ। ওদেরকে দেখে বন্যা আর মেঘ তো মহা খুশি। মূলত আবির নিজেই শত ব্যস্ততার মাঝেও ওদেরকে স্প্যারো ড্রিম হাউসে আনার ব্যবস্থা করেছে।
মিম আজ কাঁচের মতো মায়াবী… লাল শাড়িতে যেন কনে পুতুল।
আরিফ দাঁড়িয়ে আছে পাশেই, সাদা শেরওয়ানি আর সোনালী পাগড়িতে।
বিয়ে পড়ানো শেষ।
কনের বাড়ি চোখ ভেজা… মিমও চোখ ভিজিয়ে কাঁদছে।
আইরিন, রাদিফ ও মিমের বান্ধবী সবাই আয়না দেখানোর জন্য
আরিফ আর মিমকে একসাথে বসালো। মাঝখানে আয়না।
আরিফ কানে ফিসফিসিয়ে বলল—
— “এবার পুরো পৃথিবীর সামনে তুমি আমার, আমৃত্যু…”
মিম লাজুক হেসে তাকালো… সেই আয়নায় প্রতিফলিত হাসি জানিয়ে দিলো… এই ভালোবাসা কেবলই আজ শুরু, যার কোন অন্ত নেই।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। খান বাড়ির সকলের চোখে অশ্রু।
দূরে এক কোণে থমথমে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির আর তানভীর।
মিমের চোখে অশ্রু… পাশে মেঘ, বন্যা, বান্ধবীরা কাঁদছে। আরিফ মিমের হাত ধরে বলল— — “চলো, তোমার এই কান্না আমি হাসিতে ভরিয়ে দেবো…”
বিদায়ের রীতিতে মিম বাড়ির সিঁড়ি ছাড়িয়ে গেল…
সবাই দোয়া করলো —
“আল্লাহ তোদের ভালো রাখুক।”
মিমের বিদায়ের পর সকল ঝামেলা শেষ করে মেঘ রাত ৮ঃ০০ টায় রুমে ফিরেছে বাচ্চাদের কাছে।
আহিয়ান-আহিয়া দৌড়ে এসে মায়ের কোলে উঠলো।
আহিয়া বলল—
— “মাম্মা, আমি আজ তোমার সাথে ঘুমাবো!”
আহিয়ান বললো—
— “ আমিও ঘুমাবো মাম্মার সাথে!”
মেঘ ছেলে মেয়ের কান্ড দেখে হাসতে হাসতে বলল:
তোমরা তো প্রতিদিনই আমার সাথে ঘুমাও।
এবার আহিয়া বলল: মাম্মা, আমি দাদু ভাইয়ের সাথে ঘুমাবো না।
এবার মেঘ বুঝল পুরো কথাটা। একটা হাসি দিয়ে আহিয়া ও আহিয়ানকে কাছে টেনে কোলে বসিয়ে বলল: গত কয়েকদিন তোমার মিম ফুপির বিয়ে ছিল তাই আমার ঘুমাতে অনেক রাত হতো। আমি নানান কাজে ব্যস্ত থাকতাম। তোমাদেরকে তোমাদের দাদুভাই ঘুম পাড়িয়ে দিত ঠিকই কিন্তু আমি রাতে যখন ঘুমাতে আসতাম তখন তোমাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসতাম। তোমরা রাতে আমার কাছেই ঘুমাতে, বুঝেছ মাম্মা…
আবির পেছনে দাঁড়িয়ে বললো— — “ আমার মায়ের কি নিয়ে এত অভিমান হয়েছে?…”
আহিয়া দৌড়ে বাবার কোলে লাফিয়ে পড়লো। বলল— —
“আমার পাপা এসেছে !”
আহিয়ান বললো— “ঠিক আছে। পাপা তোর, মাম্মা আমার!”
এই কথা শুনে মেঘ আর আবির হেসে দিল।
মেঘের কোলে বসে থেকে আহিয়ান বলল: চলো না মাম্মা, আমরা কিছু খেলি। পাপা আর আহিয়াকে আজ হারিয়ে দিব।
মেঘ হেসে বলল— “তোমাদের পাপা কি চুপ করে থাকবে?”
আবির মেঘের কানের কাছে এসে বললো— — “ওদের কাছে হারতে রাজি… তোমার কাছে কখনোই না।”
মেঘ বলল— “আমি তো আগেই হেরে আছি আপনার কাছে।”
আবির মৃদু হাসলো— “আর সেই হারটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।”
আহিয়ান বললো— “আবার কি গল্প শুরু হলো?”
আহিয়া বললো— “চলো চলো মাম্মা, আমরা খেলবো…”
আবির মেঘের হাত ধরে বললো— — “ এমন একটা সংসার ই তো তোমায় নিয়ে চেয়েছিলাম প্রথম দিন থেকে… আমৃত্যু।”
মেঘ বললো— “ভালোবাসায় কোন মুখের শব্দ লাগে না… প্রমাণ লাগে না। এই শান্তি, এই সুখ… এটাই প্রমাণ।”
আহিয়ান ও আহিয়া যখন বিছানার এক কোনে খেলায় ব্যস্ত।
আবির তখন টুপ করে মেঘের ঠোঁটে চুমু দিয়ে বললো—
— “এই ঠোঁট, এই হাসি, এই তুই… সবটাই তো আমার বেঁচে থাকার কারণ, বউ…”
আজ শনিবার
আরিফদের বাড়ি সাজানো রাজকীয়ভাবে।
দুপুরে রিসিপশন শেষে এখন খানিকটা শান্ত পরিবেশ। খান বাড়ির সকলে স্পেরো ড্রিম হাউসে ফিরেই বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত।
সবাই ক্লান্ত, কিন্তু তৃপ্ত… মিমের বিয়ে নিয়ে গত কয়েকদিনে কেউ তেমন একটা বিশ্রাম নিতে পারেনি।
আগামীকাল সকলেই ফিরে যাবে সেই চিরচেনা খান বাড়িতে।
মেঘ হেসে বলল—
— “এইতো, কনের পক্ষের দায়িত্ব শেষ। এখন থেকে শুধু মিমের শ্বশুরবাড়ির চিন্তা!”
বন্যা বললো—
— “আমাদের বাড়িটা যে কি ফাঁকা লাগবে মিম ছাড়া, সেটা শুধু আমরাই বোঝি…”
আবির পাশে বসে মেঘের কানে ফিসফিস করে বলল—
— “তোমার মন খারাপ করে লাভ নেই। তোমার জন্য আমি আছি তো বউ…”
বন্যা খুক খুক করে কাশলো। তারপর আড়চোখে মেঘের পানে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল—
— “তুই আবির ভাইয়ের জন্য কতটা স্পেশাল, সেটা এখন আমরা সবাই বুঝে গেছি!”
সবাই হেসে উঠলো।
আবির সঙ্গে সঙ্গে উঠে অন্য দিকে চলে গেল।
ঘরটা রঙিন ফুলে ভরা। নরম আলো… ধীর সুর।
আরিফ ধীরে ধীরে কাছে এলো… মিম নীচু মুখে বসে ছিল। আরিফ পাশে বসে মিমের কাঁধে হাত রাখলো…
আরিফ বলল—
— “এত কাঁদছো কেন? এই বাসর তোমার জন্য নতুন, আমার জন্যও। তবে আমার কথা বিশ্বাস করো… আমি তোমার পাশে থাকবো সবসময়, যতটা তোমি চাইবে… তার চেয়েও বেশি।”
মিম হালকা কাঁপা গলায় বলল—
— “এতদিন আমার বাড়ি, বাড়ির মানুষগুলো ছিল… আজ থেকে সব ফেলে চলে এলাম তোমার জন্য…”
আরিফ মিমের হাত দুটো নিজের হাতের ভেতর নিয়ে বলল—
— “তোমার আজকের এই কষ্টের বিনিময়েই আমরা পাবো একটা ভালোবাসায় ভরা ভবিষ্যৎ।”
মিম চোখ তুলে তাকিয়ে হাসলো, একটু কান্নাভেজা সেই হাসিতে ছিল ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা।
আরিফ মিমের কপালে স্নেহে চুমু এঁকে বলল—
— “আজ থেকে শুধু তুমি আর আমি…।”
হালকা রোমান্টিক আবহে ধীরে ধীরে রাত নেমে এলো…
কথা… হাসি… কিছু অনুচ্চারিত অনুভূতি… আর ভালোবাসা।
সময় গড়ায়…
একটা মাস কেটে গেছে।
মিম এখন পুরোপুরি আরিফের সংসারে ব্যস্ত। কখনো শাশুড়ির সাথে রান্নাঘরে, কখনো ননদের সাথে রাদিফের নাম জড়িয়ে দুষ্টুমি। গত এই এক মাসে রাদিফের সাথে আইরিনের বেশ একটা ভালো সম্পর্ক হয়েছে। এখন তারা খুব ভালো বন্ধু। ভবিষ্যৎ তাদের সম্পর্ক কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বা যাবে সেটাই দেখার পালা।
খান বাড়ি আবার সেই আগের মতো চঞ্চল।
আহিয়া, আহিয়ান, তৃধা সবাই মিলে প্রতিদিন দুপুরে ছুটোছুটি, বিকেলে আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান ও ইকবাল খানের সাথে গল্প।
মেঘ, বন্যা, তানভীর, আবির — সবাই ব্যস্ত সংসার আর ভালোবাসায়।
আবির মাঝেমধ্যে আহিয়ান-আহিয়াকে নিয়ে মাঠে ছুটে যায়। আহিয়ান বলে—
— “পাপা, গোল করবো, তুমি ধরবা না… ঠিক আছে?”
আবির হেসে বলে—
— “তোর জন্য আজও হেরে যাবো।”
মেঘ ও বন্যা এখন পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে।
মালিহা খান, হালিমা খান ও আকলিমা খানকে সংসার জীবনের কাজকর্ম থেকে ছুটি দিয়ে মেঘ,বন্যা পুরো সংসার সহ তাদের সেবা করায় ব্যস্ত সর্বক্ষণ।
গত এক সপ্তাহ হলো আদিকে লেখাপড়ার জন্য লন্ডনে পাঠানো হয়েছে। তখন মিমও এসেছিল খান বাড়িতে। আকলিমা খানকে ধরে তার সে কি কান্না।
আকলিমা খান এখনো নিজেকে সম্পূর্ণ সামলাতে পারেনি। মেয়ের বিয়ের এক মাস হতে না হতেই এখন আবার ছোট্ট ছেলেটার বিদেশে পাড়ি। মা হিসেবে মেনে নেওয়া সত্যিই খুব কষ্টসাধ্য।
সন্ধ্যাবেলা
কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির সকল পুরুষ মানুষ বাড়ি ফিরেছে। ড্রয়িং রুমে হই হই রই রই কান্ড।
দাদা- দাদিদের সাথে বাচ্চারা খেলাধুলা ও গল্প আড্ডায় ব্যস্ত।
মেঘ একটু আগে পাকরা বানিয়ে দিয়ে গেছে।
বন্যা আর তানভীর সোফার এক কোণে বসে দেখছে ওদের দৌড়াদৌড়ি।
তানভীর মৃদু হেসে বললো—
— “দেখো তোমার মেয়ের কান্ড! ও তো পুরোপুরি তোমার মত হয়েছে!”
বন্যা খিলখিলিয়ে হেসে বললো—
— “আর তোমার মতনই জেদী!”
ওদের মেয়ে দৌড়ে এসে মায়ের পেটে মাথা লুকিয়ে বললো—
— “মামমাম , আহিয়ান ভাই আমার সাথে খেলতে চায় না!”
তানভীর মুচকি হেসে বলল: মামমাম, ও তোমার শুধু “ভাইয়া” হয়। আর আহিয়ান ভাই বলে ডাকবে না।
এবার তৃধা জিদ্দি সুরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল: না, ও শুধু আমার আহিয়ান ভাই।
তানভীর এবার মাথায় হাত দিয়ে বলল: ওহ মাই গড.. বন্যা.. আহিয়ান আর তৃধা তো মেঘ আবিরের কার্বন কপি।
এই হাসি, এই শান্তি… তানভীর-বন্যার জীবনে এটাই সবচেয়ে সুন্দর দিন।
একটু দূরে… মেঘ দুই তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিচের ড্রয়িং রুমের দিকে তাকিয়ে আছে।
আবির পেছনে এসে ওর কাঁধে হাত রাখলো—
— “কি দেখছো?”
মেঘ মৃদু হাসলো—
— “যে জীবনটা চেয়েছিলাম… সেটা।”
আবির বললো—
— পেয়েছো?
মেঘ মুচকি হেসে জবাব দিল: হুম, যতটা চেয়েছি তার থেকে বেশি।
আবির মেঘের গাল স্পর্শ করে বললো—
— “তোর মুখের এই হাসিটা… তোর বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি… এই তো আমার বেঁচে থাকার কারণ।
আর তুই… তুই তো আমার প্রাণ…!”
মেঘ চোখে জল আসা হাসি দিয়ে বললো—
— “আজকে আমি সত্যিই খুব শান্তিতে… মিম নতুন জীবনে, ভাইয়া আর বেবি সম্পূর্ণ হয়েছে… আর আমরা… আমরা তো অনেক আগেই নিজেদের মাঝে পূর্ণ হয়েছি।”
পেছন থেকে আহিয়ান দৌড়ে এসে বললো—
— “পাপা! আমাদের সাথে নিচে চলো আমরা খেলব”
আবির আহিয়ান কে কোলে নিল। তারপর মেঘকে নিয়ে নিচে ড্রয়িং রুমে সকলের সাথে এসে বসলো
আহিয়ান, আহিয়া মেঝেতে বল ছুঁড়ে, আবার হাসতে হাসতে পাপা-মাম্মার কোলে এসে পড়ছে। আবির মাঝে মাঝে আহিয়ানকে কোলে তুলছে, আহিয়াকে ঠোঁটে চুমু দিচ্ছে।
আহিয়া পাপাকে জড়িয়ে বলছে—
— “পাপা তোমার চুলগুলো নষ্ট… আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”
আবির হেসে বললো—
— “তোমার মতো প্রিন্সেস থাকতে আমার চুল নিয়ে চিন্তা কি বলো?”
আহিয়া খিল খিলিয়ে হেসে উঠলো।
সবাই ঘুমিয়ে গেছে।
সারাদিনের হইচই শেষে পুরো বাড়ি নীরব।
শুধু আকাশের থালার মতো মস্ত বড় চাঁদ আর সেই চাঁদের আলোয় ভিজে থাকা খান বাড়ির ছাদ।
সেই ছাদে… মেঘ আর আবির পাশাপাশি বসে।
কিছু না বলেও অনেক কিছু বলছে চোখ…
হাতে হাত ধরে বসে আছে… নীরবে।
চাঁদের আলো পড়ে আছে মেঘের মুখে। সেই মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে আবির।
আবির ধীরে বলল—
— “আজ এই রাতটা যেন শেষ না হয়… তুমি, আমি… এই ভালোবাসা… সব যেন এখানেই থেকে যাক…”
মেঘ আস্তে কাঁধে মাথা রাখল—
— “সময় শেষ হয়… কিন্তু ভালোবাসা কোথাও শেষ হয় না… আপনার-আমার এই গল্পের শেষ মানেই আরেকটা শুরুর অপেক্ষা…”
আবির মেঘের মুখ ছুঁয়ে বলল—
— “ এই আমিময় আবির তোমাতেই পরিপূর্ণ।”
মেঘ বলল—
— “ভালোবাসা তো শুধু মুখের শব্দ না… এই সংসার, এই শান্তি… এই দু’জনের একসাথে বাঁচা… সেটাই প্রমাণ।”
আবির হেসে বলল—
— “এই ঠোঁট, এই হাসি, এই তুমি… তুমি ছাড়া আমি কিছুই না… তুমি ছাড়া আমি কোনো পরিচয় রাখি না… তুমি ছাড়া আমি ধূসর।”
চাঁদের নরম আলোয় আবির মেঘকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
ফিসফিসিয়ে বলল—
— “এই শেষ না… তুমি আমার প্রতিটা শুরু… প্রতিটা শ্বাস… প্রতিটা বেঁচে থাকার কারণ… তুমিই আমার আমৃত্যু ভালোবাসা…”
মেঘ চোখ বন্ধ করে বলল—
— “আপনার বুকের এই জায়গাতে ই আমার সবচেয়ে নিরাপদ ঘর… সব গল্প এখানেই শেষ হোক…”
আবির মৃদু হাসলো—
— “শেষ নয়… এই তো শুরু… তুমি, আমি, আর এই ভালোবাসা… আমৃত্যু……”
চাঁদ নীরব সাক্ষী থাকলো…
যেখানে দুটো মানুষের গল্প থেমে নয়…
চিরকাল… ভালোবাসায় বেঁচে থাকবে
“ভালোবাসা শেষ হয় না… শুধু রূপ বদলায়।
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে…”
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮৬+৮৭+৮৮+৮৯
#লেখিকার_শেষ_বার্তা :
এই গল্পের শুরুতে ছিল আবির-মেঘের অসমাপ্ত গল্প…
শেষে এসে তাদের সংসার, সন্তান, সুখ— সব কিছুতেই পূর্ণতা।
সুখের পরিণতি মানেই হয় না গল্প শেষ…
ভালোবাসা থেকে যায়… আমৃত্যু।
কিছু গল্প থাকে, যেগুলোর শেষ মানে কখনোই “শেষ” নয়।
আবির-মেঘের গল্পটা ছিল তেমনই।
হাজারো ঝড়, ভুল বোঝাবুঝি, কান্না, অভিমান— সব পেরিয়ে শেষে ছিল শুধু একটুকরো শান্তি… একফোঁটা হাসি… কিছু দুষ্টু খুনসুটি… আর অসীম ভালোবাসা।
👨👩👧👦 আহিয়া-আহিয়ান যখন খুনসুটি করে,
👫 তানভীর-বন্যা যখন নতুন করে তাদের সংসার সাজায়,
💑 আর আবির-মেঘ যখন একে অন্যের হাতে হাত রেখে বলে—
“এই তো সেই ভালোবাসা, যেখানে প্রমাণ লাগে না… শুধু অনুভবই যথেষ্ট।”
এই গল্পের শেষ লাইনটা ঠিক এই জন্যই—
“আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে।”
সমাপ্ত
