Home আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮০+৮১+৮২

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮০+৮১+৮২

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮০+৮১+৮২
ফারজানা মনি

রবিবার সকাল। খান বাড়ির ড্রয়িং রুমে যেন উৎসবের রঙ ছড়িয়ে আছে। চারদিকে ব্যস্ততা, রঙিন শাড়ির ঝলক, প্যাকেট গুছোনোর হুড়োহুড়ি আর বাড়ির কর্তিদের রন্ধন ঘিরে কড়া নির্দেশনা। সবাই বেশ আনন্দিত—কারণ বাড়ির ছোট মেয়ে মিমের বিয়ে ঠিক হয়েছে!
শুধু একজন মানুষের মনেই আজ ঝড়, সে মিম নিজেই
মিম দোতলার সিঁড়ির এক কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাগ গুছানো দেখছে। তেমন কিছু বলছে না, হাসছেও না। চোখের কোণে পানি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে বারবার।
মিমের মা আকলিমা খান এগিয়ে এসে বললেন,

“মা, মন খারাপ করিস না। তোর নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে। কত মেয়ে এই দিনটার স্বপ্ন দেখে।”
মিম কষ্ট চেপে মুখে একটুখানি হাসি আনার চেষ্টা করল। কিন্তু ভেতরটা যেন কেউ চেপে ধরে আছে।
কারণ সে জানে, এই বিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হতে চলেছে।
চারপাশে কেউ বুঝতে পারছে না কিছুই। তানভীর, আবির, মেঘ, বন্যা সবাই মজা করছে। আহিয়া ও তৃধা স্যুটকেসের ওপর চড়ে বসে আছে। আহিয়ান দাঁড়িয়ে আছে পাশে। বাচ্চারা তো ড্রিম হাউসের কথা শুনেই উত্তেজনায় কাঁপছে।
আবির হাসতে হাসতে বলল:

— “এই যে আহিয়ান, তুমি আহিয়া ও তৃধাকে স্যুটকেসের ওপর উঠতে দিলা কেন?”
আহিয়ান: — “আমি বলছি উঠতে! সে নিজেই উঠছে! আমি আবার কই উঠতে দিলাম?”
মেঘ হেসে : — “ওদের দেখে মনে হচ্ছে ওরাই ড্রিম হাউসের বর-কনে।”
সবার হাসাহাসির মাঝে মিম চুপচাপ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। একটা বাচ্চাও যেন খেয়াল করে না তার মুখের বিষণ্ণতা। কেউ কল্পনাও করে না—তার চোখের পেছনে লুকিয়ে থাকা আরিফের মুখ।
আরিফ—যার সাথে পাঁচ বছর প্রেম, যার কথা শুধু মিমের মা আর বাবা জানে।
আর আজ… তার বাবা-মা মিমকে এই অন্য বিয়েতে রাজি করিয়েছে। “সময় বদলে দেয় অনেক কিছু”, মিম বারবার শুনেছে। কিন্তু তার ভালোবাসা কি সময়ের কাছে হেরে যাবে?
দুপুরের আগে খান বাড়ির চারটে গাড়ি একে একে ঢুকে পড়ল স্পেরো ড্রিম হাউসে। বাড়ির সামনে বিশাল বাগান, ঝকঝকে পাথরের রাস্তা আর ফুলে সাজানো ছোট্ট গেট।

এ কয়েক বছরে আবির বাড়িটাকে সুন্দর করে গুছিয়েছে। যদিও মেঘ বিয়ের পর আসেনি একবারও। আবির বলেছিল অনেকবার চলো কয়েকদিনের জন্য ওই বাড়িতে যাই। কিন্তু মেঘ আসেনি।
আবির এই বাড়িতে একজন কেয়ারটেকার রেখেছে। যার নাম কুদ্দুস। কুদ্দুস চাচা ই সারা বাড়ি ও বাগানের ফুলগুলোর ক্ষণাবেক্ষণ করেন। আবির এই গত কয়েক বছরে স্প্যারো ড্রিম হাউজের দ্বিতীয় তলার কাজ সম্পন্ন করেছে। বাড়িটাকে আরো আকর্ষণীয় করার জন্য বাড়ির চারপাশে গড়ে তুলেছে সুন্দর ও মনোরম ফুলের বাগান।
বাগানের এক কোণে একটা দোলনা বসানো। আর তার একপাশে একটা টেবিল সহ কয়েকটি চেয়ার।
বাড়ির এক কোণে তৈরি করেছে বাচ্চাদের খেলার জন্য kids zone.
মালিহা খান গাড়ি থেকে নিচে নেমেই বললেন,

— “এই বাড়িটার নাম এত সুন্দর কেনো রে? স্পেরো ড্রিম হাউস… কেউ যেন উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে এইখানে।”
তানভীর বলল,
— “হ্যাঁ বড় আম্মু, শুধু স্বপ্ন দেখেই না—অনেক সময় কিছু মানুষ সেই স্বপ্ন থেকে হারিয়েও যায়।”
বন্যা একটু হেসে বলল,
— “আপনি আবার এত দার্শনিক কবে থেকে হইলেন?”
তানভীর চোখ টিপে বলল,
— “মিমের বিয়ে নিয়ে একটু আবেগী হয়ে পড়েছি।”
কেউ জানে না, এই মিমের বুকেই জমে আছে সবচেয়ে বড় সত্য, যেটা লুকানো আছে আরিফের নামে। সেই নাম কেউ উচ্চারণ করে না, কারণ কেউ জানেই না। শুধু আকলিমা খান আর তার স্বামী জানেন, তাদের মেয়ে এখনও চোখ বন্ধ করলেই যে মুখটা দেখে সেটা আরিফের।
বাড়ির উঠোনে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। বড় বড় রঙিন কাপড় টানানো হচ্ছে, আলো ঝুলানো হচ্ছে গাছের ডালে। ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করে একে অন্যকে ফুল মারছে।
আলী আহমেদ খান চিৎকার করে বলছেন –

— “এই লাল বাতিটা কে লাগালো? নীল-সাদা বলেছি না?”
ক্যাটারিনের একটা ছেলে এসে বলল:
— “আমি লাগাইছি খালুজান! রঙ নিয়ে এত ঝামেলা ক্যান ? পছন্দ না হইলে আমি পাল্টে দিব।
আলী আহমেদ খান তেজীকন্ঠে বললেন: তাড়াতাড়ি পাল্টাও। বাড়িতে বিয়ে কোন স্বাধীনতা দিবস না_
একপাশে বসে ছিল মিম। মুখে হাসি নেই। আবির তার পাশে এসে ফিসফিস করে বলল –
— “তুই ঠিক আছিস তো?”
মিম কিছু না বলে মাথা ঝাঁকাল।
আবির একটু তাকিয়েই বুঝে ফেলল, সব ঠিক নেই। কিন্তু কিছু বলল না।
বাড়ির পুরুষরা মিমের বিয়ে উপলক্ষে সবাই সবার কাজ থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েছে।
তানভীর এক কোণে দাঁড়িয়ে ক্যাটারিং এর লোকগুলোকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত। আবির গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বলল: কিরে সব ঠিকমতো হচ্ছে তো?
তানভীর হেসে জবাব দিল: জ্বি ভাইয়া.. এখন পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।
আবির তানভীর এর কাঁধে এক হাতে রেখে বলল: পরবর্তীতে ও যেন সব ঠিক থাকে। কোন যেন ভুল না হয়। আমার অনেক স্পেশাল গেস্ট আসবে।
তানভীর: ঠিক আছে ভাইয়া তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।

সোমবার সকাল।
স্পেরো ড্রিম হাউসের আকাশে হালকা রোদ। বাগানের ফুলগুলো যেন রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। বাড়ির ভেতরটাও ঠিক তেমনি ঝকঝকে। দোতালার বারান্দা দিয়ে নেমে আসা রেলিং জুড়ে ঝুলছে জরি লাইট। রুমের ভিতরে, ব্যালকনি, ড্রয়িং রুম এমনকি কিচেন পর্যন্ত সাজানো।
বাড়ির নিচে ডাইনিং টেবিল সাজানো। সকালের নাস্তার জন্য পুরো খান পরিবার একসাথে বসেছে।
মোজাম্মেল খান হাসতে হাসতে বললেন —
“আবিরকে বাহবা দিতেই হয়। এমন একটা স্বপ্নের বাড়ি, আর কী সুন্দর করে সাজিয়েছে!”
ইকবাল খান মজা করে বললেন —
“এই ড্রিম হাউস তো সত্যি ড্রিম-ই হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—এটা আবির উপহার দিয়েছে আমাদের মেঘকে!
আলী আহমেদ খান একটু গম্ভীর মুখে বললেন —

“এই যুগে কত ছেলে তো মেয়েদের কিছু না দিয়েই সংসার করে। আর দেখো, আমার আবির…”
তানভীর চা খেতে খেতে আবিরের কানের সামনে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল —
আহা, কি রোমান্স!
মেঘ নিচু মুখে চুপচাপ হাসল। তারপর একটু লজ্জা পেয়ে আবিরের দিকে তাকাল। মেঘ চোখ ঘুরিয়ে এবার বলল,
— “এই বাড়ি আমি এতদিনে একবারও আসিনি… এখন এসে মনে হচ্ছে, কতটা ভালোবাসা রেখে গেছে এখানে।”
আবির হালকা গলায় বলল,
— “তুমি আসবা বলেই সাজিয়েছিলাম। জানতাম একদিন তো আসতেই হবে।”
এই আনন্দের মধ্যে একটা মুখ একদম স্তব্ধ—
মিম চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে খাচ্ছিল। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে কোনো আগ্রহ নেই।
ওর মনের মধ্যে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“এই বাড়ির চারপাশ এত আনন্দে ভরা, তাহলে আমার বুক এত ভারী কেন?”
পাশের চেয়ার থেকে বন্যা মিমের উদ্দেশ্যে বলল: তোমাকে আর কিছু দেবো?
কিন্তু মিম হয়তো অন্যমনস্কতার কারণে তা শুনতে পায়নি। ‌ নিজ মনে ভাবনায় ডুবে আছে আর প্লেটে আঙ্গুল ঘুরাচ্ছে।
বন্যা এবার মিমকে খানিকটা ঝাকুনি দিয়ে বলল: কি হলো মিম.. এত কি ভাবছো?
এবার বন্যার কথায় মিমের ধ্যানভঙ্গ হলো। জবাব দিলো: কই কিছু নাতো।
বেলা ১১টার দিকে
কলিংবেল বাজল। কুদ্দুস চাচা এসে জানাল,

— “একজন আপা এসেছে, সঙ্গে আরও দুইজন।”
এই কথা শুনেই কিচেন থেকে বের হয়ে এলো বাড়ির তিন কর্তি।
দরজা খুলতেই ঢুকলেন মাহমুদা খান। সাদা-সবুজ শাড়ি, গলায় সোনার হার। তার সঙ্গে আইরিন আর জান্নাত।
তাদের মুখে এক ধরনের রঙচঙ উচ্ছ্বাস। যেন আত্মীয় হিসেবে তারা খুব আনন্দের সাথে বিয়েতে অংশ নিচ্ছে। কারো মুখে কোন দ্বিধা নেই, আবার কারো চোখে কোনো সংকোচও নেই।
মাহমুদা খান বললেন —
“আমাদের ছোট আদরের মেয়েটার বিয়ে! হঠাৎ করেই যেন মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেল।
মালিহা খান হাসলেন।
মাহমুদা খান পুনরায় বললেন:
ভাবি.. এতদিন আরিফের মুখে আবিরের তৈরি করা স্পেরো ড্রিম হাউজের শুধু গল্প শুনেছি, আজ বাস্তবে এসে সব দেখে মন ভরে গেল।”
মাহমুদা খানের কথা শুনে মালিহা খান পুনরায় হেসে জবাব দিলেন: হ্যাঁ.. ছেলেটা একা একাই নিজ উদ্যোগে এই বাড়িটি করেছে। বহুবার শুনেছি এই বাড়ির কথা। কিন্তু কখনো ভাবি নি আমার ছেলেটা একা হাতেই এত সুন্দর করে সবকিছু গুছিয়ে করতে পারবে।
জান্নাত বললেন —
বড় মামি.. এই বাড়িটা দেখে তো আমি অবাক! হঠাৎ করে এত সুন্দর করে সাজানো—পুরো ছবির মতো!”
মিম পাশে বসে চুপচাপ সবার আনন্দ দেখছে।
আইরিন বলে উঠল —
“ অবশেষে আমাদেরও দেখার সুযোগ হলো । তাও আবার মিমের বিয়ের জন্য!
মিম ঠোঁট কামড়ে হাসার ভান করল। গলা দিয়ে শুধু একটাই শব্দ বের হলো—

— “হুম।”
তারপর মনে মনে ভাবলো: বাকি সবাই না হয় কিছু জানে না। কিন্তু তুই কি করে এতটা পাল্টে গেলি আইরিন। আমি ভেবেছিলাম প্রথমে তোকে দেখে, তুই মনে হয় আরিফের কোন মেসেজ নিয়ে আসবি আমার কাছে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।
কিছুক্ষণ পর একে একে স্পেরো ড্রীম হাউজ থেকে বেরিয়ে পড়ল খান বাড়ির তিনটি গাড়ি। গন্তব্য বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স।
গাড়ির ভেতর সবাই মজা করছে। জান্নাত ,আইরিন, মেঘ ও বন্যা হাসতে হাসতে বলছে কার কোন রঙ পছন্দ।
জান্নাত বলল —
“এই বিয়েতে শাড়ির কালেকশন এমন হবে যে ফটোসেশনেই ট্রেন্ডিং হয়ে যাবে!”
আইরিন বলল —
“আর গহনার কথা বলতে গেলে, মিমের জন্য একটা গোল্ড প্লেটেড সেট আমি নিজে সিলেক্ট করব।”
এই কথা শুনে সবাই হাসতে থাকলো।
মিম এক পাশে চুপ। এত কথা, এত আনন্দ—তবুও তার ভেতরে যেন বালুর মতো জমে আছে এক অস্থিরতা।
শাড়ির দোকানে গিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে পছন্দ করতে। রঙিন বেনারসি, সিল্ক, কাতান, কাঁচের কাজ… সব সাজিয়ে রাখা।
আইরিন একটা শাড়ি তুলে বলল —

“এইটা তো একদম মিমের জন্যই তৈরি!”
মাহমুদা খান বললেন —
“মিম, বল দেখি কোনটা নিবি?”
মিম একটা শাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—
— “যেটা তোমরা দেবে, সেটাই ভালো।”
এই কথার মধ্যে আনন্দ ছিল না, ছিল শুধু একরাশ পরাজয়।
শাড়ির দোকান — আনন্দের ঝলক
সব মেয়েরা ই শাড়ির দোকানে ঢুকেছেন। মালিহা খান একটা স্কাই ব্লু রংয়ের বেনারসি তুলে বললেন —
— “এইটা বউ পরবে রিসেপশনে! হালকা জরি, ভারী চওড়া পাড়!”
হালিমা খান বললেন —
— “এইটার সাথে গহনা কোনটা যাবে তাই তো বুঝছি না।”
আকলিমা বললেন —
— “সোনালি গলাবন্ধ চেন সেট।
আইরিন বলল —
— “জানেন, জান্নাত ভাবি যখন বিয়ে করছিল, ঠিক এই রকমেরই একটা শাড়ি পরেছিল।”
জান্নাত হেসে বলে —
— “ সম্পূর্ণ এরকম না, কিছুটা ডিফারেন্স আছে!”
সবাই হাসিতে মেতে উঠল। শুধু এক কোণায় বসে রইল মিম, তার হাতে শাড়ি নেই, মুখে কোনো বাছ-বিচার নেই, চোখে শুধু বিশাদের ছায়া।
মিম জানে, এই শপিং ব্যস্ততা তার জন্য, এই বিয়ের সাজ সব তার জন্য—তবু তার চোখে আনন্দ নেই।
মেয়েরা শাড়ির দোকান থেকে মিমসহ সকলের জন্য অনেকগুলো শাড়ি নিল। শাড়ির দোকান থেকে বের হওয়ার পরেই কারো চোখ জামার দোকানে, কারো নজর জুতার শেলফে।
হালিমা খান মালিহা খানের উদ্দেশ্যে বললেন,
— “আপা , আগে একটা সেলাই দোকান দেখি। আমি না আমার শাড়ি একটু কাটিয়ে নিতে চাই।”
মালিহা খান হাসতে হাসতে বললেন —
— “সেলাই কি শপিংয়ের আগে করিস, নাকি পরে?” আগে পুরো শপিং শেষ কর।
তানভীর__ বন্যা ও তৃধাকে নিয়ে সোজা চলে গেল কিডস সেকশনে।
তানভীর বলল —

“ওই যে কিডস সেকশন । মেয়ের জন্য যা যা পছন্দ হয় নাও!”
তানভীর এর পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই তৃধা ছুটে গেল সেদিকে।
বন্যা হেসে বলল—
“এই মেয়ে এত ছোট, তাও ব্র্যান্ড দেখে দেখে জামা ধরতেছে দেখেন… ”
তানভীর দুষ্টুমির সুরে বলল: দেখতে হবে না মেয়েটা কার। নিজের জন্য সব সময় বেস্ট টাই চয়েস করি আমি। বহু বছর আগে যেমন চয়েস করেছিলাম তোমাকে।
বন্যা একটু লাজুক হাসলো।
আহিয়ান আর আহিয়া তো দৌড়াদৌড়ি করতেই ব্যস্ত। আবির একদিকে দাঁড়িয়ে শুধু বলল,
— “বাচ্চারা শপিংমলে আসা মানেই যেন ওদের নতুন থ্রিলার মুভি শুরু।”
মেঘ হালকা হাসল। আবির বলল—
— *“তুমি কিছু দেখছো না?”
মেঘ মাথা নাড়ল — “হুম দেখছি, আপনি আমায় পছন্দ করতে সাহায্য করুন না প্লিজ।”
আবির মুচকি হেসে বলল: চলো, ঠিক আছে। ওইদিকে যাই।
আদি মোবাইলে ভিডিও করতে ব্যস্ত। হঠাৎ বলল:

— “মিম আপুর বিয়ের শপিং তো আমি vlog বানিয়ে আপলোড করব। Views চাই!”
আকর্ষণীয় হাসি ছড়াল চারপাশে।
সবাই যার যার মতো ব্যস্ত, কিন্ত মাঝে মাঝে চোখ চলে যায় মিমের দিকে। মেঘ লক্ষ করছিল, মিম কোন দোকানে ঢুকছে না, কাউকে কিছু বলছেও না। শুধু হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল, কখনও কোন পোশাকের দিকে তাকায়, আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।
একটা বুটিক দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। গ্লাসের ওপারে একটা লাল রঙের কাতান ঝুলে আছে।
মেঘ পেছন থেকে এসে বলল —
— “পছন্দ হয়েছে বুঝি?”
মিম ঘাড় নাড়ল —
— “না। শুধু দেখছিলাম।”
মেঘ তার হাত চেপে ধরল। অনেক কিছু বলতে চাইল, কিন্তু এ সময় বলার ছিল না কিছুই। শুধু বলল—

— “চোখে এত কষ্ট কেনো?”
মিম মৃদু হেসে জবাব দিল: কই ?তেমন কিছু না!
সন্ধ্যার আগে খান পরিবার শপিং শেষ করে ফিরে এল স্পেরো ড্রিম হাউসে। গাড়ি থেকে নেমে মনে হচ্ছিল যেন কেউ মালবাহী ট্রাক নামাচ্ছে। শপিং ব্যাগ, গয়নার প্যাকেট, বাচ্চাদের খেলনা, জুতার বাক্স, শাড়ির প্যাকেট—সব মিলিয়ে একেবারে বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতি।
হালিমা খান হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন —
— “শপিং করতে করতে আমার পায়ের হাড় গুলা আলাদা হয়ে গেছে। কেউ ব্যাগ নিচ্ছিস না কেনো?!”
আদি মোবাইল হাতে ভিডিও করতে করতে বলল —
— “এই শপিং আনলোডিং অপারেশন-টা আজ রাতেই ইউটিউবে উঠবে!”
তানভীর হেসে বলল —
— “ভিডিও ছাড়ার আগে সাবস্ক্রাইব বলাটা ভুলবি না!”
আহিয়ান আর আহিয়া ব্যাগ নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। আহিয়ান একটা শাড়ির প্যাকেট ঘাড়ে তুলে বলল—
— “আমি এইটার ডেলিভারি বয়।”
আহিয়া চোখ রাঙিয়ে বলল—
— “না! এটা আমার! ফুপ্পির বিয়ের শাড়ি আমি নিব।”
আবির হাত উঁচু করে বলল —

— “সবাই ব্যাগ নিয়ে ঘরে তুল, প্লিজ। খাওয়া-দাওয়া করতে হবে তারপর। আম্মুর পা ব্যথা করছে।”
মেঘ তার ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল —
— ” আহিয়ার আব্বু আমি ছেলে মেয়েরটা নিয়ে ভেতরে যাচ্ছি। আপনি আপনার আর আমারটা নিয়ে আসুন!”
বন্যা চেহারায় ক্লান্তি এনে বলল —
— “তাও ভালো, আমি তো নিজেরটার সাথে তৃধার জন্য কেনা তিনটা ব্যাগ নিয়েছে। এখন তৃধা সব খুলে দেখতে চাইতেছে।”
তৃধা তখন এক ব্যাগ খুলে একটা ছোট জুতা বের করে বলল —
— “এইটা এখনই পরব!”
মাহমুদা খান নিজের শাড়ির ব্যাগ গুনে দেখছিলেন —
— “সব ঠিক আছে তো? আমার একটা শাড়ি কম মনে হচ্ছে না?”
জান্নাত বলল —
— “মা, আপনি তো দুইবার একই শাড়ি কিনেছেন! এইটা বুঝতেই ভুল করেছেন।”
সবাই হেসে উঠল।
এইদিকে মিম চুপচাপ নিজের ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকছিল। তার হাঁটার গতিও ধীর। কিন্তু বাইরে এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যে সেই বিষাদটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ঢেকে যায়।

রাত ১১টা বেজে ৪ মিনিট।
রুমের জানালাটা খোলা। জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস এসে পর্দাকে অদ্ভুতভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
আরিফ একা বসে আছে রুমের কোণার ছোট্ট সোফায়। তার হাতে ধরা একটা কাগজ—কোনো চিঠি না, কোনো স্ক্রিপ্ট না, কেবল একটা সাদা পৃষ্ঠা… যেখানে কোনো কিছু লেখা হয়নি, কিন্তু মনের ভেতরে যেন হাজারো লাইন আঁকা।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। আলোটা আবছা। ঘরটা নিঃস্তব্ধ, ঠিক যেমন নিঃস্তব্ধ এখন আরিফের বুক।
সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
আরিফের কণ্ঠস্বর কাপছে, একা একাই বলল—
“সবাই বলে, ভালোবাসা সাহসী করে তোলে মানুষকে।
কিন্তু কেউ কখনো বলে না—ভালোবাসা মানুষকে ভয়ও দেখায়।
অসহায় করে দেয়।
চুপ করে দেয়।”

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল আরিফ।
আবার একা একা আওড়ালো:
“আমি তাকে চিনি। আমি জানি সে কেমন।
কিন্তু… কখনও কখনও কিছু মানুষ এতটাই অবাক করে,
যার ব্যাখ্যা দিতে পারে না কেউ।
আমি ভয় পাচ্ছি সেই বিস্ময়ের কাছে হেরে যেতে।”
সে জানালার বাইরে তাকাল।
আকাশে আধো আলো, চাঁদ ধীরে ধীরে মেঘের আড়ালে ঢুকে যাচ্ছে। ঠিক যেমন ওর নিজের মনের আলো—ভালোবাসার আলো, আরেকটা অজানা পরীক্ষার মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।
অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল:
“সে জানে না… কিছু জানে না।
আর আমি… সব জানি, তাও কিছু বলতে পারছি না।
কিছু করা যাচ্ছে না।
শুধু বসে থাকতে হচ্ছে—অপেক্ষায়।

একটা সিদ্ধান্তের।
একটা মুহূর্তের।
যেটা হয়তো… আমার পুরো জীবনটাই বদলে দেবে।”
আরিফ উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গেল। নিজের চোখের দিকে তাকাল।
বির বির করে বললো:
“তুমি কি পারবে না মিম… আমার ভালোবাসার মান রাখতে?”
তার চোখে জল আসার মতো, কিন্তু সে চেপে রাখল। কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি যদি না বুঝো, তবে কি আমি হারিয়ে যাব?
তুমি কি চিনবে না—এই নীরব ভালোবাসাটাকে?”
ঘরজুড়ে তখনো নিস্তব্ধতা। শুধু জানালার পর্দা উড়ছে… আর আরিফ একা দাঁড়িয়ে আছে—হৃদয়ে এক বিশাল ঝড় নিয়ে, যা কেবল সে আর একজনই অনুভব করছে—সে হলো মিম। কিন্তু মিম জানেই না, এই পুরো ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে সে নিজেই দাঁড়িয়ে।
ধীরে ধীরে ঘড়ির কাঁটা এসে থামলো রাত ১২ টায়। রুমের নিস্তব্ধতায় টিকতে না পেরে আরিফ বেরিয়ে পড়ল অন্ধকার রাত্রে অজানা গন্তব্যে।

অন্যদিকে
রাত ১২টা পেরিয়ে গেছে।
স্পেরো ড্রিম হাউসের চারপাশ নিস্তব্ধ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে—শুধু একটা ঘরে আলো জ্বলছে এখনো।
মিমের ঘর।
চুপচাপ বিছানায় বসে আছে সে। চুল খোলা, মুখটা ফ্যাকাশে। চোখ ফুলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। তাকিয়ে আছে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে—নিজেকে চিনতেই পারছে না।
আজ সারা দিন কেবল হাসিমুখ দেখিয়েছে সবার সামনে।
সবার সামনে নিজেকে সাজিয়েছে, নতুন জামা ট্রাই করেছে।
কিন্তু একবারও কেউ হয়তো বুঝতে চাইনি মিম ঠিক আছে কিনা! সেদিন আরিফের এত কথা শুনেও মিম বেহায়ার মত আজ সারাদিন কল ও মেসেজ দিয়েছে। আরিফ গত দুই দিন ধরে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমু সব থেকেই অফলাইন। সিমটাও বন্ধ। তাও যদি একবার খোলে সেই আশায় মিম কল দিয়ে গেছে বারবার। কিন্তু প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফোনটা রেখে দিতে হয়েছে।

মিম ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। তার সিল্কি কালো চুল গুলো আজ অযত্নে ছড়িয়ে পড়ে আছে সরাসরি বিছানা থেকে ফ্লোরে। চোখ তার ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখার দিকে। হৃদয় ভাঙার যন্ত্রনায় আজ সে কাতর। হঠাৎ করে মিম বিড়বিড় করে বলল: মুক্তি চাই.. এই ভয়াবহ কষ্ট থেকে আমি মুক্তি চাই।
তারপর কিছু একটা ভেবে বিছানা থেকে হঠাৎ করেই উঠে বসলো।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ড্রয়ারের দিকে।
পুরনো একটা ছোট্ট নোটবুক বের করল।
আরিফের দেওয়া প্রথম চিঠি এখনও রাখা সেখানে।
সেই চিঠির পাশে আজ লিখল সে:

“আমি হেরে যাচ্ছি আরিফ।
তোমার চুপ করে থাকা, আমার সহ্য হচ্ছে না আর।
জানি না বিয়েটা কার সাথে হচ্ছে, জানি না তুমি কোথায়।
শুধু জানি, তুমি ছাড়া আমি কিছুই না।
এই বিয়ে, এই আনন্দ, এই সাজ… সব যেন বিষ লাগছে।
কেউ যদি জানত আমি ভিতরে কতটা শেষ হয়ে গেছি…”
তারপর একটা সাদা পেইজ ছিঁড়ে আলাদাভাবে লিখল:
“আব্বু, আম্মু—আপনারা যদি এই চিঠিটা পড়েন, তাহলে শুধু জানবেন— আমি কারো বিরুদ্ধে না, আমি শুধু আমার ভালোবাসার পক্ষে ছিলাম। আমি আর পারছি না।”

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৭৭+৭৮+৭৯

তারপর মিম দরজা খুলে সিড়ি দিয়ে নামলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে। সেখান থেকে ফল কাটার ছুরিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। তার হাত তীব্র গতিতে কাঁপছে। আরিফের কথা যতবার মনে পড়ছে ততবারই মনে হচ্ছে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে।
কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও বারবার মনে পড়ছে মা-বাবা, বড় আব্বু, চাচ্চু, বড় আম্মু , মামুনি ও ভাই বোনদের মুখ।
হাতের কাঁপুনিতে হঠাৎ করেই ছুরিটা ছিটকে পরল ডাইনিং টেবিলের একটা গ্লাসের উপর। তৎক্ষণাৎ গ্লাস টি নিচে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮৩+৮৪+৮৫