কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১১
তন্ময়ী তিতিক্ষা
“কি সুন্দরী..বিয়ে করবি না?”
মোটা ভারীকন্ঠ কর্ণপাত হতেই সমস্ত অঙ্গ শিউরে উঠল আর্শির। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে সেটে গেল দেয়ালের সাথে। দৃষ্টি তখনও স্থির দরজার পানে। আলো আঁধারির মাঝে এক পুরুষ অবয়ব ভেসে উঠল। দরজার থেলে এগিয়ে এলো একজন লোক। যা দেখে কেঁপে উঠল আর্শি। দুহাতে দিয়ে আঁচল চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
“কা..কাছে আসবেন না একদম।”
লোকটার কানে যেন কথাই ঢুকলো না। ভিতরে ঢুকেই স্বশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আর্শির দৃষ্টি আরও ভয়ার্ত হলো। ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল এবার। কান্নার চোটে আর্শির শরীর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠল। লোকটা দরজা বন্ধ করে আর্শির পানে ফিরে চাইল। মুখে অদ্ভুত হাসি। হাসিটাই যেন বুকে সূচের ন্যায় বিধঁল আর্শির বুকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে অনেক আগেই, আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তবুও আর্শি যেন পারলে দেয়াল ভেদ করে চলে যেত। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
“কা..কাছে আসবেন না.. প্লিজ..আমি পা ধরছি…”
কাঁপা কণ্ঠে মিনতি করল আর্শি। লোকটা একদম নিকটে এসে থেমে গেল। আর্শির দিকে ঝুঁকে যেতেই আর্শি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আকস্মিক সামনে থাকা মানুষটা আর্শির থুতুনি চেঁপে ধরল। নিচুস্বরে বলে উঠল,
“এত ভয় কিসের? আমরা আমরাই তো।”
আর্শি ঝটকা মেরে মুখ সরিয়ে নিল। হঠাৎ এমন ছোঁয়া সহ্য করতে পারছে না। এই বুঝি কলঙ্কের দাগ লেগে গেল গাঁয়ে। ঘৃণায় রি রি করে উঠল সমস্ত দেহ। কষ্টে বুক চিরে বেরিয়ে আসছে কান্নারা। আচঁল দিয়ে পুরো শরীরটা মুড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলল আর্শি। অসহায় কন্ঠে বলে উঠল,
“ধরবেন না আমাকে। আমি কিন্তু নিজেকে শেষ করে দিবো”
লোকটা এবার হেসে উঠল। যেন খুব মজা পেয়েছে আর্শির কথায়। এবার ঝুঁকে একদম আর্শির মুখোমুখি হয়ে গেল। আর্শি ঘাবড়ে গেল। লোকটা আকস্মিক আর্শির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ নাঁচিয়ে বলে উঠল,
“শেষ করে দিবি মুটি? চল এর আগে ডিস্টিং ডিস্টিং করে নেই।”
“আ..আযরান?”
অবিশ্বাসে কেঁপে উঠল আর্শির কণ্ঠ। সামনে থাকা ব্যাক্তিটা সামান্য হাসল। লোকটা এবার একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখের নকল দাড়িটা টেনে খুলে ফেলল। মাথার ক্যাপটাও খুলে ছুঁড়ে দিল পাশে। অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মেলে চাইল আর্শি। নিমিষেই চক্ষুকার্নিশ বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নিজেকে আর সামলাতে পারল না হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়ল পড়ল আযরানের বুকে। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে আযরান আর্শিকে আঁকড়ে ধরল। বহুকষ্টে মানুষটার পিঠ আঁকড়ে ধরল। ক্রন্দনরত স্বরে বলে উঠল,
“তুই এসে..এসেছিস। তুই…না এলে আমি শেষ হয়ে যেতাম আযরান।”
কান্নার জোরে আঁটকে আসছে একেকটা শব্দ। চেয়ে আর একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। আযরানের পিঠ আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কান্নার বেগ বাড়তে লাগল ক্রমশ। কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট গলায় আযরানের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের স্বরে বলে উঠল,
“ওরা..অনেক খারাপ। আম..আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে।”
বুকটা ব্যথায় চিনচিন করে উঠল আযরানের। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল মুহুর্তে। রক্তবর্ণ ধারণ করা চক্ষুদ্বয় জ্বলজ্বল করে উঠল।
“হুশশ! কান্না থামা আর্শি। আমি এসে গেছি তো। আর কিছু হবে না।”
আর্শিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সূক্ষ্ণ একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল আযরান। এতক্ষণে যেন বক্ষস্থলে শান্তি অনুভব হচ্ছে। সারাদিন টেনশনের ওপর গেছে। মেয়েটার কোনো ক্ষতি হয়নি তো এইসব ভেবেই অভ্যন্তরে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব হচ্ছিলো। কিন্তু আর্শিকে সুস্থ অবস্থায় দেখে একটা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল আযরান। আর্শিকে বুক থেকে সরিয়ে দু’হাতে মুখশ্রী হাতের আজলে নিয়ে নিলো। পুরো মুখে চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে নিল একবার। কান্নার চোটে চোখের কাজল লেপ্টে একাকার অবস্থা। মুখের মেকআপও ঘেমে অনেকাংশে চলে গেছে। ঠোঁটের চারপাশে লিপস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিকে গভীর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আযরান। ম্লান হেসে বলে উঠল,
“এইভাবে কেউ সাজায়? পুরো পেত্নী লাগছে। আমার জায়গায় অন্যকেউ হলে কিছু করার আগেই হার্ট অ্যাটাক করে মরে যেতে। যাক বেচারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে।”
কথাটা শুনে কান্নার মাঝেও থমকে গেল আর্শি। ভেজা চোখে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাল। পরক্ষণেই ঠোঁট ফুলিয়ে কিল বসিয়ে দিলো আযরানের বক্ষের মাঝে। আযরান হেসে ফেলল। আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে আর্শির গাল বেয়ে নেমে আসা কাজলটুকু মুছে দিল। ঠোঁটের পাশে ছড়িয়ে থাকা লিপস্টিকটাও আঙুল দিয়ে ঠিক করতে করতে নিচু স্বরে বলল,
“ক্ষমা করে দিস আর্শি। হয়তো লেট করে ফেলেছি। আরও আগে আসলে এতকিছু হতোই না।”
“উঁহু! একদম ঠিক সময় এসেছিস। এখন এখান থেকে আমাকে নিয়ে চল প্লিজ। আমার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে এখানে।”
আযরান কিছু বলতে যাবে এর পূর্বেই হুট করে দরজা ধাক্কানোর শব্দ হলো। চমকে উঠল দু’জনেই। আর্শির মুখশ্রী আতঙ্কে ভরে উঠল। মিশে গেল আযরানের দেহের সাথে। বাইরে থেকে ভেসে এলো জহুরা খানমের ভারিক্কি কন্ঠস্বর,
“সাহেব..সব ঠিক আছে তো। এতক্ষণ হয়ে গেল কোনো সাড়া শব্দ নেই যে।”
আযরান তীর্যক চোখে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে। আর্শির শরীরের কম্পন বেড়েই চলেছে। আর্শিকে একহাতে আগলে চুপ থাকার ইশারা করল। পরক্ষণেই নিজের কন্ঠ মোটা করে বলে উঠল,
“সব ঠিক আছে মাসি। নতুন তো..একটু সময় লাগছে।”
নিমিষেই বাহির থেকে হাসির শব্দ ভেসে এলো, “দ্রুত পোষ নামাও। সময় নষ্ট কইরো না।”
বাইরে থেকে আর কোনো শব্দ না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আযরান। আর্শির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখতে পেল ভয়ে সিটিয়ে আছে মেয়েটা। আযরানের দৃষ্টি গভীর হলো। স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো আর্শির পানে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলে উঠল,
“আমাদের হাতে খুব কম সময় আছে আর্শি। মিহির আর প্রহর বাইরে আছে। আমি সিগন্যাল দিলেই ওরা ঢুকবে।”
আর্শি অবাক হয়ে বলে উঠল, “ওরাও এসেছে?”
“হুম! তবে আমি ঝামেলা চাচ্ছি না। তোকে কোনো মতে নিয়ে বের হয়ে যাবো।”
কেটে গেল ঘন্টাখানেক। আর্শি তখনও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে। মৃদু আলোয় যা আযরান স্পষ্ট দেখতে পেল। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আযরান ক্যাপটা মাটি থেকে তুলে নিল। পুনরায় ক্যাপটা পরে দাঁড়ি লাগিয়ে নিল মুখে। আর্শির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠল,
“আমি বের হচ্ছি। ভয় পাবি না। আমি আছি।”
আর্শির গলা কেঁপে উঠল, “ফিরবি তো?”
“তোকে রেখে কোথাও যাওয়ার জায়গা আছে আমার?”
অশ্রুসিক্ত নেত্রপল্লব মেলে চাইল আর্শি। আযরানের কথায় একদম নিশ্চিত হলো। আযরান সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আর্শির হাতটা শক্ত করে চেঁপে বলল,
“ভয় পাবি না এখনই ফিরে আসবো।”
আযরান বেরিয়ে এলো। বাইরে মেয়েদের আনাগোনা। কেউ কেউ আবার আযরানের গায়ে স্পর্শ করে বিভিন্ন আপত্তিকর ইশারা করতে থাকে। আযরান বিরক্ত হলো প্রচন্ডভাবে। কোনোমতে জহুরা খানমের সামনে এসে পদচারণ থেমে গেল। গম্ভীর দৃষ্টিতে একবার পর্অবেক্ষণ করল চারপাশ। সোফায় বসে আছে জহুরা খানম। তার আশেপাশে আরও কিছু লোক বসে আছে। আযরান একটা নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল। তাকে দেখা মাত্র ওষ্ঠকোণ বাঁকাল। আযরানকে বসতে ইশারা করে বাঁকা হেসে বলে উঠল,
“এই যে সাহেব! অনেকক্ষণ লাগলো কিন্তু…”
জহুরা খানম কুটিল হাসল। বলে উঠল,
“কেমন লাগলো মাল?”
দাঁতে দাঁত চেপে ধরল আযরান। চোয়ালও কিছুটা শক্ত আকার ধারণ করল। কিন্তু বুঝতে দিলো না। নিজেকে শান্ত রেখে বলে উঠল,
“খারাপ না!”
তারপর একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল,
“একটা কথা ছিল মাসি..”
জহুরা খানম ভ্রু তুলল, “কী কথা?”
“মেয়েটাকে আমি একবারে নিয়ে যেতে চাই।”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১০
জহুরা খানম ভ্রুঁ কুঁচকে চাইল। ঠিক ঠাহর করতে পারল না কথাটা। যখন কথাটা বুঝল জহুরা খানমের কপাল ভাঁজ পড়ল। পরক্ষণেই বাঁকা হেসে বলে উঠল,
“এত তাড়াতাড়ি মন বসে গেছে সাহেব?”
আযরান কথা বাড়ালো না। শীতল কন্ঠে বলে উঠল,
“হুম এবার বলুন.. কত দিতে হবে?”
আযরানের দিকে হুট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল জহুরা খানম। সন্দিহান কন্ঠে বলে উঠল,
“সত্যি করে বলো তো কে তুমি?”
